📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হাওয়া (আ)-এর সৃষ্টি ও বেহেশতে বসবাসের আদেশ

📄 হাওয়া (আ)-এর সৃষ্টি ও বেহেশতে বসবাসের আদেশ


আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَقُلْنَا يَأْدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا
"এবং আমি বলিলাম, 'হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর এবং যেথা ইচ্ছা স্বচ্ছন্দে আহার কর' ...." (২ঃ৩৫)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লামা ইব্‌ন কাছীর (র) বলেন, "আয়াতের বিন্যাস হইতে বুঝা যায়, হাওয়া (আ) আদম (আ)-এর জান্নাতে প্রবেশের পূর্বেই সৃষ্টি হইয়াছেন। কিন্তু কেহ কেহ বলেন, হাওয়ার সৃষ্টি হইয়াছে আদম (আ)-এর জান্নাতে প্রবেশের পর, যেমনটি সুদ্দী হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) ও সাহাবীগণের অনেকের বরাতে বর্ণনা করেন। এই বর্ণনায় বলা হয়: ইবলীস জান্নাত হইতে বহিষ্কৃত হয় এবং আদম (আ)-কে জান্নাতে বসবাস করিতে দেওয়া হয়। তিনি তখন জান্নাতে একাকী ঘোরাফেরা করিতেন, তাঁহার সাথে বসবাসের জন্য তাঁহার স্ত্রী ছিলেন না। একবার তিনি ঘুম হইতে উঠিয়া দেখিলেন, তাঁহার শিয়রে একজন নারী উপস্থিত, যাহাকে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার বাম পাজর হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন। তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কে? হাওয়া বলিলেন, আমি নারী। আদম বলিলেন, তুমি কেন সৃষ্টি হইয়াছ? হাওয়া বলিলেন, যাহাতে আপনি আমার সহিত বসবাস করেন এবং শান্তি লাভ করেন। ফেরেশতাগণ তখন আদমের বিদ্যার দৌড় কি পর্যন্ত পৌছিয়াছে দেখার উদ্দেশ্যে আদমকে প্রশ্ন করিলেন, এর নাম কি হে আদম? জবাবে আদম বলিলেন, হাওয়া। ফেরেশতাগণ বলিলেন, তাহার হাওয়া নামকরণের কারণ কি? আদম (আ) বলিলেন, সে حى বা জীবিত বস্তু হইতে নির্গত হইয়াছে বলিয়া তাহার নামকরণ করা হইয়াছে” (মুখতসর তাফসীরে ইব্‌ন কাছীর, ১খ, ৫৪, মুহাম্মদ আলী সাবৃনী সম্পা.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদম-হাওয়া কোন্ জান্নাতে ছিলেন?

📄 আদম-হাওয়া কোন্ জান্নাতে ছিলেন?


এ সম্পর্কে আলিমগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। জমহুর উলামার মতে, উহা সেই জান্নাতুল মাওয়া যাহার ওয়াদা মুত্তাকী বান্দাদের জন্য করা হইয়াছে। কুরআন ও হাদীছের আলোকে তাঁহারা এই মত পোষণ করেন। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَقُلْنَا يَأْدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ
"আমি বলিলাম, হে আদম! তুমি ও তোমার সহধর্মিনী জান্নাতে বসবাস কর” (২: ৩৫)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত মুসলিম শরীফের হাদীছে আছেঃ "আল্লাহ্ তা'আলা সমস্ত লোককে একত্র করিবেন। যখন জান্নাতকে মুমিনদের জন্য সুসজ্জিত অবস্থায় প্রস্তুত করা হইবে তখন তাহারা আদম (আ)-এর নিকট গিয়া বলিবেন, পিত! আমাদের জন্য জান্নাতের দ্বার উম্মোচন করুন। তখন তিনি বলিবেন, তোমাদেরকে তোমাদের পিতার অপরাধ ভিন্ন অন্য কিছুই জান্নাত হইতে বহিষ্কৃত করে নাই।" ইব্‌ন কাছীর (র) 'আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া' গ্রন্থে হাদীছটি উদ্ধৃত করিয়া বলেন, ঐ জান্নাত যে জান্নাতুল মাওয়া ছিল এ ব্যাপারে এই উক্তিটিই শক্তিশালী প্রমাণ।
পক্ষান্তরে অন্য একদল আলিম তাঁহাদের একটি গাছ ছাড়া সকল গাছের ফলমূল খাওয়া, সেখানে তাঁহাদের নিদ্রা যাওয়া, সেখান হইতে তাঁহাদের বহিষ্করণ, সেখানে ইবলীসের প্রবেশ এবং ওয়াস-ওয়াসা প্রদান, আদমের অপরাধ ও তাঁহার প্রভূর আদেশ মান্যকরণ প্রভৃতি কারণে মনে করেন যে, উহা জান্নাতুল মাওয়া হইতে পারে না। নিশ্চয়ই উহা দুনিয়ায় অন্য কোন বাগান হইবে।
উবায়্য ইব্‌ন কাব, আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা), ওয়াহ্হ্ ইব্‌ন্ন মুনাব্বিহ, সুফিয়ান ইব্‌ন উয়ায়না, ইব্‌ন কুতায়বা প্রমুখ হইতে অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। কাযী মুনযির ইন্ন সাঈদ বালুতী তদীয় তফসীরে এই অভিমতই গ্রহণ করিয়াছেন এবং এ সম্পর্কে তিনি স্বতন্ত্র একখানা পুস্তকও রচনা করিয়াছেন। ইমাম আবু হানীফা (র) ও তদীয় সঙ্গীগণও এরূপ মত পোষণ করিতেন বলিয়া তিনি উল্লেখ করিয়াছেন। আবূ আবদুল্লাহ্ মুহাম্মদ ইবন উমার আর-রাযী ইন্ন খাতীব আর-রাঈ তদীয় তাফসীর গ্রন্থে আবুল কাসিম বালখী ও আবূ মুসলিম ইস্পাহানী হইতে এবং কুরতুবী তদীয় তাফসীর গ্রন্থে মুতাযিলা ও কাদরিয়াদের অনুরূপ মত রহিয়াছে বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। তাওরাতের বর্ণনাও অনুরূপ (পবিত্র বাইবেলে, পৃ. ৩)।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না যে, যাহারা বলেন, আদম ও হাওয়া (আ) দুনিয়ার কোন বাগানেই ছিলেন, তাহারা যুক্তি দেন যে, তাঁহারা যদি চিরস্থায়ী জান্নাতেই বসবাস করিতেন, তাহা হইলে-ঐ নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফলভক্ষণে চিরস্থায়ী জান্নাতের তাঁহারা অধিকারী হইবেন-ইবলীসের এইরূপ বলার কী কারণ থাকিতে পারে।
আবার যাহারা বলেন, তাঁহারা স্থায়ী জান্নাতে বা জান্নাতুল মাওয়ায় বসবাস করিতেন, তাহারা বলেন, তাঁহারা যদি ঐ এই অস্থায়ী দুনিয়ার কোন অস্থায়ী বাগানেই বসবাস করিতেন, তাহা হইলে যেখানে স্থায়িত্ব বলিয়া কিছুই নাই সেখানে শাজারাতু'ল-খুল্দ বা স্থায়ী বৃক্ষের কথা আসে কোথা হইতে? আবার কোন কোন তাফসীরকার বলেন, উহা চিরস্থায়ী জান্নাত—জান্নাতুল মাওয়াও নহে, পৃথিবীর কোন বাগানও নহে, আল্লাহ্ তা'আলা ঊর্ধ্ব জগতে তাঁহাদের জন্য এক বিশেষ জান্নাত সৃষ্টি করিয়াছিলেন (আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮-১০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নিষিদ্ধ ফল কোন্টি ছিল?

📄 নিষিদ্ধ ফল কোন্টি ছিল?


জান্নাতে বসবাসের আদেশ দানের সাথে সাথে আদম ও হাওয়া (আ)-এর প্রতি কঠোরভাবে একটি নিষেধাজ্ঞাও আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হইতে জারী করা হইয়াছিল। তাহা ছিল এইরূপ:
وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّلِمِينَ.
"কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হইও না; হইলে তোমরা অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হইবে” (২: ৩৫ ও ৭: ১৯)।
এই নিষিদ্ধ বৃক্ষ ও ইহার ফলটি কী ছিল তাহা নিয়াও তাফসীরবিদগণের মধ্যে মতানৈক্য রহিয়াছে। কেহ বলিয়াছেন, উহা ছিল আঙ্গুর। ইবন আব্বাস, সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র, শা'বী, জা'দা ইব্‌ন হুবায়রা, মুহাম্মদ ইব্‌ন কায়স, সুদ্দী প্রমুখ হইতে এরূপ বর্ণিত হইয়াছে。
ইব্‌ন আব্বাস, হাসান বাসরী, ওয়াহ্ ইব্‌ন্ন মুনাব্বিহ প্রমুখ হইতে বর্ণিত আছে, ইয়াহুদীদের ধারণা, উহা ছিল গম। ওয়াত্ব বলেন, এমন একটি শস্যফল যাহা সমুদ্রের ফেনার চাইতেও কোমল এবং মধুর চাইতেও সুমিষ্ট। সুফিয়ান ছাওরী হযরত হুসায়ন (حصين) হইতে বর্ণনা করেন, উহা হইতেছে খেজুর। ইব্‌ন জুরায়জ (র) হযরত মুজাহিদের সূত্রে বর্ণনা করেন, উহা হইতেছে ডুমুর ফল। কাতাদা ও ইব্‌ন জুরায়জের উহাই অভিমত। আবুল আলিয়া বলেন, উহা এমন একটি বৃক্ষ ছিল যাহা ভক্ষণে বায়ু নিঃসরণ হইত আর জান্নাতে বায়ু নিঃসরণ ছিল অশোভনীয় (কাসাসুল আম্বিয়া, ইব্‌ন কাছীর, পৃ. ২০-২১)।
আল্লামা ইবন জারীর এই প্রসঙ্গে তাঁহার আলোচনায় একটি সিদ্ধান্তমূলক মন্তব্য করিয়াছেন। তিনি বলেন, "সঠিক কথা এই যে, আল্লাহ তাআলা আদম (আ) ও হাওয়াকে একটি সুনির্দিষ্ট বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করিতে বারণ করেন। ঐ জাতীয় সমস্ত বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করিতে তিনি বারণ করেন নাই। তাঁহারা উহা ভক্ষণ করেন। সুনির্দিষ্টভাবে ঐ বৃক্ষটি কী ছিল তাহা আমাদের জানা নাই। কেননা আল্লাহ তাআলা তদীয় বান্দাগণের জন্য আল-কুরআন বা মহানবী (স) সহীহ হাদীছে উহার কোন দলীল-প্রমাণ বর্ণনা করেন নাই। কেহ কেহ বলিয়াছেন, উহা গম গাছ ছিল, কেহ বলিয়াছেন, উহা ছিল আঙুর গাছ, কেহ বলিয়াছেন ডুমুর গাছ। ইহার যে কোনটিই হইতে পারে। উহা এমন একটি বিষয় যাহার জ্ঞান দ্বারা জ্ঞানী ব্যক্তির কোন উপকার হওয়ার সম্ভাবনা বা ইহা জ্ঞাত না থাকার কারণে ইহার জ্ঞানহীন ব্যক্তির কোনরূপ ক্ষতির আশঙ্কা নাই” (মুখতাসার ইন্ন কাছীর, সূরা বাকারার ৩৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়, পৃ. ৫৫)।
ঐ নিষিদ্ধ বৃক্ষের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সায়্যিদ কুতব (র) বলেন, "সম্ভবত ঐ গাছটিকে পার্থিব জীবনের যাবতীয় নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।"
এই নিষিদ্ধ করণের যুক্তিও সায়েদ কুতুব ব্যাখ্যা করেন এইভাবে, "কিছু নিষিদ্ধ জিনিস না থাকলে স্বাধীন ইচ্ছা শক্তির অস্তিত্ব বুঝা যায় না এবং স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন মানুষকে ইচ্ছাশক্তিহীন পশুপাখি থেকে পৃথক করা যায় না। মানুষ কতটা ধৈর্য সহকারে আল্লাহ্র সাথে কৃত অঙ্গীকার ও বিধিনিষেধ মেনে চলতে পারে তার পরীক্ষা নিষিদ্ধ জিনিস ছাড়া হতে পারে না। সুতরাং স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও নির্বাচন ক্ষমতাই হলো মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য করার মাপকাঠি। যাদের ভাল-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায় বাছবিছার করার ক্ষমতা নাই এবং নির্বিচার জীবন যাপন করে তারা দেখতে মানুষ হলেও আসলে পশু” (ফী যিলালিল কুরআন, বঙ্গানুবাদ, ১খ, পৃ. ১০৯)।
শয়তানের শত্রুতার ব্যাপারে সতর্কবাণী: يَا أَدَمُ إِنَّ هَذَا عَدُوٌّ لَكَ وَلِزَوْجِكَ فَلَا يُخْرِجَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَى .
"হে আদম! নিশ্চয়ই এ তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু, সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদিগকে জান্নাত হইতে বাহির করিয়া না দেয়। দিলে তোমরা দুঃখ-কষ্ট পাইবে" (২০: ১১৭)।
সাথে সাথে জান্নাতে তাঁহাদের জন্য রক্ষিত সুখ-শান্তির কথাটাও বলিয়া দেওয়া হয়,
إِنَّ لَكَ أَلَّا تَجُوْعَ فِيهَا وَلَا تَعْرَى . وَأَنَّكَ لَا تَظْمَوْا فِيهَا وَلَا تَضْحى.
"তোমার জন্য ইহাই রহিল যে, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্তও হইবে না, নগ্নও হইবে না এবং সেখানে পিপাসার্তও হইবে না, রৌদ্রক্লিষ্টও হইবে না" (২০: ১১৮-১১৯)।
فَوَسْوَسَ إِلَيْهِ الشَّيْطَنُ قَالَ يُأْدَمُ هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكِ لَا يَبْلَى
"অতঃপর শয়তান তাহাকে কুমন্ত্রণা দিল। সে বলিল, হে আদম! আমি কি তোমাকে বলিয়া দিব জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা" (২০: ১২০)?
অন্যত্র তাহার এই কুমন্ত্রণার কথা বিবৃত হইয়াছে এইভাবে:
مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ . وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ . فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ .
"পাছে তোমরা উভয়ে ফেরেশতা হইয়া যাও কিংবা তোমরা স্থায়ী হও এইজন্যেই তোমাদের প্রতিপালক এই বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদিগকে নিষেধ করিয়াছেন। সে তাহাদের উভয়ের নিকট শপথ করিয়া বলিল, আমি তো তোমাদের হিতাকাঙ্খীদের একজন। এইভাবে সে তাহাদেরকে প্রবঞ্চনার দ্বারা অধঃপতিত করিল" (৭ঃ ২০-২২)।
এই প্রসঙ্গে আদম (আ) ও ইবলীসের মধ্যকার ঐ সময়ের কথোপকথন চমৎকারভাবে বিধৃত হইয়াছে আল্লামা ইদরীস কান্দেহলভীর বর্ণনায়। তিনি লিখেন, "হযরত আদম (আ) জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কোন বৃক্ষের কথা বলিতেছ হে? জবাবে শয়তান তাঁহাকে সেই বৃক্ষের কথাটি বলিল যাহার নিকট যাইতে আল্লাহ তাআলা আদম (আ)-কে নিষেধ করিয়াছিলিন। তখন তিনি বলিলেন, ইহা তো নশ্বরত্ব ও পতনের বৃক্ষ। অবিনশ্বরতা ও অমরতত্ত্বের বৃক্ষ নহে, বরং ইহা হইতেছে অপমানিত ও লজ্জিত হওয়ার বৃক্ষ। আল্লাহ্র নৈকট্য ও তাঁহার দরবারে সম্মান বৃদ্ধির পরিবর্তে তাঁহার হইতে দূরত্ব বৃদ্ধি ও অপদস্থ হওয়ার হেতু। আর এইজন্যই আল্লাহ তা'আলা উহার নিকটে যাইতে বারণ করিয়াছেন। এই বৃক্ষে তোমার কথিত ফায়দাসমূহ নিহিত থাকিলে পরম দয়ালু আল্লাহ তা'আলা নিশ্চয়ই আমাদেরকে বারণ করিতেন না।"
প্রতুত্তরে শয়তান বলিল, "তোমাদের প্রভু তোমাদের ক্ষতি হইবে ভাবিয়া ইহার ফল খাইতে বারণ করেন নাই, বরং তোমরা যাহাতে চির অমর অথবা ফেরেশতায় পরিণত না হও সেই জন্যই তিনি বারণ করিয়াছেন, যাহাদের না আছে পানাহারের দুশ্চিন্তা আর না আছে স্ত্রী-পুত্রের ভাবনা। তোমরাও যদি তাহা হইয়া যাও তাহা হইলে খিলাফতের গুরুদায়িত্ব কী করিয়া পালিত হইবে? পৃথিবীর খিলাফতের দায়িত্ব তো স্ত্রী-পুত্র-পরিজন, পানাহার ও আয়-উপার্জনের ব্যস্ততার মাধ্যমেই পালন করিতে হইবে। আর ইহা বলাই বাহুল্য যে, স্ত্রী-পুত্র-পরিজন লইয়া ব্যস্ত থাকিলে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী কখন হইবে? তোমাদের দ্বারা খিলাফত বা প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করানোই যেহেতু তাঁহার উদ্দেশ্য, তাই নিজের নিকট হইতে তোমাদেরকে দূরে পাঠাইয়া দিতেছেন। আর এই বৃক্ষের ফল ভক্ষণে যেহেতু আল্লাহর নৈকট্য লাভ ঘটে, তাই তোমাদেরকে ইহা হইতে বিরত রাখা হইয়াছে। অধিকন্তু বেহেশতে মৃত্যু নাই। তোমাদেরকে কেবল খিলাফতের রীতি-নীতি শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশে অস্থায়ীভাবে কিছু দিন বেহেশতে বসবাসের আদেশ দেওয়া হইয়াছে, তারপর তিনি তাঁহার নৈকট্য হইতে দূরে পৃথিবীতে প্রেরণ করিবেন। সেখানে যাইয়া তোমাদের ও তোমাদের সন্তান-সন্ততির নানারূপ ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হইতে হইবে। অবশেষে সকলেরই মৃত্যু হইবে। পৃথিবীতে যাওয়ার ও খিলাফত লাভের পর আল্লাহ তা'আলার এই নৈকট্য আর তোমাদের ভাগ্যে জুটিবে না” (মাআরিফুল কুরআন, কান্দেলভী, ১খ, পৃ. ৯৬-৯৭)।
আবু হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (স) হইতে একটি হাদীছে বর্ণনা করেন:
ان في الجنة شجرة يسير الراكب في ظلها مأة عام لا يقطعها شجرة الخلد .
"জান্নাতে এমন একটি গাছ আছে, আরোহী তাহার ছায়ায় শতাব্দীকাল ধরিয়া পথ পরিক্রমার পরও সে উহা অতিক্রম করিয়া শেষ করিতে পারিবে না। উহাই শাজারাতুল খুলদ বা কথিত অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষ” (আহমাদ, জিলদ ২, পৃ. ৪৫৫; আবু দাউদ তায়ালিসী, তদীয় মুসনাদে, পৃ. ৩৩২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ

📄 নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ


فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَواتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ وَعَصَى أَدَمُ رَبَّهُ فَغَوى .
"যখন তাহারা উভয়ে উহা হইতে ভক্ষণ করিল, তখন তাহাদের লজ্জাস্থান তাহাদের নিকট প্রকাশ হইয়া পড়িল। আদম তাহার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করিল, ফলে সে ভ্রমে পতিত হইল" (৭ঃ ২২; তু. ২০: ১২১)।
এই নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের ব্যাপারে হাওয়াই তাঁহার স্বামীর তুলনায় অগ্রণী ছিলেন এবং তিনিই তাঁহাকে তাহা ভক্ষণে উৎসাহিত করিয়াছিলেন (কাসাসুল আম্বিয়া, ইবন কাছীর, পৃ. ২৫)। আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত বুখারীর একটি হাদীছেও ইহার প্রতি ইঙ্গিত রহিয়াছে, যাহাতে নবী করীম (স) বলেনঃ
لو لا بنو اسرائيل لم يخنز اللحم ولولا حواء لم تخن انثى زوجها
"বনূ ইসরাঈলরা না হইলে গোশত দুর্গন্ধযুক্ত হওয়ার ব্যাপারটা কখনো ঘটিত না, আর হাওয়া না হইলে মহিলারা তাহাদের স্বামীর ব্যাপারে কখনও খিয়ানতও করিত না” (বুখারী, আম্বিয়া, পৃ. ৪৬৯; কাসাসুল আম্বিয়া, ইবন কাছীর, পৃ. ২৬-এ উদ্ধৃত)।
বাইবেলের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, হাওয়াকে যে প্রাণী নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণে প্রলুব্ধ করিয়াছিল সে ছিল সর্প। বিশালাকৃতি ও সুসজ্জিত রূপ লইয়া সে হাওয়ার কাছে আগমন করে। তাহার প্ররোচনায় হাওয়া নিজেও নিষিদ্ধ ফল খান এবং আদম (আ)-কেও ইহা খাওয়ান। এ সময় তাঁহাদের চক্ষু খুলিয়া যায় এবং তাঁহারা দিব্যি উপলব্ধি করিতে পারেন যে, তাঁহারা উলঙ্গ ও বিবস্ত্র হইয়া পড়িয়াছেন। কাল বিলম্ব না করিয়া ডুমুর ফলের পাতা দ্বারা লজ্জা নিবারণে প্রবৃত্ত হন। ওয়াহব ইব্‌ন মুনাব্বিহ্ও অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন।
তাহাদের পোশাক বা আবরণ ছিল একটি দীপ্তি বা আলোকরশ্মি যাহা তাহাদের উভয়ের লজ্জাস্থানকে আড়াল করিয়া রাখিয়াছিল। ইব্‌ন আবী হাতিম (র) উবায়্য ইন্ন কা'ব (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন যাহাতে নবী করীম (স) বলেন:
ان الله خلق ادم رجلا طوالا كثير شعر الراس كانه نخلة سحوق فلما ذاق الشجرة سقط عنه لباسه ناول ما بدأ منه عورته فلما نظر الى عورته جعل في الجنة فاخذى شعره شجرة فنازعها فناده الرحمن عز وجل يا آدم متى تفر فلما سمع كلام الرحمن قال يارب لا ولكن استحياء.
"আল্লাহ তা'আলা আদমকে দীর্ঘদেহী ও ঘন চুলবিশিষ্ট মানুষরূপে সৃষ্টি করেন। তাঁহার দেহ ছিল খর্জুর বৃক্ষের ন্যায় দীর্ঘ। তিনি যখন বৃক্ষের ফল আস্বাদন করিলেন তখন তাহার বস্ত্রাভরণ খসিয়া পড়িল। এই প্রথমবারের মত তাঁহার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়। তিনি যখন তাঁহার লজ্জাস্থানের দিকে তাকাইলেন তখন দ্রুতবেগে বেহেশতের মধ্যে দৌড়াইত শুরু করিলেন। একটি বৃক্ষশাখায় তাঁহার কেশদাম আটকাইয়া গেল। তিনি তাহা সজোরে টানিলেন। তখন পরম দয়াময় আল্লাহ তাঁহাকে ডাক দিয়া বলিলেন, হে আদম! তুমি আমা হইতে পলায়ন করিতেছ? দায়ময়ের সেই আহবান শুনিয়া আদম জবাব দিলেন, প্রভু! না, বরং লজ্জাবশত" (ইবন কাছীর, বিদায়া, ১খ, ৭৮)।
সুফিয়ান ছাওরী (র) ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে সূরা আ'রাফের উপরিউক্ত আয়াতের (আয়াত নং ২২) ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন: জান্নাতের বৃক্ষপত্র বলিতে এখানে ডুমুর গাছের পাতাই বুঝান হইয়াছে। আল্লামা ইব্‌ন কাছীর উহা উদ্ধৃত করিয়া মন্তব্য করিয়াছেন:
كأنه مأخوذ من اهل الكتاب وظاهر الاية يقتضى اعم من ذلك وبقعد بر تسليمه فلا يهر والله اعلم।
সম্ভবত ইহা আহলে কিতাব হইতে গৃহীত। আয়াতটি ব্যাপক অর্থবোধক অর্থাৎ জান্নাতের যে কোন বৃক্ষপত্রই ইহার অর্থ হইতে পারে। কিন্তু যদি ধরিয়াই নেওয়া হয় যে, উহা ডুমুরের পাতা ছিল তাহাতেও কোন ক্ষতি নাই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00