📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বিশ্ব সৃষ্টির বিবরণ

📄 বিশ্ব সৃষ্টির বিবরণ


আল্লাহ তা'আলার মহান সত্তা যেমন একক লা-শরীক, তেমনি তাঁহার গুণাবলীতেও তিনি অনন্য। তাঁহার অসংখ্য গুণবাচক নামসমূহের একটি হইতেছে: البديع কোনরূপ পূর্ব নমুনা ব্যতীতই সম্পূর্ণ নূতনভাবে উদ্ভাবনকারী, যাঁহার সৃষ্টিকর্মে কোনরূপ উপায়-উপকরণ বা যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না। আল্লামা রাগিব ইস্পাহানী তদীয় বিখ্যাত মুফরাদাতুল কুরআনে লিখিয়াছেন:
"কোনরূপ পূর্ব নমুনার অনুকরণ-অনুসরণ ব্যতিরেকে উদ্ভাবন করাকে ইবদা' বলা হয়।"
"আর বাদী' শব্দটি যখন আল্লাহ্র ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় তখন এই البديع অর্থ হয় সেই সত্তা যিনি কোন যন্ত্রপাতি, উপায়-উপকরণ, স্থান-কাল-পাত্র ব্যতিরেকেই সৃষ্টি করিয়াছেন, অস্তিত্বে আনয়ন করিয়াছেন" (মুফরাদাত)।
একই অর্থে আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীমে নিজের সম্পর্কে বলিয়াছেন:
بَدِيعُ السَّمواتِ وَالْأَرْضِ وَإِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
"আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা এবং যখন তিনি কোন কিছু করিতে সিদ্ধান্ত করেন তখন উহার জন্য শুধু বলেন, 'হও' আর অমনি উহা হইয়া যায়" (২: ১১৭)।
বিশ্ব সৃষ্টি সংক্রান্ত কুরআনুল কারীমের আয়াতসমূহ পর্যালোচনা করিলে ইহার দ্বিবিধ তত্ত্ব পাওয়া যায়। কোন কোন আয়াতের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ প্রথমে পৃথিবী সৃষ্টি করিয়া তারপর আকাশমণ্ডলী সৃষ্টি করেন। যেমন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَى إِلى السَّمَاءِ فَسَوَّهُنَّ سَبْعَ سَمُوتٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ .
"তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন। তৎপর তিনি আকাশের দিকে মনসংযোগ করেন এবং উহাকে সপ্ত আকাশে বিন্যস্ত করেন; তিনি সর্ববিষয়ে সবিশেষ অবহিত।" (২: ২৯)।
تَنْزِيلاً مِّمَّنْ خَلَقَ الأَرْضَ وَالسَّمَوَاتِ العُلى .
"যিনি পৃথিবী ও সমুচ্চ আকাশমণ্ডলী সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার নিকট হইতে উহা (কুরআন) অবতীর্ণ” (২০:৪)।
قُلْ أَئِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ وَتَجْعَلُونَ لَهُ أَنْدَاداً . وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِنْ فَوْقِهَا وَبَرَكَ فِيهَا وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ سَوَاءً لِلسَّائِلِينَ . ثُمَّ اسْتَوَى إِلى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ فَقَالَ لَهَا وَالْأَرْضِ انْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا قَالَتَا أَتَيْنَا طَائِعِينَ. فَقَضَهُنَّ سَبْعَ سَمَوتِ فِي يَوْمَيْنِ وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاءٍ أَمْرَهَا وَزَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَحِفْظًا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ.
"বল, তোমরা কি তাঁহাকে অস্বীকার করিবেই যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন দুই দিনে এবং তোমরা তাঁহার সমকক্ষ দাঁড় করাইতেছ? তিনি তো জগৎসমূহের প্রতিপালক। তিনি স্থাপন করিয়াছেন অটল পর্বতমালা ভূ-পৃষ্ঠে এবং উহাতে রাখিয়াছেন কল্যাণ এবং চারিদিনের মধ্যে উহাতে ব্যবস্থা করিয়াছেন খাদ্যের সমভাবে যাজ্ঞাকারীদের জন্য। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যাহা ছিল ধুম্রপুঞ্জবিশেষ। অনন্তর তিনি উহাকে ও পৃথিবীকে বলিলেন, তোমরা উভয়ে আস (আল্লাহ্র বিধানের অনুগত হইয়া) ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। ইহারা বলিল, আমরা আসিলাম অনুগত হইয়া। অতঃপর তিনি আকাশমণ্ডলীকে দুই দিনে সপ্তাকাশে পরিণত করিলেন এবং প্রত্যেক আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন এবং আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করিলাম প্রদীপমালা দ্বারা এবং করিলাম সুরক্ষিত। ইহা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ্র ব্যবস্থাপনা" (৪১:৯-১২)।
أَلَمْ نَجْعَلِ الْأَرْضَ مهداً والجِبَالَ أَوْتَادًا وَخَلَقْنَكُمْ أَزْوَاجًا وَجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا وَجَعَلْنَا الَّيْلَ لِبَاسًا وَجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا . وَبَنَيْنَا فَوْقَكُمْ سَبْعًا شِدَاداً وَجَعَلْنَا سِرَاجًا وَهَاجًا وَأَنْزَلْنَا مِنَ الْمُعْصِرَاتِ مَاءً تَجَاجًا . لِتُخْرِجَ بِهِ حَبًّا وَنَبَاتًا وَجَنَّتَ الْفَافًا .
"আমি কি করি নাই ভূমিকে শয্যা ও পর্বতসমূহকে কীলক? আমি সৃষ্টি করিয়াছি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায়। তোমাদের নিদ্রাকে করিয়াছি বিশ্রাম এবং রাত্রিকে করিয়াছি আবরণস্বরূপ এবং দিবসকে করিয়াছি জীবিকা আহরণের সময়। আর আমি নির্মাণ করিয়াছি তোমাদের ঊর্ধ্বদেশে সুস্থিত সপ্ত আকাশ এবং সৃষ্টি করিয়াছি প্রোজ্জ্বল দীপ এবং বর্ষণ করিয়াছি মেঘমালা হইতে প্রচুর বারি, যাহাতে তদ্‌দ্বারা আমি উৎপন্ন করি শস্য, উদ্ভিদ ও ঘন সন্নিবিষ্ট উদ্যান” (৭৮: ৬-১৬)।
إِنَّ رَبَّكَ هُوَ الْخَلْقُ الْعَلِيمُ. “নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক মহাস্রষ্টা মহাজ্ঞানী” (১৫: ৮৬; আরো দ্র. ৩৬ঃ ৮১)।
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا . “পৃথিবীর সবকিছুই তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন” (২: ২৯)।
আবার বহু আয়াতে আকাশরাজি সৃষ্টির কথা প্রথমে উল্লিখিত হইয়াছে যাহাতে ধারণা হইতে পারে যে, আকাশমালাই পৃথিবীর পূর্বে সৃষ্টি হইয়াছে। যেমন:
الْحَمْدُ للهِ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوتِ وَالْأَرْضَ وَجَعَلَ الظُّلُمَتِ وَالنُّورَ “সকল প্রশংসা আল্লাহ্রই যিনি আকাশমণ্ডলী ও যমীন সৃষ্টি করিয়াছেন, আর সৃষ্টি করিয়াছেন অন্ধকার ও আলো” (৬:১)।
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمواتِ وَالْأَرْضَ . “তিনিই যথাবিধি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন” (৬ঃ ৭৩)।
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي الَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتِ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبْرَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَلَمِينَ . “তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেন; অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন। তিনিই দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন যাহাতে উহাদের একে অন্যকে দ্রুত গতিতে অনুসরণ করে, আর সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি, যাহা তাঁহারই আজ্ঞাধীন তাহা তিনিই সৃষ্টি করিয়াছেন। জানিয়া রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁহারই। মহিমময় বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ্” (৭:৫৪; আরও দ্র. ১১: ৭; ১৪: ১৯ ও ৩২; ২৫: ২; ২৭: ৬; ২৯: ৪৪; ৩৬: ৮১; ৩০: ৮; ৩৯: ৫; ৪১: ৯; ৪৫: ১৩; ৪৬: ৩; ৫৪: ২২; ৫৭: ৪; ৬৪: ৩; ৬৫: ১২ ইত্যাদি)।
এখানে ছয় দিনে সৃষ্টি সংক্রান্ত আয়াতসমূহের দিন (اليوم) শব্দটির ব্যাখ্যায় মুফাস্সিরগণ ইহা যে দুনিয়ার ২৪ ঘন্টার দিন নহে তাহা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করিয়াছেন (দ্র. ই.ফা. প্রকাশিত আল-কুরআনুল কারীম ৭:৫৪-এর টীকায়, পৃ. ২৩৪)।
আল-কুরআনের সূরা হজ্জে বলা হইয়াছে:
وَإِنَّ يَوْمًا عِنْدَ رَبِّكَ كَالْفِ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ . "তোমাদের প্রতিপালকের নিকট একদিন তোমাদের গণনার সহস্র বৎসরের সমান" (২২: ৪৭)। অন্য আয়াতে বলা হইয়াছে:
فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ .
"এমন একদিনে যাহার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বৎসর" (৭০:৪)।
বলা বাহুল্য, সূরা আ'রাফ (৭: ৫৪)-এ ছয় দিনে সৃষ্টি সংক্রান্ত আয়াতের টীকায় মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী 'প্রাক-সৃষ্টি যুগের সেই দিনগুলি যে আমাদের কয়েক ঘন্টার পৃথিবী ও সূর্যের গতি ভিত্তিক দিন ছিল না', তাহাই বলিয়াছেন।
আল্লামা ইউসুফ আলীও তদীয় কুরআন অনুবাদের টীকায় (১৯৩৪ সালে প্রকাশিত) 'ইয়াওম' বলিতে দিন বুঝাইবার উপর গুরুত্ব আরোপ করিয়াও শেষ পর্যন্ত ছয় দিন বলিতে সৃষ্টির বিবর্তনের সুদীর্ঘ ছয়টি মেয়াদ বুঝানো হইয়াছে বলিয়া তিনিও মন্তব্য করিয়াছেন।
আল্লামা ইব্‌ন কাছীর (মৃ. ৭৭৪ হি.) 'আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া' গ্রন্থে বলেন, "তাফসীরকারগণ উক্ত ছয় দিনের পরিমাণ সম্পর্কে দ্বিবিধ মতামত প্রকাশ করিয়াছেন। জমহূর মুফাসসিরীন ঐ দিনগুলো আমাদের প্রাত্যহিক ছয়দিন বলিয়া মনে করেন। অপরদিকে ইব্‌ন আব্বাস, মুজাহিদ, দাহ্হাক, কা'ব আহবার উহাকে আমাদের দিবস হিসাবে এক হাজার বৎসরের এক এক দিন বলেন। ইন্ন জারীর ও ইব্‌ন আবী হাতিম এই রিওয়ায়াতসমূহ বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (র) জাহমিয়াদের বিরুদ্ধে লিখিত গ্রন্থে এই মতের প্রতি সমর্থন জানাইয়াছেন। ইন জারীর এবং পরবর্তী যুগের কিছু সংখ্যক আলিমও এই মতের সমর্থক (১খ, পৃ. ১২)।
মুফতী মুহাম্মদ শফী (র) বলেন: "বিশ্ব সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ্ তা'আলার কাছে দিবারাত্রির পরিচয়ের অন্য কোন লক্ষণ নির্দিষ্ট থাকিতে পারে। যেমন জান্নাতের দিবারাত্রি সূর্যের পরিক্রমণ অনুযায়ী হইবে না" (মা'আরিফুল কুরআন', সংক্ষেপিত, পৃ. ৪৪৫, মদীনা মুনাওয়ারা সং.)।
বিশুদ্ধ রিওয়ায়ত অনুযায়ী, যে ছয় দিনে জগত সৃষ্টি হইয়াছে উহা রবিবার হইতে শুরু করিয়া শুক্রবার শেষ হয়, শনিবারে জগৎ সৃষ্টির কাজ হয় নাই (ইন্ন কাছীর)।
সূরা হা-মীম সাজদার (৪১) নবম ও দশম আয়াতে দুইদিনে ভূমণ্ডল সৃষ্টি এবং দুই দিনে পাহাড়-পর্বত, সাগরমালা, খনি, উদ্ভিদ, মানুষ, জীব-জানোয়ার সৃষ্টির কথা বলা হইয়াছে। যেমন:
خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ .
"তিনি পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন দুই দিনে" (৫১:৯)।
وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ.
"ইহাতে খাদ্যের ব্যবস্থা করিয়াছেন চারি দিনে" (৪১: ১০)।
যে দুই দিনে ভূমণ্ডল সৃষ্টি করা হইয়াছে উহা ছিল রবিবার ও সোমবার, দ্বিতীয় যে দুই দিনে ভুমণ্ডলের সাজ-সরঞ্জাম, পাহাড় পর্বত, নদ-নদী ইত্যাদি সৃষ্টি করা হয় তাহা ছিল মঙ্গল ও বুধবার।
فَقَضْهُنَّ سَبْعَ سَمَوَاتِ فِي يَوْمَيْنِ .
"অতঃপর তিনি আকাশমণ্ডলীকে দুই দিনে সপ্তাকাশে পরিণত করিলেন" (৪১ : ১২)।
বলাবাহুল্য, এই দুই দিন হইবে বৃহস্পতি ও শুক্রবার।
ইন জারীর সৃষ্টি শুরুর প্রথম দিন সম্পর্কে মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের বরাতে বলেন : “তাওরাতপন্থীরা (অর্থাৎ ইয়াহুদীরা) বলে, আল্লাহ্ সৃষ্টি শুরু করেন রবিবারে। ইনজীল অনুসারী খৃস্টানরা বলে, আল্লাহ সৃষ্টি শুরু করেন সোমবারে। আমরা মুসলমানগণ বলি, আল্লাহ্ সৃষ্টি শুরু করেন শনিবার দিন, যেমনটি রাসূলুল্লাহ্ (সা) হইতে আমাদের নিকট পর্যন্ত তথ্য পৌছিয়াছে।"
ইমাম ইব্‌ন কাছীর সাহাবী আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাদীছও উদ্ধৃত করিয়াছেন যাহাতে বলা হইয়াছে:
"আল্লাহ্ তা'আলা শনিবারে মাটি সৃষ্টি করেন” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ১২)। তারপর তিনি লিখেন:
"সুতরাং সৃষ্টিকার্য ছয় দিনেই সম্পন্ন হয় এবং ঐদিনগুলোর শেষ দিন ছিল শুক্রবার। এই জন্য মুসলমানগণ উহাকে সাপ্তাহিক ঈদরূপে গ্রহণ করে- যে দিনটি হইতে আমাদের পূর্বেকার আহলে কিতাবকে আল্লাহ্ বিচ্যুত করিয়া দিয়াছিলেন" (পৃ. গ্র/১খ, পৃ. ১৩)।
সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কিত এই বিবরণটি ঈষৎ গরমিলসহ বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে (তু. পবিত্র বাইবেল, পুরাতন ও নূতন নিয়ম, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, আদি পুস্তক)। এখানে প্রশ্ন জাগিতে পারে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ যেখানে 'কুন' (বা 'হও') বলামাত্র সব কিছু হইয়া যায়, সেখানে সৃষ্টি কার্যে এই ছয় দিন বা ছয়টি বিশাল মেয়াদকাল অতিবাহিত হইল কেন? হযরত সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র (র) এই সম্পর্কে বলেন:
"মহান আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় কুদরতে নিঃসন্দেহে এক নিমেষে সবকিছু সৃষ্টি করিতে পারেন, কিন্তু মানুষকে বিশ্বব্যবস্থা পরিচালনায় ধারাবাহিকতা ও কর্মসম্পর্কতা শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যেই হইতে ছয় দিন ব্যয় করা হইয়াছে' [মা'আরিফুল কুরআন (সংক্ষেপিত), পৃ. ৪৪৫]।
সূরা আম্বিয়ার একটি আয়াত হইতে প্রতীয়মান হয় যে, পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলী প্রথমে অঙ্গা-অঙ্গিভাবে একত্রে মিশিয়া ছিল। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَهُمَا وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ .
"যাহারা কুফরী করে তাহারা কি ভাবিয়া দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী মিশিয়াছিল ওৎপ্রোতভাবে, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করিয়া দিলাম এবং প্রাণবান সমস্ত কিছু সৃষ্টি করিলাম পানি হইতে, তবুও কি উহারা ঈমান আনিবে না" (২১ঃ ৩০)?
সৃষ্টির বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদম (আ) পৃথিবীর আদি মানব

📄 আদম (আ) পৃথিবীর আদি মানব


হযরত আদম (আ) যে পৃথিবীর আদি মানব এবং সমগ্র মানব জাতির আদি পিতা তাহা কুরআন করীমের বিভিন্ন আয়াত ও মহানবী (স)-এর হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللهِ كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ .
"আল্লাহ্র নিকট নিশ্চয়ই ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। তিনি তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলেন, 'হও', ফলে সে হইয়া গেল” (৩:৫৯)।
অর্থাৎ আদম (আ) পিতা ও মাতা ব্যতীতই আল্লাহ্ কুদরতে সৃষ্ট, সরাসরি মাটি হইতে। আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِّنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا
"তিনিই তোমাদেরকে এক বক্তি হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন ও উহা হইতে তাহার স্ত্রী সৃষ্টি করেন, যাহাতে সে তাহার নিকট শান্তি পায়" (৭: ১৮৯)।
অন্য আয়াতে তাঁহার স্ত্রী হাওয়াকেও তাঁহারই দেহ হইতে সৃষ্টির উল্লেখ করিয়া আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِّنْ نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا ونِسَاءَ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا .
"হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হইতেই সৃষ্টি করিয়াছেন এবং যিনি তাহা হইতে তাহার স্ত্রী সৃষ্টি করেন, যিনি তাহাদের দুইজন হইতে বহু নরনারী ছড়াইয়া দেন" (৪:১)।
উক্ত আয়াতের পাদটীকায় তাফসীর উছমানীতে বলা হইয়াছে: হযরত আদম (আ) হইতে প্রথমে হযরত হাওয়াকে তাঁহার বাম পাঁজর হইতে সৃষ্টি করেন। তারপর তাঁহাদের দুইজন হইতে সমস্ত নরনারী সৃষ্টি করিয়া বিশ্বব্যাপী ছড়াইয়া দেন। ফলে মূলত এক অভিন্ন প্রাণ ও ব্যক্তি হইতেই আল্লাহ্ তা'আলা সমস্ত মানবজাতিকে সৃষ্টি করিয়াছেন (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৫৮)।
প্রায় ঐ একইরূপ বক্তব্য আসিয়াছে অন্য আয়াতে:
يأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَانْثَى وَجَعَلْنَكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَقُوا .
“হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করিয়াছি এক পুরুষ ও এক নারী হইতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করিয়াছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাহাতে তোমরা একে অপরের সহিত পরিচিত হইতে পার” (৪৯:১৩)।
সুতরাং পৃথিবীর তাবৎ মানবই যে একই ব্যক্তি ও এক অভিন্ন দম্পতি হইতে বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করিয়াছে এবং তাহাদের আদি পিতা আদম (আ), তাহা কুরআন শরীফের বর্ণনা হইতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। আল্লাহ্ তা'আলা বিভিন্ন আয়াতে মানবজাতিকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বনী আদম বা আদম-সন্তান বলিয়া সম্বোধন করিয়াছেন (দ্র. ৭:২৭, ৩১, ৩৫, ৩৬ ৪ ৬০-৬১)।
শাফা'আত সংক্রান্ত হাদীছে রহিয়াছে, কিয়ামতের দিন সমবেত মানবমণ্ডলী আদম (আ)-এর নিকট গিয়া আবেদন করিবে :
"হে আদম! আপনি মানবজাতির আদি পিতা। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে স্বহস্তে সৃষ্টি করিয়াছেন। তাঁহার পক্ষ হইতে 'রূহ' আপনার মধ্যে ফুঁকিয়া দেন। তাঁহার ফেরেশতাকূল দিয়া আপনাকে সিজদা করাইয়াছেন। তাঁহার জান্নাতে আপনাকে বাস করিতে দিয়াছেন। আমরা কী মহাসংকটে রহিয়াছি তাহা কি আপনি লক্ষ্য করিতেছেন না? আপনি কি আপনার প্রতিপালকের দরবারে আমাদের জন্য সুপারিশ করিবেন না"? (বুখারী, ১খ, পৃ. ৪৭০, পারা-১৩, কিতাবুল আম্বিয়া, আদম ও তদীয় বংশধরগণের সৃষ্টি সংক্রান্ত অধ্যায়)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-কুরআনে আদম (আ) প্রসঙ্গ

📄 আল-কুরআনে আদম (আ) প্রসঙ্গ


মানব সৃষ্টি আর আদম (আ)-এর সৃষ্টির কথা আল-কুরআনের বর্ণনায় মূলত এক ও অভিন্ন ব্যাপার। কেননা, কুরআন তথা আসমানী সমস্ত কিতাবের বক্তব্য অনুযায়ী হযরত আদম (আ)-ই হইতেছেন প্রথম মানব। কুরআন শরীফের পঁচিশটি স্থানে 'আদম' শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে। যেমন : ২:৩১, ৩৩, ৩৪, ৩৫ ও ৩৭; ৩:৩৩, ৫৯; ৫:২৭; ৭:১১, ১৯, ২৬, ৩১, ৩৫ ও ১৭২; ১৭:৬১ ও ৭০; ১৮:৫০; ২০:১১৫, ১১৬, ১১৭, ১২০ ও ১২১; ৩৬:৬০।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আদিপুস্তক

📄 আদিপুস্তক


উক্ত আয়াতসমূহে তাঁহার সৃষ্টির বিবরণ, সৃষ্টির উপাদান, সৃষ্টির উদ্দেশ্য, তাঁহাকে সৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলার ফেরেশতাদের নিকট ঘোষণা দান, ফেরেশতাগণের উক্তি ও সে ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলার জবাব, আল্লাহ্ পাক কর্তৃক আদম (আ)-কে জ্ঞান ও মর্যাদা দান, আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতাগণ কর্তৃক আদম (আ)-কে সিজদা করা ও ইহাতে আযাযীলের অস্বীকৃতি, কুযুক্তি উত্থাপন এবং পরিণামে বিতাড়িত শয়তানে পরিণত হওয়া, আদম (আ)-এর জান্নাতে অবস্থান ও সঙ্গীরূপে স্ত্রী হাওয়াকে লাভ, শয়তানের প্ররোচনায় জান্নাতে আদম ও হাওয়া দম্পতির নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ ও পরিণামে জান্নাত হইতে পৃথিবীতে অবতরণ, তাঁহাদের তওবা কবুল হওয়া, তাঁহাদের বংশবিস্তার, হাবীল-কাবীলের দ্বন্দ্ব ও তাহাদের কুরবানী, কাবীল কর্তৃক হাবীলকে হত্যা প্রভৃতি প্রসঙ্গ বর্ণিত হইয়াছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00