📄 মহিলাদের সওমের মাসআলা
স্বামী সাথে থাকলে তার অনুমতি ব্যতীত স্ত্রী নফল সওম রাখবে না। স্বামী সফরে চলে গেলে কোনো অসুবিধে নেই।
রাতের বেলায় হায়েয [মেয়েদের মাসিক] বা নেফাস [সন্তান প্রসবের পরে বের হওয়া রক্ত] থেকে পবিত্র হল, এবং সওমের নিয়্যত করল। গোসল করার আগেই সূর্যোদয় হল। তার সওম শুদ্ধ হবে।
হায়েয বন্ধ করার ঔষধ ব্যবহার না করাই সমীচীন। উত্তম হল, স্বাভাবিক নিয়মে চলা, আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। পরবর্তীতে হায়েযের সওমগুলোর কাজা রাখা। তা ছাড়া হায়েযের প্রতিবন্ধক ঔষধ ব্যবহারে ক্ষতির দিকও আছে। অনেক মহিলাই এর ভুক্তভোগী। তারপরও কোনো মহিলা যদি এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করে সওম রাখে, তা হলে তার সওম আদায় হয়ে যাবে।
ইস্তিহাযার রক্তের ফলে সওমের কোনো ক্ষতি হবে না। [ইস্তিহাযা হল; মেয়েদের মাসিকের নির্দিষ্ট সময়ের পরে বের হওয়া রক্ত বা নেফাসের চল্লিশ পরে বের হওয়া রক্ত]
গর্ভপাত হল। সন্তান যদি পূর্ণাঙ্গ হয় বা তার কোনো অঙ্গ প্রকাশ পায়, তা হলে গর্ভপাতের পরে যে রক্ত বের হবে, তা নেফাস হবে। আর যদি তা জমাটবদ্ধ রক্ত বা মাংসপিণ্ড হয়, মানুষের কোনো অঙ্গ প্রকাশ না পায়, তা হলে সে রক্ত ইস্তিহাযা হবে। পারলে সওম রাখবে। নচেৎ সওম ভঙ্গ করবে। পরে তার কাজা রাখবে।
তদ্রূপ যদি অস্ত্রোপচার করে [পেট] পরিষ্কার করা হয়, এবং রক্ত সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়, তা হলে সওম রাখলে সওম শুদ্ধ হবে।
চল্লিশ দিনের আগেই নিফাসের রক্ত বন্ধ হয়ে গেছে। তা হলে সওম রাখবে এবং সালাত পড়বে। আবার যদি চল্লিশ দিনের মধ্যেই রক্ত আসে, তা হলে সওম রাখবে না। কারণ, এটা নিফাস। আর যদি চল্লিশ দিনের পরও চলতে থাকে, তা হলে সওম রাখবে এবং গোসল করবে। [এটা সকল ইমামের মত।] আর যে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, সেটাকে ইস্তিহাযা ধরা হবে। তবে তা যদি হায়েযের সময়ের হয়, তা হলে সেটাকে হায়েয ধরা হবে।
দিনের বেলায় সওম রাখল। রাতে তার কাপড়ে রক্তের ফোঁটা দেখতে পেল। জানতে পারল না, সওম চলাকালে বেরিয়েছে, না কি পরে। তা হলে তার সওম শুদ্ধ হবে। [আল্লাজনাতুদ্দায়েমা]
গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিণীর জন্য যদি সওম রাখা কষ্টকর হয়, তা হলে তাদের হুকুম পীড়াগ্রস্ত ব্যক্তির মত—প্রয়োজনের সময় সওম ভঙ্গ করতে পারবে, এবং তাদের শুধু কাজা রাখতে হবে, চাই তাদের নিজেদের প্রাণের আশঙ্কা হোক বা সন্তানের। নবীজি ইরশাদ করেছেন— আল্লাহ তাআলা মুসাফিরকে সওম থেকে দায়মুক্ত করে দিয়েছেন, এবং সালাত অর্ধেক করে দিয়েছেন। আর গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিণীকেও সওম থেকে দায়মুক্ত করে দিয়েছেন। [সুনানে তিরমিযি]
গর্ভবতী মহিলা সওম রাখল এবং তার রক্তস্রাব হল। তার সওম শুদ্ধ হবে। কারণ, এটা হায়েয নয়। [আল্লাজনাতুদ্দায়েমা]
📄 রামাদানের সওমের কাজা আদায় করার আহকাম
সওম কাজা রাখার ব্যাপারে জলদি করা মুস্তাহাব। এতে তার জিম্মা থেকে মুক্ত হতে পারবে। বিরতিহীনভাবে কাজা রাখা জরুরি নয়। বিলম্ব করেও কাজা রাখা জায়েয আছে। কারণ, কাজার সময় প্রশস্ত। তবে আরেক রামাদানের পর পর্যন্ত বিলম্ব জায়েয হবে না। অবশ্য কোনো উযর থাকলে ভিন্ন কথা।
কেউ মারা গেল। তার জিম্মায় কিছু সওম আছে। তা হলে তার [নিকটবর্তী] অভিভাবকের জন্য মুস্তাহাব হল তার পক্ষ থেকে কাজা করা। কারণ, এক মহিলা এসে নবীজি-কে জিজ্ঞাসা করল, 'আমার মা মারা গেছেন। তার ওপর মান্নতের কিছু সওম আছে। আমি কি তার পক্ষ থেকে সওম রাখব?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' [সহিহ বুখারি, মুসলিম]
তার পক্ষ থেকে যদি তার অভিভাবক সওম না রাখে, তা হলে প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে এক মিসকিনকে খাওয়াবে।
📄 আল্লাহর অনুগত হয়ে সালাতে দাঁড়াও
আবু যুরআ এক মসজিদের ইমাম ছিলেন। বিশ বছর ধরে সেখানে সালাত পড়াচ্ছিলেন। তার নিকট হাদিস পড়ার জন্য একদিন কয়েকজন ছাত্র এল। মেহরাবের দিকে তাকিয়ে তারা সেখানে কিছু লেখা দেখতে পেল। তাকে বলল, 'মেহরাবে কিছু লেখার ব্যাপারে কী হুকুম?' তিনি বললেন, 'আগের দিনের অনেক আলেমই এটা অপছন্দ করেছেন। আর আমিও তা থেকে নিষেধ করি এবং অপছন্দ করি।' তারা বলল, 'ওই তো! আপনার মেহরাবেই তো লেখা দেখা যাচ্ছে। আপনি কি তা জানেন না?' তিনি বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! কী যে বলো! বান্দা আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে, আর তার সামনে কী আছে, তা জানবে!'
শো'বা বিন হাজ্জাজ সালাত লম্বা করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, 'যখনই আমি তাকে রুকু' তে দেখেছি, তার দীর্ঘ রুকু'র কারণে আমার ধারণা হয়েছে, তিনি ক্বাওমা করতে ভুলে গেছেন। যখনই দুই সেজদার মাঝখানে বসেছেন, আমার মনে ধারণা জন্মেছে, পরের সেজদা করতে তিনি ভুলে গেছেন।'
উবাইদা বিন মুহাজির অনেক বড় আবেদ ছিলেন। আল্লাহ-র নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা সব সময় আদায় করতেন। বিনয়ী ও যিকিরকারী ছিলেন। তার মা ছিলেন অগ্নিপূজক। মায়ের সাথে অত্যন্ত সৎ ব্যবহার করতেন। তাকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। কিন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করতেন। একদিন আসরের সালাত থেকে এলে তার মা তাকে সুসংবাদ শোনালেন—তিনি মুসলমান হয়েছেন, কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করেছেন। এতে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করার জন্য সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। কান্নাকাটি করতে লাগলেন। যখন মাথা তুললেন, ততক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে।
হাফসা বিনতে সিরিন রাতের বেলায় বাতি জ্বালিয়ে সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। কাছেই কাফন রেখে দিতেন, যেন মৃত্যুর কথা স্মরণ হয় এবং অন্তর বিগলিত হয়।
📄 গাধাকে ঘাস খাওয়াত্ত
সুফিয়ান সওরি-র ঘটনা। তাঁর ছাত্র আব্দুর রাজ্জাক বর্ণনা করেন, “একবার সুফিয়ান সওরি রহ. ইশার সালাতের পর আমার নিকট আগমন করলেন। তাঁর সামনে রাতের খাবার পেশ করলাম। কিশমিশ ও বাদামও সামনে রাখলাম। তিনি বেশ খেলেন। খানা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন। অযু করলেন। এরপর কোমরে ভালভাবে ইজার বাঁধলেন। ক্বিবলামুখী হলেন। বললেন, 'আব্দুর রাজ্জাক! লোকে বলে, গাধাকে খাওয়াও। এরপর তাকে দিয়ে পরিশ্রম করাও'। এরপর তিনি সালাতে দাঁড়ালেন। সকাল পর্যন্ত সালাত পড়লেন।”
ইবনে ওহব বলেন, 'সুফিয়ান সওরি-কে একবার আমি হারামে দেখেছিলাম। মাগরিবের পর সালাত পড়লেন। এরপর সেজদায়ে গেলেন। ইশার আযানের আগে আর মাথা তুলেননি।'
আবু মুসলিম খাওলানি একরাত সালাতে দাঁড়ালেন। তাঁর পা-দুটি ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ছড়ি দিয়ে সেগুলোকে প্রহার করতে করতে বলতে লাগলেন, 'রাসুলে ﷺ-এর সাহাবিগণ ধারণা করছেন, তারা আমাদের আগে চলে যাবেন? খোদার কসম! আমরা তাঁদের সাথে প্রতিযোগিতা করব, যেন তারা জানতে পারেন, তাঁদের পিছনে কিছু যোগ্য লোক রেখে গেছেন।'