📄 যাকাতের খাত
মালিকানাধীন সব ধরনের মালেই যাকাত ওয়াজিব হয়। এমনকি যদি পিতৃহীন শিশুর বা পাগলের মাল থাকে, তা হলে তাদের অভিভাবক তাদের মাল থেকেও যাকাত আদায় করবে। আল্লাহ ইরশাদ করেন—
خُذُ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلُوتَكَ سَكَنْ لَهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ করো। এতে তুমি তাদেরকে পাক-পবিত্র করবে। আর তুমি তাদের জন্য দোয়া করো। নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া তাদের জন্য সান্ত্বনার কারণ। বস্তুত আল্লাহ সবকিছুই শোনেন, জানেন। [সূরা তাওবা: আয়াত: ১০৩] অর্থাৎ তাদের জন্য দোয়া করো।
আর যে মালের নির্দিষ্ট কোনো মালিক নেই, যেমন মসজিদ নির্মাণের জন্য সংগৃহীত সম্পদ, বা জনকল্যাণমূলক কোনো রাস্তা বানানোর জন্য সংগৃহীত সম্পদ, এগুলোয় যাকাত নেই, চাই তা যে পরিমাণই হোক বা তার ওপর বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাক।
দরিদ্রকে যাকাত দেওয়ার সময় তাকে জানানোর দরকার নেই যে, এটা যাকাত। কারণ, এতে তার কষ্ট হবে। তবে যদি এমন কাউকে দেওয়া হয়, যার দরিদ্র হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ আছে, তা হলে জানিয়ে দেবে যে, এটা যাকাত। তা হলে সে যাকাতের হকদার হলে তা গ্রহণ করবে, আর না হলে করবে না, কিংবা তা অন্য হকদারকে দিয়ে দেবে।
মাল যে শহরের, মালের যাকাতও সে-শহরেই আদায় করা উত্তম। সেখানকার দরিদ্রদের মধ্যে তা বণ্টন করে দেবে। তবে শর'য়ি কোনো উপকারিতার কারণে যদি অন্যত্র দেওয়া হয়, তা হলেও জায়েয হবে। যেমন নিজের কোনো আত্মীয় অন্য কোনো শহরে বসবাস করে।
যাকাত ওয়াজিব হওয়ার আগেই তা আদায় করা জায়েয। কারণ, নবীজি আব্বাস রাযি.-এর দু' বছরের সদকা একসাথে আদায় করে দিয়েছেন।
তাই যদি কোনো দরিদ্র ও অভাবী ব্যক্তি সফর মাসে আপনার নিকট আসে, আর আপনার যাকাত আদায়ের সময় হবে রামাদানে, তা হলে তাকে যাকাতের নিয়্যতে দান করতে পারেন। রামাদানে যাকাত আদায়ের সময় এই যাকাতের অর্থ তা থেকে কম করে নেবেন।
📄 যাকাতের হকদার
আল্লাহ্ ইরশাদ করেন—
ইِنَّمَا الصَّدَقْتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسْكِينِ وَ الْعَمِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَ فِي الرِّقَابِ وَالْغُرِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
যাকাত হল কেবলমাত্র ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের অন্তর জয় করার প্রয়োজন তাদের হক; এবং তা দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্য এবং মুসাফিরদের জন্য। এটা হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, মহা প্রজ্ঞাময়। [সূরা তাওবা : আয়াত : ৬০]
আয়াতে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তারাই হল যাকাতের হকদার। এদের ছাড়া অন্য কাউকে যাকাত দেওয়া জায়েয হবে না। নবীজি বলেছেন—
ইِنَّ اللهَ تَعَالَى لَمْ يَرْضَ بِحُكمِ نَبِيِّ وَلَا غَيْرِهِ فِي الصَّدَقَاتِ حَتَّى حَكَمَ فِيهَا هُوَ فَجَزَّأَها ثَمَانِيَةَ أَجْزَاء
যাকাতের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কোনো নবী বা অন্য কারও হুকুমে রাজি নন। এ কারণেই তিনি নিজেই এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। সেটাকে আট ভাগে ভাগ করেছেন। [সুনানে আবু দাউদ]
যাকাতের হকদাররা হল—
১-২. ফকির-মিসকিন : এরা হল এমন লোক, যাদের প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা নেই। মিসকিন থেকে ফকির বেশি অভাবী। ফকির-মিসকিনকে এ পরিমাণ দেবে, যেন তাদের ও তাদের ভরণপোষণের আওতাধীনদের এক বছরের খরচের ব্যবস্থা হয়ে যায়। তারা যদি পরিমিতভাবে ব্যয় করতে না জানে, যার ফলে এক বছরেরটা এক মাসেই ব্যয় করে ফেলবে, তা হলে নির্ভরযোগ্য কাউকে দেওয়া যেতে পারে, যিনি পুরো বছর ভাগ ভাগ করে তাদেরকে দেবেন।
তবে ধনী ব্যক্তি বা সামর্থ্যবান ব্যক্তি, যার উপার্জন করার শক্তি আছে, তাকে যাকাত দেওয়া যাবে না। নবীজি ইরশাদ করেছেন—
লা تَحِلُّ الصَّدَقَةُ لِغَنِيِّ وَلَا لِذِي مِرَّةٍ سَوِيٌّ
সদকা [যাকাত] ধনী ব্যক্তির জন্য হালাল হবে না, সুস্থ ও সমর্থ ব্যক্তির জন্য ও হালাল হবে না। [সুনানে নাসাই, মুসনাদে আহমাদ]
৩. যাকাত আদায়কারী : এরা হল যাকাতদাতাদের থেকে যাকাত সংগ্রহকারী। এদেরকে এদের কাজ অনুযায়ী পারিশ্রমিক দেবে। তবে তাদের জন্য যদি বেতন নির্ধারিত থাকে, তা হলে যাকাত থেকে তাদের কিছুই দেওয়া যাবে না, যেমনটা বর্তমানে অনেকখানে চলছে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের বেতন দেওয়া হয়। তাই যাকাত থেকে কিছু নেওয়া তাদের জন্য হারাম হবে।
৪. যাদের অন্তর জয় করা হবে : এরা দু ধরনের— মুসলমান ও কাফের। ইসলামের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি হওয়ার জন্য, বা তাদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কাফেরদেরকে যাকাত দেওয়া হবে। আর মুসলমানদেরকে যাকাত দেওয়া হবে তাদের ঈমান মজবুত হওয়ার জন্য এবং দীনের ওপর অটল থাকার জন্য।
৫. দাসমুক্তি : যে সব মুসলমান গোলাম তাদের মনিবের সাথে অর্থের বিনিময়ে মুক্তির চুক্তি করেছে, তাদেরকে মুক্ত করার জন্য যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে।
৬. ঋণগ্রস্ত : এরা দু' রকম—
এক. অন্যের জন্য ঋণগ্রস্ত, যে অন্যদের মধ্যে আপস করার জন্য ঋণী হয়। যেমন দুটি গোত্রের মধ্যে সম্পদ বা অন্য কিছু নিয়ে বিবাদ রয়েছে। এতে তাদের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি হয়েছে। কেউ তাদের মধ্যে মধ্যস্থতা করল, এবং তাদের বিবাদ মেটানোর জন্য নিজের পক্ষ থেকে মাল দেওয়ার কথা বলল। তা হলে সে যে অর্থ আদায়ের জিম্মা নিয়েছে, তা যাকাতের মাল থেকে আদায় করা যাবে।
দুই. নিজের জন্য ঋণগ্রস্ত, যেমন কেউ চিকিৎসা বা ঘরবাড়ি নির্মাণ বা অন্য কোনো বৈধ কাজে ঋণ নিল, আর তা পরিশোধ করার সামর্থ্য তার নেই, তা হলে যাকাত থেকে তার ঋণ পরিশোধ করা যাবে।
৭. আল্লাহ-র রাস্তায়। এরা হলেন মুজাহিদ।
৮. মুসাফির, যে মুসাফির তার সফরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তার পাথেয় হারিয়ে যাওয়ার কারণে বা ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে। তাকে এ পরিমাণ যাকাতের অর্থ দেবে, যেন সে তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারে।
যাকাতদাতার জন্য তার আপনজনদের যাকাত দেওয়া মুস্তাহাব। যেমন ভাই-বোন। [তবে পিতামাতা বা ছেলেমেয়েকে দেওয়া যাবে না।] কারণ, নবীজি ইরশাদ করেছেন—
صَدَقَتُكَ عَلَى ذِي الرَّحِمِ صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ
নিকটাত্মীয়দের দান করলে সদকাও হয়, এবং ছেলায়ে-রেহমিও হয়। [মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিযি, ইবনে মাজা]
নবীজি-কে এক নারী জিজ্ঞাসা করলেন, 'তার ভ্রাতৃস্পুত্ররা তার নিকট প্রতিপালিত হচ্ছে। তাদেরকে কি যাকাত খাওয়ানো যাবে?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' [সহিহ বুখারি]
রাসুল ইরশাদ করেছেন— الصَّدَقَةُ عَلَى الْمِسْكِينِ صَدَقَةٌ وَহِي عَلَى ذِي الرَّحِمِ ثُنَتَانِ صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ মিসকিনকে দান করলে সদকাই হবে। আর রেহমি সম্পর্কীয়দের দান করলে দুটো কাজ হবে—সদকা ও ছেলায়ে রেহমি। [মুসনাদে আহমাদ]