📄 জ্ঞানান্বেষণ পরিহারে সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
গ্রন্থকার বলেন, জেনে রাখা উচিত—মানুষের জন্য শয়তানের প্রথম ফাঁদ হচ্ছে তাকে ইলম তথা জ্ঞানার্জন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। কেননা জ্ঞান আলোসদৃশ। শয়তান তার বাতি নেভাতে পারলে অন্ধকারে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই ধোঁকা দিয়ে পথভ্রষ্ট করতে পারবে। সুফিদের ওপর শয়তান এ ব্যাপারে আরও উদ্যমের সাথে এগোতে থাকে। প্রথমে তাদের বড় একটি দলকে সামগ্রিকভাবে ইলম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং তাদেরকে বোঝাতে থাকে যে, ইলম অর্জন করতে গিয়ে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করতে হয়। শয়তান তাদেরকে আরাম ভোগ্য সামগ্রীকে উত্তম হিসেবে দেখাতে থাকে। ফলে তারা ধুতি পরে ছেঁড়া বিছানায় পড়ে থাকে।
ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, অলসতার ওপর তাসাওউফের ভিত্তি। তাঁর অভিমতের ব্যাখ্যা হচ্ছে, নফসের উদ্দেশ্য হয়তো সাধনা অথবা দুনিয়া অর্জন করা। সাধনা বা সম্পদ সঞ্চয় করা ইলম অর্জনের কারণে দেরিতে অর্জিত হয়। এতে শরীর কষ্ট-ক্লেশে পতিত হয়, চাই এতে উদ্দেশ্য সাধিত হোক বা না হোক। সুফিরা সাধনাকে দ্রুত অর্জন করতে চায়। কেননা তারা দুনিয়াবিরাগীর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে থাকে।
কতেক শ্রেণির সুফি আছেন যারা আলেমবিদ্বেষী। তারা মনে করেন ইলম তথা জ্ঞানার্জনে সময় দেয়া অহেতুক ও অনর্থক। তাদের দাবি—আমাদের ইলম কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি অর্জন করা যায়। এরা জ্ঞানান্বেষণকে অসার ও অনর্থক ভেবে নেয়ার কারণে সংক্ষিপ্ত পোশাক, লেংটি আর লোটা নিয়ে বৈরাগী সেজে থাকেন।
দ্বিতীয় শ্রেণির কিছু সুফি আছেন, যারা সামান্য কিছু ইলমের ওপর তুষ্ট থেকে যান। জ্ঞানের বৃহৎ পরিসর থেকে তাঁরা বঞ্চিত হন। হাদিসের শব্দে তুষ্ট হয়ে দ্বিধায় পড়ে যান। তারা মনে করেন, হাদিসের সনদ অন্বেষণ করা এবং হাদিস শেখা ও শেখানোর ক্লাশ কায়েম করা সবই দুনিয়াবি কাজ। এতে নফস তৃপ্তি পায়।
ফাতাওয়া, কাযা ও ইমারত সবই শঙ্কার বিষয়। কিন্তু এতে ফযিলতও অনেক। কাঁটা তো সর্বদা গোলাপের সাথেই থাকে। মানুষের উচিত-উভয় জাহানের উপকারী বিষয় অন্বেষণ করা। এর ভেতর যা কিছু বালা-মসিবত আছে, তা থেকে বিরত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করা। চেষ্টা-সাধনার শক্তি ও গুণ সব মানুষের মধ্যেই আছে। তাদের সেসব ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। যেমন বিয়ের প্রতি অনুরাগ ও টান প্রকৃতিগতভাবে সবাইকে দেয়া হয়েছে। এতে সন্তান হবে। এভাবেই ইলমের মাধ্যমে দুনিয়ার নেজামকে সাজানো হয়েছে। ইয়াযিদ ইবনে হারুন বলতেন, আমি সর্বদা গাইরুল্লাহর জন্য জ্ঞান অন্বেষণ করেছি। কিন্তু সকল প্রকার জ্ঞান আল্লাহর জন্যই রয়ে গেছে। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, ইলমের মাধ্যমে আমি ইখলাসের হেদায়াত পেয়েছি। যে ব্যক্তি এটা কামনা করে যে, নফসের দ্বারা সে তার প্রকৃতিকে বিলীন করে দেবে, তা কখনো সম্ভব নয়।
তৃতীয়ত শয়তান সুফিদের একটি দলকে এমন দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে যে, তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমল। এ সব লোক এ কথা বুঝতে পারছে না যে, ইলমে লিপ্ত হওয়া সম্পূর্ণই আমলের অন্তর্ভুক্ত। আলেম যদি আমলের বেলায় অবহেলাও করে, তারপরও সে সঠিক পথ হতে বিচ্যুত হবে না। আর ইলমবিহীন আবেদ নির্ঘাত ভুল পথে পড়ে যেতে পারেন।
চতুর্থত ইবলিস এই গোষ্ঠীর মনে এ কথা ভালো ভাবেই ঢেলে দিয়েছে যে, ইলম বলা হয় যা বাতেন তথা গোপন বিষয় দ্বারা অর্জিত হয়। ফলে এদের কেউ কেউ حدثني قلبي عن ربي 'আমাকে আমার মন বলেছে আমার রব ইরশাদ করেছেন'-এমন ধারণা লালন করতেও দ্বিধা করছে না। শিবলী এই কবিতা আবৃত্তি করতেন :
اذا طالبوني بعلم الورق * برزت عليهم بعلم الخرق 'মানুষ যখন আমাকে কিতাবি ইলমের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করে, তখন আমি তাকে ডুবে যাওয়া ও কারামাতের ইলম শেখাই।'
এরা শরয়ি ইলমকে যাহেরি ইলম বলে থাকে, নফসের আপৎসঙ্কুল বিষয়াদিকে বাতেনি ইলম আখ্যা দিয়ে থাকে। প্রমাণস্বরূপ এরা বলে, হজরত হাসান ইবনে আলী রা. হজরত আলী রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
علم الباطن سر من سر الله عز وجل وحكم من أحكام الله تعالى يقذفه الله عز وجل في قلوب من يشاء من اوليائه
'বাতেন আল্লাহর গোপন ভেদসমূহের মধ্য হতে একটি রহস্য। আর আল্লাহর বিধানাবলি হতে একটি বিধান। আল্লাহ তায়ালা সেই রহস্য তাঁর ওলিদের মধ্য থেকে যাকে চান তার কাছে উন্মোচিত করে থাকেন।'
গ্রন্থকার বলেন, এ হাদিসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস বা প্রমাণ নেই। এর সনদে অবিশ্বস্ত ও অজ্ঞাত লোক রয়েছে।
আবু মুসা বলেন, একজন ফকিহ আবু ইয়াযিদের প্রতিবেশী ছিলেন। তিনি আবু ইয়াযিদের কাছে গেলে আবু ইয়াযিদ তাকে অনেক আশ্চর্যজনক ঘটনা শোনালেন। তিনি জানতে চাইলেন, এত আশ্চর্য বিষয় তুমি কী করে জানলে? প্রত্যুত্তরে আবু ইয়াযিদ বললেন, তুমি এখনও শোনোনি এমন আরও অনেক আশ্চর্য ঘটনা আমি জানি। আলেম বললেন, হে আবু ইয়াযিদ! এই জ্ঞান আপনি কী করে অর্জন করলেন? তিনি উত্তরে বললেন, আমার ইলম আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত। তুমি কি শোনোনি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'যে ব্যক্তি জানা ইলমের ওপর আমল করবে, আল্লাহ তাকে এমন ইলম দান করবেন, যা সে জানত না।' অন্যত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
العلم علمان علم ظاهر وهو حجة الله تعالى على خلقه وعلم باطن وهو العلم النافع
'ইলম দুই প্রকার। ১. প্রকাশ্য ইলম-যা মাখলুকের জন্য আল্লাহ তায়ালার দলিল। ২. গোপন ইলম-এটি উপকারী ইলম।
হে বুযুর্গ! তোমাদের ইলম তো জবানের সাহায্যে শিক্ষাপ্রাপ্ত। পক্ষান্তরে আমার ইলম আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামের মাধ্যমে প্রাপ্ত। আলেম বললেন, আমার ইলম তো বিশ্বস্ত সূত্র-পরম্পরায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে প্রাপ্ত। তিনি জিবরাঈল আলাইহিস সালাম থেকে, আর জিবরাঈল আল্লাহ হতে প্রাপ্ত। আবু ইয়াযিদ বললেন, হে বুযুর্গ! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আল্লাহ তায়ালা আরও একটি ইলম শিক্ষা দিয়েছেন, যা জিবরাঈল আলাইহিস সালাম জানেন না, মিকাঈল আলাইহিস সালামও জানেন না। আলেম বললেন, ঠিক আছে। কিন্তু আমি চাই, আপনি সঠিকভাবে আল্লাহ হতে প্রাপ্তির বিষয়টুকু আমার কাছে স্পষ্ট করুন। আবু ইয়াযিদ বললেন, হ্যাঁ, তোমাকে আমি ওই পরিমাণ বয়ান করতে পারি, যে পরিমাণ মারেফাত তুমি রপ্ত করতে পেরেছ। আচ্ছা, তুমি কি জানো যে, আল্লাহ তায়ালা মুসা আলাইহিস সালাম এর সাথে শুধু কথা বলেছেন, কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সরাসরি সামনাসামনি কথা বলেছেন। কোনো ধরনের পর্দা ছাড়াই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে দেখেছেন। আর নবীরা ওহি দ্বারা বিধান আরোপ করে থাকেন।
আলেম উত্তরে বললেন, সঠিক বলেছেন। এরপর আবু ইয়াযিদ বললেন, তুমি কি জানো যে, সিদ্দিকীন ও ওলিদের কথা আল্লাহর ইলহামের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে প্রজ্ঞাপূর্ণ জবান দান করেন। উম্মতকে তাদের দ্বারা উপকৃত করে থাকেন। মুসা আলাইহিস সালাম এর মায়ের মনে, খিযির আলাইহিস সালাম এর নৌকা ভেঙ্গে ফেলা, দেয়াল উপড়ে দেয়া এ সবই ইলহামের মাধ্যমে হয়েছে। অনুরূপভাবে ওমর রা. এর 'হে সারিয়া! পাহাড়ের দিকে তাকাও!'-এ সবই ইলহামের অন্তর্ভুক্ত।
ইবরাহিম বলেন, আমি আবু ইয়াযিদের মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। লোকজন বলাবলি করছিল, অমুক অমুক থেকে হাদিস শুনেছে, অমুক এটা- ওটা বর্ণনা করেছে ইত্যাদি। আবু ইয়াযিদ এ সব শুনে বললেন, হে দোস্তরা! তোমরা মৃত মানুষের কাছ থেকে মৃতদের জন্য ইলম নিয়ে এসেছ। আর আমি এনেছি মহাচিরঞ্জীব আল্লাহর কাছ থেকে।
গ্রন্থকার বলেন, প্রথম ঘটনায় আবু ইয়াযিদ ফিকাহ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, তা ছিল তার স্বল্পজ্ঞানের পরিচায়ক। কেননা তিনি যদি আলেম হতেন, তাহলে অবশ্যই জানতেন-কোনো বিষয়ের ইলহাম হওয়া কখনোই ইলম-পরিপন্থী হতে পারে না। ইলমকে ডিঙিয়ে ইলহামের কাছে যাওয়া যায় না। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
'নিশ্চয় বিভিন্ন নবীর উম্মতে মুহাদ্দিসিন ছিলেন। আর আমার মুহাদ্দিস হচ্ছে ওমর।'
মুহাদ্দিস দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, ভালো বিষয়ের ইলহাম হওয়া। কিন্তু ইলহামওয়ালার কাছে যদি ইলমের বিপরীত কোনো ইলহাম আসে, তাহলে তার ওপর আমল করা জায়েয নেই। হজরত খিযির আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলা হয়, তিনি নবী ছিলেন। এ কথাকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, নবীদেরকে ওহির মাধ্যমে বিভিন্ন পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়। এটা ইলম ও তাকওয়ার ফলাফল। তাকওয়াবান ব্যক্তিকে ভালো কাজের তাওফিক দেয়া হয় এবং 'রুশদ' এর ইলহাম করা হয়। সুফিরা যে দাবি করে আসছে, আলেমরা মৃতের কাছ থেকে মৃতের ইলম অন্বেষণ করেছে। এমন দাবিদারের জানা নেই—কত বড় দাম্ভিকতাপূর্ণ কথা বলে ফেলেছে। এটা সরাসরি শরিয়তের ওপর আঘাত করার নামান্তর।
টিকাঃ
১. [মাউযূ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ৩৭২৪
২. [মাউযূ] আসিলসিলাতুয যাঈফাহ: হাদিস নং ৪২২
৩. [যঈফ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ৩৮৭৮
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৬৮৯, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৩৯৮
📄 শরিয়ত ও হাকিকতের ব্যাপারে সুফিদের মতবাদ
অনেক সুফি শরিয়ত ও হাকিকতের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে বেড়ায়। অথচ এমন কথা কেবল এদের অসার দাবি। কেননা শরিয়তের সবকিছুই হাকিকত। এ কথা দ্বারা তারা যদি কোনো ধরনের বিশেষত্ব বা হাড়ের আশ্রয় নেয়, তাহলে তাও শরিয়তের আওতাভুক্ত হতে হবে।
গ্রন্থকার বলেন, ইমাম আবু হামেদ গাযালি রহ. তাঁর এহইয়াউল উলূম গ্রন্থে লিখেছেন, যে ব্যক্তি এমন বলবে যে, হাকিকত শরিয়তের বিপরীত অথবা বাতেন জাহেরের বিপরীত, তাহলে সে ঈমান থেকে দূরে সরে কুফরের নিকটবর্তী হয়ে যাবে।
ইবনে আকিল বলেন, সুফিরা শরিয়তকে হাকিকতের একটি শাখা মনে করে থাকে। তিনি বলেন, এটা খুবই গর্হিত কথা। কেননা আল্লাহ তায়ালা শরিয়তকে সৃষ্টির উপকার এবং ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এখন যদি -কেউ হাকিকত দ্বারা মনে করে যে, শরিয়ত কিছু নয়, তাহলে এটা নির্ঘাত শয়তানের ধোঁকা বলে মানতে হবে। যে ব্যক্তি শরিয়ত ছেড়ে হাকিকতের পেছনে পড়ে, শয়তান তাকে নিয়ে খেলা করে এবং ধোঁকা দেয়।
📄 জ্ঞানগ্রন্থ দাফন ও সাগরে নিক্ষেপ বিষয়ে সুফিদের ওপর
গ্রন্থকার বলেন, সুফিদের একটি দল এমন আছেন, যারা নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত কিতাবি ইলমে মগ্ন ছিলেন। পরে শয়তান তাদের মনের অলিন্দে প্ররোচনার ডানা মেলতে থাকে যে, এসব পড়া দ্বারা কিছু হবে না, আসল বিষয় হচ্ছে আমল। সুতরাং তারা কিতাবসমূহ দাফন করে দেন। ইবরাহিম ইবনে ইউসুফ আমাকে বলেছেন, আহমাদ ইবনুল হাওয়ারি তার কিতাবসমূহ সাগরে ভাসিয়ে দেন এবং বলেন, কিতাব হচ্ছে উন্নত প্রমাণপঞ্জি। কিন্তু উদ্দেশ্য সাধনের পর দলিল-প্রমাণের পেছনে পড়ে থাকা অনুচিত।
আহমাদ ইবনুল হাওয়ারি ত্রিশ বছর যাবৎ ইলম অর্জন করেছেন। ইলমের শীর্ষচূড়ায় পৌঁছলে কিতাবগুলো নিয়ে সাগরে নিক্ষেপ করেন এবং বলেন, হে ইলম! তোমার সাথে এমন ব্যবহার তোমাকে লাঞ্ছিত ও অযোগ্য মনে করে করিনি; বরং আমি তোমাকে এ জন্য অর্জন করেছি, যাতে তোমার দ্বারা আমি আমার প্রতিপালককে চিনতে পারি। আমি সে রাস্তা পেয়ে গেলে তোমার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।
আবুল হোসাইন ইবনুল খিলাল সম্পর্কে আমার কাছে সংবাদ এসেছে যে, তিনি তার সমুদয় শ্রবণকৃত হাদিস দজলা নদীতে ফেলে দেন। তাঁর প্রথম শ্রবণ অর্জিত হয়েছিল আবুল আব্বাস আসাম্ম থেকে। তার কাছ থেকে তিনি বহু হাদিস লিপিবদ্ধ করেন। আবু তাহের জানাবুযী বলেন, মুসা ইবনে হারুন আমাকে হাদিস পড়ে শোনাতেন। একেক অধ্যায় শোনানো শেষ হলে তিনি তা দজলা নদীতে নিক্ষেপ করতেন এবং বলতেন, আমি এর হক আদায় করেছি।
আবু নাসার তুসি বলেন, বুযুর্গদের কাছ থেকে আমি শুনেছি, আবু আবদুল্লাহ মুকারা তাঁর পিতা থেকে উত্তরাধিকার সম্পত্তিস্বরূপ জমি ও ধন-সম্পদ ছাড়াও পঞ্চাশ হাজার দিনারের মালিক হন। তিনি তা পেয়ে ফকিরদের মাঝে বণ্টন করে দেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি আবু আবদুল্লাহর কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একসময় যখন আমি যুবক ছিলাম, তখন আমি এহরাম বেঁধে একাকী মক্কা অভিমুখে বেরিয়েছিলাম। তখন আমার কাছে এমন কিছু ছিল না, যার জন্য আমার ফেরত আসার দরকার পড়ত। আমার চেষ্টা ছিল, কিতাব দ্বারা আমি আমার প্রয়োজন পূরণ করে নেব। যে সকল ইলম ও হাদিস আমি সঞ্চয় করেছিলাম, তা আমার জন্য আরও কঠিনতর হয়ে যেতে থাকে যে, কী করে মক্কায় যাব এবং সফর করব? এ জন্য আমি এ সব থেকে মুক্তি চেয়েছি।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইলম হচ্ছে আলোস্বরূপ। পক্ষান্তরে শয়তান মানুষের মনে প্ররোচনা দিতে থাকে যে, এ আলো নিভিয়ে দেয়া উত্তম। এতে করে শয়তান অন্ধকারে মানুষের মনে অনায়াসে বাসা বাঁধতে সক্ষম হয়। কেননা অজ্ঞতার চেয়ে গহিন অন্ধকার আর কিছুই নেই। শয়তান যখন এ ব্যাপারে শঙ্কায় পতিত হলো যে, এসব লোক ফের কখনো কিতাব অধ্যয়নে পড়ে যায় কি না! তাই সে মানুষের মনে কিতাবসমূহ দাফন করা ও ধ্বংস করতে প্ররোচনা জাগাতে থাকে। অথচ এমন কাণ্ড খুবই গর্হিত ও নিন্দনীয়।
এ সব কথার ব্যাখ্যা হচ্ছে, ইলমের উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। শরিয়ত প্রণেতা এর সংরক্ষণের জন্য তা লিপিবদ্ধ করে রাখতে নির্দেশ দেন। কুরআনের ব্যাপারে বলা হয়েছে—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর কোনো আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে তিনি ওহি-লেখকদের ডেকে তা লিখিয়ে নিতেন। সাহাবারা আয়াতগুলো কাঠি ও পাথরের সাহায্যে লিপিবদ্ধ করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর হজরত আবু বকর সিদ্দীক রা. কুরআন শরিফকে মাসহাফ আকারে একত্র করেন। এরপর হজরত ওসমান রা. এটা নকল করে লেখ্য আকারে সাজান। এ সবকিছু এ জন্য করা হয়, যাতে তা নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত থাকে। এখান থেকে যাতে কোনো অংশই বাদ পড়ে না যায়।
এরপর আসে সুন্নাতের কথা। তো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের প্রারম্ভলগ্নে শুধু কুরআন শরিফই সংরক্ষণের নির্দেশ দেন এবং বলেন,
لا تَكْتُبُوا عَنِّي شيئاً سوى القرآن
'কুরআন ছাড়া আর কিছু আমার কাছ থেকে শুনে লিখবে না।”
এরপর হাদিসের সংখ্যা বাড়তে থাকলে এবং তিনি যখন দেখেন মুখস্থ রাখা কষ্টকর হয়ে পড়বে, তখন তিনি হাদিস লিখে রাখার নির্দেশ দেন। হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত, 'জনৈক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তার স্মরণশক্তি স্বল্পতার কথা জানালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
اسْتَعِنْ بِيَمِينِكَ عَلَى حِفْظِكَ
'নিজের স্মরণশক্তির ওপর হাত দ্বারা সাহায্য নাও।"
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَيَّدُوا الْعِلْمَ قُلْتُ: وَمَا تَقْيِيدُهُ؟ قَالَ: «كِتَابَتُهُ»
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইলমকে বন্দি করে নাও। আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কীভাবে বন্দি করে নেব? তিনি বললেন, লিখে নাও।'
লেখক বলেন, জেনে রাখা উচিত—সাহাবায়ে কেরাম রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীর শব্দ, বাক্য ও যাবতীয় কর্মকাণ্ড সংরক্ষণ করেছেন। বর্ণনা পরম্পরায় শরয়ি বিধি-বিধান কায়েম হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা আমার কাছে যা শোনো তা অন্যকে পৌঁছাও।"
হাদিস শুনে তা অক্ষরে অক্ষরে বর্ণনা করা লেখনপদ্ধতি ব্যতীত সম্ভব নয়। কেননা মুখস্থ ও স্মরণকৃত বিষয়ের ওপর ভরসা নেই। আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, তিনি হাদিস বয়ান করার সময় লোকজন তাঁকে বলত, আপনি আপনার জবান থেকে আমাদের শোনান। তিনি বলতেন, না, আমি কিতাব দেখা বিনে বয়ান করব না। আলী ইবনুল মাদিনী বলেন, আমাকে আমার গুরু আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. নির্দেশ দিয়েছেন, কিতাবে দেখা ব্যতীত কোনো হাদিস বয়ান করবে না।
সুতরাং সাহাবারা যখন সুন্নাত রেওয়ায়াত করেছেন, তাদের থেকে তাবেয়িগণ ধারণ করেছেন। মুহাদ্দিসীনরা পৃথিবী বিভিন্ন প্রান্ত সফর করে হাদিসগুলো সযত্নে সংরক্ষণ করেছেন। বিশুদ্ধ ও অবিশুদ্ধ হাদিসে গবেষণা করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। সুনানগুলো সাজিয়েছেন এবং গ্রন্থবদ্ধ করেছেন। এরপর যারা এগুলো ধুয়ে ফেলছেন, তারা মনগড়া কর্ম সাধন করেছেন। এ ব্যাপারে তারা আল্লাহর নির্দেশের তোয়াক্কা করেননি। শরিয়তের পরোয়া করেননি। মুহাদ্দিসীনরা কত কষ্ট-ত্যাগ স্বীকার করে এ সব হাদিস সমবেত করেছেন। এর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা চরম ধৃষ্টতার পরিচায়ক বৈকি?
এ সকল কিতাব-যা তারা দাফন করেছে বা সাগর-নদীতে নিক্ষেপ করেছেন, এটা তিনটি অবস্থাকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। হয়তো তা হক হবে বা বাতিল; অথবা হক-বাতিল উভয়টির সংমিশ্রণ। যদি এগুলো বাতিল কিছু থেকে থাকে, তাহলে তা দাফন করাতে নিন্দার কিছু নেই। যদি হক-বাতিল মিশ্রিত থাকে এবং এগুলোতে পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তা ধ্বংস করার একটি অজুহাত থাকতে পারে। কেননা বহু লোক নির্ভরযোগ্য ও মিথ্যাবাদী উভয় ধরনের লোকদের থেকে হাদিস লিপিবদ্ধ করেছেন। কিন্তু মূল বিষয়গুলো এতে একাকার হয়ে গেলে তারা কিতাবগুলো দাফন করে দেন। সুফিয়ান সাওরি রহ. এর সম্পর্কে যে সকল কিতাব দাফন করে ফেলার কথা বিবৃত হয়ে থাকে, এর কারণও তা-ই।
পক্ষান্তরে এ সব কিতাবে যদি হক এবং শরিয়তের বিষয়াদি থেকে থাকে, তাহলে তা ধ্বংস করা কিছুতেই বৈধ হতে পারে না। কেননা ইলম ও সম্পদ ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই। যে এগুলো ধ্বংস করতে চায়, তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা উচিত। সে যদি বলে—কিতাবগুলো আমাকে ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়। তাহলে বলতে হবে, এর প্রতিবিধান তিন প্রকার। ১. তোমার যদি জানার অবকাশ হতো, তাহলে তুমি নিশ্চিত জেনে নিতে যে, ইলমের লিপ্ততা ও ব্যস্ত থাকা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। ২. জ্ঞানের যে অন্তর্নিহিত আলো তুমি গ্রহণ করেছ, তা চিরদিন অবশিষ্ট থাকবে না। জাগতিক বিভিন্ন ফিতনা ফাসাদে জড়িয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কার কথা উড়িয়ে দেয়া যায় না। ইউসুফ ইবনে আসবাত তার কিতাবসমূহ জ্বালিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সে হাদিস শোনানো বন্ধ রাখতে পারেনি। সুতরাং মুখস্থ হাদিস বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি অনেক উল্টা-পাল্টা করে ফেলেন। ৩. আমরা মেনে নিচ্ছি যে, তোমার অন্তর আলোয় টইটম্বুর এবং তা চিরস্থায়ী, তোমার কিতাবের প্রয়োজনও নেই। কিন্তু তোমার কাছ থেকে জ্ঞান অন্বেষণকারীরা তোমার স্তরে পৌঁছতে পারছে না। তুমি তাদেরকে কিতাবগুলো না দিয়ে কেন ধ্বংস করে দিলে? অথবা এমন কাউকে কেন ওয়াকফ্ করলে না যে তা দ্বারা উপকৃত হতে পারে? অতএব কিতাবাদি ধ্বংস করা কোনো অবস্থাতে সঠিক নয়।
মুরাব্বাযী ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. হতে বর্ণনা করেন, তাঁর কাছে ওই ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়, যে এমন অসিয়ত করে-আমার কিতাবগুলো দাফন করে দেবে। তদুত্তরে তিনি বলেন, আমি এটাকে সমর্থন করতে পারি না যে, ইলমকে দাফন করা হবে। মুরাব্বাযী বলেন, আহমদ ইবনে হাম্বল বলতেন, কিতাব ধ্বংস করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ আমি দেখি না।
টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৩০০৪
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১১৯
২. [সহিহ লিগাইরিহী] সহিহুল জামে' হাদিস নং ৪৪৩৪
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৪৬১
📄 পবিত্র কুরআনের ব্যাপারে সুফিদের বক্তব্যের বিস্তৃত আলোচনা
জাফর ইবনে মুহাম্মাদ খুলদী বলেন, আমি আমার শায়খ জুনাইদের দরবারে উপস্থিত হলাম। ইবনে কাইসান তাঁর কাছে নিম্নোক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন:
سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى
'আমি তোমাকে পড়িয়ে দেব অতঃপর তুমি ভুলবে না।" তিনি বললেন, এ আয়াতের ব্যাখ্যা হচ্ছে, এর ওপর আমল করতে তুমি ভুলবে না। জাফর বলেন, জনৈক ব্যক্তি জুনাইদের কাছে নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন-
وَدَرَ سُوا مَا فِيهِ 'তাতে যা লেখা ছিল, তারা তা পড়েছে।'
জুনাইদ বললেন, এ আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তারা আমল করা ছেড়ে দিলে তিনি বললেন, আল্লাহ তোমাদের মুখের মোহর না ভাঙুক।
গ্রন্থকার বলেন, প্রথম আয়াতাংশে জুনাইদের নিজস্ব ব্যাখ্যা 'এর ওপর আমল করতে তুমি ভুলবে না'—কথাটি নিরর্থক। এটা স্পষ্ট ভ্রান্তি। কেননা لاتنسى কোনো সীগা নয়; বরং এটি হচ্ছে জুমলায়ে খবরিয়া। নাহী নয়। এটি فما تنس এর অর্থ বহন করে। এটি যদি নাহী হতো তাহলে জযম থাকত। মোটকথা-তার এই ব্যাখ্যা আলেমদের সর্বসম্মত ঐকমত্যের বিপরীত। অনুরূপভাবে ودرسوا ما فيه এটি درس থেকে উদ্দাত, যা তেলাওয়াতের অর্থ বহন করে। যথা অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে- ربا كنتم تدرسون । এখানে ওই দরস উদ্দেশ্য নয়, যা ধ্বংসের অর্থবোধক।
মুহাম্মাদ ইবনে জারির বলেন, আমি আবুল আব্বাস ইবনে আতা থেকে শুনেছি, তার কাছে জনৈক ব্যক্তি নিম্নের আয়াতের অর্থ জানতে চায়-
فَنَجَّيْنَاكَ مِنَ الْغَمِّ 'আপনাকে আমি চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়েছি।”
আবুল আব্বাস বলেন, তোমার জাতির দুশ্চিন্তা থেকে তোমাকে মুক্তি দিয়েছি। লেখক বলেন, এটা আল্লাহর কালামের ওপর মারাত্মক অপবাদ। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সে বলে থাকে, তিনি আল্লাহর প্রেমে মত্ত হয়ে গেছেন। আল্লাহর ভালোবাসাকে ফিতনা আখ্যা দিয়ে সে বিরাট অন্যায় করেছে। ইবনে আতার কাছ থেকে জনৈক ব্যক্তি-
فَأَمَّا إِنْ كَانَ مِنَ الْمُقَرَّبِينَ * فَرَحٌ وَرَيْحَانٌ وَجَنَّةُ نَعِيمٍ
'অতঃপর সে যদি নৈকট্যপ্রাপ্তদের অন্যতম হয়, তবে তার জন্য থাকবে বিশ্রাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও সুখময় জান্নাত।"
উক্ত আয়াত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জবাবে বলেন, এখানে 'রাওহ্' অর্থ আল্লাহকে দেখা, 'রায়হান' অর্থ তাঁর কথা শোনা। আর 'জান্নাতে নাঈম' ওই স্থান যেখানে আল্লাহ তায়ালাকে কোনো প্রকার পর্দা ব্যতিরেকেই দেখতে পাওয়া যায়। লেখক বলেন, এই মতামত বাস্তবিকপক্ষে তাফসিরের উল্টো।
আবু আবদুর রহমান সালামি কুরআনের তাফসির বিষয়ে সুফিদের বিভিন্ন কথাবার্তা উল্লেখ করে দু'খণ্ডে একত্র করেছেন; যার মধ্যে অধিকাংশই অনর্থক কথাবার্তা, অসার ও অবৈধ। তার নাম রেখেছেন 'হাকায়িকুত্ তাফসির'। সুফিরা তাফসির বিষয়ে এমনও বলে থাকে যে, 'আলহামদু'-কে 'ফাতিহাতুল কিতাব' বলার কারণ হচ্ছে, এগুলো প্রারম্ভিক বিষয়াশয়-যার মাধ্যমে আমরা শুরু করে থাকি। তোমরা এটাকে সম্মান করলে ভালো, অন্যথায় এর পরের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো তোমরা আর অনুধাবনের সুযোগ পাবে না। গ্রন্থকার বলেন, সুরাটিকে এভাবে ইঙ্গিতবাহী করা নিন্দনীয়। কেননা ব্যাখ্যাকারবৃন্দের সর্বসম্মতিক্রমে এটা সর্বপ্রথম অবতীর্ণ সুরা নয়। সুফিদের ধারণা-মানুষ যেই 'আমীন' বলে, তার মানে হচ্ছে আমি ইচ্ছে করে তোমার দিকে আসছি। লেখক বলেন, এটাও নিন্দনীয়। কেননা এক্ষেত্রে 'আম্মীন' হওয়ার দরকার ছিল। অথচ এটা তাশদিদের সাথে উচ্চারিত নয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَإِنْ يَأْتُوكُمْ أُسَارَى
'কাফেররা যদি বন্দি হয়ে তোমার কাছে আসে।
এ আয়াতাংশ সম্পর্কে আবু উসমান সুফি বলেন, 'উসারা' অর্থ পাপে নিমজ্জিত। ওয়াসেতী বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, তারা নিজেদের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষকরণে নিমগ্ন। জুনাইদ বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, জাগতিক বিষয়াদিতে লিপ্ত, আল্লাহ তায়ালা চাইলে তাদেরকে হেদায়াত দিতে পারেন। আমি (গ্রন্থকার) বলছি, আয়াতটি তো অস্বীকারকারীর নিন্দার বর্ণনায় অবতীর্ণ হয়েছে। তার অর্থ হচ্ছে, কাফেররা যদি বন্দি হয়ে তোমার কাছে আসে, তাহলে তাদের থেকে ফিদিয়া নাও। অন্যথায় জিহাদের সময় তাদেরকে হত্যা করো। উপরোক্ত অভিমতের আলোক যদি এ আয়াতের ব্যাখ্যা ধরে নেয়া হয়, তবে তো এদের প্রশংসা করা হচ্ছে বলে অনুমিত হয়।
মুহাম্মাদ ইবনে আলী يُحِبُّ التَّوَّابِينَ 'আল্লাহ তাওবাহকারীদের ভালোবাসেন।' এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, এর মানে হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ভালোবাসেন; যারা নিজেদের তাওবাহর ওপর তাওবাহ করে। আন নূরী সুফি يقبض ويبسط এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, নিজের জন্য অভাব ও সচ্ছলতা দান করেন। অন্যত্র আল্লাহ তায়ালার ইরশাদ مَنْ دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا 'যে হেরেমে প্রবেশ করে সে নিরাপদ।' মুহাম্মাদ ইবনে আলী এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর মানে হচ্ছে, 'প্রবৃত্তির অনুসরণ ও শয়তানের ধোঁকা থেকে সে নিরাপদ।' অথচ অর্থটি চরম গর্হিত। কেননা আয়াতের শব্দ একটি সংবাদ আর এর অর্থ হচ্ছে নির্দেশক। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে, 'যে হেরেম শরিফে প্রবেশ করে, তাকে নিরাপত্তা দাও।' তার দেয়া ব্যাখ্যায় আয়াতের সঠিক মর্ম উদঘাটিত হয় না। কেননা হেরেম শরিফে বহু মানুষ যায় কিন্তু কারো কারো মন শয়তানের ধোঁকা থেকে নিষ্কৃতি পায় না।
আবুল হাসান নুরি সম্পর্কে শুনেছি, মানুষ বলাবলি করত যে, তিনি মুয়াজ্জিনের আযান শুনে কুৎসাপূর্ণ মন্তব্য করে বলতেন, এটা মৃত্যুর বিষ। পক্ষান্তরে কুকুরের চিৎকার শুনে বলতেন لبيك وسعديك। মানুষজন এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, মুয়াজ্জিনের ব্যাপারে আমার ভয় হচ্ছে যে, সে অলসতার সাথে আল্লাহকে স্মরণ করছে। সে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে আযান দিয়ে থাকে। বেতন না পেলে সে আর আযান দেবে না। সুতরাং আমি তার নিন্দা জানাই। অন্যদিকে কুকুর রিয়াবিহীন আল্লাহর জিকির করে থাকে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ
'প্রত্যেক বস্তু আল্লাহর প্রশংসাসূচক তাসবিহ পড়ে।”
গ্রন্থকার বলেন, ভাইয়েরা! আল্লাহ সবাইকে এই ভ্রান্তি থেকে নিরাপদে রাখুন। তার জটিল ফিকাহ ও আশ্চর্য ইজতিহাদের প্রতি চিন্তা করুন। নূরী সম্পর্কে আরেকটি ঘটনা বর্ণিত আছে, তিনি জনৈক ব্যক্তিকে স্বীয় দাড়িতে হাত রাখতে দেখে বললেন, 'আল্লাহর দাড়ি থেকে তোমার হাত সরাও।' এ ঘটনা বাদশার কানে পৌঁছলে বাদশাহ নূরীকে তলব করে তাকে জিজ্ঞেস করেন, কী ব্যাপারে তুমি নাকি কুকুরের চিৎকার শুনে লাব্বাইক বলো আর মুয়াজ্জিনের আযানের সময় কুৎসা ও নিন্দা করো? নূরী বলল, হ্যাঁ। এর কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ 'প্রত্যেক বস্তু আল্লাহর প্রশংসাসূচক তাসবিহ পড়ে।”
আর মুয়াজ্জিন তো আপাদমস্তক একজন পাপিষ্ঠ ব্যক্তি। পরে বাদশাহ তাকে বললেন, তুমি ওই লোকের দাড়ি সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করলে কেন? নূরী জবাবে বলল, এই বান্দা এবং তার দাড়ি, এমন কি তার পুরো স্বত্ত্বা- যা দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে—তার সবই তো আল্লাহ তায়ালার। দেখুন! অজ্ঞতা এই শ্রেণিকে কোথায় নিক্ষেপ করেছে!
টিকাঃ
১. সুরা আ'লা: আয়াত ৬
২. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৬৯
৩. সুরা ত্বহা: আয়াত ৪০
১. সুরা ওয়াকিয়া: আয়াত ৮৮-৮৯
২. সুরা বাকারা: আয়াত ৮৫
৩. সুরা বাকারা: আয়াত ২২২
৪. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৯৭
১. সুরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ৪৪
২. সুরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ৪৪