📄 সফর থেকে ফেরার সময় সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
গ্রন্থকার বলেন, সুফিদের মতবাদ হচ্ছে, মুসাফির সফর থেকে ফিরে তার মহল্লা প্রবেশ করলে সেখানকার উপস্থিত লোকজনকে সে সালাম দেবে না; বরং প্রথমে অযুখানায় গিয়ে অযু করে দুই রাকাত নামায পড়ার পর তার শায়খকে সালাম করবে। এরপর লোকজনদেরকে সালাম দেবে।
এই শরিয়তবিরোধী বিদয়াতটি পরবর্তীকালের সুফিরা উদ্ভাবন করেছে। কেননা ফুকাহায়ে কেরামগণের মতে কেউ কোনো মানুষের জমায়েতে উপস্থিত হলে সে সবাইকে সালাম দেবে-চাই অযু থাক বা না থাক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সুফিরা এই মতবাদ ছোট ছেলেদের থেকে গ্রহণ করেছে। কেননা ছোট ছেলেদেরকে যদি বলা হয়, তুমি সালাম দাওনি কেন? সে জবাবে বলে, আমি এখনও মুখ ধুইনি। সম্ভবত এদের থেকেই বিদয়াতিরা এ অভ্যাসটি আয়ত্ত করেছে। হজরত আবু হোরায়রা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
يُسَلِّمُ الصَّغِيرُ عَلَى الكَبِيرِ، وَالمَارُّ عَلَى القَاعِدِ، وَالقَلِيلُ عَلَى الكَثِيرِ
'ছোটদের উচিত বড়দের সালাম দেয়া, চলন্ত অবস্থার লোকেরা বসা লোকদের সালাম দেবে এবং কমসংখ্যক লোক অধিক লোককে সালাম দেবে।'
এই হাদিস বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে। সুফিদের আরেকটি অভ্যাস হচ্ছে, সফর থেকে ফিরে তারা শরীর মালিশ করাতে চায়। আবু যুরআ' তাহের ইবনে মুহাম্মাদ আমাকে বলেছেন, তাঁর পিতা স্বীয় গ্রন্থে সফর থেকে ফিরে কীভাবে শরীর মালিশ করবে-সে ব্যাপারে একটি অধ্যায় নির্মাণ করেছেন। তিনি হজরত ওমর রা. এর কথা থেকে এটাকে প্রমাণিত করেছেন।
'হজরত ওমর রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে দেখি, তাঁর হাবশি ক্রীতদাস তাঁর পিঠ মোবারক মালিশ করছে। আমি আরয করলাম ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এ অবস্থা কেন? তিনি বললেন, উটনী আমাকে ফেলে দিয়েছে।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ভায়েরা! উক্ত হাদিস থেকে উপরোক্ত ব্যক্তির কথিত বিষয়ে প্রমাণ সাব্যস্তকরণের ব্যাপারে চিন্তা করুন। এই লোকের উচিত ছিল, যে ব্যক্তি উট থেকে পড়ে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, কীভাবে তার শরীর মালিশ করা চাই—সে বিষয়ক অধ্যায় নির্মাণ করা। আর সুন্নত কি পিঠ মালিশ করা নাকি পা মালিশ করা? সে কোথায় পেল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সফর থেকে এসেছেন এবং প্রথম রাতে মালিশ করা হয়েছে? এছাড়া হাদিসের আলোকে কখনো ব্যথা অনুভূত হলে পিঠ মালিশ করার নিয়মের ব্যাপারে তিনি তাঁর গ্রন্থের অধ্যায় নির্মাণ করতে পারতেন। এমন বিষয়ের অবতারণা করে তাদের 'ইসতিদরাজ' থেকে দূরত্ব অবলম্বন করা উচিত। সুফিদের আরও একটি কুসংস্কার হচ্ছে, তারা সফর থেকে এলে চতুর্দিকে এ খবর ছড়িয়ে দেয়া হয়।
ইবনে তাহের একটি অধ্যায় নির্মাণ করেছেন। যেখানে তিনি উল্লেখ করেন, সুফিরা সফর থেকে এলে আনন্দ-ফুর্তি করবে। এ ব্যাপারে তিনি হজরত আয়েশা রা. এর হাদিসকে প্রমাণ হিসেবে সাব্যস্ত করেন।
'হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সফরে বের হলে কুরাইশের এক মেয়ে মানত করল যে, আল্লাহ তায়ালা যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সহি সালামতে ফিরিয়ে আনেন, তাহলে আমি হজরত আয়েশা রা.-এর ঘরে দফ বাজাব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরিফ আনলে তিনি বললেন, এসো। দফ বাজিয়ে নাও।"
গ্রন্থকার বলেন, দফ বাজানোর বৈধতার ব্যাপারে পূর্বে আলোচনা করেছি। যেহেতু এই মেয়ে দফ বাজানোর মানত করে ফেলেছে, তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমার মানত পূরণ করে নাও। মুসাফির ঘরে এলে তার আগমন উপলক্ষে নাচ-গানের আয়োজন করার প্রমাণ এ হাদিস দ্বারা কী করে নেয়া যেতে পারে?
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৬২৩১
২. [যঈফ] হাইসামী 'মাজমাউয্যাওয়াইদ' গ্রন্থে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন।
৩. [হাসান] আসিলসিলাতুস্ সাহীহাহ্: হাদিস নং ১৬০৯
📄 সুফিদের কেউ মারা গেলে তখনকার শয়তানের ধোঁকার নমুনা
সুফিদের কেউ মারা গেলে তখন শয়তান দু'ভাবে ধোঁকা দিয়ে থাকে। যথা- প্রথম ধোকা: তারা বলে বেড়ায়, মৃত কোনো ব্যক্তির ওপর আমাদের কান্না করা উচিত নয়। কোনো সুফি-দরবেশ যদি তার নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুতে কান্না করে তাহলে সে মারেফতের রাস্তা থেকে ছিটকে পড়বে। ইবনে আকিল বলেন, এ দাবি শরিয়তের ব্যাপারে অত্যুক্তি। এটা বিবেকহীনতার পরিচায়ক। মানবপ্রকৃতি এর অনুকূলে নয় এবং তা মানবিক শিষ্টাচারবহির্ভূত প্রথা। সুতরাং এ সব লোকের চিকিৎসা এমন ঔষধ দিয়ে করা উচিত যা দ্বারা তাদের অভ্যাস পরিবর্তন করা যায়।
স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবী হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এর সম্পর্কে বলেছেন,
وَابْيَضَّتُ عَيْنَاهُ مِنَ الْحُزْنِ فَهُوَ كَظِيمٌ 'পেরেশানি ও শোকে তাঁ দু'টি চোখ সাদা হয়ে গেছে।”
আরও বলতেন-
يَا أَسَفَى عَلَى يُوسُفَ 'হায় আফসোস! ইউসুফ চলে গেছে!'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ছেলের মৃত্যুতে ক্রন্দন করেছিলেন এবং বলেছিলেন-
إِنَّ العَيْنَ تَدْمَعُ 'নিশ্চয় চক্ষু অশ্রু প্রবাহিত করে।"
হজরত ফাতেমা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের সময় বলেছিলেন- وأكرب أبتاه 'উহ্! আমার পিতার উপর কত কষ্ট!'। তখন এটাকে কেউ মন্দ বলেননি। হজরত ওমর রা. মুতাস্মিমকে তার ভাইয়ের মৃত্যুতে ক্রন্দনরত দেখেছিলেন। সে সময় তার কিছু কবিতা-
وكنا كندماني جزيمة حقبة * من الدهر حتى قيل لن يتصدعا
'আমরা দুই ভাই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বাদশা জুযাইমার দুই উজিরের মতো ছিলাম। লোকেরা আমাদেরকে দেখে বলত, এরা কখনো পৃথক হবে না।'
হজরত ওমর রা. বলেছিলেন, 'ইস! যদি আমি কবি হতাম তাহলে আমার ভাই যায়দের জন্য এভাবে মরসিয়া বলতাম!' মুতাস্মিম উত্তরে বললেন, 'আমার ভাই যদি আপনার ভাইয়ের ভাগ্য বরণ করে মারা যেত তাহলে আমি মরসিয়া করতাম না।' উল্লেখ্য, মুতামিমের ভাই মালেক কুফরী অবস্থায় মারা যায়, অন্যদিকে হজরত যায়দ রা. শাহাদাতের সুধা পানে ধন্য হন।
হজরত ওমর রা. খুশি হয়ে বললেন, হে মুতাম্মিম! কেউ আমার ভাই সম্পর্কে এভাবে মর্যাদাপূর্ণ কথা বলেনি, যা তুমি বললে। এছাড়া আমরা চিন্তা করলে দেখতে পাই, উটের মতো কঠিনপ্রাণ ও পাষাণ জন্তুও তার থাকার ঘর ছাড়ার সময় এবং নিজেদের মানুষের বিদায় বেলায় কান্নাকাটি করে থাকে। সে তার বাচ্চাদের জন্য ছটফট করতে থাকে। পাখিরা তাদের কারও বিয়োগে কান্নার আধিক্যে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করতে থাকে। অর্থাৎ নিকটজনের মৃত্যুতে মানুষের কান্নাকাটি করা ও অশ্রু ঝরানো একটি স্বাভাবিক ও মানবিক প্রকৃতি। যাকে খুশির সংবাদ আলোড়িত করে না এবং দুঃখের সংবাদ বিচলিত করে না, সে তো প্রাণহীন উদ্ভিদের মতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবিক প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে নিন্দাযোগ্য বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন, 'যে ব্যক্তি বলবে, আমি কখনো আমার দশ সন্তানের কারও গালে চুমু খাইনি, তার সম্পর্কে আমি বলব, তার অন্তর থেকে তো আল্লাহ তায়ালা দয়া-মায়া উঠিয়ে নিয়েছেন।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা ছেড়ে যাওয়ার প্রাক্কালে মক্কার দিকে বারবার ফিরে তাকিয়েছিলেন। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন কথার সমর্থন করবে, যা শরিয়ত ও মানবিক প্রকৃতির বিপরীত, তাকে জাহেল তথা অজ্ঞ বলে আখ্যায়িত করাই সমীচীন। শরিয়ত কেবল আমাদের থেকে এতটুকু কামনা করেছে, যাতে আমর মুখ ও শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে না ফেলি, জামা-কাপড় ছিঁড়ে না ফেলি। কিন্তু অশ্রু প্রবাহিত করা এবং পেরেশান ও দুঃখ প্রকাশ করা দোষের কিছু নয়।
দ্বিতীয় ধোঁকা: সুফি-দরবেশরা তাদের কেউ মারা গেলে একটি আয়োজন করে থাকে, যাকে 'ওরশ' বলে। সেখানে উচ্চাঙ্গ সংগীত, কাউয়ালি ও জারিগান গাওয়া হয়। জুয়াসহ বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। তারা বলে থাকে, আমরা এ জন্য খুশি ও আনন্দ উপভোগ করে থাকি যে, মৃত ব্যক্তি তাঁর প্রতিপালকের সান্নিধ্যে পৌঁছেছেন। শয়তান তিনভাবে এদেরকে বিভ্রান্ত করেছে-
১. সুন্নত হচ্ছে, কেউ মারা গেলে মৃতবাড়িতে খাবার পৌঁছে দেয়া। কেননা শোকের কারণে তারা খাবার তৈরি করতে অপারগ থাকে। কিন্তু মৃতবাড়ির লোকজনই খাবার পাকিয়ে অন্যদের খাওয়ানো ও অন্যত্র পরিবেশন করা—এটা কোন্ ধরনের সুন্নত? মৃতবাড়িতে খাবার পৌঁছানোর ব্যাপারে হাদিসের ভাষ্য হচ্ছে,
'সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা বর্ণনা করেন, আমাকে জাফর ইবনে খালেদ বলেছেন, আমার পিতা আবদুল্লাহ ইবনে জাফর বলেন, জাফরের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'জাফরের পরিবারের জন্য খাবার রান্না করে পাঠাও। কেননা আজ তারা শোকের কারণে রান্না তৈরি করা থেকে অপারগ।” ইমাম তিরমিযি রহ. বলেন, হাদিসটি 'হাসান সহিহ'।
২. সুফিরা বলে থাকে, আমরা মৃত ব্যক্তির জন্য এ কারণে আনন্দ উদ্যাপন করছি যে, সে মহান আল্লাহর দরবারে মিলিত হয়েছে। অথচ এটি খুশি হওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। কেননা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারব না যে, তাকে ক্ষমা করা হয়েছে না কি হয়নি! এদিকে যদি শাস্তিতে পতিত হন তার জন্য আনন্দ উদ্যাপন করার ব্যাপারে বিবেকেরও সাড়া পাওয়া যায় না। ওমর ইবনে যর—তাঁর ছেলে মারা গেলে তিনি বলেন, আমি তোমার পরিণতির দুশ্চিন্তায় পেরেশান হতে বাধ্য হয়েছি। খারেজা ইবনে ইয়াযিদ আনসারি উম্মে আলা থেকে বর্ণনা করেন, উসমান ইবনে মাযঊন ইন্তেকাল করলে আমাদের কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরিফ আনেন। আমি সে সময় উসমানের ব্যাপারে এটুকু বলেছি যে, হে আবুস্সাইব! তোমার ওপর আল্লাহর রহমত হোক। আমি কেবল এতটুকু সাক্ষী দিচ্ছি যে, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে সম্মানিত করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে বললেন, 'তুমি কি জানো যে, আল্লাহ তায়ালা তাকে সম্মানিত করেছেন?'
৩. সুফিরা সেই ওরশ অনুষ্ঠানে নাচ-গান করতে থাকে। এমন কার্যকলাপে সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রকৃতি সীমার বাইরে চলে যায়। কেননা মানবপ্রকৃতিতে বিয়োগ ব্যাথার আলামত দৃশ্যমান হওয়ার কথা। তাও যদি মৃত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে শান্তি দান করেন, তখন। এই নাচ-গান কখনো শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গণ্য হতে পারে না। তাহলে দুঃখ পেরেশানির আলামত কোথায় যাবে?
টিকাঃ
১. সুরা ইউসুফ: আয়াত ৮৪
২. সুরা ইউসুফ: আয়াত ৮৪
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৩০৩, সহিহ মুসলিম: ২৩১৫
৪. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৪৪৬২
৫. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫৯৯৮, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৩১৭
১. [হাসান] সহিহুল জামে': হাদিস নং ১০১৫
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১২৪৩
📄 জ্ঞানান্বেষণ পরিহারে সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
গ্রন্থকার বলেন, জেনে রাখা উচিত—মানুষের জন্য শয়তানের প্রথম ফাঁদ হচ্ছে তাকে ইলম তথা জ্ঞানার্জন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। কেননা জ্ঞান আলোসদৃশ। শয়তান তার বাতি নেভাতে পারলে অন্ধকারে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই ধোঁকা দিয়ে পথভ্রষ্ট করতে পারবে। সুফিদের ওপর শয়তান এ ব্যাপারে আরও উদ্যমের সাথে এগোতে থাকে। প্রথমে তাদের বড় একটি দলকে সামগ্রিকভাবে ইলম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং তাদেরকে বোঝাতে থাকে যে, ইলম অর্জন করতে গিয়ে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করতে হয়। শয়তান তাদেরকে আরাম ভোগ্য সামগ্রীকে উত্তম হিসেবে দেখাতে থাকে। ফলে তারা ধুতি পরে ছেঁড়া বিছানায় পড়ে থাকে।
ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, অলসতার ওপর তাসাওউফের ভিত্তি। তাঁর অভিমতের ব্যাখ্যা হচ্ছে, নফসের উদ্দেশ্য হয়তো সাধনা অথবা দুনিয়া অর্জন করা। সাধনা বা সম্পদ সঞ্চয় করা ইলম অর্জনের কারণে দেরিতে অর্জিত হয়। এতে শরীর কষ্ট-ক্লেশে পতিত হয়, চাই এতে উদ্দেশ্য সাধিত হোক বা না হোক। সুফিরা সাধনাকে দ্রুত অর্জন করতে চায়। কেননা তারা দুনিয়াবিরাগীর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে থাকে।
কতেক শ্রেণির সুফি আছেন যারা আলেমবিদ্বেষী। তারা মনে করেন ইলম তথা জ্ঞানার্জনে সময় দেয়া অহেতুক ও অনর্থক। তাদের দাবি—আমাদের ইলম কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি অর্জন করা যায়। এরা জ্ঞানান্বেষণকে অসার ও অনর্থক ভেবে নেয়ার কারণে সংক্ষিপ্ত পোশাক, লেংটি আর লোটা নিয়ে বৈরাগী সেজে থাকেন।
দ্বিতীয় শ্রেণির কিছু সুফি আছেন, যারা সামান্য কিছু ইলমের ওপর তুষ্ট থেকে যান। জ্ঞানের বৃহৎ পরিসর থেকে তাঁরা বঞ্চিত হন। হাদিসের শব্দে তুষ্ট হয়ে দ্বিধায় পড়ে যান। তারা মনে করেন, হাদিসের সনদ অন্বেষণ করা এবং হাদিস শেখা ও শেখানোর ক্লাশ কায়েম করা সবই দুনিয়াবি কাজ। এতে নফস তৃপ্তি পায়।
ফাতাওয়া, কাযা ও ইমারত সবই শঙ্কার বিষয়। কিন্তু এতে ফযিলতও অনেক। কাঁটা তো সর্বদা গোলাপের সাথেই থাকে। মানুষের উচিত-উভয় জাহানের উপকারী বিষয় অন্বেষণ করা। এর ভেতর যা কিছু বালা-মসিবত আছে, তা থেকে বিরত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করা। চেষ্টা-সাধনার শক্তি ও গুণ সব মানুষের মধ্যেই আছে। তাদের সেসব ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। যেমন বিয়ের প্রতি অনুরাগ ও টান প্রকৃতিগতভাবে সবাইকে দেয়া হয়েছে। এতে সন্তান হবে। এভাবেই ইলমের মাধ্যমে দুনিয়ার নেজামকে সাজানো হয়েছে। ইয়াযিদ ইবনে হারুন বলতেন, আমি সর্বদা গাইরুল্লাহর জন্য জ্ঞান অন্বেষণ করেছি। কিন্তু সকল প্রকার জ্ঞান আল্লাহর জন্যই রয়ে গেছে। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, ইলমের মাধ্যমে আমি ইখলাসের হেদায়াত পেয়েছি। যে ব্যক্তি এটা কামনা করে যে, নফসের দ্বারা সে তার প্রকৃতিকে বিলীন করে দেবে, তা কখনো সম্ভব নয়।
তৃতীয়ত শয়তান সুফিদের একটি দলকে এমন দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে যে, তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমল। এ সব লোক এ কথা বুঝতে পারছে না যে, ইলমে লিপ্ত হওয়া সম্পূর্ণই আমলের অন্তর্ভুক্ত। আলেম যদি আমলের বেলায় অবহেলাও করে, তারপরও সে সঠিক পথ হতে বিচ্যুত হবে না। আর ইলমবিহীন আবেদ নির্ঘাত ভুল পথে পড়ে যেতে পারেন।
চতুর্থত ইবলিস এই গোষ্ঠীর মনে এ কথা ভালো ভাবেই ঢেলে দিয়েছে যে, ইলম বলা হয় যা বাতেন তথা গোপন বিষয় দ্বারা অর্জিত হয়। ফলে এদের কেউ কেউ حدثني قلبي عن ربي 'আমাকে আমার মন বলেছে আমার রব ইরশাদ করেছেন'-এমন ধারণা লালন করতেও দ্বিধা করছে না। শিবলী এই কবিতা আবৃত্তি করতেন :
اذا طالبوني بعلم الورق * برزت عليهم بعلم الخرق 'মানুষ যখন আমাকে কিতাবি ইলমের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করে, তখন আমি তাকে ডুবে যাওয়া ও কারামাতের ইলম শেখাই।'
এরা শরয়ি ইলমকে যাহেরি ইলম বলে থাকে, নফসের আপৎসঙ্কুল বিষয়াদিকে বাতেনি ইলম আখ্যা দিয়ে থাকে। প্রমাণস্বরূপ এরা বলে, হজরত হাসান ইবনে আলী রা. হজরত আলী রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
علم الباطن سر من سر الله عز وجل وحكم من أحكام الله تعالى يقذفه الله عز وجل في قلوب من يشاء من اوليائه
'বাতেন আল্লাহর গোপন ভেদসমূহের মধ্য হতে একটি রহস্য। আর আল্লাহর বিধানাবলি হতে একটি বিধান। আল্লাহ তায়ালা সেই রহস্য তাঁর ওলিদের মধ্য থেকে যাকে চান তার কাছে উন্মোচিত করে থাকেন।'
গ্রন্থকার বলেন, এ হাদিসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস বা প্রমাণ নেই। এর সনদে অবিশ্বস্ত ও অজ্ঞাত লোক রয়েছে।
আবু মুসা বলেন, একজন ফকিহ আবু ইয়াযিদের প্রতিবেশী ছিলেন। তিনি আবু ইয়াযিদের কাছে গেলে আবু ইয়াযিদ তাকে অনেক আশ্চর্যজনক ঘটনা শোনালেন। তিনি জানতে চাইলেন, এত আশ্চর্য বিষয় তুমি কী করে জানলে? প্রত্যুত্তরে আবু ইয়াযিদ বললেন, তুমি এখনও শোনোনি এমন আরও অনেক আশ্চর্য ঘটনা আমি জানি। আলেম বললেন, হে আবু ইয়াযিদ! এই জ্ঞান আপনি কী করে অর্জন করলেন? তিনি উত্তরে বললেন, আমার ইলম আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত। তুমি কি শোনোনি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'যে ব্যক্তি জানা ইলমের ওপর আমল করবে, আল্লাহ তাকে এমন ইলম দান করবেন, যা সে জানত না।' অন্যত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
العلم علمان علم ظاهر وهو حجة الله تعالى على خلقه وعلم باطن وهو العلم النافع
'ইলম দুই প্রকার। ১. প্রকাশ্য ইলম-যা মাখলুকের জন্য আল্লাহ তায়ালার দলিল। ২. গোপন ইলম-এটি উপকারী ইলম।
হে বুযুর্গ! তোমাদের ইলম তো জবানের সাহায্যে শিক্ষাপ্রাপ্ত। পক্ষান্তরে আমার ইলম আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামের মাধ্যমে প্রাপ্ত। আলেম বললেন, আমার ইলম তো বিশ্বস্ত সূত্র-পরম্পরায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে প্রাপ্ত। তিনি জিবরাঈল আলাইহিস সালাম থেকে, আর জিবরাঈল আল্লাহ হতে প্রাপ্ত। আবু ইয়াযিদ বললেন, হে বুযুর্গ! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আল্লাহ তায়ালা আরও একটি ইলম শিক্ষা দিয়েছেন, যা জিবরাঈল আলাইহিস সালাম জানেন না, মিকাঈল আলাইহিস সালামও জানেন না। আলেম বললেন, ঠিক আছে। কিন্তু আমি চাই, আপনি সঠিকভাবে আল্লাহ হতে প্রাপ্তির বিষয়টুকু আমার কাছে স্পষ্ট করুন। আবু ইয়াযিদ বললেন, হ্যাঁ, তোমাকে আমি ওই পরিমাণ বয়ান করতে পারি, যে পরিমাণ মারেফাত তুমি রপ্ত করতে পেরেছ। আচ্ছা, তুমি কি জানো যে, আল্লাহ তায়ালা মুসা আলাইহিস সালাম এর সাথে শুধু কথা বলেছেন, কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সরাসরি সামনাসামনি কথা বলেছেন। কোনো ধরনের পর্দা ছাড়াই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে দেখেছেন। আর নবীরা ওহি দ্বারা বিধান আরোপ করে থাকেন।
আলেম উত্তরে বললেন, সঠিক বলেছেন। এরপর আবু ইয়াযিদ বললেন, তুমি কি জানো যে, সিদ্দিকীন ও ওলিদের কথা আল্লাহর ইলহামের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে প্রজ্ঞাপূর্ণ জবান দান করেন। উম্মতকে তাদের দ্বারা উপকৃত করে থাকেন। মুসা আলাইহিস সালাম এর মায়ের মনে, খিযির আলাইহিস সালাম এর নৌকা ভেঙ্গে ফেলা, দেয়াল উপড়ে দেয়া এ সবই ইলহামের মাধ্যমে হয়েছে। অনুরূপভাবে ওমর রা. এর 'হে সারিয়া! পাহাড়ের দিকে তাকাও!'-এ সবই ইলহামের অন্তর্ভুক্ত।
ইবরাহিম বলেন, আমি আবু ইয়াযিদের মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। লোকজন বলাবলি করছিল, অমুক অমুক থেকে হাদিস শুনেছে, অমুক এটা- ওটা বর্ণনা করেছে ইত্যাদি। আবু ইয়াযিদ এ সব শুনে বললেন, হে দোস্তরা! তোমরা মৃত মানুষের কাছ থেকে মৃতদের জন্য ইলম নিয়ে এসেছ। আর আমি এনেছি মহাচিরঞ্জীব আল্লাহর কাছ থেকে।
গ্রন্থকার বলেন, প্রথম ঘটনায় আবু ইয়াযিদ ফিকাহ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, তা ছিল তার স্বল্পজ্ঞানের পরিচায়ক। কেননা তিনি যদি আলেম হতেন, তাহলে অবশ্যই জানতেন-কোনো বিষয়ের ইলহাম হওয়া কখনোই ইলম-পরিপন্থী হতে পারে না। ইলমকে ডিঙিয়ে ইলহামের কাছে যাওয়া যায় না। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
'নিশ্চয় বিভিন্ন নবীর উম্মতে মুহাদ্দিসিন ছিলেন। আর আমার মুহাদ্দিস হচ্ছে ওমর।'
মুহাদ্দিস দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, ভালো বিষয়ের ইলহাম হওয়া। কিন্তু ইলহামওয়ালার কাছে যদি ইলমের বিপরীত কোনো ইলহাম আসে, তাহলে তার ওপর আমল করা জায়েয নেই। হজরত খিযির আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলা হয়, তিনি নবী ছিলেন। এ কথাকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, নবীদেরকে ওহির মাধ্যমে বিভিন্ন পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়। এটা ইলম ও তাকওয়ার ফলাফল। তাকওয়াবান ব্যক্তিকে ভালো কাজের তাওফিক দেয়া হয় এবং 'রুশদ' এর ইলহাম করা হয়। সুফিরা যে দাবি করে আসছে, আলেমরা মৃতের কাছ থেকে মৃতের ইলম অন্বেষণ করেছে। এমন দাবিদারের জানা নেই—কত বড় দাম্ভিকতাপূর্ণ কথা বলে ফেলেছে। এটা সরাসরি শরিয়তের ওপর আঘাত করার নামান্তর।
টিকাঃ
১. [মাউযূ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ৩৭২৪
২. [মাউযূ] আসিলসিলাতুয যাঈফাহ: হাদিস নং ৪২২
৩. [যঈফ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ৩৮৭৮
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৬৮৯, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৩৯৮
📄 শরিয়ত ও হাকিকতের ব্যাপারে সুফিদের মতবাদ
অনেক সুফি শরিয়ত ও হাকিকতের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে বেড়ায়। অথচ এমন কথা কেবল এদের অসার দাবি। কেননা শরিয়তের সবকিছুই হাকিকত। এ কথা দ্বারা তারা যদি কোনো ধরনের বিশেষত্ব বা হাড়ের আশ্রয় নেয়, তাহলে তাও শরিয়তের আওতাভুক্ত হতে হবে।
গ্রন্থকার বলেন, ইমাম আবু হামেদ গাযালি রহ. তাঁর এহইয়াউল উলূম গ্রন্থে লিখেছেন, যে ব্যক্তি এমন বলবে যে, হাকিকত শরিয়তের বিপরীত অথবা বাতেন জাহেরের বিপরীত, তাহলে সে ঈমান থেকে দূরে সরে কুফরের নিকটবর্তী হয়ে যাবে।
ইবনে আকিল বলেন, সুফিরা শরিয়তকে হাকিকতের একটি শাখা মনে করে থাকে। তিনি বলেন, এটা খুবই গর্হিত কথা। কেননা আল্লাহ তায়ালা শরিয়তকে সৃষ্টির উপকার এবং ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এখন যদি -কেউ হাকিকত দ্বারা মনে করে যে, শরিয়ত কিছু নয়, তাহলে এটা নির্ঘাত শয়তানের ধোঁকা বলে মানতে হবে। যে ব্যক্তি শরিয়ত ছেড়ে হাকিকতের পেছনে পড়ে, শয়তান তাকে নিয়ে খেলা করে এবং ধোঁকা দেয়।