📄 যোগ্য ও আদর্শবান ব্যক্তির অভাব
বর্তমান মুসলিম যুবসমাজ দ্বিতীয় যে ভয়াবহ সমস্যার মুখোমুখি, তা হলো, যোগ্য আদর্শবান ব্যক্তির অভাব। আদর্শবান ব্যক্তির যোগ্য-প্রতিপালন হাজার বয়ান ও উপদেশ প্রদানের চেয়ে বহু গুণে উত্তম ও কার্যকর। হাজার জন মিলে একজনকে উপদেশ প্রদানের চেয়ে হাজার মানুষের কল্যাণে একজনের কাজ করে যাওয়া উত্তম।
যে অভিভাবকের কথা ও কাজ তার বক্তব্য ও উপদেশের বিপরীত হয়, তার প্রতিপালন ও পরিচর্যা উপকারের পরিবর্তে অপকার বয়ে আনে- যদিও তার ধারণামতে সে অভিভাবকত্ব করছে। যদিও তার বক্তব্য বিনির্মাণ ও সংস্কারমূলক হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ. (الصف)
'তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক। '[21]
বাবার পক্ষে কি সম্ভব সন্তানকে ধুমপানে বারণ করা, যদি তার নিজ হাত সিগারেটমুক্ত না হয়? এমন বাবা কীভাবে সন্তানকে প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণের নির্দেশ দেবে, যদি সে নিজেই তার প্রতিবেশীদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত থাকে? নিজের মুখ হেফাজতে না থাকলে কীভাবে সন্তানকে জিহ্বা হেফাজতের নির্দেশ দেবে? নিজে সহনশীল না হয়ে সর্বদা রাগান্বিত থাকলে সন্তানকে কীভাবে সহনশীলতার উপদেশ দেবে? সন্তানকে দানশীল হওয়ার উপদেশ দেওয়া বাবার পক্ষে তখনই মানায়, যখন সে কার্পণ্য ত্যাগ করবে।
শিক্ষক কীভাবে ছাত্রদের রহমত ও দয়ার শিক্ষা দেবেন, যদি তিনি নিজে ক্লাসের যথাযথ হক আদায় না করে প্রাইভেট ও কোচিং-এর মাধ্যমে ছাত্রদের কাছ থেকে টাকা লুফে নেন! এমন শিক্ষক কীভাবে নির্মোহ থাকা ও আমানতদার হওয়ার শিক্ষা দেবেন? যিনি নিজে ক্লাসের হক আদায় করেন না; বরং ক্লাস ফাঁকি দিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন বা ঘুমিয়ে থাকেন!!
কোনো প্রশাসন বা নিরাপত্তাবাহিনীর পক্ষে যুবসমাজকে কোমলতা শিক্ষা দেওয়া কিংবা সন্ত্রাস ও জঙ্গি-তৎপরতা থেকে বিরত রাখা সম্ভব নয়, যদি খোদ প্রশাসন কিংবা নিরাপত্তাবাহিনী দুর্নীতিমুক্ত না হয়।
সুতরাং আদর্শবান ব্যক্তি ব্যতীত তরবিয়ত ও প্রতিপালন কীভাবে সম্ভব বলুন?! আজ মুসলিম যুবসমাজ অধিকাংশ স্থানে আদর্শবান ব্যক্তির অভাবে ভুগছে। আজ যুবসমাজ কাকে আদর্শব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করবে? কে সেই যোগ্য আদর্শবান নেতা?
আমরা নিজেদের প্রশ্ন করি এবং আপন সন্তান, আপন ভাই- এমনকি নিজের জন্য অনুসরণীয় ব্যক্তি নির্বাচন করি। কে আপনার, আপনার সন্তানের আদর্শ?!
কেনো বেশিরভাগ যুবক অশ্লীল গায়কদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে? যারা পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের সাথে বেশি ওঠাবসা করে।
কেউ কেউ তো আবার খেলোয়াড়দের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে, যারা নিজেদের জীবন-যৌবন খেল তামাশার পেছনে কাটিয়ে দেয়। তা ছাড়া অধিকাংশ আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় অমুসলিম হয়ে থাকে। এরা মুসলিম যুবসমাজের স্বপ্নের মানুষে পরিণত হয়- বড়ই হাস্যকর বিষয়! ভাবতে অবাক লাগে, আজ মুসলিম যুবসমাজ খেলোয়াড় হওয়ার নেশায় মত্ত।
কেউ কেউ তো ধনাঢ্যবান ব্যক্তিদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে, যারা দেশ-জাতির অর্থ-সম্পদ লুট করে ধনকুবের হয়েছে, অথবা ঘুষখোরদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে, যারা জাতির কাঁধে ছুরি রেখে সমাজসেবক সেজেছে।
কেউ কেউ তো মার্ক্সবাদী অথবা নাস্তিক কিংবা অশ্লীল সাহিত্যিকদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। কেউ আবার শীয়া, ইহুদী, খ্রিস্টান, হিন্দু তথা অমুসলিমদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু আফসোস আর আক্ষেপের বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে এমন মুসলিম-সন্তানের সংখ্যা খুবই কম! অথচ আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে পরিষ্কার বলেছেন-
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا. (الأحزاب)
'তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মাঝে উত্তম আদর্শ।[22]
আমাদের প্রত্যেকের উচিত, মুসলিম-যুবকদের স্পষ্ট ভাষায় এই প্রশ্ন করা, তোমার আদর্শ কে? তুমি কাকে অনুসরণ করো?
হে সমাজের অভিভাবকবৃন্দ, হে সমাজের কাণ্ডারিগণ, হে শিক্ষকবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করুন। ক্লাসরুমে, লাইব্রেরিতে, রাস্তা-ঘাটে, কফি হাউজে, ক্যান্টিনে যে সকল ছাত্রকে পাবেন, তাদের জিজ্ঞাসা করুন, কে তোমাদের আদর্শ? কাকে তোমরা অনুসরণ করো?
আল্লাহর শপথ! তাহলেই আমরা দেখতে পাব, আমাদের যুবসমাজের ক'জন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে?
আমাদের ক'জন যুবক যুবাইর, তলহা, সা'দ বা আরকাম রা. কে অনুসরণ করে? আর কতজন গায়ক, খেলোয়াড় ও সাহিত্যিকদের আদর্শ মানে!! এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে আমাদের সামনে সমাজের প্রকৃত অবস্থা ফুটে উঠবে।
যে যুবক রাস্তার পাশ দিয়ে বেগানা মেয়ের হাত ধরে হাঁটে, তার পক্ষে এ কথা বলা সম্ভব নয় যে, আমার আদর্শ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!? সিগারেট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকের পক্ষে বুক টান করে এ কথা বলা সম্ভব নয় যে, আমার আদর্শ জনাব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
আমরা কি আমাদের সন্তানদের স্বপ্নের মানুষদের কথা ভেবে দেখেছি? ভেবে দেখেছি, তারা কাদের অনুসরণ করে? আর কাকে বা কাদের অনুসরণ করা দরকার ছিল?
আমি যুবক ভাইদের নির্দোষ বলছি না। তাদের দায়িত্বমুক্তও মনে করছি না। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে নেই বলে তাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না- এমন নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ পরিপূর্ণরূপে সংরক্ষণ করেছেন। পাশাপাশি দ্বীনের এমন অসংখ্য দায়ী ও খাদেম সৃষ্টি করেছেন, যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনচরিত আমাদের সামনে বর্ণনা করেন। যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মপন্থা, পছন্দ-অপছন্দ, তথা গোটা-জীবনকে আমাদের সামনে কাজে-কর্মে, লিখনী-বক্তৃতায় ফুটিয়ে তোলেন। হ্যাঁ! অনেক সময় তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না বটে, তবে তারা নিজেদের পার্থিব-স্বার্থ ত্যাগ করে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে গোটা দুনিয়ায়, পৃথিবীর আনাচে-কানাচে, শহরে-বন্দরে, মসজিদে-মাদরাসায়, সভা-সেমিনারে তথা সর্বত্রই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সীরাত আলোচনা করেন। শুধু প্রয়োজন হলো, তাদের কাছ থেকে যুবসমাজের শিক্ষা গ্রহণ করা।
বর্তমানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে না পারার কোনো কারণ নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহ সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শ সম্পর্কে অবগতি লাভ করা খুবই সহজ। বইপত্র, অডিও-রেকর্ডিং, কম্পিউটার-ইন্টারনেট তথা আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি তা আরও সহজ করে দিয়েছে। ইলমী বৈঠকের সংখ্যাও কম নয়। এখন ওলামা-মাশায়েখের সান্নিধ্যে যাওয়াও খুব সহজ। কাজটা প্রথম পর্যায়ে কঠিন হলেও শুরু করুন, দেখবেন, মুষলধারে বরকত নাযিল শুরু হবে।
ইসলামের ইতিহাস নেক-সৎ-যোগ্য-আদর্শবান অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে ভরপুর, শুধু কাঙ্ক্ষিত মহামানবকে ইতিহাসের হাজার হাজার পৃষ্ঠা থেকে খুঁজে বের করে নিতে হবে।
অনুরূপ বর্তমান পৃথিবীও এমন মহান ব্যক্তিত্ব থেকে শূন্য নয়, যারা বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতেও জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে ইসলামকে আঁকড়ে ধরে আছেন। যাদের মাঝে রয়েছে মুসলিম যুবসমাজের জন্য উত্তম আদর্শ। তারা শুধু শহর বা নগরে নন; বরং তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন পৃথিবীর সর্বত্র। আল্লাহ তা'আলার অশেষ অনুগ্রহে তাদের সংখ্যা অনেক। সীমিত কিছু বিষয়ে তারা অনুসরণীয় তা নয়, বরং দাওয়াত ও তাবলীগ, চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রকৌশলবিদ্যা, গণিত, রসায়ন, কৃষিশিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি তথা জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে ছোট-বড়, পুরুষ-মহিলা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলের জন্য অনুসরণীয়।
যোগ্য আদর্শ- যারা শত বিপদেও দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে থাকেন, আল্লাহর বিধানের খেলাফ করেন না- ইসলাম কখনো এমন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব থেকে শূন্য হবে না। মুসলিম উম্মাহর মাঝ থেকে কখনো কল্যাণ নিঃশেষ হয়ে যাবে না। কেয়ামত অবধি এমন মহামানব মুসলিম জাতির মাঝে উপস্থিত থাকবেন। তবে তাদের খুঁজে পাওয়ার জন্য শর্ত হলো, সঠিক স্থানে সঠিক পন্থায় তাদের অনুসন্ধান করা।
যাকে আপনি নিজের আদর্শ মানবেন, তার সামাজিক অবস্থান, পদ-পদবি, আর্থিক সচ্ছলতা, প্রসিদ্ধি থাকা জরুরি নয়; বরং দেখতে হবে ঈমান-আমল, আখলাক-চরিত্র, দ্বীনদারিতে তিনি উচ্চ স্তরের কি না?
আমরা এতক্ষণ ধরে যা আলোচনা করলাম তথা 'প্রত্যেক যুবকের জন্য একজন মুরুব্বি আবশ্যক' এটি যুবকসমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি তাদের জীবনকে সুন্দরতম ও স্বর্গীয় করার জন্য একটি মৌলিক ও বুনিয়াদি বিষয়।
এ পর্যন্ত আমরা যে সকল সাহাবায়ে কেরام ও তৎপরবর্তী মহামনীষীদের আলোচনা করেছি, তারা সবাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে কথা-বার্তা, চাল-চলন, কাজ-কর্ম তথা জীবনের প্রতিটি বিষয়ে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ অনুসন্ধান করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন বিশেষ আদর্শ। এ ছাড়াও সকলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত নিজ যুগের আরো একজন মহামনীষীকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যারা উন্নতি-অগ্রগতির পথে তাদের সহযোগী ছিলেন। যেমন হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. কে দেখাশুনা করেছিলেন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা রা.। আর যায়েদ ইবনে হারেসা রা. কে প্রতিপালন করেছিলেন হযরত আননাওয়ার বিনতে মালেক রা.। হযরত মু'আয ইবনে আমর ইবনে জামুহ রা.-এর মুরুব্বি ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবী আমর ইবনে জামুহ রা.। এভাবেই এ সকল মহামনীষী নিজ যুগের একজন মুরুব্বির বিশেষ যত্নে বেড়ে উঠেছিলেন। যারা তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির পথে সহযোগী ছিলেন। এই হলো তাদের জীবনের সফলতার রাজপথ- বর্তমানেও এর বিকল্প নেই।
সুতরাং হে মুসলিম যুবসমাজ, কোনো চিন্তা-ভাবনা, যাচাই-বাছাই ছাড়াই যেকোনো মুরুব্বির পিছনে দৌড়াবেন না। কারণ, আপনার মুরুব্বি কেবল আপনার দুনিয়ার ভাগ্য নির্ধারক নন, আখেরাতেরও ভাগ্য নির্ধারক। এমনকি দুনিয়ার চেয়ে আখেরাত বিষয়ে মুরুব্বির প্রভাব বেশি কার্যকর হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে হেদায়েতের পথে পরিচালিত করুন। আমীন।
টিকাঃ
২১. সূরা সফ (৬১): ৩
২২. সূরা আহযাব (৩৩) : ২১