📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 সাত হাজার দেরহাম ... জেল হতে খালাস!!

📄 সাত হাজার দেরহাম ... জেল হতে খালাস!!


ঘটনাটি তারিখে বাগদাদ কিতাবে বর্ণিত আছে। এক দরিদ্র ব্যক্তি আব্দুল্লাহ বিন মুবারক-র নিকট এল। জানাল, সে ঋণগ্রস্ত। অনুরোধ করল, তিনি যেন ঋণটা আদায় করে দেন। একটি চিঠি লিখে তিনি তার হাতে দিলেন এবং তাকে তার মুনশির নিকট যেতে বললেন। লোকটি চিঠিটি নিয়ে তার নিকট গেল। মুনশি চিঠিটি পড়ল। এরপর ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করল, 'কত টাকা ঋণ আদায়ের কথা তুমি তাকে বলেছিলে?' সে বলল, 'সাতশ' দেরহাম।' মুনশি তার নিকট একটি চিঠি লিখল, 'লোকটা আপনার নিকট সাতশ' দেরহামের কথা বলেছে। আর আপনি সাত হাজার দেরহামের কথা লিখেছেন। এভাবে অল্পদিনেই সব মাল শেষ হয়ে যাবে।'

আব্দুল্লাহ বিন মুবারক লিখে পাঠালেন, 'মাল যদি শেষ হয়ে যায়, তা হলে জীবনও তো শেষ হয়ে যাবে। কাজেই আমার কলম যা লিখেছে, তা-ই আদায় করো।'

আব্দুল্লাহ বিন মুবারক প্রায়ই রিক্কা যেতেন। একটি সরাইখানায় অবস্থান করতেন। এক যুবক এসে তার সেবা করত। তার প্রয়োজন মেটাত। তার থেকে হাদিস শুনত।

একবার তিনি রিক্কায় এলেন। কিন্তু যুবকটিকে দেখতে পেলেন না। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন, সে বন্দী। অনেক ঋণী হয়ে পড়েছে সে। তাই তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। জিজ্ঞাসা করলেন, 'ঋণের পরিমাণ কত?' লোকেরা জানাল, 'দশ হাজার দেরহাম।' আব্দুল্লাহ বিন মুবারক পাওনাদারকে খোঁজ করতে লাগলেন। খুঁজতে খুঁজতে একসময় তাকে পেয়েও গেলেন। তিনি রাতে তাকে ডেকে আনলেন। দশ হাজার দেরহাম তাকে দিয়ে বললেন, 'সে যেন এটা কাউকে না জানায়, যত দিন তিনি বেঁচে থাকেন।' আর বললেন, 'ভোর হলে তাকে মুক্ত করে দেবে।' এরপর আব্দুল্লাহ বিন মুবারক রাতেই রিক্কা ত্যাগ করলেন।

যুবকটি কয়েদখানা থেকে মুক্ত হলে তাকে জানানো হল, আব্দুল্লাহ বিন মুবারক এসেছিলেন। তোমার খোঁজ করেছিলেন। যুবক তার পিছনে পিছনে ছুটল। রিক্কা হতে দু'-তিন মনযিল দূরে গিয়ে তার সাক্ষাৎ পেল। আব্দুল্লাহ বিন মুবারক জিজ্ঞাসা করলেন, 'যুবক! কোথায় ছিলে? সরাইখানায় দেখিনি।' যুবক বলল, 'ঋণের কারণে কয়েদ ছিলাম।' তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'মুক্তি পেলে কীভাবে?' সে বলল, 'একব্যক্তি এসে ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছে। তাকে চিনতে পারিনি।' আব্দুল্লাহ বিন মুবারক বললেন, 'আল্লাহ যে তোমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, তার জন্য তার শোকর করো।' এরপর তিনি তার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে

📄 তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে


রামাদানের সিয়াম ফরজ। আল্লাহ ইরশাদ করেন—
'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমনভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো।' [সূরা বাকারা: আয়াত: ১৮৩]

নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন—
'ইসলামের বুনিয়াদ হল পাঁচটি... রামাদানের সিয়াম।' [সহিহ বুখারি]

সিয়ামের ফজিলত:
কিয়ামতের দিন সওম সিয়াম পালনকারীর জন্য সুপারিশ করবে। বলবে—
'হে প্রভু! তাকে আমি দিনের বেলায় খাবার ও প্রবৃত্তির চাহিদা থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করো।' [মুসনাদে আহমাদ]

'সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ [যা উপোস থাকার কারণে হয়] আল্লাহর নিকট মিশকের সুগন্ধ থেকেও অধিক সুগন্ধযুক্ত।' [সহিহ মুসলিম]

'যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় থাকাকালে এক দিন সিয়াম রাখে, আল্লাহ তাকে এর ফলে জাহান্নামের আগুন থেকে সত্তর বছরের দূরত্বে রাখেন।' [সহিহ মুসলিম]

'জান্নাতে একটি দরজা আছে। সেটার নাম রাইয়্যান। সেখান দিয়ে শুধু সিয়াম পালনকারীরাই প্রবেশ করবে, অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। তারা প্রবেশ করলে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে আর কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারবে না।' [সহিহ বুখারি]

রামাদান মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। এই মাসে একটি রাত আছে, যা হাজার মাস হতেও উত্তম।

'আর রামাদান মাস এলে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।' [সহিহ বুখারি]

রামাদান মাসের সিয়াম দশ মাসের সিয়ামের সমান।

'যে ব্যক্তি রামাদানে ঈমান সহকারে সওয়াবের নিয়্যতে সিয়াম রাখবে, তার অতীতের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।' [সহিহ বুখারি]

'প্রত্যেক ইফতারের সময় আল্লাহ জাহান্নাম হতে অনেককে মুক্ত করে দেন।' [মুসনাদে আহমাদ]

যে ব্যক্তি কোনো উযর ছাড়া রামাদানের একটি সিয়াম ভঙ্গ করল, সে বিরাট কবিরা গোনাহ করল। রাসুল যখন বিভিন্ন পাপে পাপীদের শাস্তিসম্পর্কিত স্বপ্নের আলোচনা করছিলেন, তখন বলেছিলেন—
'আমি যখন পাহাড়ের মধ্যখানে গেলাম, তখন বিকট চিৎকার শুনতে পেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, 'এটা কিসের আওয়াজ?' তারা বলল, 'এটা হল জাহান্নামিদের চিৎকার'। এরপর আমাকে নিয়ে রওয়ানা হল। সেখানে একটি দল দেখতে পেলাম, যাদের হাঁটু বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের চোয়াল ছেঁড়া; সেখান থেকে রক্ত বয়ে পড়ছে। আমি বললাম, 'এরা কারা?' বলল, 'এরা হল সে-সব লোক, যারা সময়ের আগেই ইফতার করেছে। অর্থাৎ এরা সিয়াম পালন করত না'।' [ইবনে খুযাইমা]

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 সিয়ামের আদব ও সুন্নাত

📄 সিয়ামের আদব ও সুন্নাত


• সাহরির প্রতি আগ্রহ রাখা এবং তাতে বিলম্ব করা চাই। রাসুল ইরশাদ করেছেন— 'তোমরা সাহরি খাও। কারণ, সাহরি খাওয়ার মধ্যে বরকত আছে'। [সহিহ বুখারি]

• তিনি আরও বলেছেন— 'খেজুর মুমিনের কতই না উত্তম সাহরি!' [সুনানে আবু দাউদ]

• জলদি ইফতার করা। নবীজি ইরশাদ করেছেন— 'যতদিন পর্যন্ত মানুষ ইফতারে জলদি করবে, ততদিন পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকবে।' [সহিহ বুখারি]

• তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করা। তাজা খেজুর না থাকলে শুকনো খেজুর। শুকনো খেজুরও না থাকলে এক চুমুক পানি দিয়ে ইফতার করবে। [সুনানে তিরমিযি]

• ইফতারের সময় নবীজি এ দোয়া পড়তেন—
ذَهَبَ الظَّمَأُ، وَابْتَلَّتِ الْعُرُوْقُ، وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ [সুনানে আবু দাউদ]

• পাপকর্ম থেকে দূরে থাকা। রাসুল ইরশাদ করেছেন, 'তোমাদের কেউ সিয়াম রাখলে পাপকর্ম করবে না ...।' [সহিহ বুখারি]

• হাদিসে رفٹ শব্দ এসেছে। এর অর্থ পাপে লিপ্ত হওয়া। [কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ সঙ্গম করা।] নবীজি ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা ও তদনুসারে আমল ছাড়ে না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।' [সহিহ বুখারি]

• গিবত, অশ্লীল কথা ও মিথ্যা থেকে সিয়াম পালনকারীর বেঁচে থাকা চাই। কারণ, এর কারণে তার সিয়ামের সওয়াবই নষ্ট হয়ে যায়। নবীজি ইরশাদ করেছেন, 'অনেক সিয়াম পালনকারী এমন আছে, যার সিয়ামের মধ্যে উপোস থাকাটাই সার।' [ইবনে মাজা]

• কাউকে গালি দেবে না এবং কারও সাথে বিবাদ করবে না। নবীজি ইরশাদ করেছেন, “কেউ যদি তার [সিয়াম পালনকারীর] সাথে বিবাদ করে বা গালি দেয়, সে বলবে, 'আমি সিয়াম রেখেছি; আমি সিয়াম রেখেছি'।” [সহিহ বুখারি]

• খাবারে অপচয় না করা। হাদিসে আছে, 'আদমসন্তান উদর থেকে মন্দ কোনো ভাণ্ড পূর্ণ করেনি।' [সুনানে তিরমিযি]

• সদকার মাধ্যমে দয়া ও বদান্যতা করা, এবং অভাবীদের সহযোগিতা করা। নবীজি ছিলেন সবচেয়ে বেশি দানশীল। আর তিনি সবচেয়ে বেশি দান করতেন রামাদান মাসে, যখন জিবরাঈল তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন। তিনি রামাদানের প্রতি রাতে সাক্ষাৎ করতেন। তাঁকে কুরআন পাঠ করে শোনাতেন। তখন রাসূল কল্যাণবাহী বাতাস থেকেও বেশি দানশীল হতেন। [সহিহ বুখারি]

সিয়াম রাখা ও লোকদের খাওয়ানো—এ দুটোর সমন্বয় হলে জান্নাত। রাসূল ইরশাদ করেছেন, 'জান্নাতের কিছু কক্ষ আছে, যেগুলোর ভিতর থেকে বাহির, এবং বাহির থেকে ভিতর দেখা যায়। সেগুলো আল্লাহ প্রস্তুত করে রেখেছেন তাদের জন্য, যারা অপরকে খাওয়ায়, নম্র কথা বলে, সব সময় সিয়াম রাখে, এবং রাতের বেলায় মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন সালাত পড়ে।' [মুসনাদে আহমাদ]

নবীজি ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি কোনো সিয়ামদারকে ইফতার করাবে, সে তারই মত সওয়াব পাবে। অথচ সিয়াম পালনকারীর সওয়াব থেকে কিছুই কমবে না।' [সুনানে তিরমিযি] ইফতার করানো দ্বারা উদ্দেশ্য হল তাকে তৃপ্তি সহকারে আহার করানো।

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 সিয়ামের কিছু আহকাম

📄 সিয়ামের কিছু আহকাম


কিছু সিয়াম অবিচ্ছিন্নভাবে পালন করতে হয়। যেমন রামাদানের সিয়াম, ভুল হত্যার কাফ্ফারার সিয়াম, এবং দিনের বেলায় স্ত্রীসহবাসের সিয়াম।

কিছু সিয়াম অবিচ্ছিন্নভাবে পালন করা জরুরি নয়। যেমন রামাদানের কাজা সিয়াম, কসমের কাফ্ফারার সিয়াম।

শুক্রবার একদিন সিয়াম পালন করতে নবীজি নিষেধ করেছেন। [সহিহ বুখারি]

দুই ঈদের দুই দিন এবং তাশরিকের দিনগুলোয় [১১, ১২ ও ১৩ই যিলহজ্জ] সওম রাখা হারাম। কারণ, এগুলো হল কুরবানীর গোশত খাওয়ার দিন, পান করার দিন এবং আল্লাহ -র যিকিরের দিন। তবে হজ্জ পালনরত ব্যক্তি যদি হাদি [কুরবানীর পশু] না পায়, তা হলে মিনায় সওম রাখতে পারবে।

রামাদানের চাঁদ দেখা দ্বারা বা শা'বান মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ হওয়া দ্বারা রামাদান সাব্যস্ত হবে।

বোধশক্তিসম্পন্ন, মুকিম, সামর্থ্যবান এবং বাধা [যেমন হায়েয নিফাস] হতে মুক্ত প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের ওপর সওম রাখা ফরজ। নিম্নে বর্ণিত তিনটি বিষয়ের একটি পাওয়া গেলে প্রাপ্তবয়স্ক হবে–
স্বপ্নদোষের কারণে বা অন্য কোনোভাবে বীর্যপাত হলে; নিম্নাঙ্গে পশম উঠলে; পনেরো বছর পূর্ণ হলে। মেয়েদের ব্যাপারে আরেকটি বিষয়ও আছে— হায়েয। হায়েয হলেও প্রাপ্তবয়স্কা হবে এবং তার ওপর সওম ওয়াজিব হবে।

সন্তানের বয়স সাত বছর হলে তাকে সওম রাখার নির্দেশ দেবে, যদি তার সওম রাখার শক্তি থাকে। তার সওমের সওয়াব সে-ও পাবে, তার পিতামাতাও পাবে।
রুবাই' বিনতে মুআওব্বেয বলেন, 'আমরা আমাদের বাচ্চাদের সওম রাখাতাম। তাদের জন্য তুলা দিয়ে খেলনা বানিয়ে রাখতাম। খাওয়ার জন্য কাঁদলে সেটা দিতাম। এভাবে ইফতারের সময় হয়ে যেত।' [সহিহ বুখারি]

দিনের বেলা কোনো কাফের যদি মুসলমান হয়, বা কেউ প্রাপ্তবয়স্ক হয় বা উন্মাদের জ্ঞান ফিরে আসে, তা হলে তাদের জন্য বাকি দিন সওম পালনকারীর মত থাকা ওয়াজিব। কারণ, এখন তাদের ওপর সওম ওয়াজিব হয়েছে। আগের যেসব সওম বাদ গেছে, সেগুলোর কাজা আদায় করতে হবে না। অবশ্য যেদিনে ওয়াজিব হয়েছে, সেদিনের কাজা আদায় করলে ভাল।

উন্মাদের ওপর শরিয়তের হুকুম প্রযোজ্য নয়। কোনো ব্যক্তি যদি কখনও উন্মাদ থাকে, আর কখনও সজ্ঞান থাকে, তা হলে সজ্ঞান থাকার সময় সওম রাখা ওয়াজিব, উন্মাদ থাকার সময় ওয়াজিব নয়। যদি দিনের বেলা উন্মাদনা দেখা দেয়, তা হলে সওম বাতিল হবে না, যেমন রোগ ইত্যাদির কারণে অচেতন হয়ে পড়লে সওম বাতিল হয় না। কারণ, সওমের নিয়্যত করার সময় সে সজ্ঞান ছিল। মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির হুকুমও তদ্রূপ।

রামাদান মাসে কেউ মারা গেলে অবশিষ্ট সওমের ব্যাপারে তার ওপর বা তার অভিভাবকদের ওপর কিছুই ওয়াজিব হবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px