📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 এক মিনিটে নয়বার নিঃশ্বাস

📄 এক মিনিটে নয়বার নিঃশ্বাস


এক ডাক্তার আমার নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। একবার তিনি একটি আই. সি. ইউ. রুমে এক রোগীর নিকট গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখেন, এক অশীতিপর বৃদ্ধ পড়ে আছেন বেডের সাদা চাদরের ওপর। মুখটা যেন তার নুরে চমকাচ্ছে।

ডাক্তার সাহেব বলেন, 'আমি তার ফাইলটা উল্টিয়ে দেখছিলাম। তার হার্টের অপারেশন হয়েছিল।'

রক্তক্ষরণে তার দেহ বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। মস্তিষ্কের একটি রগ অকার্যকর হয়ে গেছে। ফলে সম্পূর্ণ অজ্ঞান হয়ে আছেন তিনি। নানা রকম যন্ত্রপাতি দেহে লাগানো। সেগুলোর একটি তার মুখে। কৃত্রিম শ্বাসের ব্যবস্থা। প্রতি মিনিটে নয়বার করে কৃত্রিম শ্বাস আসা-যাওয়া করছে।

পাশেই তার এক ছেলে বসা। তাকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, তার বাবা অনেক বছর ধরে এক মসজিদের মুআযযিন ছিলেন। আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। হাত নাড়ালাম; চোখের পাতা নাড়ালাম। কথা বললাম। কোনো সাড়া নেই।

তার অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে তার ছেলে কথা বলতে লাগল। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। ছেলে বলছিল, 'বাবা! আম্মু ভাল আছেন। ভায়েরাও ভাল আছেন। মামা সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন।' ছেলে বলে যাচ্ছিল। অবস্থা আগের মতই-বৃদ্ধের কোনো সাড়া নেই। মেশিন প্রতি মিনিটে নয়বার করে শ্বাস পরিচালনা করতে পারছে।

হঠাৎ ছেলে বলে উঠল, 'বাবা! মসজিদ আপনার অপেক্ষায় আছে। অমুক ছাড়া কেউ সেখানে আযান দিচ্ছে না। তার আযানে অনেক ভুল। মসজিদে আপনার জায়গা খালি পড়ে আছে।'

মসজিদ আর আযানের কথা বলার সাথে সাথেই বৃদ্ধের বুক নড়ে উঠল। শ্বাস নিতে শুরু করলেন। মেশিনের দিকে তাকালাম। শ্বাসের গতি মিনিটে আঠারো দেখাচ্ছে। ছেলেটির দৃষ্টি সে দিকে যায়নি।

এরপর ছেলে বলল, 'আমার চাচাত ভাই বিয়ে করেছে। ভাই ডিগ্রি লাভ করেছেন।' বৃদ্ধ আবার নিথর হয়ে পড়লেন। শ্বাসের গতি নয়ে নেমে এল।

এটা দেখে আমি তার দিকে এগোলাম। মাথার নিকট দাঁড়িয়ে তার হাত, চোখ ইত্যাদি নাড়া দিলাম। সাড়া নেই। সবকিছুই স্থির। আমি বিস্মিত হলাম। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলতে লাগলাম, 'আল্লাহু আকবার। হাইয়া আলাস্সালাহ। হাইয়া আলাল ফালাহ।' আর মেশিনের ডিসপ্লের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে রইলাম। দেখতে পেলাম, ডিসপ্লে মিনিটে আঠারো বার নিঃশ্বাস শো করছে।

লোকটার অন্তর মসজিদের সাথে লেগে আছে।

কত সৌভাগ্যবান রোগী সে! বরং প্রকৃত অর্থে রোগী আমরাই! হ্যাঁ। কুরআন বলছে-
'এমনসব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর যিকির, সালাত কায়েম ও যাকাত আদায় থেকে অমনোযোগী করে না। তারা ভয় করছে এমন দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে, যেন আল্লাহ তাদের কর্মের উৎকৃষ্টতর প্রতিদান প্রদান করেন এবং নিজের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ করে আরও দান করেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, তাকে অপরিমিত রিযিক দান করেন।' [সুরা নূর: আয়াত ৩৭-৩৮]

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 জাদুঘরে সালাত

📄 জাদুঘরে সালাত


“আরেক বন্ধু তার নিজের ঘটনা আমাকে শুনিয়েছে। বলেছে, "আমি সুইডেনে ছিলাম। দু'জন প্রবাসী বন্ধুকে সাথে নিয়ে সেখানকার এক জাদুঘরে গেলাম। প্রাচীন বইপুস্তক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের জাদুঘর। টিকেট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলাম। কিছু সময় ঘুরেফিরে দেখলাম। আসরের সময় হলে আমার এক সঙ্গী বলল, 'জনাব! চলুন, বাইরে গিয়ে সালাত পড়ে আসি।' অবাক হলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, 'এখানে সালাত পড়ব না কেন?' সে বলল, 'হাহ! ওদের সামনে সালাত পড়ব? না, না, তা হয় না। এটা খুবই কঠিন।' বললাম, 'কঠিন কেন?' সে বলল, 'আরে জনাব! সুইডিশদের সামনে সালাত পড়ব?!' আমি বললাম, 'হ্যাঁ, সুইডিশদের সামনে সালাত পড়ব। তাদের সামনে সালাত পড়ব না কেন? আমাদের সামনেই রাস্তাঘাটে তারা যা ইচ্ছে তা-ই করে বেড়ায়। সেটা কি তুমি দেখ না? আমাদের সামনেই সতর খুলে ফেলে। এতটুকু লজ্জাও তাদের হয় না। বেহায়াপনা করে বেড়ায়, আর এটাকেই তারা স্বাধীনতা বলে মনে করে। আর তাদের এ ধরনের স্বাধীনতার দিকে আমরা সবিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি। তা হলে তাদের সামনে সালাত পড়ে আমরা এটাকে স্বাধীনতা ভাবব না কেন'?”

“মনের বিরুদ্ধে হলেও বন্ধুটি আমার কথায় রাজি হল। জাদুঘরের একপাশে চলে গেলাম আমরা। ক্বিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়ালাম। কানে আঙ্গুল রাখলাম। চিৎকার করে উঠল আমার সঙ্গী, 'আরে, করছ কী!' বললাম, 'আযান দিচ্ছি।' খুবই অস্থির হয়ে উঠল সে। বলল, 'এখানে আযান দিচ্ছ!?' বললাম, 'হ্যাঁ, স্বাধীনতা আছে না? এরা কি রাস্তাঘাটে গানবাজনা করে না? আর এটাকেই কি তারা স্বাধীনতা বলে না? তুমিও তো এটাকে স্বাধীনতা বল'।”

“এরপর আমি আযান দিলাম, নিচু স্বরে ইকামত বললাম এবং সালাত আদায় করলাম। এরপর জাদুঘর দেখা শেষ করলাম। লোকজন আমাদের দেখল। তারা দেখল, আমরা জামাআতের সাথে সালাত পড়ছি, তাকবির বলছি, তসবিহ পড়ছি, রুকু-সেজদা করছি। কিন্তু কোনো পুলিশ আমাদের ধরতে আসেনি, কোনো জরিমানাও করেনি, বা ধরে নিয়ে জেলেও পুরেনি। আসমানও মাটিতে পড়ে যায়নি। তা হলে লোকদের সামনে সালাত পড়তে লজ্জা কিসের? পার্কে বা পাবলিক প্লেসে সালাত পড়তে অসুবিধা কী?”

কোনো কোনো মুসলমান তো সফর বা রোগ কিংবা অন্য কোনো কারণ ছাড়াই, শুধু লোকদের সামনে সালাত পড়তে লজ্জা বোধ করার কারণে দু' সালাত এক করে ফেলে।

সালাত ইসলামের একটি রুকন, একটি মৌলিক বিষয়। প্রত্যেক রাসুলের শরিয়তেই এই সালাতের হুকুম ছিল।

আল্লাহ-এর নিকট এর মর্যাদা অনেক বেশি। তাই মে'রাজের রাতে আল্লাহ তার নবী-এর ওপর এই সালাত ফরজ করেন। পবিত্র কুরআনের ৫৮ জায়গায় সালাতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সালাতের আহকাম শেখার আগে পবিত্রতার আহকাম শিখতে হবে।

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 মুমিনের জান্নাত তার মেহরাবে

📄 মুমিনের জান্নাত তার মেহরাবে


এক ব্যক্তি হাসপাতালে গেল। দেখতে পেল, এক রুগ্ন ব্যক্তি বিছানায় পড়ে আছে। পুরো দেহ অসাড়। শুধু মাথাটা নাড়াচাড়া করতে পারছে। তার অবস্থা দেখে ওই ব্যক্তির মনে মমতা জেগে উঠল। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, 'আপনার মনে কি কোনো আকাঙ্ক্ষা আছে? থাকলে বলুন, পূরণ করতে চেষ্টা করব।' রোগী বলল, 'আমার বয়স চল্লিশের মত। পাঁচ সন্তানের পিতা আমি। সাত বছর ধরে এ বিছানায় শুয়ে আছি। বিশ্বাস করুন! আমি চলাফেরা করতেও চাই না; সন্তানদের দেখার আকাঙ্ক্ষাও আমার নেই। অন্যসব মানুষের মত ভোগবিলাসের জীবনও চাই না। শুধু একটি তামান্না আমার যদি আল্লাহ-র সামনে মাটিতে কপালটা রেখে সেজদা করতে পারতাম! প্রভুর সামনে নিজের লাঞ্ছনা প্রকাশ করতে পারতাম! মানুষের মত আমিও যদি সেজদা করতে পারতাম!'

প্রিয় ভাই! তুমি এখন সুস্থ। রোগবালাই থেকে মুক্ত। আল্লাহ-র নির্দেশ মুতাবিক তুমি কি তোমার সালাত কায়েম করেছ?

📘 শুধু তাঁরই ইবাদাত 📄 আল্লাহই রক্ষাকারী

📄 আল্লাহই রক্ষাকারী


ইমাম বুখারি-র বর্ণনা। ইবরাহিম সফর করছিলেন। সাথে ছিলেন তার স্ত্রী সারা। তারা দুজন একটি শহরে প্রবেশ করলেন। সেখানকার বাদশাহ ছিল এক স্বেচ্ছাচারী শাসক।

তার এক অনুচর এসে তাকে জানাল, এখানে এক ব্যক্তি এসেছে। তার সাথে এক নারী আছে, খুবই সুন্দরী। ওকে শুধু আপনার সাথেই মানায়।

ইবরাহিম-র নিকট ওই অত্যাচারী শাসক তার বাহিনী পাঠাল। তারা তাকে জিজ্ঞাসা করল, 'তোমার সাথে যে নারী আছে, সে কে?' ইবরাহিম বুঝতে পারলেন, এই অত্যাচারীর মুকাবেলা করার শক্তি তার নেই। তিনি যদি বলেন, 'এ হল আমার স্ত্রী' তা হলে তারা তাকে মেরে ফেলবে। তাই তিনি তাদের বললেন, 'এ হল আমার বোন।'

এরপর তিনি স্ত্রী সারার নিকট এলেন; বললেন, 'সারা! দুনিয়ার বুকে তুমি আর আমি ছাড়া মুমিন বলতে কেউ নেই। এই ব্যক্তি তোমার সম্বন্ধে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে। তাকে বলেছি, তুমি আমার বোন। তাই তুমি আমাকে মিথ্যাবাদী বানিয়ো না।'

অত্যাচারী শাসক সারার নিকট লোক পাঠাল। তাকে তার নিকট উপস্থিত করা হল। সে তার কক্ষে এল। তার নিকট এগোল। এরপর যখন তার দিকে হাত বাড়াল, তার হাত অবশ হয়ে গেল। এতে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। বলল, 'তুমি আল্লাহর নিকট দোয়া করো, তিনি যেন আমাকে সুস্থ করে দেন। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।'

সারা তার জন্য দোয়া করলেন। তার হাতে আবার অনুভূতি ফিরে এল। শয়তান তাকে প্ররোচনা দিল। সে আবার তার দিকে অগ্রসর হল। তিনি তার জন্য বদদোয়া করলেন। এতে তার হাত আবার আগের মত, বরং আগের চেয়েও বেশি অসাড় হয়ে গেল। সে যখন বুঝতে পারল, এই নারীর ওপর তার শক্তি চলবে না, সে ভীত হয়ে পড়ল; বলল, 'তুমি আমার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করো। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।'

সারা তার জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ তাঁর হাত সুস্থ করে দিলেন। হাতে আবার অনুভূতি ফিরে এল।

সে তার এক দারোয়ানকে ডেকে পাঠাল। তাকে বলল, 'তোমরা আমার নিকট কোনো মানুষ আনোনি, এনেছ এক শয়তান।' এরপর তাকে তার প্রাসাদ থেকে বের করে দিল। তাকে একটি দাসীও দিল। তার নাম হাজেরা।

সেখান থেকে বেরিয়ে সারা তার স্বামীর নিকট গেলেন। ভিতরে গিয়ে দেখতে পেলেন, তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে আছেন। আল্লাহ-র নিকট দোয়া করছেন, কান্নাকাটি করছেন।

সারা ফিরে এসেছেন বুঝতে পেরে তিনি হাত দিয়ে ইশারা করলেন, তার সংবাদ জিজ্ঞাসা করলেন।

তিনি বললেন, 'আল্লাহ ওই বদমাশের চক্রান্তে তাকেই ফাঁসিয়ে দিয়েছেন।'

দেখো! বিপদের সময় ইবরাহিম কীভাবে তার প্রভুর দরবারে লুটিয়ে পড়লেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px