📄 ভূমিকা
আমার এক বন্ধু জ্যোৎস্নাময় এক রাতে তার ছেলে সম্পর্কে আমার কাছে অভিযোগ করলেন। ছেলের বয়স প্রায় বিশের কোঠায়।
আমাকে তিনি বললেন- আমি জানি না, তার সাথে আমি কী আচরণ করব? তাকে নিয়ে আমি খুব পেরেশান আছি!
আমি তাকে বললাম- কি বুঝাতে চাচ্ছেন? খোলাখুলি বলুন, আপনার ছেলে কী উচ্ছন্নে গেছে? সে কি নামায পড়েনা? পিতা মাতার অবাধ্য হয়েছে কি? নাকি দৃষ্টি হেফাজতে তার সমস্যা আছে? নির্দিষ্ট করে বলুন, সমস্যাটা কোথায়?
তার উত্তর শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম- তিনি দরদ ভরা কণ্ঠে বললেন, ডক্টর সাহেব! বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। আমার অভিযোগ হলো, সে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে প্রচণ্ড আগ্রহী। ছোট-বড় *সবকিছুতে হালাল-হারাম খুঁজে বেড়ায়। প্রায় সব ওয়াক্ত নামায মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করে। দীর্ঘ সময় সে বড় বড় বইপত্র ও গবেষণামূলক কিতাবাদি ঘাঁটাঘাঁটি করে। দিনভর সে ফিলিস্তিন, ইরাক, সুদান ও চেচনিয়া সম্পর্কে কথা বলে। (ছেলে আমার বয়সের তুলনায় অনেক কঠিন বিষয় নিয়ে ভাবছে) আমি তাকে বহুবার বলেছি, এসব ছেড়ে অন্য যুবকদের মতো প্রাণবন্ত সময় কাটাও। আমি তাকে নামায-রোযা ছাড়তে বলিনি; কিন্তু বলেছি- এগুলোর পাশাপাশি একটু খেলাধুলাও উপভোগ করো।
ডক্টর সাহেব আমাকে কি একটু সুপরামর্শ দেবেন? আমি তার সাথে কীরূপ আচরণ করবো?
আমি দীর্ঘঃশ্বাস ছেড়ে গভীরভাবে কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বললাম- এ বিষয়ে আমার পরামর্শ হলো, এ ক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন!! কেননা, অনেক বাবার সঠিক দিক নির্দেশনা প্রয়োজন। আর বহু সন্তান তাদের উর্বর মস্তিষ্ক প্রজ্ঞা ও সঠিক চিন্তার আলোয় আলোকিত করে তোলে, যা তাদের বাবারা দীর্ঘকাল পরেও অর্জন করতে পারেন না।
আমার বন্ধু আবেগাপ্লুত হয়ে বারবার একই কথা বলছিলেন। আমার কথা বোঝার কোন চেষ্টাই করছিলেন না। বলছিলেন- ডক্টর সাহেব, আমার ছেলে তো এখনো যুবক। তার বয়স কেবল বিশ বছর!!
আমার বন্ধুর চেতনার আকাশে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে আমি তার এই প্রশ্নের কারণে গভীর চিন্তায় পড়ে যাই। ভাবতে থাকি- ইসলামে যুবসমাজের কী মূল্যায়ন? যুব সম্প্রদায়ের ভূমিকাই বা কী? জাতি যুবসমাজের কাছে কী প্রত্যাশা করে? আজকের মুসলিম যুবসমাজ কোন পথে ধাবমান? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন ও চিন্তা আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। এ সকল প্রশ্ন ও চিন্তার ফসল হলো বক্ষমাণ গ্রন্থ।
রাগিব সারজানি
📄 যুব সমাজের সমস্যাবলী
আমি একবার কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদ সেমিনারে যোগ দিয়েছিলাম। সেমিনারের আলোচ্য বিষয় ছিলো ‘যুবসমাজের সমস্যাবলী’। আমি সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার পূর্বে যুবসমাজের প্রধান প্রধান সমস্যা সম্পর্কে তাদের মতামত জানার চেষ্টা করি। যাতে আমার চিন্তা-চেতনা ও ভাবনা যেন তাদের বাস্তব অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন না হয়। এমন যেন না হয়, আমি আছি এক প্রান্তে আর তারা আছে আরেক প্রান্তে। তাই আমি উপস্থিত প্রত্যেক যুবককে তাদের জীবনের প্রধান ও মূল সমস্যাবলী সংক্ষেপে চিরকুটে লিখে জানাবার আবেদন করি, যে সমস্যাগুলোর যথাযথ সমাধান তাদের সুখীমানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। উপস্থিত যুবকেরা তাদের সমস্যাবলী লিখিত আকারে জানিয়ে আমার আহ্বানে সাড়া দেয়।
আমি অবাক না হয়ে পারি না- আমি যেসব সমস্যা সম্পর্কে পূর্ব থেকে আলোচনা করার নিয়ত করেছিলাম, তা বর্তমান যুবসমাজের মূল সমস্যা নয়। বস্তুত বর্তমান যুবসমাজ এক গ্রহে বাস করে, আর আমি ভিন্ন কোনো গ্রহে। আমি হয়রান হয়ে পড়ি, সিদ্ধান্তহীনতা আমাকে ঘিরে ফেলে। কোন সমস্যাগুলোকে প্রাধান্য দেব, তারা যে সব সমস্যার কথা বলে সেগুলো? না আমি যেগুলোকে তাদের প্রধান সমস্যা মনে করেছিলাম, সেগুলো? অবশেষে আমি তাদের লিখিত সমস্যাগুলোর মাধ্যমে আমার আলোচনা শুরু করি। তাদের লিখিত সমস্যাগুলো নিম্নরূপ:
* বেকারত্ব। লেখাপড়া শেষে বেকার হওয়ার ভয়।
* বিয়ের আকাংঙ্খা। অথচ এ সময়ে তাদের পক্ষে সামর্থ্যহীনতার কারণে তা অসম্ভব হয়ে ওঠে।
* যুবক-যুবতীদের অবাধ মেলামেশার প্রেক্ষিতে তাদের যৌনাকাঙ্ক্ষা নাড়া দিয়ে ওঠা।
* দৃষ্টি অবনমিত রাখতে না পারা।
* জটিল শিক্ষা-ব্যবস্থা ও তা কাজে না লাগার অনুভূতি।
* গোপন কু-অভ্যাস。
* দরিদ্রতা ও অর্থসংকট。
* একপেশে ভালোবাসা।
* মাদকদ্রব্যের সয়লাব।
* ধূমপান।
* তাদের একজনের সমস্যা ছিল, সে মুঠোফোন ক্রয় করতে চায়; কিন্তু তার বাবা তা প্রত্যাখ্যান করেন।
এই ছিল কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের যুবসমাজ কর্তৃক পেশকৃত সমস্যাবলী। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তারা মিসরীয় যুবসমাজের প্রতিনিধিত্ব করে; বরং বলা যায়, তারা মুসলিম বিশ্বের যুবসমাজের প্রতিনিধি। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, তারা হলো উম্মাহর উৎকৃষ্ট যুবসমাজের নির্বাচিত অংশ। কারণ, তারা শিক্ষিত ও আলোকিত বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া যুবসমাজ। যেকোনো বিষয় সুচিন্তিত উপায়ে বাস্তবায়িত করার যোগ্যতা ও ক্ষমতা তাদের আছে। এমনকি তারা এই 'যুবসমাজের সমস্যাবলী' শীর্ষক ইসলামী ভাবধারার সেমিনারে উপস্থিত হওয়ার তীব্র অপেক্ষায় সময় পার করছিল। সুতরাং বলা যায়, তারা বিশ্ব প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে যেসব সমস্যা উল্লেখ করেছে, তা বর্তমান বিশ্ব যুবসমাজের সমস্যাবলীর সার নির্যাস।
তবে তারা যে এসব সমস্যা উল্লেখ করবে আমি তা আশা করিনি। কারণ, এগুলো যুবসমাজের প্রকৃত সমস্যা নয়। এসব সমস্যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে প্রধান হিসেবে চোখে পড়লেও এর বাইরে এমন অনেক সমস্যা রয়েছে- আমার ধারণামতে- যা আরও গুরুতর ও জটিল।
উদাহরণস্বরূপ যেসব জটিল সমস্যা তারা উল্লেখ করেনি, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. আজ অধিকাংশ মুসলিম দেশে শরিয়া আইন বাস্তবায়ন না হওয়া, মানবরচিত আইন ও নীতিমালার প্রতি আস্থাশীল হওয়া এবং কুরআন-সুন্নাহ বিমুখ হওয়া।
২. অনেক মুসলিম ভূখণ্ড অমুসলিম শক্তি কর্তৃক বে-দখল হয়ে যাওয়া। বিশেষতঃ ফিলিস্তিন, ইরাক, কাশ্মীর, চেচনিয়া ও আফগানিস্তান। এসব ভূখণ্ডে মুসলমানরা অন্যায়-অবিচার, জুলুম-হত্যা ও নির্মম অত্যাচারের শিকার।
৩. মিডিয়া কর্তৃক ইসলামকে লক্ষ্য করে সাঁড়াশি আক্রমণ এবং প্রকাশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরাম ও আলেম-ওলামাকে গালিগালাজ ও সমালোচনা করা। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া তথা দৈনিক পত্র-পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন ও ইন্টারনেটে এই অশুভ কর্মের মহড়া আজ খুব স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪. অধিকাংশ মুসলিম দেশ আজ অপরিশোধ্য ঋণে জর্জরিত। বাহ্যত এ ঋণ থেকে বেরিয়ে আসা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
৫. প্রশাসনিক দুর্নীতি, স্বচ্ছতার অভাব, সুদ-ঘুষ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, জালিয়াতি, আত্মসাৎ, মিথ্যা অপবাদ, যেসব অনৈতিক কার্যাবলী মুসলিম বিশ্বকে সভ্য ও উন্নত দেশের তালিকার একেবারে নীচের দিকে ঠাঁই দিয়েছে। শুধু একটি দেশ প্রশাসনিক নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার মানদণ্ডে শতকরা ৫৩ ভাগ উত্তীর্ণ হতে পেরেছে। সেই দেশটি হলো মালয়েশিয়া। আর তিউনিসিয়া হলো শতকরা ৫০ ভাগ। অন্য সকল মুসলিম দেশ আমানতদারি ও চারিত্রিক গুণাবলিতে চরম অধঃপতনের শিকার!![1] [উল্লেখ্য যে, ইসরায়েল এর মতো দেশও নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার মানদণ্ডে শতকরা ৬৮ ভাগ উন্নতি সাধন করতে পেরেছে।
৬. জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়া। কারিগারি ও সৃজনশীল শিক্ষা খাতে জাতীয় অর্থনৈতিক বাজেট কম হওয়া। আরব দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণা কাজে জাতীয় অর্থনৈতিক বাজেটের ০.৬ ভাগের বেশি বরাদ্দ করা হয় না। যা খুবই নগণ্য। অন্যদিকে ইসরায়েল এ খাতে ২.৪ ভাগ বরাদ্দ করে!
৭. বিশ্বের বহু অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত না পৌঁছা। মানবজাতির একটা বৃহদাংশ এখনো ইসলামের বাণী শোনেনি। অথবা শুনে থাকলেও মিথ্যা কিংবা বিকৃত বাণী শুনেছে। অথচ মুসলিম উম্মাহ'র জন্য ফরজ, ভূপৃষ্ঠের প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো।
একটু ভেবে দেখুন! যুবসমাজ কর্তৃক উল্লেখিত সমস্যাবলি ও আমি যেসব সমস্যার কথা উল্লেখ করলাম, যে সমস্যাগুলোর কথা যুবকদের অনুসন্ধানে বের হয়ে আসেনি, এগুলোর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য কী?
একটু বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাবেন, এ দুইয়ের মাঝে মৌলিক পার্থক্য হলো, যুবকদের উল্লেখকৃত সমস্যাগুলো হলো ব্যক্তিগত সমস্যা। আর আমি যে সমস্যাবলির কথা উল্লেখ করেছি, সেগুলো সামগ্রিক ও জাতিগত। গোটা মুসলিম সমাজ যে সমস্যায় আক্রান্ত।
এখানে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, মুসলিম যুবসমাজ তাদের এক ভয়াবহ দিক উন্মোচন করেছে। তা হলো, তারা আজ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। জাতিকে নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। সবাই শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এটা উম্মাহর জন্য ভয়াবহ বিপদের অশনি সংকেত। কারণ, উল্লিখিত প্রধান প্রধান সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগ দরকার। সেখানে মূল বিষয়টি যদি যুবসমাজের মাথা থেকে দূর হয়ে যায়, তাহলে তা অবশ্যই ভাববার বিষয়!!
প্রশ্ন হলো, আজকের যুবসমাজ কেন জাতির প্রধান প্রধান সমস্যাগুলো নিয়ে চিন্তিত নয়?
বস্তুতঃ আজ মুসলিম যুবসমাজ এমন কিছু মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত, যা গুরুত্বসহ দ্রুত চিকিৎসা করা বাঞ্ছনীয়। এ সকল ব্যাধির মাঝে অন্যতম ব্যাধি হলো, 'জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিষ্কার না থাকা'। যুবসমাজ আজ নিজেদের মূল্য জানে না। জানে না জীবনে তার ভূমিকা কী? জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ আজ বহু যুবকের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এমনকি কেউ কেউ তো কেবল গাড়ি বা ফ্লাটের মালিক হওয়া এ জাতীয় বৈষয়িক বিষয়কে নিজেদের প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করে। যদিও আমি জানি এধরনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হারাম নয়। তদুপরি এ কথা স্বীকৃত যে, এগুলো জীবনের মহৎ কোনো লক্ষ্য হতে পারে না। আফসোস, মহান লক্ষ্যের কথা আজ মানুষ ভুলতে বসেছে। তুচ্ছ-নগণ্য লক্ষ্যগুলো বেশিরভাগ যুবকের কাছে আজ মহান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। এটি বড় ধ্বংসাত্মক ব্যাপার। যেন যুব সমাজ বলতে চায়-
إِنْ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِين (المؤمنون)
'আমাদের জীবন তো কেবল পার্থিব (দুনিয়াবী) জীবন। (এখানেই) আমরা মরব, বাঁচব। আমরা আর পুনরুত্থিত হবো না।'[2]
আজ মুসলিম যুবসমাজ অর্থহীন বিনোদন, আমোদ-ফুর্তি, আনন্দ-উল্লাস, খাবার- দাবারের পেছনেই ব্যস্ত থাকে। অন্যকিছুতে তারা মনোযোগী হয় না।
যুবসমাজের অধিকাংশই এই নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। ফলে জাতি আজ সমস্যার অথৈই সমুদ্রে ডুবু ডুবু প্রায়। আর যুবসমাজ দূর থেকে দেখছে ও মজা করছে। যেন বিষয়টি তাদের কাছে কোন গুরুত্বই রাখেনা। অথচ তারা ভালোভাবেই জানে যে, গোটা জাতির সাথে তাদের ধ্বংসও অনিবার্য। কারণ, তারা ঐ জাতিরই অংশ। এ জাতির দেশ, ধর্ম ও ভবিষ্যত তাদেরই দেশ, ধর্ম ও ভবিষ্যত।
যুবকদের অন্তরে আজ এ ধারণা বদ্ধমূল যে, তারা বয়সে এখনো অনেক ছোট; যেন এ সকল কঠিন সমস্যার সমাধান নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা তাদের উচিত নয়। তারা মনে করে, তাদের জীবনের এই সময় কেবল বিনোদন, পিকনিক, বনভোজন ইত্যাদি আনন্দদায়ক কাজে ব্যয় করার জন্য। আর সামান্য কিছু সময় পরীক্ষা, ক্লাস ও অল্প কিছু কাজে ব্যয় করতে হবে!!
যে প্রশ্নটি আমাকে দিশেহারা করে রেখেছে তা হলো, যুবসমাজ কি আসলেই ছোট? তাদের বয়স কি বাড়বে না? আর বয়সের ছোট হওয়াই কি ছোট হওয়ার মূল মাপকাঠি? নাকি প্রকৃত ছোট হওয়ার মূল মাপকাঠি হলো চিন্তা, বুদ্ধি, চরিত্র, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে ছোট হওয়া?
ইসলামে শিশুর সংজ্ঞা মানবরচিত সংজ্ঞার চেয়ে অনেক ভিন্ন। এই ভিন্নতার কারণে বহু বিষয়ে ভিন্নতা সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ- জাতিসংঘ শিশুর সংজ্ঞা দিয়েছে- যে সন্তান আঠারো বছরে উপনীত হয়নি, তাকে শিশু বলা হবে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে শিশু হলো, যে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি। ইসলাম প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সময় নির্ধারণ করেছে ১৩ বা ১৪ বছর। সুতরাং শিশু এই বয়সে উপনীত হলে তাকে যুবক বলা হবে। আর তখনই তার ওপর নানা বিধান আরোপিত হবে। তখন তার কথাবার্তা, কাজকর্ম তথা সবকিছু শরিয়ত মোতাবেক হতে হবে এবং সবকিছু সম্পর্কে তাকেই জবাবদিহি করতে হবে। হয়তো তার সম্পর্কে তার পিতা-মাতা, শিক্ষক-উস্তাজ বা সমাজকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। কারণ, সে এখনও তাদের দৃষ্টিতে ছোট। কিন্তু কেয়ামত দিবসে অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা তাকে তার প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরের সব কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। যদিও তার বয়স এখনো ১৩, ১৪ বা ১৫ বছর। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা- যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তার সক্ষমতা-পারদর্শিতা সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকেফহাল- তাই তার প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরের সময়ের বিস্তারিত হিসাব গ্রহণ করবেন। কারণ, আল্লাহ তা'আলা জানেন, এই বয়সে শিশু উপনীত হলে সে গভীরভাবে চিন্তা করতে সক্ষম হয়। ভালোভাবে কাজ করতে পারে। সততার সাথে চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে পারে।
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ (الملك).
'যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি জানেন না? তিনি সূক্ষ্মদর্শী। সম্যক অবগত।'[3]
বরং মানুষের বয়সের এই সময়কাল তথা ১৩/১৪ থেকে ১৮ বছর হলো যৌবনকাল- এই সময় সম্পর্কে কেয়ামত দিবসে বিশেষভাবে প্রশ্ন করা হবে। ইমাম তিরমিযী রহ. হযরত ইবনে মাসউদ রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لَا تَزُولُ قَدَمُ ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلٌ ، حَتَّى يَسْأَلَهُ عَنْ خَمْسٍ : عَنْ عُمْرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ ، وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلَاهُ ، وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ ، وَفِيمَا أَنْفَقَهُ ، وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ. (رواه الترمذي)
'কোন আদমসন্তান কেয়ামতের দিন আল্লাহ রব্বুল আলামীনের সামনে থেকে এক কদম সরতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ না করবেন। যথা: ১. তোমার জীবন তুমি কীভাবে কাটিয়েছ? ২. যৌবন কীভাবে কাটিয়েছ? ৩. সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছ? ৪. সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছ? ৫. আর যা জেনেছ সে অনুযায়ী কী আমল করেছ?'[4]
এই হাদীসে যৌবনকালের মূল্য ও গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। যৌবনকাল যদিও জীবনের একটি সীমিত সময়ের নাম, তবুও আল্লাহ তা'আলা এই সময়কে কেন্দ্র করে কেয়ামতের দিন নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন করবেন। যদি হাদীসে কেবল জীবনের কথা উল্লেখ করা হতো, তবু অর্থ পূর্ণতা পেত। কারণ, যৌবন তো জীবনেরই অংশ। তারপরও পৃথকভাবে যৌবনের কথা উল্লেখ করে এ কথা বোঝানো হয়েছে যে, মানবজীবনে এ সময়ের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যেমন যুবক তুলনামূলকভাবে বয়সে ছোট হলেও কেয়ামত দিবসে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তার হিসাব নেওয়া হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত সে জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলোর উত্তর দিতে না পারবে, ততক্ষণ সে পুলসিরাত পার হতে পারবে না এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। সেই বিশেষ মুহূর্তগুলোর অন্যতম হলো যৌবনকাল।
ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. হযরত আদী ইবনে হাতেম রা. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَا مِنْكُمْ أَحَدٌ إِلَّا سَيُكَلِّمُهُ رَبُّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ تُرْجُمَانٌ ، فَيَنْظُرُ أَيْمَنَ مِنْهُ فَلَا يَرَى إِلَّا مَا قَدَّمَ ، وَيَنْظُرُ بَيْنَ يَدَيْهِ فَلَا إِلَّا مَا قَدَّمَ مِنْ عَمَلِهِ ، وَيَنْظُرُ أَشْأَمَ مِنْهُ فَلَا يَرَى إِلَّا مَا يَرَى إِلَّا النَّارَ تِلْقَاءَ وَجْهِهِ ، فَاتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ. (متفق عليه)
'কেয়ামত-দিবসে প্রত্যেকের সাথে আল্লাহ তা'আলা সরাসরি কথা বলবেন। মাঝে কোনো দোভাষী থাকবে না। বান্দা ডানে তাকালে কেবল নিজের কৃতকর্ম দেখতে পাবে। বামে তাকালে কেবল নিজের কৃতকর্ম দেখতে পাবে। সামনে তাকালে কেবল জাহান্নামের আগুন দেখতে পাবে। সুতরাং তোমরা জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকো এক টুকরো খেজুরের বিনিময়ে হলেও।'[5]
উক্ত হাদীসে এ কথা পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে যে, কেয়ামতের দিন কেউ প্রশ্ন থেকে মুক্তি পাবে না। বয়স-জাতি-রঙ-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সেদিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, যৌবনকালকে অর্থহীন বিনোদন, আনন্দ-ফুর্তি ও দায়িত্বহীনতায় কাটানো বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার পরিপন্থী। বিবেকের দাবি হলো, যৌবনকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো। কারণ, যৌবন কোথায় ব্যয় হয়েছে, এ সম্পর্কে অবশ্যই প্রত্যেকে জিজ্ঞাসিত হবে।
মোটকথা আল্লাহ তা'আলা- যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং বিধানাবলি আরোপ করেছেন- প্রত্যেক যুবকের মাঝে এমন সব যোগ্যতা দান করেছেন, যার মাধ্যমে তারা তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য যথাযথভাবে আদায় করতে সক্ষম হয়। এর আলোকে বলা যায়, আল্লাহর তৌফিকে যুবসমাজ জাতির যাবতীয় সমস্যার সমাধান করতে পূর্ণ সক্ষম।
মুসলিম জাতির যুবসমাজের জন্য এটা কোনো নতুন বিধান নয়; পৃথিবীতে বহু জাতির ভাগ্য ও ইতিহাস যুবসমাজের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যেন এ জাতির যুবসমাজকে কল্যাণ ও হেদায়েতের পথে পরিচালিত করেন।
টিকাঃ
১. বর্তমানে আরো কিছু মুসলিম দেশ অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে। যেমন ব্রুনাই, কাতার, আরব আমীরাত, তুরস্ক, মরক্কো, সেনেগাল ও ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি।
২. সূরা মুমিনুন (২৩): ৩৭
৩. সূরা মুলক (৬৭): ১৪
৪. তিরমিযী: ২৩৫৩
৫. বুখারী: ৬৯৮১
📄 ইসলামে যৌবনকালের মর্যাদা ও গুরুত্ব
ইসলামধর্মে যৌবনকালের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামী ইতিহাসের পাঠকমাত্রই জানেন, মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে যত বড় বড় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তা তৎকালীন যুবসমাজের হাতেই হয়েছে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি পূর্ব-নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা, যা বারংবার পুনরাবৃত্ত হয়।
চলুন একটু ইসলামী ইতিহাসের দিকে তাকাই...
ওহী নাজিলের শুরুরদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন?
কাদের ইসলামের অনুসারী বানানো হয়েছিল?
ইসলামের আমানত কাদের প্রতি ন্যস্ত করা হয়েছিল?
গোটা মক্কা নগরীর জীবন যাত্রা পরিবর্তনের দায়িত্ব কাদের হাতে দেওয়া হয়েছিল?
গোটা বিশ্ববাসীর জীবন পরিবর্তনের দায়িত্ব শুধু তৎকালের জন্য নয়, বরং কেয়ামত পর্যন্ত কাদেরকে দেওয়া হয়েছিল?
কারা ইসলামের অগ্রগামী দল? কারা ইসলামের অগ্রগামী সৈনিক?
কারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম? যাদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ. (متفق عليه)
'সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষেরা। এরপর পরবর্তী যুগের মানুষেরা। তারপর পরবর্তী যুগের মানুষেরা।'[6]
হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
কারা মক্কার কাফের মুশরিকদের মোকাবেলা করেছিল?
কারা আরব উপদ্বীপের মূর্তির পূজার বিরোধিতা করেছিল?
কারা রোম-পারস্যের দুর্গগুলোকে ভেঙে খানখান করে দিয়েছিল? কারা কিসরা-কায়সারের (খসরু-সীজার) প্রাসাদে কম্পন সৃষ্টি করেছিল? কারা শিরকের সমুদ্রে স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটেছিল? হে যুবকসম্প্রদায়, তারা কারা? তাদের পরিচয় কী? ইতিহাস পাঠ করে দেখো। সীরাত অধ্যয়ন করো। নিম্নোক্ত উদাহরণগুলো পড়ে দেখো-
টিকাঃ
৬. বুখারী: ২৬৫২
📄 তরুণ যুবাইর ইবনে আওয়াম রা.
ইসলামের অন্যতম যোদ্ধা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিশিষ্ট সাহাবী, দুঃসাহসী সৈনিক, বীর-বাহাদুর, ইসলামী দাওয়াতের অন্যতম স্তম্ভ হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম রা.। ইসলাম গ্রহণের সময় এই মহামনীষীর বয়স কত ছিল? তখন তার বয়স ছিল মাত্র পনেরো বছর!! অর্থাৎ আমাদের বর্তমান সময় অনুযায়ী সর্বোচ্চ নবম বা একাদশ শ্রেণি পড়ুয়া ছাত্রের বয়সের।
আজকের একজন মাধ্যমিক বা উচ্চ-মাধ্যমিক পড়ুয়া ছাত্র কি সেই চিন্তা-ভাবনা করে, সেই স্বপ্ন দেখে, সেই আশা ব্যক্ত করে ও সেই রকম আমল করে, যেমন হযরত যুবাইর ইবনে আওয়ام রা. সেই বয়সে চিন্তা-ভাবনা করতেন, স্বপ্ন দেখতেন, আশা ব্যক্ত করতেন ও আমল করতেন? নিশ্চয় এখানে কোন গলদ আছে।
তাই ভাবা দরকার। নিজেদের হিসাব-নিকাশ ও আত্মসমালোচনার জন্য একটু ভাবা দরকার।
কেন আজ মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক এমনকি ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্রের মেধায় সে সকল বস্তু স্থান পায় না, যা দেশ-জাতি নির্বিশেষে গোটা বিশ্বের জন্য কল্যাণকর? কেবল কতিপয় অশ্লীল সিনেমা, ধ্বংসাত্মক গান-বাজনা, জীবন-বিধ্বংসী বিনোদন ছাড়া তাদের মাথায় অন্য কিছু জায়গা পায় না? কেন তারা টেলিভিশন, ভিডিওগেম ও ইন্টারনেটের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে? কেন তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিলিয়ার্ড হলে ও নীলনদের তীরে সময় নষ্ট করে? অথচ সামান্য সময় দ্বীন, ইলম, দাওয়াত, মহৎ উদ্দেশ্য বা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যয় করে না? এ বিষয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করা দরকার!!