📄 সালাত পড়েছ! না, তুমি তো সালাত পড়োনি!
বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনা। একদিনের ঘটনা। নবীজি ﷺ তাঁর সাহাবিদের নিয়ে মসজিদে বসে আছেন। এ সময় একব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করল। প্রবেশ করেই সে সালাত পড়া শুরু করল। সে সালাত পড়ছিল, আর নবীজি ﷺ তাঁর সালাত দেখছিলেন। সালাত শেষ করে সে নবীজি ﷺ-র নিকট এল। সালাম করল। তিনি তার সালামের জবাব দিলেন। এরপর বললেন, 'ফিরে গিয়ে সালাত পড়ো। তুমি সালাত [সঠিকভাবে] পড়নি।' লোকটি ফিরে গেল। সালাত পড়ল। আগের মতই পড়ল। এরপর নবীজি ﷺ-র নিকট এসে সালাম করল। তিনি বললেন, 'ওয়া আলাইকাস্সালাম! ফিরে গিয়ে সালাত পড়ো। কারণ, তুমি সালাত [সঠিকভাবে] পড়নি।' তখন লোকটি বলল, 'যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন, তার শপথ! এর থেকে ভালভাবে আমি পড়তে পারি না। আমাকে শিখিয়ে দিন!'
তখন নবীজি ﷺ বললেন, 'তুমি যখন সালাতে দাঁড়াবে, তখন তাকবির বলবে। এরপর কুরআন থেকে যতটুকু পার, পড়বে। এরপর রুকু' করবে। রুকু' তে গিয়ে স্থির হবে। এরপর সোজা হয়ে দাঁড়াবে। এরপর সেজদা করবে। সেজদায় গিয়ে স্থির হবে। এরপর স্থির হয়ে বসবে। এভাবেই পুরো সালাত শেষ করবে।'
'ফিরে গিয়ে সালাত পড়ো। কারণ, তুমি সঠিকভাবে সালাত পড়নি।' -সালাতশেষে এ কথা বলার মানুষ যে কত মুখাপেক্ষী!
আজকাল মানুষ সেজদার সময় মাটিতে মাথা ঠেকিয়েই উঠিয়ে ফেলে, যেন কাকের ঠোকর। রুকু' থেকেও তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়, যেন সন্দেহ নিয়ে সালাত পড়ছে। সেজদায় আল্লাহ-র নিকট কান্নাকাটি তো নেই-ই। দয়াময় আল্লাহ-র সামনে বিনয় প্রকাশও নেই।
📄 অধীনস্থ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ
আব্দুল আজিজ বিন মারওয়ান তার পুত্র উমর-কে মদিনা পাঠালেন। তিনি সেখানে শিষ্টাচার শিখবেন, ইলম অর্জন করবেন। আর সালেহ বিন কাইসান-কে লিখে পাঠালেন, তিনি যেন তার খোঁজখবর রাখেন। সালেহ বিন কাইসান রহ. সালাতে সব সময় তার সাথে থাকতেন।
একদিন উমর বিন আব্দুল আজিজ সালাতে আসতে বিলম্ব করলেন। সালেহ বিন কাইসান জিজ্ঞাসা করলেন, 'বিলম্বে আসার কারণ কী?'
তিনি বললেন, 'মাথা আঁচড়াচ্ছিলাম। তাই দেরি হয়ে গেছে।'
তিনি বললেন, 'চুলের প্রতি তোমার ভালবাসা এতটাই হয়ে গেছে যে, এর জন্য সালাতেও বিলম্ব করছ?'
বিষয়টি তার পিতার নিকট লিখে পাঠালেন। তার পিতা একজন দূত পাঠালেন। মাথার চুল কামানোর আগ পর্যন্ত তিনি তার সাথে কোনো কথাই বলেননি।
এক জুম'আয় আব্দুল মালেক বিন মারওয়ান তার পুত্র হিশামকে দেখতে পেলেন না। সালাতের পর লোক পাঠিয়ে বিলম্বের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন।
হিশাম বললেন, 'আমার খচ্চরটা আমাকে আনতে পারছিল না। অন্য কোনো প্রাণীও পাইনি।'
তিনি তার নিকট সংবাদ পাঠালেন, তুমি যখন পশু না থাকার কারণে জুম'আয় উপস্থিত হও না, আমিও কসম করেছি, পুরো এক বছর তোমাকে কোনো বাহন দেব না।
মুজাহিদ রহ. বলেন, 'আমি এক বদরি সাহাবিকে দেখেছি, তিনি তার পুত্রকে জিজ্ঞাসা করছেন, তুমি কি আমাদের সাথে সালাত পড়েছ?'
তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, পড়েছি।'
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাকবিরে-উলা কি পেয়েছ?'
তিনি বললেন, 'না, পাইনি।'
সাহাবি বললেন, 'তুমি যখন কালো চোখবিশিষ্ট একশ' উট থেকেও উত্তম বস্তু হারালে ...।'
আবু হুরায়রা যখন সালাতের জন্য বেরতেন, তার পরিবারের লোকদের নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় চিৎকার করে তাদের ঘর থেকে বের করে মসজিদে নিয়ে যেতেন। আর এই আয়াত পাঠ করতেন-
'তুমি তোমার পরিবারকে সালাতের নির্দেশ দাও; এবং এর ওপর ধৈর্যধারণ করো। তোমার নিকট আমি রিযিক চাই না। আমিই তোমাকে রিযিক দিই। উত্তম পরিণতি তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য।' [সূরায়ে ত্বা-হা: আয়াত ১৩২]
📄 তারাবিহর সালাত
এ সালাত রামাদানে আদায় করা হয়। এটি সুন্নাতে মুআক্কাদা। সালাতটির নাম তারাবিহ হওয়ার কারণ হল, এই সালাত দীর্ঘ হওয়ার কারণে প্রতি চার রাকআত পর তারবিহা করা হয়। [তারবিহা আরবি শব্দ। অর্থ আরাম করা।] তাই এই সালাতকে তারাবিহ বলা হয়। এই সালাত মসজিদে জামাআতের সাথে আদায় করা উত্তম। নবীজি ইরশাদ করেছেন—
মَنْ قَامَ مَعَ الْإِمَامِ حَتَّى يَنْصَرِفَ كُتِبَ لَهُ قِيَامُ لَيْلَةٍ
যে-ব্যক্তি ইমামের সাথে সালাত পড়ে, তার আমলনামায় রাত্রিজাগরণের সওয়াব লেখা হয়। [সহিহ বুখারি, মুসলিম]
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন—
মَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
যে-ব্যক্তি রামাদানে ঈমান সহকারে সওয়াবের আশায় সালাত পড়ে, তার অতীতের সকল গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। [সহিহ বুখারি, মুসলিম]
আয়েশা রাযি. বলেন, ‘রাসুল রামাদান বা রামাদানের বাইরে এগারো রাকআতের বেশি পড়তেন না।’ তবে এ ব্যাপারে রাসুল হতে অকাট্য কিছু বর্ণিত নেই। তাই এগারো রাকআতও পড়া যেতে পারে, আবার তেইশ রাকআতও পড়া যেতে পারে। এর বেশি পড়লেও ক্ষতি নেই।²²
টিকাঃ
২২. হানাফী আলেমদের মতে বিতরসহ তারাবিহ তেইশ রাকআত পড়বে।
📄 ফরজ সালাতের সাথের সুন্নাত
ফরজ সালাতের সাথে যেসব সুন্নাত পড়ার বিধান রয়েছে, সেগুলো অনেক ফজিলতপূর্ণ। নবীজি ইরশাদ করেছেন—
মَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِمٍ يُصَلّي الله كُلَّ يَوْمٍ ثِنْتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً تَطَوّعاً، غَيْرَ فَرِيضَةٍ، إِلَّا بَنَى اللَّهُ لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ أَرْبَعُ رَكْعَاتٍ قَبْلَ الظُّهْرِ ... وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْمَغْرِبِ ... وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْعِشَاءِ... وَرَكْعَتَيْنِ قَبْلَ الصُّبْحِ
যে মুসলমান আল্লাহকে খুশি করার জন্য প্রতিদিন ফরজের অতিরিক্ত বারো রাকআত নফল সালাত পড়বে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন। [সেগুলো হল,] যোহরের আগে চার রাকআত, যোহরের পর দু' রাকআত, মাগরিবের পর দু' রাকআত, ইশার পর দু' রাকআত এবং ফজরের আগে দু' রাকআত। [সহিহ মুসলিম]
এগুলো হল সুন্নাতে মুআক্কাদা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকিদ হল ফজরের সুন্নাতের। হাদিসে আছে— رَكْعَتَا الْفَجْرِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيْهَا ফজরের সালাতের দু' রাকআত সালাত দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা-কিছু আছে, তার সবকিছু থেকে উত্তম। [সহিহ মুসলিম]
ফজরের দু' রাকআত সুন্নাত দীর্ঘ না করা উত্তম। প্রথম রাকআতে সূরায়ে ফাতিহার পর সূরায়ে কাফেরুন পড়বে, এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরায়ে ইখলাস পড়বে। অথবা প্রথম রাকআতে পড়বে— قُولُوا أَمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ إِلَى إِبْرُهِمَ وَإِسْمَعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِنْ رَّبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ মِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ
আর দ্বিতীয় রাকআতে পড়বে— قُلْ يَأَهْلَ الْكِتَبِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا মِّنْ دُونِ اللَّهِ ۖ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ
তদ্রূপ মাগরিবের পরের দু' রাকআতেও সূরায়ে কাফেরুন ও সূরায়ে ইখলাস পড়বে।
এসব সুন্নাত সালাতের কোনোটা পড়তে না পারলে পরবর্তীতে কাজা পড়া সুন্নাত।²³ তদ্রূপ কেউ যদি রাতে বিতরের সালাত পড়তে না পারে, তা হলে দিনের বেলায় তা কাজা পড়ে নেবে। নবীজি ইরশাদ করেছেন—
মَنْ نَامَ عَنْ الْوِتْرِ أَوْ نَسِيَهُ فَلْيُصَلِّ إِذَا أَصْبَحَ أَوْ ذَكَرَ
কেউ যদি বিতর না পড়ে ঘুমিয়ে পড়ে, বা পড়তে ভুলে যায়, তা হলে সকাল হলে তা পড়ে নেবে, অথবা স্মরণ হলে পড়ে নেবে। [দারা কুতনি]
তবে বিতর সালাত কাজা পড়ার সময় এক রাকআত বৃদ্ধি করে জোড় রাকআত বানিয়ে নেবে। তাই কেউ যদি সব সময় পাঁচ রাকআত পড়ে, তা হলে ছয় রাকআত পড়বে। এভাবে বাকিগুলোর নিয়ম।²⁴
টিকাঃ
২৩. হানাফী আলেমদের মতে, ফজরের সুন্নাত ব্যতীত কোনো সুন্নাতের কাজা নেই।
২৪. তবে হানাফী আলেমদের মতে এরূপ করবে না।