📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফেরেশতাগণের মন্তব্য

📄 ফেরেশতাগণের মন্তব্য


তাহারা বলিল, "আপনি কি সেখানে এমন কাহাকেও সৃষ্টি করিবেন যে অশান্তি ঘটাইবে ও রক্তপাত করিবে? আমরাই তো আপনার সপ্রশংস ও স্ততিগান ও পবিত্রতা ঘোষণা করি।" তখন আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: 'আমি জানি যাহা তোমরা জান না'।
ফেরেশতাকুলের এই উক্তি আপক্তি, অহঙ্কার কিংবা তাঁহাদের আদম-সন্তানদের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত ছিল না। যেমন ইব্‌ন কাছীর বলিয়াছেন:
ইহা আল্লাহ্ তা'আলার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তিসূচক বা মানব সন্তানদের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত ছিল না যেমনটি কোন তাফসীরকার ধারণা করিয়াছেন (মুখতাসার তাফসীরে ইব্‌ন কাছীর, ১খ, পৃ. ৪৯)।
ইহার যুক্তিও তিনি ব্যাখা করিয়াছেন এইভাবে: বস্তুত তাহারা ইহার রহস্য জানিবার জন্যই এই প্রশ্ন করে (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর-উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায়)।
আল্লাহ তা'আলা তখন 'আমি জানি তোমরা যাহা জান না' বলিয়া ফেরেশতাদের প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন। ইব্‌ন কাছীর তাঁহার এই কথার ব্যাখ্যাস্বরূপ লিখেন: অর্থাৎ তোমরা জান না, অচিরেই তাহাদের মধ্যে নবী-রাসূল, সিদ্দীক, শহীদ ও পুণ্যবানদের উদ্ভব হইবে কাসাসুল আম্বিয়া (আরবী), পৃ.১ ১-৪]।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মাটি সংগ্রহের জন্য পৃথিবীতে ফেরেশতা প্রেরণ

📄 মাটি সংগ্রহের জন্য পৃথিবীতে ফেরেশতা প্রেরণ


তারপর আল্লাহ তা'আলা তাঁহার পরিকল্পনা অনুসারে মানব সৃষ্টির জন্য পৃথিবী মাটি লইয়া যাওয়ার জন্য ফেরেশতাকুল শিরোমণি জিবরাঈল ও মীকাঈলকে পৃথিবীতে পাঠাইলেন। মাটি তখন আল্লাহর দোহাই দিয়ো তাহার অঙ্গহানি না করিতে অনুরোধ করিল। তাঁহারা দুই জনই পরপর খালি হাতে পৃথিবী হইতে ফিরিয়া যান এবং আল্লাহ্ দোহাই দিয়া পৃথিবীর অনুরোধে তাঁহাদের এ ব্যাপারে অসামর্থ্যের কথা আল্লাহ তা'আলার কাছে আরয করেন। অতঃপর আল্লাহ্ হুকুমে মালাকুল মওত আযরাঈল পৃথিবীতে নামিয়া আসেন এবং পৃথিবীর আল্লাহ্ দোহাই দিয়া তাহার অনুরোধ উপেক্ষা করিয়া পৃথিবীর নানাবর্ণের নানা ধরনের মাটি লইয়া যান। পৃথিবীর 'আল্লাহ্র দোহাই'-এর জবাবে তিনি বলেন, আল্লাহর দোহাই শুনিয়া আমি কি তাঁহার হুকুম পালন না করিয়াই ফিরিয়া যাইব? তাহা কোন ক্রমেই হইতে পারে না। উক্ত মাটি ভিজান হইলে তাহা এঁটেল মাটিতে طين لازب পরিণত হয়। অতঃপর তাহা বিকৃত হইয়া দুর্গন্ধযুক্ত হওয়া পর্যন্ত পতিত অবস্থায়ই থাকে।
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَا مُسْنُونَ .
"আমি মানুষকে ছাঁচে ঢালা কর্দমের ঠনঠনে শুষ্ক মাটি হইতে সৃষ্টি করিয়াছি” (১৫ : ২৬)।
উক্ত আয়াতে ঐ দিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে। তারপর আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদের প্রতি নির্দেশ দিলেন, আমি মৃত্তিকা দ্বারা একটি মানুষ সৃষ্টি করিব। তাহাকে আমি যখন পূর্ণাঙ্গ রূপ দান করিব এবং তাহার মধ্যে রূহ সঞ্চার করিব তখন তোমরা তাহার সম্মানার্থে সিজদাবনত হইবে। তারপর আল্লাহ তা'আলা তাঁহার বরকতপূর্ণ কুদরতী হাতে আদমের অবয়ব সৃষ্টি করিলেন, যাহাতে ইবলীস তাহার ব্যাপারে অহঙ্কার করিতে না পারে। দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত আদমের ঐ অবয়ব পড়িয়া রহিল। ফেরেশতাগণ তাহার পার্শ্ব দিয়া অতিক্রমকালে তাহাকে অত্যন্ত সমীহ করিতেন, কিন্তু ইবলীসের গায়ে জ্বালা ধরিয়া যাইত। ইবলীস আদমের দেহকে লক্ষ্য করিয়া বলিত, কী কাজের জন্য তোমাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে? সে ঐ দেহের মুখ দিয়া প্রবেশ করিয়া উহার পশ্চাৎদেশ দিয়া বাহির হইত এবং ফেরেশতাগণকে অভয় দিয়া বলিত, "ইহাকে দেখিয়া ঘাবড়াইয়া যাইও না। ইহা একটি ফাঁপা জিনিস, আমি তাহাকে বাগে পাওয়া মাত্রই উহার সর্বনাশ করিয়া ছাড়িব।"
অতঃপর যখন আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা অনুযায়ী আদমের দেহে রূহ্ সঞ্চারের সময় উপস্থিত হইল তখন তিনি ফেরেশতাগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: আমি উহাতে রূহ্ সঞ্চার করিলে তোমরা তাহাকে সিজদা করিবে।
যথা সময়ে যখন তাহাতে রূহ্ সঞ্চার করা হইল এবং রূহ্ তাহার মস্তকে পৌঁছিল তখন আদম (আ) হাঁচি দিয়া উঠিলেন। ফেরেশতাগণ তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিনে: বলুন, আল-হামদুলিল্লাহ! তিনি আল-হাম্দুলিল্লাহ বলিলেন, তখন আল্লাহ তাহার উদ্দেশ্যে বলিলেন: رحمك ربك অর্থাৎ তোমার প্রতি আল্লাহ রহম করুন। রূহ যখন তাঁহার চক্ষে প্রবেশ করিল তখন তিনি জান্নাতের ফলফলাদি দেখিতে পাইলেন। রূহ তাহার বুকে ও পেটে প্রবেশ করিলে তাহার ক্ষুধা ও আহার প্রবৃত্তি জাগ্রত হইল। রূহ তাঁহার পদদ্বয়ে পৌঁছিতে না পৌঁছিতেই আদমের দেহ জান্নাতের ফল আহরণের উদ্দেশ্যে উঠিয়া দাঁড়াইতে চেষ্টা করিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদম (আ)-এর সালাম

📄 আদম (আ)-এর সালাম


হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত এক হাদীছে হযরত আদম (আ) কে সৃষ্টির অব্যবহিত পরের একটি বর্ণনা রহিয়াছে এইভাবে। নবী করীম (স) বলেনঃ
"আল্লাহ তা'আলা আদমকে সৃষ্টি করিলেন। তাঁহার দৈর্ঘ্য ছিল ষাট হাত। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: যাও, ঐ যে ফেরেশতাগণ বসিয়া রহিয়াছে উহাদেরকে সালাম দাও। তাহারা কী জবাব দেয় তাহা শুনিবে। কেননা, উহাই হইবে তোমার ও তোমার সন্তানদের অভিবাদন। তিনি গিয়া বলিলেন, আস্সালামু আলায়কুম। জবাবে তাহারা বলিলেন, আস্সালামু আলায়কা ওয়া রাহমাতুল্লাহ। তাঁহারা রহমতুল্লাহ শব্দটি যোগ করিলেন। তারপর যাহারাই জান্নাতে প্রবেশ করিবে, তাহারা তাঁহারই আকৃতির হইবে। অতঃপর মানুষের আকৃতি খর্ব হইতে হইতে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হইয়াছে” (আল-আদাবুল মুফরাদ, ৪৪৭ নং অধ্যায়, হাদীছ নং ৯৭৮, পৃ. ২৫৪; ১৯৭৬ সালে তাশখন্দে মুদ্রিত, ইফা মুদ্রিত মৎকৃত অনুবাদ, ২খ, পৃ. ৪৯১-৪৮২; বুখারী ২খ, পৃ. ১১৯-২০; কিতাবুল ইসতিযান, বাব-বাদউস সালাম; মুসলিম, কিতাবুল জান্নাত ও সিফাতু নাঈমিহা ওয়া আহলিহা)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদম (আ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব

📄 আদম (আ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব


আল্লাহ তা'আলা নূরের তৈরী ফেরেশতা ও আগুনের তৈরী জিন্ন জাতির উপর কেন আদমকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিলেন, কিভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিলেন, কেনই-বা মানবজাতির মধ্যে অশান্তি সৃষ্টিকারী রক্তপাতকারী থাকা সত্ত্বেও এই কাঁদামাটির সৃষ্টি মানুষকেই খলীফা (প্রতিনিধি) বানাইয়া দুনিয়ায় পাঠাইবার জন্য বাছিয়া লইলেন, তাহার কারণও বর্ণিত হইয়াছে আল-কুরআনে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَعَلَّمَ أَدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلْئِكَةِ فَقَالَ أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هُؤُلَاءِ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِينَ.
"আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তৎপর সে সমুদয় ফেরেশতাদের সম্মুখে প্রকাশ করিলেন এবং বলিলেন, এই সমুদয়ের না আমাকে বলিয়া দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও” (২ঃ ৩১)।
ফেরেশতাগণের জ্ঞানভাণ্ডারে সে জ্ঞান ছিল না। তাই তাহাদের পক্ষে তাহা বলা সম্ভবত হয় নাই। তাহারা লা জবাব হইয়া গেলেন। তাঁহাদের তখনকার অবস্থা এইভাবে বিবৃত হইয়াছে:
قَالُوا سُبْحْنَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ.
"তাহারা বলিল, আপনি মহান, পবিত্র! আপনি আমাদেরকে যাহা শিক্ষা দিয়াছেন তাহা ছাড়া আমাদের তো কোন জ্ঞানই নাই। আপনিই জ্ঞানময় ও প্রজ্ঞাময়" (২ঃ ৩১)।
সুতরাং ফেরেশতাকুলের উপর আদম (আ)-এর সুস্পষ্ট প্রাধান্য সূচিত হইল। শুধু বস্তুসমূহের নামই আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-কে শিক্ষা দিয়াছিলেন এমন নহে। আল্লামা রাগিব আল-ইসফাহানীর ভাষায়: "নামকের পরিচয় চিত্র অন্তরে ও মস্তিষ্কে ধারণ ব্যতীত নামের পরিচয় অর্জন সম্ভব নহে” (আল-মুফদারাত ফী গারীবিল কুরআন, পৃঃ ২৪৪)।
মওলানা আশরফ আলী থানবী (র) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “পৃথিবীর যাবতীয় বস্তুর বাহ্যিক পরিচয় ও লক্ষণাদি এবং এইগুলির বৈশিষ্ট্যাবলী তাঁহাকে ব্যাপকভাবে শিক্ষা দিয়াছেন” (দ্র. তাফসীরে বয়ানুল কুরআন, সূরা বাকারার ৩১তম আয়াত)। অন্যান্য বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থেও অনুরূপ ব্যাখ্যা রহিয়াছে। আল্লামা কুরতুবী বলেন, "আরবী ভাষায় যাত, নাফস, 'আইন ও ইসম শব্দগুলি সমার্থক"। তাফসীরে কাশ্শাফে আছে, "আল্লাহ তা'আলা আদমকে ঐ সমস্ত নামের 'নামকসমূহের' জ্ঞান দান করিলেন।” বায়যাবী বলেন, "তিনি তাঁহাকে বস্তুসমূহের নাম, সত্তা, গুণাবলী, ধর্ম, সেই সাথে যাবতীয় জ্ঞানের সূত্র ও নীতিমালা এবং প্রযুক্তির নিয়মকানুন ও এই গুলির উপকরণাদির ব্যবহার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়াছেন।" ইমাম রাযী (র) তাফসীরে কাবীরে লিখেন, "আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে প্রতিটি বস্তুর বিবরণ, সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যর জ্ঞান দান করিলেন"।
আল্লামা মাযহারী তা'বীল হিসাবে তাঁহার নিজস্ব একটি মত প্রকাশ করিয়াছেন। উক্ত আয়াতে উল্লিখিত اسماء (নামসমূহ) শব্দের দ্বারা আল্লাহ্র সত্তা ও গুণবাচক নামসমূহ বুঝান হইয়াছে। এইগুলির সংক্ষিপ্ত ও সামগ্রিক ইল্ল্ম তিনি পাইয়া গিয়াছিলেন এবং প্রতিটি গুণের সহিত এমন পরিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হইয়া গিয়াছিল যে, যখন যে গুণের প্রতি তিনি নিবিষ্ট হইতেন, মুহূর্তেই তাহা তাঁহার সত্তায় পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত হইত। উদাহরণস্বরূপ যখন তাহার উপর الاول (আল-আওয়ালু) গুণবাচক পবিত্র নামটির বিভাসন ঘটিল তখন প্রতিটি বস্তু তাঁহার মানসপটে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল।
অনুরূপভাবে الاخر (আল-আখিরু) নামটির বিভাসনের প্রসঙ্গও অনুরূপ (দ্র. তাফসীরে মাজেদী, সূরা বাকারার ৩১ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00