📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সন্তানে অনগ্রহী ব্যাপারে সুফিদের ওপর ইবলিসের ধোঁকা

📄 সন্তানে অনগ্রহী ব্যাপারে সুফিদের ওপর ইবলিসের ধোঁকা


আবুল হাওয়ারী বলেন, আমি আবু সুলাইমান দারানি থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সন্তানের আশা পোষণ করে সে আহমক। এতে না জাগতিক উপকার আছে, না দীনি ফায়েদা। কেননা সে যদি পানাহার, নিদ্রা ও যৌনতার আকাঙ্ক্ষী করে, তাহলে সন্তানের কারণে এতে তার অসুবিধা দেখা দেবে।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, উপরোক্ত কথাটি মারাত্মক ভ্রান্তির বহিঃপ্রকাশ। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, পৃথিবী সৃষ্টি করার পেছনে মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছে হচ্ছে তিনি কেয়ামত পর্যন্ত এখানে মানুষের মধ্য থেকে মানুষের বংশ-পরম্পরা অব্যাহত রাখবেন। যেহেতু এ জগতে মানুষের জীবনের সময়কাল খুবই সীমিত, তাই তিনি মানুষের প্রকৃতি ও অভ্যাসের মাঝে যৌবন সৃষ্টি করে তাকে যৌনচাহিদা নিবারণের সুবন্দোবস্ত করেছেন। শরয়ি দৃষ্টিকোণে চিন্তা করলে আমরা দেখি আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ 'তোমরা কুমারী নারীদের বিয়ে করো।”

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
تناكحوا تناسلوا فاني أباهي بكم الأمم يوم القيامة ولو بالسقط "বিয়ে করো এবং বংশ বৃদ্ধি করো। কেননা আমি কেয়ামতের দিন তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে অন্যান্য উম্মতের ওপর গর্ব করব। যদিও তা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বেকার শিশু হোক না কেন।”

স্বয়ং নবীগণ আলাইহিমুস সালাম সন্তানের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছেন। সৎ ব্যক্তিরা সন্তান ধারণের বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করেছেন। অনেক সময় স্ত্রী-সহবাসের ফলে জগৎজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি জন্মলাভ করেন। যেমন ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, শাফেয়ি ও আহমাদ রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। এমন সহবাস হাজার বছর ইবাদতের চেয়ে উত্তম। স্বয়ং হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, স্ত্রীর সাথে সহবাসকারী, সন্তানদের খোরপোশের ব্যবাস্থাকারী, যে ব্যক্তির সন্তান মারা যায় অথবা যে সন্তান রেখে মারা যায়, এ সবকিছুর বিনিময়ে সে সাওয়াবপ্রাপ্ত হয়। অতএব যে ব্যক্তি সন্তানের আকাঙ্খা থেকে বিমুখ হয়ে থাকে সে সুন্নত ও উত্তম বিষয়ের বিরোধী এবং সুখপূজারি বলে সাব্যস্ত হবে।

জুনাইদ বলতেন, সন্তান হচ্ছে বৈধ সহবাসের শাস্তিস্বরূপ। তাহলে অবৈধ সহবাসের ফল কী হতে পারে? চিন্তা করে দেখো! লেখক আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, কথাটি ভুল। কেননা 'মুবাহ' ও বৈধ বস্তুকে কখনো শান্তি বলে আখ্যায়িত করা যায় না। এটি খুবই মন্দ কাজ। কেননা যে কাজ মুবাহ, তার ফলাফল শাস্তি কী করে হয়? শরিয়ত যে কাজের দিকে আহ্বান করেছে, তা অর্জন করা সাওয়াব বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।

টিকাঃ
১. সুরা নূর: আয়াত ৩২
২. [যঈফ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ২৪৮৪

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সফর ও বেরোজগার ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা

📄 সফর ও বেরোজগার ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা


শয়তান অধিকাংশ সুফির মনে অদ্ভুত প্ররোচনা জাগালে তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে এবং তা কোনো বিশেষ স্থান বা ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে নয়। অনেকেই সফরের উপকরণ ছেড়ে একাকী বেরিয়ে পড়ে এবং এটাকে 'তাওয়াক্কুল' বলে দাবি করে। বহু ফরয ও ফজিলতপূর্ণ আমল তার থেকে ছুটে যায়। বৈরাগীপনাকে তারা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত মনে করে থাকে এবং এর দ্বারা নিজেকে বেলায়েতের কাছাকাছি পৌঁছার দাবি করে। অথচ এরা নাফরমান এবং খোদাদ্রোহী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজন ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো স্থানে দৌড় দেয়া বা চক্কর দেয়া হতে নিষেধ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
لَا زِمَامَ وَلَا خِزَامَ وَلا رَهْبَانِيَةً وَلا تَبَتُلَ وَلا سِيَاحَةَ فِي الإِسْلامِ
'যিমাম, হাযাম, রাহবানিয়ত, তাবাতুল ও সিয়াহত ইসলামে নেই।”

ইবনে কুতাইবা বলেন, হাযাম চুল উপড়ে ফেলাকে বলা হয় যা উটের কুঁজের একদিকে রাখা হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দ্বারা বনি ইসরাইলের উপাসনাকারীদের বুঝিয়েছেন। তাবাতুল মানে বিয়ে থেকে বিমুখ হওয়া এবং সিয়াহাত বলা হয় নিজ এলাকা ছেড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে থাকা। ইমাম আবু দাউদ রহ. তার সুনানে আবু উমামা রা. এর হাদিস বর্ণনা করেছেন,
أَنْ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ: اِبْذَنْ لَّنَا فِي السَّيَاحَةِ، فَقَالَ: «إِنَّ سِيَاحَةَ أُمَّتِي الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
'এক ব্যক্তি আরয করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সিয়াহাতের অনুমতি প্রদান করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার উম্মতের সিয়াহাত হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।’'

গ্রন্থকার বলেন, হজরত উসমান ইবনে মাযউন রা. এর হাদিস আমরা পূর্বে বর্ণনা করে এসেছি। তিনি বলেছিলেন,
إِنَّ نَفْسِي تَحَدَّثُنِي بِأَنْ أَسِيحَ فِي الْأَرْضِ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» لَهُ مَهْلًا يَا عُثْمَانُ فَإِنَّ سِيَاحَةَ أُمَّتِي الْغَزْوُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْحَجُّ وَالْعُمْرَة
'ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার মন চায় আমি পৃথিবীতে ঘোরাঘুরি করি। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উসমান! দাঁড়াও! আমার উম্মতের সিয়াহাত হচ্ছে জিহাদ, হজ ও ওমরা।'

ইসহাক ইবনে ইবরাহিম ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল হতে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করল, যে ব্যক্তি বৈরাগ্যের সাথে ইবাদত-বন্দেগি করে, তাকে পছন্দ করেন, নাকি যে তার এলাকায় অবস্থান করে তাকে পছন্দ করেন? আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. উত্তরে বলেন, বৈরাগ্যবাদ ইসলামের কোনো অংশ নয় আর এটি আম্বিয়া ও নেককার ব্যক্তিদের কাজ নয়।

বাকি থাকল, একাকী সফর করা-তো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাকী সফর করতে নিষেধ করেছেন, হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত,
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُسَافِرَ الرَّجُلُ وَحْدَهُ 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাকী বনে-জঙ্গলে চলাফেরাকারীদের ওপর লানত করেছেন।”

টিকাঃ
৩. আবু দাউদ: হাদিস নং ২০০
৪. [যঈফ] যঈফুল জামে' হাদিস নং ৬২৮৭
১. সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ২৪৮৬, সহিহুল জামে': হাদিস নং ২০৯৩
২. শারহুসসুন্নাহ: ২/৩৭০-৩৭১
৩. প্রাগুক্ত

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 রাতের বেলা একাকী চলাফেরা

📄 রাতের বেলা একাকী চলাফেরা


সুফিরা রাতের বেলায় ঘোরাফেরা করে। অথচ এটি নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে, হজরত ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا فِي الْوَحْدَةِ مَا سَارَ أَحَدٌ وَحْدَهُ بِلَيْلٍ أَبَدًا “মানুষ যদি একাকী সফরের ক্ষতি সম্পর্কে জানত, তাহলে কখনো তারা রাতে একাকী বেরোত না।" তিনি আরও বলেছেন,
أَقِلُوا الْخُرُوجَ إِذَا هَدَأَتِ الرَّجُلُ إِنَّ اللَّهَ يَبُثُّ مِنْ خَلْقِهِ بِاللَّيْلِ مَا شَاءَ "গভীর রাতে তোমরা বের হয়ো না। কেননা রাতের বেলা আল্লাহ তায়ালা যা চান তা মাখলুকের মাঝে ছিটিয়ে দেন।”

গ্রন্থকার বলেন, অধিকাংশ সুফি সফরকে তাদের পেশা বানিয়ে রেখেছেন। অথচ সফর নিজে কোনো উদ্দেশ্য হতে পারে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
السَّفَرُ قِطْعَةُ مِنَ العَذَابِ، فَإِذَا قَضَى نَهْمَتَهُ مِنْ وَجْهِهِ فَلْيُعَجِّلْ إِلَى أَهْلِهِ “সফর আজাবের একটি টুকরো। সফরে তোমাদের প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে দ্রুত বাড়ি চলে যাও।”

অতএব যে ব্যক্তি সফরকে নিজের পেশা বানিয়ে রেখেছে, সে তো নিজেকে শাস্তিতে পতিত করল। এভাবে তার জীবনকে ধ্বংস করে যাচ্ছে। এ দু'টি উদ্দেশ্যই বাতিল। লেখক আরও বলেন, আবু হামযা খোরাসানি বর্ণনা করেছেন, আমি এহরামের সময় বহু কষ্ট-ত্যাগ স্বীকার করি। প্রতি বছর হাজার মাইল সফর করি। আমার মাথার ওপর সূর্য উঠত আর ডুবত। এভাবেই আমি এহরাম বেঁধে নিতাম। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে এমন তাওফিক কামনা করি যা দ্বারা তুমি আমার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাও।

টিকাঃ
৪. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২৯৯৮
৫. [সহিহ] সহিহুল জামে': হাদিস নং ১১৮৪
৬. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৮০৪, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৯২৭

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পান্থেয় ছাড়া বেরিয়ে পড়ার ব্যাপারে সুফিদের ওপর ইবলিসের ধোঁকা

📄 পান্থেয় ছাড়া বেরিয়ে পড়ার ব্যাপারে সুফিদের ওপর ইবলিসের ধোঁকা


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ইবলিস সুফিদের বৃহৎ একটি গোষ্ঠীকে এই সন্দেহে পতিত করে রেখেছে যে, সহায়-সম্বল ও উপায়-উপকরণ ছাড়া সফর করাকে 'তাওয়াক্কুল' বলা হয়। পূর্বে আমরা এর ক্ষতিকারক দিকসমূহ নিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু বিষয়টিকে জাতির অজ্ঞ লোকেরা ভালো দৃষ্টিতে প্রচার করতে থাকে। গল্পচ্ছলে আহমকরা এসব ঘটনাকে তাওয়াক্কুলের পরিচায়ক হিসেবে উপস্থাপন করে বেড়ায়। এতে বিদয়াতিরা আরও প্ররোচিত হতে থাকে। অজ্ঞদের প্রশংসার কারণে সঠিক পথ আড়ালে ঢেকে যায়। এ ব্যাপারে বহু ঘটনা লোকমুখে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। আমরা এর কিছু তুলে ধরছি :

আলী ইবনে সাহাল বসরি রহ. বলেন, ফাহাত মুসিল্লী আমাকে বলেছেন, আমি হজের সফরে এক বিস্তীর্ণ মাঠে পৌঁছলে অল্পবয়সী এক বালককে দেখতে পাই। আমি মনে মনে ভাবলাম, আল্লাহু আকবার! এই বিস্তীর্ণ প্রান্তরে একাকী এ ছেলে কোথায় যাচ্ছে? দ্রুত হেঁটে আমি তার কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে তাকে বললাম, বৎস! তুমি তো এখনও ছোট বালক, তোমার ওপর তো শরিয়তের বিধান জারি হয়নি। সে বলল, হে জনাব! আমার চেয়েও ছোট বালক পরপারে চলে যায়। আমি বললাম, তাহলে দ্রুত বেগে চলো। কেননা মঞ্জিলে পৌঁছার রাস্তা বহু দূর। সে বলল, চাচাজান! আমার চলার সামর্থ্য আছে, কিন্তু পৌঁছানোর এখতিয়ার আল্লাহর কাছে। আপনি কি আল্লাহ তায়ালার ইরশাদ পড়েননি?
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمُ
'যে ব্যক্তি আমার জন্য কষ্ট-পরিশ্রম করে, আমি তাকে আমার রাস্তা বাতলে থাকি।”” আমি বললাম, তোমার কাছে দেখছি সফরের কোনো সহায়-উপকরণ ও সাওয়ারি-বাহন নেই! সে জবাব দিল, হে চাচা! 'একিন' হচ্ছে আমার সহায়, আর 'আশা' আমার বাহন। আমি বললাম, আমি তোমার কাছে রুটি ও পানির ব্যাপারে জানতে চেয়েছি। সে বলল, চাচা! আপনি তাহলে বলুন, আপনাকে যদি আপনার কোনো ভাই বা নিকটাত্মীয় তার ঘরে দাওয়াত করে, আপনি কি তখন নিজের ঘর থেকে খাবার তৈরি করে তার বাড়িতে গিয়ে খাওয়া পছন্দ করবেন? এ কথা শুনে আমি তাকে বললাম, আমি তোমাকে সফরের কিছু সহায়-উপকরণ দিয়ে দিই? সে বলল, হে মিথ্যাবাদী! আমার কাছ থেকে দূর হয়ে যাও! আল্লাহ তায়ালা আমাকে খাওয়ান, পান করান। ফাতাহ মুসিল্লী বলেন, আমি এ বালকের চেয়ে ছোট আর কোনো বালককে এমন তাওয়াক্কুলসম্পন্ন দেখিনি, কোনো বড় বুযুর্গকেও তার মতো সংসারত্যাগী ও যাহেদ হিসেবে পাইনি।

গ্রন্থকার বলেন, এমন ঘটনাগুলোই সঠিক কর্মসাধনে বিঘ্ন ঘটায় এবং মনে হয় এটা সঠিক পন্থা। বিখ্যাত মনীষীরা যেহেতু বলছেন, এমন ছোট বালক এমন এমন করেছেন। তাহলে আমরা তো তার চেয়ে অধিক উপযোগী। উক্ত বালকের কর্মকাণ্ডে তো আশ্চর্যের কিছু নেই, কিন্তু আশ্চর্য লাগছে তার ওপর, যিনি তাকে এভাবে দেখেও বলেননি যে, এটা শরিয়তসম্মত পন্থা নয়। এটাও কেন বলেননি যে, যে মহান প্রতিপালক তোমাকে তার ঘরের দিকে আহ্বান করেছেন, তিনি তার দেয়া সম্পদ হতে সফরের সহায়-সম্বল ও উপায়-উপকরণ নিয়ে যেতে বলেছেন। দুঃখ হয় বড়রাও যখন এ ব্যাপারে উদাসীন, ছোটদের কথা বলাই বাহুল্য।

আবু আবদুল্লাহ আলজালার নিকট জনৈক ব্যক্তি জানতে চাইল, সহায়-সম্বল ও উপায়-উপকরণ ছাড়া বন-বাদাড়ে যাওয়া এবং এটাকে তাওয়াক্কুলসম্মত কাজ বলে মনে করা, আর সেই বন-জঙ্গলেই মারা যাওয়ার ব্যাপারে আপনার কী অভিমত? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, এটা হকপন্থীদের কাজ। সে মারা গেলে খুনিকে দিয়্যত দিতে হবে।

গ্রন্থকার বলেন, এটা এমন এক ব্যক্তির ফাতাওয়া, যে শরিয়ত সম্পর্কে মোটেই ওয়াকিফহাল নন। কেননা উম্মতের সর্বসম্মত মতানুসারে সহায়-সম্বল ও উপায়-উপকরণ ছাড়া বন-জঙ্গলে যাওয়া অবৈধ। অন্যথায় যে এর বিপরীত করে সেখানে মারা যাবে, সে আল্লাহর নাফরমান হিসেবে সাব্যস্ত হবে এবং জাহান্নামের উপযোগী বলে বিবেচিত হবে। উপরন্তু প্রাণ সংহারের এমন আশঙ্কা পূর্ব থেকে আঁচ করা সত্ত্বেও এমন পরিবেশে নিজেকে পতিত করা ধ্বংসের কারণ। কেননা আল্লাহ তায়ালা প্রাণকে আমাদের কাছে আমানত হিসেবে গচ্ছিত রেখেছেন এবং বলেছেন, وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ "তোমাদের নিজেকে ধ্বংস কোরো না।" এ ব্যাপারে আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি যে, কষ্টদায়ক বস্তু থেকে দূরে থাকা ওয়াজিব। আল্লাহ তায়ালা বাণী- وَتَزَوَّدُوا 'তোমরা প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে সফর করো।" এর বিপরীত।

আবদুল্লাহ ইবনে খাফিফ বলেন, আমি আমার তৃতীয় সফরে 'সিরাজ' শহর থেকে একাকী বনে চলে গিয়েছিলাম। সেখানে ক্ষুধা-পিপাসার তীব্রতায় এত অধিক কষ্ট অনুভব হয়েছিল যে, আমার আটটি দাঁত পড়ে গিয়েছিল এবং শরীরের সমুদয় কেশ পড়ে গিয়েছিল। লেখক বলেন, লোকটি এমনভাবে ঘটনার বিবরণ দিচ্ছে যেন তা খুব প্রশংসনীয় কাজ! অথচ এটি বড়ই নিন্দনীয় বিষয়।

সুফি আবু হামযা বলেন, আমি পেট পুরে খেয়ে তাওয়াক্কুলের দাবি করে জঙ্গলে অবস্থান করার ব্যাপারে আল্লাহকে লজ্জা করি। ঘর থেকে সফরের উপকরণ নেয়া ও পেট ভরে খেয়ে সফর করা আমি পছন্দ করি না। গ্রন্থকার বলেন, এমন উদ্ভট দাবির খণ্ডনে বিস্তর আলোচনা গত হয়েছে। এসব লোক মনে করে, প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ ছেড়ে দেয়ার নাম তাওয়াক্কুল। যদি এমন হতো, তাহলে কেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ নিয়ে গারে হেরায় তাশরিফ নিয়েছেন? তার কি তাওয়াক্কুলের কমতি ছিল? অনুরূপভাবে হজরত মুসা আলাইহিস সালাম যখন হজরত খিযির আলাইহিস সালাম এর সন্ধানে দীর্ঘ সফরে যাচ্ছিলেন, তখন কেন প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণের পাশাপাশি মাছ ইত্যাদি সঙ্গে নিয়েছিলেন? এছাড়া আসহাবে কাহাফ দেশান্তরী হতে চাইলে কেন তারা সঙ্গে কিছু দিরহাম তথা মুদ্রা রেখে দিয়েছিলেন?

মূল কথা হচ্ছে, এ সব লোক তাওয়াক্কুলের অর্থই জানেন না। এ ব্যাপারে তারা অজ্ঞই থেকে গেছেন। আবু হামেদ রহ. মানুষের জন্য উপায় বের করে বলেছেন, প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ ছাড়া বন-জঙ্গলে অবস্থান করা দুই শর্তে বৈধ। ১. এ ব্যাপারে মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে হবে যে, অনাহারে সে অন্তত এক সপ্তাহ অতিবাহিত করতে পারবে। ২. সেখানে ঘাস-পাতা ইত্যাদি খাওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। হতে পারে সেখানে এক সপ্তাহ পর কোনো মানুষজনের দেখা পাবে কিংবা খাওয়ার উপযোগী কোনো বৃক্ষ-লতা-গুল্ম মিলে যাবার সম্ভাবনা থাকবে। আর এতে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

আমি বলি, একজন জ্ঞানী লোক কী করে এমন অভিমত ব্যক্ত করতে পারলেন! কেননা এমনও হতে পারে, হয়তো কারও দেখা সেখানে পাবে না, কখনো-বা রাস্তা ভুলে যাবার আশঙ্কা থাকতে পারে। অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না, তখন তার জন্য ঘাস খাওয়া সমীচীন হতে পারে না। আবার কখনো এমন লোকও পাওয়া যেতে পারে, যে তাকে কোনো প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করবে না, মেহমানদারি করবে না। এমতাবস্থায় সে মারা যেতে পারে, যখন তার কাছে কেউ থাকবে না। এছাড়া আমরা একাকী সফরের ক্ষতিকর দিকগুলো উল্লেখ করে এসেছি। এমন অহেতুক কষ্ট সহ্য করার কী প্রয়োজন? যে ভরসা করছে তার অভ্যাসের ওপর বা কোনো ব্যক্তির সাক্ষাতের ওপর। ঘাসের এমন রুটি খাওয়ার কি কোনো বিশেষ ফজিলত আছে? নিজেকে এমন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া সালফে সালেহীনদের মধ্যে কার নিদর্শন ছিল? তারা কি এমন কর্মকাণ্ড দ্বারা আল্লাহকে পরীক্ষা করতে চায়? আল্লাহ নিঝুম এই বন-জঙ্গলে রুটি-রুজি দেন কি না!? (নাউযুবিল্লাহ) যে ব্যক্তি জঙ্গলে খাদ্য অন্বেষণ করে বেড়ায়, সে অপ্রচলিত বস্তুর সন্ধান করে। তোমাদের কি জানা নেই মুসা আলাইহিস সালাম এর গোত্র যখন সুস্বাদু খাদ্যের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিল তখন আল্লাহ তায়ালা -اهبطوا مصرا "শহরে চলে যাও” বলে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ তারা এমন বস্তুর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে যা কেবল শহরেই পাওয় যায়। অতএব এসব লোক মস্তবড় ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত। এটা শরিয়ত ও বিবেক-বোধপরিপন্থী বিষয় এবং মনগড়া কার্যকলাপ হিসেবেই বিবেচিত।

ইকরামা ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, ইয়ামেনের অধিবাসীরা হজে আসার সময় সফরের প্রয়োজনীয় উপকরণ সঙ্গে আনত না। তারা বলত, আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করছি। এ সব লোক হজ করত আর মক্কায় এসে মানুষের সামনে ভিক্ষার হাত পেতে দিত। আল্লাহ তায়ালা তখন এই আয়াত অবতীর্ণ করেন:
وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوى 'তোমরা সফরের প্রয়োজনীয় উপকরণ সঙ্গে রাখো। কেননা সফরের উন্নত উপকরণ তাকওয়ার অন্তর্ভুক্ত।”

মুহাম্মাদ ইবনে মুসা জুরজানি বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনে কাসির সানয়ানির কাছে ওই সকল দুনিয়াত্যাগীদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম, সফরের সময় যারা প্রয়োজনীয় উপকরণ সঙ্গে নেয় না; এমনকি জুতা-মোজাও ব্যবহার করে না। উত্তরে তিনি বললেন, তুমি আমাকে শয়তানের বংশধরদের সম্পর্কে প্রশ্ন করেছ; যাহেদ তথা দুনিয়াবিরাগীদের ব্যাপারে প্রশ্ন করোনি। আমি বললাম, তাহলে 'যুহদ' তথা দুনিয়াবিরাগ কী? তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নত মতে আমল করা এবং সাহাবায়ে কেরামের সাথে সাদৃশ্য রাখা।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর কাছে যারা সফরের সময় প্রয়োজনীয় উপকরণ সঙ্গে না নিয়ে বন-জঙ্গলে অবস্থান করে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি কঠিন ভাষায় তা অস্বীকার করেন। বলেন, উফ্ উফ, না! না! সফরের সময় প্রয়োজনীয় উপকরণ, সঙ্গী ও কাফেলা ছাড়া কখনো কোথাও যাওয়া উচিত নয়। তিনি এ কথা উচ্চৈঃস্বরে বললেন।

আবু আবদুল্লাহ আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর কাছে জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, এক ব্যক্তি সফর করতে চায়। আপনি সফরের সময় প্রয়োজনীয় উপকরণ সঙ্গে নেয়া পছন্দ করেন নাকি তাওয়াক্কুল তথা ভরসা করা পছন্দ করেন? উত্তরে তিনি বললেন, সফরের সময় প্রয়োজনীয় উপকরণ সঙ্গে নেয়া আবশ্যক অথবা এমন তাওয়াক্কুল করা যে, তাকে কেউ কিছু দেয়ার জন্য সে যেন মাথা উপরের দিকে না উঠায়।

খাল্লাল বলেন, আমাকে ইবরাহিম ইবনে খলিল বর্ণনা করেছেন, আহমদ ইবনে নাসার লোকদেরকে বর্ণনা করেছিলেন যে, এক ব্যক্তি আবু আবদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করল, তাওয়াক্কুল করে মক্কায় যেতে চাই এবং নিজের সঙ্গে সফরের সময় প্রয়োজনীয় উপকরণ নেব না বলে ভাবছি। আবু আবদুল্লাহ বললেন, আমার জানা নেই তুমি খাবে কোথা থেকে? সে বলল, তাওয়াক্কুল করব, তাহলে মানুষ আমাকে কিছু খেতে দেবে। তিনি বললেন, মানুষ যদি কিছু না দেয়, তাহলে কি তাদের দিকে মুখ তুলবে না যাতে মানুষ তোমাকে কিছু দেয়? এটা আমি ভালো দৃষ্টিতে দেখছি না। আমি এমন কোনো হাদিস সম্পর্কে অবগত নই, যেখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবা বা তাবেয়িনরা এমন করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর কাছে খোরাসানি একজন ব্যক্তি এসে বলল, হে আবু আবদুল্লাহ! আমার কাছে এক দিরহাম আছে। এটা নিয়ে আমি হজে যাব। ইমাম সাহেব তাকে বললেন, তুমি বাবুল কারাখে গিয়ে এই দিরহাম দিয়ে কিছু বরই ক্রয় করো। এটা মাথায় নিয়ে ফেরি করে বিক্রয় করতে থাকো। যখন তোমার কাছে তিনশত দিরহাম জমা হবে তখন হজের উদ্দেশে গমন কোরো। সে বলল, হে আবু আবদুল্লাহ! আপনি মানুষের জন্য জীবিকার বিষয় নিয়ে ভাবছেন? ইমাম সাহেব বললেন, দেখো এই অপদার্থ কী বলছে! তুমি কি মানুষের জন্য জীবিকা নির্বাহের উপকরণকে অস্বীকার করছ? সে বলল, হে আবু আবদুল্লাহ! আমি তাওয়াক্কুল করব। ইমাম সাহেব তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জঙ্গলে মানুষের সাথে যাবে, নাকি একাকী? সে উত্তর দিল, মানুষের সাথে যাব। ইমাম সাহেব বললেন, তুমি মিথ্যাবাদী, ভরসাকারী নও। একাকী যাও নতুবা মানুষজনের থলের ওপর ভরসা করো।

টিকাঃ
১. সুরা আনকাবূত: আয়াত ৬৯
১. সুরা বাকারা: আয়াত ১৯৭
২. সুরা বাকারা: আয়াত ৬১
১. সুরা বাকারা: আয়াত ১৯৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00