📄 সওম ও ইফতারের আহকাম
সূর্য অস্ত গেলে সিয়াম পালনকারী ইফতার করবে। নবীজি ইরশাদ করেছেন— 'যখন এখান থেকে রাত্র এগিয়ে আসে এবং এখান থেকে দিন পিছিয়ে যায় এবং সূর্য অস্ত যায়, তখন ইফতারের সময় হয়।' [সহিহ বুখারি]
ইফতার জলদি করা সুন্নাত। নবীজি ইফতার না করে মাগরিবের সালাত পড়তেন না, যদিও এক চুমুক পানি দিয়ে হোক। [হাকেম]
সুন্নাত হল তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করা, তা পাওয়া না গেলে শুকনো খেজুর দিয়ে, তা-ও পাওয়া না গেলে এক চুমুক পানি দিয়ে। কারণ, নবীজি সালাতের আগে তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তাজা খেজুর না পেলে শুকনো খেজুর দিয়ে করতেন। আর যখন শুকনো খেজুরও হত না, তখন এক চুমুক পানি পান করে নিতেন। [মুসনাদে আহমদ]
যদি তাজা বা শুকনো খেজুর কিংবা পানি পাওয়া না যায়, তা হলে যা পাওয়া যায়, তা দিয়েই ইফতার করবে। যদি কোনো কিছুই পাওয়া না যায়, তা হলে মনে মনে সওম ভঙ্গের নিয়্যত করবে।
ইফতারের সময় যা ভাল লাগে, তার প্রার্থনা করবে। কারণ, ইফতারের সময় সওম পালনকারীর একটি দোয়া [অবশ্যই কবুল হয়, তা] প্রত্যাখ্যাত হয় না। নবীজি ইফতারের সময় বলতেন—
ذَهَبَ الظَّمَأُ، وَابْتَلَّتِ الْعُرُوْقُ، وَثَبَتَ الْأَজْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ [আবু দাউদ, দারকুতনি]
সাবধান! সময়ের আগে ইফতার করবে না। কারণ, নবীজি-কে কিছু পাপীর শাস্তি দেখানো হয়েছিল। তিনি বলেন—
'এরপর আমাকে নিয়ে রওয়ানা হল। সেখানে একটি দল দেখতে পেলাম, যাদের হাঁটু বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের চোয়াল ছেঁড়া; সেখান থেকে রক্ত বয়ে পড়ছে। নবীজি বলেন, 'আমি বললাম, এরা কারা?' [জিবরাঈল আলাইহিস্সালাম] বলল, 'এরা হল তারা, যারা সময়ের আগেই ইফতার করেছে'।' [ইবনে খুজাইমা]
ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথেই সিয়াম পালনকারী পানাহার থেকে বিরত থাকবে, চাই আযান শুনুক বা না শুনুক। যদি জানা থাকে যে, ফজরের ওয়াক্ত শুরু হতেই মুআয্যিন আযান দেয়, তা হলে আযান শোনার সাথে সাথেই পানাহার বন্ধ করতে হবে। আর যদি জানা থাকে, মুআয্যিন সতর্কতাস্বরূপ ফজরের ক্ষণিক আগে আযান দেয়, তা হলে আযান শুরু হওয়া পর্যন্ত বা আযানের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পানাহার করা যাবে। আর যদি মুআয্যিনের অবস্থা সম্বন্ধে জানা না থাকে [যে, কখন আযান দেয়,] বা মুআয্যিন অনেক থাকে, তা হলে সালাতের সময়সূচির ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চলবে।
ফজরের দশ মিনিট আগে যে সতর্কতামূলক পানাহার বন্ধ করা হয়, এটা বিদ'আত। আর কোনো কোনো ক্যালেন্ডারে দেখা যায়, পানাহার বন্ধ করার একটি ঘর এবং সালাতের সময় শুরুর আরেকটি ঘর। এটা সুন্নাতের খেলাফ।
📄 সওমভঙ্গের কারণ
১. সঙ্গম: যে ব্যক্তি সওমের দিনে স্বেচ্ছায় পূর্ণ সঙ্গম করে, তার সওম নষ্ট হয়ে যায়, চাই বীর্যপাত হোক বা না হোক। এরূপ হলে তার ওপর চারটি বিষয় ওয়াজিব হয়—
এক. তওবা করা;
দুই. ওই দিনের সওম পূর্ণ করা;
তিন. রামাদানের পর ওই দিনের সওমের কাজা রাখা, এবং
চার. কাফফারায়ে মুগাল্লাযা আদায় করা।
কাফফারায়ে মুগাল্লাযা হল, একটি দাস বা দাসী আজাদ করা। দাস-দাসী পাওয়া না গেলে অবিচ্ছিন্নভাবে দু' মাস সওম রাখা। তা পারা না গেলে ষাট জন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো।
হাদিসে আছে, এক ব্যক্তি রাসুল-এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল! আমি তো ধ্বংস হয়ে গেছি!' তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী হয়েছে তোমার?' সে বলল, 'সওম অবস্থায় আমি স্ত্রীসঙ্গম করে বসেছি।' তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'আজাদ করার মত কোনো দাস-দাসী কি আছে?' সে বলল, 'নেই।' তিনি বললেন, 'অবিচ্ছিন্নভাবে দু' মাস কি সওম রাখতে পারবে?' সে বলল, 'না।' জিজ্ঞাসা করলেন, 'ষাটজনকে কি খাওয়াতে পারবে?' সে বলল, 'না।' [সহিহ বুখারি]
সব ধরনের সঙ্গমের ক্ষেত্রেই এই হুকুম প্রযোজ্য [এমনকি, ব্যভিচার, পুংমৈথুন ও পশুর সাথে সঙ্গমের ক্ষেত্রেও]।
যে ব্যক্তি একই রামাদানে দিনের বেলায় কয়েক দিন সঙ্গম করল, তা হলে যত দিন সে সঙ্গম করেছে, ততটি কাফফারা আদায় করতে হবে। আর ওই দিনগুলোর সওমও কাজা করতে হবে। এরূপ করলে যে কাফফারা ওয়াজিব হয়, তা তার জানা না থাকার কারণে কাফফারা মাফ হবে না। [আল্লাজনাতুত্দায়েমা]
সওমের দিনে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে স্বামী সঙ্গম করল। তা হলে স্ত্রীর হুকুমও স্বামীর মতই। তবে যদি স্বামী জোরপূর্বক সঙ্গম করে, আর স্ত্রীও তাকে যথাসাধ্য বাধা দেয়, কিন্তু বিরত রাখতে না পারে, তা হলে তার ওপর কোনো কাফফারা আসবে না। সতর্কতামূলক শুধু ওই দিনের সওম কাজা করবে। তবে স্বামীর ওপর পূর্ববর্ণিত কাফফারা ওয়াজিব হবে। স্বামী এরূপ, স্ত্রীর তা জানা থাকলে দূরে দূরে থাকবে, এবং রামাদানের দিনের বেলায় সাজগোজ করবে না। আর রামাদানে যেসব সওম ভঙ্গ হয়েছে, সেগুলোর কাজা করা ওয়াজিব। কাজা রাখার সময় স্বামীর অনুমতির প্রয়োজন নেই। আর কাজা সওম রাখলে শর'য়ি উযর ছাড়া তা ভঙ্গ করা জায়েয হবে না। আর স্বামীর জন্যও তার সওম নষ্ট করা জায়েয হবে না।
আর নফল সওমের ক্ষেত্রে হুকুম হল, স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ছাড়া সওম রাখবে না। নবীজি ইরশাদ করেছেন— স্বামী উপস্থিত থাকলে তার অনুমতি ব্যতীত স্ত্রী সওম রাখবে না। [সহিহ বুখারি]
সওমের মাসে দিনের বেলায় স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করার জন্য এ কৌশল করল— আগে খানা খেয়ে সওম ভঙ্গ করল। এরপর স্ত্রীসঙ্গম করল। এরূপ করলে আরও বেশি শক্ত গোনাহ হবে। কারণ, সে দু' বার রামাদানের মর্যাদাহানি করেছে—খেয়ে এক বার, সঙ্গম করে আরেকবার। তার ওপর কাফফারায়ে মুগাল্লাযা ওয়াজিব হবে, এবং তাকে তওবা করতে হবে।
ফজরের আযান হল, অথচ সিয়াম পালনকারী ব্যক্তি তখনও জুনুবি, সঙ্গম বা স্বপ্নদোষের গোসল করেনি। তার সওম শুদ্ধ হবে।
২. সওম পালনকারীর কোনো কাজের কারণে উত্তেজনা সহকারে বীর্যপাত: চুমো খাওয়া, স্পর্শ করা, হস্তমৈথুন করা অথবা বারবার দৃষ্টিপাত করার কারণে উত্তেজনা সহকারে বীর্যপাত হলে সওম ফাসেদ হয়ে যাবে। শুধু কাজা আদায় করতে হবে, কাফফারা ওয়াজিব হবে না। কারণ, কাফফারা শুধু সঙ্গমের সাথে সম্পৃক্ত। তদ্রূপ কেউ যদি দিনের বেলায় ঘুমায় এবং স্বপ্নদোষ হয়, তা হলে তার সওম শুদ্ধ হবে। কারণ, এটা তার ইচ্ছাধীন নয়। তবে জানাবতের গোসল করতে হবে।
৩. ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করা: আল্লাহ ইরশাদ করেন—
'আর পানাহার করো যতক্ষণ না কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর সওম পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত।' [সূরায়ে বাকারা : আয়াত ১৮৭]
কেউ যদি ভুলে পানাহার করে ফেলে, তা হলে সওম পূর্ণ করবে। কারণ, আল্লাহ তাকে খাইয়েছেন এবং পান করিয়েছেন। [সহিহ বুখারি]
এক বর্ণনায় আছে, তার ওপর কাজাও ওয়াজিব নয়, কাফ্ফারাও ওয়াজিব নয়। আর যদি কাউকে ভুলক্রমে খেতে দেখে, তা হলে তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে। কারণ, আল্লাহ ইরশাদ করেন—
'তোমরা একে অপরকে সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে সাহায্য করো।' [সূরায়ে মায়েদা : আয়াত ২]
তদ্রূপ রাসুল ইরশাদ করেছেন— 'আমি ভুলে গেলে আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ো।'
কিছু কাজ সরাসরি পানাহার না হলেও পানাহারের মত। সেগুলোর কারণেও সওম ভঙ্গ হবে। যেমন মুখ দিয়ে ঔষধ-বড়ি খাওয়া; ইনজেকশনের মাধ্যমে খাবার প্রবেশ করানো; রক্তের ইনজেকশন নেওয়া ইত্যাদি। তবে যে ইনজেকশন দ্বারা খাবার দেওয়া হয় না বা যা পানাহারের প্রয়োজন মেটায় না, শুধু চিকিৎসার জন্য করা হয়, যেমন ইনসুলিন ও পেনিসিলিন। এগুলো সওমের কোনো ক্ষতি করবে না, চাই ইনজেকশন পেশীতে নেওয়া হোক বা শিরায়। তবে সতর্কতার দাবি হল, ইনজেকশন রাতের বেলায় নেওয়া।
অনিচ্ছাকৃতভাবে গলা দিয়ে কিছু ঢুকে গেল। যেমন অযুর কুলি করার সময় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে কিছু পানি ভিতরে চলে গেল। এতে সওম শুদ্ধ থাকবে। তবে সওম পালনকারীর জন্য কুলি করার সময় বা নাকে পানি দেওয়ার সময় সতর্ক থাকা চাই। কারণ, এতে পেটে পানি চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন— 'ভালভাবে নাকে পানি দেবে। তবে সিয়াম পালনকারী হলে মুবালাগা করবে না।' [তিরমিযি, ইবনে মাজা]
মুখে বা জিহ্বায় আসার আগেই যদি কফ গলায় চলে যায়, তা হলে সওম শুদ্ধ হবে। কারণ, তা বের করা কষ্টসাধ্য। আর যদি মুখে এসে যায় বা জিহ্বায় পৌঁছে যায়, তা হলে তা বের করে ফেলতে হবে। গিলে ফেললে সওম ভঙ্গ হয়ে যাবে। তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে ভিতরে চলে গেলে সওম ভাঙবে না।
দিনের বেলায় সওম পালনকারীর জন্য মেসওয়াক করা সুন্নাত। মেসওয়াক তাজা হলেও ক্ষতি নেই। নতুন মেসওয়াক দিয়ে মেসওয়াক করলে যদি সেটার স্বাদ হলকে পৌঁছয়, থুতু করে ফেলে দেবে। মেসওয়াকের যে টুকরোগুলো মুখের ভিতর ছড়িয়ে পড়ে, সেগুলো বের করে দেবে। অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেললে কোনো ক্ষতি নেই।
চামড়া সতেজকারী মলম বা চামড়া মোলায়েম করে এমন ঔষধ মর্দন করলে বা সুগন্ধ শুঁকলে বা আতর ব্যবহার করলে কিংবা ধূপ ব্যবহার করলে সওমের কোনো ক্ষতি হবে না। তবে পেটের ভিতর নেওয়ার জন্য যদি নস্যি নেয়, তা হলে ভিন্ন কথা। ধুমপান করলে সওম ভঙ্গ হয়ে যাবে। আর তা সিয়াম পালনকারী ও অরোযাদার, সবার জন্যই হারাম।
সিয়াম পালনকারী যদি এমন কিছু করে, যা দ্বারা তার পিপাসা লাঘব হয়, যেমন গোসল করল বা কুলি করল, তা হলে কোনো ক্ষতি নেই। রাত বাকি আছে ধারণা করে যদি সিয়াম পালনকারী পানাহার করে, এরপর জানা যায় যে, তখন ফজরের সময় হয়ে গিয়েছিল, তার সওম শুদ্ধ হবে। কারণ, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
'আর পানাহার করো যতক্ষণ না কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর সওম পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত।' [সূরায়ে বাকারা : আয়াত ১৮৭]
যেমন, ফজরের আযান হয় চারটার সময়। একব্যক্তি সাহরি খাওয়ার জন্য উঠে দেখল, তার ঘড়িতে সাড়ে তিনটা বাজে। সে সাহরি খাওয়া শুরু করল। এই সময় কাছের মসজিদ থেকে ইকামতের আওয়াজ এল। তখন সে জানতে পারল, তার ঘড়িটি আধা ঘণ্টা পিছিয়ে আছে। তা হলে এখানে যে রাত বাকি আছে ধরে নিয়ে পানাহার করেছে, এবং পরে জানতে পেরেছে, ফজরের সময় হয়ে গেছে, তার সওম শুদ্ধ হবে।
ধারণা হল, সূর্য ডুবে গেছে। তাই ইফতার করে ফেলল। এরপর জানা গেল, সূর্য অস্ত যায়নি। তা হলে [সকল ইমামের মতে] তার সওমের কাজা আদায় করতে হবে। কারণ, এখানে নিশ্চিত ও স্বাভাবিক হল দিবস বাকি থাকা। আর নিশ্চিত বিষয় সন্দেহজনক বিষয় দ্বারা দূর হয় না।
৪. দেহ থেকে রক্ত বের করা: শিঙা লাগিয়ে বা রগ টেনে বা কোনো রোগীকে রক্ত দান করার জন্য রক্ত বের করলে সওম ভঙ্গ হয়ে যাবে। তবে সামান্য পরিমাণ রক্ত বেরলে তা সওমের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। তদ্রূপ নাক থেকে বা ক্ষত থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে রক্ত বেরলে সওমের কোনো ক্ষতি হবে না।
৫. বমি: পেটে যে খাবার বা পানি আছে, ইচ্ছাকৃতভাবে তা মুখ দিয়ে বের করলে সওম ভঙ্গ হবে। তবে যদি বমি আসে, আর তা দমন করা না যায়, অনিচ্ছাকৃতভাবে বেরিয়ে যায়, তা হলে তা সওমের ওপর কোনোরূপ প্রভাব ফেলবে না। রাসুল ইরশাদ করেছেন— 'বমি যাকে অক্ষম করে দেয়, তাকে কাজা রাখতে হবে না। আর যে ইচ্ছাকৃত বমি করে, সে কাজা রাখবে।' [আবু দাউদ, তিরমিযি]
📄 সালাতের বিস্ময়
মুহাম্মদ বিন খফিফ রহ.র কোমরে ব্যথা ছিল। সালাতের আযান হলে কারও পিঠে করে মসজিদে নেওয়া হত। তাকে বলা হল, ‘আল্লাহ তো আপনাকে মাযুর করেছেন। নিজের ওপর যদি শিথিলতা করতেন!’ তিনি বললেন, ‘মোটেই নয়! যদি কখনও আমাকে সালাতের কাতারে না দেখ, তা হলে ধরে নিয়ো, আমি কবরের মাটিতে শুয়ে আছি।’
কত সৌভাগ্যবান পীড়িত ব্যক্তি ছিলেন তাঁরা! প্রকৃত অর্থে, পীড়িত তো আমরা!
মনসুর বিন মু’তামির। রাত হলে তিনি তাঁর সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরিধান করতেন। এরপর বাড়ির ছাদে উঠতেন। সালাত পড়তেন। তিনি মারা গেলে তাঁর প্রতিবেশী এক বালক তাঁর মাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘মা! আমাদের প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদে রাতে যে খুঁটিটি দেখা যেত, ওটাকে দেখছি না!’ তিনি বললেন, ‘বেটা! ওটা খুঁটি ছিল না। ওটা ছিল মনসুর। তিনি রাতে দাঁড়িয়ে সালাত পড়তেন। তিনি মারা গেছেন।’
📄 সওমভঙ্গ সম্পর্কিত বিবিধ মাসায়েল
সওমভঙ্গের যেসব কারণ বর্ণিত হয়েছে, [হায়েয ও নেফাস ছাড়া] তিনটি শর্ত পাওয়া গেলেই সেগুলো দ্বারা সওম ভঙ্গ হবে—
১. জানা থাকতে হবে যে, এটা সওম ভঙ্গের কারণ;
২. সে যে সিয়াম পালনকারী, তা তার স্মরণ থাকতে হবে;
৩. ইচ্ছাকৃত হতে হবে, কারও বাধ্য করার কারণে নয়।
কিডনি পরিষ্কার করতে রক্ত বের করতে হয়। এরপর সাথে কিছু রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত করে ভিতরে ঢুকাতে হয়। এরূপ হলে এটা সওম ভঙ্গের কারণ হবে। [আল্লাজনাতুদ্দায়েমা]
পায়ুপথে ইনজেকশন দিলে, চোখে বা কানে ঔষধের ফোঁটা ব্যবহার করলে, দাঁত উঠালে, ক্ষতস্থানে ঔষধ দিলে সওম ভঙ্গ হবে না। কারণ, এগুলো পানাহারের কাজ দেয় না।
ইনহেলার ব্যবহার করলে সওম ভঙ্গ হয় না। কারণ, এটা একটা গ্যাস, খাবার নয়। আর শ্বাসকষ্টের রোগীকেও রামাদানে এটা ব্যবহার করতে হচ্ছে।
পরীক্ষা করার জন্য যে রক্ত নেওয়া হয়, এতে সওম ভঙ্গ হবে না। বরং এটা মাফ। কারণ, প্রয়োজনের তাগিদে রক্ত বের করতে হচ্ছে। [ফাতাওয়ায়ে ইবনে বায]
গলা ও কণ্ঠনালী পরিষ্কার করার জন্য ঔষধ দিয়ে গড়গড়া করলে সওম ভঙ্গ হবে না, যদি তা গলার ভিতর না যায়।
দাঁত ছিদ্র করলে বা দাঁত উপড়ে ফেললে অথবা দাঁত পরিষ্কার করলে বা মিসওয়াক করলে কিংবা ব্রাশ ব্যবহার করলে যদি সেগুলোর কণা গিলে ফেলা থেকে বেঁচে থাকা যায়, তা হলে সওম ভঙ্গ হবে না। তদ্রূপ কেউ যদি দাঁতে কোনো ঔষধ ব্যবহার করে, এবং সেটার স্বাদ হলকে পাওয়া যায়, তা হলেও সওমের কোনো ক্ষতি হবে না।
কান পরিষ্কারের ঔষধ বা নাকের ঔষধ বা নাকের স্প্রে হলকে যাওয়ার পর সেগুলো না গিললে সওম ভঙ্গ হবে না।
দূরবীন বা স্প্রিং বা এ জাতীয় কিছু যদি জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়, বা যোনিপথে জরায়ুতে কিছু প্রবেশ করানো হয়, বা ডাক্তারি অনুসন্ধানের জন্য আঙ্গুল প্রবেশ করানো হয়, তা হলে সওম ভঙ্গ হবে না।
তদ্রূপ প্রস্রাবের থলি পরিষ্কার করার জন্য বা অন্য কোনো কারণে নারী বা পুরুষের প্রস্রাবের নালী দিয়ে যদি কোনো যন্ত্র ইত্যাদি প্রবেশ করানো হয়, তা হলেও সওম ভঙ্গ হবে না।
কুলকুচা বা গড়গড়া করলে বা মুখে ঔষধ স্প্রে করলে যদি তা গলায় না যায়, তা হলে সওম ভঙ্গ হবে না। অক্সিজেন গ্যাস গলায় গেলে সওম ভঙ্গ হবে না।
দেহে মালিশ লাগালে বা ঔষধমিশ্রিত প্লাস্টার লাগালে সওম ভঙ্গ হবে না।
হার্ট বা অন্য কিছুর ছবি গ্রহণের জন্য বা চিকিৎসার জন্য শিরার ভিতর দিয়ে সূক্ষ্ম যন্ত্র ঢুকানো হয়, এর ফলে সওম ভঙ্গ হবে না। মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডে ঢুকালেও একই হুকুম—রোযা ভঙ্গ হবে না।
অস্ত্র পরীক্ষার জন্য দেহের চামড়া ভেদ করে যে দূরবীন ঢুকানো হয়, তাতে সওম ভঙ্গ হবে না। তবে পাকস্থলীতে যদি ঢুকানো হয়, আর তাতে কিছু মিশ্রিত থাকে তা হলে সওম ভঙ্গ হয়ে যাবে, নচেৎ হবে না।
কোনো নিষ্পাপকে বাঁচানোর জন্য যদি সওম ভঙ্গ করার প্রয়োজন হয়, যেমন ডুবন্ত ব্যক্তিকে বাঁচানোর জন্য বা আগুন নেভানোর জন্য, তা হলে সওম ভঙ্গ করবে।
যে ব্যক্তি দুশমনের সাথে লড়াই করছে বা দুশমন তাকে ঘিরে ধরেছে, আর সওম রাখলে যুদ্ধক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়বে, তার জন্য সওম ভঙ্গ করা জায়েয, যদিও সে সফরে না থাকে। তদ্রূপ যুদ্ধের আগেও যদি সওম ভঙ্গের প্রয়োজন হয়, তা হলে সওম ভঙ্গ করবে। নবীজি ইরশাদ করেছেন— তোমরা তোমাদের শত্রুপক্ষের কাছে যাচ্ছ। সওম না রাখলে অধিক শক্তি পাবে। কাজেই সওম ভঙ্গ করো। [সহিহ মুসলিম]
কেউ উযরবশত রামাদানে সওম রাখল না, যেমন সফর বা রোগের কারণে সওম রাখল না। মানুষের সামনে তার জন্য খাওয়া কি জায়েয হবে? জবাব হল, যদি তার সওম ভাঙ্গার কারণটি সবার নিকট স্পষ্ট থাকে, যেমন অশীতিপর বৃদ্ধ, প্রকাশ্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, তার জন্য লোকদের সামনে কিছু খাওয়াতে দোষ নেই। আর যার সওম না রাখার কারণ সবার জানা নেই, যেমন সফর, তা হলে উত্তম হল গোপনেই খাওয়া, যেন তার ব্যাপারে কারও কু-ধারণা সৃষ্টি না হয়।