📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সফর ও সাধনারকালে সুফিদের শরিয়তবিরোধী কার্যকলাপ

📄 সফর ও সাধনারকালে সুফিদের শরিয়তবিরোধী কার্যকলাপ


সুফি আবু হামযা বলেন, আমি তাওয়াক্কুলের ওপর নির্ভর করে একটি সফর করেছিলাম। এক রাতে আমি হাঁটছিলাম, তখন আমার দু'চোখ ছিল তন্দ্রাচ্ছন্ন। হঠাৎ একটি কূপে পড়ে গেলাম। আমি নিজেকে তখন কূপের অভ্যন্তরে আবিষ্কার করলাম। এখান থেকে বের হতে পারছিলাম না, কেননা তার পার্শ্ব ছিল বহু উঁচু। অতএব সেখানে আমি বসে পড়লাম। এভাবে বসেই ছিলাম অনেকক্ষণ। হঠাৎ দেখি কূপের উপরে দু'ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে। একজন আরেকজনকে বলছে, চলো, আমরা মুসলমানদের জন্য কূপটি ছেড়ে দিই। অপরজন বলল, তারপর কী করবে? আমি মনে মনে ভাবলাম, চিৎকার দিয়ে বলব, আমি কূপের ভেতরে আটকা পড়েছি। আওয়াজ এলো, তুমি আমার ওপর ভরসা করেছ আবার আমার দেয়া বিপদের ব্যাপারে অন্যের কাছে ফরিয়াদ করছ? সুতরাং আমি চুপ হয়ে গেলাম। ওই দুই ব্যাক্তি চলে গেল। এরপর আবার ফিরে এলো এবং একটি ঢাকনা দিয়ে কূপের মুখ আটকে দিল। আমাকে আমার মন বলছে, কূপের মুখ তো নিরাপদ হয়েছে কিন্তু তুমি এখন এখানে বন্দি। আমি রাত-দিন এখানে সমান দেখছিলাম। পরের দিন কেউ একজন আমাকে শব্দ করে ডাকল। কিন্তু তাকে আমি চোখে দেখছিলাম না। সে আমাকে শক্তহাতে ধরতে বলল। আমি আমার হাত বাড়ালাম। এতে একটি কঠিন বস্তু পড়ে গেল। আমি তা ধরলাম। সে আমাকে উপরে উঠিয়ে মাটিতে নিক্ষেপ করল। আমি ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, এটি একটি হিংস্র প্রাণী। এমতাবস্থায় একটি গায়েবি আওয়াজ এলো যে, হে আবু হামযা! আমি তোমাকে বিপদ দ্বারা বিপদ থেকে উদ্ধার করেছি এবং ভয়ংকর স্থান হতে ভয়ংকর স্থানে নিক্ষেপ করেছি।

ইবনে মালেকী বর্ণনা করেন যে, আবু হামযা খোরাসানি বলেন, আমি এক বছর হজের সফরে রাস্তায় হাঁটছিলাম। হঠাৎ একাকী একটি কূপে পতিত হলে মন আমার সাথে খুব বিরোধিতা করল। মন বলল, ফরিয়াদ করো। আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো ফরিয়াদ করব না। আমি আমার ইচ্ছা পূরণ করিনি। কূপের মুখে দু'ব্যক্তি এসে একে অন্যকে বলল, এসো এ রাস্তার কূপটির মুখ বন্ধ করে দিই। তারা তখন কুঠার ও খুঁটি নিল। আমি কিছু বলার ইচ্ছে করলে মন বলল, তাকে বলো যে ওই দুই ব্যক্তির চেয়ে তোমার নিকটবর্তী। (অর্থাৎ তাওয়াক্কুল করো)। আমি চুপ হয়ে গেলাম। একসময় তারা কূপের মুখ বন্ধ করে চলে গেল। পরে হঠাৎ কে একজন এসে কূপের মুখ খুলে তার উভয় পা ঝুলিয়ে রাখল। যেন সে বলছে আমাকে ধরো। আমি তার ওপর ঝুলে রইলাম। সে আমাকে ভেতর থেকে বাইরে নিয়ে গেল। পরে দেখলাম, এটি একটি হিংস্র প্রাণী। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি আমাকে চিৎকার দিয়ে বলল, হে আবু হামযা! এটা কি উত্তম নয়? আমি ভয়ংকর বস্তু দিয়ে ভয়ংকর স্থান থেকে তোমাকে হেফাজত করেছি!

আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে নাঈম সুফি আবু হামযা দামেস্কীর ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, তিনি কূপ থেকে বেরিয়ে কয়েক ছত্র কবিতা আবৃত্তি করেন। যথা-
نهائي حيائي منك أن أكشف الهوى * فأغنيتني بالقرب منك عن الكشف ترأيت لي بالغيب حتى كأنني * تبشرني بالغيب إنك في الكف
أراك وبي من هيبتي لك وحشة * وتؤنسني بالعطف منك باللطف وتحييء محبا أنت فى الحب حتفه * وذا عجب كون الحياة مع الحتف
"আমার ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতে লজ্জা হচ্ছে। তোমার নৈকট্যের কারণে এই ভালোবাসা প্রকাশ করার আর প্রয়োজন নেই। অদৃশ্যে আমার এমন অনুভব হয়েছে, যেন অদৃশ্য থেকে আমার জন্য সুসংবাদ আসছে, যা আমি এখনই প্রত্যক্ষ করলাম। আমি তোমাকে দেখছি, তোমার শাস্তির ভয়াবহতায় আমি ভীত হয়ে পড়েছি। আর তুমি আমাকে দয়া ও করুণা দ্বারা নির্ভার করছ। সেই আশেককে পুনরুজ্জীবন দান করো, যাকে ভালোবাসায় ধ্বংস করো। এটা বড় আশ্চর্যের বিষয় যে, ধ্বংসের সাথেই জীবনের বসবাস।"

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, কূপে পড়ে যাওয়ার ব্যাপারে আবু হামযা সম্পর্কে ঘটনার বিভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়। আবু আবদুর রহমান সুলামী বলেন, আবু হামযা খোরাসানের অধিবাসী। যিনি জুনাইদ বাগদাদি রহ. এর সময়কালের এবং তাঁর নাম মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহিম। তাঁর কথা খতিবে বাগদাদি তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তাঁর উপরোক্ত ঘটনার কথাও উল্লেখ করেছেন। যাক, তিনি যে-ই হোন না কেন তিনি শরিয়তবিরোধী কাজ তথা কূপে পতিত অবস্থায় চুপ থেকে ভুল করেছেন। অথচ চিৎকার দেয়া এবং কূপের এই বিপদ থেকে দূরে থাকা তার জন্য ওয়াজিব ছিল। যেমন কেউ যদি তাকে খুন করতে চায়, তবে তার জন্য বাধা দেয়া ওয়াজিব। অন্যথায় 'আমি ফরিয়াদ করব না'- এমন বলা ওই উপমা বহন করে যেমন কেউ বলল, আমি খাবার খাব না, পানি পান করব না। অথচ যে ব্যক্তি এমন কর্মকাণ্ড করবে সে জাহেল তথা অজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত হবে। এসব কর্মকাণ্ড সৃষ্টির সচরাচর নিয়মবহির্ভূত। কেননা আল্লাহ তায়ালা বস্তুজগৎকে একটি প্রকৃতি ও নিয়মানুসারে পরিচালনা করছেন। মানুষকে স্পর্শ করার জন্য হাত দিয়েছেন, যাতে সে বাধা দিতে পারে। কথা বলার জন্য মুখ দিয়েছেন, বিবেক-বুদ্ধি দিয়েছেন, যাতে সে বিপৎসঙ্কুল পরিস্থিতিতে পথ দেখাতে পারে। মানুষের উপকারে ঔষধপত্র ও খাদ্যসামগ্রী সৃষ্টি করেছেন।

এখন যে ব্যক্তি তাদের জন্য সৃষ্টিকৃত বস্তু ব্যবহার করা থেকে বিমুখ হবে, তাহলে সে শরয়ি বিধানকে ছেড়ে দিয়েছে বলে বিবেচিত হবে। কেননা সে সৃষ্টিকর্তার হেকমতের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছে। কোনো অজ্ঞ ব্যক্তি যদি আল্লাহর 'কাযা' ও 'কদর' থেকে বিমুখ হয়, আমরা তার উত্তরে বলব কেন বিমুখ হবেন? অথচ আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন:
خُذُوا حِذْرَكُمْ
'তোমরা তোমাদের সতর্কতা অবলম্বন করো।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সুরাকাকে বলেছিলেন, আমার অবস্থান গোপন রাখবে। তিনি মদিনায় যাওয়ার জন্য একজন পথপ্রদর্শক ভাড়া করেছিলেন। তিনি এমন বলেননি যে, আমি তাওয়াক্কুল করে চলতে থাকব। সর্বদা তিনি প্রকাশ্যে আসবাব তথা বস্তুর দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন এবং অন্তরে বস্তুর সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করেছেন। এ সম্পর্কে বিশদ বিবরণ আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি।

আবু হামযার কথা 'আমাকে আমার মন বলছে' এটা নিছক অজ্ঞতাজনিত কথা। এই অজ্ঞতা দ্বারা সে বুঝে নিয়েছে যে, এটা তাওয়াক্কুলের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং সে আসবাব তথা উপায়-উপকরণ ছেড়ে দিল। অথচ শরিয়ত এমন কাজের নির্দেশ দেয়নি। এছাড়া আবু হামযার কাছে যখন শক্ত কিছু ধরার বিষয় সামনে এলো তখন সে কেন তা না ধরে তাওয়াক্কুল করেনি? এটাও তো আসবাব ছেড়ে দেয়ার পরিপন্থী কাজ-যে দাবি সে করে এসেছিল। আবু হামযা ভেতরে বসে থাকেনি কেন, সে তো আসবাব ছাড়া উপরে ওঠে যেতে পারত। অতএব এটি নিন্দনীয় কাজ। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার ওপর সর্বদা ইহসান করে থাকেন। আমরা কেবল শরিয়তবিরোধী কাজের বিরোধিতা করছি।

জুনাইদ রহ. বলেন, আমাকে মুহাম্মাদ ইবনে সামীন বর্ণনা করেছেন, আমি কুফায় আমাদের নিকটবর্তী একটি মাঠের পাশে অবস্থিত রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। সেই রাস্তা দিয়ে কেউ চলাফেরা করত না। রাস্তার গোড়ায় আমি একটি মৃত উট দেখতে পেলাম, যাকে ৮-৯টি হিংস্র হায়েনা টেনে-টুনে খাচ্ছে। হায়েনারা পরস্পর একে অপরকে হামলাও করছে। এমন পরিস্থিতি দেখে আমি ভীষণ ঘাবড়ে গেলাম। কেননা এগুলো সব রাস্তার গোড়াতেই অবস্থান করছে। আমার মন আমাকে বলল, ডানে-বাঁয়ে কোথাও ঢুকে বেরিয়ে যাও। কিন্তু আমি মনের কথা শুনলাম না। হায়েনাদের ভেতর দিয়েই চলে গেলাম। পরে মনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে বলছে, এখন দেখো কী অবস্থা হয়! ভয় আমাকে সেখান থেকে সরে যেতে বললেও আমি তা অস্বীকার করে হায়েনাদের মাঝেই বসে গেলাম। তখনও আমি মনকে ভীষণ ভীত পেলাম। কিন্তু আমি উঠতে অস্বীকার করে সেখানেই শুয়ে পড়লাম। এমতাবস্থায় নিদ্রা আমাকে পেয়ে বসলে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। এভাবে কিছুক্ষণ আমি শুয়ে থাকি। জেগে দেখি হায়েনারা চলে গেছে। তাদের কেউ আর সেখানে নেই। এ ক্ষণে আমার ভয়ও দূরীভূত হলো এবং আমি আমার পথ চলতে শুরু করলাম।

গ্রন্থকার বলেন, উপর্যুক্ত ব্যক্তি হায়েনার ভয় থাকা সত্ত্বেও সেখানে গিয়ে বসে পড়া এবং শুয়ে পড়া সম্পূর্ণ শরিয়তবিরোধী কাজ। স্বেচ্ছায় কারও জন্য হিংস্র প্রাণী বা সাপের কাছে যাওয়া জায়েয নয়; বরং তার থেকে পলায়ন করা ওয়াজিব। বুখারি ও মুসলিমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِذَا وَقَعَ الطَّاعُونُ بِأَرْضِ وَأَنْتُمْ بِهَا، فَلَا تَقْدَمُوا عَلَيْهِ 'কোনো শহরে ভাইরাসজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সেখানে যাবে না।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, “বসন্ত রোগীর কাছ থেকে এমনভাবে পলায়ন করো, যেভাবে বাঘ থেকে তোমরা পলায়ন করে থাকো।"

অনুরূপভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেলে পড়া একটি দেয়ালের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় “দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়েছিলেন।”

উপরের ঘটনায় উল্লেখিত ব্যক্তি তার স্বাভাবিক অভ্যাস ও প্রকৃতিকে ভীত হতে বারণ করে। অথচ এটা এমন একটি বিষয় যেখানে হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এর মতো নবীও অবিচল থাকতে পারেননি। কেননা তিনি যখন হাতের লাঠিকে সাপের আকৃতিতে দেখতে পান, তৎক্ষণাৎ তিনি পেছনে সরে আসেন। আলোচ্য ব্যক্তির কথা ঠিক হলেও বিশুদ্ধ নয়। কেননা মানুষের অভ্যাস ও প্রকৃতি সমান। যে ব্যক্তি বলে যে, আমি অভ্যাসগতভাবে হিংস্র প্রাণীকে ভয় পাই না, তাহলে আমরা তাকে মিথ্যুক হিসেবে আখ্যায়িত করব। যেমন কেউ যদি বলে, আমি ভালো বস্তু আগ্রহভরে দেখি না, তাহলে সে যেন নিজের ওপরই ক্রোধান্বিত হলো। নিজের মনগড়া বিবেচনায় ধ্বংসের মুখে নিজেকে ঠেলে দেয়াকে তাওয়াক্কুল ভেবেছে। অথচ এটা নিছক মনগড়া খেয়ালিপনা। এটা যদি তাওয়াক্কুল হতো, তাহলে ক্ষতিকারক বস্তুর কাছে যাওয়া থেকে বাধা দেয়া হতো না। আলোচ্য ব্যক্তির অক্ষত থাকার ব্যাপারে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা হায়েনারা মৃত উট ভক্ষণের কাজে লিপ্ত ছিল। তার প্রতি হয়তো তারা লক্ষ করেনি। কেননা আবু তোরাব নাখশি নামীয় একজন খ্যাতিমান সুফি ছিলেন—যাকে বনের হিংস্র প্রাণীরা একা পেয়ে আক্রমণ করে বসে এবং তাকে খেয়ে ফেলে। এভাবে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তথাপি এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আলোচ্য ব্যক্তির ওপর আল্লাহ তায়ালা দয়া ও অনুগ্রহ করেছেন। তাকে উত্তম ধারণার কারণে মুক্তি দিয়েছেন। আমরা কেবল এহেন কর্মকাণ্ডের ভ্রান্তি ও ক্ষতি সম্পর্কে আলোচনা করছি। সাধারণ মানুষ তার এমন কর্মকাণ্ডের ঘটনা শুনে তাকে বীর ও অতি সাহসী ভেবে থাকবে। উক্ত ব্যক্তির অবস্থাকে কখনো-বা হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এর ঘটনা থেকেও চিত্তাকর্ষক হিসেবে মনে করবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থা থেকেও তাকে অগ্রগামী মনে করার স্পর্ধা দেখাতে পারে, যিনি হেলে পড়া দেয়ালের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে দ্রুতবেগে হেঁটেছিলেন। এভাবে তারা হজরত আবু বকর রা. এর অবস্থা থেকেও তাকে অগ্রগামী মনে করতে থাকবে, যিনি ক্ষতিকর বস্তু থেকে নিরাপদে থাকতে পাহাড়ের গুহার ছিদ্র বন্ধ করেছিলেন। অথচ আলোচ্য ব্যক্তির ভ্রান্ত ধারণামতে, তার কর্মকাণ্ডকে তাওয়াক্কুলের অন্তর্ভুক্ত ভেবে থাকলেও তা কখনো আম্বিয়ায়ে কেরাম ও সিদ্দিকিনের মর্যাদার সমকক্ষ হতে পারবে না।

মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ফারাগানি বলেন, আমি মুয়াম্মিল মুগাবি থেকে শুনেছি, তিনি বলতেন, আমি ছিলাম মুহাম্মাদ ইবনে সামীনের সমসাময়িক। তার সাথে তিকরিত ও মসুলের মধ্যবর্তী স্থানের সফর করতাম। একবার জঙ্গলের পাশ দিয়ে যেতে থাকলে একটি বাঘ দেখে আমি ভীষণ ঘাবড়ে পড়েছিলাম। আমার চেহারায় ভীতির আলামত দেখা গেলেও আমি সম্মুখে এগোবার ইচ্ছা পোষণ করি। মুহাম্মাদ ইবনে সামিন আমার গায়ে হাত দিয়ে বললেন, হে মুয়াম্মিল! এখানেই তাওয়াক্কুলের পরীক্ষা।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, নিঃসন্দেহে ভরসাকারীদের ওপর তাওয়াক্কুলের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় বিপদ-আপদের সময়। কিন্তু তাওয়াক্কুলের শর্তসমূহের মধ্যে নিজেকে বাঘের মুখে ঠেলে দেয়ার কোনো কথা নেই। কেননা এটা অবৈধ।

খাওয়াস বলেন, আমাকে কয়েকজন বুযুগ বলেছেন, আলী রাযীকে কেউ বললেন, আমি আপনাকে আবু তালেব জ্বরজানির সাথে দেখি না কেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, একবার আমরা উভয়ে এমন এক স্থানে উপস্থিত ছিলাম, যেখানে ছিল হিংস্র প্রাণীদের বসবাস। আবু তালেব আমাকে নিদ্রা আসছে না দেখে বললেন, আজকের পর তুমি আমার কাছে আসবে না।

গ্রন্থকার বলেন, তিনি তাঁর সাহচর্যের ব্যাপারে অতিরঞ্জন করেছেন। কেননা তিনি তার কাছে এমন বিষয় সন্ধান করেছেন যা তার আয়ত্তাধীন নয়। শরিয়তও তাকে এ বিষয়ে জবরদস্তি করেনি। (অর্থাৎ হিংস্র প্রাণীদের কাছে কেন তার নিদ্রা এলো না?) হজরত মুসা আলাইহিস সালামও এমন অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি, যখন তিনি সাপ দেখে পালাচ্ছিলেন। সুতরাং এ ক্ষেত্রে তাকে এমন নির্দেশ দেয়া অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়।

আহমদ ইবনে আলী ওয়াজদি বলেন, দিনুরি নামীয় এক ব্যক্তি খালি পা ও খালি মাথায় বারো (১২) বার হজ করছেন। পায়ে কোনো কাঁটা বিধলে জমিনে পা হেঁচড়াতেন এবং এভাবে হাঁটতে থাকতেন। কাঁটা বের করার জন্য জমিনের দিকে ঝুঁকতেন না, যাতে তার তাওয়াক্কুল বিশুদ্ধ থাকে।

গ্রন্থকার বলেন, চিন্তা করে দেখুন। অজ্ঞদের সাথে অজ্ঞতা কী ধরনের ব্যবহার করে থাকে। খালি পায়ে বন-জঙ্গলে হাঁটাচলা করে কখনো আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য হতে পারে না। কেননা এতে মনে-প্রাণে ভীষণ কষ্ট অনুভূত হয়। অনুরূপভাবে খোলা মাথায় সফর করাতেও কোনো বিশেষত্ব ও ফজিলত নেই। এ দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয় না। যদি ইহরামের সময় খালি মাথায় থাকার নির্দেশ না থাকত তাহলে মাথা খোলা রাখা অর্থহীন হিসেবে বিবেচিত হতো। ওই ব্যক্তিকে কে নির্দেশ দিল যে, নিজের পা থেকে কাঁটা তুলবে না। এটা কী ধরনের আনুগত্য? কাঁটাবিদ্ধ হওয়ার ফলে যখন সে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ভুগতে থাকে তখন তা না তুলে জমিনে হেঁচড়ানোর কী অর্থ? জমিনে হেঁচড়ানোর ফলেই তো তার কষ্ট কিছুটা কম অনুভূত হয়। এতে কি তার তাওয়াক্কুলে বিঘ্ন ঘটে না? তাওয়াক্কুলর সাথে এসব বিবেকবর্জিত ও শরিয়তবিরোধী কার্যক্রমের কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা বিবেক ও শরিয়তের চাহিদা হচ্ছে নিজেকে উপকার পৌঁছানো এবং কষ্টদায়ক ও ক্ষতিকারক বিষয় থেকে দূরে রাখা। স্বয়ং শরিয়ত এই নির্দেশ প্রদান করে যে, ইহরাম বাঁধলে যদি কারও কষ্ট অনুভূত হয় তাহলে ইহরামে নিষিদ্ধ বস্তু ভেঙ্গে দেবে এবং ফিদিয়া প্রদান করবে। আব্বাস ইবনে মুহাম্মাদ বলেন, আমি আবু উবায়দা থেকে শুনেছি, তিনি বলতেন, মানুষের বৃদ্ধিতে এটা তো কাজ করে যে, সে রৌদ্র ছেড়ে ছায়ার নিচ দিয়ে চলাচল করবে।

আবু আলী রোয়বারি আবু বকর দাক্কাক থেকে বর্ণনা করেন, আমি আরবের একটি পরিবারে মেহমান হয়েছিলাম। সেখানে আমি একজন সুন্দরী মেয়ে দেখতে পাই। তার দিকে তাকানোর অপরাধে আমি আমার চক্ষু উপড়ে ফেলি।

গ্রন্থকার বলেন, দেখুন, এ ব্যক্তির অজ্ঞতা কেমন। এহেন কর্মকাণ্ডের সাথে শরিয়ত বা ইবাদতের কোনো সম্পর্কই নেই। কেননা সে যদি ওই মেয়ের দিকে অনিচ্ছাকৃতভাবে তাকিয়ে থাকে, তাহলে এতে তার গুনাহ হবে না। আর যদি ইচ্ছে করে দেখে থাকে, তাহলে তার সগিরা গুনাহ হবে। যার জন্য লজ্জাবোধই যথেষ্ট। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে নিজের চক্ষু উপড়ে ফেলে একটি কবিরা গুনাহে পতিত হলো। এ অপরাধে সে তাওবাও করল না। কেননা সে ভেবে রেখেছে, এ দ্বারা সে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারবে। এদিকে যে ব্যক্তি নিষিদ্ধ বিষয়কে আল্লাহর নৈকট্যের কারণ হিসেবে মনে করবে, তার অন্যায়ের কোনো সীমারেখা থাকবে না। হয়তো সে এমন ঘটনা বনি ইসরাইলের জনৈক ব্যক্তির সম্পর্কে শুনেছে। বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তি মহিলার দিকে দৃষ্টি দিলে সে নিজের চক্ষু উপড়ে ফেলে। এটা তৎকালীন যুগে হয়তো সঠিক ছিল এবং তাদের শরিয়তে তা ছিল বৈধ। পক্ষান্তরে আমাদের শরিয়তে এটাকে অবৈধ ও হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। এই সুফি গোষ্ঠী নিজেরাই একটি শরিয়ত নির্মাণ করে তার নাম রেখেছে তাসাওউফ। ফলে শরিয়তে মুহাম্মদি তারা ছেড়ে দেয়।

অনেক সুফি মহিলার পক্ষ থেকেও এ ধরনের ঘটনা শোনা যায়। শুয়ানা বলেন, আমাদের প্রতিবেশী একজন নেককার মহিলা ছিলেন। একদিন সে বাজারে গেলে এক ব্যক্তি তাকে দেখে উৎসাহী হলো এবং তার পিছু পিছু তার ঘর পর্যন্ত এলো। মহিলা তাকে বলল, হে লোক! আপনি আমার কাছে কী চান? সে বলল, আমি আপনার প্রেমে পড়ে গিয়েছি। মহিলা বলল, আপনি আমার কী পছন্দ করেন? সে বলল, আপনার নয়নযুগল বেশ সুন্দর। মহিলা ঘরে গিয়ে নিজের চক্ষু উপড়ে ফেলল এবং দরজার কাছে এসে ওই লোকের সম্মুখে নিক্ষেপ করল। বলল, নিয়ে যান এই চক্ষু। আল্লাহ এতে আপনাকে বরকত দিবেন না।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, আমার ভাইয়েরা! দেখুন। শয়তান জাহেলদের সাথে কীভাবে খেলা করে! এই লোক তো মহিলাকে দেখে সগিরা গুনাহে পতিত হয়েছিল, কিন্তু মহিলা এর ফলে কবিরা গুনাহে লিপ্ত হলো। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, সে এটাকে ইবাদত মনে করেছিল। এছাড়াও তার উচিত ছিল, বেগানা পুরুষের সাথে কথা না বলা। অথচ কোনো কোনো সুফি এর বিপরীত করে থাকেন।

যুনুন বলেন, জঙ্গলে এক মহিলার সাথে আমার দেখা হলে আমি তাকে ডাকলাম। সে আমার কথা শুনে বলল, কোনো পুরুষের জন্য বেগানা নারীকে আহ্বান করা বৈধ নয়। আমি যদি তোমার হীন বুদ্ধি সম্পর্কে অবগত না হতাম, তাহলে তোমাকে আঘাত করতাম।

ইসমাঈল ইবনে নাজীদ বলেন, আমি ইবরাহিম হারভী সাবতিয়ার সাথে কোনো এক সফরে সঙ্গী ছিলাম। সাবতিয়া তাকে বলল, জাগতিক বস্তুসামগ্রীর মধ্যে যা কিছু তোমার কাছে আছে তা ফেলে দাও। ইবরাহিম বলেন, আমি সবকিছু ফেলে দিলাম এবং এক দিনার রেখে দিলাম। কয়েক কদম এগোনোর পর তিনি আবার বললেন, দুনিয়াবি সবকিছু ফেলে দাও এবং আমার বাতেনকে কলঙ্কিত কোরো না। আমি দিনারটি বের করে তাকে দিলে তিনি তা ফেলে দিলেন। আরও কয়েক কদম এগোনোর পর আবার বললেন, তোমার কাছে যা আছে তা ফেলে দাও। আমি বললাম, আমার কাছে আর কিছু নেই। তিনি বললেন, এখনও আমার বাতেন কলঙ্কিত। হঠাৎ আমার স্মরণ এলো যে, আমার কাছে তাবিজের পাত্র আছে। তিনি আমার কাছ থেকে সেটি নিয়ে ফেলে দিয়ে বললেন, এখন চলো। আমরা উভয়ে চললাম। রাস্তায় আমার সেই তাবিজের পাত্র এর প্রয়োজন দেখা দিলে জঙ্গলের ভেতর আমার সামনে সেটা পেয়ে গেলাম। সাবতিয়া আমাকে বললেন, দেখো—যে আল্লাহর সাথে সত্যের ব্যবহার করে, আল্লাহ তায়ালা তার সাথে তেমনই ব্যবহার করে থাকেন।

গ্রন্থকার বলেন, এসব কর্মকাণ্ড ভুল এবং সম্পদ নিক্ষেপ করা হারাম। ওই ব্যক্তির ওপর আশ্চর্য লাগে, যে তার নিজের মালিকানাধীন বস্তু ফেলে দেয়। এবং এমন বস্তু গ্রহণ করে যার সে মালিক নয়, জানাও নেই এটা কোথা থেকে এসেছে।

আলী ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মিসরির কাছ থেকে আমি শুনেছি, তিনি বলেন, আমাকে আবু সাঈদ খায্যায় বলেছেন, আমি একবার কোনো ধরনের সফর-সামগ্রী ছাড়া জঙ্গলে প্রবেশ করলে আমার প্রচণ্ড ক্ষুধা পায়। দূর থেকে আমি আমার গন্তব্য দেখতে পেয়ে বেশ খুশি হলাম। পরে ভাবলাম, এটা আমি ঠিক করিনি। আমি গায়রুল্লাহর ওপর ভরসা করে ফেলেছি। ফলে আমি শপথ করে নিলাম যে, কারও প্রয়োজন ছাড়া আমি আমার গন্তব্যে যাব না। আমি সেখানে ধারালো বস্তু দিয়ে একটি গর্ত খুঁড়ে ফেললাম এবং নিজেকে সিনা পর্যন্ত সেখানে ঢেকে রাখলাম। অর্ধরাত অতিবাহিত হলে আমি একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম। কে যেন বলছে, হে গ্রামবাসী, তোমাদের পাশে এই জঙ্গলে আল্লাহর একজন অলী নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে, তোমরা তার খবর নাও। তারপর গ্রাম থেকে কিছু লোক এসে আমাকে গ্রামে নিয়ে গেল।

গ্রন্থকার বলেন, এই লোক নিজের স্বাভাবিক চাহিদা ও প্রকৃতির ওপর জুলুম করেছেন। কেননা সে এমন বিষয় চেয়েছে, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি। কেননা মানুষের জন্য তার প্রয়োজনীয় বিষয়ের দিকে আকর্ষণাত্মক প্রকৃতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে। পিপাসার্ত অবস্থায় পানির দিকে যাওয়া এবং ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাবারের দিকে যাওয়া কখনো আপত্তিজনক বিষয় হতে পারে না। তাই প্রয়োজনীয় বিষয়ের দিকে ধাবিত হওয়া স্বাভাবিক। হাদিসে আছে,
“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফর থেকে আসতেন এবং মদিনা দেখা যেত, তখন ঘরের টানে তিনি দ্রুত হাঁটতেন।”

অন্যত্র বর্ণিত আছে:
“মক্কা থেকে ফেরার সময় মাতৃভূমির টানে তিনি বারবার মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মক্কার দিকে দেখতেন।”

হজরত বেলাল রা. বলতেন, উতবা ও শাইবার ওপর আল্লাহর লা'নত পতিত হোক। সে আমাকে মক্কা থেকে বিতাড়ন করে দিয়েছে। তিনি তখন নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতেন :
ألا ليت شعري هل أبيتن ليلة * بواد وحولي إذخر وجليل
“ইস যদি এমন হতো! যদি এমন কোনো রজনি আসত, যখন আমি মক্কায় থাকতাম এবং আমার পিঠ সেখানের ঘাসের ওপর থাকত।”

এমতাবস্থায় যে ব্যক্তি জ্ঞান ও বুদ্ধির বিষয় থেকে বিমুখ হবে তাকেও আল্লাহ রক্ষা করবেন। তথাপি সে জামাতে নামায পড়া ছেড়ে দেয়ায় নিকৃষ্ট পাপে পতিত হলো। এমন কর্মকাণ্ডে কি আল্লাহর নৈকট্য লাভ হতে পারে? এটা তো কেবল অজ্ঞতা।

বকর ইবনে মুহাম্মাদ বলেন, আমি আবুল খায়ের নিশাপুরির পাশে ছিলাম। সে নির্দ্বিধায় আমার সাথে কথাবার্তা বলছিল। তিনি তার শুরুর জীবনের আলোচনা করলে আমি তাকে হাত কাটার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে তিনি বললেন, সে অন্যায় করেছে, তাই তা কেটে ফেলা হয়েছে। পরে আমি কিছু মানুষ নিয়ে তার কাছে গেলাম। তখন তারা তার হাত কাটার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমি একবার সফরে গিয়েছিলাম। এস্কান্দরিয়া পৌঁছে সেখানে বারো (১২) বছর কাটিয়েছি। সেখানে আমি একটি ঝুপড়ি বানিয়ে রাত কাটাতাম এবং গ্রামবাসীর শিকারকৃত বস্তু দ্বারা ইফতার করতাম। তাদের দস্তরখানার অবশিষ্টাংশ কুকুর থেকে কেড়ে নিয়ে খেয়ে নিতাম। তখন আমার বাতেন অন্তর আমাকে আওয়াজ দিয়ে বলল, হে আবুল খায়ের! তোমার মনোবাসনা হচ্ছে, মাখলুককে তার রুজির ব্যাপারে কষ্ট দেয়া যায় না। তাওয়াক্কুল করে সফর করবে। অথচ তুমি মানুষের মাঝে অবস্থান করছ। আমি আরয করলাম, হে আমার মাবুদ! তোমার ইজ্জতের শপথ! আমি আমার হাত ওই বস্তুর প্রতি হাত বাড়াব না, যা মাটি হতে উৎপন্ন হয়েছে। এভাবে এমন স্থান হতে আমার কাছে রিজিক পৌঁছানো হয়, যার কল্পনাও আমি করিনি। বারোদিন পর্যন্ত আমি কেবল ফরয আদায় করতাম। পরে আর দাঁড়াতে পারতাম না। তারপরও বারোদিন দাঁড়িয়ে ছিলাম। পরে বসে নামায পড়তাম। এরপর বসার শক্তিও পেতাম না। আমি দেখছিলাম নিজেকে নিজেই ক্ষয় করে দিচ্ছি। অতঃপর আমি মনকে আল্লাহর দিক মনোযোগী করে আরয করলাম, হে আমার মাবুদ! তুমি আমার ওপর ফরয নির্ধারিত করেছ, যে ব্যাপারে আমি জিজ্ঞাসিত হব। তুমিই আমার রুজির জামিনদার হয়েছ। সুতরাং তোমার দয়া আর অনুগ্রহে আমাকে রিযিক দাও। তোমার সম্পর্কে আমি যে বিশ্বাস স্থাপন করেছি, সে ব্যাপারে আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিও না। তোমার ইজ্জতের শপথ! তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণে আমি প্রাণপণ চেষ্টা করে যাবে।

হঠাৎ আমার সম্মুখে দু'টি রুটি দেখতে পেলাম। তাতে কিছু তরকারিও ছিল। সর্বদা আমি এমন খাদ্য পেতাম। এক রাত থেকে আরেক রাত পর্যন্ত এতেই আমার ক্ষুধা নিবারণ হতো। পরে আমাকে ঘাঁটিতে ফেরার নির্দেশ দেয়া হলে আমি চলে এলাম। শহরে এসে মসজিদে একজন বক্তাকে দেখতে পেলাম, যিনি হজরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম এর ঘটনা বর্ণনা করছেন। হজরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম এর মাথায় যখন করাত চালানো হলো, তখন আল্লাহ তায়ালা অহী পাঠালেন যে, যদি আমার কাছে তোমার আহ্ শব্দ আসে, তাহলে নবুয়তের তালিকা থেকে তোমার নাম কর্তন করে ফেলা হবে। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম সবর করলে তার মাথা দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে যাকারিয়া আলাইহিস সালাম অনেক বড় ধৈর্যধারণকারী ছিলেন।

পরে সেখান থেকে আমি এনতাকিয়া নামক স্থানে প্রবেশ করলাম। সেখানে আমার কিছু বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ হলো। তারা জেনে নিল যে, আমি পাহাড়ের গর্তে অবস্থান করতে চাই। তারা আমাকে একটি তরবারি, একটি ঢাল এবং একটি কুঠার দিল। তখন আমি আল্লাহকে খুব লজ্জা করতাম, তাই শত্রুর ভয়ে দেয়ালের আড়ালে অবস্থান করা আমার সহ্য হতো না। একটি জঙ্গলে আমার অবস্থান নির্ধারণ করে নিলাম। সেখানেই থাকতাম। রাতের বেলা নদীর পাড়ে যেতাম। তীরে হাতিয়ার গেড়ে ঢাল মেহরাবের দিকে ফিরিয়ে দাঁড়াতাম। এভাবে ফজর পর্যন্ত নামায পড়তাম। ফজরের নামায আদায়ে পর আবার জঙ্গলের দিকে ফিরে যেতাম। সারাদিন এখানেই অবস্থান করতাম।

একদিন বের হয়ে আমার সামনে একটি বৃক্ষ দেখতে পাই। এর ফলগুলো আমার খুব ভালো লাগে। আল্লাহর সাথে আমি যে অঙ্গীকার করেছিলাম, তা ভুলে গেলাম। জমি থেকে উৎপন্ন কোনো বস্তুর প্রতি হাত না বাড়ানো সংক্রান্ত শপথের কথাও আমার স্মরণ ছিল না। আমি হাত বাড়িয়ে কিছু ফল নিয়ে তা মুখে পুরে খেতে থাকলাম। হঠাৎ আমার অঙ্গীকার ও শপথের কথা। স্মরণ হলে, তৎক্ষণাৎ যে ফল আমার মুখে ছিল তা ছুঁড়ে ফেললাম। সেখানেই মাথায় হাত রেখে বসে গেলাম।

আমার কাছে কিছু আরোহী এসে বলল, দাঁড়াও। তারা আমাকে নদীর তীরে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে একজন সরদারকে দেখতে পাই। তার পাশে আরও কিছু সাওয়ারি ও কাফেলা রয়েছে। তাদের সামনে হাবশিদের একটি দলও দেখতে পাই—যারা ডাকাতি করত। সরদার তাদেরকে গ্রেফতার করেছিল এবং যারা পালিয়ে গেছে তাদের সন্ধানে আমাকে বহনকারী সাওয়ারির মতো আরও কিছু সাওয়ারি সে জঙ্গলের এদিক-সেদিক পাঠায়। তারা আমার কাছে তরবারি, ঢাল ও কুঠার দেখে ওই ডাকাত হাবশিদের একজন বলে ভেবে নিয়েছে।

সরদার আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? আমি বললাম, আমি একজন আল্লাহর বান্দা। তারপর তিনি হাবশিদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি এই লোককে চেনো? তারা বলল, না। সরদার বললেন, কেন চেনো না? এ তো তোমাদের সরদার। তোমরা নিজের প্রাণ দিয়ে হলেও তাকে রক্ষা করতে চাচ্ছ। আমি তোমাদের হাত-পা কেটে ফেলব। একজন ডাকাতকে সামনে এনে এনে তাদের হাত-পা কাটা হতে থাকল।

আমার সিরিয়াল এলে আমাকে বলা হলো, সম্মুখে এসে স্বীয় হাত বাড়াও। আমি হাত বের করে সামনে রাখলাম। তা কেটে ফেলা হলো। তারপর পা এগিয়ে দিতে বলা হলে, আমি পা এগিয়ে দিলাম এবং আকাশের দিকে মাথা তুলে আরয করলাম, হে আমার প্রতিপালক! আমার হাত তো অন্যায় করেছে, কিন্তু আমার পা কী অন্যায় করেছে?

ইত্যবসরে একজন আরোহী সোজা এখানে এসে দাঁড়াল। মাটিতে পড়ে সে চিৎকার দিয়ে বলল, হে লোকেরা! তোমরা এটা কী করছ! তোমরা কি চাও, আকাশ-মাটি একীভূত হয়ে যাক? এই লোক একজন খাঁটি নেককার ব্যক্তি। তিনি আবুল খায়ের নামে প্রসিদ্ধ। সরদার এ কথা শুনে মাটিতে লুটে পড়ে আমার কর্তিত হাতটি তার হাতে নিয়ে চুমোতে আরম্ভ করল। আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার বাহু ও হাতে চুমোতে লাগল এবং বলল, আল্লাহর জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি বললাম, তুমি যখন আমার হাত কাটছিলে তখনই আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। কেননা এই হাত অন্যায় করার কারণে কাটা হয়েছে।

গ্রন্থকার বলেন, চিন্তা করা দরকার—অজ্ঞতা তার সাথে কেমন আচরণ করেছে! অথচ তিনি একজন ভালো লোক হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ। জ্ঞান থাকলে তিনি জেনে নিতে পারতেন যে, যেসব কর্মকাণ্ড তিনি করেছেন এসব তার জন্য হারাম ছিল। আবেদ ও যাহেদ তথা ইবাদতকারী ও দুনিয়াত্যাগীদের সাথে শয়তানের জন্য অজ্ঞতার চেয়ে অধিকতর সাহায্যকারী আর কিছু নেই।

সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত আছে, ইবনে হাদীক বলেন, আমি হাতেম আসামের সাথে মসিসা নামক এলাকায় প্রবেশ করেছিলাম। হাতেম যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর মুখ খুলে কোনো খাদ্যবস্তু তাঁর মুখে ঢুকিয়ে দেয়া না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কিছু না খাওয়ার অঙ্গীকার করে বসলেন। সাথিদের বললেন, তোমরা এদিক-সেদিক চলে যাও। এরপর তিনি বসে গেলেন। এভাবে নয়দিন ধরে বসে রইলেন এবং কিছু খেলেন না। দশম দিনে এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে কিছু খাদ্যদ্রব্য তাঁর সম্মুখে পেশ করে বলল, এগুলো খান। হাতেম কোনো উত্তর দিল না। এভাবে তিনবার বলার পরও তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। পরে লোকটি বলল, এই লোক পাগল। তাই এক মুঠো খাবার তাঁর মুখের দিকে তুলে ধরল। কিন্তু তিনি মুখ খুলছেন না এবং কোনো কথাও বলছেন না। এই লোক তার চাদরের কোণে থাকা চাবি বের করে তাঁর মুখ খুলে বলল, খেতে থাকুন। এ কথা বলে সে খাবার তাঁর মুখে ঢুকিয়ে দিলেন। হাতেম খেলেন। এরপর বললেন, তুমি যদি এই খাবারের বিনিময়ে কোনো উপকার পেতে চাও, তাহলে এদেরকে খাওয়াও। এ কথা বলে তিনি তাঁর সাথিদের দিকে ইশারা করলেন।

কাজী আহমদ ইবনে সাইয়্যার বলেন, জনৈক সুফি আমাকে বলেছেন, এক সফরে একজন শায়খের সাথে আরও কিছু লোক ছিল। তাওয়াক্কুলের আলোচনা চলছিল। রিযিক এবং নফসের দুর্বলতা ও শক্তির বিষয়ে তাওয়াক্কুলের আলোচনার ফাঁকে শায়খ বললেন, আমার সাথে এসো। এ কথা বলে তিনি কঠিন শপথ করেন যে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি কোনো খাদ্যদ্রব্যের স্বাদ নেব না, এমনকি গরম গরম ফালুদার পাত্র আমার কাছে পাঠানো হলেও আমি তা খাবো না, যতক্ষণ পর্যন্ত খাওয়ার জন্য কেউ শপথ করে। আমরা সাহার নামক এলাকার অভিমুখে চললাম। অন্য একটি কাফেলা শায়খের অবস্থা শুনে বলল, এটা অজ্ঞতা। হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটি গ্রামে গিয়ে পৌঁছলাম। একদিন দুই রাত অতিবাহিত হয়ে গেল। শায়খ কিছু খেলেন না। কাফেলার অন্যরা তাঁকে একাকী ছেড়ে দিলে শুধু আমি তাঁর সঙ্গে থাকি। গ্রামের মসজিদে তিনি শুয়ে গেলেন এবং অতিরিক্ত দুর্বলতার দরুন তিনি যেন নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছিলেন। আমি তাঁর সঙ্গেই ছিলাম।

এভাবে চতুর্থ দিনের অর্ধরাত অতিবাহিত হলে শায়খ মরণাপন্ন হয়ে পড়েন। ইত্যবসরে হঠাৎ শুনতে পাই কে যেন মসজিদের দরজা খুলছে। দেখি কৃষ্ণবর্ণের এক বালিকা একটি পোটলা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির। আমরা তাকে দেখলে, সে জানতে চাইল আমরা কি মুসাফির নাকি গ্রামবাসী? আমি বললাম, আমরা মুসাফির। সে পোটলা খুলল এবং ফালুদার একটি পাত্র আমাদের সামনে পেশ করল। যা গরমের তীব্রতায় টগবগ করছিল। বালিকা বলল, খাও। আমি শায়খকে বললাম, এগুলো খেয়ে নিন। তিনি উত্তর দিলেন, আমি খাব না। বালিকা তার হাত উঠিয়ে জোরে ধাক্কাতে আরম্ভ করল এবং বলল, আল্লাহর শপথ! আপনি যদি না খান, তাহলে আমি এভাবে মারতে থাকব। অনুগ্রহ করে আপনি খেয়ে নিন। এবার শায়খ আমাকে বললেন, এসো, আমার সাথে খাও। আমরা উভয়ে খেয়ে পাত্র খালি করে ফেললাম।

বালিকা ফিরে যেতে চাইলে তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কে? আর এটা কেমন পাত্র? সে বলল, আমি এই গ্রামের সরদারের দাসী। তিনি ভীষণ বদমেজাজি লোক। আমার কাছে তিনি ফালুদার পাত্র চাইলে আমি দ্রুত ফালুদা তৈরি করি। কিন্তু তার পরও আমার কিছুটা দেরি হয়ে যায়। সরদার তৎক্ষণাৎ তালাকের কসম খেয়ে বললেন, এই পাত্রের খাবার না আমি খাব, না ঘরের কোনো লোক খেতে পারবে, আর না গ্রামের কোনো অধিবাসী। এটা কেবল মুসাফিরকেই খাওয়াতে হবে। আমি মসজিদে মসজিদে ফকিরদের সন্ধানে ছুটে চললাম। তোমাদের ছাড়া আর কাউকে পেলাম না। যদি এই শায়খ না খেতেন, তাহলে তাকে আমি মারতেই থাকতাম; যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি না খেতেন। কারণ কিছুতেই যেন আমার মালিকের স্ত্রীর ওপর মালিকের তালাক পতিত না হয়। শায়খ আমাকে বললেন, কী দেখলে তুমি! আল্লাহ তায়ালা রিযিক পৌঁছাতে চাইলে এভাবেই পৌঁছান।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, অনেক সময় অজ্ঞ লোকেরা এমন কাহিনী শুনলে মনে করবে এটা কারামত। অথচ লোকটি যা করল তা খুবই নিন্দনীয়। কেননা সে আল্লাহ তায়ালাকে পরীক্ষা করছে, সে ব্যাপারে শপথ করছে এবং নিজের নফসের ওপর আক্রমণ করছে। এজন্য উপরোক্ত কর্মকাণ্ড বৈধ ছিল না। আমরা এটা অস্বীকার করছি না যে, আল্লাহ তায়ালা তার ওপর অনুগ্রহ করেছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, সে সঠিকের বিপরীত কাজ করছে। এ অবস্থা অব্যাহত মারাত্মক পাপের কারণ। কেননা সে বিশ্বাস করেছে যে, আল্লাহ তায়ালা তাকে সম্মান করেছে। এ ব্যাপারে সে নিজেকে মর্যাদাসম্পন্ন ভেবে নিয়েছে। এ ঘটনা পূর্বে উল্লেখিত হাতেম রাযীর অনুরূপ। কেননা সে যদি সুস্থ ও বিবেকবান হয়, তাহলে সে অজ্ঞতাপূর্ণ ও নাজায়েয কাজ করেছে বলে প্রমাণিত হবে। কেননা তারা ভেবে নিয়েছে যে, তাওয়াক্কুল মানে আসবাব ও বস্তুসামগ্রী ছেড়ে দেয়া। যদি তারা স্বীয় অঙ্গীকার পূরণে ব্রতী হতো, তাহলে খাবার চিবাত না এবং গিলত না। অতএব এমন নিষ্ফল কর্মকাণ্ডে কী করে আল্লাহর নৈকট্যের কারণ হতে পারে? এ সব কথাকে আমি বাড়াবাড়ি বলে মনে করি। এটা শরয়ি জ্ঞানস্বল্পতার কারণে অজ্ঞদের সাথে শয়তানের খেলা। কারণ অজ্ঞদের সাথে শয়তান খেলতে মজা পায়।

আবু ইসহাক ইবরাহিম ইবনে আহমদ তাবারি বলেন, আমাকে জাফর খুলদী বলেছেন, আমি ছাপ্পান্নবার আরাফার ময়দানে অবস্থান করেছি। এর মধ্যে একুশবার মাযহাব মতো ছিলাম। আমি আবু ইসহাককে জিজ্ঞেস করলাম, 'একুশবার মাযহাব মতো ছিলাম'-এর মানে কী? তিনি বললেন, সে তখন নাশেরিয়া ব্রিজে চড়ত এবং তার জামা ছিঁড়ে দিত, যাতে মানুষ বুঝতে পারে যে, তার কাছে সফরের কোনো সহায়-সম্বল, পানাহার-সামগ্রী নেই। এরপর সে তালবিয়া বলে বলে হাঁটত।

গ্রন্থকার বলেন, এটা শরিয়তবিরোধী কাজ। কেননা আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- وتزودوا 'তোমরা সঙ্গে পাথেয় তথা সফরসামগ্রী নাও”” স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরসামগ্রী সঙ্গে রাখতেন। এমন বলা সম্ভব নয় যে, এক মাস যাবৎ মানুষ কোনো ধরনের প্রয়োজনের মুখোমুখি হবে না। যদি সে দুস্থ হয় এবং নিজেকে ধ্বংস করে দেয়, তবে সে গুনাহাগার হবে। যদি মানুষের কাছে হাত পেতে কিছু চায়, তাহলে তা তাওয়াক্কুলের দাবির বিপরীত। আর যদি এই দাবি করে যে, আল্লাহ তায়ালা তাকে সম্মান করবেন এবং কোনো উপকরণ ছাড়া তার কাছে রিযিক পৌঁছাবেন, তাহলে বুঝতে হবে-সে নিজেকে সম্মানের উপযোগী মনে করে। পক্ষান্তরে সে যদি শরিয়তের অনুসরণ করত এবং সফরসামগ্রী সঙ্গে রাখত, তাহলে সব দিক থেকেই-তার জন্য মঙ্গল হতো।

আবু শুয়াইব মুকাফ্ফা সম্পর্কে আমি একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা শুনেছি। তিনি পায়ে হেঁটে সত্তরবার হজ করেছেন। প্রত্যেক হজের সময় বায়তুল মুকাদ্দাসের পাহাড় হতে ইহরাম বাঁধতেন এবং তাবুক এলাকায় তাওয়াক্কুল করে প্রবেশ করতেন। শেষবার হজের সময় তিনি জঙ্গলে একটি পিপাসার্ত কুকুর দেখতে পান, যে তীব্র পিপাসার কারণে হাঁ করে আছে এবং বলছে, এমন কে আছ যে আমাকে এক মুঠো পানি পান করিয়ে সত্তরটি হজের সাওয়াব গ্রহণ করবে? এক ব্যক্তি পিপাসা নিবারণ উপযোগী পানি কুকুরকে দিল। সে পানি পান করা করিয়ে বলল, এই আমল সত্তরটি হজ অপেক্ষা উত্তম। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'প্রত্যেক প্রাণীর সাথে ভালো আচরণ করার দ্বারা সাওয়াব পাওয়া যায়。

আমি বলছি, এসব ঘটনাবলি আমি এ জন্য উল্লেখ করেছি, যাতে করে জ্ঞানীরা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। তাঁরা অতিরিক্ত বুঝতে চেয়েছেন এবং তাওয়াক্কুল ইত্যাদির ভুল ব্যাখ্যা লালন করেছেন, যা শরয়ি বিধি-বিধানের বিপরীত। আমার বুঝে আসছে না, এ সব লোক খালি হাতে বের হলে কীভাবে অযু ও নামায আদায় করতেন? কাপড় ছিঁড়ে গেলে সুই দিয়ে সেলাই না করে কীভাবে পরতেন? অথচ তাদের পীর ও শায়খেরা সফরের পূর্বে সফরের উপায়-উপকরণ তৈরি রাখার নির্দেশ প্রদান করতেন।

গ্রন্থকার বলেন, তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে ইবরাহিম খাওয়াস ছিলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনি সর্বদা নিজের সাথে সুঁই, সুতা, বদনা ও কাঁচি রাখতেন। কখনো এগুলো ফেলে চলতেন না। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি অন্যদেরকে কোনো দুনিয়াবি বস্তু সঙ্গে না রাখতে উপদেশ দেন, অথচ আপনি নিজে এগুলো সঙ্গে রাখেন, এর কারণ কী? উত্তরে ইবরাহিম বলেন, এগুলো সঙ্গে রাখার দ্বারা তাওয়াক্কুলে বিঘ্ন ঘটে না। কেননা আমার ওপর আল্লাহ তায়ালার ফারায়েয রয়েছে। এদিকে দরবেশদের শরীরে একটিমাত্র কাপড় থাকে। কখনো কখনো সেটা ছিঁড়ে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। সাথে যদি সুঁই, সুতো না থাকে তাহলে লজ্জাস্থান ঢেকে রাখা দায় হয়ে যাবে এবং নামায ফাসেদ হবে। আবার সাথে বদনা ও বাটি রাখা না হলে পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব হবে না। অতএব কোনো দরবেশকে যদি সঁই-সুতো ছাড়া দেখে থাকো, তাহলে নামাযের ব্যাপারে তুমি তাকে অভিযুক্ত করতে পার।

টিকাঃ
১. সুরা নিসা: আয়াত ৭১
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৯০৬
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৬৯৭৪
৪. [সহিহ] আস্সহিহাহ্: হাদিস নং ৭৮৩
৫. [মুনকার] ইমাম যাহাবী রহ. মীযানুল ই'তিদাল গ্রন্থে এটাকে 'মুনকার' বলেছেন।
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৮৮৬
২. তিরমিযি: হাদিস নং ৩৯২৫
১. সুরা বাকারা: আয়াত ১৯৭
২. মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৭৫

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সফর থেকে ফেরার সময় সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা

📄 সফর থেকে ফেরার সময় সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা


গ্রন্থকার বলেন, সুফিদের মতবাদ হচ্ছে, মুসাফির সফর থেকে ফিরে তার মহল্লা প্রবেশ করলে সেখানকার উপস্থিত লোকজনকে সে সালাম দেবে না; বরং প্রথমে অযুখানায় গিয়ে অযু করে দুই রাকাত নামায পড়ার পর তার শায়খকে সালাম করবে। এরপর লোকজনদেরকে সালাম দেবে।

এই শরিয়তবিরোধী বিদয়াতটি পরবর্তীকালের সুফিরা উদ্ভাবন করেছে। কেননা ফুকাহায়ে কেরামগণের মতে কেউ কোনো মানুষের জমায়েতে উপস্থিত হলে সে সবাইকে সালাম দেবে-চাই অযু থাক বা না থাক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সুফিরা এই মতবাদ ছোট ছেলেদের থেকে গ্রহণ করেছে। কেননা ছোট ছেলেদেরকে যদি বলা হয়, তুমি সালাম দাওনি কেন? সে জবাবে বলে, আমি এখনও মুখ ধুইনি। সম্ভবত এদের থেকেই বিদয়াতিরা এ অভ্যাসটি আয়ত্ত করেছে। হজরত আবু হোরায়রা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
يُسَلِّمُ الصَّغِيرُ عَلَى الكَبِيرِ، وَالمَارُّ عَلَى القَاعِدِ، وَالقَلِيلُ عَلَى الكَثِيرِ
'ছোটদের উচিত বড়দের সালাম দেয়া, চলন্ত অবস্থার লোকেরা বসা লোকদের সালাম দেবে এবং কমসংখ্যক লোক অধিক লোককে সালাম দেবে।'

এই হাদিস বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে। সুফিদের আরেকটি অভ্যাস হচ্ছে, সফর থেকে ফিরে তারা শরীর মালিশ করাতে চায়। আবু যুরআ' তাহের ইবনে মুহাম্মাদ আমাকে বলেছেন, তাঁর পিতা স্বীয় গ্রন্থে সফর থেকে ফিরে কীভাবে শরীর মালিশ করবে-সে ব্যাপারে একটি অধ্যায় নির্মাণ করেছেন। তিনি হজরত ওমর রা. এর কথা থেকে এটাকে প্রমাণিত করেছেন।
'হজরত ওমর রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে দেখি, তাঁর হাবশি ক্রীতদাস তাঁর পিঠ মোবারক মালিশ করছে। আমি আরয করলাম ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এ অবস্থা কেন? তিনি বললেন, উটনী আমাকে ফেলে দিয়েছে।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ভায়েরা! উক্ত হাদিস থেকে উপরোক্ত ব্যক্তির কথিত বিষয়ে প্রমাণ সাব্যস্তকরণের ব্যাপারে চিন্তা করুন। এই লোকের উচিত ছিল, যে ব্যক্তি উট থেকে পড়ে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, কীভাবে তার শরীর মালিশ করা চাই—সে বিষয়ক অধ্যায় নির্মাণ করা। আর সুন্নত কি পিঠ মালিশ করা নাকি পা মালিশ করা? সে কোথায় পেল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সফর থেকে এসেছেন এবং প্রথম রাতে মালিশ করা হয়েছে? এছাড়া হাদিসের আলোকে কখনো ব্যথা অনুভূত হলে পিঠ মালিশ করার নিয়মের ব্যাপারে তিনি তাঁর গ্রন্থের অধ্যায় নির্মাণ করতে পারতেন। এমন বিষয়ের অবতারণা করে তাদের 'ইসতিদরাজ' থেকে দূরত্ব অবলম্বন করা উচিত। সুফিদের আরও একটি কুসংস্কার হচ্ছে, তারা সফর থেকে এলে চতুর্দিকে এ খবর ছড়িয়ে দেয়া হয়।

ইবনে তাহের একটি অধ্যায় নির্মাণ করেছেন। যেখানে তিনি উল্লেখ করেন, সুফিরা সফর থেকে এলে আনন্দ-ফুর্তি করবে। এ ব্যাপারে তিনি হজরত আয়েশা রা. এর হাদিসকে প্রমাণ হিসেবে সাব্যস্ত করেন।
'হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সফরে বের হলে কুরাইশের এক মেয়ে মানত করল যে, আল্লাহ তায়ালা যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সহি সালামতে ফিরিয়ে আনেন, তাহলে আমি হজরত আয়েশা রা.-এর ঘরে দফ বাজাব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরিফ আনলে তিনি বললেন, এসো। দফ বাজিয়ে নাও।"

গ্রন্থকার বলেন, দফ বাজানোর বৈধতার ব্যাপারে পূর্বে আলোচনা করেছি। যেহেতু এই মেয়ে দফ বাজানোর মানত করে ফেলেছে, তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমার মানত পূরণ করে নাও। মুসাফির ঘরে এলে তার আগমন উপলক্ষে নাচ-গানের আয়োজন করার প্রমাণ এ হাদিস দ্বারা কী করে নেয়া যেতে পারে?

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৬২৩১
২. [যঈফ] হাইসামী 'মাজমাউয্যাওয়াইদ' গ্রন্থে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন।
৩. [হাসান] আসিলসিলাতুস্ সাহীহাহ্: হাদিস নং ১৬০৯

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সুফিদের কেউ মারা গেলে তখনকার শয়তানের ধোঁকার নমুনা

📄 সুফিদের কেউ মারা গেলে তখনকার শয়তানের ধোঁকার নমুনা


সুফিদের কেউ মারা গেলে তখন শয়তান দু'ভাবে ধোঁকা দিয়ে থাকে। যথা- প্রথম ধোকা: তারা বলে বেড়ায়, মৃত কোনো ব্যক্তির ওপর আমাদের কান্না করা উচিত নয়। কোনো সুফি-দরবেশ যদি তার নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুতে কান্না করে তাহলে সে মারেফতের রাস্তা থেকে ছিটকে পড়বে। ইবনে আকিল বলেন, এ দাবি শরিয়তের ব্যাপারে অত্যুক্তি। এটা বিবেকহীনতার পরিচায়ক। মানবপ্রকৃতি এর অনুকূলে নয় এবং তা মানবিক শিষ্টাচারবহির্ভূত প্রথা। সুতরাং এ সব লোকের চিকিৎসা এমন ঔষধ দিয়ে করা উচিত যা দ্বারা তাদের অভ্যাস পরিবর্তন করা যায়।

স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবী হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এর সম্পর্কে বলেছেন,
وَابْيَضَّتُ عَيْنَاهُ مِنَ الْحُزْنِ فَهُوَ كَظِيمٌ 'পেরেশানি ও শোকে তাঁ দু'টি চোখ সাদা হয়ে গেছে।”

আরও বলতেন-
يَا أَسَفَى عَلَى يُوسُفَ 'হায় আফসোস! ইউসুফ চলে গেছে!'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ছেলের মৃত্যুতে ক্রন্দন করেছিলেন এবং বলেছিলেন-
إِنَّ العَيْنَ تَدْمَعُ 'নিশ্চয় চক্ষু অশ্রু প্রবাহিত করে।"

হজরত ফাতেমা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের সময় বলেছিলেন- وأكرب أبتاه 'উহ্! আমার পিতার উপর কত কষ্ট!'। তখন এটাকে কেউ মন্দ বলেননি। হজরত ওমর রা. মুতাস্মিমকে তার ভাইয়ের মৃত্যুতে ক্রন্দনরত দেখেছিলেন। সে সময় তার কিছু কবিতা-
وكنا كندماني جزيمة حقبة * من الدهر حتى قيل لن يتصدعا
'আমরা দুই ভাই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বাদশা জুযাইমার দুই উজিরের মতো ছিলাম। লোকেরা আমাদেরকে দেখে বলত, এরা কখনো পৃথক হবে না।'

হজরত ওমর রা. বলেছিলেন, 'ইস! যদি আমি কবি হতাম তাহলে আমার ভাই যায়দের জন্য এভাবে মরসিয়া বলতাম!' মুতাস্মিম উত্তরে বললেন, 'আমার ভাই যদি আপনার ভাইয়ের ভাগ্য বরণ করে মারা যেত তাহলে আমি মরসিয়া করতাম না।' উল্লেখ্য, মুতামিমের ভাই মালেক কুফরী অবস্থায় মারা যায়, অন্যদিকে হজরত যায়দ রা. শাহাদাতের সুধা পানে ধন্য হন।

হজরত ওমর রা. খুশি হয়ে বললেন, হে মুতাম্মিম! কেউ আমার ভাই সম্পর্কে এভাবে মর্যাদাপূর্ণ কথা বলেনি, যা তুমি বললে। এছাড়া আমরা চিন্তা করলে দেখতে পাই, উটের মতো কঠিনপ্রাণ ও পাষাণ জন্তুও তার থাকার ঘর ছাড়ার সময় এবং নিজেদের মানুষের বিদায় বেলায় কান্নাকাটি করে থাকে। সে তার বাচ্চাদের জন্য ছটফট করতে থাকে। পাখিরা তাদের কারও বিয়োগে কান্নার আধিক্যে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করতে থাকে। অর্থাৎ নিকটজনের মৃত্যুতে মানুষের কান্নাকাটি করা ও অশ্রু ঝরানো একটি স্বাভাবিক ও মানবিক প্রকৃতি। যাকে খুশির সংবাদ আলোড়িত করে না এবং দুঃখের সংবাদ বিচলিত করে না, সে তো প্রাণহীন উদ্ভিদের মতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবিক প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে নিন্দাযোগ্য বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন, 'যে ব্যক্তি বলবে, আমি কখনো আমার দশ সন্তানের কারও গালে চুমু খাইনি, তার সম্পর্কে আমি বলব, তার অন্তর থেকে তো আল্লাহ তায়ালা দয়া-মায়া উঠিয়ে নিয়েছেন।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা ছেড়ে যাওয়ার প্রাক্কালে মক্কার দিকে বারবার ফিরে তাকিয়েছিলেন। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন কথার সমর্থন করবে, যা শরিয়ত ও মানবিক প্রকৃতির বিপরীত, তাকে জাহেল তথা অজ্ঞ বলে আখ্যায়িত করাই সমীচীন। শরিয়ত কেবল আমাদের থেকে এতটুকু কামনা করেছে, যাতে আমর মুখ ও শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে না ফেলি, জামা-কাপড় ছিঁড়ে না ফেলি। কিন্তু অশ্রু প্রবাহিত করা এবং পেরেশান ও দুঃখ প্রকাশ করা দোষের কিছু নয়।

দ্বিতীয় ধোঁকা: সুফি-দরবেশরা তাদের কেউ মারা গেলে একটি আয়োজন করে থাকে, যাকে 'ওরশ' বলে। সেখানে উচ্চাঙ্গ সংগীত, কাউয়ালি ও জারিগান গাওয়া হয়। জুয়াসহ বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। তারা বলে থাকে, আমরা এ জন্য খুশি ও আনন্দ উপভোগ করে থাকি যে, মৃত ব্যক্তি তাঁর প্রতিপালকের সান্নিধ্যে পৌঁছেছেন। শয়তান তিনভাবে এদেরকে বিভ্রান্ত করেছে-

১. সুন্নত হচ্ছে, কেউ মারা গেলে মৃতবাড়িতে খাবার পৌঁছে দেয়া। কেননা শোকের কারণে তারা খাবার তৈরি করতে অপারগ থাকে। কিন্তু মৃতবাড়ির লোকজনই খাবার পাকিয়ে অন্যদের খাওয়ানো ও অন্যত্র পরিবেশন করা—এটা কোন্ ধরনের সুন্নত? মৃতবাড়িতে খাবার পৌঁছানোর ব্যাপারে হাদিসের ভাষ্য হচ্ছে,
'সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা বর্ণনা করেন, আমাকে জাফর ইবনে খালেদ বলেছেন, আমার পিতা আবদুল্লাহ ইবনে জাফর বলেন, জাফরের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'জাফরের পরিবারের জন্য খাবার রান্না করে পাঠাও। কেননা আজ তারা শোকের কারণে রান্না তৈরি করা থেকে অপারগ।” ইমাম তিরমিযি রহ. বলেন, হাদিসটি 'হাসান সহিহ'।

২. সুফিরা বলে থাকে, আমরা মৃত ব্যক্তির জন্য এ কারণে আনন্দ উদ্‌যাপন করছি যে, সে মহান আল্লাহর দরবারে মিলিত হয়েছে। অথচ এটি খুশি হওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। কেননা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারব না যে, তাকে ক্ষমা করা হয়েছে না কি হয়নি! এদিকে যদি শাস্তিতে পতিত হন তার জন্য আনন্দ উদ্‌যাপন করার ব্যাপারে বিবেকেরও সাড়া পাওয়া যায় না। ওমর ইবনে যর—তাঁর ছেলে মারা গেলে তিনি বলেন, আমি তোমার পরিণতির দুশ্চিন্তায় পেরেশান হতে বাধ্য হয়েছি। খারেজা ইবনে ইয়াযিদ আনসারি উম্মে আলা থেকে বর্ণনা করেন, উসমান ইবনে মাযঊন ইন্তেকাল করলে আমাদের কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরিফ আনেন। আমি সে সময় উসমানের ব্যাপারে এটুকু বলেছি যে, হে আবুস্সাইব! তোমার ওপর আল্লাহর রহমত হোক। আমি কেবল এতটুকু সাক্ষী দিচ্ছি যে, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে সম্মানিত করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে বললেন, 'তুমি কি জানো যে, আল্লাহ তায়ালা তাকে সম্মানিত করেছেন?'

৩. সুফিরা সেই ওরশ অনুষ্ঠানে নাচ-গান করতে থাকে। এমন কার্যকলাপে সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রকৃতি সীমার বাইরে চলে যায়। কেননা মানবপ্রকৃতিতে বিয়োগ ব্যাথার আলামত দৃশ্যমান হওয়ার কথা। তাও যদি মৃত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে শান্তি দান করেন, তখন। এই নাচ-গান কখনো শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গণ্য হতে পারে না। তাহলে দুঃখ পেরেশানির আলামত কোথায় যাবে?

টিকাঃ
১. সুরা ইউসুফ: আয়াত ৮৪
২. সুরা ইউসুফ: আয়াত ৮৪
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৩০৩, সহিহ মুসলিম: ২৩১৫
৪. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৪৪৬২
৫. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫৯৯৮, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৩১৭
১. [হাসান] সহিহুল জামে': হাদিস নং ১০১৫
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১২৪৩

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 জ্ঞানান্বেষণ পরিহারে সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা

📄 জ্ঞানান্বেষণ পরিহারে সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা


গ্রন্থকার বলেন, জেনে রাখা উচিত—মানুষের জন্য শয়তানের প্রথম ফাঁদ হচ্ছে তাকে ইলম তথা জ্ঞানার্জন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। কেননা জ্ঞান আলোসদৃশ। শয়তান তার বাতি নেভাতে পারলে অন্ধকারে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই ধোঁকা দিয়ে পথভ্রষ্ট করতে পারবে। সুফিদের ওপর শয়তান এ ব্যাপারে আরও উদ্যমের সাথে এগোতে থাকে। প্রথমে তাদের বড় একটি দলকে সামগ্রিকভাবে ইলম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং তাদেরকে বোঝাতে থাকে যে, ইলম অর্জন করতে গিয়ে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করতে হয়। শয়তান তাদেরকে আরাম ভোগ্য সামগ্রীকে উত্তম হিসেবে দেখাতে থাকে। ফলে তারা ধুতি পরে ছেঁড়া বিছানায় পড়ে থাকে।

ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, অলসতার ওপর তাসাওউফের ভিত্তি। তাঁর অভিমতের ব্যাখ্যা হচ্ছে, নফসের উদ্দেশ্য হয়তো সাধনা অথবা দুনিয়া অর্জন করা। সাধনা বা সম্পদ সঞ্চয় করা ইলম অর্জনের কারণে দেরিতে অর্জিত হয়। এতে শরীর কষ্ট-ক্লেশে পতিত হয়, চাই এতে উদ্দেশ্য সাধিত হোক বা না হোক। সুফিরা সাধনাকে দ্রুত অর্জন করতে চায়। কেননা তারা দুনিয়াবিরাগীর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে থাকে।

কতেক শ্রেণির সুফি আছেন যারা আলেমবিদ্বেষী। তারা মনে করেন ইলম তথা জ্ঞানার্জনে সময় দেয়া অহেতুক ও অনর্থক। তাদের দাবি—আমাদের ইলম কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি অর্জন করা যায়। এরা জ্ঞানান্বেষণকে অসার ও অনর্থক ভেবে নেয়ার কারণে সংক্ষিপ্ত পোশাক, লেংটি আর লোটা নিয়ে বৈরাগী সেজে থাকেন।

দ্বিতীয় শ্রেণির কিছু সুফি আছেন, যারা সামান্য কিছু ইলমের ওপর তুষ্ট থেকে যান। জ্ঞানের বৃহৎ পরিসর থেকে তাঁরা বঞ্চিত হন। হাদিসের শব্দে তুষ্ট হয়ে দ্বিধায় পড়ে যান। তারা মনে করেন, হাদিসের সনদ অন্বেষণ করা এবং হাদিস শেখা ও শেখানোর ক্লাশ কায়েম করা সবই দুনিয়াবি কাজ। এতে নফস তৃপ্তি পায়।

ফাতাওয়া, কাযা ও ইমারত সবই শঙ্কার বিষয়। কিন্তু এতে ফযিলতও অনেক। কাঁটা তো সর্বদা গোলাপের সাথেই থাকে। মানুষের উচিত-উভয় জাহানের উপকারী বিষয় অন্বেষণ করা। এর ভেতর যা কিছু বালা-মসিবত আছে, তা থেকে বিরত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করা। চেষ্টা-সাধনার শক্তি ও গুণ সব মানুষের মধ্যেই আছে। তাদের সেসব ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। যেমন বিয়ের প্রতি অনুরাগ ও টান প্রকৃতিগতভাবে সবাইকে দেয়া হয়েছে। এতে সন্তান হবে। এভাবেই ইলমের মাধ্যমে দুনিয়ার নেজামকে সাজানো হয়েছে। ইয়াযিদ ইবনে হারুন বলতেন, আমি সর্বদা গাইরুল্লাহর জন্য জ্ঞান অন্বেষণ করেছি। কিন্তু সকল প্রকার জ্ঞান আল্লাহর জন্যই রয়ে গেছে। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, ইলমের মাধ্যমে আমি ইখলাসের হেদায়াত পেয়েছি। যে ব্যক্তি এটা কামনা করে যে, নফসের দ্বারা সে তার প্রকৃতিকে বিলীন করে দেবে, তা কখনো সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত শয়তান সুফিদের একটি দলকে এমন দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে যে, তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমল। এ সব লোক এ কথা বুঝতে পারছে না যে, ইলমে লিপ্ত হওয়া সম্পূর্ণই আমলের অন্তর্ভুক্ত। আলেম যদি আমলের বেলায় অবহেলাও করে, তারপরও সে সঠিক পথ হতে বিচ্যুত হবে না। আর ইলমবিহীন আবেদ নির্ঘাত ভুল পথে পড়ে যেতে পারেন।

চতুর্থত ইবলিস এই গোষ্ঠীর মনে এ কথা ভালো ভাবেই ঢেলে দিয়েছে যে, ইলম বলা হয় যা বাতেন তথা গোপন বিষয় দ্বারা অর্জিত হয়। ফলে এদের কেউ কেউ حدثني قلبي عن ربي 'আমাকে আমার মন বলেছে আমার রব ইরশাদ করেছেন'-এমন ধারণা লালন করতেও দ্বিধা করছে না। শিবলী এই কবিতা আবৃত্তি করতেন :
اذا طالبوني بعلم الورق * برزت عليهم بعلم الخرق 'মানুষ যখন আমাকে কিতাবি ইলমের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করে, তখন আমি তাকে ডুবে যাওয়া ও কারামাতের ইলম শেখাই।'

এরা শরয়ি ইলমকে যাহেরি ইলম বলে থাকে, নফসের আপৎসঙ্কুল বিষয়াদিকে বাতেনি ইলম আখ্যা দিয়ে থাকে। প্রমাণস্বরূপ এরা বলে, হজরত হাসান ইবনে আলী রা. হজরত আলী রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
علم الباطن سر من سر الله عز وجل وحكم من أحكام الله تعالى يقذفه الله عز وجل في قلوب من يشاء من اوليائه
'বাতেন আল্লাহর গোপন ভেদসমূহের মধ্য হতে একটি রহস্য। আর আল্লাহর বিধানাবলি হতে একটি বিধান। আল্লাহ তায়ালা সেই রহস্য তাঁর ওলিদের মধ্য থেকে যাকে চান তার কাছে উন্মোচিত করে থাকেন।'

গ্রন্থকার বলেন, এ হাদিসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস বা প্রমাণ নেই। এর সনদে অবিশ্বস্ত ও অজ্ঞাত লোক রয়েছে।

আবু মুসা বলেন, একজন ফকিহ আবু ইয়াযিদের প্রতিবেশী ছিলেন। তিনি আবু ইয়াযিদের কাছে গেলে আবু ইয়াযিদ তাকে অনেক আশ্চর্যজনক ঘটনা শোনালেন। তিনি জানতে চাইলেন, এত আশ্চর্য বিষয় তুমি কী করে জানলে? প্রত্যুত্তরে আবু ইয়াযিদ বললেন, তুমি এখনও শোনোনি এমন আরও অনেক আশ্চর্য ঘটনা আমি জানি। আলেম বললেন, হে আবু ইয়াযিদ! এই জ্ঞান আপনি কী করে অর্জন করলেন? তিনি উত্তরে বললেন, আমার ইলম আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত। তুমি কি শোনোনি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'যে ব্যক্তি জানা ইলমের ওপর আমল করবে, আল্লাহ তাকে এমন ইলম দান করবেন, যা সে জানত না।' অন্যত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
العلم علمان علم ظاهر وهو حجة الله تعالى على خلقه وعلم باطن وهو العلم النافع
'ইলম দুই প্রকার। ১. প্রকাশ্য ইলম-যা মাখলুকের জন্য আল্লাহ তায়ালার দলিল। ২. গোপন ইলম-এটি উপকারী ইলম।

হে বুযুর্গ! তোমাদের ইলম তো জবানের সাহায্যে শিক্ষাপ্রাপ্ত। পক্ষান্তরে আমার ইলম আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামের মাধ্যমে প্রাপ্ত। আলেম বললেন, আমার ইলম তো বিশ্বস্ত সূত্র-পরম্পরায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে প্রাপ্ত। তিনি জিবরাঈল আলাইহিস সালাম থেকে, আর জিবরাঈল আল্লাহ হতে প্রাপ্ত। আবু ইয়াযিদ বললেন, হে বুযুর্গ! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আল্লাহ তায়ালা আরও একটি ইলম শিক্ষা দিয়েছেন, যা জিবরাঈল আলাইহিস সালাম জানেন না, মিকাঈল আলাইহিস সালামও জানেন না। আলেম বললেন, ঠিক আছে। কিন্তু আমি চাই, আপনি সঠিকভাবে আল্লাহ হতে প্রাপ্তির বিষয়টুকু আমার কাছে স্পষ্ট করুন। আবু ইয়াযিদ বললেন, হ্যাঁ, তোমাকে আমি ওই পরিমাণ বয়ান করতে পারি, যে পরিমাণ মারেফাত তুমি রপ্ত করতে পেরেছ। আচ্ছা, তুমি কি জানো যে, আল্লাহ তায়ালা মুসা আলাইহিস সালাম এর সাথে শুধু কথা বলেছেন, কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সরাসরি সামনাসামনি কথা বলেছেন। কোনো ধরনের পর্দা ছাড়াই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে দেখেছেন। আর নবীরা ওহি দ্বারা বিধান আরোপ করে থাকেন।

আলেম উত্তরে বললেন, সঠিক বলেছেন। এরপর আবু ইয়াযিদ বললেন, তুমি কি জানো যে, সিদ্দিকীন ও ওলিদের কথা আল্লাহর ইলহামের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে প্রজ্ঞাপূর্ণ জবান দান করেন। উম্মতকে তাদের দ্বারা উপকৃত করে থাকেন। মুসা আলাইহিস সালাম এর মায়ের মনে, খিযির আলাইহিস সালাম এর নৌকা ভেঙ্গে ফেলা, দেয়াল উপড়ে দেয়া এ সবই ইলহামের মাধ্যমে হয়েছে। অনুরূপভাবে ওমর রা. এর 'হে সারিয়া! পাহাড়ের দিকে তাকাও!'-এ সবই ইলহামের অন্তর্ভুক্ত।

ইবরাহিম বলেন, আমি আবু ইয়াযিদের মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। লোকজন বলাবলি করছিল, অমুক অমুক থেকে হাদিস শুনেছে, অমুক এটা- ওটা বর্ণনা করেছে ইত্যাদি। আবু ইয়াযিদ এ সব শুনে বললেন, হে দোস্তরা! তোমরা মৃত মানুষের কাছ থেকে মৃতদের জন্য ইলম নিয়ে এসেছ। আর আমি এনেছি মহাচিরঞ্জীব আল্লাহর কাছ থেকে।

গ্রন্থকার বলেন, প্রথম ঘটনায় আবু ইয়াযিদ ফিকাহ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, তা ছিল তার স্বল্পজ্ঞানের পরিচায়ক। কেননা তিনি যদি আলেম হতেন, তাহলে অবশ্যই জানতেন-কোনো বিষয়ের ইলহাম হওয়া কখনোই ইলম-পরিপন্থী হতে পারে না। ইলমকে ডিঙিয়ে ইলহামের কাছে যাওয়া যায় না। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
'নিশ্চয় বিভিন্ন নবীর উম্মতে মুহাদ্দিসিন ছিলেন। আর আমার মুহাদ্দিস হচ্ছে ওমর।'

মুহাদ্দিস দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, ভালো বিষয়ের ইলহাম হওয়া। কিন্তু ইলহামওয়ালার কাছে যদি ইলমের বিপরীত কোনো ইলহাম আসে, তাহলে তার ওপর আমল করা জায়েয নেই। হজরত খিযির আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলা হয়, তিনি নবী ছিলেন। এ কথাকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, নবীদেরকে ওহির মাধ্যমে বিভিন্ন পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়। এটা ইলম ও তাকওয়ার ফলাফল। তাকওয়াবান ব্যক্তিকে ভালো কাজের তাওফিক দেয়া হয় এবং 'রুশদ' এর ইলহাম করা হয়। সুফিরা যে দাবি করে আসছে, আলেমরা মৃতের কাছ থেকে মৃতের ইলম অন্বেষণ করেছে। এমন দাবিদারের জানা নেই—কত বড় দাম্ভিকতাপূর্ণ কথা বলে ফেলেছে। এটা সরাসরি শরিয়তের ওপর আঘাত করার নামান্তর।

টিকাঃ
১. [মাউযূ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ৩৭২৪
২. [মাউযূ] আসিলসিলাতুয যাঈফাহ: হাদিস নং ৪২২
৩. [যঈফ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ৩৮৭৮
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৬৮৯, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৩৯৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00