📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 ধনীদের ওপর শয়তানের ধোঁকা

📄 ধনীদের ওপর শয়তানের ধোঁকা


ধনীদেরকে শয়তান চারভাবে ধোঁকা দিয়ে থাকে :

১. ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা উপার্জনের ক্ষেত্রে সে কোনোরূপ বাছ-বিচার করে না। অধিকাংশ লেন-দেনে সুদের আশ্রয় নেয়। বৈধ-অবৈধের ব্যাপারটি সে বেমালুম ভুলে যায়। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الَّذِيْنَ يَأْكُلُوْنَ الرِّبٰوا لَا يَقُوْمُوْنَ إِلَّا كَمَا يَقُوْمُ الَّذِيْ يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطٰنُ مِنَ الْمَسِّ.
'যারা সুদ খায় তারা দাঁড়াবে ওই ব্যক্তির ন্যায় যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দেয়।”

হাদিসে আছে,
الرِّبَا ثَلَاثَةٌ وَسَبْعُوْنَ بَابًا، أَيْسَرُهَا مِثْلُ أَنْ يَّنْكِحَ الرَّجُلُ أُمَّهُ، وَإِنَّ أَرْبَى الرِّبَا عِرْضُ الرَّجُلِ الْمُسْلِمِ
‘সুদের গুনাহের ৭৩টি স্তর রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে হালকা হলো নিজ মাতাকে বিবাহ করা। সর্বনিম্ন স্তর হলো কোনো মুসলমানের ইজ্জত সম্ভ্রম হরণ করা।” আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন :
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبٰوا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيْمٍ
'আল্লাহ্ সুদকে মিটিয়ে দেন এবং সদকাকে বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ কোনো অতি কুফরকারী পাপীকে ভালোবাসেন না।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ * فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না করো তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও, আর যদি তোমরা তাওবাহ করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা যুলম করবে না এবং তোমাদের যুলম করা হবে না।”

ইবনে আব্বাস রা. বলেন, এটি শেষ আয়াত যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল। ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'সুদের অর্থ দিয়ে যা- ই বৃদ্ধি করুক না কেন অল্পই কিন্তু তার শেষ পরিণাম।"

২. কৃপণতা। অনেক ধনী লোক আল্লাহর ক্ষমার প্রত্যাশা করে যাকাতও দেয় না। অনেকে যাকাত না দেয়ার বাহানা সন্ধান করে। কৃপণতা তাদের বাড়তে থাকে। কৃপণের ধ্বংস অনিবার্য। তার সম্পদ কোনো কাজে আসবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তায়ালার বাণী-
وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى ، وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى • فَسَنُيَسِرُهُ لِلْعُسْرَى * وَمَا يُغْنِي عَنْهُ مَالُهُ إِذَا تَرَدَّى
“পক্ষান্তরে যে কার্পণ্য করে ও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে। আর সৎ বিষয়কে মিথ্যাজ্ঞান করে, অচিরেই তার জন্য আমি সুগম করে দেবো (জাহান্নামের) কঠোর পরিণামের পথ। যখন সে ধ্বংস হবে, তখন তার সম্পদ তার কোনোই কাজে আসবে না।"

হাদিস শরিফে আছে: হজরত জাবের রা. কর্তৃক বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
اتَّقُوا الظُّلْمَ ؛ فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتُ يَوْمَ القِيَامَةِ . وَاتَّقُوا الشُّحَّ ؛ فَإِنَّ الشُّحَّ أهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، حَمَلَهُمْ عَلَى أَنْ سَفَكُوا دِمَاءهُمْ وَاسْتَحَلُّوا مَحَارِمَهُمْ
'অত্যাচার করা থেকে বাঁচো। কেননা, অত্যাচার কেয়ামতের দিনের অন্ধকার। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাকো। কেননা, কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। (এই কৃপণতাই) তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল, ফলে তারা নিজেদের রক্তপাত ঘটিয়েছিল এবং তাদের ওপর হারামকৃত বস্তুসমূহকে হালাল করে নিয়েছিল।"

যাহ্হাক রহ. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, টাকশাল থেকে প্রথম যে টাকাটি বের হয়, শয়তান সেটি নিয়ে চুমু দেয়। তার নাক ও চোখে মাখতে থাকে। পরে বলে, তোমার মাধ্যমে আমি আদমসন্তানকে অকৃতজ্ঞ বানাব। তোমার মাধ্যমে আমি তাদেরকে কাফের ও পাপিষ্ঠ বানাব। তোমার মাধ্যমে খুশি হয়ে মানুষ আমার পূজা করে থাকে।

আ'মাশ রহ. শাকীক থেকে বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বলেন, শয়তান সকল প্রকার ভালো বস্তু দ্বারা মানুষকে ধোঁকা দেয়। সে কিছুটা অভাবগ্রস্ত হলে শয়তান তার ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সার ওপর শুয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে দান-সদকা দিতে তাকে বাধা দেয়।

৩. অধিক ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সার কারণে নিজেকে সে গরিবদের চেয়ে উত্তম মনে করে। অথচ এটা অজ্ঞতা ও মূর্খতা। কেননা শ্রেষ্ঠত্ব এমন বিষয় দ্বারা অর্জিত হয় যা নিজের জন্য জরুরি। অর্থকড়ি সঞ্চয় ও সংরক্ষণে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। জনৈক আরব কবির ভাষায় :
غنى النفس لمن يعقل * خير من غنى المال وفضل النفس في الأنفس * وليس الفضل في الحال
'বুদ্ধিমানের জন্য ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সায় ধনী হওয়ার চেয়ে নফসের ধনী হওয়া অধিক শ্রেষ্ঠ। কেননা মানুষ তার নিজ সত্তা দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে, বৈষয়িক কারণে নয়।'

৪. ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা ব্যয়ের সময় অপচয় ও অপব্যয় করা। কখনো কখনো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ইমারত তৈরি করে। দেয়াল খুব সুন্দর করে সাজায়। সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ভাস্কর্য নির্মাণ করে। এতে গর্ব ও অহংকারের পথ সুগম হয়। অনেক সময় খাবার-দাবারে অপচয় করে। অথচ এ সব কর্মকাণ্ড হারাম বা মাকরুহ ও নিন্দনীয়। সকল বিষয়ে তার হাশরের মাঠে মহান আল্লাহর দরবারে হিসেব দিতে হবে। দুনিয়ার মহব্বত মানুষকে গুনাহে লিপ্ত থাকতে বাধ্য করে। তারা দুনিয়া লাভ করার উদ্দেশ্যে হালাল-হারাম ন্যায় অন্যায় কোনো কিছুকে তোয়াক্কা করে না। যেখানেই দুনিয়াবি লাভ দেখে সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। আব্দুল্লাহ ইবনে হারেস ইবনে নওফল রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন উবাই ইবনে কা'ব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর সাথে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন,
لَا يَزَالُ النَّاسُ مُخْتَلِفَةً أَعْنَاقُهُمْ فِي طَلَبِ الدُّنْيَا
"মানুষ সব সময় দুনিয়ার অনুসন্ধানে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে।”

হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাকে ইয়ামেনের দিকে পাঠান, তখন তিনি তাকে উপদেশ দিয়ে বলেন,
إِيَّاكَ وَالتَّنَعُمَ فَإِنَّ عِبَادَ اللَّهِ لَيْسُوا بِالمُتَنَعَمِينَ
"তোমরা ভোগ-বিলাস ও অপচয় করা হতে সতর্ক থাকো। কারণ, মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এর বান্দারা কখনোই ভোগ-বিলাস ও অপচয় করেন না।”

দুনিয়া হলো একজন মানুষের জন্য আখিরাতের ক্ষেত ও সেতুবন্ধন স্বরূপ। একজন মানুষের শেষ প্রান্তর ও গন্তব্য হলো, আখিরাতের জীবন ও মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এর সন্তুষ্টি অর্জন। দুনিয়াতে তার যাবতীয় কাজ ও আমল হবে তার আসল গন্তব্য ও শেষ ঠিকানার জন্য। দুনিয়া তার আসল গন্তব্য বা শেষ ঠিকানা নয়। এ কারনেই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন আমাদের দুনিয়ার প্রতি অধিক মনোযোগী হতে বা ঝুঁকে পড়তে নিষেধ করেন এবং দুনিয়ার মোহে পড়ে আমরা যাতে ধোঁকায় না পড়ি এ জন্য তিনি আমাদের সতর্ক করেন। দুনিয়ার প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়াতে নানাবিধ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।

তিরমিযি ও অন্যান্য হাদিসের কিতাবে আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
مَنْ كَانَتِ الْآخِرَةُ هَمَّهُ، جَعَلَ اللهُ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ، وَجَمَعَ لَهُ شَمْلَهُ، وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ راغِمَةٌ، وَمَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ، جَعَلَ اللهُ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ، وَفَرَّقَ عَلَيْهِ شَمَلَهُ، وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا قُدِّرَ لَهُ
“যে ব্যক্তির জীবনে আখিরাত অর্জন করাই তার বড় টার্গেট বা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তার অন্তরকে অভাবমুক্ত করে দেন। তার জন্য আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তার সম্পদকে সহজ করে দেন। আর দুনিয়া তার নিকট অপমান অপদস্থ হয়ে আসতে থাকে। আর যে ব্যক্তির জীবনে দুনিয়া অর্জন করাই তার বড় টার্গেট বা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন দরিদ্রতা ও অভাব তার চোখের সামনে তুলে ধরেন এবং তার ওপর বিশৃঙ্খলা চাপিয়ে দেন। সে যতই চেষ্টা করুক না কেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার ভাগ্যে যতটুকু দুনিয়া লিপিবদ্ধ করেছেন, তার বাইরে সে দুনিয়া হাসিল করতে পারবে না।”

কিছু কিছু ধনী লোক মসজিদ-মাদরাসা ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণে ব্যয় করে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে খ্যাতি ও প্রসিদ্ধি অর্জন করা। যাতে তার নাম প্রচার হয়। খ্যাতি বাড়ে। সেই নির্মাণে তার নাম খোদাই করে রাখে। যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য হতো, তাহলে আল্লাহর দেখা-শোনাই তার জন্য যথেষ্ট ছিল। অনেকে রমযান মাসে মসজিদে মোমবাতি পাঠায়। অথচ সারা বছর মসজিদ ছিল অন্ধকারে। কেননা প্রতিদিন অল্প অল্প করে তেল দিলে খ্যাতি বাড়ে না। তাই সে রমযানকে মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নেয়।

অনেক ধনী ব্যক্তি অন্য লোকদেরকে দান-খয়রাত করে থাকে। নিজের পরিবার ও নিকটাত্মীয়ের দিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। অথচ উত্তম ছিল নিকটজনদেরকে দান-খয়রাত করা। হাদিসে আছে, হজরত সালমান ইবনে আমের রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি:
إِنَّ الصَّدَقَةَ عَلَى المِسْكِينِ صَدَقَةٌ، وَعَلَى ذِي الرَّحِمِ اثْنَتَانِ؛ صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ
'মিসকীনদেরকে দান করলে একটি দানের সাওয়াব পাওয়া যায়, অন্যদিকে নিকটাত্মীয়কে দান করলে দু'টি সাওয়াব পাওয়া যায়। একটি সদকার সাওয়াব, অন্যটি আত্মীয়তা রক্ষার সাওয়াব।”

অনেক ধনী জানে যে, নিকটাত্মীয়কে দান করা অধিক সাওয়াব। কিন্তু পারস্পরিক শত্রুতার কারণে তাদেরকে দান করে না। নিকটাত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও তাদের অভাব-অনটনে সাহায্য-সহযোগিতা করে না। অথচ যদি তাদের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসা যায়, তাহলে তিনটি সাওয়াব প্রাপ্ত হতো। ১. সদকার সাওয়াব, ২. আত্মীয়তা রক্ষার সাওয়াব ও ৩. প্রবৃত্তির অনুসরণ না করার সাওয়াব। হাদিসে আছে, হজরত আবু আইয়ুব আনসারি রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
أَفْضَلُ الصَّدَقَةِ عَلَى ذِي الرَّحِمِ الْكَاشِحِ 'উত্তম সদকা হচ্ছে, যা হিংসা ও শত্রুতা পোষণকারী আত্মীয়দেরকে দান করা হয়。

অনেকে দান-খয়রাত করে কিন্তু নিজের পরিবার-পরিজনদের ওপর খরচের বেলায় কৃপণতা করে। অথচ হাদিসে আছে, হজরত জাবের ইবনে আবদিল্লাহ রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
أَفْضَلُ الصَّدَقَةِ مَا كَانَ عَنْ ظَهْرِ غِنِّى، وَابْدَأُ بِمَنْ تَعُولُ উত্তম সদকা হচ্ছে, যা নিজের সচ্ছলতার পর হোক বা এর পূর্বে তার পরিবারের ওপর খরচ করা হয়।" অন্য হাদিসে আছে, হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন :
تَصَدَّقْ بِهِ عَلَى نَفْسِكَ " قَالَ: عِنْدِي دِينَارُ آخَرُ. قَالَ: " تَصَدَّقُ بِهِ عَلَى زَوْجِكَ " قَالَ: عِنْدِي دِينَارُ آخَرُ. قَالَ: " تَصَدَّقُ بِهِ عَلَى وَلَدِكَ " قَالَ: عِنْدِي دِينَارُ آخَرُ. قَالَ: " تَصَدَّقْ بِهِ عَلَى خَادِمِكَ " قَالَ: عِنْدِي دِينَارُ آخَرُ. قَالَ : " أَنْتَ أَبْصَرُ
'তোমরা সদকা করো। এ কথা শুনে এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার কাছে এক দিনার আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা তোমার নিজের জন্য ব্যয় করো। অতঃপর লোকটি বলল, আমার কাছে আরও একটি দিনার আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা তোমার স্ত্রীর জন্য ব্যয় করো। পরে লোকটি বলল, আমার কাছে আরও একটি দিনার আছে। এবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা তোমার সন্তানের জন্য ব্যয় করো। আবার লোকটি বলল, আমার কাছে আরও একটি দিনার আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা তোমার খাদেমের জন্য ব্যয় করো। শেষে আবার লোকটি বলল, আমার কাছে আরও একটি দিনার আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এবার তোমার ইচ্ছা, তুমি চিন্তা-ভাবনা করে খরচ করো। '

অনেক ধনী ব্যক্তি রিয়া তথা লোক-দেখানোর জন্য হজ করে। এতে তার উদ্দেশ্য থাকে মানুষের প্রশংসা কুড়ানো, খ্যাতি বাড়ানো। অথচ এটা মারাত্মক পাপ। শয়তানের প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়েই অনেক ধনী এমনটি করে থাকেন। শয়তানের প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে অনেক লোক অসিয়ত করার সময় সীমা অতিক্রম করে থাকে। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত ওয়ারিস ও উত্তরাধিকারদেরকে বঞ্চিত করে। তারা মনে করে আমার ধন-সম্পদ আমি যাকে ইচ্ছে দিয়ে যাব। অথচ এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুঁশিয়ারি বাণী উচ্চারণ করে গেছেন। হাদিসে এসেছে, আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
مَنْ خَافَ عِنْدَ الْوَصِيَّةِ قذف في الوباء والوباء
'যে ব্যক্তি অসিয়ত করার সময় খেয়ানত করবে, তাকে জাহান্নামের 'ওয়াবা'তে নিক্ষেপ করা হবে।' ওয়াবা জাহান্নামের একটি গর্তের নাম। আ'মাש রহ. খাইসামা থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَقُولُ: مَا غَلَبَنِي عَلَيْهِ ابْنُ آدَمَ فَلَنْ يَغْلِبَنِي عَلَى ثَلَاثٍ: أَنْ يَأْخُذَ مَالًا مِنْ غَيْرِ حَقَّهِ أَوْ أَنْ يَمْنَعَهُ مِنْ حَقَّهِ أَوْ أَنْ يَضَعَهُ فِي غَيْرِ حَقَّهِ
'শয়তান বলে থাকে, আমি আদমসন্তানকে কিছুতেই বিজয়ী হতে দিই না। বিজয়ী হওয়া পথে এগোতে থাকলে তাকে তিনটি বিষয়ে প্রলোভন দিয়ে থাকি। যথা-১. না-হক ধন-সম্পদ নেয়া, ২. অপাত্রে ধন-সম্পদ ব্যয় করা ও ৩. হকের মধ্যে বেশ-কম করা।'

টিকাঃ
১. সুরা বাকারা: আয়াত ২৭৫
২. মুসতাদরাকে হাকিম
৩. সুরা বাকারা: আয়াত ২৭৬
১. সুরা বাকারা: আয়াত ২৭৮-২৭৯
২. ফাতহুল বারী: ৪/৩১৪
৩. সুনানে ইবনে মাজাহ্: হাদিস নং ২২৭৯
৪. সুরা লাইল: আয়াত ৮-১১
৫. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৫৭৮, মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ১৪০৫২
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৮৯৫
২. মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ৬১৬০০
৩. সুনানে তিরমিযি: হাদিস নং ২৪৬৫
১. সহিহুল জামে': হাদিস নং ৩৮৫৮
২. সহিহুল জামে': হাদিস নং ১১১০
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৪২৭, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১০৩৪
৪. [হাসান] মুসনাদে আহমাদ: ২/২৫১, সুনানে আবি দাউদ: হাদিস নং ১৬৯১
১. হাদিসটির সনদ দু'টি কারণে দুর্বল। প্রথমত আ'মাש আনআনার কারণে 'মুদাল্লিস', দ্বিতীয়ত খাইসামা হচ্ছেন বিশ্বস্ত একজন তাবেয়ী, সুতরাং তা মুরসাল।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 দরিদ্রদের ওপর শয়তানের ধোঁকা

📄 দরিদ্রদের ওপর শয়তানের ধোঁকা


দরিদ্ররাও শয়তানের বহুমুখী চক্রান্ত ও বিচিত্র ধোঁকা থেকে রেহাই পায় না। অনেক ধনী তাই নিজের দরিদ্রতার কথা লোকসম্মুখে বলে বেড়ায়, অথচ সে ধনী। এমতাবস্থায় সে যদি অপ্রয়োজনে কারও কাছে দান-অনুদান চায়, তাহলে সে যেন জাহান্নামের অগ্নিপিণ্ড জমা করছে। হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
مَنْ سَأَلَ النَّاسَ أَمْوَالَهُمْ تَكَثُرًا، فَإِنَّمَا يَسْأَلُ جَمْرًا فَلْيَسْتَقِلَّ أَوْ لِيَسْتَكْثِرُ
'যে ব্যক্তি ধন-সম্পদ বৃদ্ধির জন্য মানুষের নিকট হাত পাতে, সে যেন জাহান্নামের অঙ্গার সন্ধান করছে। চাই তা কম হোক বা বেশি।'

এখন যদি এই লোক মানুষের কাছে কিছু না চায়, কিন্তু তার দরিদ্রতা প্রকাশের কারণে অন্যান্য মানুষ তাকে যাহেদ বা দুনিয়াত্যাগী মনে করে, তাহলে সে রিয়াকার হিসেবে বিবেচিত হবে। আল্লাহর দেয়া নেয়ামতরাজি গোপন করে যদি এ জন্য দরিদ্রতা প্রকাশ করে যে, এর দ্বারা দান-খয়রাত করতে হবে না, তাহলে সে কৃপণতার পাশাপাশি আল্লাহর অকৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে সাব্যস্ত হবে। কেননা ইতোপূর্বে এক হাদিসে আমরা বর্ণনা করে এসেছি, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেঁড়া-ফাড়া পোশাক পরিহিত এক লোককে দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমার কাছে কি ধন-সম্পদ নেই? লোকটি উত্তরে বলেছিল, হ্যাঁ, আছে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, তাহলে আল্লাহর নেয়ামত প্রকাশ থাকা চাই।’

দরিদ্রদের ওপর শয়তানের আরেকটি চক্রান্ত হচ্ছে, তারা নিজেদেরকে ধনীদের চেয়ে উত্তম মনে করে। তারা মনে করে, ধনীরা যেসবের আকাঙ্ক্ষী, এরা তার আকাঙ্ক্ষী নয়। অথচ এই ধারণাটি ভুল। কেননা কোনো বস্তু বা বিষয়ের থাকা না-থাকা মঙ্গল ও সার্থকতার মাপকাঠি নয়।

অনেক সময় শয়তান মানুষকে দরিদ্রতার ভয় দেখায়। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'য়ালা ইরশাদ করেন,
الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ
‘শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং কার্পণ্যের নির্দেশ দেয়।’

শয়তান লোকদেরকে বলে, এ চাকরিটা ছেড়ে দিলে আরেকটা চাকরি কোথায় পাবে? তুমি তো নিতান্ত দরিদ্র হয়ে যাবে। তখন লোকেরা দারিদ্র্যের ভয় করে এবং হারামে লিপ্ত হয়। আমরা সুদ গ্রহীতাকে দারিদ্র-শঙ্কায় শঙ্কিত হতে দেখি। সে বলে, কীভাবে বাঁচব? মানুষ তো সচ্ছল হয়ে গেল। আর আমি আজও নিঃস্ব!

কখনও শয়তান বাতিলকে ইসলামের দায়ীদের সামনে সজ্জিত করে উপস্থাপন করে। তখন সে যুক্তির আশ্রয় নিয়ে হারামকে হালাল করে। ‘দাওয়াতের স্বার্থেই তো মিথ্যা বলা’ এ যুক্তিতে সে দাওয়াতকর্মীকে মিথ্যায় লিপ্ত করে। ‘দাওয়াতের স্বার্থই এ বিষয়ের দাবি করে’–এ ব্যাখ্যা করে শয়তান বাতিলকে এমনভাবে শোভিত করে, যেন মনে হয় সেটাই প্রকৃত হক।

কখনও মুসলিম-সমাজে আমরা এক মুসলিম কর্তৃক অপর মুসলিমকে, এক দাওয়াতকর্মী কর্তৃক অপর দাওয়াতকর্মীকে, এক আলেম কর্তৃক আরেকজন আলেমকে কোণঠাসা করতে দেখি, অবমূল্যায়ন করতে দেখি। একজন অন্যজনকে কোণঠাসা করছে, দোষচর্চা করছে। একজন কাফের, ফাসিক, ফাজিরের সাথে যত-না মন্দ আচরণ করা উচিত, তার চেয়ে অধিক মন্দ আচরণ করে তারা একে অপরের সাথে। এসবই শয়তানের চক্রান্ত।

টিকাঃ
২. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১০৪১
৩. সুনানে আবি দাউদ: হাদিস নং ৪০৬৩
৪. সুরা বাকারাহ: আয়াত ২৬৮

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 নারীদের ওপর শয়তানের ধোঁকা

📄 নারীদের ওপর শয়তানের ধোঁকা


নারীদের ওপর শয়তান অধিক মাত্রায় ধোঁকা দিয়ে থাকে। আমি কেবল নারীদের উদ্দেশ্যে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছি। যাতে তাদের সম্পর্কে সমুদয় বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এখানে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করব। নারীদের ওপর শয়তানের ধোঁকার একটি হচ্ছে, তারা ঋতুস্রাব শেষ হওয়ার পরও দেরি করে আসরের সময় গোসল করে এবং শুধু আসরের নামায থেকে পবিত্রতার হিসাব করে সে ওয়াক্ত থেকে নামায পড়া শুরু করে। তারা জানে না—যোহরের নামাযও তাদের ওপর ফরয ছিল। অনেক ঋতুবতী মহিলা দু'তিন দিন যাবৎ গোসল করেন না এবং কাপড় ধোয়া হয়নি বলে ওজর পেশ করে থাকেন। অনেকে জানাবাত তথা ফরয গোসলে বিলম্ব করেন, শৈথিল্য প্রদর্শন করেন। এছাড়া অনেক মহিলা গোসলখানায় যাবার সময় ভালো করে কাপড় পড়ে যান না। তারা মনে করেন, ঘরে তো আমরা কেবল ক'জন মহিলাই থাকি, পুরো শরীর আবৃত করার কী আছে? ঘরের সবাই তো আমার নিজের লোক।

এ সকল বিষয় হারাম। বিনা কারণে গোসলে বিলম্ব করা জায়েয নেই। এমনইভাবে এক নারী জন্য অন্য নারীর নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অঙ্গ দেখা অবৈধ, সে মা হোক বা মেয়ে। হ্যাঁ, যদি মেয়ে ছোট হয় তবে অসুবিধা নেই। কিন্তু তার বয়স সাত হলে, তখন তার থেকে পর্দা করা উচিত।

অনেক মহিলা আছেন—যারা দাঁড়ানোর সামর্থ্য রাখা সত্ত্বেও বসে নামায আদায় করেন। এমতাবস্থায় নামায বাতিল বলে গণ্য হবে। অনেক নারী নামাযে শৈথিল্য প্রদর্শন করতে গিয়ে বলেন, আজ কাপড়ে বাচ্চা পেশাব করে দিয়েছে। অথচ কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা থাকলে দ্রুত কাপড় পরিবর্তন করেন। নামাযের বেলায়ই এই অবহেলা। কোনো কোনো মা-বোন নামাযের ওয়াজিব তথা আবশ্যিক বিষয়াবলি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে যান, এক্ষেত্রে তারা কারও কাছ থেকে শিখতে চান না। কারও আবার নামাযের সময় কাপড় খুলে যায়, শরীর দেখা যায়। অথচ এতে নামায টূটে যায়। এগুলোকে তারা তেমন আপত্তিজনক মনে করেন না।

অনেক মহিলা গর্ভপাতকে সহজ মনে করেন। তারা এটা ভাবেন না যে, একটি জমাট আত্মাকে নষ্ট করা একজন মুসলমানকে খুন করার সমতুল্য। এতে যে কাফফারা আবশ্যক হয়, সে ব্যাপারেও তারা গ্রাহ্য করেন না।

বিশেষ জ্ঞাতব্য : স্বামীর অকৃতজ্ঞতা একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ হাদিসে আছে, আবু উমামা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
ثَلاثَةٌ لا تُجَاوِزُ صَلَاتُهُمْ آذَانَهُمُ الْعَبْدُ الآبِقُ حَتَّى يَرْجِعَ وَامْرَأَةً بَاتَتْ وَزَوْجُهَا عَلَيْهَا سَاخِطٌ وَإِمَامُ قَوْمٍ وَهُمْ لَهُ كَارَهُونَ
“তিন ব্যক্তির নামায তাদের কানের ওপরে ওঠে না (অর্থাৎ কবুল হয় না) যথা-১. পলাতক ক্রীতদাস, যে নিজের মালিকের নিকট থেকে পলায়ন করেছে। যতক্ষণ সে ফিরে না আসবে তার নামায কবুল হবে না। ২. সেই নারী, যে স্বামীকে রাগান্বিত রেখে রাত কাটায়। ৩. সেই ইমাম, লোকেরা যার ইমামতি পছন্দ করে না।”

মু'আয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
لا تُؤْذِي امْرَأَةً زَوْجَهَا فِي الدُّنْيَا إِلا قَالَتْ زَوْجَتُهُ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ لَا تُؤْذِيهِ قَاتَلَكِ اللَّهُ فَإِنَّمَا هُوَ عِنْدَكَ دَخِيلُ يُوشِكُ أَنْ يُفَارِقَكِ إِلَيْنَا
“কোনো নারী যখন দুনিয়াতে তার স্বামীকে কষ্ট দেয়, তখন জান্নাতে তার হুরেঈন স্ত্রী বলতে থাকেন, আল্লাহ্ তোমাকে ধ্বংস করুন! ওকে কষ্ট দিও না। উনি তো তোমার কাছে কয়েক দিনের মেহমান। অচিরেই তোমাকে ছেড়ে আমাদের কাছে (জান্নাতে) আগমন করবেন।”

উপরোক্ত হাদিসগুলোতে স্বামীকে অসন্তুষ্ট করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এজন্য যে, নেককার স্বামী দুনিয়ার স্ত্রীর কাছে কিছুদিনের জন্য অতিথিস্বরূপ। তার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট।

স্ত্রীর ওপর স্বামীর যে সকল অধিকার রয়েছে, তমধ্যে বিছানার অধিকার অন্যতম। মূলত এটি স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই মিলিত অধিকার। এ জন্য স্বামী যখন যৌন ইচ্ছা পূরণ করতে আগ্রহী হয়, স্ত্রীর জন্য তখন বাধা দেয়া বৈধ নয়। হ্যাঁ, কঠিন ব্যাধিতে নিপতিত হলে সে ব্যাপারটি আলাদা।

অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে এ ব্যাপারে বেশ মতানৈক্য দেখা দেয়। ঝগড়া-বিবাদেরও উপক্রম হয়। স্বামী বেচারা শান্তি ও তৃপ্তির আশায় ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। অন্যত্র চলে যায়। বিছানার অধিকার পাওয়ার আগ পর্যন্ত স্ত্রীকে দূরে রাখে। এমন সময় স্বামী চায়, স্ত্রী তাকে আগের মতো ভালোবাসুক। সে উভয়ের মিলনের প্রত্যাশা করে। এদিকে স্ত্রীও মনে মনে সেটাই চায়। কিন্তু শয়তান এ ক্ষেত্রে বাগড়া বসায়। সে স্ত্রীর মনে ওয়াসওয়াসা দেয়- তোমার স্বামী রাগ করেছে। মান করেছে। তুমি কেন তার ডাকে সাড়া দেবে? তোমারও তো একটি ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য আছে। শয়তানের এই আশকারা পেয়ে স্ত্রী মুখ ফুলিয়ে রাখে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যেতে বাধ্য হয়। সংসারে টানাপোড়েন দেখা দেয়। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত ফেরেশতাদের লা'নত তো আছেই!

একজন নারী স্ত্রী হিসেবে স্বামীর যাবতীয় অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন পূরণ করবে, তার গৃহের দেখাশোনা, সন্তানদের লালন-পালন ও সংসারের পরিপাটিতে নিজেকে ব্যস্ত রাখবে। সেই স্ত্রী স্বামীর হৃদয়-বাগের ফুল হিসেবে তাকে খোশবু দেবে। ভালোবাসার বন্ধনে তাঁকে সঁপে দেবে নিজের দেহ-মন। ফলে ভরে উঠবে তাদের দাম্পত্য জীবন স্বর্গীয় সুখের অমৃত সুধায়। দাম্পত্য জীবনের সুন্দর এই সম্পর্কের কথা মহান স্রষ্টা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করে ইরশাদ করেন,
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
"আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য হতে স্ত্রীগণকে সৃষ্টি করেছেন। যাতে করে তোমরা তাদের নিকটে শান্তি লাভ করো। আর তোমাদের উভয়ের মাঝে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও সহানুভূতি। এতে রয়েছে নিদর্শন সেই লোকদের জন্য যারা চিন্তা করে থাকে।"'

কিন্তু তারপরও কোন নারী যদি নিজের সৌন্দর্যের অহংকারে, বাপ-দাদা ও ধন-সম্পদের অহমিকায় স্বামীর সাথে অসদাচরণ করে, আঙ্গুলের দোলায় তাকে চালাতে চায়, এমনকি স্বামীকে শারীরিক অধিকার থেকে বাধা দেয় ও বঞ্চিত রাখে—এ নারী সৃষ্টিকুলের মধ্যে নিকৃষ্ট ও অভিশপ্ত। যেমনটি হাদিসে সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ
“কোনো ব্যক্তি যদি স্ত্রীকে বিছানায় আহ্বান করে, কিন্তু স্ত্রী তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে, অতঃপর স্বামী রাগান্বিত অবস্থায় রাত কাটায়, তবে প্রভাত হওয়া পর্যন্ত ফেরেশতাগণ সে স্ত্রীকে অভিশাপ দেয়।”

উক্ত হাদিসের সমর্থনে ত্বলক বিন আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِذَا الرَّجُلُ دَعَا زَوْجَتَهُ لِحَاجَتِهِ فَلْتَأْتِهِ وَإِنْ كَانَتْ عَلَى التَّنُّورِ
"স্বামী যদি প্রয়োজন পূরণের (সহবাসের) জন্য স্ত্রীকে আহ্বান করে, তবে সে যেন তাৎক্ষণিক তার ডাকে সাড়া দেয়; যদিও সে চুলার কাছে বসে থাকে না কেন।"

অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْ رَجُلٍ يَدْعُو امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهَا فَتَأْبَى عَلَيْهِ إِلَّا كَانَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ سَاخِطًا عَلَيْهَا حَتَّى يَرْضَى عَنْهَا
"শপথ সেই সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ, কোনো ব্যক্তি যদি স্ত্রীকে বিছানায় (সহবাসের জন্য) আহ্বান করে আর সে তা প্রত্যাখ্যান করে, তবে আকাশের অধিপতি আল্লাহ্ তাআলা ততক্ষণ পর্যন্ত তার ওপর অসন্তুষ্ট থাকবেন যে পর্যন্ত স্বামী তার ওপর সন্তুষ্ট না হয়।”

স্বামী তার প্রয়োজনে স্ত্রীকে ডাকলে স্ত্রী যদি অস্বীকার করে কিংবা অসুস্থ সেজে বসে, আল্লাহ্র কাছে এটা কঠিন অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত হয়। আদর্শ স্ত্রীরা তো ঝগড়া-বিবাদের কথা ভুলে যায়। সে আপন প্রতিপালকের কাছে সাওয়াব ও নেকি অর্জনের উদ্দেশ্যে দ্বিতীয়বার স্বামীর অনুগত ও আদেশ মান্যকারী হয়ে যায়। ইবনে আবি হামযাহ্ রহ. বলেন, এ কথা সহজেই অনুমানযোগ্য যে, বিছানার অধিকার বলতে এখানে সহবাসের কথা বোঝানো হয়েছে। অন্য হাদিসের মাধ্যমেও এর প্রমাণ মিলে।'

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আল্লাহ তাআলা এমন মহিলাদের প্রতি দয়ার দৃষ্টি দেন না, যারা স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞ। অথচ সে স্বামীর মুখোপেক্ষী।”

জানা গেল, আদর্শ স্ত্রী তারা-যারা স্বামীর অবদানকে কৃতজ্ঞচিত্তে দেখে। তার কারণেই সে আপন সম্ভ্রম শালীনতা বজায় রাখতে পেরেছে এবং তার কারণেই সন্তানের মতো নিয়ামতপ্রাপ্ত হয়ে মা হওয়ার সৌভাগ্য নসীব হয়েছে।

হে আমার মুসলিম বোনেরা! এ ব্যাপারে ইবনুল কারইয়াহ্ রহ. বলেন, মুসলিম স্ত্রীরা শালীন, সুন্দর, কোমল ও অনুগত হয়ে থাকেন। তার স্বামী যদি তার কাছে কোনো কিছু আমানত হিসেবে গচ্ছিত রাখে, তাকে আমানতদার হিসেবে পায়। যদি অভাব-অনটনে পতিত হয়, তবে কানা'আত তথা অল্পেতুষ্ট থাকে। বাইরে কোথাও গেলে সে তার রক্ষণাবেক্ষণকারী হয়। স্বীয় স্বামীকে সর্বদা খুশি ও উৎফুল্ল রাখে। তার পার্শ্ববর্তীরা নিরাপদে থাকে। চাকর-বাকরেরা নিরাপদ থাকে। তার সন্তান-সন্ততিরা পরিষ্কার-পরিছন্ন হয়। তার ধৈর্যশক্তি তার অজ্ঞতাকে ঢেকে রাখে। তার ধর্ম তার জ্ঞানে পরিপক্বতা আনে। তখন সে ওই ফুলের ন্যায় হতে পারে, যাকে ছেঁড়া হতে মানুষ দূরে থাকে। সে ওই হীরার মতো হয়, যা দিয়ে কিছু কাটা হয়নি। সে সুসময়ে শোকর আদায় করে। দুঃসময়ে ধৈর্যধারণ করে। আল্লাহ্ তাআলা যাকে এমন স্ত্রী দান করেন, সে জগতের সব কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।

প্রকৃত আদর্শ স্ত্রীরা স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। স্বামীর সব কাজ সে খুশিমনে পালন করে। কখনো বিরক্তিভাব প্রকাশ করে না। আদর্শ স্ত্রীরা স্বামীর বিপদ ও দুর্দশায় পাশে থেকে সাহস জোগায়। কথা-কাজে তার প্রতি অনুগত থেকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলে না।

আনাস বিন মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, “কোন ধরনের রমণী জান্নাতী, আমি কি তোমাদেরকে বলে দেব না? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ হে আল্লাহ্র রাসুল! তিনি বললেন, তোমাদের জান্নাতী রমণীগণ হচ্ছে, স্বামীর প্রতি প্রেম নিবেদনকারিণী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারিণী। তার আনুগত্যের প্রকাশ হচ্ছে, সে রাগন্বিতা হলে বা তার সাথে খারাপ আচরণ করা হলে বা স্বামী তার প্রতি রাগন্বিত হলে, স্বামীর কাছে গিয়ে বলে, এই আমার হাত আপনার হাতে সঁপে দিলাম, আপনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি চোখের পলক ফেলব না। অর্থাৎ আমি কোনো আরাম নেব না কোনো আনন্দ বিনোদন করব না যতক্ষণ আপনি আমার প্রতি খুশি না হন।”

টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিযি: হাদিস নং ৩২৮
২. তিরমিযি: হাদিস নং ১০৯৪; ইবনু মাজাহ্: হাদিস নং ২০০৪
১. সুরা রূম: আয়াত ২১
২. সহিহ বোখারী: হাদিস নং ২৯৯৮; সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৫৯৪
৩. তিরমিযি: হাদিস নং ১০৮০
৪. সহিহ মুসলিম: ২৫৯৫
১. ফাতহুল বারী: ৯/২৯৪
২. সুনানে নাসায়ী: ২৪৯, মুসতাদরাকে হাকিম: ২/১৯০
৩. আলমুহাসিন ওয়াল আযদাদ: ১৪৩
৪. তবরানী, সিলসিলা সহিহা: হাদিস নং ২৮৭

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 উচ্চাশা পোষণে সবার প্রতি শয়তানের ধোঁকা

📄 উচ্চাশা পোষণে সবার প্রতি শয়তানের ধোঁকা


গ্রন্থকার বলেন, অধিকাংশ ইহুদি-খ্রিষ্টান মনে মনে ইসলামের সত্যতা ও অপরিহার্যতা স্বীকার করে। কিন্তু শয়তান সারাক্ষণ তাদের প্ররোচনা দিয়ে বলে, এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিও না। ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নাও। এভাবে শয়তান তাকে দোদুল্যমান রাখে। আর এভাবে কাফের অবস্থাতেই সে মারা যায়। অনুরূপভাবে পাপীদেরকেও শয়তান তার প্ররোচনা দিয়ে টলাতে থাকে। শৈথিল্য প্রদর্শনে ইন্ধন জোগাতে থাকে। পাপের কাজ আরও অধিক পরিমাণে করার জন্য প্রলোভন দিতে থাকে। জনৈক কবি খুব সুন্দর বলেছেন,
'তুমি ইচ্ছেমতো পাপ কাজ দ্রুত করে নাও, আগামী বছর তাওবাহ করার আশা রাখো।' আর এমনই করে সে তাওবাহ ছাড়া ইহজগৎ থেকে পরপারে পাড়ি দেয়। অনেক সময় ফকিহগণ পুনরায় তার দরস দেখে নিতে চান, কিন্তু শয়তান ইন্ধন দিয়ে বলে, আর সামান্য আরাম করে নিন। অনেক ইবাদতকারী রাতে নামায পড়ার জন্য উঠতে চায়, শয়তান তাকে 'আরো অনেক সময় পড়ে আছে' বলে ধোঁকা দিতে থাকে। এভাবে উত্তম কাজে সব শ্রেণির লোককে শয়তান বিভিন্ন টালবাহানায়, অদ্ভুত কূটচাল আর বিচিত্র ফন্দিতে সময় ক্ষেপণ করতে বাধ্য করে। উচ্চাশা পোষণে প্ররোচনা দেয়। সুতরাং বুদ্ধিমানদের উচিত—আমলের কাজ দ্রুত করে নেয়া। সময়ের কাজ যথাসময়ে আদায় করা। আগামীর জন্য কোনো আমল রেখে না দেয়া। উচ্চাশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। কেননা সময়ের নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতে নয়। সে ইচ্ছে করলেই ভবিষ্যতের আশাকৃত কাজ করতে পারে না। এটা নিতান্তই শয়তানের একটি চাল ও ফাঁদ। এ জন্যই হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
صَلَّ صَلَاةَ مُوَدَّعٍ
'যখন তোমরা নামায পড়বে, মনে করবে এটা তোমার শেষ নামায।'

জনৈক বুযুর্গ বলেছেন, আমি তোমার 'অতিসত্বর' শব্দযুক্ত কথার ব্যাপারে ভয় করি। কেননা এটা শয়তানের অন্যতম সৈনিক। দ্রুত কাজ সম্পাদন এবং উচ্চাশা পোষণকারী-উভয়ের উদাহরণ হচ্ছে এমন, দু'জন দীর্ঘ সফরে গাড়িতে উঠল। মাঝপথে বিরতিতে উভয়ে এক স্থানে গাড়িটি কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়ায়। দ্রুত কাজ সম্পাদনকারী গাড়ি থেকে নেমে তার বাকি সফরের পাথেয়গুলো প্রয়োজনমাফিক খরিদ করার কাজে নেমে গেল। আর উচ্চাশা পোষণকারী ভাবল, একটু জিরিয়ে নিই। আরও বহু সময় আছে, পরে পাথেয় খরিদ করে নেব। এমন করে একসময় গাড়িটি ছাড়ার উদ্দেশ্যে হর্ন বাজালে উচ্চাশা পোষণকারীর টনক নড়ে। সে হায় হায় শব্দে আফসোস করতে থাকে। বাকি পথের পাথেয়ের ব্যাপারে হা-হুতাশ করতে থাকে। আর দ্রুত কাজ সম্পাদনকারী নির্বিঘ্নে শঙ্কামুক্ত থেকে গাড়িতে ওঠে বাকি পথের জন্য দুশ্চিন্তামুক্ত থাকে।

تم والحمد لله أولا وآخرا

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00