📄 কারণ : ১
ইসলামী প্রতিপালন নীতি বর্জন
এটি বর্তমান যুবসমাজের অধঃপতনের অন্যতম কারণ। ইসলামী অনুশাসন ও আদর্শে লালিত-পালিত না হলে যায়েদ ইবনে সাবেত, উসামা ইবনে যায়েদ, মু'আয ইবনে জাবাল, মু'আয ইবনে আমর ইবনে জামুহ, মু'আয ইবনে আফরা রা. কীভাবে বিকশিত হতেন?! কে তাদের চিনত, জানত?
ইসলামই এ সকল বীর ও ক্ষণজন্মা মহামনীষীদের তৈরি করেছে। ইসলামই তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছে। ইসলামই তাদের সম্ভাবনাকে জাতির খেদমতে নিয়োজিত করেছে। দুনিয়াবাসীর কল্যাণে তাদের পরিচালিত করেছে।
আজ জাতি যুবসমাজের উন্নতি ও বিকাশের জন্য ইসলামী নীতিমালা উপেক্ষা করে শত শত নীতিমালা প্রণয়ন করছে। ফলে জাতি সফলতার রহস্য হারিয়ে ফেলছে, হেদায়েত ও সংশোধনের পথে পরিচালিত হচ্ছে না, সংকীর্ণতা ও হতাশার জীবনযাপন করছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنْ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكاً. (طه)
'যে আমার স্মরণে বিমুখ হবে, সে অবশ্যই সংকুচিত জীবনযাপন করবে।'[9]
যুবসমাজের মাঝে ইসলামী প্রতিপালন বাস্তবায়নের জন্য শর্ত হলো, প্রত্যেক যুবকের একজন দক্ষ আলেমে দ্বীন মুরুব্বি হিসেবে থাকা। মুরুব্বিহীন ধ্যানমগ্ন সময় কাটালেও যুবসমাজের মাঝে পরিবর্তন আসবে না। পরিবর্তনের জন্য দরকার দক্ষ মুরুব্বির নিয়মতান্ত্রিক প্রতিপালন। কাজেই যুবসমাজ মুরুব্বিশূন্য হয়ে গেলে তারা ভুল পথে পরিচালিত হবে, নির্মাণ ও সংস্কারমূলক কাজ বাদ দিয়ে ধ্বংস ও অপসংস্কৃতির পথে ধাবিত হবে।
দ্বীনিজ্ঞান সম্পন্ন একজন মুরুব্বীকর্তৃক নির্দেশিত প্রতিপালনই মানুষকে কুরআন-সুন্নাহ অভিমুখী করে তোলে। আফসোস! আজ যুবসমাজ মুরব্বিশূন্য হওয়ার ফলে তারা কুরআন-সুন্নাহ থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে দ্বীন যাদের প্রধান আদর্শ হওয়ার কথা ছিল, তাদের কাছে আজ তা হেলাফেলার বস্তু। দ্বীন যেন তাদের কাছে আদর্শলিপি বইয়ের মতো ভাসাভাসা কিছু নিয়ম-কানুন, যা তারা পাঠ্যপুস্তকে পাঠ করে।
বর্তমান মুসলিম যুবসমাজের মাঝে এমন কিছু বস্তুর দিকে নিজেদের সম্বোধিত করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যে বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা কোনো দলিল নাযিল করেননি এবং মুসলিম উম্মাহর সোনালি যুগে মহামনীষীগণের মাঝেও যে বিষয়ের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তারা কেউ কেউ নিজেদের আরব গোত্রের দিকে সম্বোধন করে নিজেদের বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকা মুসলিম ভ্রাতৃত্ব থেকে আলাদা করে ফেলে। তারা কেউ নিজেকে ফেরাউনী, কেউ ব্যবিলনী, কেউ ফিনিশীয়, কেউ পারসী, কেউ তুর্কী ইত্যাদি ভাবে প্রকাশ করে। ফলে তারা গোটা জাতিকে প্রকারান্তরে দ্বীন ইসলাম থেকে আলাদা করে ফেলে। কারও কারও দুঃসাহস এত বেশি যে, নিজেকে কাফের, মুশরিক বা নাস্তিক, মুরতাদ গোত্রের সঙ্গে সম্বন্ধ করে। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে একটু বলবেন- যুবকসমাজ কাফের মুশরিক বা নাস্তিক মুরতাদ গোত্রের নামে সম্বোধিত ব্যক্তির সাথে কীরূপ আচরণ করবে? যখন সে কুরআনের পাতায় পাতায় ফেরাউন, তার সেনাবাহিনী ও সম্প্রদায়ের প্রতি অভিশাপ দেখতে পাবে, আবার বাস্তব জীবনে এমন লোকের নামে সম্বোধিত ব্যক্তির গলায় ফুলের মালা দেখতে পাবে! এমতাবস্থায় যুবসমাজের মাঝে বিশৃঙ্খলা ব্যতীত আর কী দেখবেন বলুন? দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তাকে আঁকড়ে ধরবে। সে কাকে সত্যবাদী মনে করবে? কার অনুসরণ করবে? বুঝে উঠতে পারবে না।
আজ আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থা, স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-ভার্সিটি তথা সব শিক্ষাঙ্গন এখলাস ও লিল্লাহিয়াত মুক্ত হয়ে পড়েছে। ছাত্র-উস্তাজের মাঝে মহব্বত-ভালোবাসার সম্পর্ক নেই। বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা আক্রান্ত।
সবকিছুর ওপর দ্বীনকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা আজ নেই বললেই চলে। জিহাদের আয়াতসমূহ যেন আসমানে তুলে নেওয়া হয়েছে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেন আজ ধুলায় ধূসরিত।
আজ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কে এমন মনীষী আছেন, যিনি যুবসমাজকে আখেরাতের পথে আহ্বান করবেন? কেয়ামত দিবসে আল্লাহর দরবারে হিসাব-নিকাশের ভয়াবহতা বোঝাবেন? আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে কি আজ এমন খোদাভীরু বুযুর্গ আছেন, যিনি যুবকদের ডেকে বলবেন, আমল পরিশুদ্ধ করো, পড়াশোনার প্রতি মনোনিবেশ করো? কারণ, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের দেখছেন। তিনি তোমাদের প্রচেষ্টা অনুযায়ী তোমাদের প্রতিদান দিবেন। না কি শিক্ষাঙ্গনগুলো এমন মানুষে ভরপুর, যারা ছাত্রদের বলেন, শুনে রাখো! যারা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করবে, কাঙ্ক্ষিত মানদণ্ডে নির্বাচিত হবে, তারা দুনিয়ায় উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে। তার টাকা-পয়সা, ইজ্জত-সম্মান কোনো কিছুর অভাব থাকবে না। অন্যদের থেকে সে অনেক সময় অবসরও কাটাতে পারবে। কারণ, তার গাড়ি থাকবে, বাড়ি থাকবে, বেতন-ভাতা হবে আকর্ষণীয়!!
হে মুসলিম যুবসমাজ, এ দুই শ্রেণির মাঝে কত ব্যবধান! এক শ্রেণি আখেরাতের জন্য কাজ করে, আরেক শ্রেণি পার্থিব স্বার্থে কাজ করে।
এর অর্থ এই নয়, আমরা আমাদের যুবসমাজকে দুনিয়া বর্জনের শিক্ষা দেব বা তাদের উপার্জন-বিমুখ করে গড়ে তুলব। উদ্দেশ্য হলো, নিয়ত বিশুদ্ধ করা ও সঠিক পথে পরিচালিত করা। তাহলে তাদের যাবতীয় কাজকর্ম তথা আলোচনা-পর্যালোচনা, জ্ঞান-বিদ্যা, আখলাক-চরিত্র, মুআমালা-লেনদেন, আমল-ইবাদত, অর্জন-উপার্জন- সবই নেককর্ম হিসেবে গণ্য হবে।
আমরা চাই, শিক্ষকমণ্ডলী ছাত্রদের এই শিক্ষা দেবেন যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাকে সব সময় দেখছেন। তিনি চিরঞ্জীব- কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না। চিরস্থায়ী- কখনো বিস্মৃত হবেন না। তিনি সবকিছু জানেন- তার কাছে কোনো কিছু গোপন থাকে না। তাহলে যুবসমাজ সব সময় আল্লাহকে স্মরণ করবে। তার সন্তুষ্টি কামনা করবে। ভেতর-বাহির সংশোধনের চেষ্টা করবে। অলসতা-অবহেলা ঝেড়ে ফেলে নেক আমলের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করবে।
ইসলামী তরবিয়ত বা প্রতিপালন ও ইসলামী আদর্শ নির্দিষ্ট কোনো স্থান বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির মাঝে সীমিত নয়। বরং এর ক্ষেত্র হলো গোটা মুসলিম উম্মাহ। এটি রাজা-প্রজা, শাসক-শাসিত, ঘর-বাড়ি, স্কুল-মাদরাসা তথা সর্বত্র সবার জন্য পালনীয়। মোটকথা, অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে, উম্মতের দরদ রয়েছে, মর্যাদা ও প্রাপ্তির উচ্চাসনে আরোহণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ এই নয় যে, কেউ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে অন্যরাও অবহেলা করবে।
সুতরাং যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পাঠ্যসূচিকে ইসলামমুক্ত রাখা হয়, তাতে দ্বীনের প্রাণ না থাকে, এটি অভিভাবক ও মুরুব্বিদের জন্য মোটেও কল্যাণকর নয়। অভিভাবক-শ্রেণির প্রতি আমার আকুল আবেদন- সন্তানকে ইসলামের সরল-সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করবেন না। বাবা-মা, ভাই-বোন, শিক্ষক-উস্তাজ, পাড়া-প্রতিবেশী তথা অভিভাবকমাত্র সকলের কর্তব্য হলো, অধীনস্থ যুবকদের অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা, দ্বীন পালনের গুরুত্ব, জান্নাতের আশা ও জাহান্নামের ভয় ঢেলে দেওয়া। কেবল যৌবনে উপনীত হওয়ার পর তাদের এমন শিক্ষা দিতে হবে এমন নয়, বরং এরও বহু পূর্ব থেকে জীবনের প্রতিটি স্তরে তাদের অন্তরে এসব বিষয়ের বীজ বপন করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তানের ডান কানে আজান ও বাম কানে ইক্বামত দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন! এ কথা শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে, জন্ম থেকে মৃত্যুপর্যন্ত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত শিক্ষাক্ষেত্র। গোটা জীবন একটি বিদ্যানিকেতন। মানবজীবনের প্রতিটি স্তরে ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়িত করতে হবে। এভাবে সন্তান লালিত-পালিত হলে তাদের জীবন হবে নিষ্পাপ-নিষ্কলুষ। আমরা জীবনে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো অবৈধ কাজ করতে চাইলেও যেন নিজেকে কমপক্ষে একশো বার জিজ্ঞাসা করি যে, এতে আমার দয়াময় স্রষ্টা আল্লাহ কি সন্তুষ্ট থাকবেন না নারাজ হবেন?
সুতরাং এ কথার অজুহাত দেখিয়ে কোনো অভিভাবক ছাড় পাবেন না যে, তাদের সিলেবাসে তো ইসলামী আদর্শ শিক্ষা দেওয়া হয় না। তাই তাদের সন্তানেরা ইসলামী আদর্শে আদর্শবান হতে পারেনি। অথবা কেউ এই অজুহাতের ছলে দায়িত্বমুক্ত হতে পারবেন না যে, তারা দীর্ঘ এক বছর ব্যয় করে যা অর্জন করে, অন্যরা তা একদিনে ধ্বংস করে দেয়। সন্তানদের ইসলামী আদর্শ শিক্ষা না দেওয়ার ক্ষেত্রে এগুলো কোনো গ্রহণযোগ্য আপত্তি নয়। আমি স্বীকার করছি, কাজটি অনেক কঠিন; তবে অসম্ভব নয়। আমরা বিশ্বাস করি, যে ব্যক্তি ইখলাসের সাথে চেষ্টা করবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অবশ্যই তাকে তৌফিক দান করবেন এবং তার জন্য আত্মশুদ্ধি ও আমলের যাবতীয় দ্বার উন্মোচন করে দেবেন।
এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। তা হলো, আমি কিন্তু যুবসমাজকে দায়িত্বমুক্ত ঘোষণা করিনি।
ইসলামের আদর্শকে জীবনে বাস্তবায়িত করার পথে যত বাধা-বিপত্তি, ঘাত-প্রতিঘাত আসুক না কেন, কেয়ামতের দিন প্রত্যেককেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। প্রত্যেককে সেদিন যৌবনকালের হিসাব দিতে হবে। তাই কোনো বিবেকবান যুবকের জন্য বেপরোয়া জীবনযাপন করা উচিত নয়।
এ কথা বললে চলবে না, সবাই তো এমন করে, সুতরাং আমিও একটু করে দেখি। সবাই তো কম-বেশি আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, সুতরাং আমিও একটু অবাধ্য হই।
আবার এমনও নয় যে, যারা ইসলামবিরোধী জীবনবিধান প্রণয়ন করছে, তারা যুবসমাজের ঈমান-আমলের ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। সুতরাং সার্বিক বিষয়টি কঠিন মনে করে সবদিক থেকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নিজে অপরাধ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। আবার অন্যের অপরাধপ্রবণতায় প্রভাবিত হওয়া থেকেও দূরে থাকতে হবে।
হে যুবক, নিজেকে প্রশ্ন করুন এবং নিজের মাঝে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করুন। প্রত্যেক যুবকেরই উচিত নিজেকে এমন প্রশ্ন করা। প্রশ্নটি হলো- আল্লাহ তা'আলা কেন আমাকে সৃষ্টি করেছেন?
প্রশ্নটি একবার দুইবার তিনবার করুন। আল্লাহ তা'আলা কেন আমাকে সৃষ্টি করেছেন?
এটি আপনার জীবনের সাধারণ কোনো বিষয় নয়, বরং এটি আপনার জীবনের চিরস্থায়ী সফলতা ও ব্যর্থতার বিষয়। এর ওপরই আপনার দুনিয়া-আখেরাতের সফলতা নির্ভরশীল।
অধিকাংশ যুবক নিজেকে এই প্রশ্ন করে না। আর এ কারণেই তারা জীবন ধ্বংস করতে বসে।
নিশ্চয়ই মানব-সৃষ্টির একটি মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
اَفَحَسِبْتُمْ اَنَّمَا خَلَقْنٰكُمْ عَبَثًا وَّ اَنَّكُمْ اِلَيْنَا لَا تُرْجَعُوْنَ. (المؤمنون)
'তোমরা কি মনে করো যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি, আর তোমরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না?'[10]
কেন আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে সৃষ্টি করলেন? আল্লাহ তা'আলা কি আমাদেরকে আনন্দ-ফুর্তি ও ভোগ-বিলাসের জন্য সৃষ্টি করেছেন?
আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের ধন-সম্পদ অর্জন করার জন্য সৃষ্টি করেছেন? আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের বীরত্ব প্রদর্শন বা মল্লযুদ্ধ করার জন্য সৃষ্টি করেছেন?
আল্লাহ তা'আলা কি আমাদেরকে তার অবাধ্যতা, বিরোধিতা ও পিঠপ্রদর্শন করার জন্য সৃষ্টি করেছেন?
বিজ্ঞ স্রষ্টার সৃষ্টি এসবের কোনো একটির জন্যও হতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। বিষয়টি আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ. (الذاريات)
'আমি জিন ও মানবজাতিকে আমার ইবাদতের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি।'[11]
সুতরাং উদ্দেশ্য হাসিল করতে না পারলে এ জীবন তো খেল-তামাশার বস্তু ভিন্ন কিছু নয়। লক্ষ্যহীন জীবনের কোনো মূল্য নেই।
প্রশ্ন হলো, ইবাদতের অর্থ কী? ইবাদত কাকে বলে?
ইবাদতের প্রকৃত অর্থ হলো, আল্লাহর প্রতি নিজের পূর্ণ ভালোবাসা নিবেদন করতঃ পূর্ণাঙ্গরূপে আত্মসমর্পণ করা।
আল্লাহর সামনে পূর্ণ নত হওয়া এবং তার প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা নিবেদন করার নাম হলো ইবাদত।
আকীদা-বিশ্বাসে, চিহ্ন-নিদর্শনে, আখলাক-চরিত্রে, মুআমালা-মুআশারায় তথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যৌবনে-বৃদ্ধকালে, সুস্থতা-অসুস্থতায়, যুদ্ধ-বিগ্রহে, শান্তি-সংঘর্ষে, সফরে-অবস্থানকালে তথা জীবনের প্রতিটি স্তরে নিজেকে আল্লাহর সামনে পূর্ণ সঁপে দেওয়া এবং নিজের সবটুকু ভালোবাসা তাকে নিবেদন করার নামই হলো ইবাদত।
কিছু সুবিধাবাদী ও অধিকাংশ সাধারণ মুসলমানের ধারণামতে ইবাদত হলো শুধুমাত্র নামায, রোজা, হজ্ব ও যাকাত- বিষয়টি এমন নয়।
আর এখান থেকেই তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির উদয় হয়েছে যে, ইবাদতের উপযুক্ত স্থান কেবল মসজিদ- কখনো কখনো ঘর। আর অবশিষ্ট জীবন তোমার। সেখানে তোমার যা ইচ্ছা করবে। রব্বুল আলামীন যা চান, তা নয়। বলুন হে যুবসমাজ, এটি কি মেনে নেওয়ার মতো কোনো কথা? আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের এই জন্য সৃষ্টি করেছেন যে, আমরা আমাদের সময় থেকে কিছু অংশ দ্রুত ইবাদত করে কাটিয়ে দেব। কতিপয় যিকির-আযকার করব। আর বাকি সময় নিজের ইচ্ছে মতো-আল্লাহর ইচ্ছার পরোয়া না করে- কাটিয়ে দেব?
আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনুল কারীমে বলেন-
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ. (الزلزال)
'যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ ও সৎকর্ম করবে সে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলেও সে তা দেখতে পাবে।[12] সুতরাং প্রত্যেকের জীবনের অণু পরিমাণ কর্মেরও পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হবে। ছোট-বড় সবকিছু সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কেয়ামত-দিবসে এই ভয়াবহ হিসাব-নিকাশ দেখে মানুষ বলবে-
مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا. (الكهف)
'এটি কেমন কিতাব (আমলনামা), ছোট বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি। বরং সবকিছু হিসাব করে রেখেছে।[13] সুতরাং দুনিয়ার প্রতিটি বস্তুর এবং মানবজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সম্পর্কে সবিস্তার প্রশ্নোত্তর হবে। এ কারণেই আমি ইবাদতের প্রকৃত অর্থ করেছি, পূর্ণ ভালোবাসা নিয়ে আল্লাহর সামনে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করা। যা নিম্নোক্ত আয়াতের আলোকে প্রতিভাত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. (الأنعام)
'(হে নবী, আপনি বলুন, আমার নামায আমার কুরবানী আমার জীবন আমার মৃত্যু (সবই) আল্লাহর জন্যে।'[14]
অর্থাৎ আমাদের জীবনের সবকিছু আল্লাহ তা'আলার জন্য। আমাদের প্রতিটি নড়াচড়াও আল্লাহর জন্য। আমৃত্যু এই চেতনা নিয়ে জীবন কাটাতে হবে। এই অবস্থায় মৃত্যু হলে তা আল্লাহর পথের মৃত্যু বলে বিবেচিত হবে।
এভাবে জীবন কাটালে জীবন হবে আল্লাহর পথে। মৃত্যুও হবে আল্লাহর পথে। সুতরাং আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। আমাদের নামায-রোজা আল্লাহর জন্য, চাকরি-বাকরি আল্লাহর জন্য, বেতন-বোনাস আল্লাহর জন্য, ধন-সম্পত্তি, আয়- উপার্জন, রিযিক-দৌলত আল্লাহর জন্য, বাবা-মা, সন্তান-সন্ততি, ছোট-বড়, ভাই-বোন, ছাত্র-শিক্ষক, চেনা-অচেনা সবার সঙ্গে আমাদের আচরণ হবে আল্লাহর জন্য। আমরা আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসব। আবার ঘৃণা করলেও আল্লাহর জন্য করব। এমনকি আনন্দ-ফুর্তি, আরাম-আয়েশও হবে আল্লাহর জন্য।
এ বিষয়ে অগণিত আয়াত-হাদীস আছে। কারণ, এতে গোটা মানবজীবন ও পূর্ণ দ্বীন ইসলাম নিহিত। এটি এমন এক ব্যাখ্যা, যার মাধ্যমে মানবজাতি মুক্তি পেতে পারে। অন্যথায় ধ্বংসের কালো থাবা থেকে রক্ষা পাওয়া খুব কঠিন। সুতরাং কেয়ামত দিবসে সবাইকে হিসাবের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। সবার হিসাব আলাদা আলাদা হবে। কাউকে অন্যের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে না। আবার আপনার আমল সম্পর্কে অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করা হবে না। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ. (المدثر)
'প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ।'[15]
কেয়ামত দিবসে কোনো একজন ব্যক্তিও ভালো-মন্দ কোনো কাজে আপনার পাশে এসে দাঁড়াবে না। আল্লাহ তা'আলা বলবেন-
وَلَقَدْ جِئْتُمُونَا فُرَادَى كَمَا خَلَقْنَاكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ. (الأنعام)
'তোমরা আমার কাছে আজ একাকী এসেছ, যেভাবে আমি তোমাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম।'[16]
সুতরাং আপনার জীবনের একটি মুহূর্ত যদি আল্লাহর ধ্যানমগ্নতা ছাড়া অতিবাহিত হয়, সেই মুহূর্তের হিসাব অবশ্যই আপনাকে দিতে হবে। অন্য কেউ দেবে না। আপনার বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক-অভিভাবক, কাছের-দূরের কেউ আপনার সামান্য বোঝা বহন করবে না। মনে রাখবেন, কিছুতেই এদের কেউ আপনার সামান্য বোঝা বহন করবে না। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا اتَّبِعُوا سَبِيلَنَا وَلْنَحْمِلْ خَطَايَاكُمْ وَمَا هُمْ بِحَامِلِينَ مِنْ خَطَايَاهُمْ مِنْ شَيْءٍ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ. (العنكبوت)
'কাফেররা মুমিনদের বলে, আমাদের পথ অনুসরণ করো, তাহলে আমরা তোমাদের পাপভার বহন করব। কিন্তু তারা তো তাদের পাপভারের কিছুই বহন করবে না। তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।'[17]
ফেতনাবাজ পাপী কাফের মুশরিকরা কখনো তাদের সামান্য বোঝা বহন করবে না। উল্টো তাদের ফেতনায় নিপতিত করবে। অণু পরিমাণ বোঝাও তারা বহন করবে না। প্রত্যেকে নিজ নিজ হিসাব প্রদানে ব্যস্ত থাকবে। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে বিবেক-বুদ্ধি, ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন। আপনার সামনে কল্যাণ- অকল্যাণের পথ খুলে দিয়েছেন। হেদায়েত ও গোমরাহীর পথ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
وَهَدَيْنَاهُ النَّجْدَيْنِ. (البلد)
'আমি তাকে দুটি পথ দেখিয়েছি।[18]
দুটি পথ তথা ভালো-মন্দ, কল্যাণ ও অকল্যাণের পথ।
হে মুসলিম যুবসমাজ, আমি যে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলার ইচ্ছা করেছিলাম, তা এখানেই শেষ।
একটু ভেবে দেখুন, আপনার যৌবনের বছরগুলো যদি এভাবে শেষ হয়ে যায়, আপনি আল্লাহর পথ থেকে দূরেই সরে থাকেন, অপরাধকর্মে ডুবে থাকেন, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনায় বেপরোয়া জীবন কাটান, জীবনের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য না থাকে, এভাবে যদি যৌবন শেষ হয়ে যায়, এরপর আল্লাহ তা'আলা আপনাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনেন, তাহলে আপনার জীবনের হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণোজ্জ্বল যৌবনকাল কে ফিরিয়ে দেবে?
আপনার জীবনের এক-তৃতীয়াংশ বা অর্ধজীবন বা কম বেশি হারিয়ে যাওয়া অতীতকে ফিরিয়ে দেবে?
এটা তো আল্লাহ তা'আলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, অতীত কখনো ফিরে আসে না।
তাহলে কেন আপনি আপনার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাবেন না? কেন আপনার অস্তিত্বের প্রতিটি সেকেন্ডকে কর্মময় করে তুলবেন না?!
হযরত হাকেম রহ. তার সহীহ গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
اغتنم خمسا قبل خمس شبابك قبل هرمك وصحتك قبل سقمك وغناءك قبل فقرك وفراغك قبل شغلك وحياتك قبل موتك. (رواه الحاكم)
'পাঁচটি বস্তুর অস্তিত্বকে পাঁচটি বস্তুতে হারিয়ে যাওয়ার পূর্বে গনিমত মনে করবে— ১. বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে ২. রোগ-শোকের পূর্বে সুস্থতাকে ৩. দারিদ্র্যের পূর্বে সচ্ছলতাকে ৪. ব্যস্ততার পূর্বে অবসর সময়কে এবং ৫. মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে।'[19]
সমৃদ্ধ অর্থবহ চমৎকার একটি হাদীস। হাদীসের পরিভাষায় এটি 'জাওয়ামিউল কালিম' [শব্দ কম অর্থ বেশি]-এর অন্তর্ভুক্ত। আমাদের সকলেরই হাদীসটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা দরকার।
অনেক সময় মানুষ প্রকৃত বিষয় বুঝে উঠতে পারে না। ফলে জীবনের মূল লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে। শেষ মুহূর্তে যখন আফসোস আর আক্ষেপের কোনো অন্ত থাকে না, দেয়ালে হাত চাপড়েও কোনো লাভ হয় না, তখন বুঝে আসে। চল্লিশ বা পঞ্চাশ ঊর্ধ্ব বয়সে যৌবনের মূল্য বুঝতে পারে।
অসুস্থ ব্যক্তি তখনই সুস্থতার মর্ম উপলব্ধি করতে পারে, যখন বিছানা তার সঙ্গী হয়।
ধনী ব্যক্তি সম্পদ হারিয়ে ফেললে কিংবা দরিদ্র হয়ে পড়লে সম্পদের মূল্য বুঝতে পারে।
ধীরে ধীরে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর যেতে যেতে মানুষ যখন জীবন হারাতে বসে তখন সময়ের মূল্য বুঝতে পারে।
সবশেষে মানুষ জীবনের মূল্য, গুরুত্ব ও তাৎপর্য তখনই বুঝতে পারে, যখন সে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে বা কবরে প্রশ্নোত্তরের মুখোমুখি হয়!!
হে আমার যুবক যুবতী ভাই বোনেরা, যৌবন হারিয়ে গেলে কে আপনাদের তা ফিরিয়ে দেবে? আর মৃত্যু তো হঠাৎ যেকোনো মুহূর্তে চলে আসতে পারে। মৃত্যু কাউকে ছাড়বে না। বয়োবৃদ্ধ মারা যাবে, অনুরূপ টগবগে যুবকও মারা যাবে। অসুস্থ ব্যক্তি মারা যাবে, অনুরূপ সুস্থ ব্যক্তিও মারা যাবে। মৃত্যুর হাত থেকে কেউ রেহাই পাবে না। তখন লজ্জা ও অনুশোচনা করে কোনো লাভ হবে না।
হে মুসলিম যুবসমাজ, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত আহ্বানকে মনে রেখো-
اسْتَجِيبُوا لِرَبِّكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَ يَوْمٌ لَا مَرَدَّ لَهُ مِنَ اللَّهِ مَا لَكُمْ مِنْ مَلْجَإٍ يَوْمَئِذٍ وَمَا لَكُمْ مِنْ نَكِيرِ. (الشورى)
'আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই দিবস আসার পূর্বেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দাও, যা অপ্রতিরোধ্য। যেদিন তোমাদের কোনো আশ্রয়স্থল থাকবে না এবং তোমাদের জন্য তা প্রতিরোধ করারও কেউ থাকবে না।'[20]
টিকাঃ
৯. সূরা ত্বহা (২০): ১২৪
১০. সূরা মুমিনুন (২৩) : ১১৫
১১. সূরা যারিয়াত (৫১): ৫৬
১২. সূরা যিলযাল (৯৯): ৭-৮
১৩. সূরা কাহাফ (১৮): ৪৯
১৪. সূরা আন'আম (০৬): ১৬২
১৫. সূরা মুদ্দাসসির (৭৪): ৩৮
১৬. সূরা আন'আম (০৬): ৯৪
১৭. সূরা আনকাবুত (২৯): ১২
১৮. সূরা বালাদ (৯০): ১০
১৯. হাকেম: ৭৮৪৬
২০. সূরা শুরা (৪২): ৪৭
📄 কারণ : ২
যোগ্য আদর্শবান ব্যক্তির অভাব
বর্তমান মুসলিম যুবসমাজ দ্বিতীয় যে ভয়াবহ সমস্যার মুখোমুখি, তা হলো, যোগ্য আদর্শবান ব্যক্তির অভাব। আদর্শবান ব্যক্তির যোগ্য-প্রতিপালন হাজার বয়ান ও উপদেশ প্রদানের চেয়ে বহু গুণে উত্তম ও কার্যকর। হাজার জন মিলে একজনকে উপদেশ প্রদানের চেয়ে হাজার মানুষের কল্যাণে একজনের কাজ করে যাওয়া উত্তম।
যে অভিভাবকের কথা ও কাজ তার বক্তব্য ও উপদেশের বিপরীত হয়, তার প্রতিপালন ও পরিচর্যা উপকারের পরিবর্তে অপকার বয়ে আনে- যদিও তার ধারণামতে সে অভিভাবকত্ব করছে। যদিও তার বক্তব্য বিনির্মাণ ও সংস্কারমূলক হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ. (الصف)
'তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক। '[21]
বাবার পক্ষে কি সম্ভব সন্তানকে ধুমপানে বারণ করা, যদি তার নিজ হাত সিগারেটমুক্ত না হয়? এমন বাবা কীভাবে সন্তানকে প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণের নির্দেশ দেবে, যদি সে নিজেই তার প্রতিবেশীদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত থাকে? নিজের মুখ হেফাজতে না থাকলে কীভাবে সন্তানকে জিহ্বা হেফাজতের নির্দেশ দেবে? নিজে সহনশীল না হয়ে সর্বদা রাগান্বিত থাকলে সন্তানকে কীভাবে সহনশীলতার উপদেশ দেবে? সন্তানকে দানশীল হওয়ার উপদেশ দেওয়া বাবার পক্ষে তখনই মানায়, যখন সে কার্পণ্য ত্যাগ করবে।
শিক্ষক কীভাবে ছাত্রদের রহমত ও দয়ার শিক্ষা দেবেন, যদি তিনি নিজে ক্লাসের যথাযথ হক আদায় না করে প্রাইভেট ও কোচিং-এর মাধ্যমে ছাত্রদের কাছ থেকে টাকা লুফে নেন! এমন শিক্ষক কীভাবে নির্মোহ থাকা ও আমানতদার হওয়ার শিক্ষা দেবেন? যিনি নিজে ক্লাসের হক আদায় করেন না; বরং ক্লাস ফাঁকি দিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন বা ঘুমিয়ে থাকেন!!
কোনো প্রশাসন বা নিরাপত্তাবাহিনীর পক্ষে যুবসমাজকে কোমলতা শিক্ষা দেওয়া কিংবা সন্ত্রাস ও জঙ্গি-তৎপরতা থেকে বিরত রাখা সম্ভব নয়, যদি খোদ প্রশাসন কিংবা নিরাপত্তাবাহিনী দুর্নীতিমুক্ত না হয়।
সুতরাং আদর্শবান ব্যক্তি ব্যতীত তরবিয়ত ও প্রতিপালন কীভাবে সম্ভব বলুন?! আজ মুসলিম যুবসমাজ অধিকাংশ স্থানে আদর্শবান ব্যক্তির অভাবে ভুগছে। আজ যুবসমাজ কাকে আদর্শব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করবে? কে সেই যোগ্য আদর্শবান নেতা?
আমরা নিজেদের প্রশ্ন করি এবং আপন সন্তান, আপন ভাই- এমনকি নিজের জন্য অনুসরণীয় ব্যক্তি নির্বাচন করি। কে আপনার, আপনার সন্তানের আদর্শ?!
কেনো বেশিরভাগ যুবক অশ্লীল গায়কদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে? যারা পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের সাথে বেশি ওঠাবসা করে।
কেউ কেউ তো আবার খেলোয়াড়দের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে, যারা নিজেদের জীবন-যৌবন খেল তামাশার পেছনে কাটিয়ে দেয়। তা ছাড়া অধিকাংশ আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় অমুসলিম হয়ে থাকে। এরা মুসলিম যুবসমাজের স্বপ্নের মানুষে পরিণত হয়- বড়ই হাস্যকর বিষয়! ভাবতে অবাক লাগে, আজ মুসলিম যুবসমাজ খেলোয়াড় হওয়ার নেশায় মত্ত।
কেউ কেউ তো ধনাঢ্যবান ব্যক্তিদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে, যারা দেশ-জাতির অর্থ-সম্পদ লুট করে ধনকুবের হয়েছে, অথবা ঘুষখোরদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে, যারা জাতির কাঁধে ছুরি রেখে সমাজসেবক সেজেছে।
কেউ কেউ তো মার্ক্সবাদী অথবা নাস্তিক কিংবা অশ্লীল সাহিত্যিকদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। কেউ আবার শীয়া, ইহুদী, খ্রিস্টান, হিন্দু তথা অমুসলিমদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু আফসোস আর আক্ষেপের বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে এমন মুসলিম-সন্তানের সংখ্যা খুবই কম! অথচ আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে পরিষ্কার বলেছেন-
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا. (الأحزاب)
'তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মাঝে উত্তম আদর্শ।[22]
আমাদের প্রত্যেকের উচিত, মুসলিম-যুবকদের স্পষ্ট ভাষায় এই প্রশ্ন করা, তোমার আদর্শ কে? তুমি কাকে অনুসরণ করো?
হে সমাজের অভিভাবকবৃন্দ, হে সমাজের কাণ্ডারিগণ, হে শিক্ষকবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করুন। ক্লাসরুমে, লাইব্রেরিতে, রাস্তা-ঘাটে, কফি হাউজে, ক্যান্টিনে যে সকল ছাত্রকে পাবেন, তাদের জিজ্ঞাসা করুন, কে তোমাদের আদর্শ? কাকে তোমরা অনুসরণ করো?
আল্লাহর শপথ! তাহলেই আমরা দেখতে পাব, আমাদের যুবসমাজের ক'জন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে?
আমাদের ক'জন যুবক যুবাইর, তলহা, সা'দ বা আরকাম রা. কে অনুসরণ করে? আর কতজন গায়ক, খেলোয়াড় ও সাহিত্যিকদের আদর্শ মানে!! এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে আমাদের সামনে সমাজের প্রকৃত অবস্থা ফুটে উঠবে।
যে যুবক রাস্তার পাশ দিয়ে বেগানা মেয়ের হাত ধরে হাঁটে, তার পক্ষে এ কথা বলা সম্ভব নয় যে, আমার আদর্শ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!? সিগারেট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকের পক্ষে বুক টান করে এ কথা বলা সম্ভব নয় যে, আমার আদর্শ জনাব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
আমরা কি আমাদের সন্তানদের স্বপ্নের মানুষদের কথা ভেবে দেখেছি? ভেবে দেখেছি, তারা কাদের অনুসরণ করে? আর কাকে বা কাদের অনুসরণ করা দরকার ছিল?
আমি যুবক ভাইদের নির্দোষ বলছি না। তাদের দায়িত্বমুক্তও মনে করছি না। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে নেই বলে তাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না- এমন নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ পরিপূর্ণরূপে সংরক্ষণ করেছেন। পাশাপাশি দ্বীনের এমন অসংখ্য দায়ী ও খাদেম সৃষ্টি করেছেন, যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনচরিত আমাদের সামনে বর্ণনা করেন। যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মপন্থা, পছন্দ-অপছন্দ, তথা গোটা-জীবনকে আমাদের সামনে কাজে-কর্মে, লিখনী-বক্তৃতায় ফুটিয়ে তোলেন। হ্যাঁ! অনেক সময় তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না বটে, তবে তারা নিজেদের পার্থিব-স্বার্থ ত্যাগ করে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে গোটা দুনিয়ায়, পৃথিবীর আনাচে-কানাচে, শহরে-বন্দরে, মসজিদে-মাদরাসায়, সভা-সেমিনারে তথা সর্বত্রই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সীরাত আলোচনা করেন। শুধু প্রয়োজন হলো, তাদের কাছ থেকে যুবসমাজের শিক্ষা গ্রহণ করা।
বর্তমানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে না পারার কোনো কারণ নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহ সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শ সম্পর্কে অবগতি লাভ করা খুবই সহজ। বইপত্র, অডিও-রেকর্ডিং, কম্পিউটার-ইন্টারনেট তথা আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি তা আরও সহজ করে দিয়েছে। ইলমী বৈঠকের সংখ্যাও কম নয়। এখন ওলামা-মাশায়েখের সান্নিধ্যে যাওয়াও খুব সহজ। কাজটা প্রথম পর্যায়ে কঠিন হলেও শুরু করুন, দেখবেন, মুষলধারে বরকত নাযিল শুরু হবে।
ইসলামের ইতিহাস নেক-সৎ-যোগ্য-আদর্শবান অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে ভরপুর, শুধু কাঙ্ক্ষিত মহামানবকে ইতিহাসের হাজার হাজার পৃষ্ঠা থেকে খুঁজে বের করে নিতে হবে।
অনুরূপ বর্তমান পৃথিবীও এমন মহান ব্যক্তিত্ব থেকে শূন্য নয়, যারা বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতেও জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে ইসলামকে আঁকড়ে ধরে আছেন। যাদের মাঝে রয়েছে মুসলিম যুবসমাজের জন্য উত্তম আদর্শ। তারা শুধু শহর বা নগরে নন; বরং তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন পৃথিবীর সর্বত্র। আল্লাহ তা'আলার অশেষ অনুগ্রহে তাদের সংখ্যা অনেক। সীমিত কিছু বিষয়ে তারা অনুসরণীয় তা নয়, বরং দাওয়াত ও তাবলীগ, চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রকৌশলবিদ্যা, গণিত, রসায়ন, কৃষিশিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি তথা জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে ছোট-বড়, পুরুষ-মহিলা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলের জন্য অনুসরণীয়।
যোগ্য আদর্শ- যারা শত বিপদেও দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে থাকেন, আল্লাহর বিধানের খেলাফ করেন না- ইসলাম কখনো এমন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব থেকে শূন্য হবে না। মুসলিম উম্মাহর মাঝ থেকে কখনো কল্যাণ নিঃশেষ হয়ে যাবে না। কেয়ামত অবধি এমন মহামানব মুসলিম জাতির মাঝে উপস্থিত থাকবেন। তবে তাদের খুঁজে পাওয়ার জন্য শর্ত হলো, সঠিক স্থানে সঠিক পন্থায় তাদের অনুসন্ধান করা।
যাকে আপনি নিজের আদর্শ মানবেন, তার সামাজিক অবস্থান, পদ-পদবি, আর্থিক সচ্ছলতা, প্রসিদ্ধি থাকা জরুরি নয়; বরং দেখতে হবে ঈমান-আমল, আখলাক-চরিত্র, দ্বীনদারিতে তিনি উচ্চ স্তরের কি না?
আমরা এতক্ষণ ধরে যা আলোচনা করলাম তথা 'প্রত্যেক যুবকের জন্য একজন মুরুব্বি আবশ্যক' এটি যুবকসমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি তাদের জীবনকে সুন্দরতম ও স্বর্গীয় করার জন্য একটি মৌলিক ও বুনিয়াদি বিষয়।
এ পর্যন্ত আমরা যে সকল সাহাবায়ে কেরাম ও তৎপরবর্তী মহামনীষীদের আলোচনা করেছি, তারা সবাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে কথা-বার্তা, চাল-চলন, কাজ-কর্ম তথা জীবনের প্রতিটি বিষয়ে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ অনুসন্ধান করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন বিশেষ আদর্শ। এ ছাড়াও সকলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত নিজ যুগের আরো একজন মহামনীষীকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যারা উন্নতি-অগ্রগতির পথে তাদের সহযোগী ছিলেন। যেমন হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. কে দেখাশুনা করেছিলেন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা রা.। আর যায়েদ ইবনে হারেসা রা. কে প্রতিপালন করেছিলেন হযরত আননাওয়ার বিনতে মালেক রা.। হযরত মু'আয ইবনে আমর ইবনে জামুহ রা.-এর মুরুব্বি ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবী আমর ইবনে জামুহ রা.। এভাবেই এ সকল মহামনীষী নিজ যুগের একজন মুরুব্বির বিশেষ যত্নে বেড়ে উঠেছিলেন। যারা তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির পথে সহযোগী ছিলেন। এই হলো তাদের জীবনের সফলতার রাজপথ- বর্তমানেও এর বিকল্প নেই।
সুতরাং হে মুসলিম যুবসমাজ, কোনো চিন্তা-ভাবনা, যাচাই-বাছাই ছাড়াই যেকোনো মুরুব্বির পিছনে দৌড়াবেন না। কারণ, আপনার মুরুব্বি কেবল আপনার দুনিয়ার ভাগ্য নির্ধারক নন, আখেরাতেরও ভাগ্য নির্ধারক। এমনকি দুনিয়ার চেয়ে আখেরাত বিষয়ে মুরুব্বির প্রভাব বেশি কার্যকর হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে হেদায়েতের পথে পরিচালিত করুন। আমীন।
টিকাঃ
২১. সূরা সফ (৬১): ৩
২২. সূরা আহযাব (৩৩) : ২১
📄 হৃদয় নিংড়ানো উপদেশ
হে মুসলমান যুবক-যুবতী ভাই ও বোনেরা, যদি আপনাদের মাঝে দুনিয়া-আখেরাতে সফল হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে থাকে, তাহলে এই আগ্রহকে দৃঢ় সংকল্পে পরিণত করতে হবে। এরপর অবিরাম কাজ করে যেতে হবে।
সফলতার পথ এত মসৃণ নয়। এ পথ তারই জন্য মসৃণ, আল্লাহ তা'আলা যার জন্য মসৃণ করে দেন। এ পথ তারই জন্য সহজ, আল্লাহ তা'আলা যার জন্য সহজ করে দেন। আল্লাহ তা'আলা সবার অন্তরের খবর রাখেন। তিনি জানেন, কারা ফেতনাবাজ, আর কারা কল্যাণকামী। আল্লাহ তা'আলা সূরা গাফেরে বলেন-
يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ. (الغافر)
'তিনি চোখের খেয়ানত ও অন্তর যা গোপন করে, তাও জানেন।[31]
যদি আপনারা সত্যিকার অর্থে এ জাতির উন্নতি চান, তাদের হারিয়ে যাওয়া গৌরব যদি ফিরিয়ে আনতে চান, যদি লাঞ্ছনা আর অবমাননাকর জীবনের ইতি ঘটাতে চান, তাহলে এখন থেকেই শুরু করুন।
আর দেরি নয়। আর কালক্ষেপণ নয়। এখনই সময়। সব বাধা পেরিয়ে আপনাদেরই আগামীর সুন্দর সফল ভবিষ্যৎ গড়ার শপথ করতে হবে। শুরু করুন। আল্লাহ তা'আলা রহমতের দ্বার খুলে দেবেন- ইনশাআল্লাহ।
এখন আমি আপনাদের অতি সংক্ষেপে দশটি উপদেশ প্রদান করব। প্রত্যেকটি উপদেশ এক একটি কিতাব হতে পারে। এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা দরকার। বক্ষমাণ কিতাবটি এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার উপযুক্ত স্থান নয়। এগুলো নিয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা করার আশা রইল।
টিকাঃ
* সূরা গাফের (80): ১৯
📄 শেষ কথা
আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, প্রায় সব বৃদ্ধই যৌবনকালে এই উপদেশগুলো আমলের উদ্দেশ্যে শুনতে চাইতেন। কিন্তু আজ তাদের হাতে আর সময় নেই। আজ তাদের যৌবন শেষ। আজ আপনি এসব কথা শুনছেন। এখন আপনার শোনার ও আমল করার সময় আছে। তাই বলছি, ওই দিন আসার পূর্বেই আমল করুন, যেদিন আপনি পুরোনো দিন ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করবেন, কিন্তু তা আর কোনোদিনও ফেরত আসবে না।
আল্লাহ তা'আলা আপনাকে এমন অনেক নেয়ামত দান করেছেন, যা অন্যদের দান করেননি। আপনাকে শারীরিক শক্তি দান করেছেন, প্রখর মেধা দিয়েছেন, দৃঢ়-সংকল্প গ্রহণের তৌফিক দিয়েছেন, কোমল অন্তর এবং সুস্থ-সুন্দর অবয়র ও শারীরিক সৌম্য দান করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যুগ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করেছেন। যুগকে অধঃপতন থেকে উন্নয়নের সোপানে ফিরিয়ে আনা, খারাপ থেকে ভালো পথে নিয়ে আসা ও দুর্বল থেকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব আজ আপনার।
আপনাকে আল্লাহ তা'আলা উক্ত কাজের জন্য নির্বাচন করেছেন। সুতরাং আপনি সমাজ দ্বারা প্রভাবিত হবেন না। সমাজকে আপনার আদর্শে প্রভাবিত করুন। পরিবেশ-সমাজ কোনো কিছুকে আপনার পথে প্রতিবন্ধক ভাববেন না।
আল্লাহ তা'আলা আপনাকে সমাজ পরিবর্তনের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সমাজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার জন্য নয়।
আল্লাহ গোটা বিশ্বকে আপনার আদর্শে আদর্শবান করার জন্য সৃষ্টি করেছেন; আপনার পথ থেকে অন্যদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য নয়।
আল্লাহ আপনাকে যমিনবাসীর প্রতি দয়া প্রদর্শন, তাদের কল্যাণ সাধন এবং পৃথিবী আবাসযোগ্য করার জন্য সৃষ্টি করেছেন।
কাজেই আপনি এত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে অর্থহীন বিনোদন ও গল্পগুজবে সময় নষ্ট করবেন না।
আপনি হবেন আলোর মিনার। আপনাকে দেখে পথভোলা মানুষ পথ খুঁজে পাবে। আপনি হবেন সেই সুরাইয়া তারকা, যাকে দেখে মাঝ-সমুদ্রের মাঝি দিক ফিরে পাবে। আপনি হবেন সেই মহামানব, যার দ্বারা অধঃপতিত সমাজ আবার ঘুরে দাঁড়াবে। আপনার দ্বারা বিশ্বমানবতা দুনিয়া আখেরাতের সফলতা ফিরে পাবে।
যখন খুব অস্থিরতায় ভুগবেন, নিজেকে দুর্বল মনে হবে, সহায় সম্বলহীন মনে হবে, তখন মনে করবেন, আল্লাহ রব্বুল আলামীনই আপনার জন্য যথেষ্ট।[46] তিনি নিজ কুদরতে ও অন্য মুসলমানদের মাধ্যমে আপনাকে শক্তিশালী করবেন। আপনি শুধু আল্লাহর বিধানকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরুন এবং মুসলমানদের পাশে থাকুন।
আল্লাহর কাজ করুন। আর দৃষ্টি রাখুন জান্নাতের দিকে। আর আপনার সামনে পথ খুলে গেলে গভীর রজনীর অশ্রু বিসর্জনে আমি অধমকে ভুলবেন না। হয়তো আপনার ও আপনাদের দু'আয় আল্লাহ আমাকে রহম করবেন। জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতের নেয়ামত দান করবেন।
এতক্ষণ যা বললাম, তা কখনো ভুলে যাবেন না। আমি আমার বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করছি। আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখেন।
সমাপ্ত
টিকাঃ
46. حسبنا الله ونعم الوكيل، نعم المولى ونعم النصير