📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 সালাতের বিস্ময়

📄 সালাতের বিস্ময়


মুহাম্মদ বিন খফিফ রহ.র কোমরে ব্যথা ছিল। সালাতের আযান হলে কারও পিঠে করে মসজিদে নেওয়া হত। তাকে বলা হল, ‘আল্লাহ তো আপনাকে মাযুর করেছেন। নিজের ওপর যদি শিথিলতা করতেন!’ তিনি বললেন, ‘মোটেই নয়! যদি কখনও আমাকে সালাতের কাতারে না দেখ, তা হলে ধরে নিয়ো, আমি কবরের মাটিতে শুয়ে আছি।’

কত সৌভাগ্যবান পীড়িত ব্যক্তি ছিলেন তাঁরা! প্রকৃত অর্থে, পীড়িত তো আমরা!

মনসুর বিন মু’তামির। রাত হলে তিনি তাঁর সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরিধান করতেন। এরপর বাড়ির ছাদে উঠতেন। সালাত পড়তেন। তিনি মারা গেলে তাঁর প্রতিবেশী এক বালক তাঁর মাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘মা! আমাদের প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদে রাতে যে খুঁটিটি দেখা যেত, ওটাকে দেখছি না!’ তিনি বললেন, ‘বেটা! ওটা খুঁটি ছিল না। ওটা ছিল মনসুর। তিনি রাতে দাঁড়িয়ে সালাত পড়তেন। তিনি মারা গেছেন।’

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 সওমভঙ্গ সম্পর্কিত বিবিধ মাসায়েল

📄 সওমভঙ্গ সম্পর্কিত বিবিধ মাসায়েল


সওমভঙ্গের যেসব কারণ বর্ণিত হয়েছে, [হায়েয ও নেফাস ছাড়া] তিনটি শর্ত পাওয়া গেলেই সেগুলো দ্বারা সওম ভঙ্গ হবে—
১. জানা থাকতে হবে যে, এটা সওম ভঙ্গের কারণ;
২. সে যে সিয়াম পালনকারী, তা তার স্মরণ থাকতে হবে;
৩. ইচ্ছাকৃত হতে হবে, কারও বাধ্য করার কারণে নয়।

কিডনি পরিষ্কার করতে রক্ত বের করতে হয়। এরপর সাথে কিছু রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত করে ভিতরে ঢুকাতে হয়। এরূপ হলে এটা সওম ভঙ্গের কারণ হবে। [আল্লাজনাতুদ্দায়েমা]

পায়ুপথে ইনজেকশন দিলে, চোখে বা কানে ঔষধের ফোঁটা ব্যবহার করলে, দাঁত উঠালে, ক্ষতস্থানে ঔষধ দিলে সওম ভঙ্গ হবে না। কারণ, এগুলো পানাহারের কাজ দেয় না।

ইনহেলার ব্যবহার করলে সওম ভঙ্গ হয় না। কারণ, এটা একটা গ্যাস, খাবার নয়। আর শ্বাসকষ্টের রোগীকেও রামাদানে এটা ব্যবহার করতে হচ্ছে।

পরীক্ষা করার জন্য যে রক্ত নেওয়া হয়, এতে সওম ভঙ্গ হবে না। বরং এটা মাফ। কারণ, প্রয়োজনের তাগিদে রক্ত বের করতে হচ্ছে। [ফাতাওয়ায়ে ইবনে বায]

গলা ও কণ্ঠনালী পরিষ্কার করার জন্য ঔষধ দিয়ে গড়গড়া করলে সওম ভঙ্গ হবে না, যদি তা গলার ভিতর না যায়।

দাঁত ছিদ্র করলে বা দাঁত উপড়ে ফেললে অথবা দাঁত পরিষ্কার করলে বা মিসওয়াক করলে কিংবা ব্রাশ ব্যবহার করলে যদি সেগুলোর কণা গিলে ফেলা থেকে বেঁচে থাকা যায়, তা হলে সওম ভঙ্গ হবে না। তদ্রূপ কেউ যদি দাঁতে কোনো ঔষধ ব্যবহার করে, এবং সেটার স্বাদ হলকে পাওয়া যায়, তা হলেও সওমের কোনো ক্ষতি হবে না।

কান পরিষ্কারের ঔষধ বা নাকের ঔষধ বা নাকের স্প্রে হলকে যাওয়ার পর সেগুলো না গিললে সওম ভঙ্গ হবে না।

দূরবীন বা স্প্রিং বা এ জাতীয় কিছু যদি জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়, বা যোনিপথে জরায়ুতে কিছু প্রবেশ করানো হয়, বা ডাক্তারি অনুসন্ধানের জন্য আঙ্গুল প্রবেশ করানো হয়, তা হলে সওম ভঙ্গ হবে না।

তদ্রূপ প্রস্রাবের থলি পরিষ্কার করার জন্য বা অন্য কোনো কারণে নারী বা পুরুষের প্রস্রাবের নালী দিয়ে যদি কোনো যন্ত্র ইত্যাদি প্রবেশ করানো হয়, তা হলেও সওম ভঙ্গ হবে না।

কুলকুচা বা গড়গড়া করলে বা মুখে ঔষধ স্প্রে করলে যদি তা গলায় না যায়, তা হলে সওম ভঙ্গ হবে না। অক্সিজেন গ্যাস গলায় গেলে সওম ভঙ্গ হবে না।

দেহে মালিশ লাগালে বা ঔষধমিশ্রিত প্লাস্টার লাগালে সওম ভঙ্গ হবে না।

হার্ট বা অন্য কিছুর ছবি গ্রহণের জন্য বা চিকিৎসার জন্য শিরার ভিতর দিয়ে সূক্ষ্ম যন্ত্র ঢুকানো হয়, এর ফলে সওম ভঙ্গ হবে না। মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডে ঢুকালেও একই হুকুম—রোযা ভঙ্গ হবে না।

অস্ত্র পরীক্ষার জন্য দেহের চামড়া ভেদ করে যে দূরবীন ঢুকানো হয়, তাতে সওম ভঙ্গ হবে না। তবে পাকস্থলীতে যদি ঢুকানো হয়, আর তাতে কিছু মিশ্রিত থাকে তা হলে সওম ভঙ্গ হয়ে যাবে, নচেৎ হবে না।

কোনো নিষ্পাপকে বাঁচানোর জন্য যদি সওম ভঙ্গ করার প্রয়োজন হয়, যেমন ডুবন্ত ব্যক্তিকে বাঁচানোর জন্য বা আগুন নেভানোর জন্য, তা হলে সওম ভঙ্গ করবে।

যে ব্যক্তি দুশমনের সাথে লড়াই করছে বা দুশমন তাকে ঘিরে ধরেছে, আর সওম রাখলে যুদ্ধক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়বে, তার জন্য সওম ভঙ্গ করা জায়েয, যদিও সে সফরে না থাকে। তদ্রূপ যুদ্ধের আগেও যদি সওম ভঙ্গের প্রয়োজন হয়, তা হলে সওম ভঙ্গ করবে। নবীজি ইরশাদ করেছেন— তোমরা তোমাদের শত্রুপক্ষের কাছে যাচ্ছ। সওম না রাখলে অধিক শক্তি পাবে। কাজেই সওম ভঙ্গ করো। [সহিহ মুসলিম]

কেউ উযরবশত রামাদানে সওম রাখল না, যেমন সফর বা রোগের কারণে সওম রাখল না। মানুষের সামনে তার জন্য খাওয়া কি জায়েয হবে? জবাব হল, যদি তার সওম ভাঙ্গার কারণটি সবার নিকট স্পষ্ট থাকে, যেমন অশীতিপর বৃদ্ধ, প্রকাশ্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, তার জন্য লোকদের সামনে কিছু খাওয়াতে দোষ নেই। আর যার সওম না রাখার কারণ সবার জানা নেই, যেমন সফর, তা হলে উত্তম হল গোপনেই খাওয়া, যেন তার ব্যাপারে কারও কু-ধারণা সৃষ্টি না হয়।

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 মহিলাদের সওমের মাসআলা

📄 মহিলাদের সওমের মাসআলা


স্বামী সাথে থাকলে তার অনুমতি ব্যতীত স্ত্রী নফল সওম রাখবে না। স্বামী সফরে চলে গেলে কোনো অসুবিধে নেই।

রাতের বেলায় হায়েয [মেয়েদের মাসিক] বা নেফাস [সন্তান প্রসবের পরে বের হওয়া রক্ত] থেকে পবিত্র হল, এবং সওমের নিয়্যত করল। গোসল করার আগেই সূর্যোদয় হল। তার সওম শুদ্ধ হবে।

হায়েয বন্ধ করার ঔষধ ব্যবহার না করাই সমীচীন। উত্তম হল, স্বাভাবিক নিয়মে চলা, আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। পরবর্তীতে হায়েযের সওমগুলোর কাজা রাখা। তা ছাড়া হায়েযের প্রতিবন্ধক ঔষধ ব্যবহারে ক্ষতির দিকও আছে। অনেক মহিলাই এর ভুক্তভোগী। তারপরও কোনো মহিলা যদি এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করে সওম রাখে, তা হলে তার সওম আদায় হয়ে যাবে।

ইস্তিহাযার রক্তের ফলে সওমের কোনো ক্ষতি হবে না। [ইস্তিহাযা হল; মেয়েদের মাসিকের নির্দিষ্ট সময়ের পরে বের হওয়া রক্ত বা নেফাসের চল্লিশ পরে বের হওয়া রক্ত]

গর্ভপাত হল। সন্তান যদি পূর্ণাঙ্গ হয় বা তার কোনো অঙ্গ প্রকাশ পায়, তা হলে গর্ভপাতের পরে যে রক্ত বের হবে, তা নেফাস হবে। আর যদি তা জমাটবদ্ধ রক্ত বা মাংসপিণ্ড হয়, মানুষের কোনো অঙ্গ প্রকাশ না পায়, তা হলে সে রক্ত ইস্তিহাযা হবে। পারলে সওম রাখবে। নচেৎ সওম ভঙ্গ করবে। পরে তার কাজা রাখবে।

তদ্রূপ যদি অস্ত্রোপচার করে [পেট] পরিষ্কার করা হয়, এবং রক্ত সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়, তা হলে সওম রাখলে সওম শুদ্ধ হবে।

চল্লিশ দিনের আগেই নিফাসের রক্ত বন্ধ হয়ে গেছে। তা হলে সওম রাখবে এবং সালাত পড়বে। আবার যদি চল্লিশ দিনের মধ্যেই রক্ত আসে, তা হলে সওম রাখবে না। কারণ, এটা নিফাস। আর যদি চল্লিশ দিনের পরও চলতে থাকে, তা হলে সওম রাখবে এবং গোসল করবে। [এটা সকল ইমামের মত।] আর যে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, সেটাকে ইস্তিহাযা ধরা হবে। তবে তা যদি হায়েযের সময়ের হয়, তা হলে সেটাকে হায়েয ধরা হবে।

দিনের বেলায় সওম রাখল। রাতে তার কাপড়ে রক্তের ফোঁটা দেখতে পেল। জানতে পারল না, সওম চলাকালে বেরিয়েছে, না কি পরে। তা হলে তার সওম শুদ্ধ হবে। [আল্লাজনাতুদ্দায়েমা]

গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিণীর জন্য যদি সওম রাখা কষ্টকর হয়, তা হলে তাদের হুকুম পীড়াগ্রস্ত ব্যক্তির মত—প্রয়োজনের সময় সওম ভঙ্গ করতে পারবে, এবং তাদের শুধু কাজা রাখতে হবে, চাই তাদের নিজেদের প্রাণের আশঙ্কা হোক বা সন্তানের। নবীজি ইরশাদ করেছেন— আল্লাহ তাআলা মুসাফিরকে সওম থেকে দায়মুক্ত করে দিয়েছেন, এবং সালাত অর্ধেক করে দিয়েছেন। আর গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিণীকেও সওম থেকে দায়মুক্ত করে দিয়েছেন। [সুনানে তিরমিযি]

গর্ভবতী মহিলা সওম রাখল এবং তার রক্তস্রাব হল। তার সওম শুদ্ধ হবে। কারণ, এটা হায়েয নয়। [আল্লাজনাতুদ্দায়েমা]

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 রামাদানের সওমের কাজা আদায় করার আহকাম

📄 রামাদানের সওমের কাজা আদায় করার আহকাম


সওম কাজা রাখার ব্যাপারে জলদি করা মুস্তাহাব। এতে তার জিম্মা থেকে মুক্ত হতে পারবে। বিরতিহীনভাবে কাজা রাখা জরুরি নয়। বিলম্ব করেও কাজা রাখা জায়েয আছে। কারণ, কাজার সময় প্রশস্ত। তবে আরেক রামাদানের পর পর্যন্ত বিলম্ব জায়েয হবে না। অবশ্য কোনো উযর থাকলে ভিন্ন কথা।

কেউ মারা গেল। তার জিম্মায় কিছু সওম আছে। তা হলে তার [নিকটবর্তী] অভিভাবকের জন্য মুস্তাহাব হল তার পক্ষ থেকে কাজা করা। কারণ, এক মহিলা এসে নবীজি-কে জিজ্ঞাসা করল, 'আমার মা মারা গেছেন। তার ওপর মান্নতের কিছু সওম আছে। আমি কি তার পক্ষ থেকে সওম রাখব?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' [সহিহ বুখারি, মুসলিম]

তার পক্ষ থেকে যদি তার অভিভাবক সওম না রাখে, তা হলে প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে এক মিসকিনকে খাওয়াবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px