📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পবিত্র কুরআনের ব্যাপারে সুফিদের বক্তব্যের বিস্তৃত আলোচনা

📄 পবিত্র কুরআনের ব্যাপারে সুফিদের বক্তব্যের বিস্তৃত আলোচনা


জাফর ইবনে মুহাম্মাদ খুলদী বলেন, আমি আমার শায়খ জুনাইদের দরবারে উপস্থিত হলাম। ইবনে কাইসান তাঁর কাছে নিম্নোক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন:
سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى
'আমি তোমাকে পড়িয়ে দেব অতঃপর তুমি ভুলবে না।" তিনি বললেন, এ আয়াতের ব্যাখ্যা হচ্ছে, এর ওপর আমল করতে তুমি ভুলবে না। জাফর বলেন, জনৈক ব্যক্তি জুনাইদের কাছে নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন-
وَدَرَ سُوا مَا فِيهِ 'তাতে যা লেখা ছিল, তারা তা পড়েছে।'

জুনাইদ বললেন, এ আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তারা আমল করা ছেড়ে দিলে তিনি বললেন, আল্লাহ তোমাদের মুখের মোহর না ভাঙুক।

গ্রন্থকার বলেন, প্রথম আয়াতাংশে জুনাইদের নিজস্ব ব্যাখ্যা 'এর ওপর আমল করতে তুমি ভুলবে না'—কথাটি নিরর্থক। এটা স্পষ্ট ভ্রান্তি। কেননা لاتنسى কোনো সীগা নয়; বরং এটি হচ্ছে জুমলায়ে খবরিয়া। নাহী নয়। এটি فما تنس এর অর্থ বহন করে। এটি যদি নাহী হতো তাহলে জযম থাকত। মোটকথা-তার এই ব্যাখ্যা আলেমদের সর্বসম্মত ঐকমত্যের বিপরীত। অনুরূপভাবে ودرسوا ما فيه এটি درس থেকে উদ্দাত, যা তেলাওয়াতের অর্থ বহন করে। যথা অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে- ربا كنتم تدرسون । এখানে ওই দরস উদ্দেশ্য নয়, যা ধ্বংসের অর্থবোধক।

মুহাম্মাদ ইবনে জারির বলেন, আমি আবুল আব্বাস ইবনে আতা থেকে শুনেছি, তার কাছে জনৈক ব্যক্তি নিম্নের আয়াতের অর্থ জানতে চায়-
فَنَجَّيْنَاكَ مِنَ الْغَمِّ 'আপনাকে আমি চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়েছি।”

আবুল আব্বাস বলেন, তোমার জাতির দুশ্চিন্তা থেকে তোমাকে মুক্তি দিয়েছি। লেখক বলেন, এটা আল্লাহর কালামের ওপর মারাত্মক অপবাদ। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সে বলে থাকে, তিনি আল্লাহর প্রেমে মত্ত হয়ে গেছেন। আল্লাহর ভালোবাসাকে ফিতনা আখ্যা দিয়ে সে বিরাট অন্যায় করেছে। ইবনে আতার কাছ থেকে জনৈক ব্যক্তি-
فَأَمَّا إِنْ كَانَ مِنَ الْمُقَرَّبِينَ * فَرَحٌ وَرَيْحَانٌ وَجَنَّةُ نَعِيمٍ
'অতঃপর সে যদি নৈকট্যপ্রাপ্তদের অন্যতম হয়, তবে তার জন্য থাকবে বিশ্রাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও সুখময় জান্নাত।"

উক্ত আয়াত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জবাবে বলেন, এখানে 'রাওহ্' অর্থ আল্লাহকে দেখা, 'রায়হান' অর্থ তাঁর কথা শোনা। আর 'জান্নাতে নাঈম' ওই স্থান যেখানে আল্লাহ তায়ালাকে কোনো প্রকার পর্দা ব্যতিরেকেই দেখতে পাওয়া যায়। লেখক বলেন, এই মতামত বাস্তবিকপক্ষে তাফসিরের উল্টো।

আবু আবদুর রহমান সালামি কুরআনের তাফসির বিষয়ে সুফিদের বিভিন্ন কথাবার্তা উল্লেখ করে দু'খণ্ডে একত্র করেছেন; যার মধ্যে অধিকাংশই অনর্থক কথাবার্তা, অসার ও অবৈধ। তার নাম রেখেছেন 'হাকায়িকুত্ তাফসির'। সুফিরা তাফসির বিষয়ে এমনও বলে থাকে যে, 'আলহামদু'-কে 'ফাতিহাতুল কিতাব' বলার কারণ হচ্ছে, এগুলো প্রারম্ভিক বিষয়াশয়-যার মাধ্যমে আমরা শুরু করে থাকি। তোমরা এটাকে সম্মান করলে ভালো, অন্যথায় এর পরের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো তোমরা আর অনুধাবনের সুযোগ পাবে না। গ্রন্থকার বলেন, সুরাটিকে এভাবে ইঙ্গিতবাহী করা নিন্দনীয়। কেননা ব্যাখ্যাকারবৃন্দের সর্বসম্মতিক্রমে এটা সর্বপ্রথম অবতীর্ণ সুরা নয়। সুফিদের ধারণা-মানুষ যেই 'আমীন' বলে, তার মানে হচ্ছে আমি ইচ্ছে করে তোমার দিকে আসছি। লেখক বলেন, এটাও নিন্দনীয়। কেননা এক্ষেত্রে 'আম্মীন' হওয়ার দরকার ছিল। অথচ এটা তাশদিদের সাথে উচ্চারিত নয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَإِنْ يَأْتُوكُمْ أُسَارَى
'কাফেররা যদি বন্দি হয়ে তোমার কাছে আসে।

এ আয়াতাংশ সম্পর্কে আবু উসমান সুফি বলেন, 'উসারা' অর্থ পাপে নিমজ্জিত। ওয়াসেতী বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, তারা নিজেদের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষকরণে নিমগ্ন। জুনাইদ বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, জাগতিক বিষয়াদিতে লিপ্ত, আল্লাহ তায়ালা চাইলে তাদেরকে হেদায়াত দিতে পারেন। আমি (গ্রন্থকার) বলছি, আয়াতটি তো অস্বীকারকারীর নিন্দার বর্ণনায় অবতীর্ণ হয়েছে। তার অর্থ হচ্ছে, কাফেররা যদি বন্দি হয়ে তোমার কাছে আসে, তাহলে তাদের থেকে ফিদিয়া নাও। অন্যথায় জিহাদের সময় তাদেরকে হত্যা করো। উপরোক্ত অভিমতের আলোক যদি এ আয়াতের ব্যাখ্যা ধরে নেয়া হয়, তবে তো এদের প্রশংসা করা হচ্ছে বলে অনুমিত হয়।

মুহাম্মাদ ইবনে আলী يُحِبُّ التَّوَّابِينَ 'আল্লাহ তাওবাহকারীদের ভালোবাসেন।' এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, এর মানে হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ভালোবাসেন; যারা নিজেদের তাওবাহর ওপর তাওবাহ করে। আন নূরী সুফি يقبض ويبسط এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, নিজের জন্য অভাব ও সচ্ছলতা দান করেন। অন্যত্র আল্লাহ তায়ালার ইরশাদ مَنْ دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا 'যে হেরেমে প্রবেশ করে সে নিরাপদ।' মুহাম্মাদ ইবনে আলী এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর মানে হচ্ছে, 'প্রবৃত্তির অনুসরণ ও শয়তানের ধোঁকা থেকে সে নিরাপদ।' অথচ অর্থটি চরম গর্হিত। কেননা আয়াতের শব্দ একটি সংবাদ আর এর অর্থ হচ্ছে নির্দেশক। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে, 'যে হেরেম শরিফে প্রবেশ করে, তাকে নিরাপত্তা দাও।' তার দেয়া ব্যাখ্যায় আয়াতের সঠিক মর্ম উদঘাটিত হয় না। কেননা হেরেম শরিফে বহু মানুষ যায় কিন্তু কারো কারো মন শয়তানের ধোঁকা থেকে নিষ্কৃতি পায় না।

আবুল হাসান নুরি সম্পর্কে শুনেছি, মানুষ বলাবলি করত যে, তিনি মুয়াজ্জিনের আযান শুনে কুৎসাপূর্ণ মন্তব্য করে বলতেন, এটা মৃত্যুর বিষ। পক্ষান্তরে কুকুরের চিৎকার শুনে বলতেন لبيك وسعديك। মানুষজন এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, মুয়াজ্জিনের ব্যাপারে আমার ভয় হচ্ছে যে, সে অলসতার সাথে আল্লাহকে স্মরণ করছে। সে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে আযান দিয়ে থাকে। বেতন না পেলে সে আর আযান দেবে না। সুতরাং আমি তার নিন্দা জানাই। অন্যদিকে কুকুর রিয়াবিহীন আল্লাহর জিকির করে থাকে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ
'প্রত্যেক বস্তু আল্লাহর প্রশংসাসূচক তাসবিহ পড়ে।”

গ্রন্থকার বলেন, ভাইয়েরা! আল্লাহ সবাইকে এই ভ্রান্তি থেকে নিরাপদে রাখুন। তার জটিল ফিকাহ ও আশ্চর্য ইজতিহাদের প্রতি চিন্তা করুন। নূরী সম্পর্কে আরেকটি ঘটনা বর্ণিত আছে, তিনি জনৈক ব্যক্তিকে স্বীয় দাড়িতে হাত রাখতে দেখে বললেন, 'আল্লাহর দাড়ি থেকে তোমার হাত সরাও।' এ ঘটনা বাদশার কানে পৌঁছলে বাদশাহ নূরীকে তলব করে তাকে জিজ্ঞেস করেন, কী ব্যাপারে তুমি নাকি কুকুরের চিৎকার শুনে লাব্বাইক বলো আর মুয়াজ্জিনের আযানের সময় কুৎসা ও নিন্দা করো? নূরী বলল, হ্যাঁ। এর কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ 'প্রত্যেক বস্তু আল্লাহর প্রশংসাসূচক তাসবিহ পড়ে।”

আর মুয়াজ্জিন তো আপাদমস্তক একজন পাপিষ্ঠ ব্যক্তি। পরে বাদশাহ তাকে বললেন, তুমি ওই লোকের দাড়ি সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করলে কেন? নূরী জবাবে বলল, এই বান্দা এবং তার দাড়ি, এমন কি তার পুরো স্বত্ত্বা- যা দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে—তার সবই তো আল্লাহ তায়ালার। দেখুন! অজ্ঞতা এই শ্রেণিকে কোথায় নিক্ষেপ করেছে!

টিকাঃ
১. সুরা আ'লা: আয়াত ৬
২. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৬৯
৩. সুরা ত্বহা: আয়াত ৪০
১. সুরা ওয়াকিয়া: আয়াত ৮৮-৮৯
২. সুরা বাকারা: আয়াত ৮৫
৩. সুরা বাকারা: আয়াত ২২২
৪. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৯৭
১. সুরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ৪৪
২. সুরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ৪৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00