📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 মুসাফিরের সালাত

📄 মুসাফিরের সালাত


মুসাফির ব্যক্তি চার রাকআতবিশিষ্ট সালাত দু' রাকআত আদায় করবে। আল্লাহ ইরশাদ করেন—
'তোমরা যখন সফরে বের হবে, তখন সালাত কসর করলে তোমাদের কোনো পাপ হবে না।' [সূরা নিসা: ১০১]

যদি কেউ বারবারও সফর করতে থাকে, তা হলেও সে সালাত কসর করবে। যেমন বার্তাবাহক, ট্যাক্সিড্রাইভার।

মুসাফিরের জন্য যোহর ও আসর একসাথে এবং মাগরিব ও ইশা একসাথে এক ওয়াক্তে পড়া জায়েয।²⁶ যে মুসাফিরের জন্য কসর করা জায়েয, তার জন্য দু' সালাত এক ওয়াক্তে পড়াও জায়েয। তবে প্রয়োজন না হলে একত্রে না পড়াই উত্তম।

কেউ যদি সফরের নিয়্যত করে, কিন্তু তখনও নিজ বসতি বা শহর ত্যাগ করেনি, আর এরই মধ্যে সালাতের সময় উপস্থিত হয়, তা হলে সে সফরের সালাত পড়বে না। তার জন্য কসর করা জায়েয হবে না। কারণ, বসতি বা শহর ত্যাগ করার পরই কসরের হুকুম জারি হয়। আর কেউ যদি গাড়ি চড়ে সফর শুরু করে এবং শহরের বাইরে সালাত আদায় করে, তা হলে সে কসর পড়বে।

যদি কেউ বিমানে সফর করে এবং বিমানবন্দর শহরের বাইরে থাকে, আর যদি তার টিকেট বা বুকিং নিশ্চিত [ওকে] থাকে, তা হলে কসর পড়বে। আর যদি তা না হয়, তা হলে কসর পড়বে না। কারণ, তার সফর অনিশ্চিত।

সালাত পড়ার সময় কসর পড়ার কথা মনে উপস্থিত করার দরকার নেই, যেমন সফর না করার সময় পুরো সালাত পড়ার কথা মনে উপস্থিত করতে হয় না।

মুসাফির মুক্তাদি যদি পুরো সালাত পড়ার নিয়্যত করে, আর তার ইমাম কসর পড়ে, তা হলে মুক্তাদিও কসর পড়বে, যদি দুজনেই মুসাফির হয়।

যদি মুসাফির মুক্তাদি কসর পড়ার নিয়্যত করে, আর তার ইমাম পুরো সালাত পড়ে, তা হলে ইমামের অনুসরণে তাকেও পুরো সালাত পড়তে হবে।

মুসাফির যদি সালাত শুরু করে, এবং কসরের নিয়্যত করতে ভুলে যায়, তা হলে সে কসরই করবে, চাই সে ইমাম হোক বা মুক্তাদি।

ইমাম মুকিম না কি মুসাফির, তা যদি মুসাফিরের জানা না থাকে, তা হলে ইমাম যা পড়ে, তাকে তা-ই আদায় করতে হবে।

যদি সালাত শুরু করার সময় পুরো সালাত পড়ার নিয়্যত করে, কিন্তু সালাতের মধ্যে স্মরণ হয় যে, সে মুসাফির, তা হলে সে কসরই পড়বে, চাই সে মুকিম হোক বা মুসাফির। কারণ, মুসাফিরের প্রকৃত সালাত হল কসর।

যদি সালাতের শুরুতে কসরের নিয়্যত করে, এবং দ্বিতীয় রাকআতে বসার পর ভুলে উঠে দাঁড়ায়, তা হলে সে ফিরে আসবে এবং সেজদায়ে সাহু করবে।

মুসাফির ব্যক্তি যখন তার উদ্দিষ্ট শহরে পৌঁছবে, সে একা থাকুক বা তার আরও সফরসঙ্গী থাকুক, মুকিম থাকার মতই মসজিদে সালাত পড়বে। সফরের কারণে এতে কোনোরূপ শিথিলতা আসবে না। কারণ, মসজিদে সালাত পড়া-সম্পর্কিত হাদিসে সফরের অবস্থাকে বাদ দেওয়া হয়নি। যেমন ইরশাদ হচ্ছে—
'যে ব্যক্তি আযান শুনল, এরপরও মসজিদে এল না, তার সালাত [পূর্ণাঙ্গ] হবে না। তবে কোনো উযর থাকলে ভিন্ন কথা।' [সুনানে ইবনে মাজাহ]

ইমাম যদি পূর্ণ সালাত আদায় করে, তার পিছনে ইক্তিদা করে মুসাফিরের জন্য কসর করা জায়েয হবে না, চাই সালাতের শুরুতেই ইক্তিদা করুক বা শেষদিকে। হাদিসে আছে—
'ইমাম করা হয়েছে তার ইক্তিদা করার জন্য।' [বুখারি ও মুসলিম]

অনেক মুসাফির চার রাকআতবিশিষ্ট সালাতের শেষ দু' রাকআতে ইমামের ইক্তিদা করে। আর ওই দু' রাকআত পড়েই সালাত শেষ করে। এটা জায়েয নয়। বরং মুকিম ইমামের পিছনে ইক্তিদা করলে পুরো সালাত পড়তে হবে।

যদি ইক্তিদা করার সময় ইমামকে মুসাফির মনে করে থাকে, এবং শেষ দু' রাকআতে তাকে পেয়ে থাকে, এবং ওই দু' রাকআত আদায় করার পর জানতে পারে যে, ইমাম হলেন মুকিম, তা হলে তাকে পুরো সালাত পড়তে হবে এবং শেষে সেজদায়ে সাহু করতে হবে।

যদি মুসাফির ব্যক্তি মাগরিবের সালাত না পড়ে থাকে, এবং ইশার সালাত আদায়কারী মুসাফির ইমামের পিছনে ইক্তিদা করে, তা হলে ইমামের সালাম ফেরানোর পর দাঁড়িয়ে তৃতীয় রাকআত আদায় করবে। আর যদি ইমাম মুকিম হন, [যিনি ইশার সালাত চার রাকআত আদায় করছেন,] তা হলে মুক্তাদি তিন রাকআত আদায় করে বসে ইমামের সালাম ফেরানোর অপেক্ষা করবে এবং তারই সাথে সালাম ফেরাবে।

আর যদি মুসাফির ব্যক্তি ইশার সালাত দু' রাকআত পড়ার নিয়্যত করে, আর ইমাম মাগরিবের সালাত পড়ে, তা হলে মুক্তাদি ইশার নিয়্যতে সালাতে শরিক হবে। আর ইমাম সালাম ফেরানোর পর দাঁড়িয়ে চতুর্থ রাকআত আদায় করবে। দু' রাকআত পড়ে সালাত শেষ করা তার জন্য জায়েয হবে না।

টিকাঃ
২৬. হানাফী আলেমদের মতে এরূপ করার কোনো সুযোগ নেই।

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 সত্তর বছর সালাত ফউত হয়নি!

📄 সত্তর বছর সালাত ফউত হয়নি!


সাঈদ বিন আব্দুল আজিজ যদি কখনও জামাআতে সালাত পড়তে না পারতেন, তিনি ক্রন্দন করতেন।

সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব-র চল্লিশ বছর এমন অতিবাহিত হয়েছে যে, যখন সালাতের আযান হত, তিনি মসজিদেই থাকতেন।

ইমাম আ'মাশ-র প্রায় সত্তর বছর এমন কেটেছে যে, এর মধ্যে তার তাকবিরে-উলা ছোটেনি।

সুলাইমান মুকাদ্দেসি-কে জামাআতের সালাত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হল। তখন তার বয়স প্রায় নব্বই। তিনি বললেন, 'দু' ওয়াক্ত সালাত ছাড়া কখনও আমি ফরজ সালাত একাকী পড়িনি। ওই দু' ওয়াক্তের ব্যাপারে আমার মনে হয়, যেন আমি ওই সালাত পড়িইনি।'

হাতেমে আসাম্ম বলেন, 'একবার আমি জামাআত পাইনি। এতে একমাত্র আবু ইসহাক বুখারিই আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। অথচ আমার কোনো সন্তান মারা গেলে দশ হাজারের বেশি লোক আমাকে সান্ত্বনা দিতে আসত।'

রবি' বিন খাইসাম রহ.-র দেহ সম্পূর্ণ অসাড় হয়ে গিয়েছিল। পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। দু' ব্যক্তির ওপর ভর করে তাকে মসজিদে নেওয়া হত। সঙ্গীরা জিজ্ঞাসা করতেন, 'আবু ইয়াজিদ! আল্লাহ তোমার জন্য অবকাশ রেখেছেন। ঘরেই যদি সালাত পড়ে নিতে...।' তিনি বলতেন, 'আমি শুনতে পাই, মুআয্যিন ডাকছেন— حَيَّ عَلَى الْفَلَاح [কল্যাণের দিকে দৌড়ে এসো!] তোমাদের কেউ যদি কল্যাণের দিকে যাওয়ার আহ্বান শোনে, হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাতে সাড়া দেওয়া চাই।'

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 মৃত্যুর বিছানায়

📄 মৃত্যুর বিছানায়


বিশিষ্ট আবেদ ও জাহেদ আব্দুল্লাহ বিন ইদরিস-র মৃত্যুর সময় তার যন্ত্রণা বেড়ে গিয়েছিল। তিনি যখন দ্রুত শ্বাস নিতে লাগলেন, তা দেখে তার মেয়ে কাঁদতে লাগলেন। তিনি বললেন, ‘বেটি, কেঁদো না! এ ঘরেই আমি চার হাজার বার কুরআন খতম করেছি। সবক’টা খতমই করেছি এই পরিস্থিতির জন্য।’

আমের বিন আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর। মৃত্যুশয্যায় শায়িত। শেষ ক’টি শ্বাস গণনা করছেন। পাশে বসে পরিবারের লোকজন কাঁদছে। মৃত্যুর ওপারে যাওয়ার উপক্রম করছেন এমন সময় তিনি আযান শুনতে পেলেন। মাগরিবের আযান দিয়েছেন মুআয্যিন। পাশে উপবিষ্ট লোকদের তিনি বললেন, ‘আমার দু’ হাত ধরো।’ তারা বললেন, ‘কোথায় যাবেন?’ তিনি বললেন, ‘মসজিদে।’ তারা বললেন, ‘এই অবস্থায়!’ তিনি বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ! সালাতের ডাক শুনতে পাব, আর তাতে সাড়া দেব না? আমার হাত ধরো!’ তারা তাকে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন। ইমামের সাথে এক রাকআত পড়লেন। এরপর সেজদার মধ্যেই বিদায় হলেন। হ্যাঁ! সেজদারত অবস্থায়ই তার মৃত্যু হল।

আব্দুর রহমান বিন আসওয়াদের মৃত্যুক্ষণ। তিনি কাঁদছেন। জিজ্ঞাসা করা হল, ‘কান্নার কারণ কী? আপনি ...। আপনি ...।’ অর্থাৎ সালাত-ইবাদত-বিনয়-যুহদে তো আপনি অনন্য। তিনি বললেন, ‘খোদার কসম! আমি আমার সালাত-সিয়ামের ওপর আক্ষেপ করে কাঁদছি। এরপর তিনি তেলাওয়াত করতে লাগলেন। আর এই অবস্থায়ই তার মৃত্যু হল।’

ইয়াজিদ রাক্কাশি তার মৃত্যুর সময় এ বলে কাঁদতে লাগলেন, 'ইয়াজিদ! তুমি মারা গেলে তোমার জন্য সালাত পড়বে কে? তোমার জন্য সিয়াম রাখবে কে? কে তোমার গোনাহ মাফের দরখাস্ত করবে? এরপর তিনি কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন এবং মৃত্যুবরণ করলেন।'

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 সাত হাজার দেরহাম ... জেল হতে খালাস!!

📄 সাত হাজার দেরহাম ... জেল হতে খালাস!!


ঘটনাটি তারিখে বাগদাদ কিতাবে বর্ণিত আছে। এক দরিদ্র ব্যক্তি আব্দুল্লাহ বিন মুবারক-র নিকট এল। জানাল, সে ঋণগ্রস্ত। অনুরোধ করল, তিনি যেন ঋণটা আদায় করে দেন। একটি চিঠি লিখে তিনি তার হাতে দিলেন এবং তাকে তার মুনশির নিকট যেতে বললেন। লোকটি চিঠিটি নিয়ে তার নিকট গেল। মুনশি চিঠিটি পড়ল। এরপর ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করল, 'কত টাকা ঋণ আদায়ের কথা তুমি তাকে বলেছিলে?' সে বলল, 'সাতশ' দেরহাম।' মুনশি তার নিকট একটি চিঠি লিখল, 'লোকটা আপনার নিকট সাতশ' দেরহামের কথা বলেছে। আর আপনি সাত হাজার দেরহামের কথা লিখেছেন। এভাবে অল্পদিনেই সব মাল শেষ হয়ে যাবে।'

আব্দুল্লাহ বিন মুবারক লিখে পাঠালেন, 'মাল যদি শেষ হয়ে যায়, তা হলে জীবনও তো শেষ হয়ে যাবে। কাজেই আমার কলম যা লিখেছে, তা-ই আদায় করো।'

আব্দুল্লাহ বিন মুবারক প্রায়ই রিক্কা যেতেন। একটি সরাইখানায় অবস্থান করতেন। এক যুবক এসে তার সেবা করত। তার প্রয়োজন মেটাত। তার থেকে হাদিস শুনত।

একবার তিনি রিক্কায় এলেন। কিন্তু যুবকটিকে দেখতে পেলেন না। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন, সে বন্দী। অনেক ঋণী হয়ে পড়েছে সে। তাই তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। জিজ্ঞাসা করলেন, 'ঋণের পরিমাণ কত?' লোকেরা জানাল, 'দশ হাজার দেরহাম।' আব্দুল্লাহ বিন মুবারক পাওনাদারকে খোঁজ করতে লাগলেন। খুঁজতে খুঁজতে একসময় তাকে পেয়েও গেলেন। তিনি রাতে তাকে ডেকে আনলেন। দশ হাজার দেরহাম তাকে দিয়ে বললেন, 'সে যেন এটা কাউকে না জানায়, যত দিন তিনি বেঁচে থাকেন।' আর বললেন, 'ভোর হলে তাকে মুক্ত করে দেবে।' এরপর আব্দুল্লাহ বিন মুবারক রাতেই রিক্কা ত্যাগ করলেন।

যুবকটি কয়েদখানা থেকে মুক্ত হলে তাকে জানানো হল, আব্দুল্লাহ বিন মুবারক এসেছিলেন। তোমার খোঁজ করেছিলেন। যুবক তার পিছনে পিছনে ছুটল। রিক্কা হতে দু'-তিন মনযিল দূরে গিয়ে তার সাক্ষাৎ পেল। আব্দুল্লাহ বিন মুবারক জিজ্ঞাসা করলেন, 'যুবক! কোথায় ছিলে? সরাইখানায় দেখিনি।' যুবক বলল, 'ঋণের কারণে কয়েদ ছিলাম।' তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'মুক্তি পেলে কীভাবে?' সে বলল, 'একব্যক্তি এসে ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছে। তাকে চিনতে পারিনি।' আব্দুল্লাহ বিন মুবারক বললেন, 'আল্লাহ যে তোমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, তার জন্য তার শোকর করো।' এরপর তিনি তার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px