📘 শোনো হে যুবক > 📄 আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করুন

📄 আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করুন


উপদেশ : ৫
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করুন
মুসলিমসমাজ আজ ভয়াবহ বিপদের মুখে দাঁড়িয়েছে। আজ তাদের পারস্পরিক বন্ধন, ভ্রাতৃত্ববোধ শূন্যে নেমে এসেছে। আজ সবাই নিজেকে নিয়ে মহাব্যস্ত। অন্যের দিকে ফিরে তাকানোরও সময় নেই।
মাসের পর মাস চলে যায়, বছরের পর বছর, ভাই ভাইকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে না। ভালো-মন্দ জিজ্ঞাসা করে না। চাচা-ভাতিজাদের কোনো খোঁজখবর নেয় না। মামা-ভাগিনা খবর নেয় না। সবার মাঝে আজ এক অদৃশ্য দূরত্ব বিরাজ করছে। যেন সবাই সবার থেকে আলাদা।
মুসলিম উম্মাহর এই দূরত্ব তাদের জীবনে অসংখ্য বিপদ ডেকে আনবে!! সমাজ-বিচ্ছিন্ন মানুষ জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবেলা করতে পারে না। ঘাত-প্রতিঘাত চাই সামাজিক হোক বা ব্যক্তিগত। বিপদে আপদে তো সর্বপ্রথম রক্ত-সম্পর্কীয় আত্মীয়রাই এগিয়ে আসে। সুতরাং যদি অবস্থা এমন হয়, আত্মীয়দের সাথে পরস্পর কোনো সম্পর্ক নেই, কেউ কাউকে চেনেই না, তাহলে তো অন্যদের সাথে সম্পর্ক থাকবেই না। এটা খুবই স্বাভাবিক। আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক না থাকলে দেখবেন, প্রতিবেশীর সাথেও সুসম্পর্ক নেই। দেখবেন, সহকর্মী সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, ধীরে ধীরে কাছের বন্ধুরা দূরে সরে যাচ্ছে। মুসলমান মুসলমানের কোনো খোঁজখবর নিচ্ছে না।
এ কারনেই আল্লাহ রব্বুল আলামীন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার প্রতি অত্যধিক গুরুত্বারোপ করেছেন এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের সাথে নিজের সম্পর্ক রক্ষার ঘোষণা দিয়েছেন।
ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম রহ. হযরত আবু হুরায়রা রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِنَّ اللهَ خَلَقَ الْخَلْقَ حَتَّى إِذَا فَرَغَ مِنْهُمْ قَامَتِ الرَّحِمُ، فَقَالَتْ: هَذَا مَقَامُ الْعَائِدِ مِنَ الْقَطِيعَةِ، قَالَ: نَعَمْ، أَمَا تَرْضَيْنَ أَنْ أَصِلَ مَنْ وَصَلَكِ، وَأَقْطَعَ مَنْ قَطَعَكِ؟ قَالَتْ: بَلَى، قَالَ: فَذَاكِ لَكِ " ثُمَّ قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اقْرَءُوا إِنْ شِئْتُمْ: {فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ، أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ، أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا. [متفق عليه]
‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করার পর যখন ফারেগ হলেন, তখন জরায়ু দাঁড়িয়ে বলে উঠল, সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে সুরক্ষা ও আশ্রয়প্রার্থীর জন্য এটা (উপযুক্ত) স্থান। তিনি (আল্লাহ) বললেন, হ্যাঁ, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার সাথে যে সুসম্পর্ক রাখবে, আমিও তার সাথে সুসম্পর্ক রাখব। আর যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব। সে (জরায়ু) বলে উঠল, হ্যাঁ, আমি সন্তুষ্ট! আল্লাহ বললেন, তাহলে এ মর্যাদা তোমাকে দেওয়া হলো। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমার ইচ্ছে হলে এ আয়াতটি পড়ো- (অর্থ) শীঘ্রই যদি তোমরা কর্তৃত্ব লাভ করো, তাহলে কি তোমরা পৃথিবীতে ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলবে? আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দেন এবং তাদেরকে বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন বানিয়ে দেন। তবে কি তারা কুরআন সম্বন্ধে গভীর মনোযোগ সহকারে চিন্তা করে না? না কি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?[39]
যখন বড়রা দূরত্ব কমিয়ে ফেলবে, আত্মীয়তার সম্পর্ককে রক্ষা করবে, তখন যুবকশ্রেণি নতুন উদ্যমে সম্পর্ক রক্ষা করে চলবে। তখন প্রত্যেক যুবক বিচ্ছিন্ন সম্পর্কগুলোকে নতুনভাবে জোড়া লাগাবে এবং যে সকল সমস্যা সমাজে বিদ্যমান, তা যথাসাধ্য সংশোধন করার চেষ্টা করবে। এভাবে নতুন এক স্বর্গীয় সমাজ গড়ে উঠবে। সমাজে ভ্রাতৃত্ববন্ধনের নতুন মাত্রা যোগ হবে।
যুবসমাজ সমীপে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন...
আপনি যতই বড় হন না কেন, পিতা-মাতার ওপর বড়ত্ব জাহির করা আপনার জন্য জায়েয নয়!!
এটি পিতা-মাতার ফজিলত উল্লেখ করার স্থান নয়। শুধু এতটুকু উল্লেখ করাকেই যথেষ্ট মনে করছি, আল্লাহ তা'আলা পিতা-মাতার আনুগত্যকে স্বীয় ইবাদতের পর উল্লেখ করেছেন। অতঃপর তাদের বিরোধিতা না করা ও তাদের কষ্ট না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তারা কাফের হলেও তাদের কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন। তবে যদি তারা আল্লাহর সাথে শিরক করার নির্দেশ দেন তখন তাদের আনুগত্য করা যাবে না। তবে তখনো তাদের সাথে সদাচরণ করতে হবে। আল্লাহ রব্বুল আ'লামীন বলেন-
وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشَّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ، وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ، وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبَهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ. (لقমান)
'স্মরণ করো যখন লুকমান উপদেশ দিতে গিয়ে তার পুত্রকে বলেছিল, হে বৎস, আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক কোরো না। নিশ্চয় শিরক হলো চরম জুলুম।
আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং দুই বছরে তার দুধ ছাড়িয়েছে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমার নিকটেই।
তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার অংশীদার বানাতে যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মানবে না। তবে পৃথিবীতে সদ্ভাবে তাদেরকে সঙ্গদিবে এবং যে ব্যক্তি বিশুদ্ধচিত্তে আমার অভিমুখী, তার পথ অবলম্বন করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট এবং তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবহিত করব। '[80]
অন্যদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক হাদীসে জান্নাতে প্রবেশকে পিতা-মাতার সন্তুষ্টির সাথে শর্তযুক্ত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ ইমাম মুসলিম রহ. হযরত আবু হুরায়রা রা. এর সূত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
رَغِمَ أَنْفُ، ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُ، ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُ ، قِيلَ : مَنْ؟ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: مَنْ أَدْرَكَ أَبَوَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ ، أَحَدَهُمَا أَوْ كِلَيْهِمَا فَلَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ. (رواه مسلم)
'ওই ব্যক্তির নাক ধুলোয় জর্জরিত হোক, ওই ব্যক্তির নাক ধুলোয় জর্জরিত হোক, ওই ব্যক্তির নাক ধুলোয় জর্জরিত হোক! সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, কার ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি তার বাবা-মার যে কোনো একজনকে অথবা উভয়জনকে বৃদ্ধ অবস্থায় পাওয়ার পরও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারেনি। '[81]

টিকাঃ
৩৯. সূরা মুহাম্মদ (৪৭): ২২-২৪; বুখারী: ৫৫৬১
80. সূরা লুকমান (৩১): ১৩-১৫
৪১. মুসলিম: ২৫৫১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00