📄 বিয়ে বিতৃষ্ণ সুফি মতাদর্শের খণ্ডন
ইবলিস অধিকাংশ সুফিকে ধোঁকা দিয়ে তাদেরকে বিয়ে-শাদী থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তাই পূর্বেকার সুফিরা ইবাদতে মত্ত থাকার নিমিত্তে বিয়ে করতেন না। তারা মনে করতেন এতে ইবাদতে বিঘ্ন ঘটে। এদের যদি বিয়ের চাহিদা জাগত বা এ-জাতীয় কোনো আকর্ষণ দেখা দিত, তাহলে নিশ্চিত তারা শরীর ও দীনকে শঙ্কায় ফেলতেন। আর যদি বিয়ের চাহিদা না জাগত বা এ-জাতীয় কোনো আকর্ষণ দেখা না দিত, তাহলে এই ফজিলত থেকে বঞ্চিত থাকত। সহিহাইনে আছে, হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَيَأْتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُونُ لَهُ فِيهَا أَجْرٌ قَالَ أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي الْحَرَامِ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيهَا وِزْرُ قَالُوا نَعَمْ قَالَ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلَالِ كَانَ لَهُ فِيهَا أَجْرُ ثم قال أفتحتسبون الشر ولا تحتسبون الخير
'তোমাদের বিশেষ অঙ্গেরও সদকা আছে। সাহাবারা আরয করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দ্বারা তো আমরা নিজের প্রবৃত্তি নিবারণ করে থাকি। তাতেও কি সদকা হবে? তিনি বললেন, অবশ্যই। বলো, যদি সে তার প্রবৃত্তি অপাত্রে পূরণ করত তাহলে সে কি গুনাহগার হতো না? সাহাবারা বলেলেন, হ্যাঁ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা এর মন্দ দিকটা দেখছ আর ভালো দিকটা দেখছ না?”
সুফিদের কারো কারো অভিমত হচ্ছে, বিয়ের কারণে রুটি-রুজির পেছনে পড়তে হয়। জীবিকা নির্বাহ করা বড় কঠিন কাজ। তাদের এই অজুহাত কেবল জীবিকা অর্জনের কষ্ট থেকে গা বাঁচিয়ে রাখার জন্য। সহিহাইনে আছে, হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
دِينَارُ أَنْفَقْتَهُ فِي سَبِيلِ اللهِ وَدِينَارُ أَنْفَقْتَهُ فِي رَقَبَةٍ، وَدِينَارُ تَصَدَّقْتَ بِهِ عَلَى مسْكِينٍ، وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ، أَعْظَمُهَا أَجْرًا الَّذِي أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ
'এক দিনার তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো, এক দিনার গোলাম ও কর্মচারীদের জন্য ব্যয় করো, এক দিনার তোমরা সদকা করো, আর এক দিনার তোমরা পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করো। এসবের সেটাই সর্বोत्কৃষ্ট দিনার যা তোমরা নিজেদের পরিবার-পরিজনদের জন্য ব্যয় করে থাকো।'
সুফিদের কেউ কেউ আছেন যারা বলেন, বিয়ে দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার উপকরণ। আবু সোলায়মান দারানি হতে বর্ণিত, যখন মানুষ হাদিসের সন্ধানে বা জীবিকার সন্ধানে সফর করে, তখন তা দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট করে। গ্রন্থকার বলেন, এসব কথা শরিয়তবিরোধী। কেন হাদিসের সন্ধানে বের হওয়া যাবে না? অথচ তালেবে ইলমদের জন্য ফেরেশতারা তাদের পাখা বিছিয়ে দেন। অন্যদিকে জীবিকার সন্ধানে কেন বের হওয়া দূষণীয় হবে? অথচ হজরত ওমর রা. বলেন, আমি যদি জীবিকার সন্ধানে পরিশ্রম করতে গিয়ে মারা যাই তা আমার নিকট আল্লাহর রাস্তায় গাজী হয়ে মৃত্যুবরণ করা অপেক্ষা উত্তম। আর বিয়ে-শাদী কেন নিন্দনীয় হবে? অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা বিয়ে করো এবং বংশ বৃদ্ধি করো।” আমার মতে উপরোক্ত বাহানাগুলো শরিয়তবিরোধী হিসেবে বিবেচ্য।
আবু হামেদ বলেন, সুফিদের কেউ কেউ প্রসিদ্ধ যাহেদ তথা দুনিয়ারিবাগী সাজার জন্য বিয়ে-শাদি থেকে দূরে থাকে। সাধারণ মানুষ সুফিদেরকে খুব সম্মান করে থাকে। কারণ তাদের কোনো স্ত্রী থাকে না। তারা আরও বলে থাকে, অমুক বুযুর্গ জীবনে কখনো নারী সংশ্রবে পতিত হননি। অথচ এই বৈরাগ্যবাদী ইসলামি শরিয়তের বিপরীত।
তিকরিতী বলেন, মুরিদদের উচিত নিজ থেকে বিয়ে-শাদীর প্রতি ঝুঁকে না পড়া। কেননা এতে সুলুক থেকে দূরে সরে যাবে। লেখক বলেন, এই লোকের কথা আমার কাছে খুব আশ্চর্য লেগেছে। তার এটুকু জ্ঞান নেই যে, কেউ তার নিজের যৌনচাহিদার নিয়ন্ত্রণ, বিবি-বাচ্চার খোরপোশ ইত্যাদিতে সচেষ্ট হলে তা কখনো সুলুকের বিপরীত হয় না। আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেন,
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً
"আল্লাহ তায়ালা তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য জোড়া সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা আরামে থাকতে পার। তিনি তোমাদের পরস্পরে মুহব্বত ও ভালোবাসার জন্য দিয়েছেন।”
সহিহ হাদিসে আছে, হজরত জাবের রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেন,
هَلَّا تَزَوَّجْتَ بِكْرًا تُلاعِبُهَا وَتُلاعِبُكَ
‘হে জাবির! তুমি কেন কুমারী মেয়ে বিয়ে করছ না? যাতে তুমি তার সাথে খেলতে পার এবং সেও তোমার সাথে খেলতে পারে!”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো জাবের রা.-কে এমন বিষয়ে নির্দেশনা দিতেন না যা আল্লাহর নৈকট্য থেকে তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখে। “স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীগণদের সাথে প্রীতিময় আচরণ করতেন।” তিনি হজরত আয়েশা রা. এর সাথে দৌড় খেলা খেলতেন। এ সব কাজ কি আল্লাহ তায়ালার নৈকট্যবিরোধী? বরং সুফিদের ওসব কথা অজ্ঞতার পরিচায়ক।
টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১০০৬
২. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৯৯৫
৩. [যঈফ] যঈফুল জামে' হাদিস নং ২৪৮৪
১. সুরা রূম: আয়াত ২১
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫০৭৯
৩. লেখক এখানে উম্মে যারা'র হাদীসের প্রতি ইংগিত করেছেন- যা বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।
📄 বিয়ে বিতৃষ্ণতার নেপথ্যে
জেনে রাখা দরকার, যুবক যুবক সুফিরা যখন বিয়ে-শাদি ছেড়ে চিরকুমার থাকতে চায় তখন তারা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা:
১. বীর্যস্খলন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। কেননা বীর্য যখন দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আবদ্ধ থাকে, তখন তার বিষাক্ত প্রভাব মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে। আবু বকর মুহাম্মাদ বিন যাকারিয়া রাযি. বলেন, আমি এমন এক গোত্র সম্পর্কে জানি, যাদের অনেক বীর্য ছিল। অতঃপর যখন তারা দর্শনতত্ত্বে প্রভাবিত হয়ে তা আবদ্ধ করে রাখে, তখন তাদের যৌনচাহিদা হ্রাস পেতে থাকে। তাদের শরীর বিকৃত হয়ে যেতে থাকে এবং হজমশক্তিতে বিঘ্ন ঘটে। চলাফেরায় সমস্যা দেখা দেয়। তিনি আরও বলেন, সহবাসবিরোধী এক ব্যক্তিকে আমি দেখেছি, তার রুচি ও খাদ্যগ্রহণশক্তি শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, সামান্য খেলেও তা আর হজম হয় না। পরে সহবাসের অভ্যাসে ফিরে আসলে তৎক্ষণাৎ এই ব্যাধি দূরীভূত হয়ে যায়।
২. দ্বিতীয় প্রকারের যুবক সুফিরা যা কিছু পরিত্যাগ করেছিল, তার ওপর আরও প্রচণ্ডভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। সুফিদের অনেকে এমন আছেন, যারা বিয়ে-শাদী থেকে দূরে থেকে ধৈর্যধারণ করেছেন এবং তাদের বীর্য আবদ্ধ রয়েছে। পরে হুঁশ ফিরলে আবার যৌনকর্মে মত্ত হয়ে যায়। জাগতিক বিষয়গুলো থেকে তারা যে পরিমাণ দূরে অবস্থান করেছিল, দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে আবার তাতে ফিরে আসে। এর উদাহরণ হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি কয়েক দিন উপোস থাকার পর তীব্র ক্ষুধা নিয়ে যখন খেতে বসে, সে তখন নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে বেশি খেয়ে থাকে। যেন উপোস থাকাকালীন খাবারগুলোও সে সাবাড় করে ছাড়বে।
৩. তৃতীয় শ্রেণির সুফিরা ছেলেদের সাথে অযাচারে লিপ্ত হয়। সুফিদের অনেকে এমন আছে যারা বিয়ে-শাদী থেকে বিমুখ ও বিতৃষ্ণ হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের বীর্যগুলো আবদ্ধ হয়ে আছে। তারা তখন সুদর্শন বালকদের সাথে সহবাস করে বিকৃত প্রশান্তি অনুভব করে।
***
সুফিদের একটি দলকে শয়তান এমনভাবে আকৃষ্ট করল যে, তারা বিয়ে করেছে ঠিকই আবার বলতে থাকে আমরা যৌনচাহিদা চরিতার্থ করতে বিয়ে করিনি। এক্ষেত্রে তারা যদি মনে করে বিয়ে আমরা কেবল সুন্নত আদায়ের নিমিত্তে করেছি, তাহলে ঠিক আছে। আর যদি বলে বিয়ের ওপর তার আগ্রহ ছিল না বা নেই, তাহলে তা খুব চিন্তার বিষয়।
কিছু কিছু লোককে অজ্ঞতা এমন প্ররোচনা দিতে থাকে যে, তারা পুরুষাঙ্গ কর্তন করে ফেলে। তারা ভাবে আল্লাহ তায়ালাকে লজ্জা করার নিদর্শন হিসেবে তারা এমন কর্মকাণ্ড করেছেন। অথচ এটি মারাত্মক আহমকি। কেননা আল্লাহ তায়ালা এই অঙ্গের কারণে নারীদের ওপর পুরুষকে সম্মানিত করেছেন। মানবজন্মের পরম্পরা বহমান রাখার নিমিত্তে তিনি এই অঙ্গ দান করেন। যে এটি কর্তন করে মুখে বলে ভালো উদ্দেশ্যের কথা— তার কথা ভিত্তিহীন ও অসার বলে বিবেচিত। উপরন্তু পুরুষাঙ্গ কর্তন করার ফলে তার যৌনস্পৃহা স্তিমিত হয়ে যায়নি। সুতরাং তার লক্ষ্য ভিত্তিহীন।
টিকাঃ
৪. সুনাদে আবু দাউদ: হাদিস নং ২৫৭৮
📄 সন্তানে অনগ্রহী ব্যাপারে সুফিদের ওপর ইবলিসের ধোঁকা
আবুল হাওয়ারী বলেন, আমি আবু সুলাইমান দারানি থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সন্তানের আশা পোষণ করে সে আহমক। এতে না জাগতিক উপকার আছে, না দীনি ফায়েদা। কেননা সে যদি পানাহার, নিদ্রা ও যৌনতার আকাঙ্ক্ষী করে, তাহলে সন্তানের কারণে এতে তার অসুবিধা দেখা দেবে।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, উপরোক্ত কথাটি মারাত্মক ভ্রান্তির বহিঃপ্রকাশ। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, পৃথিবী সৃষ্টি করার পেছনে মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছে হচ্ছে তিনি কেয়ামত পর্যন্ত এখানে মানুষের মধ্য থেকে মানুষের বংশ-পরম্পরা অব্যাহত রাখবেন। যেহেতু এ জগতে মানুষের জীবনের সময়কাল খুবই সীমিত, তাই তিনি মানুষের প্রকৃতি ও অভ্যাসের মাঝে যৌবন সৃষ্টি করে তাকে যৌনচাহিদা নিবারণের সুবন্দোবস্ত করেছেন। শরয়ি দৃষ্টিকোণে চিন্তা করলে আমরা দেখি আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ 'তোমরা কুমারী নারীদের বিয়ে করো।”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
تناكحوا تناسلوا فاني أباهي بكم الأمم يوم القيامة ولو بالسقط "বিয়ে করো এবং বংশ বৃদ্ধি করো। কেননা আমি কেয়ামতের দিন তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে অন্যান্য উম্মতের ওপর গর্ব করব। যদিও তা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বেকার শিশু হোক না কেন।”
স্বয়ং নবীগণ আলাইহিমুস সালাম সন্তানের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছেন। সৎ ব্যক্তিরা সন্তান ধারণের বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করেছেন। অনেক সময় স্ত্রী-সহবাসের ফলে জগৎজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি জন্মলাভ করেন। যেমন ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, শাফেয়ি ও আহমাদ রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। এমন সহবাস হাজার বছর ইবাদতের চেয়ে উত্তম। স্বয়ং হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, স্ত্রীর সাথে সহবাসকারী, সন্তানদের খোরপোশের ব্যবাস্থাকারী, যে ব্যক্তির সন্তান মারা যায় অথবা যে সন্তান রেখে মারা যায়, এ সবকিছুর বিনিময়ে সে সাওয়াবপ্রাপ্ত হয়। অতএব যে ব্যক্তি সন্তানের আকাঙ্খা থেকে বিমুখ হয়ে থাকে সে সুন্নত ও উত্তম বিষয়ের বিরোধী এবং সুখপূজারি বলে সাব্যস্ত হবে।
জুনাইদ বলতেন, সন্তান হচ্ছে বৈধ সহবাসের শাস্তিস্বরূপ। তাহলে অবৈধ সহবাসের ফল কী হতে পারে? চিন্তা করে দেখো! লেখক আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, কথাটি ভুল। কেননা 'মুবাহ' ও বৈধ বস্তুকে কখনো শান্তি বলে আখ্যায়িত করা যায় না। এটি খুবই মন্দ কাজ। কেননা যে কাজ মুবাহ, তার ফলাফল শাস্তি কী করে হয়? শরিয়ত যে কাজের দিকে আহ্বান করেছে, তা অর্জন করা সাওয়াব বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।
টিকাঃ
১. সুরা নূর: আয়াত ৩২
২. [যঈফ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ২৪৮৪
📄 সফর ও বেরোজগার ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
শয়তান অধিকাংশ সুফির মনে অদ্ভুত প্ররোচনা জাগালে তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে এবং তা কোনো বিশেষ স্থান বা ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে নয়। অনেকেই সফরের উপকরণ ছেড়ে একাকী বেরিয়ে পড়ে এবং এটাকে 'তাওয়াক্কুল' বলে দাবি করে। বহু ফরয ও ফজিলতপূর্ণ আমল তার থেকে ছুটে যায়। বৈরাগীপনাকে তারা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত মনে করে থাকে এবং এর দ্বারা নিজেকে বেলায়েতের কাছাকাছি পৌঁছার দাবি করে। অথচ এরা নাফরমান এবং খোদাদ্রোহী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজন ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো স্থানে দৌড় দেয়া বা চক্কর দেয়া হতে নিষেধ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
لَا زِمَامَ وَلَا خِزَامَ وَلا رَهْبَانِيَةً وَلا تَبَتُلَ وَلا سِيَاحَةَ فِي الإِسْلامِ
'যিমাম, হাযাম, রাহবানিয়ত, তাবাতুল ও সিয়াহত ইসলামে নেই।”
ইবনে কুতাইবা বলেন, হাযাম চুল উপড়ে ফেলাকে বলা হয় যা উটের কুঁজের একদিকে রাখা হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দ্বারা বনি ইসরাইলের উপাসনাকারীদের বুঝিয়েছেন। তাবাতুল মানে বিয়ে থেকে বিমুখ হওয়া এবং সিয়াহাত বলা হয় নিজ এলাকা ছেড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে থাকা। ইমাম আবু দাউদ রহ. তার সুনানে আবু উমামা রা. এর হাদিস বর্ণনা করেছেন,
أَنْ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ: اِبْذَنْ لَّنَا فِي السَّيَاحَةِ، فَقَالَ: «إِنَّ سِيَاحَةَ أُمَّتِي الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
'এক ব্যক্তি আরয করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সিয়াহাতের অনুমতি প্রদান করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার উম্মতের সিয়াহাত হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।’'
গ্রন্থকার বলেন, হজরত উসমান ইবনে মাযউন রা. এর হাদিস আমরা পূর্বে বর্ণনা করে এসেছি। তিনি বলেছিলেন,
إِنَّ نَفْسِي تَحَدَّثُنِي بِأَنْ أَسِيحَ فِي الْأَرْضِ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» لَهُ مَهْلًا يَا عُثْمَانُ فَإِنَّ سِيَاحَةَ أُمَّتِي الْغَزْوُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْحَجُّ وَالْعُمْرَة
'ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার মন চায় আমি পৃথিবীতে ঘোরাঘুরি করি। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উসমান! দাঁড়াও! আমার উম্মতের সিয়াহাত হচ্ছে জিহাদ, হজ ও ওমরা।'
ইসহাক ইবনে ইবরাহিম ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল হতে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করল, যে ব্যক্তি বৈরাগ্যের সাথে ইবাদত-বন্দেগি করে, তাকে পছন্দ করেন, নাকি যে তার এলাকায় অবস্থান করে তাকে পছন্দ করেন? আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. উত্তরে বলেন, বৈরাগ্যবাদ ইসলামের কোনো অংশ নয় আর এটি আম্বিয়া ও নেককার ব্যক্তিদের কাজ নয়।
বাকি থাকল, একাকী সফর করা-তো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাকী সফর করতে নিষেধ করেছেন, হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত,
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُسَافِرَ الرَّجُلُ وَحْدَهُ 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাকী বনে-জঙ্গলে চলাফেরাকারীদের ওপর লানত করেছেন।”
টিকাঃ
৩. আবু দাউদ: হাদিস নং ২০০
৪. [যঈফ] যঈফুল জামে' হাদিস নং ৬২৮৭
১. সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ২৪৮৬, সহিহুল জামে': হাদিস নং ২০৯৩
২. শারহুসসুন্নাহ: ২/৩৭০-৩৭১
৩. প্রাগুক্ত