📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পাপে সম্পৃক্ততার ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা

📄 পাপে সম্পৃক্ততার ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা


অনেক সাধারণ মানুষ মনে করে, আল্লাহ তায়ালা দয়াবান ও অনুগ্রহশীল। তাঁর ক্ষমার হস্ত উদার ও বিশাল। তিনি আমাদেরকে এমনিতেই ক্ষমা করে দেবেন। শয়তানের এই প্ররোচনায় পড়ে অনেক অজ্ঞ লোক নিজের ধ্বংস ডেকে এনেছে।

আবু আমর ইবনে আলা বলেন, ফারাযদাক এক সম্প্রদায়ের পাশে বসা ছিলাম, যারা আল্লাহর যিকির করছিল। তারা আল্লাহর রহমতের বিষয়ে খুবই উদারচিত্তের অধিকারী। মানুষজন তাকে বলল, তুমি ভালো মানুষকে কেন অপবাদ দিচ্ছ? জবাবে সে বলল, আচ্ছা, বলো তো দেখি, তোমার কোনো সন্তান যদি অপরাধ করে, তাহলে কি তাকে তুমি জ্বলন্ত উনুনে নিক্ষেপ করবে? লোকজন বলল, না। সে উত্তর দিল, আল্লাহ তায়ালা আমাকে আমার মাতা-পিতা থেকে অধিক ভালোবাসেন। তিনি কী করে আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে পারেন?

গ্রন্থকার বলেন, এই ধারণা একান্তই অজ্ঞতাজনিত। কেননা আল্লাহ তা'য়ালার দয়া ও অনুগ্রহ অভ্যাসের কোমলতার সাথে সম্পৃক্ত নয়। যদি এমন হতো, তাহলে কোনো পশু-পাখিকে জবাই করা যেত না। অনুরূপভাবে কোনো শিশু মারা যেত না এবং কোনো মানুষ জাহান্নামে যেত না।

আসমায়ী বলেন, আমি আবু নাওয়াসের সাথে মক্কায় অবস্থান করছিলাম। দেখলাম একজন অল্পবয়স্ক বালক হাজরে আসওয়াদে চুমু খাচ্ছে। আবু নাওয়াস আমাকে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি হাজরে আসওয়াদের পাশের অল্পবয়স্ক বালককে চুমু দেয়া ছাড়া এখান থেকে যাব না। আমি বললাম, আল্লাহকে ভয় করুন। এখন তুমি হেরেম এলাকায় অবস্থান করছ, আল্লাহর ঘরের পাশে আছ। সে বলল, আমি অপারগ। এ কথা বলে সে হাজরে আসওয়াদের পাশে গিয়ে বালকের গালে মুখ রেখে চুমু খেল। আমি বললাম, তোমাকে ধিক্কার! আল্লাহর হেরেমের পাশে তুমি এ কাজ করলে! সে বলল, এমন করে বলো না। আমার প্রতিপালক দয়ালু। পরে সে কবিতার দু'টি লাইন আবৃত্তি করল-
وعاشقان التف خداهما * عند استلام الحجر الأسود فاشتفيا من غير أن يأثما * كأنما كانا على موعد
'প্রিয়তম ও প্রিয়তমার চেহারা হাজরে আসওয়াদ চুমু দেয়ার সময় একত্র হয়ে যায়। প্রিয়তমের উদ্দেশ্য অসৎ হলেও এতে পাপ নেই। যেন উভয়েই এ কাজে অঙ্গীকারবদ্ধ।'

গ্রন্থকার বলেন, এই হীন কর্মকাণ্ডের প্রতি লক্ষ করুন। এই হীন কাজের সময়ও সে আল্লাহর অনুগ্রহ প্রত্যাশা করছে। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বৈধতার সীমা রেখা ভেদ করে কঠিন শাস্তির উপযোগিতার কথা সে অকপটে ভুলে গেছে। আবু নাওয়াসের মৃত্যুশয্যায় লোকজন তার কাছে গেলে তাকে তাওবাহ করতে বলে। সে বলল, তোমরা কি আমার ব্যাপারে ভয় করো? আমাকে হাম্মাদ ইবনে সালামাহ বলেছেন, ইয়াযিদ রাক্কাশী হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لِكُل نبي شفاعة، وإنى اختبات شفاعتى لأهل الكبائر من أمتى يوم القيامة 'প্রত্যেক নবীর জন্য একটি সুপারিশের অধিকার থাকবে। আমি আমার উম্মতের জন্য আমার সুপারিশ গোপন রেখেছি।”

এতে আশ্চর্যের কী আছে যে, আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হব!

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, এই লোক দু'টি দিক দিয়ে ভুল করে বসেছে। প্রথমত তাওবাহর বদলে রহমত কামনা করেছে এবং শাস্তির দিকে দৃষ্টি দেয়নি। দ্বিতীয়ত সে এ কথার দিকে লক্ষ রাখেনি যে, রহমত তারাই প্রত্যাশা করতে পারে যারা-তাওবাহ করেছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَإِنِّي لَغَفَّارُ لِمَنْ تَابَ 'যে ব্যক্তি তাওবাহ করবে, আমি তাকে ক্ষমা করব।' অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
وَرَحْمَتِي وَسعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ ‘আর আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে। সুতরাং আমি তা লিখে দেব তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে।"

উপরোক্ত ঘটনা নিতান্তই শয়তানের ধোঁকা। সে এভাবেই সাধারণ মানুষকে ধ্বংস করে থাকে।
***
কতেক সাধারণ মানুষ মনে করে, আলেমগণ আল্লাহর আল্লাহর বিধান পরোয়া করেন না। অমুক এমন করেন, তমুক এমন করেন। আমিই সঠিক পথে আছি। শয়তান তাদেরকে প্ররোচনা দিয়ে বলে, আলেম-মূর্খ সবার জন্য শরিয়ত সমান। আলেমরা যখন শরিয়ত পালনে উদাসীনতা দেখায়, সুতরাং মূর্খরা শরিয়ত পালন করবে কেন? সাধারণ অনক মানুষ মনে করে, আমাদের পাপই-বা কতটুকু! আর আমরা এমন কে? যাকে পাপের কারণে জবাবদিহি করতে হবে! আমাদের পাপে আল্লাহর কোনো ক্ষতি হয় না, তদ্রূপ আমাদের পুণ্যে আল্লাহর কোনো লাভও হয় না। এছাড়া আল্লাহ রাহমানুর রাহীম, দয়াবান ও করুণাময়। তিনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন, আমরা যতবড় পাপ কাজ করি না কেন। অনেকে বলে:
من أنا عند الله حتى إذا " أذنبت لا يغفر لي ذنبي
'তাঁর সামনে আমার কীই-বা হাকিকত ও বাস্তবতা? আমাকে কেন ক্ষমা করা হবে না?'

এমন ধারণা ও চিন্তা-ভাবনা অসার ও অমূলক। চিন্তার স্থূলতা আর বিশ্বাসের বিভ্রান্তির কারণে শয়তান তাদের মনে এমন ভাবনার উদয় করে থাকে। ইবনে আকিল জনৈক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছেন, সে বলত, আমি কে? আল্লাহ আমাকে কেন শাস্তি দেবেন? তাকে বলা হলো, তুমি সেই ব্যক্তি, যখন সমুদয় বিশ্বজগৎ ধ্বংস হয়ে যাবে, একমাত্র অবশিষ্ট থাকবে তুমি। তোমাকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে- يا أيها الناس 'হে মানুষ'।

অনেক সাধারণ মানুষ এ ভাবনায় থাকে যে, আগামীতে তাওবাহ করে ভালো হয়ে যাব। অথচ বহু আশাবাদী লোক আশা নিয়েই থাকে এবং এ অবস্থাতেই তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসে। পাপে দ্রুততা ও পুণ্যে ধীরতা খুবই অশুভ লক্ষণ। এতে করে অনেক সময় তাওবাহ করার সুযোগ হয় না। তাওবাহ করলেও অনেক সময় তা শুদ্ধ হয় না কিংবা তা কবুল হয় না। তাওবাহ কবুল হলেও পাপের কারণে লজ্জিত থাকতে হয়। সুতরাং পাপের চিন্তা মাথা থেকে সরাতে হবে।

টিকাঃ
১. [সহিহ] আলবানি রহ. সংকলিত 'মাজমূয়ায়ে তাবাকাহ': ৮৩০, ৮৩১, ৮৩২
২. সুরা তাওবাহ: আয়াত ৮২
৩. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৫৬

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 বংশের দোহাই দিয়ে মুক্তির প্রত্যাশা

📄 বংশের দোহাই দিয়ে মুক্তির প্রত্যাশা


সাধারণ মানুষের জন্য এটাও একটা শয়তানী ফাঁদ যে, তারা বংশের দোহাই দিয়ে পার পেতে চায়। কেউ বলে, আমি আবু বকরের বংশধর, কেউ বলে, আমি আলীর বংশধর। আরেকজন বলে, আমি অমুক আলেম অমুক যাহেদের উত্তরসূরি। আবার কেউ বলে, আমি অমুক পীরের মুরিদ, অমুক অলি-দরবেশের ভক্ত। তিনি আমার জন্য সুপারিশ করবেন। আমি তাতে পার পেয়ে যাব। কেউ বলে, আমি অমুক বুযুর্গের সুপারিশের অধিক হকদার। আমি অমুক মনীষীর আওলাদ ইত্যাদি।

এ ধারণারও কোনো ভিত্তি নেই। আল্লাহর জন্য ভালোবাসা আর মানুষের জন্য ভালোবাসা এক নয়। আল্লাহর ভালোবাসা আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল। আমরা দেখতে পাই, আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিষ্টানরা তো হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এর বংশধর। আহলে কিতাবদের পূর্বপুরুষতা তাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনেনি। যদি আনত তাহলে নিশ্চয় তারা আল্লাহর নির্দেশমতে চলত। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى
'আর তারা শুধু তাদের জন্যই সুপারিশ করে যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট।'

হজরত নুহ আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্রকে জাহাজে বসাতে চাইলে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ
'হে নুহ! এই ছেলে তোমার পরিবারের কেউ নয়।'

হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এর সুপারিশ তাঁর পিতার ব্যাপারে এবং হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুপারিশ তাঁর মাতার ব্যাপারে গৃহীত হয়নি। হাদিসে আছে, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত ফাতেমা রা.-কে উদ্দেশ্য করে বলেন:
لَا أُغْنِي عَنْكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا
'আল্লাহর কাছে আমি তোমার কোনো কাজে আসব না।'

অনেক লোককে শয়তান প্ররোচনা দিলে তারা মনে করে, আমরা অমুক অলী-বুযুর্গকে ভালোবাসি, তাঁর সাথে সম্পর্ক রাখি। এই ভাবনায় সে পাপের ব্যাপারে বেপরোয়া হয়ে যায়। কেউ আবার বলে, আমি আহলে সুন্নাতের মতানুসারী। তা সত্ত্বেও সে পাপ কাজ থেকে বিরত হয় না। এমন লোকদেরকে বলতে হবে, বিশ্বাসও ফরয আবার গুনাহ থেকে মুক্ত থাকাও ফরয। এখানে একটি আরেকটির পরিপূরক নয়।

টিকাঃ
১. সুরা আম্বিয়া: আয়াত ২৮
২. সুরা হৃদ: আয়াত ৪৬
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২৭৫৩, ৪৭৭১, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২০৪

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 ফরযের ওপর নফলকে প্রাধান্য

📄 ফরযের ওপর নফলকে প্রাধান্য


অধিকাংশ সাধারণ মানুষ নফলের ওপর অধিক ভরসা রাখে এবং ফরযের তোয়াক্কা করে না। যেমন-আযানের পূর্বেই মসজিদে চলে আসে, নফল পড়ে। কিন্তু মুক্তাদী হয়ে ফরয নামায আদায়কালে ইমামের আগে চলে যায়। অনেকে যথাসময়ে ফরযের পাবন্দি করে না, কিন্তু রজবের সাতাশ তারিখের রাতে আগ্রহভরে অংশগ্রহণ করে। অনেকে সেদিন বেশ ইবাদত-বন্দেগি করে এবং কান্নাকাটি করে। অথচ মন্দ ও পাপ কাজে প্রতিযোগিতার সাথে অংশ নিতেও ভোলে না। কেউ তাকে সাবধান করলে বলে, পাপ-পুণ্যের সমন্বয়ে মানুষ, আল্লাহ তো দয়াময় ও ক্ষমাশীল। তিনি ক্ষমা করে দেবেন। অধিকাংশ সাধারণ মানুষ নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী ইবাদত করে। ফলে যতটুকু ভালো করে, তার চেয়ে বেশি বিচ্যুতি ঘটে থাকে। আমি জনৈক সাধারণ ব্যক্তিকে দেখেছি, যে কুরআন হিফজ করেছে এবং দুনিয়াত্যাগী হয়েছে। পরে সে নিজেকে মাজযূব বানিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ পুরুষাঙ্গ কর্তন করে ফেলেছে। অথচ এটা চরম গর্হিত পাপ।

* শয়তানের ধোঁকায় আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষ ওয়াজ ও জিকিরের মাহফিলে শরিক হয়ে বেশ প্রভাবিত হয়ে পড়ে। অনেক কান্নাকাটি করে। তারা মনে করে মাহফিলে শরিক হয়ে অনেক বড় কাজ করে ফেলেছি। তাই সে ওয়ায়েজের মুখ থেকে ফযিলতের কথা শুনতে চায়। যখন সে জানতে পারে যে, মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমল করা, তখন সে বিমুখ হয়ে যায়। শুনে প্রভাবিত হওয়া আর আমলে পরিণত করার পার্থক্য সে আর নির্ণয় করতে পারে না।

আমি এমন অনেক লোককে দেখেছি, যারা বছরের পর বছর ওয়াজ-মাহফিলে অংশগ্রহণ করে এবং প্রভাবিত হয়ে প্রচুর অশ্রু বিসর্জন দেয় বটে, কিন্তু না সুদ নেয়া থেকে বিরত থাকে, না ব্যবসায় ধোঁকাবাজি ছাড়ে। নামাযের রোকন সম্পর্কে সে বছরের পূর্বে যেমন অজ্ঞ ছিল, বছর শেষে এতগুলো ওয়াজ শুনেও তদ্রূপ অজ্ঞ ও উদাসীন থেকে গেছে। মুসলমানের গীবত, পিতা-মাতার অবাধ্যতার ক্ষেত্রে বছরের পূর্বে যেমন অজ্ঞ ছিল, বছর শেষে এতগুলো ওয়াজ শুনেও তদ্রূপ অজ্ঞ ও উদাসীন থেকে গেছে। পরিবর্তন আসেনি। শয়তান তাদেরকে এমন প্ররোচনা দিতে থাকে যে, এসব মাহফিলে অংশগ্রহণ তোমার পাপের কাফফারা ও প্রায়শ্চিত্ত। অনেককে আবার ধোঁকা হিসেবে বলে, নেককার আলেমদের সাহচর্য তোমার পাপ মোচনের কারণ হবে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শয়তান মানুষকে নিজ সত্তার প্রতি বিমুগ্ধদৃষ্টি প্রদানে প্রবৃত্ত করে। তুমি নিজের দিকে তাকিয়ে দেখো, কত কীই-না করেছ। তখন ওই ব্যক্তির (মনস্তাত্ত্বিক) পরিবর্তন ঘটে; ক্রমশ সে অহংকারী হয়, অহমিকা তাকে আচ্ছন্ন করে। অন্যদের সে তখন অবজ্ঞা করে, সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং ভুল করলে সংশোধনে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদের থেকে শিখতে, ইলমের আলোচনায় বসতে অনীহা প্রদর্শন করে। জনসমক্ষে লজ্জিত হবে, এ ভয়ে গোটা জিন্দেগি সে শেখে না।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 ধনীদের ওপর শয়তানের ধোঁকা

📄 ধনীদের ওপর শয়তানের ধোঁকা


ধনীদেরকে শয়তান চারভাবে ধোঁকা দিয়ে থাকে :

১. ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা উপার্জনের ক্ষেত্রে সে কোনোরূপ বাছ-বিচার করে না। অধিকাংশ লেন-দেনে সুদের আশ্রয় নেয়। বৈধ-অবৈধের ব্যাপারটি সে বেমালুম ভুলে যায়। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الَّذِيْنَ يَأْكُلُوْنَ الرِّبٰوا لَا يَقُوْمُوْنَ إِلَّا كَمَا يَقُوْمُ الَّذِيْ يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطٰنُ مِنَ الْمَسِّ.
'যারা সুদ খায় তারা দাঁড়াবে ওই ব্যক্তির ন্যায় যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দেয়।”

হাদিসে আছে,
الرِّبَا ثَلَاثَةٌ وَسَبْعُوْنَ بَابًا، أَيْسَرُهَا مِثْلُ أَنْ يَّنْكِحَ الرَّجُلُ أُمَّهُ، وَإِنَّ أَرْبَى الرِّبَا عِرْضُ الرَّجُلِ الْمُسْلِمِ
‘সুদের গুনাহের ৭৩টি স্তর রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে হালকা হলো নিজ মাতাকে বিবাহ করা। সর্বনিম্ন স্তর হলো কোনো মুসলমানের ইজ্জত সম্ভ্রম হরণ করা।” আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন :
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبٰوا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيْمٍ
'আল্লাহ্ সুদকে মিটিয়ে দেন এবং সদকাকে বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ কোনো অতি কুফরকারী পাপীকে ভালোবাসেন না।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ * فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না করো তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও, আর যদি তোমরা তাওবাহ করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা যুলম করবে না এবং তোমাদের যুলম করা হবে না।”

ইবনে আব্বাস রা. বলেন, এটি শেষ আয়াত যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল। ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'সুদের অর্থ দিয়ে যা- ই বৃদ্ধি করুক না কেন অল্পই কিন্তু তার শেষ পরিণাম।"

২. কৃপণতা। অনেক ধনী লোক আল্লাহর ক্ষমার প্রত্যাশা করে যাকাতও দেয় না। অনেকে যাকাত না দেয়ার বাহানা সন্ধান করে। কৃপণতা তাদের বাড়তে থাকে। কৃপণের ধ্বংস অনিবার্য। তার সম্পদ কোনো কাজে আসবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তায়ালার বাণী-
وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى ، وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى • فَسَنُيَسِرُهُ لِلْعُسْرَى * وَمَا يُغْنِي عَنْهُ مَالُهُ إِذَا تَرَدَّى
“পক্ষান্তরে যে কার্পণ্য করে ও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে। আর সৎ বিষয়কে মিথ্যাজ্ঞান করে, অচিরেই তার জন্য আমি সুগম করে দেবো (জাহান্নামের) কঠোর পরিণামের পথ। যখন সে ধ্বংস হবে, তখন তার সম্পদ তার কোনোই কাজে আসবে না।"

হাদিস শরিফে আছে: হজরত জাবের রা. কর্তৃক বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
اتَّقُوا الظُّلْمَ ؛ فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتُ يَوْمَ القِيَامَةِ . وَاتَّقُوا الشُّحَّ ؛ فَإِنَّ الشُّحَّ أهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، حَمَلَهُمْ عَلَى أَنْ سَفَكُوا دِمَاءهُمْ وَاسْتَحَلُّوا مَحَارِمَهُمْ
'অত্যাচার করা থেকে বাঁচো। কেননা, অত্যাচার কেয়ামতের দিনের অন্ধকার। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাকো। কেননা, কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। (এই কৃপণতাই) তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল, ফলে তারা নিজেদের রক্তপাত ঘটিয়েছিল এবং তাদের ওপর হারামকৃত বস্তুসমূহকে হালাল করে নিয়েছিল।"

যাহ্হাক রহ. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, টাকশাল থেকে প্রথম যে টাকাটি বের হয়, শয়তান সেটি নিয়ে চুমু দেয়। তার নাক ও চোখে মাখতে থাকে। পরে বলে, তোমার মাধ্যমে আমি আদমসন্তানকে অকৃতজ্ঞ বানাব। তোমার মাধ্যমে আমি তাদেরকে কাফের ও পাপিষ্ঠ বানাব। তোমার মাধ্যমে খুশি হয়ে মানুষ আমার পূজা করে থাকে।

আ'মাশ রহ. শাকীক থেকে বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বলেন, শয়তান সকল প্রকার ভালো বস্তু দ্বারা মানুষকে ধোঁকা দেয়। সে কিছুটা অভাবগ্রস্ত হলে শয়তান তার ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সার ওপর শুয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে দান-সদকা দিতে তাকে বাধা দেয়।

৩. অধিক ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সার কারণে নিজেকে সে গরিবদের চেয়ে উত্তম মনে করে। অথচ এটা অজ্ঞতা ও মূর্খতা। কেননা শ্রেষ্ঠত্ব এমন বিষয় দ্বারা অর্জিত হয় যা নিজের জন্য জরুরি। অর্থকড়ি সঞ্চয় ও সংরক্ষণে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। জনৈক আরব কবির ভাষায় :
غنى النفس لمن يعقل * خير من غنى المال وفضل النفس في الأنفس * وليس الفضل في الحال
'বুদ্ধিমানের জন্য ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সায় ধনী হওয়ার চেয়ে নফসের ধনী হওয়া অধিক শ্রেষ্ঠ। কেননা মানুষ তার নিজ সত্তা দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে, বৈষয়িক কারণে নয়।'

৪. ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা ব্যয়ের সময় অপচয় ও অপব্যয় করা। কখনো কখনো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ইমারত তৈরি করে। দেয়াল খুব সুন্দর করে সাজায়। সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ভাস্কর্য নির্মাণ করে। এতে গর্ব ও অহংকারের পথ সুগম হয়। অনেক সময় খাবার-দাবারে অপচয় করে। অথচ এ সব কর্মকাণ্ড হারাম বা মাকরুহ ও নিন্দনীয়। সকল বিষয়ে তার হাশরের মাঠে মহান আল্লাহর দরবারে হিসেব দিতে হবে। দুনিয়ার মহব্বত মানুষকে গুনাহে লিপ্ত থাকতে বাধ্য করে। তারা দুনিয়া লাভ করার উদ্দেশ্যে হালাল-হারাম ন্যায় অন্যায় কোনো কিছুকে তোয়াক্কা করে না। যেখানেই দুনিয়াবি লাভ দেখে সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। আব্দুল্লাহ ইবনে হারেস ইবনে নওফল রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন উবাই ইবনে কা'ব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর সাথে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন,
لَا يَزَالُ النَّاسُ مُخْتَلِفَةً أَعْنَاقُهُمْ فِي طَلَبِ الدُّنْيَا
"মানুষ সব সময় দুনিয়ার অনুসন্ধানে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে।”

হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাকে ইয়ামেনের দিকে পাঠান, তখন তিনি তাকে উপদেশ দিয়ে বলেন,
إِيَّاكَ وَالتَّنَعُمَ فَإِنَّ عِبَادَ اللَّهِ لَيْسُوا بِالمُتَنَعَمِينَ
"তোমরা ভোগ-বিলাস ও অপচয় করা হতে সতর্ক থাকো। কারণ, মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এর বান্দারা কখনোই ভোগ-বিলাস ও অপচয় করেন না।”

দুনিয়া হলো একজন মানুষের জন্য আখিরাতের ক্ষেত ও সেতুবন্ধন স্বরূপ। একজন মানুষের শেষ প্রান্তর ও গন্তব্য হলো, আখিরাতের জীবন ও মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এর সন্তুষ্টি অর্জন। দুনিয়াতে তার যাবতীয় কাজ ও আমল হবে তার আসল গন্তব্য ও শেষ ঠিকানার জন্য। দুনিয়া তার আসল গন্তব্য বা শেষ ঠিকানা নয়। এ কারনেই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন আমাদের দুনিয়ার প্রতি অধিক মনোযোগী হতে বা ঝুঁকে পড়তে নিষেধ করেন এবং দুনিয়ার মোহে পড়ে আমরা যাতে ধোঁকায় না পড়ি এ জন্য তিনি আমাদের সতর্ক করেন। দুনিয়ার প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়াতে নানাবিধ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।

তিরমিযি ও অন্যান্য হাদিসের কিতাবে আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
مَنْ كَانَتِ الْآخِرَةُ هَمَّهُ، جَعَلَ اللهُ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ، وَجَمَعَ لَهُ شَمْلَهُ، وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ راغِمَةٌ، وَمَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ، جَعَلَ اللهُ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ، وَفَرَّقَ عَلَيْهِ شَمَلَهُ، وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا قُدِّرَ لَهُ
“যে ব্যক্তির জীবনে আখিরাত অর্জন করাই তার বড় টার্গেট বা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তার অন্তরকে অভাবমুক্ত করে দেন। তার জন্য আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তার সম্পদকে সহজ করে দেন। আর দুনিয়া তার নিকট অপমান অপদস্থ হয়ে আসতে থাকে। আর যে ব্যক্তির জীবনে দুনিয়া অর্জন করাই তার বড় টার্গেট বা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন দরিদ্রতা ও অভাব তার চোখের সামনে তুলে ধরেন এবং তার ওপর বিশৃঙ্খলা চাপিয়ে দেন। সে যতই চেষ্টা করুক না কেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার ভাগ্যে যতটুকু দুনিয়া লিপিবদ্ধ করেছেন, তার বাইরে সে দুনিয়া হাসিল করতে পারবে না।”

কিছু কিছু ধনী লোক মসজিদ-মাদরাসা ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণে ব্যয় করে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে খ্যাতি ও প্রসিদ্ধি অর্জন করা। যাতে তার নাম প্রচার হয়। খ্যাতি বাড়ে। সেই নির্মাণে তার নাম খোদাই করে রাখে। যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য হতো, তাহলে আল্লাহর দেখা-শোনাই তার জন্য যথেষ্ট ছিল। অনেকে রমযান মাসে মসজিদে মোমবাতি পাঠায়। অথচ সারা বছর মসজিদ ছিল অন্ধকারে। কেননা প্রতিদিন অল্প অল্প করে তেল দিলে খ্যাতি বাড়ে না। তাই সে রমযানকে মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নেয়।

অনেক ধনী ব্যক্তি অন্য লোকদেরকে দান-খয়রাত করে থাকে। নিজের পরিবার ও নিকটাত্মীয়ের দিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। অথচ উত্তম ছিল নিকটজনদেরকে দান-খয়রাত করা। হাদিসে আছে, হজরত সালমান ইবনে আমের রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি:
إِنَّ الصَّدَقَةَ عَلَى المِسْكِينِ صَدَقَةٌ، وَعَلَى ذِي الرَّحِمِ اثْنَتَانِ؛ صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ
'মিসকীনদেরকে দান করলে একটি দানের সাওয়াব পাওয়া যায়, অন্যদিকে নিকটাত্মীয়কে দান করলে দু'টি সাওয়াব পাওয়া যায়। একটি সদকার সাওয়াব, অন্যটি আত্মীয়তা রক্ষার সাওয়াব।”

অনেক ধনী জানে যে, নিকটাত্মীয়কে দান করা অধিক সাওয়াব। কিন্তু পারস্পরিক শত্রুতার কারণে তাদেরকে দান করে না। নিকটাত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও তাদের অভাব-অনটনে সাহায্য-সহযোগিতা করে না। অথচ যদি তাদের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসা যায়, তাহলে তিনটি সাওয়াব প্রাপ্ত হতো। ১. সদকার সাওয়াব, ২. আত্মীয়তা রক্ষার সাওয়াব ও ৩. প্রবৃত্তির অনুসরণ না করার সাওয়াব। হাদিসে আছে, হজরত আবু আইয়ুব আনসারি রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
أَفْضَلُ الصَّدَقَةِ عَلَى ذِي الرَّحِمِ الْكَاشِحِ 'উত্তম সদকা হচ্ছে, যা হিংসা ও শত্রুতা পোষণকারী আত্মীয়দেরকে দান করা হয়。

অনেকে দান-খয়রাত করে কিন্তু নিজের পরিবার-পরিজনদের ওপর খরচের বেলায় কৃপণতা করে। অথচ হাদিসে আছে, হজরত জাবের ইবনে আবদিল্লাহ রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
أَفْضَلُ الصَّدَقَةِ مَا كَانَ عَنْ ظَهْرِ غِنِّى، وَابْدَأُ بِمَنْ تَعُولُ উত্তম সদকা হচ্ছে, যা নিজের সচ্ছলতার পর হোক বা এর পূর্বে তার পরিবারের ওপর খরচ করা হয়।" অন্য হাদিসে আছে, হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন :
تَصَدَّقْ بِهِ عَلَى نَفْسِكَ " قَالَ: عِنْدِي دِينَارُ آخَرُ. قَالَ: " تَصَدَّقُ بِهِ عَلَى زَوْجِكَ " قَالَ: عِنْدِي دِينَارُ آخَرُ. قَالَ: " تَصَدَّقُ بِهِ عَلَى وَلَدِكَ " قَالَ: عِنْدِي دِينَارُ آخَرُ. قَالَ: " تَصَدَّقْ بِهِ عَلَى خَادِمِكَ " قَالَ: عِنْدِي دِينَارُ آخَرُ. قَالَ : " أَنْتَ أَبْصَرُ
'তোমরা সদকা করো। এ কথা শুনে এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার কাছে এক দিনার আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা তোমার নিজের জন্য ব্যয় করো। অতঃপর লোকটি বলল, আমার কাছে আরও একটি দিনার আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা তোমার স্ত্রীর জন্য ব্যয় করো। পরে লোকটি বলল, আমার কাছে আরও একটি দিনার আছে। এবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা তোমার সন্তানের জন্য ব্যয় করো। আবার লোকটি বলল, আমার কাছে আরও একটি দিনার আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা তোমার খাদেমের জন্য ব্যয় করো। শেষে আবার লোকটি বলল, আমার কাছে আরও একটি দিনার আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এবার তোমার ইচ্ছা, তুমি চিন্তা-ভাবনা করে খরচ করো। '

অনেক ধনী ব্যক্তি রিয়া তথা লোক-দেখানোর জন্য হজ করে। এতে তার উদ্দেশ্য থাকে মানুষের প্রশংসা কুড়ানো, খ্যাতি বাড়ানো। অথচ এটা মারাত্মক পাপ। শয়তানের প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়েই অনেক ধনী এমনটি করে থাকেন। শয়তানের প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে অনেক লোক অসিয়ত করার সময় সীমা অতিক্রম করে থাকে। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত ওয়ারিস ও উত্তরাধিকারদেরকে বঞ্চিত করে। তারা মনে করে আমার ধন-সম্পদ আমি যাকে ইচ্ছে দিয়ে যাব। অথচ এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুঁশিয়ারি বাণী উচ্চারণ করে গেছেন। হাদিসে এসেছে, আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
مَنْ خَافَ عِنْدَ الْوَصِيَّةِ قذف في الوباء والوباء
'যে ব্যক্তি অসিয়ত করার সময় খেয়ানত করবে, তাকে জাহান্নামের 'ওয়াবা'তে নিক্ষেপ করা হবে।' ওয়াবা জাহান্নামের একটি গর্তের নাম। আ'মাש রহ. খাইসামা থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَقُولُ: مَا غَلَبَنِي عَلَيْهِ ابْنُ آدَمَ فَلَنْ يَغْلِبَنِي عَلَى ثَلَاثٍ: أَنْ يَأْخُذَ مَالًا مِنْ غَيْرِ حَقَّهِ أَوْ أَنْ يَمْنَعَهُ مِنْ حَقَّهِ أَوْ أَنْ يَضَعَهُ فِي غَيْرِ حَقَّهِ
'শয়তান বলে থাকে, আমি আদমসন্তানকে কিছুতেই বিজয়ী হতে দিই না। বিজয়ী হওয়া পথে এগোতে থাকলে তাকে তিনটি বিষয়ে প্রলোভন দিয়ে থাকি। যথা-১. না-হক ধন-সম্পদ নেয়া, ২. অপাত্রে ধন-সম্পদ ব্যয় করা ও ৩. হকের মধ্যে বেশ-কম করা।'

টিকাঃ
১. সুরা বাকারা: আয়াত ২৭৫
২. মুসতাদরাকে হাকিম
৩. সুরা বাকারা: আয়াত ২৭৬
১. সুরা বাকারা: আয়াত ২৭৮-২৭৯
২. ফাতহুল বারী: ৪/৩১৪
৩. সুনানে ইবনে মাজাহ্: হাদিস নং ২২৭৯
৪. সুরা লাইল: আয়াত ৮-১১
৫. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৫৭৮, মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ১৪০৫২
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৮৯৫
২. মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ৬১৬০০
৩. সুনানে তিরমিযি: হাদিস নং ২৪৬৫
১. সহিহুল জামে': হাদিস নং ৩৮৫৮
২. সহিহুল জামে': হাদিস নং ১১১০
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৪২৭, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১০৩৪
৪. [হাসান] মুসনাদে আহমাদ: ২/২৫১, সুনানে আবি দাউদ: হাদিস নং ১৬৯১
১. হাদিসটির সনদ দু'টি কারণে দুর্বল। প্রথমত আ'মাש আনআনার কারণে 'মুদাল্লিস', দ্বিতীয়ত খাইসামা হচ্ছেন বিশ্বস্ত একজন তাবেয়ী, সুতরাং তা মুরসাল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00