📄 তাশরিকের দিনগুলো [১১, ১২ ও ১৩ই যিলহজ্জ]
ঈদের দিন তাওয়াফে ইফাযার পর মিনা ফিরে যাবে। রাত্রি অবশ্যই সেখানে যাপন করতে হবে। কারণ, নবীজি কাউকে মক্কায় থাকার অনুমতি দেননি। শুধু আব্বাস রাযি.-কে লোকদের পানি পান করানোর স্বার্থে অনুমতি দিয়েছিলেন। [ইবনে মাজা]
তাই তিন রাত মিনায় অবস্থান করবে [একাদশ তারিখের রাত (দশ তারিখ দিবাগত রাত), দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ তারিখের রাত]। এই তিন রাত সেখানে অবস্থান করবে, যদি তাড়া না থাকে। আর তাড়া থাকলে দু' রাত অবস্থান করবে। মিনায় সালাত কসর করবে। তবে জমা' বাইনাস্সালাতাইন করবে না, অর্থাৎ একই ওয়াক্তে দু' ওয়াক্তের সালাত পড়বে না। বরং প্রত্যেক সালাত নিজ নিজ ওয়াক্তে আদায় করবে।
তাশরিকের তিন দিনই সূর্য ঢলে যাওয়ার [যোহরের আযানের] পর রমিয়ে জিমার করবে। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, 'আমরা অপেক্ষা করতাম। সূর্য হেলে পড়লে আমরা রমি করতাম।' [সহিহ বুখারি]
হাদিস শরিফে نَتَحَيَّنُ শব্দ এসেছে। যার অর্থ হল, আমরা সূর্যের দিকে লক্ষ রাখতাম। যোহরের সময় হলে আমরা রমি করতাম। তা ছাড়া নবীজি ইরশাদ করেছেন, 'আমার থেকে তোমাদের হজ্জের আহকাম শিখে নাও।' [সহিহ মুসলিম]
এগারো তারিখ ও এর পরের দিনগুলোয় রমির সময় শুরু হবে সূর্য ঢলে পড়ার পর। এর আগে রমি করলে শুদ্ধও হবে না, রমির দায়িত্বও আদায় হবে না। সালাত যেমন সময়ের আগে পড়লে তা আদায় হয় না, তেমনি রমিও সময়ের আগে করলে আদায় হয় না। [সমকালীন কোনো কোনো আলেম অবশ্য এ ব্যাপারে অবকাশ রেখেছেন।] মুতাকাদ্দেমিনদের কেউ কেউ তাশরিকের দিনগুলোয় দ্বিপ্রহরের আগে রমি করার অবকাশ রেখেছেন। কারণ, নবীজি দ্বিপ্রহরের পর রমি করেছেন বটে, কিন্তু এর আগে রমি করতে নিষেধ করেননি। আর হজ্জের মধ্যে কোনো কাজ আগ বা পর হওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছেন, 'করো। ক্ষতি নেই।' আর দ্বিপ্রহরের আগে রমি করার অনুমতি থাকলে লোকদের জন্য সহজ হয়, বিশেষ করে এই প্রচণ্ড ভিড়ের সময়। আর আগে ইবনে উমর রাযি.-র যে হাদিসটি উল্লেখ হয়েছে, তা হল একটি আমলের বর্ণনা। তবে উত্তম হল রাসুল যে বলেছেন, 'আমার থেকে তোমরা তোমাদের হজ্জের আহকাম শিখে নাও', সেটার ওপর আমল করা। আর রাসুল দ্বিপ্রহরের পরই রমি করেছেন।
রমির সময় প্রথমে নিক্ষেপ করবে ছোটটা, এরপর মেঝোটা, এবং এরপর বড়টা। প্রত্যেক জমরার জন্য সাতটি পাথর। প্রতিটি পাথর নিক্ষেপের সময় তাকবির বলবে। সুন্নাত নিয়ম হল, ছোটটিতে রমি করে একটু আগে বাড়বে এবং সেটাকে বাম পাশে রাখবে। এরপর ক্বিবলার দিকে ফিরবে। হাত তুলে দীর্ঘ সময় দোয়া করবে। মাঝেরটাতে রমি করার পর সামনে এগোবে, এবং সেটাকে ডান দিকে রাখবে। ক্বিবলার দিকে ফিরে হাত তুলে দীর্ঘ সময় দোয়া করবে। আর জামরায়ে-কুবরার মধ্যে পাথর নিক্ষেপের পর সেখানে দাঁড়িয়ে দোয়া করবে না। কারণ, নবীজি এমনই করেছেন। [সহিহ বুখারি]
রোগাক্রান্ত বা বৃদ্ধ ব্যক্তি এবং গর্ভবতী বা দুর্বল মহিলারা রমি করার জন্য তাদের পক্ষ থেকে কাউকে প্রতিনিধি বানাতে পারবেন। আর প্রতিনিধি প্রতিটি জামরাতে প্রথমে নিজের পক্ষ থেকে সাতটি পাথরকণা নিক্ষেপ করবে। এরপর যার প্রতিনিধিত্ব করছে, তার পক্ষ থেকে সাতটি পাথরকণা নিক্ষেপ করবে।
১২ তারিখে রমি করার পর হাজি ইচ্ছা করলে মিনা থেকে চলে যেতে পারে। তবে যেতে হবে সূর্যাস্তের পূর্বে। আর চাইলে রাত্রি যাপন করে ১৩ তারিখে দ্বিপ্রহরের পর রমি করে আসবে। এটাই উত্তম। আল্লাহ্ ইরশাদ করেন— ۞ فَمَنْ تَعَجَّلَ فِي يَوْمَيْنِ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ ۚ وَمَنْ تَأَخَّرَ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ لِمَنِ اتَّقَى ۗ 'আর যে দুদিনের মধ্যে জলদি করে চলে যায়, তার কোনো গোনাহ হবে না। আর যে বিলম্ব করে, তারও কোনো গোনাহ হবে না, যে আল্লাহকে ভয় করে, তার জন্য।' [সূরা বাকারা : আয়াত: ২০৩]
আর যদি ১২ তারিখে মিনা হতে রওয়ানা হতে হতে সূর্যাস্ত হয়ে যায়, তা হলে তাকে বিলম্ব করতে হবে। রাত্রিও যাপন করতে হবে, এবং ১৩ তারিখের রমিও করতে হবে।
হজ্জ শেষ করার পর কেউ যদি নিজ শহরে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা করে বা অন্য কোথাও সফর করার ইচ্ছা করে, তা হলে সফর করার পূর্বে তাকে বিদা'য়ি তাওয়াফ করতে হবে।
📄 ভোর হয়েছে কি
হাসান বিন সালেহ-র এক দাসী ছিল। একব্যক্তি তাকে কিনে নিল। নতুন মনিবের নিকট যাওয়ার পর রাতের অর্ধেক হলে বাড়িতে চিৎকার করতে শুরু করল, 'সবাই উঠো। সালাত! সালাত!' গভীর রাতে চিৎকার শুনে সবাই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তাকে জিজ্ঞাসা করল, 'ভোর হয়েছে কি?' সে বলল, 'তোমরা কি ফরজ সালাত ছাড়া আর কিছু পড় না?' এরপর সে সালাতে দাঁড়িয়ে গেল।
ভোরবেলায় সে আগের মনিবের নিকট গেল। বলল, 'আমাকে তো আপনি একটি মন্দ সম্প্রদায়ের নিকট বিক্রয় করেছেন। ওরা ফরজ সালাত ছাড়া অন্য সালাত পড়ে না। ফরজ সওম ছাড়া অন্য সওম রাখে না। আমাকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনুন।' তিনি তাকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনলেন।
আমাদেরকে দেখলে ওই দাসী কী বলত? যদি দেখতে পেত আমাদের যুগের একদল মুসলমান এমন আছে যাদের দিনগুলো পেরিয়ে যাচ্ছে, অথচ তারা বিছানার ওপর শুয়ে শুয়ে এদিক-ওদিক করছে। রাতেও সালাত পড়ে না। ফজরের সালাতেও যায় না। তাদের অবস্থা ঠিক তেমন, যেমনটা আল্লাহ বলেছেন— فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيَّا 'তাদের পর এল এমন একটি অকর্মণ্যের দল, যারা সালাত নষ্ট করল এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করল। অতিশীঘ্রই তারা পথভ্রষ্টতা প্রত্যক্ষ করবে।' [সূরায়ে মারয়াম: আয়াত ৫৯]