📄 সংশয় সৃষ্টি করা
সন্দেহপ্রবণতা সৃষ্টি করা শয়তানের অনুপ্রবেশের ঝুকিপূর্ণ একটি পথ। সংশয়ের দরজা দিয়ে সে মানুষের কাছে প্রবেশ করে। কিন্তু শয়তান কী করে সংশয় সৃষ্টি করে? বোঝা প্রয়োজন।
উদাহরণস্বরূপ একজন সৎ লোক আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলে, শয়তান তার কাছে এসে সংশয় সৃষ্টি করে বলবে, আত্মশুদ্ধির যে পথ তুমি অবলম্বন করছ, এটা কি সঠিক? বিশেষত এই লোকটি যখন কিছু মন্দ লোকের সাথে সাক্ষাৎ করবে, শয়তান তখন তাকে বলবে, এরা সবাই জাহান্নামে যাবে আর তুমি একা জান্নাতে যাবে?
সঠিক কথা হলো সংখ্যার আধিক্য বা স্বল্পতা কখনো সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না। সত্য তা-ই, যা আল্লাহর কালাম ও রাসূলের কথার সাথে মিলে যাবে।
তেমনি জামাতের সাথে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু কোন জামাত হক, এটার মাপকাঠি জনবলের আধিক্য নয়, বরং হক জামাত সেটাই যেটা সত্যের অনুগামী। আপনি যদি একা ও হন, তবু সেটাই জামাত। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ “তুমি যতই চাও, অধিকাংশ মানুষ মুমিন হবে না।”[১১]
নুআইম ইবনে হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “জামাত তারা, যারা আল্লাহর আদেশ মোতাবেক চলবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যদি বিপথে যায়, তবুও তুমি সত্যকে আঁকড়ে ধরবে। যদি তুমি একা হও, তবু তুমিই (হক) জামাত বলে গণ্য হবে।”
শয়তানের আরেকটি অনুপ্রবেশের পথ হলো নিয়্যতে সংশয় সৃষ্টি করা। সে মানুষকে বলে—তুমি তো লোক দেখাচ্ছ, তোমার মাঝে রিয়া আছে, তুমি মুনাফিক, তুমি তো এটা মানুষের জন্য করছ... শয়তান এসব সংশয় সৃষ্টি করে যেন মানুষ আমল ছেড়ে দেয়। এ ধরনের আরেকটি উদাহরণ হলো—এক ব্যক্তি সদকা করতে চাইল। তখন সে দেখল যে, আরেক ব্যক্তি তাকে দেখছে। ফলে সে চিন্তা করল—অমুক তো ভাববে, আমি তাকে দেখাচ্ছি; তাই আমার আর দান না করাই ভালো হবে।
আমরা আমাদের নিয়্যত নিয়মিত নবায়ন করব—এটাই আমাদের প্রতি নির্দেশ। উদ্দেশ্য হলো নিয়্যত যেন এক আল্লাহরই জন্য হয় এবং আল্লাহরই জন্য থাকে। বিশিষ্ট তাবিঈ ইবরাহীম আদহাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি ত্রিশজন সাহাবিকে দেখেছি, তাঁরা সবাই নিজেদের ব্যাপারে এই ভয় করতেন যে, তারা ইখলাস ছাড়াই (হয়তো) আমল করছেন।"
নিজেদের নিয়্যতের খোঁজ-খবর নিতে বলা হয়েছে। খোঁজ-খবর নেওয়া মানে তো আমল ছেড়ে দেওয়া নয়; খোঁজ-খবর সেটাই যেটা আপনাকে আমলে আরো উদ্বুদ্ধ করবে এবং আপনার আমল আরো বাড়িয়ে দেবে।
হারিস বিন কায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তুমি সালাত পড়ছ, এমন সময় শয়তান এসে যদি তোমাকে বলে, তুমি তো মানুষ দেখাচ্ছ! তখন তুমি সালাতকে আরো দীর্ঘ করবে।"
টিকাঃ
[১১] সূরা ইউসুফ: ১০৩
📄 শয়তানের দোসরদের পক্ষ থেকে ভীতিপ্রদর্শন
শয়তান মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করার লক্ষ্যে দুটো পন্থা অবলম্বন করে :
১. শয়তান তার দোসরদের ভয় দেখায়
২. শয়তান দরিদ্রতার ভয় দেখায়
শয়তানের দোসরদের ভীতি: মানুষকে শয়তান তার পাপাচারী ও পাপিষ্ঠ সৈন্য ও দোসরদের ভয় দেখায়। সে বলে, তাদের থেকে সতর্ক থেকো, কারণ তাদের অনেক ক্ষমতা। তখন সে (তাদের ভয়ে) আমল ও ইবাদত ছেড়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ “সে-ই শয়তান। সে তোমাদেরকে তার দোসরদের ভয় দেখায়। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় কোরো না, ভয় করো আমাকে, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।”[১২]
দরিদ্রতার ভয় : আল্লাহ তাআলা বলেন, الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ “শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়।”[১৩] সে মানুষকে বলে, তুমি যদি এই চাকরি ছেড়ে দাও, তাহলে আরেকটি চাকরি কোথায় পাবে? তুমি তো একদম ফকির হয়ে যাবে। ফলে এ ব্যক্তি দরিদ্রতাকে ভয় পেয়ে (চাকরি না ছেড়ে) হারাম কাজ করতে থাকে। যেমন এক ব্যক্তি মুসলিম হয়েও মদ বিক্রিকে হালাল মনে করছে![১৪] ওদিকে শয়তান তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ “যে আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার বের হওয়ার পথ করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না।" [১৫]
আমরা সুদগ্রহীতাকেও দেখি, দরিদ্রতার ভয় করছে। সে বলছে, আমি কী করে বেঁচে থাকব? মানুষ ধনী হয়ে যাচ্ছে আর আমি দরিদ্র থেকে যাচ্ছি!
কখনো কখনো শয়তান দাঈদের সামনে বাতিলকে সুসজ্জিতরূপে তুলে ধরে। ফলে সে হারামকে হালাল বলে এই যুক্তিতে যে, দাওয়াতের স্বার্থে মিথ্যা বলা! একইভাবে শয়তান কখনো বাতিলকে এতটা সুন্দর করে তুলে ধরে যে, মনে হয় এটাই হক-এ ব্যাখ্যায় যে, দাওয়াতের স্বার্থে এটা প্রয়োজন!
আমরা অনেক মুসলিম ও দাঈ ভাইদেরকে দেখি-এ তাকে ঠেলছে, সে একে কোণঠাসা করছে; একে অপরের গীবত করছে; একজন আরেকজনের সাথে দুর্ব্যবহার করছে, যতটা-না দুর্ব্যবহার একজন কাফের, ফাসেক কিংবা পাপাচারীর সাথে সে করে থাকে!
টিকাঃ
[১২] সূরা আলে ইমরান: ১৭৫
[১৩] সূরা আল-বাকারাহ: ২৬৮
[১৪] সে মনে করছে, আমি তো আর মদ খাচ্ছি না, মদ বেঁচে হালাল খাবার খাচ্ছি। (সম্পাদক)
[১৫] সূরা আত-তালাক: ২-৩