📘 শোনো হে যুবক > 📄 এক্ষুনি গুনাহ ছেড়ে দিন

📄 এক্ষুনি গুনাহ ছেড়ে দিন


উপদেশ: ১
এক্ষুনি গুনাহ ছেড়ে দিন
হয়তো মুসলিম যুবসমাজ ও সকল মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বস্তু হলো গুনাহের কাজে ডুবে থাকা। নিশ্চয়ই গুনাহ মানুষের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের চেয়েও ভয়াবহ। গুনাহ মানুষের অন্তরে এমন পর্দা ফেলে দেয়, যা তাদের ইতিবাচক মনোভাবকে দূর করে দেয়। ফলে গুনাহগার মানুষ উপদেশ শুনলেও আমল করে না। উপদেশবাণী পাঠ করলে উপদেশ গ্রহণ করে না। এমনকি কুরআন তেলাওয়াত করলেও বিনয়ী হয় না। চোখ থাকতেও যেন দেখতে পায় না।
এসবের একমাত্র কারণ হলো গুনাহের কাজে ডুবে থাকা। এটিই নিম্নোক্ত হাদীসের মূল ভাষ্য। হাদীসটি ইমাম তিরমিযী, ইমাম আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
"إن المؤمن إذا أذنب ذنباً كانت نكتة سوداء في قلبه. فإن تاب ونزع واستغفر صقل منها، وإن زاد زادت حتى يغلف بها قلبه، فذلك الران الذي ذكر الله في كتابه کلا، بل ران على قلوبهم. (رواه الترمذي وأبوداود)
"মুমিন যখন গুনাহে লিপ্ত হয়, তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। যদি সে তওবা করে, বিরত থাকে এবং ইস্তেগফার পড়ে, তার অন্তর সাফ হয়ে যায়। আর যদি গুনাহ করতেই থাকে তাহলে সেই কালো দাগ বাড়তে থাকে। এটি সেই মরিচা, যার কথা কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- 'বরং তাদের কৃতকর্মের কারণে তাদের অন্তরে মরিচা পড়েছে।”
হে যুবসমাজ, নেককাজ করার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো গুনাহবর্জন করা। সুতরাং যে ব্যক্তি গুনাহ করে না এবং কুরআন তেলাওয়াত করে না, সে ওই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম, যে কুরআন তেলাওয়াত করে, পাশাপাশি গুনাহ করে। ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. হযরত আবু হুরায়রা রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
ما نهيتكم عنه فانتهوا ، وما أمرتكم به فأتوا منه ما استطعتم. (متفق عليه)
'আমি তোমাদের যা করতে বারণ করেছি তা থেকে বিরত থাকবে। আর যে কাজের নির্দেশ দিয়েছি, যথাসাধ্য তা বাস্তবায়ন করবে।' যে ব্যক্তি মুসলিম জাতির সহযোগী হবে সে তো গুনাহ করতে পারে না। হযরত ওমর রা. তার সৈন্যবাহিনীকে অসিয়ত করতেন-
لا تعملوا بمعاصي الله وانتم في سبيل الله 'তোমরা আল্লাহর রাস্তায় থাকাকালে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ো না।'
আর সবচেয়ে ভয়াবহ হলো সেই গুনাহ, যা নিয়মিত করা হয়। ধারাবাহিক গুনাহ করে যাওয়া অন্তর নষ্ট হয়ে যাওয়ার আলামত। কাজেই দ্রুত অন্তরের চিকিৎসা গ্রহণ করুন। না হলে দিন যতই অতিবাহিত হবে, অবস্থা ততই শোচনীয় হবে। সামনের দিন হবে আরও খারাপ।
হে যুবক যুবতী ভাই ও বোনেরা, মনে রাখবেন, আপনার গুনাহ থেকে সরে আসা, ভবিষ্যতে গুনাহে লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা এবং অতীতের কৃত গুনাহের জন্য লজ্জিত হওয়া আপনার জীবনে নতুন এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা করবে। আল্লাহ তা'আলা আপনাদের যাবতীয় গুনাহ মোচন করবেন। তিনি স্বীয় বান্দার তওবা কবুল করেন। সকল গুনাহ মাফ করে দেন এবং যারা তার নৈকট্য লাভ করতে চায় তাদের কাছে টেনে নেন। তিনি অনেক বড়, মহিমাময়।
অতঃপর আজকের তওবা কালকের জন্য রেখে দেবেন না- এমনকি এই মুহূর্তের তওবা পরবর্তী মুহূর্তের জন্য রেখে দেবেন না। কারণ, আত্মা একবার বের হয়ে গেলে আর কখনো ফিরে আসবে না। আত্মা তো মাত্র একবারই বের হবে। আর মৃত্যু কোনো অবস্থাতেই সামান্য সময়ের জন্য বিলম্বিত হবে না। আল্লাহ আ'আলা তওবাকারীদের প্রশংসায় বলেন-
ثُمَّ يَتُوبُوْنَ مِنْ قَرِيبٍ. (النساء)
'তারা খুব জলদি তওবা করে।[32]
অর্থাৎ গুনাহ হয়ে গেলে তারা তওবা করতে দেয়িও করে না। ফলে তারা অবিরাম গুনাহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয় না। দুআয় বেশি বেশি তওবা ও ইস্তেগফার করবেন। যেন আল্লাহ তা'আলা আপনাকে মাফ করে দেন। আপনার গুনাহ ও অন্যায়সমূহ গোপন রাখেন।
কারণ, আল্লাহ তা'আলা তওবা কবুলকারী। দুআ কবুলকারী। নিঃসন্দেেহ তিনি আপনার দুআও কবুল করবেন। আর দুআ কবুলের নিদর্শন হলো, দেখবেন আপনার অন্তর নেক কাজের প্রতি উৎসাহিত হবে, নেক কাজ করতে আপনার ভালো লাগবে, কৃত গুনাহের কারণে ভয় অনুভূত হবে, কুরআন-হাদীসের আলোচনার সময় আপনার অন্তর বিগলিত হবে।
অন্তরে এমন অবস্থা অনুভূত হলে বেশি বেশি আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করবেন। অন্তরকে সর্বদা জাগ্রত রেখে আমলে অগ্রগামী হবেন। যেন অন্তরের এই কোমলতা ও ইবাদতের স্বাদ স্থায়ী হয়।
আর আপনি যদি এমন অবস্থা অনুভব না করেন তাহলে খুঁজে দেখুন কোনো না- কোনো প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য গুনাহ আপনি নিয়মিত করে যাচ্ছেন, যার খবরও আপনার নেই। কখনো কখনো গুনাহ হয় দৃষ্টির মাধ্যমে, কখনো গীবতের মাধ্যমে, কখনো অবৈধ গান-বাজনা শোনার মাধ্যমে, কখনো পিতা-মাতার অবাধ্যতায়, কখনো রাগের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনোভাবে, যা গুনাহ হওয়ার উপলব্ধি হয়তো আপনার অন্তরে নেই।
গুনাহে সগীরার ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। সগীরা গুনাহ ধীরে ধীরে অন্তরে প্রবেশ করে একপর্যায়ে পাহাড়ের আকার ধারণ করে। সগীরা গুনাহ বারবার করলে সেটাও কবীরায় রূপান্তরিত হয়। মনে রাখবেন, তওবা করলে যেমন কবীরা গুনাহ কবীরা থাকে না, অনুরূপ বার বার সগীরা গুনাহে লিপ্ত হলে সেটি আর সগীরা থাকে না- করীরায় পরিণত হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিম্নোক্ত হাদীসটি মনে রাখবেন। ইমাম আহমদ রহ. হযরত সাহল ইবনে সা'দ রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إياكم ومحقرات الذنوب، فإنما مثل محقرات الذنوب كمثل قوم نزلوا بطن واد فجاء ذا بعود وذا بعود، حتى جمعوا ما أنضجوا به خبزهم، وإن محقرات الذنوب متى يؤخذ بهما صاحبها تملكه. (رواه الإمام أحمد)
'তোমরা ছোট ছোট তুচ্ছ গুনাহ বর্জন করো। ছোট গুনাহ ওই সম্প্রদায়ের মতো, যারা কোনো উপত্যকায় আসার পর একজন একটা লাকড়ি নিয়ে এল, আরেকজন আরেকটা লাকড়ি নিয়ে এল। অবশেষে এই লাকড়ি দিয়েই তারা রুটি রান্না করে ফেলল। তোমরা ছোট ছোট গুনাহ বর্জন করে চলবে। কারণ, ছোট গুনাহ মানুষকে ধ্বংস করে দেয়।[33]
ছোট গুনাহ হলো, যেসব গুনাহ মানুষের দৃষ্টিতে ছোট। আর ছোট হওয়ার কারণে মানুষ তা থেকে খুব একটা সতর্কতা অবলম্বন করে না। একপর্যায়ে সেই ছোট গুনাহই বিরাট আকার ধারণ করে তাকে ধ্বংস করে ফেলে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের আপনাদের সকল মুসলমানদের নিরাপদে রাখুন। গুনাহ থেকে হেফাজতে রাখুন। আমীন।

টিকাঃ
32. সূরা নিসা (৪): ১৭
33. ইমাম আহমাদ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00