📄 হতাশা
কারণ: ৩
হতাশা বর্তমান মুসলিম যুবসমাজের অবনতি ও অধঃপতনের নেপথ্যে 'হতাশা' অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমান যুবসমাজের সর্বত্র একটি হতাশা বাক্য ছড়িয়ে পড়েছে- 'আর সম্ভব নয়'। তবে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে কখনো হতাশ হতে নেই। অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা মুসলিম উম্মাহকে সম্মানিত করবেন এবং এ জাতির জন্য আল্লাহ তা'আলা যেই দ্বীন মনোনীত করেছেন, তা অবশ্যই এ ধরায় প্রতিষ্ঠিত হবে।
কিন্তু যুবসমাজ অল্পতেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সাময়িক ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ে। তাদের হতাশা আর ব্যর্থতার পেছনে একটা বড় যৌক্তিক কারণও আছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে একটানা মুসলিমজাতির অধঃপতন ও পরাজয় দেখে আসছে। বিপরীতে অমুসলিমদের অগ্রগতি ও বিজয়োল্লাস দেখে নিজেদের বিজয়গাথার সোনালি ইতিহাস ভুলতে বসেছে। ফলে হতাশা আর বঞ্চনাই বাস্তবতা হিসেবে তাদের সামনে ধরা দিয়েছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সামরিক- এমনকি শিক্ষা ও চারিত্রিক ক্ষেত্রেও হতাশা নেমে এসেছে।
উপরন্তু প্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যকার দূরত্ব যুবসমাজের হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং দিনে দিনে এই দূরত্ব বেড়েই চলেছে। কারণ, পশ্চিমারা ইসলামের সোনালি ইতিহাসকে শুধু বিকৃত করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তা ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে হরহামেশা। ফলে আজ মুসলিম যুবসমাজ কেবলই অধঃপতন, ফেতনা, পরাজয় ও বিপদাপদের ঘটনাবলী দেখছে। এতে তারা আরও বেশি ভেঙে পড়ছে।
তা ছাড়া মুসলিমবিশ্বের অবিরাম অধঃপতন যুবসমাজের হতাশাকে আরও গভীর করেছে। শুধু ফিলিস্তিন নয়, বরং ইরাক আফগানিস্তান, চেচনিয়া, কাশ্মীর, তুর্কিস্তান ও সুদান ইত্যাদি মুসলিম ভূখণ্ডগুলোর পতনের গল্প যুবসমাজকে নেতিয়ে দিয়েছে।
পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোর স্বৈরাচারী-রাজনীতি, প্রশাসনিক-দুর্নীতি, অকার্যকর গণতন্ত্র, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিপর্যয়, সুদ, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, মিথ্যা ও খেয়ানত ইত্যাদি কারণে এক হতাশ যুবসমাজ সৃষ্টি হয়েছে।
এই হতাশাজনক পথ থেকে উত্তরণের উপায় কী?!
এ জাতির কল্যাণকামী হিতাকাঙ্ক্ষী প্রত্যেক বাবা-মা, শিক্ষক ও অভিভাবকের উচিত এ কথা খুব ভালোভাবে মনে রাখা যে, কোন জাতির সফলতা ও কামিয়াবী কখনো হতাশ ও নিরাশ প্রজন্মের হাতে রচিত হয় না।
হতাশ জাতি কখনো পা সোজা করে দাঁড়াতে পারে না।
এ এক স্বীকৃত বিধান, কখনো অস্বীকার করা যায় না।
তাই যুবসমাজের উচিত, অন্তরে আশার বীজ বপন করা।
হতাশা ও নিরাশা কিছুতেই মুমিনের গুণ হতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
قَالَ وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ. (الحجر)
'হযরত ইবরাহীম আ. ফেরেশতাদের বললেন, পথভ্রষ্ট ব্যতীত আর কে তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ থেকে হতাশ হয়?'[23]
যত বিপদ আসুক, যতই দুর্যোগ ঘনীভূত হোক, কিছুতেই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হতে নেই।
হে মুসলিম যুবসমাজ, একটি কথা। আপনাদের প্রতি আমার হৃদয়-নিংড়ানো উপদেশ...
যখন অবলা নারীদের আর্তনাদ শুনবেন... মায়েরা একের পর এক সন্তান হারাবে... যখন সকাল-সন্ধ্যা নির্মমভাবে শিশু-হত্যা দেখবেন... মুজাহিদদের বিতাড়িত ও বন্দী হতে দেখবেন... যখন ঘর-বাড়ি ভস্ম হতে দেখবেন... যখন কোন অঞ্চল বিরান হতে দেখবেন... খেত-খামার জ্বালিয়ে দিতে দেখবেন... মৃতলাশের কবর দেওয়ার জায়গা খুঁজে পাবেন না... চারদিকে কেবল জুলুম-অত্যাচার, ধ্বংস আর হত্যার মিছিল শুনতে পাবেন... যখন দুর্বলদের প্রতি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষিপ্ত হবে... এ ছাড়াও আরও অযাচিত ঘটনা ঘটতে দেখবেন... তখনও হতাশ হবেন না। বসে থাকবেন না। দুর্বল হবেন না। নিরাশ হবেন না। কারণ-
إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ. (يوسف)
'আল্লাহর রহমত থেকে কাফের শ্রেণি ব্যতীত কেউ নিরাশ হয় না। '[24]
বন্ধুরা, প্রকৃত অবস্থা বোঝার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, আল্লাহ তা'আলার কিছু নীতিমালা রয়েছে, যেগুলোর কখনো পরিবর্তন-পরিমার্জন হয় না। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِّثْلُهُ وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ.
'যদি তোমাদের আঘাত লেগে থাকে, অনুরূপ আঘাত তো তাদেরও লেগেছিল। আমি পর্যায়ক্রমে মানুষের মধ্যে এই দিনগুলোর আবর্তন ঘটাই।'[25]
আজ যেমন মুসলমানরা কষ্ট সহ্য করছে, একদিন অন্যরাও কষ্ট সহ্য করেছিল। সেদিন মুসলমানরা নিরাপদে-শান্তিতে ছিল। আবার একটা সময় আসবে যখন निःসন্দেহে মুসলমানদের সাম্রাজ্য-শক্তি ফিরে আসবে।
মনে রাখবেন, মুসলিম জাতি অন্যান্য জাতির মতো নয়। মুসলিম জাতি বিশেষ গুণে গুণান্বিত। বিশেষ বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত। মুসলিম জাতি কখনো চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে না। হয়তো কালের বিবর্তনে কখনো দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু চিরদিনের জন্য কখনো নিঃশেষ হবে না। এ জাতি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত শেষ বাণীটি পৃথিবীবাসীর কাছে পৌঁছে দেবে।
বলুন, মুসলিম জাতি ধ্বংস হলে কোন জাতি পৃথিবীর বুকে আল্লাহর বিধান কায়েম করবে?
বিশ্ববাসীর কল্যাণেই আল্লাহ তা'আলা এই জাতিকে টিকিয়ে রাখবেন।
মুসলিম জাতির অস্তিত্ব গোটা বিশ্বের জন্য কল্যাণকর। আর মুসলিম জাতির বিদায় বিশ্ববাসীর ধ্বংসের কারণ।
মনে রাখবেন, যুদ্ধের ঘোষণা মূলতঃ একদল মুসলমান আর একদল কাফেরের মাঝে নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের ঘোষণা হলো, আল্লাহ তা'আলা ও দ্বীন শরীয়তবিরোধী দুর্বল বান্দাদের মধ্যে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ. (آل عمران)
'তারা চক্রান্ত করে আর আল্লাহ তা'আলা কৌশল অবলম্বন করেন। আল্লাহ তা'আলা কৌশল অবলম্বনকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।[26]
আল্লাহর যুদ্ধ বড় কঠিন। আল্লাহর যুদ্ধ হবে তার শক্তি, পরাক্রমশীলতা, ক্ষমতা ও অহংকার অনুযায়ী।
وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ. (الزمر)
'তারা আল্লাহ তা'লার ক্ষমতাকে যথাযথ অনুধাবন করতে পারেনি। কেয়ামতের দিন সমগ্র ভূমণ্ডল তার কজায় থাকবে ও আকাশমণ্ডলী ভাঁজ করা অবস্থায় তার হাতে থাকবে। পবিত্র ও সুমহান তিনি, তারা তার সাথে যা শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে।[27]
কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সুসংবাদের প্রকৃত অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করুন।
দেখুন আল্লাহ রব্বুল আলামীন ওয়াদা করে বলেছেন-
وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِينَ (الروم)
'মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব। '[28]
এ জাতীয় সুসংবাদ সম্বলিত আয়াতসমূহ বোঝার চেষ্টা করুন।
ইমাম মুসলিম রহ. হযরত ছাওবান রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ زَوَى لِي الْأَرْضَ فَأُرِيتُ مَشَارِقَهَا وَمَغَارِبَهَا، وَإِنْ أُمَّتِي سَيَبْلُغُ مُلْكُهَا مَا زُوِيَ لِي مِنْهَا. (رواه مسلم)
'আল্লাহ তা'আলা যমিনকে আমার সামনে ভাঁজ করে পেশ করেছেন। আমি পশ্চিম থেকে পূর্ব গোটা বিশ্বকে দেখেছি। নিশ্চয়ই আমার উম্মতের রাজত্ব সে পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, যে পর্যন্ত যমিন ভাঁজ করা হয়েছিল। '[29]
মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস দেখুন, তারা কখনো হেরে গেলে আবার বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। কখনো পতনের শিকার হলে আবার উত্থানের পথ নির্মাণ করেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর ধর্মত্যাগের ফিতনার সময় আমাদের অধঃপতন আজকের অধঃপতনের চেয়ে আরও ভয়াবহ ছিল। আমরা আবার পরিখা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছি। নতুনভাবে আবার ইতিহাস রচনা করেছি। এমনকি রোম-পারস্য দুই মহাশক্তিকে পরাভূত করেছি। ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় ক্রুসেড বাহিনীর কাছে আমারা তিক্ত পরাজয় বরণ করেছিলাম। আবার আমরা মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়েছি। আবির্ভূত হয়েছেন ইমাদুদ্দীন জঙ্গী, নূরুদ্দীন মাহমুদ, সালাহুদ্দীন আইয়ুবী। আমরা আবার নতুন সাজে সজ্জিত হয়েছি। ইসলামের পতাকাকে আমরা নতুনভাবে উড্ডীন হতে দেখেছি।
স্পেনে আমরা পরাজিত হতে না-হতেই আমরা অটোমান মুজাহিদদের পতাকাতলে এসে দাঁড়িয়েছি। আমরা কনস্টান্টিনোপল জয় করেছি।
হে মুসলিম যুবসমাজ, প্রত্যেক পরাজয়ের পর আমাদের ঘুরে দাঁড়াবার ইতিহাস আছে। সুতরাং নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। নিরাশ হবেন না।
টিকাঃ
২৩. সূরা হিজর (১৫): ৫৬
২৪. সূরা ইউসুফ (১২): ৮৭
২৫. সূরা আল ইমরান (০৩): ১৪০
২৬. সূরা আল ইমরান (০৩): ৫৪
২৭. সূরা যুমার (৩৯): ৬৭
২৮. সূরা রূম (৩০): ৪৭
২৯. মুসলিম: ২৮৯১