📄 আলেমদেরকে অবজ্ঞার ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা
সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছেন—যারা নিজ বুদ্ধিমতে চলেন। আলেমদের বিরোধিতাকে মোটেই তোয়াক্কা করেন না। আলেমদের ফতোয়া তাদের মনঃপূত না হলে এটাকে খণ্ডাতে আরম্ভ করে দেন। আলেমদের বিভিন্ন দুর্বলতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে আরম্ভ করে। ইবনে আকিল বলতেন, আমি এত বছর বেঁচে আছি, যখনই কারও কোনো কাজে হাত দিই, সে বলে, তুমি আমার কাজে বিঘ্ন ঘটালে। আমি যদি বলি, আমি একজন আলেম। সে জবাব দেয়, আল্লাহ তোমার ইলমে বরকত দিন। এটা তোমার কাজ নয়। তুমি এ কাজ করলে বুঝতে। অথচ তার কাজ একটি স্পর্শযোগ্য কাজ। অন্যদিকে আমি যে কাজে মগ্ন, সেটা জ্ঞান-বুদ্ধির সাথে সম্পৃক্ত কাজ। সুতরাং আমি তাকে ফতোয়া দিলে সে তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয় না।
সাধারণ মানুষকে প্ররোচনা দিয়ে শয়তান ভণ্ড যাহেদ-পীর এবং বৈরাগীদের ব্যাপারে দ্রুত প্রভাবিত করে ফেলে। অনায়াসে এদেরকে তারা বিশ্বাস করে। আলেমদের চেয়ে পীর-দরবেশকে প্রাধান্য দেয়। এই অজ্ঞ সাধারণ মানুষেরা আরও বড় জাহেল ও মূর্খ কোনো ব্যক্তির শরীরে সুফিদের জুব্বা বা আলখেল্লা দেখলে তৎক্ষণাৎ তাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে ফেলে। সে মাথা নুইয়ে বিনয় প্রকাশ করলে তার ওপর ভক্তি ও অগাধ শ্রদ্ধা দেখাতে থাকে। অন্যদের বলতে থাকে—এই দেখো, দরবেশ আর আলেমের পার্থক্য। ইনি দুনিয়াত্যাগী আর আলেম দুনিয়াসন্ধানী। ইনি উত্তম খাবার খান না, বিয়ে-শাদী করেন না। অথচ এই ধারণা ও শ্রদ্ধা অমূলক। মুহাম্মদি শরিয়তে এর কোনো ভিত্তি বা মর্যাদা নেই; বরং এটা তো শরিয়তকে অবজ্ঞা প্রদর্শনের নামান্তর। ফলে সে মূর্খতাকে ইলমের ওপর প্রাধান্য দেয়ার প্রয়াস পেয়েছে। আল্লাহর বহু বড় অনুগ্রহ যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে এদের আবির্ভাব হয়নি। নচেৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিয়ে-শাদী, পাক-পবিত্র পানাহার ও মিষ্টান্নের প্রতি আকৃষ্টের অবস্থা দেখলে তাঁর সম্পর্কে মন্দ ধারণা করত।
অধিকাংশ সাধারণ মানুষ উদাস-বাউল ও বাউন্ডুলে-ভবঘুরে ধরনের পীর-দরবেশদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট। সাধারণ মানুষ তাদের পছন্দ করে, ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। এদের টানে নিজ শহর ছেড়ে চলে যায়। অথচ নিজেকে এমন ব্যক্তির সোপর্দ করা উচিত—যার মারেফত পরীক্ষিত। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
فَإِنْ أَنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ
'সুতরাং যদি তোমরা তাদের মধ্যে বিবেকের পরিপক্বতা দেখতে পাও, তবে তাদের ধন-সম্পদ তাদেরকে দিয়ে দাও।" আল্লাহ তায়ালা হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মানুষের কাছে পাঠিয়ে অনুগ্রহ করেছেন। কাফেররা খুব ভালো করে তাঁকে চিনত। ইরশাদ হচ্ছে,
لَقَدْ مَنَ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ
'আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের ওপর অনুগ্রহ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাদের মধ্য থেকে প্রেরণ করেছেন।" অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে,
يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمُ
‘এসব লোক তাঁকে এমনভাবে চেনে, যেভাবে তারা নিজ সন্তানদেরকে চিনে থাকে।"
টিকাঃ
১. সুরা নিসা: আয়াত ৬
২. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৬৪
৩. সুরা আনয়াম: আয়াত ২০
📄 পাপে সম্পৃক্ততার ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকা
অনেক সাধারণ মানুষ মনে করে, আল্লাহ তায়ালা দয়াবান ও অনুগ্রহশীল। তাঁর ক্ষমার হস্ত উদার ও বিশাল। তিনি আমাদেরকে এমনিতেই ক্ষমা করে দেবেন। শয়তানের এই প্ররোচনায় পড়ে অনেক অজ্ঞ লোক নিজের ধ্বংস ডেকে এনেছে।
আবু আমর ইবনে আলা বলেন, ফারাযদাক এক সম্প্রদায়ের পাশে বসা ছিলাম, যারা আল্লাহর যিকির করছিল। তারা আল্লাহর রহমতের বিষয়ে খুবই উদারচিত্তের অধিকারী। মানুষজন তাকে বলল, তুমি ভালো মানুষকে কেন অপবাদ দিচ্ছ? জবাবে সে বলল, আচ্ছা, বলো তো দেখি, তোমার কোনো সন্তান যদি অপরাধ করে, তাহলে কি তাকে তুমি জ্বলন্ত উনুনে নিক্ষেপ করবে? লোকজন বলল, না। সে উত্তর দিল, আল্লাহ তায়ালা আমাকে আমার মাতা-পিতা থেকে অধিক ভালোবাসেন। তিনি কী করে আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে পারেন?
গ্রন্থকার বলেন, এই ধারণা একান্তই অজ্ঞতাজনিত। কেননা আল্লাহ তা'য়ালার দয়া ও অনুগ্রহ অভ্যাসের কোমলতার সাথে সম্পৃক্ত নয়। যদি এমন হতো, তাহলে কোনো পশু-পাখিকে জবাই করা যেত না। অনুরূপভাবে কোনো শিশু মারা যেত না এবং কোনো মানুষ জাহান্নামে যেত না।
আসমায়ী বলেন, আমি আবু নাওয়াসের সাথে মক্কায় অবস্থান করছিলাম। দেখলাম একজন অল্পবয়স্ক বালক হাজরে আসওয়াদে চুমু খাচ্ছে। আবু নাওয়াস আমাকে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি হাজরে আসওয়াদের পাশের অল্পবয়স্ক বালককে চুমু দেয়া ছাড়া এখান থেকে যাব না। আমি বললাম, আল্লাহকে ভয় করুন। এখন তুমি হেরেম এলাকায় অবস্থান করছ, আল্লাহর ঘরের পাশে আছ। সে বলল, আমি অপারগ। এ কথা বলে সে হাজরে আসওয়াদের পাশে গিয়ে বালকের গালে মুখ রেখে চুমু খেল। আমি বললাম, তোমাকে ধিক্কার! আল্লাহর হেরেমের পাশে তুমি এ কাজ করলে! সে বলল, এমন করে বলো না। আমার প্রতিপালক দয়ালু। পরে সে কবিতার দু'টি লাইন আবৃত্তি করল-
وعاشقان التف خداهما * عند استلام الحجر الأسود فاشتفيا من غير أن يأثما * كأنما كانا على موعد
'প্রিয়তম ও প্রিয়তমার চেহারা হাজরে আসওয়াদ চুমু দেয়ার সময় একত্র হয়ে যায়। প্রিয়তমের উদ্দেশ্য অসৎ হলেও এতে পাপ নেই। যেন উভয়েই এ কাজে অঙ্গীকারবদ্ধ।'
গ্রন্থকার বলেন, এই হীন কর্মকাণ্ডের প্রতি লক্ষ করুন। এই হীন কাজের সময়ও সে আল্লাহর অনুগ্রহ প্রত্যাশা করছে। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বৈধতার সীমা রেখা ভেদ করে কঠিন শাস্তির উপযোগিতার কথা সে অকপটে ভুলে গেছে। আবু নাওয়াসের মৃত্যুশয্যায় লোকজন তার কাছে গেলে তাকে তাওবাহ করতে বলে। সে বলল, তোমরা কি আমার ব্যাপারে ভয় করো? আমাকে হাম্মাদ ইবনে সালামাহ বলেছেন, ইয়াযিদ রাক্কাশী হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لِكُل نبي شفاعة، وإنى اختبات شفاعتى لأهل الكبائر من أمتى يوم القيامة 'প্রত্যেক নবীর জন্য একটি সুপারিশের অধিকার থাকবে। আমি আমার উম্মতের জন্য আমার সুপারিশ গোপন রেখেছি।”
এতে আশ্চর্যের কী আছে যে, আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হব!
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, এই লোক দু'টি দিক দিয়ে ভুল করে বসেছে। প্রথমত তাওবাহর বদলে রহমত কামনা করেছে এবং শাস্তির দিকে দৃষ্টি দেয়নি। দ্বিতীয়ত সে এ কথার দিকে লক্ষ রাখেনি যে, রহমত তারাই প্রত্যাশা করতে পারে যারা-তাওবাহ করেছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَإِنِّي لَغَفَّارُ لِمَنْ تَابَ 'যে ব্যক্তি তাওবাহ করবে, আমি তাকে ক্ষমা করব।' অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
وَرَحْمَتِي وَسعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ ‘আর আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে। সুতরাং আমি তা লিখে দেব তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে।"
উপরোক্ত ঘটনা নিতান্তই শয়তানের ধোঁকা। সে এভাবেই সাধারণ মানুষকে ধ্বংস করে থাকে।
***
কতেক সাধারণ মানুষ মনে করে, আলেমগণ আল্লাহর আল্লাহর বিধান পরোয়া করেন না। অমুক এমন করেন, তমুক এমন করেন। আমিই সঠিক পথে আছি। শয়তান তাদেরকে প্ররোচনা দিয়ে বলে, আলেম-মূর্খ সবার জন্য শরিয়ত সমান। আলেমরা যখন শরিয়ত পালনে উদাসীনতা দেখায়, সুতরাং মূর্খরা শরিয়ত পালন করবে কেন? সাধারণ অনক মানুষ মনে করে, আমাদের পাপই-বা কতটুকু! আর আমরা এমন কে? যাকে পাপের কারণে জবাবদিহি করতে হবে! আমাদের পাপে আল্লাহর কোনো ক্ষতি হয় না, তদ্রূপ আমাদের পুণ্যে আল্লাহর কোনো লাভও হয় না। এছাড়া আল্লাহ রাহমানুর রাহীম, দয়াবান ও করুণাময়। তিনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন, আমরা যতবড় পাপ কাজ করি না কেন। অনেকে বলে:
من أنا عند الله حتى إذا " أذنبت لا يغفر لي ذنبي
'তাঁর সামনে আমার কীই-বা হাকিকত ও বাস্তবতা? আমাকে কেন ক্ষমা করা হবে না?'
এমন ধারণা ও চিন্তা-ভাবনা অসার ও অমূলক। চিন্তার স্থূলতা আর বিশ্বাসের বিভ্রান্তির কারণে শয়তান তাদের মনে এমন ভাবনার উদয় করে থাকে। ইবনে আকিল জনৈক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছেন, সে বলত, আমি কে? আল্লাহ আমাকে কেন শাস্তি দেবেন? তাকে বলা হলো, তুমি সেই ব্যক্তি, যখন সমুদয় বিশ্বজগৎ ধ্বংস হয়ে যাবে, একমাত্র অবশিষ্ট থাকবে তুমি। তোমাকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে- يا أيها الناس 'হে মানুষ'।
অনেক সাধারণ মানুষ এ ভাবনায় থাকে যে, আগামীতে তাওবাহ করে ভালো হয়ে যাব। অথচ বহু আশাবাদী লোক আশা নিয়েই থাকে এবং এ অবস্থাতেই তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসে। পাপে দ্রুততা ও পুণ্যে ধীরতা খুবই অশুভ লক্ষণ। এতে করে অনেক সময় তাওবাহ করার সুযোগ হয় না। তাওবাহ করলেও অনেক সময় তা শুদ্ধ হয় না কিংবা তা কবুল হয় না। তাওবাহ কবুল হলেও পাপের কারণে লজ্জিত থাকতে হয়। সুতরাং পাপের চিন্তা মাথা থেকে সরাতে হবে।
টিকাঃ
১. [সহিহ] আলবানি রহ. সংকলিত 'মাজমূয়ায়ে তাবাকাহ': ৮৩০, ৮৩১, ৮৩২
২. সুরা তাওবাহ: আয়াত ৮২
৩. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৫৬
📄 বংশের দোহাই দিয়ে মুক্তির প্রত্যাশা
সাধারণ মানুষের জন্য এটাও একটা শয়তানী ফাঁদ যে, তারা বংশের দোহাই দিয়ে পার পেতে চায়। কেউ বলে, আমি আবু বকরের বংশধর, কেউ বলে, আমি আলীর বংশধর। আরেকজন বলে, আমি অমুক আলেম অমুক যাহেদের উত্তরসূরি। আবার কেউ বলে, আমি অমুক পীরের মুরিদ, অমুক অলি-দরবেশের ভক্ত। তিনি আমার জন্য সুপারিশ করবেন। আমি তাতে পার পেয়ে যাব। কেউ বলে, আমি অমুক বুযুর্গের সুপারিশের অধিক হকদার। আমি অমুক মনীষীর আওলাদ ইত্যাদি।
এ ধারণারও কোনো ভিত্তি নেই। আল্লাহর জন্য ভালোবাসা আর মানুষের জন্য ভালোবাসা এক নয়। আল্লাহর ভালোবাসা আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল। আমরা দেখতে পাই, আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিষ্টানরা তো হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এর বংশধর। আহলে কিতাবদের পূর্বপুরুষতা তাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনেনি। যদি আনত তাহলে নিশ্চয় তারা আল্লাহর নির্দেশমতে চলত। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى
'আর তারা শুধু তাদের জন্যই সুপারিশ করে যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট।'
হজরত নুহ আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্রকে জাহাজে বসাতে চাইলে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ
'হে নুহ! এই ছেলে তোমার পরিবারের কেউ নয়।'
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এর সুপারিশ তাঁর পিতার ব্যাপারে এবং হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুপারিশ তাঁর মাতার ব্যাপারে গৃহীত হয়নি। হাদিসে আছে, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত ফাতেমা রা.-কে উদ্দেশ্য করে বলেন:
لَا أُغْنِي عَنْكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا
'আল্লাহর কাছে আমি তোমার কোনো কাজে আসব না।'
অনেক লোককে শয়তান প্ররোচনা দিলে তারা মনে করে, আমরা অমুক অলী-বুযুর্গকে ভালোবাসি, তাঁর সাথে সম্পর্ক রাখি। এই ভাবনায় সে পাপের ব্যাপারে বেপরোয়া হয়ে যায়। কেউ আবার বলে, আমি আহলে সুন্নাতের মতানুসারী। তা সত্ত্বেও সে পাপ কাজ থেকে বিরত হয় না। এমন লোকদেরকে বলতে হবে, বিশ্বাসও ফরয আবার গুনাহ থেকে মুক্ত থাকাও ফরয। এখানে একটি আরেকটির পরিপূরক নয়।
টিকাঃ
১. সুরা আম্বিয়া: আয়াত ২৮
২. সুরা হৃদ: আয়াত ৪৬
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২৭৫৩, ৪৭৭১, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২০৪
📄 ফরযের ওপর নফলকে প্রাধান্য
অধিকাংশ সাধারণ মানুষ নফলের ওপর অধিক ভরসা রাখে এবং ফরযের তোয়াক্কা করে না। যেমন-আযানের পূর্বেই মসজিদে চলে আসে, নফল পড়ে। কিন্তু মুক্তাদী হয়ে ফরয নামায আদায়কালে ইমামের আগে চলে যায়। অনেকে যথাসময়ে ফরযের পাবন্দি করে না, কিন্তু রজবের সাতাশ তারিখের রাতে আগ্রহভরে অংশগ্রহণ করে। অনেকে সেদিন বেশ ইবাদত-বন্দেগি করে এবং কান্নাকাটি করে। অথচ মন্দ ও পাপ কাজে প্রতিযোগিতার সাথে অংশ নিতেও ভোলে না। কেউ তাকে সাবধান করলে বলে, পাপ-পুণ্যের সমন্বয়ে মানুষ, আল্লাহ তো দয়াময় ও ক্ষমাশীল। তিনি ক্ষমা করে দেবেন। অধিকাংশ সাধারণ মানুষ নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী ইবাদত করে। ফলে যতটুকু ভালো করে, তার চেয়ে বেশি বিচ্যুতি ঘটে থাকে। আমি জনৈক সাধারণ ব্যক্তিকে দেখেছি, যে কুরআন হিফজ করেছে এবং দুনিয়াত্যাগী হয়েছে। পরে সে নিজেকে মাজযূব বানিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ পুরুষাঙ্গ কর্তন করে ফেলেছে। অথচ এটা চরম গর্হিত পাপ।
* শয়তানের ধোঁকায় আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষ ওয়াজ ও জিকিরের মাহফিলে শরিক হয়ে বেশ প্রভাবিত হয়ে পড়ে। অনেক কান্নাকাটি করে। তারা মনে করে মাহফিলে শরিক হয়ে অনেক বড় কাজ করে ফেলেছি। তাই সে ওয়ায়েজের মুখ থেকে ফযিলতের কথা শুনতে চায়। যখন সে জানতে পারে যে, মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমল করা, তখন সে বিমুখ হয়ে যায়। শুনে প্রভাবিত হওয়া আর আমলে পরিণত করার পার্থক্য সে আর নির্ণয় করতে পারে না।
আমি এমন অনেক লোককে দেখেছি, যারা বছরের পর বছর ওয়াজ-মাহফিলে অংশগ্রহণ করে এবং প্রভাবিত হয়ে প্রচুর অশ্রু বিসর্জন দেয় বটে, কিন্তু না সুদ নেয়া থেকে বিরত থাকে, না ব্যবসায় ধোঁকাবাজি ছাড়ে। নামাযের রোকন সম্পর্কে সে বছরের পূর্বে যেমন অজ্ঞ ছিল, বছর শেষে এতগুলো ওয়াজ শুনেও তদ্রূপ অজ্ঞ ও উদাসীন থেকে গেছে। মুসলমানের গীবত, পিতা-মাতার অবাধ্যতার ক্ষেত্রে বছরের পূর্বে যেমন অজ্ঞ ছিল, বছর শেষে এতগুলো ওয়াজ শুনেও তদ্রূপ অজ্ঞ ও উদাসীন থেকে গেছে। পরিবর্তন আসেনি। শয়তান তাদেরকে এমন প্ররোচনা দিতে থাকে যে, এসব মাহফিলে অংশগ্রহণ তোমার পাপের কাফফারা ও প্রায়শ্চিত্ত। অনেককে আবার ধোঁকা হিসেবে বলে, নেককার আলেমদের সাহচর্য তোমার পাপ মোচনের কারণ হবে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শয়তান মানুষকে নিজ সত্তার প্রতি বিমুগ্ধদৃষ্টি প্রদানে প্রবৃত্ত করে। তুমি নিজের দিকে তাকিয়ে দেখো, কত কীই-না করেছ। তখন ওই ব্যক্তির (মনস্তাত্ত্বিক) পরিবর্তন ঘটে; ক্রমশ সে অহংকারী হয়, অহমিকা তাকে আচ্ছন্ন করে। অন্যদের সে তখন অবজ্ঞা করে, সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং ভুল করলে সংশোধনে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদের থেকে শিখতে, ইলমের আলোচনায় বসতে অনীহা প্রদর্শন করে। জনসমক্ষে লজ্জিত হবে, এ ভয়ে গোটা জিন্দেগি সে শেখে না।