📄 কামিলিয়াত বা পূর্ণতার সাজে অনুপ্রবেশ
শয়তান এসে মানুষকে এ ধরনের সুখানুভূতি দেয় যে, তুমি তো পরিপূর্ণ বা পারফেক্ট! তুমি তো অমুক থেকে উত্তম। তুমি তো সালাত পড়ো, আরো কত মানুষ আছে সালাতই পড়ে না! তুমি তো সাওম পালন করো, আরো কত মানুষ আছে সাওম পালন করে না। এভাবে শয়তান সৎকর্মে আপনার নিচে যারা আছে, তাদের দেখাবে। এটা শুধু এজন্যই যে, সে আপনার আমলকে স্থবির করে দিতে চায়।
যদি আপনি নিজেকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ না ভাবেন, তখন শয়তান বলবে, তোমার আমল তোমার জন্য সুপারিশ করবে। তারপর শয়তান তাকে (বুঝিয়ে) বৈধ অন্য যে কোনো কাজে লাগিয়ে দেয় আর বলে, একটু জিরিয়ে নাও। তুমি কত ব্যস্ত! তুমি অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ... এভাবেই শয়তান তাকে শিথিল করে ফেলে। সে আর কাজে উদ্যম পায় না।
কাম্য কী ছিল! উল্টোটা। আপনি দেখবেন, অমুক সোম ও বৃহস্পতিবার সাওম করছে, কিন্তু আপনি করছেন না। দেখবেন, অমুক কত নফল ইবাদত করছে, কিন্তু আপনি করছেন না। এটাই কাম্য।
📄 নিজেকে ও নিজের সামর্থ্যকে সঠিক মূল্যায়ন না করা
নিজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শয়তানের দুটি পন্থা আছে,
ক. আত্মপ্রবঞ্চনাবোধ: শয়তান মানুষকে প্ররোচিত করে, যেন সে নিজেকে দেখে মুগ্ধ হয়। শয়তান মানুষকে প্রবঞ্চনা ও অহংকার জোগাতে থাকে। সে বলে, তুমি এটা করো, ওটা করো; তুমি নিজের দিকে তাকাও, তুমি এই করেছ, সেই করেছ। তখন মানুষ বদলাতে থাকে এবং অহংকারী হতে থাকে, ফলে আত্মপ্রবঞ্চনা তাকে পেয়ে বসে আর সে অন্যদের হেয় করতে থাকে; সে সত্যকে উড়িয়ে দেয়, যখন সে কোনো ভুল করে তখন ফিরে না এসে সত্যকে তুড়ি মারে; অন্যের কাছ থেকে শিখতে সে ইলমের মজলিসে বসতে চায় না।
কুরআনের 'পাঠচক্রে' মাঝেমধ্যে দেখা যায়, কিছু মানুষ কুরআনুল কারীম তিলাওয়াতে ভুল করছে। কিন্তু তারা পাঠচক্রে নিয়মিত না হয়ে বরং আসা বন্ধ করে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য—যেন মানুষ জানতে না পারে যে, তারা কুরআন শুদ্ধ করে পড়তে পারে না। ফলে অনেক বয়স্ক হলেও তার আর শেখা হয় না। সে একটু চিন্তা করলেই এটা বুঝতে পারত, যে ব্যক্তি আজ ভালো পড়ছে, কদিন আগে সেও তো তারই মতো ছিল, এরপর সে শিখেছে। যতদিন শেখার ব্যাপারে এই ব্যক্তির মাঝে লজ্জা ও অহংকারবোধ থাকবে, ততদিন...
কবি বলেন, যার যে দোষ আছে তা প্রকাশ পাবে সে যতই ভাবুক, তা গোপন থাকবে। অর্থাৎ সে তার ত্রুটি গোপন রাখার জন্য শিখছে না, কিন্তু শিখতে না এলেও তা প্রকাশ পাবেই। সুতরাং মন্দ দোষগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করার অভ্যাস অর্জনের জন্য সকলের উচিত চেষ্টা অব্যাহত রাখা।
খ. নিজের প্রতি হেয়ভাবাপন্ন হওয়া: কখনো শয়তান আপনাকে এসে বলবে— অবশ্যই তোমাকে বিনয়ী হতে হবে, যে বিনয়ী হয় আল্লাহ তাকে মর্যাদাবান করেন; দ্বীনের এ-সমস্ত মহান দায়িত্ব আঞ্জামের জন্য তুমি তো বেশ নগণ্য! এসব মহান ব্যক্তিগণের কাজ।
এসব কথা বলে শয়তানের আসল উদ্দেশ্য হলো আপনাকে 'দাওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব' থেকে দূরে সরিয়ে রাখা; আর এটা সে করছে বিনয়ের দরজা দিয়ে। তাই সে আপনার মাঝে নিজের প্রতি এমন তাচ্ছিল্যবোধ সৃষ্টি করছে, যেন আপনার যে সামর্থ্য আছে তা থেকেও আপনি উপকৃত হতে না পারেন।
আল্লাহ আমাদের সকলকেই তার সাধ্য ও সামর্থ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। সবার দায়িত্ব নিজ নিজ সাধ্যানুযায়ী সেবা দেওয়া। যে দায়িত্ব পালন করবে না, আল্লাহ তাকে এ সম্পর্কে জবাবদিহি করবেন। নিজের সামর্থ্যকে ছোট করে দেখার নাম বিনয় নয়; এ বরং এটা হলো দায়িত্ব থেকে পালিয়ে আসা এবং कर्तव्य পালন না করে গা ঢাকা দেওয়া।
আপনি যখন দাওয়াতের পথে আসবেন, শয়তান আপনাকে বলবে, দাওয়াতের কাজ তো অনেক সম্মানের; এটি মহান ব্যক্তিদের কর্মবিশেষ; এ ক্ষেত্রটি তুমি তোমার চেয়ে যোগ্য কারো জন্য ছেড়ে দাও। শয়তান কখনো কখনো তার এ ধরনের আরো কিছু চিন্তা হাজির করে। ধরুন—কোনো ব্যক্তি দাওয়াতের কাজে ভুল করল। শয়তান তখন বলে, এ ভুল সবাই করে। (তখন দাঈ আর এ ভুল সংশোধন করে না)। এ ধরনের প্ররোচনাও শয়তানের একটি কাজ এবং তার অনুপ্রবেশের একটি পথ।
কখনো শয়তান তাকে এতটা বিনয়ী ভাবতে প্ররোচিত করে যে, সে নিজের বিবেককে আর কাজে লাগায় না। সে বিবেক দিয়ে এতটুকুও ভাবে না যে :
• আমার পরিচয় কী আর আমার শাইখের পরিচয় কী?
• আমি কী জিনিস আর একজন আলিম কী জিনিস?
ফলে সে নিজেকে অতি তুচ্ছ করে তার শাইখকে অতি মহান করে দেখে। তার শাইখ যা বলে, এর বাইরে সে কিছুই করে না। তার শাইখের চিন্তা ছাড়া সে আর চিন্তাও করতে পারে না। তার কাছে তার শাইখই ঠিক, বাকি সব বেঠিক। নিজেকে তুচ্ছ করে দেখার মাধ্যমেই কোনো মানুষকে মহান ও পুত-পবিত্র করে দেখার সূচনা হয়।
আমাদের মূলনীতি হলো আমরা সর্বদা শরিয়তের কাছে প্রত্যাবর্তন করব এবং (এ ধারণা রাখব যে,) আমাদের সামনে যে মানুষটা আছে, সেও ভুল করতে পারে। এজন্যই সমস্ত মানুষের কথাকে আমরা আল্লাহর কালাম ও তাঁর রাসূলের কথা অনুযায়ী যাচাই করব। যে কথা কুরআন-সুন্নাহর সাথে মিলে যাবে, গ্রহণ করব। আর যা মিলবে না, প্রত্যাখ্যান করব।
📄 সংশয় সৃষ্টি করা
সন্দেহপ্রবণতা সৃষ্টি করা শয়তানের অনুপ্রবেশের ঝুকিপূর্ণ একটি পথ। সংশয়ের দরজা দিয়ে সে মানুষের কাছে প্রবেশ করে। কিন্তু শয়তান কী করে সংশয় সৃষ্টি করে? বোঝা প্রয়োজন।
উদাহরণস্বরূপ একজন সৎ লোক আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলে, শয়তান তার কাছে এসে সংশয় সৃষ্টি করে বলবে, আত্মশুদ্ধির যে পথ তুমি অবলম্বন করছ, এটা কি সঠিক? বিশেষত এই লোকটি যখন কিছু মন্দ লোকের সাথে সাক্ষাৎ করবে, শয়তান তখন তাকে বলবে, এরা সবাই জাহান্নামে যাবে আর তুমি একা জান্নাতে যাবে?
সঠিক কথা হলো সংখ্যার আধিক্য বা স্বল্পতা কখনো সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না। সত্য তা-ই, যা আল্লাহর কালাম ও রাসূলের কথার সাথে মিলে যাবে।
তেমনি জামাতের সাথে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু কোন জামাত হক, এটার মাপকাঠি জনবলের আধিক্য নয়, বরং হক জামাত সেটাই যেটা সত্যের অনুগামী। আপনি যদি একা ও হন, তবু সেটাই জামাত। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ “তুমি যতই চাও, অধিকাংশ মানুষ মুমিন হবে না।”[১১]
নুআইম ইবনে হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “জামাত তারা, যারা আল্লাহর আদেশ মোতাবেক চলবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যদি বিপথে যায়, তবুও তুমি সত্যকে আঁকড়ে ধরবে। যদি তুমি একা হও, তবু তুমিই (হক) জামাত বলে গণ্য হবে।”
শয়তানের আরেকটি অনুপ্রবেশের পথ হলো নিয়্যতে সংশয় সৃষ্টি করা। সে মানুষকে বলে—তুমি তো লোক দেখাচ্ছ, তোমার মাঝে রিয়া আছে, তুমি মুনাফিক, তুমি তো এটা মানুষের জন্য করছ... শয়তান এসব সংশয় সৃষ্টি করে যেন মানুষ আমল ছেড়ে দেয়। এ ধরনের আরেকটি উদাহরণ হলো—এক ব্যক্তি সদকা করতে চাইল। তখন সে দেখল যে, আরেক ব্যক্তি তাকে দেখছে। ফলে সে চিন্তা করল—অমুক তো ভাববে, আমি তাকে দেখাচ্ছি; তাই আমার আর দান না করাই ভালো হবে।
আমরা আমাদের নিয়্যত নিয়মিত নবায়ন করব—এটাই আমাদের প্রতি নির্দেশ। উদ্দেশ্য হলো নিয়্যত যেন এক আল্লাহরই জন্য হয় এবং আল্লাহরই জন্য থাকে। বিশিষ্ট তাবিঈ ইবরাহীম আদহাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি ত্রিশজন সাহাবিকে দেখেছি, তাঁরা সবাই নিজেদের ব্যাপারে এই ভয় করতেন যে, তারা ইখলাস ছাড়াই (হয়তো) আমল করছেন।"
নিজেদের নিয়্যতের খোঁজ-খবর নিতে বলা হয়েছে। খোঁজ-খবর নেওয়া মানে তো আমল ছেড়ে দেওয়া নয়; খোঁজ-খবর সেটাই যেটা আপনাকে আমলে আরো উদ্বুদ্ধ করবে এবং আপনার আমল আরো বাড়িয়ে দেবে।
হারিস বিন কায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তুমি সালাত পড়ছ, এমন সময় শয়তান এসে যদি তোমাকে বলে, তুমি তো মানুষ দেখাচ্ছ! তখন তুমি সালাতকে আরো দীর্ঘ করবে।"
টিকাঃ
[১১] সূরা ইউসুফ: ১০৩
📄 শয়তানের দোসরদের পক্ষ থেকে ভীতিপ্রদর্শন
শয়তান মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করার লক্ষ্যে দুটো পন্থা অবলম্বন করে :
১. শয়তান তার দোসরদের ভয় দেখায়
২. শয়তান দরিদ্রতার ভয় দেখায়
শয়তানের দোসরদের ভীতি: মানুষকে শয়তান তার পাপাচারী ও পাপিষ্ঠ সৈন্য ও দোসরদের ভয় দেখায়। সে বলে, তাদের থেকে সতর্ক থেকো, কারণ তাদের অনেক ক্ষমতা। তখন সে (তাদের ভয়ে) আমল ও ইবাদত ছেড়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ “সে-ই শয়তান। সে তোমাদেরকে তার দোসরদের ভয় দেখায়। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় কোরো না, ভয় করো আমাকে, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।”[১২]
দরিদ্রতার ভয় : আল্লাহ তাআলা বলেন, الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ “শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়।”[১৩] সে মানুষকে বলে, তুমি যদি এই চাকরি ছেড়ে দাও, তাহলে আরেকটি চাকরি কোথায় পাবে? তুমি তো একদম ফকির হয়ে যাবে। ফলে এ ব্যক্তি দরিদ্রতাকে ভয় পেয়ে (চাকরি না ছেড়ে) হারাম কাজ করতে থাকে। যেমন এক ব্যক্তি মুসলিম হয়েও মদ বিক্রিকে হালাল মনে করছে![১৪] ওদিকে শয়তান তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ “যে আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার বের হওয়ার পথ করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না।" [১৫]
আমরা সুদগ্রহীতাকেও দেখি, দরিদ্রতার ভয় করছে। সে বলছে, আমি কী করে বেঁচে থাকব? মানুষ ধনী হয়ে যাচ্ছে আর আমি দরিদ্র থেকে যাচ্ছি!
কখনো কখনো শয়তান দাঈদের সামনে বাতিলকে সুসজ্জিতরূপে তুলে ধরে। ফলে সে হারামকে হালাল বলে এই যুক্তিতে যে, দাওয়াতের স্বার্থে মিথ্যা বলা! একইভাবে শয়তান কখনো বাতিলকে এতটা সুন্দর করে তুলে ধরে যে, মনে হয় এটাই হক-এ ব্যাখ্যায় যে, দাওয়াতের স্বার্থে এটা প্রয়োজন!
আমরা অনেক মুসলিম ও দাঈ ভাইদেরকে দেখি-এ তাকে ঠেলছে, সে একে কোণঠাসা করছে; একে অপরের গীবত করছে; একজন আরেকজনের সাথে দুর্ব্যবহার করছে, যতটা-না দুর্ব্যবহার একজন কাফের, ফাসেক কিংবা পাপাচারীর সাথে সে করে থাকে!
টিকাঃ
[১২] সূরা আলে ইমরান: ১৭৫
[১৩] সূরা আল-বাকারাহ: ২৬৮
[১৪] সে মনে করছে, আমি তো আর মদ খাচ্ছি না, মদ বেঁচে হালাল খাবার খাচ্ছি। (সম্পাদক)
[১৫] সূরা আত-তালাক: ২-৩