📄 হযরত মু‘আয ইবনে আমর ইবনে জামুহ রা. ও মু‘আওয়াজ ইবনে আফরা রা. এর বীরত্ব
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 উসামা ইবনে যায়েদ রা.
ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের আরেক যুবকের বীরত্বের গল্প শুনুন...
আমরা অধিকাংশই তার মহান ব্যক্তিত্বের কথা রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তার বিজ্ঞতাসূলভ নেতৃত্ব দেখে জানতে পেরেছি। তবে এ যুদ্ধেই সর্বপ্রথম তার বীরত্ব প্রকাশ পায়নি। ইতিহাসের পাতায় তার বীরত্বগাথা এরও পূর্বে অঙ্কিত হয়েছে। তিনি হলেন হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা.।
রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পূর্বে তিনি অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ইসলামী ইতিহাসে তার অবদান স্বীকৃত ও অনস্বীকার্য।
উদাহরণস্বরূপ সপ্তম হিজরীতে সংঘটিত সারিয়ায়ে গালেব ইবনে আবদুল্লাহ রা.। তখন হযরত উসামা রা.-এর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। তা ছাড়া মক্কা বিজয়, হুনাইনের যুদ্ধসহ অন্যান্য যুদ্ধ তো আছেই।
হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. ছিলেন সর্বজনবরিত ও শ্রদ্ধেয় প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। সাহাবায়ে কেরাম যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কোনো বিষয়ে আলোচনা করতে ভয় পেতেন, অথবা কোন কিছু চাইতে ভয় পেতেন, তখন হযরত উসামা রা. কে সে বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আলোচনা করার আবেদন করতেন। অথচ তিনি বয়সের দিক থেকে ছিলেন অনেক ছোট। সে সময় তার বয়স ছিল সর্বোচ্চ ১৫ বছর। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তার অবস্থান ও জ্ঞান-গরিমার কারণে এ ধরনের বিষয়ে তাকে প্রাধান্য দেওয়া হতো।
শুধু এ কারণেই নয়, বরং এর চাইতে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কারণে তাকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। সেটি কী?
হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. পঞ্চম হিজরীতে সংঘটিত মুরাইসি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মর্মস্পর্শী ইফকের ঘটনা (মা আয়েশা রা. সম্পর্কে অপবাদ রটানোর ঘটনা।) এই যুদ্ধে সংঘটিত হয়।
একদল নিন্দুক মা আয়েশা রা. সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ রটায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন? কঠিন সময় পার করছিলেন তিনি। সরাসরি ওহী নাযিল হতেও দেরি হচ্ছিল (একমাস পর ওহী নাযিল হয়)। চারদিকে যে গুজব ছড়ছিল তাতে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন, পরিস্থিতি একেবারেই সঙ্কটজনক হয়ে পড়ে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্ঞানী-গুণী সাহাবাদের পরামর্শ গ্রহণ করতে চাইলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি কতিপয় জ্ঞানী-গুণী সাহাবীর কাছে এই ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পরামর্শ গ্রহণ করবেন। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে কার কাছে পরামর্শ চাইবেন? তিনি মাত্র দু'জনের কাছে পরামর্শ চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
একজন হলেন হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা.
অন্যজন হযরত আলী ইবনে আবু তালেব রা.।
সে সময় হযরত উসামা রা. এর বয়স ছিল মাত্র বারো বছর!
এ বয়সের বালকের পক্ষে তো ঘটনাটি বোঝারই কথা না- কেউ কেউ এমন ধারণাও করতে পারেন। ঘটনার বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও নেপথ্য কি হতে পরে- তার বোঝার কথা না। এ বিষয়ে পরামর্শ প্রদান তো অনেক কঠিন ও দুরূহ বিষয়!! কিন্তু জনাব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারো বছরের ছোট্ট বালক উসামার মাঝে সেই যোগ্যতা ও প্রতিভা অবলোকন করেন, যার মাধ্যমে সে এমন কঠিন বিষয়ে সুচিন্তিত পরামর্শ প্রদান করতে সক্ষম।
ভেবে দেখুন, পরামর্শপ্রার্থী কে? সৃষ্টির সেরা, দুনিয়া-আখেরাতের সরদার, মানবজাতির সেরা জ্ঞানী, নিষ্পাপ জনাব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
এটি হযরত উসামা রা. এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। বরং এটি বিশ্বের যুব সমাজের শ্রেষ্ঠতম গুণ। কোনো একজন যুবকের চিন্তা-ফিকির ও বিচার-বুদ্ধির জগতে এই উঁচু স্তরে উপনীত হওয়া গোটা যুবসমাজের জন্য বিশাল দিগন্ত উন্মোচন করে দেয়, তাদের সুপ্ত প্রতিভা ও শক্তির বিকাশে সুবিধা গ্রহণের পথ দেখায়। আল্লাহপ্রদত্ত গুণাবলির ওপর পড়ে থাকা আস্তরণ সরিয়ে দেয়।
আলোচিত বিষয়টি ছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পূর্বে এক আশ্চর্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আর তা হলো, উসামা ইবনে যায়েদ রা. কে সেনাপতি বানিয়ে সিরিয়াতে রোমানদের বিরুদ্ধে বিশাল এক মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করেন। তখন হযরত উসামার বয়স ছিল মাত্র আঠারো বছর। বাস্তবেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই সিদ্ধান্ত ছিল আশ্চর্যকর! এ বিষয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করা দরকার।
উসামা ইবনে যায়েদ রা. এই যুদ্ধে একদল বালককে পরিচালনা করেননি কিংবা একদল সাধারণ লোক যাদের রণকৌশল জানা নেই তাদের নেতৃত্ব দেননি; তিনি এই যুদ্ধে এক বিশাল আকৃতির রণশাস্ত্রে পারদর্শী শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীকে পরিচালনা করেছেন। যারা সার্বিক দিক থেকে ছিলেন অগ্রগামী। যুদ্ধ, সামরিক-পরিকল্পনা, ঈমান ও ইসলামে অগ্রগামী, বিচক্ষণতা ও মান-মর্যাদার দিক থেকে তারা তৎকালের শ্রেষ্ঠ দল ছিলেন। সেই দলকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন আঠারো বছর বয়সের নওজোয়ান হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা.।
আসুন বিষয়টা নিয়ে একটু গভীর পর্যালোচনা করি। তখন কি মদিনায় হযরত উসামা রা. এর চেয়ে অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন কোন নেতা ছিলেন না?
উত্তর সুস্পষ্ট! নিশ্চয়ই তখন মদিনা মুনাওয়ারায় এমন বহু মানুষ ছিলেন যারা হযরত উসামার চেয়েও শ্রেষ্ঠ ও বিজ্ঞ। আবু উবাইদা ইবনুল জাব্বাহ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, খালেদ ইবনে ওয়ালিদ, কা'কা' ইবনে আমর, শুরাহবিল ইবনে হাসানা, মুসান্না ইবনে হারেসা, আমর ইবনে আস প্রমুখ বিখ্যাত সাহাবায়ে কেরাম তখন মদিনায় ছিলেন।
তাহলে কেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বাদ দিয়ে যুদ্ধের পতাকা হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. এর হাতে তুলে দিলেন? কেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় সাহাবীর ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও বিশাল বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে হযরত উসামাকে নির্বাচন করলেন?!
ইশারা সুস্পষ্ট। উদ্দেশ্য মহৎ।
যুবসমাজের ক্ষমতা, শক্তি, সামর্থ্য, মেধা ও প্রতিভাকে উম্মাহর সামনে তুলে ধরার মহৎ লক্ষ্যেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সিদ্ধান্ত নেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অভিপ্রায় ছিল এ কথা বোঝানো যে, একজন আঠারো বছরের যুবকের মাঝেও একদল বিচক্ষণ, বিজ্ঞ, বীর বাহাদুর পরিচালনার পূর্ণ ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে।
এর মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুন প্রজন্মকে যোগ্য করে গড়ে তোলার এবং যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন করার নীতিমালা বর্ণনা করেছেন। যদি প্রধান সেনাপতি জীবনভর সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন, অন্যদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ না দেন, তবে তা নিঃসন্দেহে জাতির জন্য মহা ক্ষতির কারণ। পক্ষান্তরে যদি কেউ যুবসমাজকে ছোটবেলা থেকেই প্রশাসন ও নেতৃত্ব বিষয়ে শিক্ষাদান করে, তাহলে যুবসমাজের জীবন হবে স্বর্ণোজ্জ্বল, পূর্ববর্তীদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এই যুবসমাজ হবে প্রতিষ্ঠিত ও অপ্রতিরোধ্য। শুধু বর্তমান নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও হবে তারা কল্যাণকর।
উল্লেখ্য, হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. এর নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী কোন শরীরচর্চা, আনন্দ-বিনোদন, কিংবা স্বাভাবিক কোনো যুদ্ধ জয় করতে যাচ্ছে না, বরং তারা তৎকালীন পৃথিবীর পরাশক্তি রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বের হয়েছে। রোমানরা তখন কূটনীতিতেও বিশ্বসেরা জাতি ছিল। আর যাদের ছিল স্বর্ণোজ্জ্বল অতীত ও অসংখ্য যুদ্ধজয়ের অভিজ্ঞতা।
আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করুন-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাতে যুদ্ধের পতাকা তুলে দিয়ে মুসলিম জাতিকে কোনো অবস্থাতেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালোভাবে জানতেন, এই যুবক পূর্ণ সফলতার সাথে এই গুরুদায়িত্ব আঞ্জাম দিতে সক্ষম হবে। উপরন্তু কতিপয় সাহাবী তার হাতে পতাকা তুলে দেওয়াতে কিছুটা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করার পরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ আমাদের অন্তরে উক্ত বিষয়টি গেঁথে দেয়। যে বিষয়টি বহু গুণীজন মুরব্বিদের কাছে অস্পষ্ট থাকে। তা হলো 'যুবসমাজের ক্ষমতা অপরিসীম'।
যুবক উসামা ইবনে যায়েদ রা. মাত্র কয়েক বছরে নেতৃত্ব ও পরিচালনাশাস্ত্র, যুদ্ধ ও রণশাস্ত্র এবং ফিকাহশাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাই তো তিনি এই মহান গুরুদায়িত্ব সফলভাবে আঞ্জাম দিতে সক্ষম হয়েছেন।
পাঠকবৃন্দ! হযরত উসামা রা. বর্তমান যুবসমাজের ন্যায় রাজকীয় জীবনযাপন করতেন? তাও না। তিনি আজকের যুবক সম্প্রদায়ের মতো এত উন্নত পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করেননি। তিনি বর্তমান যুবসমাজের মতো এত উন্নত জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন না।
তিনি ছিলেন সহজ সরল প্রকৃতির। সাধারণ বাবার একজন সাধারণ সন্তান। তার বাবা ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কৃতদাস যায়েদ ইবনে হারেসা রা.। যিনি বেচাকেনা হতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে স্বাধীন করেছিলেন। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, উসামা রা. ছিলেন সহায়-সম্বলহীন অসহায়-দরিদ্র। তিনি কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তি, রাজা-বাদশা বা আমির-উমারার আদরের সন্তান ছিলেন না।
উসামা সুঠাম সুদর্শন যুবকও ছিলেন না। না চেহারা-অবয়ব, না শারীরিক গঠন-কোনো দিক থেকেই তিনি সুদর্শন ছিলেন না। এতে এ কথা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, প্রকৃত সফলতা বংশ, সম্পদ বা শারীরিক অবয়বে নিহিত নয়; বরং তা নিহিত থাকে দ্বীন-ধর্ম, জ্ঞান-গরিমা, যোগ্যতা ও প্রতিভার মাঝে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উসামার শানে যথাযথ বলেছেন- যা প্রত্যেক মুসলিম যুবকের জন্য গর্বের বস্তু। ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন-
أن رسول الله (ص) بعث بعثا وأمر عليهم أسامة بن زيد فطعن الناس في إمارته فقام رسول الله (ص) فقال : إن تطعنوا في إمارته ، فقد كنتم تطعنون في إمارة أبيه من قبل وأيم الله إن كان لخليقاً للإمارة وإن كان لمن أحب الناس إلى وإن هذا لمن أحب الناس إلي بعده. (متفق عليه)
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল সৈন্য পাঠালেন। উসামা ইবনে যায়েদকে তাদের সেনাপতি নিযুক্ত করলেন। কতিপয় লোক তার নেতৃত্বকে অস্বীকার করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে বললেন- 'যদি তোমরা তার নেতৃত্বে ছিদ্রান্বেষণ করো, তবে মনে রাখবে তোমরা ইতিপূর্বে তার বাবার নেতৃত্বেও ছিদ্রান্বেষণ করেছিলে! আল্লাহর শপথ! যদি সে বাস্তবে নেতৃত্বের যোগ্য হয়ে থাকে, তাহলে সে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।'[8]
আহ! যুবসমাজ কত বেশি মর্যাদাবান! যদি তারা বুঝত! আহ! সমাজ ও জাতি উন্নতি-অগ্রগতির চরম শিখরে উত্তীর্ণ হতো যদি যুবসমাজ তাদের সাধ্যমতো প্রচেষ্টা করত এবং সাধ্যমতো উত্তম কাজে নিজেদের নিয়োজিত করত। হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. এর মাঝে আমাদের জন্য রয়েছে বহু উপদেশ।
আমার মন চাচ্ছে, ইসলামের স্বর্ণযুগের যুবসমাজের অবদান ও কীর্তি সবিস্তারে আলোচনা করি। কিন্তু এতে আলোচনার কলেবর দীর্ঘ হয়ে যাবে। তা ছাড়া যুবসমাজের যাবতীয় কীর্তি সবিস্তারে আলোচনা করাও এই কিতাবের মূল উদ্দেশ্য নয়। এখানে আমি উদাহরণস্বরূপ কয়েকজনের কথা উল্লেখ করেছি মাত্র। আগ্রহী পাঠকদের প্রতি বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থসমূহ হতে মুসআব ইবনে উমাইর, সামুরা ইবনে জুনদুব, জা'ফর ইবনে আবু তালেব, আস'আদ ইবনে যুরারা, মু'আজ ইবনে জাবাল, সা'দ ইবনে মু'আজ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস, বারা ইবনে আজেব, যায়েদ ইবনে আরকাম প্রমুখ সাহাবা আজমাঈন [রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আলাইহিম আজমাঈন]-এর জীবনী পাঠের আবেদন রইল। আল্লাহ তা'আলা তাদের মতো যুবক-শ্রেণি যুগে যুগে সৃষ্টি করুন- আমীন।
টিকাঃ
৮. বুখারী: ৪১৯৯
📄 কেন এই ব্যবধান?
একটু বিরতি নিয়ে আত্মজিজ্ঞাসা করা দরকার। গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার।
বর্তমান যুবসমাজ ও পূর্বেকার যুবসমাজের মাঝে কেন এই বিশাল ব্যবধান বিরাজমান? কেন তাদের সম্ভাবনা, শক্তি ও সৃজনের মাঝে বিপুল ফারাক? আজকের যুবসমাজ কোন আদর্শে আদর্শবান? আর তাদের কোন আদর্শে আদর্শবান হওয়া কাম্য ছিল?
জাতির ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতার মাঝে কেন আজ এত ব্যবধান? এ কথা নিশ্চিত, শুধু যুবসমাজের দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। ভুল শুধু যুবক- শ্রেণিরই নয়, বরং আজকের সমাজের এই অধঃপতন সর্বশ্রেণির সমন্বিত ভুলের মাশুল। এ এক মহাবিপর্যয়। এতো মুসলিম উম্মাহর অধঃপতন। এই বিপর্যয় ও অধঃপতনই আজ আমাদের এই অবস্থার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ফলে বর্তমান যুবসমাজ ও তৎকালীন যুবসমাজের মাঝে বিরাট ব্যবধান বিরাজ করছে।
দীর্ঘ অধ্যয়ন ও গবেষণার পর আমার কাছে মনে হয়েছে, এই অধঃপতনের অনেক কারণ রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন আরো গভীর গবেষণা ও পর্যালোচনা। প্রয়োজন নির্বিঘ্ন প্রচেষ্টা ও একনিষ্ঠ সাধনা এবং এই অবস্থা থেকে উত্তরণের বাস্তব পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। অন্যথায় নির্ঘাত সীমাহীন দুঃখ ও অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। যে জাতির যুবক-শ্রেণি ধ্বংসের কবলে পতিত হয়েছে, সে জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।
তাই আমরা অকার্যকর চিন্তা-ভাবনা ও অনর্থক গল্পগুজবে সময় না কাটিয়ে একটি সমাধানমূলক কার্যকরী আলোচনার অবতারণা করার প্রচেষ্টা করছি, যার ফলাফল হবে স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী এবং যা দুই প্রান্তের যুবসমাজের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনবে, শুধু তা-ই নয়, বরং চিরতরে এই ব্যবধান মিটিয়ে দেবে- ইনশাআল্লাহ।
এ পর্যায়ে আমি কতিপয় কারণ ও তার প্রতিকার উল্লেখ করছি। আমাদের উচিত, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য স্পষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং তা বাস্তবায়নে সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
📄 কারণ : ১
ইসলামী প্রতিপালন নীতি বর্জন
এটি বর্তমান যুবসমাজের অধঃপতনের অন্যতম কারণ। ইসলামী অনুশাসন ও আদর্শে লালিত-পালিত না হলে যায়েদ ইবনে সাবেত, উসামা ইবনে যায়েদ, মু'আয ইবনে জাবাল, মু'আয ইবনে আমর ইবনে জামুহ, মু'আয ইবনে আফরা রা. কীভাবে বিকশিত হতেন?! কে তাদের চিনত, জানত?
ইসলামই এ সকল বীর ও ক্ষণজন্মা মহামনীষীদের তৈরি করেছে। ইসলামই তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছে। ইসলামই তাদের সম্ভাবনাকে জাতির খেদমতে নিয়োজিত করেছে। দুনিয়াবাসীর কল্যাণে তাদের পরিচালিত করেছে।
আজ জাতি যুবসমাজের উন্নতি ও বিকাশের জন্য ইসলামী নীতিমালা উপেক্ষা করে শত শত নীতিমালা প্রণয়ন করছে। ফলে জাতি সফলতার রহস্য হারিয়ে ফেলছে, হেদায়েত ও সংশোধনের পথে পরিচালিত হচ্ছে না, সংকীর্ণতা ও হতাশার জীবনযাপন করছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنْ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكاً. (طه)
'যে আমার স্মরণে বিমুখ হবে, সে অবশ্যই সংকুচিত জীবনযাপন করবে।'[9]
যুবসমাজের মাঝে ইসলামী প্রতিপালন বাস্তবায়নের জন্য শর্ত হলো, প্রত্যেক যুবকের একজন দক্ষ আলেমে দ্বীন মুরুব্বি হিসেবে থাকা। মুরুব্বিহীন ধ্যানমগ্ন সময় কাটালেও যুবসমাজের মাঝে পরিবর্তন আসবে না। পরিবর্তনের জন্য দরকার দক্ষ মুরুব্বির নিয়মতান্ত্রিক প্রতিপালন। কাজেই যুবসমাজ মুরুব্বিশূন্য হয়ে গেলে তারা ভুল পথে পরিচালিত হবে, নির্মাণ ও সংস্কারমূলক কাজ বাদ দিয়ে ধ্বংস ও অপসংস্কৃতির পথে ধাবিত হবে।
দ্বীনিজ্ঞান সম্পন্ন একজন মুরুব্বীকর্তৃক নির্দেশিত প্রতিপালনই মানুষকে কুরআন-সুন্নাহ অভিমুখী করে তোলে। আফসোস! আজ যুবসমাজ মুরব্বিশূন্য হওয়ার ফলে তারা কুরআন-সুন্নাহ থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে দ্বীন যাদের প্রধান আদর্শ হওয়ার কথা ছিল, তাদের কাছে আজ তা হেলাফেলার বস্তু। দ্বীন যেন তাদের কাছে আদর্শলিপি বইয়ের মতো ভাসাভাসা কিছু নিয়ম-কানুন, যা তারা পাঠ্যপুস্তকে পাঠ করে।
বর্তমান মুসলিম যুবসমাজের মাঝে এমন কিছু বস্তুর দিকে নিজেদের সম্বোধিত করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যে বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা কোনো দলিল নাযিল করেননি এবং মুসলিম উম্মাহর সোনালি যুগে মহামনীষীগণের মাঝেও যে বিষয়ের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তারা কেউ কেউ নিজেদের আরব গোত্রের দিকে সম্বোধন করে নিজেদের বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকা মুসলিম ভ্রাতৃত্ব থেকে আলাদা করে ফেলে। তারা কেউ নিজেকে ফেরাউনী, কেউ ব্যবিলনী, কেউ ফিনিশীয়, কেউ পারসী, কেউ তুর্কী ইত্যাদি ভাবে প্রকাশ করে। ফলে তারা গোটা জাতিকে প্রকারান্তরে দ্বীন ইসলাম থেকে আলাদা করে ফেলে। কারও কারও দুঃসাহস এত বেশি যে, নিজেকে কাফের, মুশরিক বা নাস্তিক, মুরতাদ গোত্রের সঙ্গে সম্বন্ধ করে। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে একটু বলবেন- যুবকসমাজ কাফের মুশরিক বা নাস্তিক মুরতাদ গোত্রের নামে সম্বোধিত ব্যক্তির সাথে কীরূপ আচরণ করবে? যখন সে কুরআনের পাতায় পাতায় ফেরাউন, তার সেনাবাহিনী ও সম্প্রদায়ের প্রতি অভিশাপ দেখতে পাবে, আবার বাস্তব জীবনে এমন লোকের নামে সম্বোধিত ব্যক্তির গলায় ফুলের মালা দেখতে পাবে! এমতাবস্থায় যুবসমাজের মাঝে বিশৃঙ্খলা ব্যতীত আর কী দেখবেন বলুন? দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তাকে আঁকড়ে ধরবে। সে কাকে সত্যবাদী মনে করবে? কার অনুসরণ করবে? বুঝে উঠতে পারবে না।
আজ আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থা, স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-ভার্সিটি তথা সব শিক্ষাঙ্গন এখলাস ও লিল্লাহিয়াত মুক্ত হয়ে পড়েছে। ছাত্র-উস্তাজের মাঝে মহব্বত-ভালোবাসার সম্পর্ক নেই। বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা আক্রান্ত।
সবকিছুর ওপর দ্বীনকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা আজ নেই বললেই চলে। জিহাদের আয়াতসমূহ যেন আসমানে তুলে নেওয়া হয়েছে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেন আজ ধুলায় ধূসরিত।
আজ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কে এমন মনীষী আছেন, যিনি যুবসমাজকে আখেরাতের পথে আহ্বান করবেন? কেয়ামত দিবসে আল্লাহর দরবারে হিসাব-নিকাশের ভয়াবহতা বোঝাবেন? আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে কি আজ এমন খোদাভীরু বুযুর্গ আছেন, যিনি যুবকদের ডেকে বলবেন, আমল পরিশুদ্ধ করো, পড়াশোনার প্রতি মনোনিবেশ করো? কারণ, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের দেখছেন। তিনি তোমাদের প্রচেষ্টা অনুযায়ী তোমাদের প্রতিদান দিবেন। না কি শিক্ষাঙ্গনগুলো এমন মানুষে ভরপুর, যারা ছাত্রদের বলেন, শুনে রাখো! যারা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করবে, কাঙ্ক্ষিত মানদণ্ডে নির্বাচিত হবে, তারা দুনিয়ায় উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে। তার টাকা-পয়সা, ইজ্জত-সম্মান কোনো কিছুর অভাব থাকবে না। অন্যদের থেকে সে অনেক সময় অবসরও কাটাতে পারবে। কারণ, তার গাড়ি থাকবে, বাড়ি থাকবে, বেতন-ভাতা হবে আকর্ষণীয়!!
হে মুসলিম যুবসমাজ, এ দুই শ্রেণির মাঝে কত ব্যবধান! এক শ্রেণি আখেরাতের জন্য কাজ করে, আরেক শ্রেণি পার্থিব স্বার্থে কাজ করে।
এর অর্থ এই নয়, আমরা আমাদের যুবসমাজকে দুনিয়া বর্জনের শিক্ষা দেব বা তাদের উপার্জন-বিমুখ করে গড়ে তুলব। উদ্দেশ্য হলো, নিয়ত বিশুদ্ধ করা ও সঠিক পথে পরিচালিত করা। তাহলে তাদের যাবতীয় কাজকর্ম তথা আলোচনা-পর্যালোচনা, জ্ঞান-বিদ্যা, আখলাক-চরিত্র, মুআমালা-লেনদেন, আমল-ইবাদত, অর্জন-উপার্জন- সবই নেককর্ম হিসেবে গণ্য হবে।
আমরা চাই, শিক্ষকমণ্ডলী ছাত্রদের এই শিক্ষা দেবেন যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাকে সব সময় দেখছেন। তিনি চিরঞ্জীব- কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না। চিরস্থায়ী- কখনো বিস্মৃত হবেন না। তিনি সবকিছু জানেন- তার কাছে কোনো কিছু গোপন থাকে না। তাহলে যুবসমাজ সব সময় আল্লাহকে স্মরণ করবে। তার সন্তুষ্টি কামনা করবে। ভেতর-বাহির সংশোধনের চেষ্টা করবে। অলসতা-অবহেলা ঝেড়ে ফেলে নেক আমলের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করবে।
ইসলামী তরবিয়ত বা প্রতিপালন ও ইসলামী আদর্শ নির্দিষ্ট কোনো স্থান বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির মাঝে সীমিত নয়। বরং এর ক্ষেত্র হলো গোটা মুসলিম উম্মাহ। এটি রাজা-প্রজা, শাসক-শাসিত, ঘর-বাড়ি, স্কুল-মাদরাসা তথা সর্বত্র সবার জন্য পালনীয়। মোটকথা, অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে, উম্মতের দরদ রয়েছে, মর্যাদা ও প্রাপ্তির উচ্চাসনে আরোহণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ এই নয় যে, কেউ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে অন্যরাও অবহেলা করবে।
সুতরাং যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পাঠ্যসূচিকে ইসলামমুক্ত রাখা হয়, তাতে দ্বীনের প্রাণ না থাকে, এটি অভিভাবক ও মুরুব্বিদের জন্য মোটেও কল্যাণকর নয়। অভিভাবক-শ্রেণির প্রতি আমার আকুল আবেদন- সন্তানকে ইসলামের সরল-সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করবেন না। বাবা-মা, ভাই-বোন, শিক্ষক-উস্তাজ, পাড়া-প্রতিবেশী তথা অভিভাবকমাত্র সকলের কর্তব্য হলো, অধীনস্থ যুবকদের অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা, দ্বীন পালনের গুরুত্ব, জান্নাতের আশা ও জাহান্নামের ভয় ঢেলে দেওয়া। কেবল যৌবনে উপনীত হওয়ার পর তাদের এমন শিক্ষা দিতে হবে এমন নয়, বরং এরও বহু পূর্ব থেকে জীবনের প্রতিটি স্তরে তাদের অন্তরে এসব বিষয়ের বীজ বপন করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তানের ডান কানে আজান ও বাম কানে ইক্বামত দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন! এ কথা শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে, জন্ম থেকে মৃত্যুপর্যন্ত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত শিক্ষাক্ষেত্র। গোটা জীবন একটি বিদ্যানিকেতন। মানবজীবনের প্রতিটি স্তরে ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়িত করতে হবে। এভাবে সন্তান লালিত-পালিত হলে তাদের জীবন হবে নিষ্পাপ-নিষ্কলুষ। আমরা জীবনে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো অবৈধ কাজ করতে চাইলেও যেন নিজেকে কমপক্ষে একশো বার জিজ্ঞাসা করি যে, এতে আমার দয়াময় স্রষ্টা আল্লাহ কি সন্তুষ্ট থাকবেন না নারাজ হবেন?
সুতরাং এ কথার অজুহাত দেখিয়ে কোনো অভিভাবক ছাড় পাবেন না যে, তাদের সিলেবাসে তো ইসলামী আদর্শ শিক্ষা দেওয়া হয় না। তাই তাদের সন্তানেরা ইসলামী আদর্শে আদর্শবান হতে পারেনি। অথবা কেউ এই অজুহাতের ছলে দায়িত্বমুক্ত হতে পারবেন না যে, তারা দীর্ঘ এক বছর ব্যয় করে যা অর্জন করে, অন্যরা তা একদিনে ধ্বংস করে দেয়। সন্তানদের ইসলামী আদর্শ শিক্ষা না দেওয়ার ক্ষেত্রে এগুলো কোনো গ্রহণযোগ্য আপত্তি নয়। আমি স্বীকার করছি, কাজটি অনেক কঠিন; তবে অসম্ভব নয়। আমরা বিশ্বাস করি, যে ব্যক্তি ইখলাসের সাথে চেষ্টা করবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অবশ্যই তাকে তৌফিক দান করবেন এবং তার জন্য আত্মশুদ্ধি ও আমলের যাবতীয় দ্বার উন্মোচন করে দেবেন।
এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। তা হলো, আমি কিন্তু যুবসমাজকে দায়িত্বমুক্ত ঘোষণা করিনি।
ইসলামের আদর্শকে জীবনে বাস্তবায়িত করার পথে যত বাধা-বিপত্তি, ঘাত-প্রতিঘাত আসুক না কেন, কেয়ামতের দিন প্রত্যেককেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। প্রত্যেককে সেদিন যৌবনকালের হিসাব দিতে হবে। তাই কোনো বিবেকবান যুবকের জন্য বেপরোয়া জীবনযাপন করা উচিত নয়।
এ কথা বললে চলবে না, সবাই তো এমন করে, সুতরাং আমিও একটু করে দেখি। সবাই তো কম-বেশি আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, সুতরাং আমিও একটু অবাধ্য হই।
আবার এমনও নয় যে, যারা ইসলামবিরোধী জীবনবিধান প্রণয়ন করছে, তারা যুবসমাজের ঈমান-আমলের ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। সুতরাং সার্বিক বিষয়টি কঠিন মনে করে সবদিক থেকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নিজে অপরাধ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। আবার অন্যের অপরাধপ্রবণতায় প্রভাবিত হওয়া থেকেও দূরে থাকতে হবে।
হে যুবক, নিজেকে প্রশ্ন করুন এবং নিজের মাঝে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করুন। প্রত্যেক যুবকেরই উচিত নিজেকে এমন প্রশ্ন করা। প্রশ্নটি হলো- আল্লাহ তা'আলা কেন আমাকে সৃষ্টি করেছেন?
প্রশ্নটি একবার দুইবার তিনবার করুন। আল্লাহ তা'আলা কেন আমাকে সৃষ্টি করেছেন?
এটি আপনার জীবনের সাধারণ কোনো বিষয় নয়, বরং এটি আপনার জীবনের চিরস্থায়ী সফলতা ও ব্যর্থতার বিষয়। এর ওপরই আপনার দুনিয়া-আখেরাতের সফলতা নির্ভরশীল।
অধিকাংশ যুবক নিজেকে এই প্রশ্ন করে না। আর এ কারণেই তারা জীবন ধ্বংস করতে বসে।
নিশ্চয়ই মানব-সৃষ্টির একটি মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
اَفَحَسِبْتُمْ اَنَّمَا خَلَقْنٰكُمْ عَبَثًا وَّ اَنَّكُمْ اِلَيْنَا لَا تُرْجَعُوْنَ. (المؤمنون)
'তোমরা কি মনে করো যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি, আর তোমরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না?'[10]
কেন আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে সৃষ্টি করলেন? আল্লাহ তা'আলা কি আমাদেরকে আনন্দ-ফুর্তি ও ভোগ-বিলাসের জন্য সৃষ্টি করেছেন?
আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের ধন-সম্পদ অর্জন করার জন্য সৃষ্টি করেছেন? আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের বীরত্ব প্রদর্শন বা মল্লযুদ্ধ করার জন্য সৃষ্টি করেছেন?
আল্লাহ তা'আলা কি আমাদেরকে তার অবাধ্যতা, বিরোধিতা ও পিঠপ্রদর্শন করার জন্য সৃষ্টি করেছেন?
বিজ্ঞ স্রষ্টার সৃষ্টি এসবের কোনো একটির জন্যও হতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। বিষয়টি আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ. (الذاريات)
'আমি জিন ও মানবজাতিকে আমার ইবাদতের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি।'[11]
সুতরাং উদ্দেশ্য হাসিল করতে না পারলে এ জীবন তো খেল-তামাশার বস্তু ভিন্ন কিছু নয়। লক্ষ্যহীন জীবনের কোনো মূল্য নেই।
প্রশ্ন হলো, ইবাদতের অর্থ কী? ইবাদত কাকে বলে?
ইবাদতের প্রকৃত অর্থ হলো, আল্লাহর প্রতি নিজের পূর্ণ ভালোবাসা নিবেদন করতঃ পূর্ণাঙ্গরূপে আত্মসমর্পণ করা।
আল্লাহর সামনে পূর্ণ নত হওয়া এবং তার প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা নিবেদন করার নাম হলো ইবাদত।
আকীদা-বিশ্বাসে, চিহ্ন-নিদর্শনে, আখলাক-চরিত্রে, মুআমালা-মুআশারায় তথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যৌবনে-বৃদ্ধকালে, সুস্থতা-অসুস্থতায়, যুদ্ধ-বিগ্রহে, শান্তি-সংঘর্ষে, সফরে-অবস্থানকালে তথা জীবনের প্রতিটি স্তরে নিজেকে আল্লাহর সামনে পূর্ণ সঁপে দেওয়া এবং নিজের সবটুকু ভালোবাসা তাকে নিবেদন করার নামই হলো ইবাদত।
কিছু সুবিধাবাদী ও অধিকাংশ সাধারণ মুসলমানের ধারণামতে ইবাদত হলো শুধুমাত্র নামায, রোজা, হজ্ব ও যাকাত- বিষয়টি এমন নয়।
আর এখান থেকেই তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির উদয় হয়েছে যে, ইবাদতের উপযুক্ত স্থান কেবল মসজিদ- কখনো কখনো ঘর। আর অবশিষ্ট জীবন তোমার। সেখানে তোমার যা ইচ্ছা করবে। রব্বুল আলামীন যা চান, তা নয়। বলুন হে যুবসমাজ, এটি কি মেনে নেওয়ার মতো কোনো কথা? আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের এই জন্য সৃষ্টি করেছেন যে, আমরা আমাদের সময় থেকে কিছু অংশ দ্রুত ইবাদত করে কাটিয়ে দেব। কতিপয় যিকির-আযকার করব। আর বাকি সময় নিজের ইচ্ছে মতো-আল্লাহর ইচ্ছার পরোয়া না করে- কাটিয়ে দেব?
আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনুল কারীমে বলেন-
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ. (الزلزال)
'যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ ও সৎকর্ম করবে সে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলেও সে তা দেখতে পাবে।[12] সুতরাং প্রত্যেকের জীবনের অণু পরিমাণ কর্মেরও পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হবে। ছোট-বড় সবকিছু সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কেয়ামত-দিবসে এই ভয়াবহ হিসাব-নিকাশ দেখে মানুষ বলবে-
مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا. (الكهف)
'এটি কেমন কিতাব (আমলনামা), ছোট বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি। বরং সবকিছু হিসাব করে রেখেছে।[13] সুতরাং দুনিয়ার প্রতিটি বস্তুর এবং মানবজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সম্পর্কে সবিস্তার প্রশ্নোত্তর হবে। এ কারণেই আমি ইবাদতের প্রকৃত অর্থ করেছি, পূর্ণ ভালোবাসা নিয়ে আল্লাহর সামনে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করা। যা নিম্নোক্ত আয়াতের আলোকে প্রতিভাত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. (الأنعام)
'(হে নবী, আপনি বলুন, আমার নামায আমার কুরবানী আমার জীবন আমার মৃত্যু (সবই) আল্লাহর জন্যে।'[14]
অর্থাৎ আমাদের জীবনের সবকিছু আল্লাহ তা'আলার জন্য। আমাদের প্রতিটি নড়াচড়াও আল্লাহর জন্য। আমৃত্যু এই চেতনা নিয়ে জীবন কাটাতে হবে। এই অবস্থায় মৃত্যু হলে তা আল্লাহর পথের মৃত্যু বলে বিবেচিত হবে।
এভাবে জীবন কাটালে জীবন হবে আল্লাহর পথে। মৃত্যুও হবে আল্লাহর পথে। সুতরাং আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। আমাদের নামায-রোজা আল্লাহর জন্য, চাকরি-বাকরি আল্লাহর জন্য, বেতন-বোনাস আল্লাহর জন্য, ধন-সম্পত্তি, আয়- উপার্জন, রিযিক-দৌলত আল্লাহর জন্য, বাবা-মা, সন্তান-সন্ততি, ছোট-বড়, ভাই-বোন, ছাত্র-শিক্ষক, চেনা-অচেনা সবার সঙ্গে আমাদের আচরণ হবে আল্লাহর জন্য। আমরা আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসব। আবার ঘৃণা করলেও আল্লাহর জন্য করব। এমনকি আনন্দ-ফুর্তি, আরাম-আয়েশও হবে আল্লাহর জন্য।
এ বিষয়ে অগণিত আয়াত-হাদীস আছে। কারণ, এতে গোটা মানবজীবন ও পূর্ণ দ্বীন ইসলাম নিহিত। এটি এমন এক ব্যাখ্যা, যার মাধ্যমে মানবজাতি মুক্তি পেতে পারে। অন্যথায় ধ্বংসের কালো থাবা থেকে রক্ষা পাওয়া খুব কঠিন। সুতরাং কেয়ামত দিবসে সবাইকে হিসাবের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। সবার হিসাব আলাদা আলাদা হবে। কাউকে অন্যের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে না। আবার আপনার আমল সম্পর্কে অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করা হবে না। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ. (المدثر)
'প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ।'[15]
কেয়ামত দিবসে কোনো একজন ব্যক্তিও ভালো-মন্দ কোনো কাজে আপনার পাশে এসে দাঁড়াবে না। আল্লাহ তা'আলা বলবেন-
وَلَقَدْ جِئْتُمُونَا فُرَادَى كَمَا خَلَقْنَاكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ. (الأنعام)
'তোমরা আমার কাছে আজ একাকী এসেছ, যেভাবে আমি তোমাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম।'[16]
সুতরাং আপনার জীবনের একটি মুহূর্ত যদি আল্লাহর ধ্যানমগ্নতা ছাড়া অতিবাহিত হয়, সেই মুহূর্তের হিসাব অবশ্যই আপনাকে দিতে হবে। অন্য কেউ দেবে না। আপনার বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক-অভিভাবক, কাছের-দূরের কেউ আপনার সামান্য বোঝা বহন করবে না। মনে রাখবেন, কিছুতেই এদের কেউ আপনার সামান্য বোঝা বহন করবে না। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا اتَّبِعُوا سَبِيلَنَا وَلْنَحْمِلْ خَطَايَاكُمْ وَمَا هُمْ بِحَامِلِينَ مِنْ خَطَايَاهُمْ مِنْ شَيْءٍ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ. (العنكبوت)
'কাফেররা মুমিনদের বলে, আমাদের পথ অনুসরণ করো, তাহলে আমরা তোমাদের পাপভার বহন করব। কিন্তু তারা তো তাদের পাপভারের কিছুই বহন করবে না। তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।'[17]
ফেতনাবাজ পাপী কাফের মুশরিকরা কখনো তাদের সামান্য বোঝা বহন করবে না। উল্টো তাদের ফেতনায় নিপতিত করবে। অণু পরিমাণ বোঝাও তারা বহন করবে না। প্রত্যেকে নিজ নিজ হিসাব প্রদানে ব্যস্ত থাকবে। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে বিবেক-বুদ্ধি, ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন। আপনার সামনে কল্যাণ- অকল্যাণের পথ খুলে দিয়েছেন। হেদায়েত ও গোমরাহীর পথ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
وَهَدَيْنَاهُ النَّجْدَيْنِ. (البلد)
'আমি তাকে দুটি পথ দেখিয়েছি।[18]
দুটি পথ তথা ভালো-মন্দ, কল্যাণ ও অকল্যাণের পথ।
হে মুসলিম যুবসমাজ, আমি যে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলার ইচ্ছা করেছিলাম, তা এখানেই শেষ।
একটু ভেবে দেখুন, আপনার যৌবনের বছরগুলো যদি এভাবে শেষ হয়ে যায়, আপনি আল্লাহর পথ থেকে দূরেই সরে থাকেন, অপরাধকর্মে ডুবে থাকেন, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনায় বেপরোয়া জীবন কাটান, জীবনের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য না থাকে, এভাবে যদি যৌবন শেষ হয়ে যায়, এরপর আল্লাহ তা'আলা আপনাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনেন, তাহলে আপনার জীবনের হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণোজ্জ্বল যৌবনকাল কে ফিরিয়ে দেবে?
আপনার জীবনের এক-তৃতীয়াংশ বা অর্ধজীবন বা কম বেশি হারিয়ে যাওয়া অতীতকে ফিরিয়ে দেবে?
এটা তো আল্লাহ তা'আলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, অতীত কখনো ফিরে আসে না।
তাহলে কেন আপনি আপনার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাবেন না? কেন আপনার অস্তিত্বের প্রতিটি সেকেন্ডকে কর্মময় করে তুলবেন না?!
হযরত হাকেম রহ. তার সহীহ গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
اغتنم خمسا قبل خمس شبابك قبل هرمك وصحتك قبل سقمك وغناءك قبل فقرك وفراغك قبل شغلك وحياتك قبل موتك. (رواه الحاكم)
'পাঁচটি বস্তুর অস্তিত্বকে পাঁচটি বস্তুতে হারিয়ে যাওয়ার পূর্বে গনিমত মনে করবে— ১. বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে ২. রোগ-শোকের পূর্বে সুস্থতাকে ৩. দারিদ্র্যের পূর্বে সচ্ছলতাকে ৪. ব্যস্ততার পূর্বে অবসর সময়কে এবং ৫. মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে।'[19]
সমৃদ্ধ অর্থবহ চমৎকার একটি হাদীস। হাদীসের পরিভাষায় এটি 'জাওয়ামিউল কালিম' [শব্দ কম অর্থ বেশি]-এর অন্তর্ভুক্ত। আমাদের সকলেরই হাদীসটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা দরকার।
অনেক সময় মানুষ প্রকৃত বিষয় বুঝে উঠতে পারে না। ফলে জীবনের মূল লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে। শেষ মুহূর্তে যখন আফসোস আর আক্ষেপের কোনো অন্ত থাকে না, দেয়ালে হাত চাপড়েও কোনো লাভ হয় না, তখন বুঝে আসে। চল্লিশ বা পঞ্চাশ ঊর্ধ্ব বয়সে যৌবনের মূল্য বুঝতে পারে।
অসুস্থ ব্যক্তি তখনই সুস্থতার মর্ম উপলব্ধি করতে পারে, যখন বিছানা তার সঙ্গী হয়।
ধনী ব্যক্তি সম্পদ হারিয়ে ফেললে কিংবা দরিদ্র হয়ে পড়লে সম্পদের মূল্য বুঝতে পারে।
ধীরে ধীরে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর যেতে যেতে মানুষ যখন জীবন হারাতে বসে তখন সময়ের মূল্য বুঝতে পারে।
সবশেষে মানুষ জীবনের মূল্য, গুরুত্ব ও তাৎপর্য তখনই বুঝতে পারে, যখন সে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে বা কবরে প্রশ্নোত্তরের মুখোমুখি হয়!!
হে আমার যুবক যুবতী ভাই বোনেরা, যৌবন হারিয়ে গেলে কে আপনাদের তা ফিরিয়ে দেবে? আর মৃত্যু তো হঠাৎ যেকোনো মুহূর্তে চলে আসতে পারে। মৃত্যু কাউকে ছাড়বে না। বয়োবৃদ্ধ মারা যাবে, অনুরূপ টগবগে যুবকও মারা যাবে। অসুস্থ ব্যক্তি মারা যাবে, অনুরূপ সুস্থ ব্যক্তিও মারা যাবে। মৃত্যুর হাত থেকে কেউ রেহাই পাবে না। তখন লজ্জা ও অনুশোচনা করে কোনো লাভ হবে না।
হে মুসলিম যুবসমাজ, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত আহ্বানকে মনে রেখো-
اسْتَجِيبُوا لِرَبِّكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَ يَوْمٌ لَا مَرَدَّ لَهُ مِنَ اللَّهِ مَا لَكُمْ مِنْ مَلْجَإٍ يَوْمَئِذٍ وَمَا لَكُمْ مِنْ نَكِيرِ. (الشورى)
'আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই দিবস আসার পূর্বেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দাও, যা অপ্রতিরোধ্য। যেদিন তোমাদের কোনো আশ্রয়স্থল থাকবে না এবং তোমাদের জন্য তা প্রতিরোধ করারও কেউ থাকবে না।'[20]
টিকাঃ
৯. সূরা ত্বহা (২০): ১২৪
১০. সূরা মুমিনুন (২৩) : ১১৫
১১. সূরা যারিয়াত (৫১): ৫৬
১২. সূরা যিলযাল (৯৯): ৭-৮
১৩. সূরা কাহাফ (১৮): ৪৯
১৪. সূরা আন'আম (০৬): ১৬২
১৫. সূরা মুদ্দাসসির (৭৪): ৩৮
১৬. সূরা আন'আম (০৬): ৯৪
১৭. সূরা আনকাবুত (২৯): ১২
১৮. সূরা বালাদ (৯০): ১০
১৯. হাকেম: ৭৮৪৬
২০. সূরা শুরা (৪২): ৪৭