📄 আদম (আ)-এর নাম সম্পর্কে
আদম শব্দটির আরবী বা অনারবী হওয়া সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ অভিমত হইল উহা হিব্রুভাষায় اما۱। শব্দ হইত গৃহীত- যাহার অর্থ পৃথিবী। কেননা, পৃথিবীর মাটি হইতে তিনি সৃষ্ট (দায়েরাতুল মা'আরিফ, আরবী, ১খ, পৃ. ৪৫)। আবূ মনসূর জাওয়ালি বলেন, আদম, সালিহ, শু'আয়ব ও মুহাম্মাদ (সা) ব্যতীত সকল নবীর নামই অনারবী।
জাওহারী বলেন, আদম শব্দটি আরবী (দায়েরাতুল মা'আরিফিল ইসলামিয়া = আরবী ইসলামী বিশ্বকোষ, দ্র. আদম প্রসঙ্গ)।
ইমাম আবূ জা'ফর তাবারী (র) বলেন, হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ মহান আল্লাহ্ ফেরেশতা আযরাঈল (আ)-এক পৃথিবীতে পাঠাইলেন। তিনি পৃথিবীর উপরিভাগের যে মাটি লইয়া যান উহা দ্বারাই আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয়। পৃথিবীর উপর আস্তরণ বা ভূ-ত্বককে যেহেতু আরবীতে اديم (আদীম) বলা হইয়া থাকে, সে জন্য তাঁহার নামকরণ করা হয় আদম।
সাঈদ ইব্ন জুবায়র (রা)-ও বলেন, আদম (আ)-কে যেহেতু আদীমুল আরদ (ভূত্বক) হইতে সৃষ্টি করা হয় এই জন্যই তাঁহার নাম আদম রাখা হয়।
হযরত আলী (রা) বলেন, আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয় আদীম বা ভূ-ত্বক হইতে। তাহাতে উত্তম-অধম, কল্যাণকর ও অকল্যাণকর সবকিছুই ছিল। এই জন্যই তুমি আদম সন্তানদের মধ্যে বিভিন্নতা দেখিতে পাও। তাহাদের মধ্যকার কেহ বা পুণ্যবান ও কল্যাণকর, আবার কেহ পাপাচারী ও অকল্যাণকর (তাফসীরে তাবারী, আরবী), (সূরা বাকারার ৩১নং আয়াতের তাফসীর)। রাগিব ইসফাহানী বলেন,
"আদম-মানবজাতির আদি পিতা, তাঁহার এইরূপ নামকরণের কারণ হইল তাঁহার দেহ 'আদীমুল আরদ' বা ভূ-ত্বক হইতে সৃষ্ট। আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন: তাঁহার দেহের ادومة বা গো-ধুম বর্ণের জন্য তাঁহার এইরূপ নামকরণ করা হইয়াছে (আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন, পৃ. ১৪, দ্র. আদম, দারু'ল-মা'রিফা, কায়রো)।
কেহ কেহ আবার আদম শব্দটি ১। (আদ্ম) অথবা ۱٥۱۰ শব্দটি হইতে গৃহীত বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। উহার অর্থ সমন্বিত ও সংমিশ্রিত। এই অর্থ দ্বারা আদম (আ)-এর মধ্যে বিভিন্ন শক্তি ও উপাদানের সমন্বয় ও সংমিশ্রণ ঘটিয়াছে বুঝায়। কেননা মাটি ও পানির মিশ্রণে তাঁহার খামীর প্রস্তুত করা হইয়াছিল।
কেহ কেহ আবার دمة শব্দটি ادما শব্দ হইতে উদ্ভূত বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। ইহার অর্থ অনুসরণযোগ্য। কিন্তু যামাখশারী دمة শব্দটি আরবী বলিলেও নিম্নোক্ত কারণে শব্দটি অনারব বলিয়া প্রতীয়মান হয়। শব্দটির বহুবচন وادم। এবং ইহার اویدم বা ক্ষুদ্রত্ববোধকরূপ همزة দ্বারা ইহাই প্রতিপন্ন হয় যে, শব্দটি অন-আরবী, অন্যথায় উভয়রূপেই আদ্যাক্ষর অপরিবর্তিত থাকিত।
হিব্রু ভাষায় ۱ শব্দের অর্থ মানবজাতি। ফিনিশীয় এবং সাবাঈ ভাষায়ও শব্দটির একই রূপ। ইংরেজী সাহিত্য ও অন্যান্য ভাষায় ادم ও حواء শব্দ ইন্ন্জীল এবং তাওরাতের মাধ্যমে প্রচলিত হইয়াছে। বাইবেলের আদিপুস্তকে উল্লিখিত আছে যে, আদম তাঁহার স্ত্রীর নাম حواء এই জন্য রাখিয়াছিলেন যে, তিনি জীবকূলের মাতা (আরও দ্র. হিব্রু, বিশ্বকোষ, হাওওয়া নিবন্ধ)। آدم এবং حواء -এর অর্থ যে কোন বিষয়ের জন্মদাতা, গোত্র বা জাতির বড় নেতা এবং আদি পুরুষ। যেমন দক্ষিণাত্যের ওয়ালী উর্দু কবিদের বাবা আদম ছিলেন।' আরও তু. ১৮৮৪, পৃ. ৩৯৬। (দ্র. ইসলামী বিশ্বকোষ, ইফা প্রকাশিত, ১খ, নিবন্ধ আদম, পৃ. ২৪)।
📄 আদম সৃষ্টির উদ্দেশ্য
কুরআন শরীফের সূরা বাকারায় সর্বপ্রথম যেখানে আদম (আ) সৃষ্টি প্রসঙ্গটি উল্লিখিত হইয়াছে সেখানেই তাঁহার সৃষ্টির উদ্দেশ্য আল্লাহ্ তা'আলা সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করিয়াছেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَاذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلئِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً .
"(স্মরণ কর সে সময়ের কথা), যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বলিলেন, আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করিতেছি” (২: ৩০)।
ইমাম তাবারী বলেন, এই আয়াতের অর্থ হইল, আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি প্রেরণ করিব। এই ব্যাখ্যা হাসান ও কাতাদার অভিমতের সহিত অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, পৃথিবীর প্রথম বাসিন্দা ছিল জিন্ন জাতি। তাহারা এখানে ফিৎনা-ফাসাদ, হানাহানি ও খুন-খারাবীতে লিপ্ত হইল। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদের শাস্তি বিধানের জন্য ফেরেশতাদের একটি বাহিনীসহ ইবলীসকে পাঠাইলেন। ইবলীস ও তাহার সাথী ফেরেশতাগণ তাহাদেরকে হত্যা করিল এবং বিভিন্ন সাগরের দ্বীপে ও পাহাড়-পর্বতে তাড়াইয়া দিল। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা আদমকে সৃষ্টি করিয়া তাঁহাকে ও মানবজাতিকে তাহাদের স্থলাভিষিক্ত করিলেন। সেই হিসাবে উক্ত আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়: আমি পৃথিবীতে জিন্ন জাতির স্থলাভিষিক্ত সৃষ্টি করিব- যাহারা তাহাদের স্থলাভিষিক্ত হইয়া পৃথিবীতে বসবাস করিবে এবং তাহা আবাদ করিবে।
ইব্ন যায়দ-এর সূত্রে ইউনুস (র) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্ পাক ফেরেশতাগণকে বলিলেন: আমি মনস্থ করিয়াছি পৃথিবীতে এমন একটি নূতন জাতি সৃষ্টি করিব যাহারা পৃথিবীতে আমার খলীফা (প্রতিনিধি) হইবে। ঐ সময় ফেরেশতাগণ ছাড়া আল্লাহ্র আর কোন মাখলুক ছিল না বা পৃথিবীতে অন্য কোন সৃষ্ট জীবও ছিল না। আল্লাহ্ পাক ফেরেশতাগণকে খবর দিয়াছিলেন যে, তিনি পৃথিবীতে তাঁহার খলীফা সৃষ্টি করিবেন। তাহারা সেখানে তদীয় সৃষ্টিকূলের মধ্যে আল্লাহ্ পাকের বিধান কার্যকরী করিবে।
ইবন মাসঊদ (রা) প্রমুখ সাহাবী হইতে বর্ণিত আছে যে, ঐ খলীফার প্রকৃতি কী হইবে ফেরেশতাগণের এইরূপ প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ্ তা'আলা বলিলেন: তাহার কতক সন্তান এমনও হইবে যাহারা পৃথিবীতে ফিতনা-ফাসাদ, হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানি, খুনাখুনিতে লিপ্ত হইবে।
ইবন মাসউদ (রা) হইতে উদ্ধৃত উক্ত রিওয়ায়াত অনুসারে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা হইবে, আমি পৃথিবীতে আমার মাখলুকসমূহের মধ্যে আইন পরিচালনার্থ আমার খলীফা নিয়োগ করিব। সেই খলীফা হইবে আদম এবং তাহার সেই সব সন্তানরা যাহারা আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করিবে এবং সৃষ্টিকূলের মধ্যে ইনসাফ কায়েম করিবে। তবে ফাসাদ সৃষ্টি ও অন্যায় কার্যাদি সংঘটিত হইবে খলীফা ভিন্ন অন্য আদম সন্তানদের দ্বারা। আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাগণের প্রশ্নের উত্তরে বলিয়াছেন: খলীফার বংশধরদের মধ্যকার একটি অংশ ফিৎনা-ফাসাদ, বিদ্বেষ, হানাহানি ও খুনাখুনিতে লিপ্ত হইবে। এখানে লক্ষ্যণীয়, এই জবাবে ফিৎনা-ফাসাদ, হানাহানি ও খুনাখুনির সহিত খলীফার বংশধরদের একাংশকেই কেবল সম্পৃক্ত করা হইয়াছে, স্বয়ং খলীফাকে বা তদীয় সৎকর্মশীল বংশধরগণকে এই অপবাদ হইতে আল্লাহ্ তা'আলা মুক্ত রাখিয়াছেন (তাফসীর তাবারী, ১খ, সূরা বাকারার ৩০তম আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে)। তাফসীরে মা'আলিমু'ত-তানযীলের ভাষায় খলীফা প্রেরণের উদ্দেশ্য:
সেই নতুন সৃষ্টি হইবে পৃথিবীতে তাঁহার প্রতিনিধিস্বরূপ, যাহাতে সে তাঁহার বিধান কার্যকরী করে এবং তাঁহার ফয়সালাসমূহকে বাস্তবায়িত করিতে পারে।
এতদসংক্রান্ত মওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদীর ব্যাখ্যামূলক পাদটীকা প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেন,
"মনে রাখতে হবে যে, দুনিয়ায় কোন ধর্মই মাটির মানুষকে আল্লাহ্ খিলাফত ও প্রতিনিধিত্বের মত এমন সুমহান মর্যাদায় অভিষিক্ত করেনি। জাহেলী ধর্ম ও মতবাদের কথাতো বলাই বাহুল্য, খোদ ইহুদী ধর্ম এবং তার বিকৃত সংস্করণ তথা খৃষ্ট ধর্মও এক্ষেত্রে ইসলাম থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। এ প্রসঙ্গে বাইবেলে শুধু বলা হয়েছে- 'সদাপ্রভু ঈশ্বর পৃথিবীতে বৃষ্টি বর্ষান নাই, আর পৃথিবীতে কৃষিকর্ম করিতে মনুষ্য ছিল না। আর পৃথিবী হইতে কুজ্জটিকা উঠিয়া সমস্ত ভূতলকে জলসিক্ত করিল। আর সদাপ্রভু ঈশ্বর মৃত্তিকার ধূলিতে আদমকে (অর্থাৎ মনুষ্যকে) নির্মাণ করিলেন এবং তাহার নাসিকায় ফুঁ দিয়া প্রাণ বায়ু প্রবেশ করাইলেন। তাহাতে মনুষ্য সজীব প্রাণী হইল' (আদি পুস্তক ২ঃ ৫-৭)।
"যেন অন্যান্য প্রাণী যেভাবে অস্তিত্ব লাভ করেছিল, 'আদম' নামের এক প্রাণীও অনুরূপ অস্তিত্ব লাভ করল। বেশীর চেয়ে বেশী তার কর্ম ছিল ভূমি কর্ষণ। কোথায় সুদীর্ঘ ও অন্তঃসারশূন্য এ বিবরণ যেখানে মানুষকে আবদ্ধ করা হয়েছে হালচাষের সংকীর্ণ গণ্ডীতে আর কোথায় কুরআনের সংক্ষিপ্ত সারগর্ভ ও সর্বাঙ্গীন বিবরণ যেখানে মানুষকে আসীন করা হয়েছে খিলাফতে ইলাহীর অনন্য মর্যাদায়” (তাফসীরে মাজেদী, বাংলা অনু, ইফা, পৃ. ৬৯; সূরা বাকারার ৩০নং আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে পাদটীকা নং-১১০)।
আল্লাহর খিলাফতের তাৎপর্য
পৃথিবীতে আল্লাহ্ খিলাফত বা প্রতিনিধিত্বের তাৎপর্য ব্যাখ্যায় মিসরীয় মুফাস্সির সাইয়েদ কুতুব শহীদ (র) বলিয়াছেন,
"অর্থাৎ যখন মহান আল্লাহর সর্বোচ্চ ইচ্ছা এই নতুন সৃষ্টির হাতে পৃথিবীর দায়দায়িত্ব ন্যস্ত করার বিষয়টি চূড়ান্ত করে ফেলেছে, তিনি পৃথিবীর বুকে মানুষের হাতকে ক্ষমতাশালী করে দিয়েছেন। তার কাছে ন্যস্ত করেছেন নব নব উদ্ভাবন ও আবিষ্কার। বিভিন্ন বস্তুর মিশ্রণ ও সংযোজন, পরিবর্তন ও পরিমার্জন এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরে বিদ্যমান শক্তি ও খনিজ দ্রব্যাদি উত্তোলন এবং গোটা সৃষ্টি জগতকে আল্লাহ্ অনুমতিক্রমে আপন অনুগত করার খোদায়ী ইচ্ছা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা। এটাই ছিল আল্লাহ কর্তৃক তার কাছে অর্পিত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
"আর আল্লাহ মানুষকে সকল সুপ্ত শক্তি, যোগ্যতা ও প্রতিভা দান করলেন যাতে সে পৃথিবীর শক্তিকে এবং সকল খনিজ দ্রব্য ও কাঁচা মালকে ব্যবহার করতে পারে। আর আল্লাহ্র ইচ্ছাকে বাস্তবরূপ দিতে যে প্রচ্ছন্ন ক্ষমতার প্রয়োজন, তাও তাকে দিলেন।
"আর পৃথিবী ও গোটা সৃষ্টিজগতকে পরিচালনাকারী প্রাকৃতিক শক্তি এবং এই নতুন সৃষ্টিকে (মানুষকে) এবং তার শক্তি ও ক্ষমতাকে পরিচালনাকারী প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর মধ্যে পরিপূর্ণ সমন্বয় সাজুয্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল, যাতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির মধ্যে সংঘাত না বেধে যায় এবং এই বিশাল বিশ্বে মানুষের শক্তি ধ্বংস হয়ে না যায়।
"তখন মানুষ অর্জন করলো এক সুমহান মর্যাদা। এই প্রশস্ত পৃথিবীতে মানুষ হয়ে দাড়াঁলো এক পরম সম্মানিত ও মর্যাদাবান সৃষ্টি।
“এ সবই হলো মহান আল্লাহ্ 'আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি বা খলীফা পাঠাতে মনস্থ করেছি' এই উক্তির কিছু ব্যাখ্যা। সচেতন স্নায়ুমণ্ডল ও উন্মুক্ত অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে এবং এই নব্য সৃজিত প্রতিনিধির হাতে এই বিশাল পৃথিবীতে যা কিছু সংঘটিত হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে এ উক্তির উপরিউক্ত ব্যাখ্যাই দেওয়া যায়” (তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন, বাংলা অনু., সূরা বাকারার ৩০ তম আয়াতের ব্যাখ্যায়, ১খ, পৃ. ১০৬।
📄 আল্লাহ্র খিলাফতের তাৎপর্য
পৃথিবীতে আল্লাহ্ খিলাফত বা প্রতিনিধিত্বের তাৎপর্য ব্যাখ্যায় মিসরীয় মুফাস্সির সাইয়েদ কুতুব শহীদ (র) বলিয়াছেন,
"অর্থাৎ যখন মহান আল্লাহর সর্বোচ্চ ইচ্ছা এই নতুন সৃষ্টির হাতে পৃথিবীর দায়দায়িত্ব ন্যস্ত করার বিষয়টি চূড়ান্ত করে ফেলেছে, তিনি পৃথিবীর বুকে মানুষের হাতকে ক্ষমতাশালী করে দিয়েছেন। তার কাছে ন্যস্ত করেছেন নব নব উদ্ভাবন ও আবিষ্কার। বিভিন্ন বস্তুর মিশ্রণ ও সংযোজন, পরিবর্তন ও পরিমার্জন এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরে বিদ্যমান শক্তি ও খনিজ দ্রব্যাদি উত্তোলন এবং গোটা সৃষ্টি জগতকে আল্লাহ্ অনুমতিক্রমে আপন অনুগত করার খোদায়ী ইচ্ছা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা। এটাই ছিল আল্লাহ কর্তৃক তার কাছে অর্পিত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
"আর আল্লাহ মানুষকে সকল সুপ্ত শক্তি, যোগ্যতা ও প্রতিভা দান করলেন যাতে সে পৃথিবীর শক্তিকে এবং সকল খনিজ দ্রব্য ও কাঁচা মালকে ব্যবহার করতে পারে। আর আল্লাহ্র ইচ্ছাকে বাস্তবরূপ দিতে যে প্রচ্ছন্ন ক্ষমতার প্রয়োজন, তাও তাকে দিলেন।
"আর পৃথিবী ও গোটা সৃষ্টিজগতকে পরিচালনাকারী প্রাকৃতিক শক্তি এবং এই নতুন সৃষ্টিকে (মানুষকে) এবং তার শক্তি ও ক্ষমতাকে পরিচালনাকারী প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর মধ্যে পরিপূর্ণ সমন্বয় সাজুয্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল, যাতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির মধ্যে সংঘাত না বেধে যায় এবং এই বিশাল বিশ্বে মানুষের শক্তি ধ্বংস হয়ে না যায়।
"তখন মানুষ অর্জন করলো এক সুমহান মর্যাদা। এই প্রশস্ত পৃথিবীতে মানুষ হয়ে দাড়াঁলো এক পরম সম্মানিত ও মর্যাদাবান সৃষ্টি।
“এ সবই হলো মহান আল্লাহ্ 'আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি বা খলীফা পাঠাতে মনস্থ করেছি' এই উক্তির কিছু ব্যাখ্যা। সচেতন স্নায়ুমণ্ডল ও উন্মুক্ত অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে এবং এই নব্য সৃজিত প্রতিনিধির হাতে এই বিশাল পৃথিবীতে যা কিছু সংঘটিত হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে এ উক্তির উপরিউক্ত ব্যাখ্যাই দেওয়া যায়” (তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন, বাংলা অনু., সূরা বাকারার ৩০ তম আয়াতের ব্যাখ্যায়, ১খ, পৃ. পৃ. ১০৬।
📄 ফেরেশতাগণের মন্তব্য
তাহারা বলিল, "আপনি কি সেখানে এমন কাহাকেও সৃষ্টি করিবেন যে অশান্তি ঘটাইবে ও রক্তপাত করিবে? আমরাই তো আপনার সপ্রশংস ও স্ততিগান ও পবিত্রতা ঘোষণা করি।" তখন আল্লাহ তা'আলা বলিলেন: 'আমি জানি যাহা তোমরা জান না'।
ফেরেশতাকুলের এই উক্তি আপক্তি, অহঙ্কার কিংবা তাঁহাদের আদম-সন্তানদের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত ছিল না। যেমন ইব্ন কাছীর বলিয়াছেন:
ইহা আল্লাহ্ তা'আলার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তিসূচক বা মানব সন্তানদের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত ছিল না যেমনটি কোন তাফসীরকার ধারণা করিয়াছেন (মুখতাসার তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ১খ, পৃ. ৪৯)।
ইহার যুক্তিও তিনি ব্যাখা করিয়াছেন এইভাবে: বস্তুত তাহারা ইহার রহস্য জানিবার জন্যই এই প্রশ্ন করে (তাফসীর ইব্ন কাছীর-উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায়)।
আল্লাহ তা'আলা তখন 'আমি জানি তোমরা যাহা জান না' বলিয়া ফেরেশতাদের প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন। ইব্ন কাছীর তাঁহার এই কথার ব্যাখ্যাস্বরূপ লিখেন: অর্থাৎ তোমরা জান না, অচিরেই তাহাদের মধ্যে নবী-রাসূল, সিদ্দীক, শহীদ ও পুণ্যবানদের উদ্ভব হইবে কাসাসুল আম্বিয়া (আরবী), পৃ.১ ১-৪]।