📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 জুম'আর দিনের ফজিলত

📄 জুম'আর দিনের ফজিলত


নবীজি ইরশাদ করেছেন— 'জুম'আর দিন হল শ্রেষ্ঠ দিন। এ দিনই আদম-কে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। এ দিনই তাকে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে। আর কিয়ামতও হবে জুম'আর দিনে।' [সহিহ মুসলিম]

তিনি আরও বলেছেন— 'জুম'আর দিন হল শ্রেষ্ঠ দিন।' [সহিহ বুখারি, মুসলিম]

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 জুম'আর হুকুম

📄 জুম'আর হুকুম


জুম'আ আদায় করতে সক্ষম প্রত্যেক মুকাল্লাফের [শরিয়তের হুকুমের আদিষ্ট] ওপর তা ফরজে আইন। আল্লাহ ইরশাদ করেন—
'হে ঈমানদারগণ! জুম'আর দিন যখন সালাতের আযান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর যিকরের দিকে [সালাতের দিকে] দৌড়ে যাও!' [সূরা জুমআ : আয়াত : ৯]

কেউ যদি জুম'আর সালাতে উপস্থিত হতে না পারে, তা হলে যোহরের চার রাকআত সালাত পড়বে।

সহিহ মুসলিমে আছে, জুম'আর সালাতে উপস্থিত না হওয়া একটি সম্প্রদায়কে লক্ষ করে নবীজি ﷺ বলেছিলেন—
'আমার তো ইচ্ছা হয়েছিল, কাউকে সালাত পড়াতে বলে আমি এমনসব লোকের বাড়ি পুড়িয়ে দিই, যারা জুম'আর সালাতে না এসে বাড়িতে বসে থাকে।'

তিনি আরও বলেছেন—
'যে ব্যক্তি অবহেলা করে তিনটি জুম'আ ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে মোহর মেরে দেন।' [সহিহ বুখারি ব্যতীত সিহাহ সিত্তার বাকি পাঁচ কিতাব]

তিনি আরও বলেছেন—
'[জুম'আর সালাত তরককারী] লোকেরা জুম'আ তরক করা থেকে ফিরে আসুক। নচেৎ আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেবেন, এবং তারা গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।' [সহিহ মুসলিম]

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 জুম'আর সালাতের ওয়াক্ত

📄 জুম'আর সালাতের ওয়াক্ত


যোহরের ওয়াক্তই হল জুম'আর ওয়াক্ত। অর্থাৎ সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ার সাথে সাথেই এই সালাতের ওয়াক্ত শুরু হয়, এবং আসরের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত বাকি থাকে। তবে আজকাল মানুষ জুম'আর সালাতে আসতে বিলম্ব করে। রাসুল ﷺ ইরশাদ করেছেন—

'যে ব্যক্তি জুম'আর দিন জানাবতের গোসল করে, এরপর মসজিদে যায়, সে যেন একটি উট কুরবানি দিল। আর যে আরও পরে যায়, সে যেন একটি গরু কুরবানি দিল। আর যে আরও পরে যায়, সে যেন একটি শিংযুক্ত মেষ কুরবানি দিল। আর যে আরও পরে যায়, সে যেন একটি মুরগি দান করল। আর যে আরও পরে যায় সে যেন একটি ডিম দান করল। আর ইমাম বেরিয়ে এলে ফেরেশতারা যিকির [তথা আলোচনা] শোনার জন্য এসে যায়।' [সহিহ বুখারি]

আর এই মুহূর্তগুলো শুরু হয় সূর্যোদয় থেকে, এক উক্তিমতে, ফজরের সময় থেকে।

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন—
'জুম'আর দিন এলে মসজিদের প্রতিটি দরজায় ফেরেশতারা দাঁড়িয়ে প্রথমে আগমনকারীদের নাম লিখতে থাকে। ... ইমাম সাহেব বসে পড়লে তারা তাদের লেখার কাগজ গুটিয়ে নেয় এবং যিকির [ইমামের আলোচনা বা খুতবা] শোনার জন্য চলে আসে।' [সহিহ বুখারি]

এ কারণেই আগেকার নেককাররা আগে আগে মসজিদে চলে যেতেন এবং নফল সালাত, যিকির ও কুরআন তেলাওয়াতে লেগে যেতেন।

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 জুম'আর আদব

📄 জুম'আর আদব


জুম'আর সালাতের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে আসা মুস্তাহাব। নবীজি ইরশাদ করেছেন—
'যে-ব্যক্তি জুম'আর দিন গোসল করায়, এবং নিজে গোসল করে, আগে আগে মসজিদে যায়, এবং পায়ে হেঁটে যায়, [কোনো বাহনের ওপর] আরোহণ করে নয়, এবং ইমামের কাছাকাছি বসে, মনোযোগ দিয়ে ইমামের কথা শোনে, কোনো অর্থহীন কাজ করে না, সে ব্যক্তি প্রতি কদমে এক বছর [নফল] সালাত পড়ার ও সওম রাখার সওয়াব পাবে।'

মসজিদে যাওয়ার পথে তিলাওয়াত বা যিকরে মশগুল থাকা মুস্তাহাব।

আর সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরে সেজেগুজে যাওয়া এবং সুগন্ধ ব্যবহার করা মুস্তাহাব। নবীজি ইরশাদ করেছেন—
'যে-ব্যক্তি জুম'আর দিন উত্তমরূপে গোসল করল, তার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরিধান করল এবং সুগন্ধ ব্যবহার করল, যদি তার নিকট থাকে, এরপর মসজিদে এল, কারও ঘাড় টপকে সামনে গেল না, এরপর আল্লাহ তাআলা যতটুকু লিখে রেখেছেন, সালাত পড়ল, এরপর ইমাম বেরিয়ে এলে সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত চুপ রইল, তার এই সালাতটি এই জুম'আ ও পূর্ববর্তী জুম'আর মধ্যকার গোনাহর জন্য কাফফরা হবে।' [ইবনে হিব্বান ও হাকেম বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ।]

মসজিদে প্রবেশ করে যদি দেখে ইমাম খুতবা দিচ্ছেন, তা হলেও তাহিয়্যাতুল মসজিদ দু' রাকআত সালাত না পড়ে বসবে না। সালিক গিতফানি নামক এক সাহাবি মসজিদে প্রবেশ করলেন। রাসুল (ﷺ) তখন খুতবা দিচ্ছিলেন। তিনি বসে পড়লেন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কি দু' রাকআত পড়েছ?' তিনি বললেন, 'না।' তিনি বললেন— 'ওঠো! দু' রাকআত পড়ে নাও।'

মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে সামনে যাবে না। নবীজি ﷺ একব্যক্তিকে দেখতে পেলেন, সে লোকদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বললেন— 'বসে পড়ো! তুমি বিলম্বও করলে, লোকদের কষ্টও দিলে।'

জুম'আর দিনে অথবা জুম'আর রাতে সূরায়ে কাহফ পড়া মুস্তাহাব। এতে দু' জুম'আর মধ্যকার গোনাহ মাফ হয়ে যায়। [বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকে জুম'আর রাত শুরু হয়।]

জুম'আর দিনে ও রাতে বেশি বেশি দোয়া করবে। কারণ, এতে জুম'আর দিনের যে-মুহূর্তের দোয়া কবুল হয়, সে-মুহূর্তের সাথে মিলে যাওয়ার আশা থাকে। নবীজি বলেছেন— 'এই দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, ওই মুহূর্তে যে মুসলমান সালাত পড়ে দোয়া করতে থাকে, তা যদি ওই মুহূর্তে হয়ে যায়, তা হলে আল্লাহ তাআলা তাকে তা অবশ্যই দান করবেন।' এ কথা বলে তিনি হাত দিয়ে ইশারা করে বোঝালেন, সময়টা খুবই সামান্য। [সহিহ বুখারি, মুসলিম]

এই দিনে বা রাতে বেশি বেশি সদকা করা এবং ভাল কাজ করা উত্তম।

এই দিনে বা রাতে বেশি বেশি দরূদ শরিফ পড়া মুস্তাহাব। নবীজি ইরশাদ করেছেন— 'তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হল জুম'আর দিন। তাই এই দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরূদ শরিফ পাঠ করো। কারণ, তোমাদের দরূদ আমার সামনে পেশ করা হয়।' [সুনানে আবু দাউদ]

তিনি আরও বলেছেন— 'জুম'আর রাত ও দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরূদ শরিফ পাঠ করো। কারণ, যে ব্যক্তি আমার ওপর এক বার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত প্রেরণ করবেন।' [ভালো সনদে বাইহাকি বর্ণিত]

মসজিদে যাওয়ার পথে এক হাতের আঙ্গুল আরেক হাতের আঙ্গুলের ভিতর দিয়ে জট পাকানো মাকরূহ। তদ্রূপ যতক্ষণ পর্যন্ত সালাতের অপেক্ষায় থাকবে বা খুতবা শুনবে, ততক্ষণ যে-কোনো অর্থহীন কাজ করা মাকরূহ।

খুতবা শোনার সময় তন্দ্রা এলে সেরূপ করবে, যেরূপ করতে নবীজি বলেছেন— 'মসজিদে থাকার সময় কারও তন্দ্রা এলে বসার জায়গা পরিবর্তন করবে।' [সুনানে তিরমিযি, সুনানে আবু দাউদ]

জুম'আর জন্য গোসল করা সুন্নাতে মুআক্কাদা। কেউ কেউ ওয়াজিবও বলেছেন।

জুম'আর সালাতের পর চার রাকআত সালাত পড়বে।

খতিব সাহেব যদি নবীজির নাম উচ্চারণ করেন, তা হলে অনুচ্চ আওয়াজে দরূদ শরিফ পাঠ করবে।

খতিব যে দোয়া করবেন, সেখানে অনুচ্চ আওয়াজে আমিন বলা মুস্তাহাব।

মসজিদে এসে খতিবকে খুতবারত অবস্থায় পেলে সালাম করবে না। বরং ধীরস্থিরভাবে কাতারে এসে দু' রাকআত সালাত পড়বে। এরপর মন দিয়ে খুতবা শুনবে। পাশে বসা ব্যক্তির সাথে মুসাফাহা করবে না।

খুতবা চলাকালে নীরব থাকা চাই। কোনোরূপ কথা বলবে না। নবীজি বলেছেন, 'জুম'আর দিন খুতবা চলাকালে যদি তোমার ভাইকে বলো, চুপ হও! তা হলে তুমি অর্থহীন কাজ করলে।' [সহিহ বুখারি, মুসলিম] খুতবার সময় ইমাম মুসল্লিদের কারো কারো সাথে কথা বলতে চাইলে বলতে পারবেন। তবে খুতবা চলাকালীন কেউ হাতের দ্বারা, নখ, দাড়ি, কাপড়, চাদর দ্বারা খেলা করবে না। নবীজি বলেছেন, '[খুতবা চলাকালে] যে পাথর নিয়ে নাড়াচাড়া করে, সে অর্থহীন কাজ করল, আর যে অর্থহীন কাজ করে তার জুম'আ হয় না।' [ইমাম তিরমিযি এই হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

খুতবার সময় অযথা এদিক-ওদিক তাকাবে না। লোকদের দিকেও তাকাবে না। কারণ, এতে খুতবা থেকে মনোযোগ সরে পড়বে। হাঁচি এলে মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বলবে।

দুই খুতবার মাঝখানে ইমাম সাহেব বসলে প্রয়োজনীয় কথা সংশোধনের উদ্দেশ্যে সেরে নেওয়া যাবে।

কেউ কোথাও প্রমোদভ্রমণে গেল, বা পিকনিকে গেল। আশেপাশে জুম'আ পড়ার কোনো মসজিদ নেই। তা হলে তাদের ওপর জুম'আ ফরজ থাকবে না। তাদের সংখ্যা যতই হোক না কেন, তারা যোহরের সালাত পড়বে। কারণ, জুম'আর জন্য স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া শর্ত।

কেউ যদি বিলম্বে এসে ইমামের সাথে এক রাকআত পায়, তা হলে বাকি এক রাকআত পড়ে জুম'আর সালাত আদায় করবে। আর যদি এক রাকআতের কম পায়, যেমন তাশাহহুদ পেল, বা দুই সেজদা পেল, তা হলে তার জুম'আ পাওয়া হবে না। যোহরের নিয়্যতে ইমামের সাথে শরিক হবে। ইমাম সালাম ফেরালে যোহরের চার রাকআত সালাত পড়বে।

জুম'আর সালাতের জন্য সালাতের আগে দুটি খুতবা পড়তে হবে।

তবে খুতবা লম্বা হওয়ার শর্ত নেই। বরং সেখানে আল্লাহ-র প্রশংসা, শাহাদাতাইন [আল্লাহ-র একত্বের ও আল্লাহর রাসুলের সত্যতার সাক্ষ্য], নবীজি-র ওপর দরূদ, তাকওয়ার নসিহত, কুরআনের সামান্য অংশ তেলাওয়াত ইত্যাদি পাওয়া গেলেই চলবে।

উপস্থিত মুসল্লিদের বোধশক্তি অনুযায়ী খুতবা সহজ করা সুন্নাত। মিম্বরে উঠে প্রথমে বসবে। মুআয্যিনের আযান শেষ হলে দাঁড়িয়ে খুতবা পাঠ করবে। উভয় খুতবার মধ্যখানে বসবে। খুতবা পড়ার সময় ডানে-বাঁয়ে বেশি তাকাবে না। কারণ, নবীজি এ ব্যাপারে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতেন। উপস্থিত ব্যক্তিরা তার দিকে মুখ ফিরিয়ে মনোযোগী হবে। খুতবা দীর্ঘ না করে ভারসাম্যপূর্ণ করবে, যেন উপস্থিত ব্যক্তিদের মনে বিরক্তিবোধ সৃষ্টি না হয়। উঁচু আওয়াজে খুতবা পড়া সুন্নাত। কারণ, নবীজি-এর খুতবা পড়ার সময় তার আওয়াজ উঁচু হয়ে যেত, তার ক্রোধ বৃদ্ধি পেত। তা ছাড়া এভাবে পড়া হলে তা মানুষের মনে ভালভাবে বসে। আর খুতবার মধ্যে মুসলমানদের দীন-দুনিয়ার কল্যাণ ও শান্তির জন্য দোয়া করবে। খুতবা শেষ করে সালাতে দাঁড়াবে।

জুম'আর সালাত দু' রাকআত। ক্বিরাআত উঁচু আওয়াজে পড়বে। সূরায়ে ফাতিহার পর প্রথম রাকআতে সূরায়ে আ'লা سَبِّحْ اِسْمَ রَبِّكَ الْأَعْلَى এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরায়ে গাশিয়াহ هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْغَاشِيَةِ পড়া সুন্নাত। অথবা প্রথম রাকআতে সূরায়ে জুম'আ এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরায়ে মুনাফিকুন পড়বে।

টিকাঃ
২৭. হানাফী আলেমদের মতে, খুতবার সময় তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়া যায় না। রাসুল ﷺ ওই সাহবিকে কোন সালাত পড়তে বলেছিলেন, তাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২৮. প্রাগুক্ত
২৯. হানাফী আলেমদের মতে, তাশাহহুদ পাওয়া মানেই জামাত পাওয়া।

ফন্ট সাইজ
15px
17px