📄 শয়তানের অবকাশ প্রার্থনা ও দম্ভোক্তি
قَالَ انْظُرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ . قَالَ إِنَّكَ مِنَ الْمُنْظَرِينَ . قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ المُستَقِيمَ . ثُمَّ لَأْتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَن أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُم شُكِرِينَ . قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَدْمُومًا مُدْحُورًا لَمَنْ تَبِعَكَ مِنهُمُ لَأَمْلَتَنْ جَهَنَّمَ مِنْكُمْ أَجْمَعِينَ .
“সে (ইবলীস) বলিল, পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দিন। তিনি বলিলেন, যাহাদিগকে অবকাশ দেওয়া হইয়াছে তুমি অবশ্যই তাহাদের অন্তর্ভুক্ত হইলে। সে বলিল, আপনি আমাকে শাস্তি দান করিলেন, এইজন্য আমিও আপনার সরল পথে মানুষের জন্য নিশ্চয়ই ওঁৎ পাতিয়া থাকিব। অতঃপর আমি তাহাদের নিকট আসিবই তাহাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ, দক্ষিণ ও বাম দিক হইতে এবং আপনি তাহাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাইবেন না। তিনি বলিলেন, এই স্থান হইতে ধিকৃত ও বিতাড়িত অবস্থায় বাহির হইয়া যাও। মানুষের মধ্যে যাহারা তোমার অনুসরণ করিবে নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সকলের দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করিবই” (৭ : ১৪-১৮)।
কুরআন শরীফের অন্যত্র ঐ একই ঘটনার বিবরণ আসিয়াছে ভিন্নশব্দে :
قَالَ يَابْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدِي اسْتَكْبَرْتَ أَمْ كُنْتَ مِنَ الْعَالِينَ . قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ . قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ ، وَإِنَّ عَلَيْكَ لَعْنَتِي إِلَى يَوْمِ الدِّينِ . قَالَ رَبِّ فَانْظُرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ . قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنْظَرِينَ ، إِلى يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُوْمِ ، قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ، إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ . قَالَ فَالْحَقِّ وَالْحَقِّ أَقُولُ ، لَأَمْلَنَّ جَهَنَّمَ مِنْكَ وَمِمَّنْ تَبعَكَ مِنْهُمْ أَجْمَعِينَ.
“তিনি বলিলেন, হে ইবলীস! আমি যাহাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করিলাম তাহার প্রতি সিজদাবনত হইতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করিলে, না তুমি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন? সে বলিল, আমি উহা হইতে শ্রেষ্ঠ; আপনি আমাকে আগুন হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং উহাকে সৃষ্টি করিয়াছেন কর্দম হইতে। তিনি বলিলেন, তুমি এখান হইতে বাহির হইয়া যাও, নিশ্চয় তুমি বিতাড়িত এবং তোমার উপর লা'নত স্থায়ী হইবে, কর্মফল দিবস পর্যন্ত। সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে অবকাশ দিন উত্থান দিবস পর্যন্ত। তিনি বলিলেন, 'তুমি অবকাশ-প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হইলে অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত'। সে বলিল, 'আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি উহাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করিব, তবে উহাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে নহে'। তিনি বলিলেন, 'তবে ইহাই সত্য, আর আমি সত্যই বলি, তোমার দ্বারা ও তোমার অনুসারীদের দ্বারা আমি জাহান্নাম পূর্ণ করিবই'।” (৩৮ : ৭৫-৮৫)।
কুরআন শরীফের অন্যত্র শয়তানের দম্ভোক্তিটি বিবৃত হইয়াছে এইভাবে :
قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَزَيَّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ.
“সে বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আপনি যে আমাকে বিপথগামী করিলেন, তজ্জন্য আমি পৃথিবীতে মানুষের নিকট পাপকর্মটি অবশ্যই শোভন করিয়া তুলিব এবং আমি উহাদের সকলকেই বিপথগামী করিব, তবে উহাদের মধ্যে আপনার নির্বাচিত বান্দাগণ ব্যতীত” (১৫ : ৩৯-৪০)।
তাহারই বিভ্রান্তকরণের কৌশল কত ব্যাপক হইবে, তাহার বর্ণনা রহিয়াছে সূরা আ'রাফের ১৪ হইতে ১৮ নং আয়াতে।
আল্লাহ্ তা'আলা ও পূণ্যবান আদম সন্তানদের ব্যাপারে তাঁহার গভীর আস্থার কথা উল্লেখ করিয়া শয়তানের অনুসারীদের কঠোর পরিণতির কথা বর্ণনা করেন এই ভাবে:
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَنَ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَوِينَ . وَإِنْ جَهَنَّمَ لَمَوْعِدُهُمْ أَجْمَعِينَ . لَهَا سَبْعَةُ أَبْوَابِ لِكُلِّ بَابٍ مِنْهُمْ جُزْءٌ مُقْسُومٌ ، إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّتِ وَعُيُونٍ.
"বিভ্রান্তদের মধ্যে যাহারা তোমার অনুসরণ করিবে, তাহারা ব্যতীত আমার বান্দাদের উপর তোমার কোনই ক্ষমতা থাকিবে না। অবশ্যই জাহান্নাম তাহাদের সকলেরই প্রতিশ্রুত স্থান, উহার সাতটি দরজা আছে, প্রত্যেক দরজার জন্য পৃথক পৃথক শ্রেণী আছে" (১৫:৪২-৪৫)।
📄 হাওয়া (আ)-এর সৃষ্টি ও বেহেশতে বসবাসের আদেশ
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَقُلْنَا يَأْدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا
"এবং আমি বলিলাম, 'হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর এবং যেথা ইচ্ছা স্বচ্ছন্দে আহার কর' ...." (২ঃ৩৫)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লামা ইব্ন কাছীর (র) বলেন, "আয়াতের বিন্যাস হইতে বুঝা যায়, হাওয়া (আ) আদম (আ)-এর জান্নাতে প্রবেশের পূর্বেই সৃষ্টি হইয়াছেন। কিন্তু কেহ কেহ বলেন, হাওয়ার সৃষ্টি হইয়াছে আদম (আ)-এর জান্নাতে প্রবেশের পর, যেমনটি সুদ্দী হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) ও সাহাবীগণের অনেকের বরাতে বর্ণনা করেন। এই বর্ণনায় বলা হয়: ইবলীস জান্নাত হইতে বহিষ্কৃত হয় এবং আদম (আ)-কে জান্নাতে বসবাস করিতে দেওয়া হয়। তিনি তখন জান্নাতে একাকী ঘোরাফেরা করিতেন, তাঁহার সাথে বসবাসের জন্য তাঁহার স্ত্রী ছিলেন না। একবার তিনি ঘুম হইতে উঠিয়া দেখিলেন, তাঁহার শিয়রে একজন নারী উপস্থিত, যাহাকে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার বাম পাজর হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন। তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কে? হাওয়া বলিলেন, আমি নারী। আদম বলিলেন, তুমি কেন সৃষ্টি হইয়াছ? হাওয়া বলিলেন, যাহাতে আপনি আমার সহিত বসবাস করেন এবং শান্তি লাভ করেন। ফেরেশতাগণ তখন আদমের বিদ্যার দৌড় কি পর্যন্ত পৌছিয়াছে দেখার উদ্দেশ্যে আদমকে প্রশ্ন করিলেন, এর নাম কি হে আদম? জবাবে আদম বলিলেন, হাওয়া। ফেরেশতাগণ বলিলেন, তাহার হাওয়া নামকরণের কারণ কি? আদম (আ) বলিলেন, সে حى বা জীবিত বস্তু হইতে নির্গত হইয়াছে বলিয়া তাহার নামকরণ করা হইয়াছে” (মুখতসর তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ১খ, ৫৪, মুহাম্মদ আলী সাবৃনী সম্পা.)।
📄 আদম-হাওয়া কোন্ জান্নাতে ছিলেন?
এ সম্পর্কে আলিমগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। জমহুর উলামার মতে, উহা সেই জান্নাতুল মাওয়া যাহার ওয়াদা মুত্তাকী বান্দাদের জন্য করা হইয়াছে। কুরআন ও হাদীছের আলোকে তাঁহারা এই মত পোষণ করেন। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَقُلْنَا يَأْدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ
"আমি বলিলাম, হে আদম! তুমি ও তোমার সহধর্মিনী জান্নাতে বসবাস কর” (২: ৩৫)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত মুসলিম শরীফের হাদীছে আছেঃ "আল্লাহ্ তা'আলা সমস্ত লোককে একত্র করিবেন। যখন জান্নাতকে মুমিনদের জন্য সুসজ্জিত অবস্থায় প্রস্তুত করা হইবে তখন তাহারা আদম (আ)-এর নিকট গিয়া বলিবেন, পিত! আমাদের জন্য জান্নাতের দ্বার উম্মোচন করুন। তখন তিনি বলিবেন, তোমাদেরকে তোমাদের পিতার অপরাধ ভিন্ন অন্য কিছুই জান্নাত হইতে বহিষ্কৃত করে নাই।" ইব্ন কাছীর (র) 'আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া' গ্রন্থে হাদীছটি উদ্ধৃত করিয়া বলেন, ঐ জান্নাত যে জান্নাতুল মাওয়া ছিল এ ব্যাপারে এই উক্তিটিই শক্তিশালী প্রমাণ।
পক্ষান্তরে অন্য একদল আলিম তাঁহাদের একটি গাছ ছাড়া সকল গাছের ফলমূল খাওয়া, সেখানে তাঁহাদের নিদ্রা যাওয়া, সেখান হইতে তাঁহাদের বহিষ্করণ, সেখানে ইবলীসের প্রবেশ এবং ওয়াস-ওয়াসা প্রদান, আদমের অপরাধ ও তাঁহার প্রভূর আদেশ মান্যকরণ প্রভৃতি কারণে মনে করেন যে, উহা জান্নাতুল মাওয়া হইতে পারে না। নিশ্চয়ই উহা দুনিয়ায় অন্য কোন বাগান হইবে।
উবায়্য ইব্ন কাব, আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা), ওয়াহ্হ্ ইব্ন্ন মুনাব্বিহ, সুফিয়ান ইব্ন উয়ায়না, ইব্ন কুতায়বা প্রমুখ হইতে অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। কাযী মুনযির ইন্ন সাঈদ বালুতী তদীয় তফসীরে এই অভিমতই গ্রহণ করিয়াছেন এবং এ সম্পর্কে তিনি স্বতন্ত্র একখানা পুস্তকও রচনা করিয়াছেন। ইমাম আবু হানীফা (র) ও তদীয় সঙ্গীগণও এরূপ মত পোষণ করিতেন বলিয়া তিনি উল্লেখ করিয়াছেন। আবূ আবদুল্লাহ্ মুহাম্মদ ইবন উমার আর-রাযী ইন্ন খাতীব আর-রাঈ তদীয় তাফসীর গ্রন্থে আবুল কাসিম বালখী ও আবূ মুসলিম ইস্পাহানী হইতে এবং কুরতুবী তদীয় তাফসীর গ্রন্থে মুতাযিলা ও কাদরিয়াদের অনুরূপ মত রহিয়াছে বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। তাওরাতের বর্ণনাও অনুরূপ (পবিত্র বাইবেলে, পৃ. ৩)।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না যে, যাহারা বলেন, আদম ও হাওয়া (আ) দুনিয়ার কোন বাগানেই ছিলেন, তাহারা যুক্তি দেন যে, তাঁহারা যদি চিরস্থায়ী জান্নাতেই বসবাস করিতেন, তাহা হইলে-ঐ নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফলভক্ষণে চিরস্থায়ী জান্নাতের তাঁহারা অধিকারী হইবেন-ইবলীসের এইরূপ বলার কী কারণ থাকিতে পারে।
আবার যাহারা বলেন, তাঁহারা স্থায়ী জান্নাতে বা জান্নাতুল মাওয়ায় বসবাস করিতেন, তাহারা বলেন, তাঁহারা যদি ঐ এই অস্থায়ী দুনিয়ার কোন অস্থায়ী বাগানেই বসবাস করিতেন, তাহা হইলে যেখানে স্থায়িত্ব বলিয়া কিছুই নাই সেখানে শাজারাতু'ল-খুল্দ বা স্থায়ী বৃক্ষের কথা আসে কোথা হইতে? আবার কোন কোন তাফসীরকার বলেন, উহা চিরস্থায়ী জান্নাত—জান্নাতুল মাওয়াও নহে, পৃথিবীর কোন বাগানও নহে, আল্লাহ্ তা'আলা ঊর্ধ্ব জগতে তাঁহাদের জন্য এক বিশেষ জান্নাত সৃষ্টি করিয়াছিলেন (আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮-১০)।
📄 নিষিদ্ধ ফল কোন্টি ছিল?
জান্নাতে বসবাসের আদেশ দানের সাথে সাথে আদম ও হাওয়া (আ)-এর প্রতি কঠোরভাবে একটি নিষেধাজ্ঞাও আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হইতে জারী করা হইয়াছিল। তাহা ছিল এইরূপ:
وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّلِمِينَ.
"কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হইও না; হইলে তোমরা অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হইবে” (২: ৩৫ ও ৭: ১৯)।
এই নিষিদ্ধ বৃক্ষ ও ইহার ফলটি কী ছিল তাহা নিয়াও তাফসীরবিদগণের মধ্যে মতানৈক্য রহিয়াছে। কেহ বলিয়াছেন, উহা ছিল আঙ্গুর। ইবন আব্বাস, সাঈদ ইব্ন জুবায়র, শা'বী, জা'দা ইব্ন হুবায়রা, মুহাম্মদ ইব্ন কায়স, সুদ্দী প্রমুখ হইতে এরূপ বর্ণিত হইয়াছে。
ইব্ন আব্বাস, হাসান বাসরী, ওয়াহ্ ইব্ন্ন মুনাব্বিহ প্রমুখ হইতে বর্ণিত আছে, ইয়াহুদীদের ধারণা, উহা ছিল গম। ওয়াত্ব বলেন, এমন একটি শস্যফল যাহা সমুদ্রের ফেনার চাইতেও কোমল এবং মধুর চাইতেও সুমিষ্ট। সুফিয়ান ছাওরী হযরত হুসায়ন (حصين) হইতে বর্ণনা করেন, উহা হইতেছে খেজুর। ইব্ন জুরায়জ (র) হযরত মুজাহিদের সূত্রে বর্ণনা করেন, উহা হইতেছে ডুমুর ফল। কাতাদা ও ইব্ন জুরায়জের উহাই অভিমত। আবুল আলিয়া বলেন, উহা এমন একটি বৃক্ষ ছিল যাহা ভক্ষণে বায়ু নিঃসরণ হইত আর জান্নাতে বায়ু নিঃসরণ ছিল অশোভনীয় (কাসাসুল আম্বিয়া, ইব্ন কাছীর, পৃ. ২০-২১)।
আল্লামা ইবন জারীর এই প্রসঙ্গে তাঁহার আলোচনায় একটি সিদ্ধান্তমূলক মন্তব্য করিয়াছেন। তিনি বলেন, "সঠিক কথা এই যে, আল্লাহ তাআলা আদম (আ) ও হাওয়াকে একটি সুনির্দিষ্ট বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করিতে বারণ করেন। ঐ জাতীয় সমস্ত বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করিতে তিনি বারণ করেন নাই। তাঁহারা উহা ভক্ষণ করেন। সুনির্দিষ্টভাবে ঐ বৃক্ষটি কী ছিল তাহা আমাদের জানা নাই। কেননা আল্লাহ তাআলা তদীয় বান্দাগণের জন্য আল-কুরআন বা মহানবী (স) সহীহ হাদীছে উহার কোন দলীল-প্রমাণ বর্ণনা করেন নাই। কেহ কেহ বলিয়াছেন, উহা গম গাছ ছিল, কেহ বলিয়াছেন, উহা ছিল আঙুর গাছ, কেহ বলিয়াছেন ডুমুর গাছ। ইহার যে কোনটিই হইতে পারে। উহা এমন একটি বিষয় যাহার জ্ঞান দ্বারা জ্ঞানী ব্যক্তির কোন উপকার হওয়ার সম্ভাবনা বা ইহা জ্ঞাত না থাকার কারণে ইহার জ্ঞানহীন ব্যক্তির কোনরূপ ক্ষতির আশঙ্কা নাই” (মুখতাসার ইন্ন কাছীর, সূরা বাকারার ৩৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়, পৃ. ৫৫)।
ঐ নিষিদ্ধ বৃক্ষের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সায়্যিদ কুতব (র) বলেন, "সম্ভবত ঐ গাছটিকে পার্থিব জীবনের যাবতীয় নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।"
এই নিষিদ্ধ করণের যুক্তিও সায়েদ কুতুব ব্যাখ্যা করেন এইভাবে, "কিছু নিষিদ্ধ জিনিস না থাকলে স্বাধীন ইচ্ছা শক্তির অস্তিত্ব বুঝা যায় না এবং স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন মানুষকে ইচ্ছাশক্তিহীন পশুপাখি থেকে পৃথক করা যায় না। মানুষ কতটা ধৈর্য সহকারে আল্লাহ্র সাথে কৃত অঙ্গীকার ও বিধিনিষেধ মেনে চলতে পারে তার পরীক্ষা নিষিদ্ধ জিনিস ছাড়া হতে পারে না। সুতরাং স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও নির্বাচন ক্ষমতাই হলো মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য করার মাপকাঠি। যাদের ভাল-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায় বাছবিছার করার ক্ষমতা নাই এবং নির্বিচার জীবন যাপন করে তারা দেখতে মানুষ হলেও আসলে পশু” (ফী যিলালিল কুরআন, বঙ্গানুবাদ, ১খ, পৃ. ১০৯)।
শয়তানের শত্রুতার ব্যাপারে সতর্কবাণী: يَا أَدَمُ إِنَّ هَذَا عَدُوٌّ لَكَ وَلِزَوْجِكَ فَلَا يُخْرِجَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَى .
"হে আদম! নিশ্চয়ই এ তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু, সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদিগকে জান্নাত হইতে বাহির করিয়া না দেয়। দিলে তোমরা দুঃখ-কষ্ট পাইবে" (২০: ১১৭)।
সাথে সাথে জান্নাতে তাঁহাদের জন্য রক্ষিত সুখ-শান্তির কথাটাও বলিয়া দেওয়া হয়,
إِنَّ لَكَ أَلَّا تَجُوْعَ فِيهَا وَلَا تَعْرَى . وَأَنَّكَ لَا تَظْمَوْا فِيهَا وَلَا تَضْحى.
"তোমার জন্য ইহাই রহিল যে, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্তও হইবে না, নগ্নও হইবে না এবং সেখানে পিপাসার্তও হইবে না, রৌদ্রক্লিষ্টও হইবে না" (২০: ১১৮-১১৯)।
فَوَسْوَسَ إِلَيْهِ الشَّيْطَنُ قَالَ يُأْدَمُ هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكِ لَا يَبْلَى
"অতঃপর শয়তান তাহাকে কুমন্ত্রণা দিল। সে বলিল, হে আদম! আমি কি তোমাকে বলিয়া দিব জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা" (২০: ১২০)?
অন্যত্র তাহার এই কুমন্ত্রণার কথা বিবৃত হইয়াছে এইভাবে:
مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ . وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ . فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ .
"পাছে তোমরা উভয়ে ফেরেশতা হইয়া যাও কিংবা তোমরা স্থায়ী হও এইজন্যেই তোমাদের প্রতিপালক এই বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদিগকে নিষেধ করিয়াছেন। সে তাহাদের উভয়ের নিকট শপথ করিয়া বলিল, আমি তো তোমাদের হিতাকাঙ্খীদের একজন। এইভাবে সে তাহাদেরকে প্রবঞ্চনার দ্বারা অধঃপতিত করিল" (৭ঃ ২০-২২)।
এই প্রসঙ্গে আদম (আ) ও ইবলীসের মধ্যকার ঐ সময়ের কথোপকথন চমৎকারভাবে বিধৃত হইয়াছে আল্লামা ইদরীস কান্দেহলভীর বর্ণনায়। তিনি লিখেন, "হযরত আদম (আ) জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কোন বৃক্ষের কথা বলিতেছ হে? জবাবে শয়তান তাঁহাকে সেই বৃক্ষের কথাটি বলিল যাহার নিকট যাইতে আল্লাহ তাআলা আদম (আ)-কে নিষেধ করিয়াছিলিন। তখন তিনি বলিলেন, ইহা তো নশ্বরত্ব ও পতনের বৃক্ষ। অবিনশ্বরতা ও অমরতত্ত্বের বৃক্ষ নহে, বরং ইহা হইতেছে অপমানিত ও লজ্জিত হওয়ার বৃক্ষ। আল্লাহ্র নৈকট্য ও তাঁহার দরবারে সম্মান বৃদ্ধির পরিবর্তে তাঁহার হইতে দূরত্ব বৃদ্ধি ও অপদস্থ হওয়ার হেতু। আর এইজন্যই আল্লাহ তা'আলা উহার নিকটে যাইতে বারণ করিয়াছেন। এই বৃক্ষে তোমার কথিত ফায়দাসমূহ নিহিত থাকিলে পরম দয়ালু আল্লাহ তা'আলা নিশ্চয়ই আমাদেরকে বারণ করিতেন না।"
প্রতুত্তরে শয়তান বলিল, "তোমাদের প্রভু তোমাদের ক্ষতি হইবে ভাবিয়া ইহার ফল খাইতে বারণ করেন নাই, বরং তোমরা যাহাতে চির অমর অথবা ফেরেশতায় পরিণত না হও সেই জন্যই তিনি বারণ করিয়াছেন, যাহাদের না আছে পানাহারের দুশ্চিন্তা আর না আছে স্ত্রী-পুত্রের ভাবনা। তোমরাও যদি তাহা হইয়া যাও তাহা হইলে খিলাফতের গুরুদায়িত্ব কী করিয়া পালিত হইবে? পৃথিবীর খিলাফতের দায়িত্ব তো স্ত্রী-পুত্র-পরিজন, পানাহার ও আয়-উপার্জনের ব্যস্ততার মাধ্যমেই পালন করিতে হইবে। আর ইহা বলাই বাহুল্য যে, স্ত্রী-পুত্র-পরিজন লইয়া ব্যস্ত থাকিলে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী কখন হইবে? তোমাদের দ্বারা খিলাফত বা প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করানোই যেহেতু তাঁহার উদ্দেশ্য, তাই নিজের নিকট হইতে তোমাদেরকে দূরে পাঠাইয়া দিতেছেন। আর এই বৃক্ষের ফল ভক্ষণে যেহেতু আল্লাহর নৈকট্য লাভ ঘটে, তাই তোমাদেরকে ইহা হইতে বিরত রাখা হইয়াছে। অধিকন্তু বেহেশতে মৃত্যু নাই। তোমাদেরকে কেবল খিলাফতের রীতি-নীতি শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশে অস্থায়ীভাবে কিছু দিন বেহেশতে বসবাসের আদেশ দেওয়া হইয়াছে, তারপর তিনি তাঁহার নৈকট্য হইতে দূরে পৃথিবীতে প্রেরণ করিবেন। সেখানে যাইয়া তোমাদের ও তোমাদের সন্তান-সন্ততির নানারূপ ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হইতে হইবে। অবশেষে সকলেরই মৃত্যু হইবে। পৃথিবীতে যাওয়ার ও খিলাফত লাভের পর আল্লাহ তা'আলার এই নৈকট্য আর তোমাদের ভাগ্যে জুটিবে না” (মাআরিফুল কুরআন, কান্দেলভী, ১খ, পৃ. ৯৬-৯৭)।
আবু হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (স) হইতে একটি হাদীছে বর্ণনা করেন:
ان في الجنة شجرة يسير الراكب في ظلها مأة عام لا يقطعها شجرة الخلد .
"জান্নাতে এমন একটি গাছ আছে, আরোহী তাহার ছায়ায় শতাব্দীকাল ধরিয়া পথ পরিক্রমার পরও সে উহা অতিক্রম করিয়া শেষ করিতে পারিবে না। উহাই শাজারাতুল খুলদ বা কথিত অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষ” (আহমাদ, জিলদ ২, পৃ. ৪৫৫; আবু দাউদ তায়ালিসী, তদীয় মুসনাদে, পৃ. ৩৩২)।