📄 মুমিনের জান্নাত তার মেহরাবে
এক ব্যক্তি হাসপাতালে গেল। দেখতে পেল, এক রুগ্ন ব্যক্তি বিছানায় পড়ে আছে। পুরো দেহ অসাড়। শুধু মাথাটা নাড়াচাড়া করতে পারছে। তার অবস্থা দেখে ওই ব্যক্তির মনে মমতা জেগে উঠল। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, 'আপনার মনে কি কোনো আকাঙ্ক্ষা আছে? থাকলে বলুন, পূরণ করতে চেষ্টা করব।' রোগী বলল, 'আমার বয়স চল্লিশের মত। পাঁচ সন্তানের পিতা আমি। সাত বছর ধরে এ বিছানায় শুয়ে আছি। বিশ্বাস করুন! আমি চলাফেরা করতেও চাই না; সন্তানদের দেখার আকাঙ্ক্ষাও আমার নেই। অন্যসব মানুষের মত ভোগবিলাসের জীবনও চাই না। শুধু একটি তামান্না আমার যদি আল্লাহ-র সামনে মাটিতে কপালটা রেখে সেজদা করতে পারতাম! প্রভুর সামনে নিজের লাঞ্ছনা প্রকাশ করতে পারতাম! মানুষের মত আমিও যদি সেজদা করতে পারতাম!'
প্রিয় ভাই! তুমি এখন সুস্থ। রোগবালাই থেকে মুক্ত। আল্লাহ-র নির্দেশ মুতাবিক তুমি কি তোমার সালাত কায়েম করেছ?
📄 আল্লাহই রক্ষাকারী
ইমাম বুখারি-র বর্ণনা। ইবরাহিম সফর করছিলেন। সাথে ছিলেন তার স্ত্রী সারা। তারা দুজন একটি শহরে প্রবেশ করলেন। সেখানকার বাদশাহ ছিল এক স্বেচ্ছাচারী শাসক।
তার এক অনুচর এসে তাকে জানাল, এখানে এক ব্যক্তি এসেছে। তার সাথে এক নারী আছে, খুবই সুন্দরী। ওকে শুধু আপনার সাথেই মানায়।
ইবরাহিম-র নিকট ওই অত্যাচারী শাসক তার বাহিনী পাঠাল। তারা তাকে জিজ্ঞাসা করল, 'তোমার সাথে যে নারী আছে, সে কে?' ইবরাহিম বুঝতে পারলেন, এই অত্যাচারীর মুকাবেলা করার শক্তি তার নেই। তিনি যদি বলেন, 'এ হল আমার স্ত্রী' তা হলে তারা তাকে মেরে ফেলবে। তাই তিনি তাদের বললেন, 'এ হল আমার বোন।'
এরপর তিনি স্ত্রী সারার নিকট এলেন; বললেন, 'সারা! দুনিয়ার বুকে তুমি আর আমি ছাড়া মুমিন বলতে কেউ নেই। এই ব্যক্তি তোমার সম্বন্ধে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে। তাকে বলেছি, তুমি আমার বোন। তাই তুমি আমাকে মিথ্যাবাদী বানিয়ো না।'
অত্যাচারী শাসক সারার নিকট লোক পাঠাল। তাকে তার নিকট উপস্থিত করা হল। সে তার কক্ষে এল। তার নিকট এগোল। এরপর যখন তার দিকে হাত বাড়াল, তার হাত অবশ হয়ে গেল। এতে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। বলল, 'তুমি আল্লাহর নিকট দোয়া করো, তিনি যেন আমাকে সুস্থ করে দেন। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।'
সারা তার জন্য দোয়া করলেন। তার হাতে আবার অনুভূতি ফিরে এল। শয়তান তাকে প্ররোচনা দিল। সে আবার তার দিকে অগ্রসর হল। তিনি তার জন্য বদদোয়া করলেন। এতে তার হাত আবার আগের মত, বরং আগের চেয়েও বেশি অসাড় হয়ে গেল। সে যখন বুঝতে পারল, এই নারীর ওপর তার শক্তি চলবে না, সে ভীত হয়ে পড়ল; বলল, 'তুমি আমার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করো। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।'
সারা তার জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ তাঁর হাত সুস্থ করে দিলেন। হাতে আবার অনুভূতি ফিরে এল।
সে তার এক দারোয়ানকে ডেকে পাঠাল। তাকে বলল, 'তোমরা আমার নিকট কোনো মানুষ আনোনি, এনেছ এক শয়তান।' এরপর তাকে তার প্রাসাদ থেকে বের করে দিল। তাকে একটি দাসীও দিল। তার নাম হাজেরা।
সেখান থেকে বেরিয়ে সারা তার স্বামীর নিকট গেলেন। ভিতরে গিয়ে দেখতে পেলেন, তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে আছেন। আল্লাহ-র নিকট দোয়া করছেন, কান্নাকাটি করছেন।
সারা ফিরে এসেছেন বুঝতে পেরে তিনি হাত দিয়ে ইশারা করলেন, তার সংবাদ জিজ্ঞাসা করলেন।
তিনি বললেন, 'আল্লাহ ওই বদমাশের চক্রান্তে তাকেই ফাঁসিয়ে দিয়েছেন।'
দেখো! বিপদের সময় ইবরাহিম কীভাবে তার প্রভুর দরবারে লুটিয়ে পড়লেন।
📄 সালাত পড়েছ! না, তুমি তো সালাত পড়োনি!
বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনা। একদিনের ঘটনা। নবীজি ﷺ তাঁর সাহাবিদের নিয়ে মসজিদে বসে আছেন। এ সময় একব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করল। প্রবেশ করেই সে সালাত পড়া শুরু করল। সে সালাত পড়ছিল, আর নবীজি ﷺ তাঁর সালাত দেখছিলেন। সালাত শেষ করে সে নবীজি ﷺ-র নিকট এল। সালাম করল। তিনি তার সালামের জবাব দিলেন। এরপর বললেন, 'ফিরে গিয়ে সালাত পড়ো। তুমি সালাত [সঠিকভাবে] পড়নি।' লোকটি ফিরে গেল। সালাত পড়ল। আগের মতই পড়ল। এরপর নবীজি ﷺ-র নিকট এসে সালাম করল। তিনি বললেন, 'ওয়া আলাইকাস্সালাম! ফিরে গিয়ে সালাত পড়ো। কারণ, তুমি সালাত [সঠিকভাবে] পড়নি।' তখন লোকটি বলল, 'যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন, তার শপথ! এর থেকে ভালভাবে আমি পড়তে পারি না। আমাকে শিখিয়ে দিন!'
তখন নবীজি ﷺ বললেন, 'তুমি যখন সালাতে দাঁড়াবে, তখন তাকবির বলবে। এরপর কুরআন থেকে যতটুকু পার, পড়বে। এরপর রুকু' করবে। রুকু' তে গিয়ে স্থির হবে। এরপর সোজা হয়ে দাঁড়াবে। এরপর সেজদা করবে। সেজদায় গিয়ে স্থির হবে। এরপর স্থির হয়ে বসবে। এভাবেই পুরো সালাত শেষ করবে।'
'ফিরে গিয়ে সালাত পড়ো। কারণ, তুমি সঠিকভাবে সালাত পড়নি।' -সালাতশেষে এ কথা বলার মানুষ যে কত মুখাপেক্ষী!
আজকাল মানুষ সেজদার সময় মাটিতে মাথা ঠেকিয়েই উঠিয়ে ফেলে, যেন কাকের ঠোকর। রুকু' থেকেও তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়, যেন সন্দেহ নিয়ে সালাত পড়ছে। সেজদায় আল্লাহ-র নিকট কান্নাকাটি তো নেই-ই। দয়াময় আল্লাহ-র সামনে বিনয় প্রকাশও নেই।
📄 অধীনস্থ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ
আব্দুল আজিজ বিন মারওয়ান তার পুত্র উমর-কে মদিনা পাঠালেন। তিনি সেখানে শিষ্টাচার শিখবেন, ইলম অর্জন করবেন। আর সালেহ বিন কাইসান-কে লিখে পাঠালেন, তিনি যেন তার খোঁজখবর রাখেন। সালেহ বিন কাইসান রহ. সালাতে সব সময় তার সাথে থাকতেন।
একদিন উমর বিন আব্দুল আজিজ সালাতে আসতে বিলম্ব করলেন। সালেহ বিন কাইসান জিজ্ঞাসা করলেন, 'বিলম্বে আসার কারণ কী?'
তিনি বললেন, 'মাথা আঁচড়াচ্ছিলাম। তাই দেরি হয়ে গেছে।'
তিনি বললেন, 'চুলের প্রতি তোমার ভালবাসা এতটাই হয়ে গেছে যে, এর জন্য সালাতেও বিলম্ব করছ?'
বিষয়টি তার পিতার নিকট লিখে পাঠালেন। তার পিতা একজন দূত পাঠালেন। মাথার চুল কামানোর আগ পর্যন্ত তিনি তার সাথে কোনো কথাই বলেননি।
এক জুম'আয় আব্দুল মালেক বিন মারওয়ান তার পুত্র হিশামকে দেখতে পেলেন না। সালাতের পর লোক পাঠিয়ে বিলম্বের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন।
হিশাম বললেন, 'আমার খচ্চরটা আমাকে আনতে পারছিল না। অন্য কোনো প্রাণীও পাইনি।'
তিনি তার নিকট সংবাদ পাঠালেন, তুমি যখন পশু না থাকার কারণে জুম'আয় উপস্থিত হও না, আমিও কসম করেছি, পুরো এক বছর তোমাকে কোনো বাহন দেব না।
মুজাহিদ রহ. বলেন, 'আমি এক বদরি সাহাবিকে দেখেছি, তিনি তার পুত্রকে জিজ্ঞাসা করছেন, তুমি কি আমাদের সাথে সালাত পড়েছ?'
তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, পড়েছি।'
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাকবিরে-উলা কি পেয়েছ?'
তিনি বললেন, 'না, পাইনি।'
সাহাবি বললেন, 'তুমি যখন কালো চোখবিশিষ্ট একশ' উট থেকেও উত্তম বস্তু হারালে ...।'
আবু হুরায়রা যখন সালাতের জন্য বেরতেন, তার পরিবারের লোকদের নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় চিৎকার করে তাদের ঘর থেকে বের করে মসজিদে নিয়ে যেতেন। আর এই আয়াত পাঠ করতেন-
'তুমি তোমার পরিবারকে সালাতের নির্দেশ দাও; এবং এর ওপর ধৈর্যধারণ করো। তোমার নিকট আমি রিযিক চাই না। আমিই তোমাকে রিযিক দিই। উত্তম পরিণতি তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য।' [সূরায়ে ত্বা-হা: আয়াত ১৩২]