📄 বিয়েতে অনগ্রহী করার ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা হলে বিয়ে করা ওয়াজিব। আর যদি ব্যভিচারে পতিত হওয়ার আশঙ্কা না থাকে তবে বিবাহ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। এটা জামহুর তথা অধিকাংশ ফকিহদের মাযহাব। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেন, এমন অবস্থায় বিয়ে করা সকল প্রকার নফল ইবাদত অপেক্ষা উত্তম। কেননা তা সন্তানপ্রাপ্তির উপায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
تَنَاكَحُوا تَنَاسَلُوا “বিয়ে করো এবং বংশ বৃদ্ধি করো।”
আরও বলেছেন,
النَّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي، فَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي “বিয়ে করা আমার সুন্নত। যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, সে আমার দলভুক্ত নয়।”
عَنْ سَعْدِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: " رَدَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى عُثْمَانَ بْنَ مَطْعُونِ التَّبَتُلَ وَلَوْ أَذِنَ لَهُ فِيهِ لَاخْتَصَيْنَا
হজরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসমান ইবনে মাযঊন রা.-কে বিয়ে ছেড়ে দিতে বারণ করেছেন। যদি তিনি বিয়ে ছেড়ে অনুমতি দিতেন, তাহলে আমরা সবাই খাসি তথা যৌনশক্তি রহিত করার পন্থা অবলম্বন করতাম।"
عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ نَاسًا سَأَلُوا أَزْوَاجَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ عِبَادَتِهِ فِي السِّرِّ، قَالَ: فَحَمِدَ اللهَ، وَأَثْنَى عَلَيْهِ، ثُمَّ قَالَ: " مَا بَالُ أَقْوَامٍ يَسْأَلُونَ عَمَّا أَصْنَعُ، أَمَّا أَنَا فَأُصَلِّي وَأَنَامُ، وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي، فَلَيْسَ مِنِّي
'হজরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিদের মধ্য থেকে একটি জামাত আওয়াজে মুতাহ্হারাত তথা নবীপত্নীদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে কীভাবে ইবাদত-বন্দেগি করতেন? নবীপত্নীগণ উত্তর দিলেন। সাহাবাদের মধ্যে কেউ কেউ বললেন, আমি মেয়েদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হব না। কেউ কেউ বললেন, আমি কখনো গোস্ত ভক্ষণ করব না। আবার কেউ কেউ বললেন, আমি রাত্রিবেলা নিদ্রা গ্রহণ করব না। কেউ কেউ অনবরত রোযা রাখার সংকল্প করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের এ সব কথা শুনে খুতবায় হামদ ও সানা পড়ার পর ইরশাদ করলেন—এরা কারা যারা এমন এমন ইচ্ছা পোষণ করছে? আমি তো রাত্রিবেলা নামায পড়ি এবং ঘুমাই। রোযা রাখি এবং রোযা ছাড়াও থাকি। নারীদের বিবাহ করি। যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে আমার দলভুক্ত নয়।” ইবনে আব্বাস রা. বলেন, এই উম্মতের সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি সে, যার বহু স্ত্রী ছিল।
শাদ্দাব ইবনে আউস রা. বলেন, আমাকে বিয়ে করিয়ে দিন। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অসিয়ত করে বলেছেন যাতে আমি বিয়ে করা ছাড়া আল্লাহর দরবারে না যাই।
মুহাম্মাদ ইবনে রাশেদ আমাকে বলেছেন, মাকহুল জনৈক ব্যক্তির কাছে বর্ণনা করেছেন, হজরত আবু যর রা. বলেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে এক ব্যক্তি এসেছিলেন যার নাম আক্কাফ ইবনে বিশির তামিমি হিলালী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আক্কাফ! তোমার কোনো স্ত্রী আছে? সে বলল, নেই। জিজ্ঞেস করলেন, কোনো দাসী আছে? সে বলল, নেই। এবার তার কাছে জানতে চেয়ে বললেন, তুমি কি যৌনশক্তি রহিত? সে বলল, হ্যাঁ, এতে আমি সন্তুষ্ট। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এখন তুমি শয়তানের ভাই। তুমি যদি খ্রিষ্টান হতে তাহলে সন্ন্যাসী হয়ে যেতে। আমাদের সুন্নত হচ্ছে বিয়ে করা। আর তোমার মতো মন্দ ব্যক্তিরা বিয়েবিহীন জীবন কাটায়। মৃত্যুবেলায় সবচেয়ে অপদস্থ হয়ে ওই ব্যক্তি মারা যায়, যে বিয়ে-শাদী ছাড়া জীবন কাটিয়ে দেয়। সৎ লোকদের জন্য বিয়ে ছেড়ে দেয়ার চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র শয়তানের কাছে নেই।
আবু বকর আলমারুযি আমাকে বলেন, আমি আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর কাছ থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, বিয়ে ছাড়া তথা চিরকুমার থাকা ইসলামের কোনো বিধানের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চৌদ্দটি বিয়ে করেছেন এবং নয়জন স্ত্রী রেখে ইন্তেকাল করেছেন। পরে বলেছেন, যদি বিশর ইবনুল হারিস বিয়ে করে নিতেন তাহলে তার সব কাজ চুকে যেত। মানুষ বিয়ে-শাদী ছেড়ে দিলে আর জিহাদ করবে না, হজ করবে না, এটা করবে না, সেটা করবে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থা অনেক সময় এমন হতো যে, ঘরে রান্না করার মতো কোনো উপকরণ নেই, তারপরও তিনি বিয়ে করা পছন্দ করতেন এবং মানুষকে এ ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। চিরকুমার থাকতে বারণ করতেন। সুতারং যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে কখনো হকের ওপর থাকতে পারে না।
হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম শেষ বয়সে প্রচণ্ড পেরেশান অবস্থাতেও বিয়ে করেছেন এবং তাঁর সন্তান হয়েছে। উপরন্ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমার অন্তরে নারীদের প্রতি ভালোবাসা দেয়া হয়েছে।" ইবরাহিম ইবনে আদহাম হতে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি আমার কাছে অভিযোগ তুলল যে, আমি বিয়ে করেছি। পরে আমার সন্তান হলে এখন আমি ভীষণ পেরেশানি ভোগ করছি। এখনও তার কথা শেষ হয়নি, ইবরাহিম ইবনে আদহাম তাকে ধমক দিয়ে বললেন, আমি দেখছি, এর বিনিময়ে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তুমি সেই পন্থায় দৃষ্টি দাও যে পথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম জীবন কাটিয়েছেন। পরে বললেন, নিজের পিতা থেকে কেঁদে কেঁদে রুটি চাওয়া এমন এমন ফজিলতের কারণ। বলো, এ সব মর্যাদা অবিবাহিত আবেদরা কোথা হতে অর্জন করবে?
টিকাঃ
১. [যঈফ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ২৪৮৪
২. [সহিহ] সহিহুল জামে': হাদিস নং ৬৮০৭
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫০৭৩, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৪০২
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৪০১
২. হাদিসটির সনদ দুর্বল। এর রাবী আবু রাজা আলজুযরী বহু মুনকার হাদিস রেওয়ায়াত করেছেন।
৩. মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ: ৩/৪৩৯ [রেওয়ায়াতটি মুনকার]
৪. [যঈফ]
৫. [সহিহ] সহিহুল জামে': হাদিস নং ৩১২৪, আলবানি রহ. সংকলিত মিশকাত: হাদিস নং ৫২৬১
📄 বিয়ে বিতৃষ্ণ সুফি মতাদর্শের খণ্ডন
ইবলিস অধিকাংশ সুফিকে ধোঁকা দিয়ে তাদেরকে বিয়ে-শাদী থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তাই পূর্বেকার সুফিরা ইবাদতে মত্ত থাকার নিমিত্তে বিয়ে করতেন না। তারা মনে করতেন এতে ইবাদতে বিঘ্ন ঘটে। এদের যদি বিয়ের চাহিদা জাগত বা এ-জাতীয় কোনো আকর্ষণ দেখা দিত, তাহলে নিশ্চিত তারা শরীর ও দীনকে শঙ্কায় ফেলতেন। আর যদি বিয়ের চাহিদা না জাগত বা এ-জাতীয় কোনো আকর্ষণ দেখা না দিত, তাহলে এই ফজিলত থেকে বঞ্চিত থাকত। সহিহাইনে আছে, হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَيَأْتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُونُ لَهُ فِيهَا أَجْرٌ قَالَ أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي الْحَرَامِ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيهَا وِزْرُ قَالُوا نَعَمْ قَالَ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلَالِ كَانَ لَهُ فِيهَا أَجْرُ ثم قال أفتحتسبون الشر ولا تحتسبون الخير
'তোমাদের বিশেষ অঙ্গেরও সদকা আছে। সাহাবারা আরয করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দ্বারা তো আমরা নিজের প্রবৃত্তি নিবারণ করে থাকি। তাতেও কি সদকা হবে? তিনি বললেন, অবশ্যই। বলো, যদি সে তার প্রবৃত্তি অপাত্রে পূরণ করত তাহলে সে কি গুনাহগার হতো না? সাহাবারা বলেলেন, হ্যাঁ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা এর মন্দ দিকটা দেখছ আর ভালো দিকটা দেখছ না?”
সুফিদের কারো কারো অভিমত হচ্ছে, বিয়ের কারণে রুটি-রুজির পেছনে পড়তে হয়। জীবিকা নির্বাহ করা বড় কঠিন কাজ। তাদের এই অজুহাত কেবল জীবিকা অর্জনের কষ্ট থেকে গা বাঁচিয়ে রাখার জন্য। সহিহাইনে আছে, হজরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
دِينَارُ أَنْفَقْتَهُ فِي سَبِيلِ اللهِ وَدِينَارُ أَنْفَقْتَهُ فِي رَقَبَةٍ، وَدِينَارُ تَصَدَّقْتَ بِهِ عَلَى مسْكِينٍ، وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ، أَعْظَمُهَا أَجْرًا الَّذِي أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ
'এক দিনার তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো, এক দিনার গোলাম ও কর্মচারীদের জন্য ব্যয় করো, এক দিনার তোমরা সদকা করো, আর এক দিনার তোমরা পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করো। এসবের সেটাই সর্বोत्কৃষ্ট দিনার যা তোমরা নিজেদের পরিবার-পরিজনদের জন্য ব্যয় করে থাকো।'
সুফিদের কেউ কেউ আছেন যারা বলেন, বিয়ে দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার উপকরণ। আবু সোলায়মান দারানি হতে বর্ণিত, যখন মানুষ হাদিসের সন্ধানে বা জীবিকার সন্ধানে সফর করে, তখন তা দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট করে। গ্রন্থকার বলেন, এসব কথা শরিয়তবিরোধী। কেন হাদিসের সন্ধানে বের হওয়া যাবে না? অথচ তালেবে ইলমদের জন্য ফেরেশতারা তাদের পাখা বিছিয়ে দেন। অন্যদিকে জীবিকার সন্ধানে কেন বের হওয়া দূষণীয় হবে? অথচ হজরত ওমর রা. বলেন, আমি যদি জীবিকার সন্ধানে পরিশ্রম করতে গিয়ে মারা যাই তা আমার নিকট আল্লাহর রাস্তায় গাজী হয়ে মৃত্যুবরণ করা অপেক্ষা উত্তম। আর বিয়ে-শাদী কেন নিন্দনীয় হবে? অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা বিয়ে করো এবং বংশ বৃদ্ধি করো।” আমার মতে উপরোক্ত বাহানাগুলো শরিয়তবিরোধী হিসেবে বিবেচ্য।
আবু হামেদ বলেন, সুফিদের কেউ কেউ প্রসিদ্ধ যাহেদ তথা দুনিয়ারিবাগী সাজার জন্য বিয়ে-শাদি থেকে দূরে থাকে। সাধারণ মানুষ সুফিদেরকে খুব সম্মান করে থাকে। কারণ তাদের কোনো স্ত্রী থাকে না। তারা আরও বলে থাকে, অমুক বুযুর্গ জীবনে কখনো নারী সংশ্রবে পতিত হননি। অথচ এই বৈরাগ্যবাদী ইসলামি শরিয়তের বিপরীত।
তিকরিতী বলেন, মুরিদদের উচিত নিজ থেকে বিয়ে-শাদীর প্রতি ঝুঁকে না পড়া। কেননা এতে সুলুক থেকে দূরে সরে যাবে। লেখক বলেন, এই লোকের কথা আমার কাছে খুব আশ্চর্য লেগেছে। তার এটুকু জ্ঞান নেই যে, কেউ তার নিজের যৌনচাহিদার নিয়ন্ত্রণ, বিবি-বাচ্চার খোরপোশ ইত্যাদিতে সচেষ্ট হলে তা কখনো সুলুকের বিপরীত হয় না। আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেন,
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً
"আল্লাহ তায়ালা তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য জোড়া সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা আরামে থাকতে পার। তিনি তোমাদের পরস্পরে মুহব্বত ও ভালোবাসার জন্য দিয়েছেন।”
সহিহ হাদিসে আছে, হজরত জাবের রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেন,
هَلَّا تَزَوَّجْتَ بِكْرًا تُلاعِبُهَا وَتُلاعِبُكَ
‘হে জাবির! তুমি কেন কুমারী মেয়ে বিয়ে করছ না? যাতে তুমি তার সাথে খেলতে পার এবং সেও তোমার সাথে খেলতে পারে!”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো জাবের রা.-কে এমন বিষয়ে নির্দেশনা দিতেন না যা আল্লাহর নৈকট্য থেকে তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখে। “স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীগণদের সাথে প্রীতিময় আচরণ করতেন।” তিনি হজরত আয়েশা রা. এর সাথে দৌড় খেলা খেলতেন। এ সব কাজ কি আল্লাহ তায়ালার নৈকট্যবিরোধী? বরং সুফিদের ওসব কথা অজ্ঞতার পরিচায়ক।
টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১০০৬
২. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৯৯৫
৩. [যঈফ] যঈফুল জামে' হাদিস নং ২৪৮৪
১. সুরা রূম: আয়াত ২১
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫০৭৯
৩. লেখক এখানে উম্মে যারা'র হাদীসের প্রতি ইংগিত করেছেন- যা বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।
📄 বিয়ে বিতৃষ্ণতার নেপথ্যে
জেনে রাখা দরকার, যুবক যুবক সুফিরা যখন বিয়ে-শাদি ছেড়ে চিরকুমার থাকতে চায় তখন তারা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা:
১. বীর্যস্খলন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। কেননা বীর্য যখন দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আবদ্ধ থাকে, তখন তার বিষাক্ত প্রভাব মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে। আবু বকর মুহাম্মাদ বিন যাকারিয়া রাযি. বলেন, আমি এমন এক গোত্র সম্পর্কে জানি, যাদের অনেক বীর্য ছিল। অতঃপর যখন তারা দর্শনতত্ত্বে প্রভাবিত হয়ে তা আবদ্ধ করে রাখে, তখন তাদের যৌনচাহিদা হ্রাস পেতে থাকে। তাদের শরীর বিকৃত হয়ে যেতে থাকে এবং হজমশক্তিতে বিঘ্ন ঘটে। চলাফেরায় সমস্যা দেখা দেয়। তিনি আরও বলেন, সহবাসবিরোধী এক ব্যক্তিকে আমি দেখেছি, তার রুচি ও খাদ্যগ্রহণশক্তি শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, সামান্য খেলেও তা আর হজম হয় না। পরে সহবাসের অভ্যাসে ফিরে আসলে তৎক্ষণাৎ এই ব্যাধি দূরীভূত হয়ে যায়।
২. দ্বিতীয় প্রকারের যুবক সুফিরা যা কিছু পরিত্যাগ করেছিল, তার ওপর আরও প্রচণ্ডভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। সুফিদের অনেকে এমন আছেন, যারা বিয়ে-শাদী থেকে দূরে থেকে ধৈর্যধারণ করেছেন এবং তাদের বীর্য আবদ্ধ রয়েছে। পরে হুঁশ ফিরলে আবার যৌনকর্মে মত্ত হয়ে যায়। জাগতিক বিষয়গুলো থেকে তারা যে পরিমাণ দূরে অবস্থান করেছিল, দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে আবার তাতে ফিরে আসে। এর উদাহরণ হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি কয়েক দিন উপোস থাকার পর তীব্র ক্ষুধা নিয়ে যখন খেতে বসে, সে তখন নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে বেশি খেয়ে থাকে। যেন উপোস থাকাকালীন খাবারগুলোও সে সাবাড় করে ছাড়বে।
৩. তৃতীয় শ্রেণির সুফিরা ছেলেদের সাথে অযাচারে লিপ্ত হয়। সুফিদের অনেকে এমন আছে যারা বিয়ে-শাদী থেকে বিমুখ ও বিতৃষ্ণ হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের বীর্যগুলো আবদ্ধ হয়ে আছে। তারা তখন সুদর্শন বালকদের সাথে সহবাস করে বিকৃত প্রশান্তি অনুভব করে।
***
সুফিদের একটি দলকে শয়তান এমনভাবে আকৃষ্ট করল যে, তারা বিয়ে করেছে ঠিকই আবার বলতে থাকে আমরা যৌনচাহিদা চরিতার্থ করতে বিয়ে করিনি। এক্ষেত্রে তারা যদি মনে করে বিয়ে আমরা কেবল সুন্নত আদায়ের নিমিত্তে করেছি, তাহলে ঠিক আছে। আর যদি বলে বিয়ের ওপর তার আগ্রহ ছিল না বা নেই, তাহলে তা খুব চিন্তার বিষয়।
কিছু কিছু লোককে অজ্ঞতা এমন প্ররোচনা দিতে থাকে যে, তারা পুরুষাঙ্গ কর্তন করে ফেলে। তারা ভাবে আল্লাহ তায়ালাকে লজ্জা করার নিদর্শন হিসেবে তারা এমন কর্মকাণ্ড করেছেন। অথচ এটি মারাত্মক আহমকি। কেননা আল্লাহ তায়ালা এই অঙ্গের কারণে নারীদের ওপর পুরুষকে সম্মানিত করেছেন। মানবজন্মের পরম্পরা বহমান রাখার নিমিত্তে তিনি এই অঙ্গ দান করেন। যে এটি কর্তন করে মুখে বলে ভালো উদ্দেশ্যের কথা— তার কথা ভিত্তিহীন ও অসার বলে বিবেচিত। উপরন্তু পুরুষাঙ্গ কর্তন করার ফলে তার যৌনস্পৃহা স্তিমিত হয়ে যায়নি। সুতরাং তার লক্ষ্য ভিত্তিহীন।
টিকাঃ
৪. সুনাদে আবু দাউদ: হাদিস নং ২৫৭৮
📄 সন্তানে অনগ্রহী ব্যাপারে সুফিদের ওপর ইবলিসের ধোঁকা
আবুল হাওয়ারী বলেন, আমি আবু সুলাইমান দারানি থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সন্তানের আশা পোষণ করে সে আহমক। এতে না জাগতিক উপকার আছে, না দীনি ফায়েদা। কেননা সে যদি পানাহার, নিদ্রা ও যৌনতার আকাঙ্ক্ষী করে, তাহলে সন্তানের কারণে এতে তার অসুবিধা দেখা দেবে।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, উপরোক্ত কথাটি মারাত্মক ভ্রান্তির বহিঃপ্রকাশ। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, পৃথিবী সৃষ্টি করার পেছনে মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছে হচ্ছে তিনি কেয়ামত পর্যন্ত এখানে মানুষের মধ্য থেকে মানুষের বংশ-পরম্পরা অব্যাহত রাখবেন। যেহেতু এ জগতে মানুষের জীবনের সময়কাল খুবই সীমিত, তাই তিনি মানুষের প্রকৃতি ও অভ্যাসের মাঝে যৌবন সৃষ্টি করে তাকে যৌনচাহিদা নিবারণের সুবন্দোবস্ত করেছেন। শরয়ি দৃষ্টিকোণে চিন্তা করলে আমরা দেখি আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ 'তোমরা কুমারী নারীদের বিয়ে করো।”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
تناكحوا تناسلوا فاني أباهي بكم الأمم يوم القيامة ولو بالسقط "বিয়ে করো এবং বংশ বৃদ্ধি করো। কেননা আমি কেয়ামতের দিন তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে অন্যান্য উম্মতের ওপর গর্ব করব। যদিও তা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বেকার শিশু হোক না কেন।”
স্বয়ং নবীগণ আলাইহিমুস সালাম সন্তানের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছেন। সৎ ব্যক্তিরা সন্তান ধারণের বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করেছেন। অনেক সময় স্ত্রী-সহবাসের ফলে জগৎজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি জন্মলাভ করেন। যেমন ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, শাফেয়ি ও আহমাদ রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। এমন সহবাস হাজার বছর ইবাদতের চেয়ে উত্তম। স্বয়ং হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, স্ত্রীর সাথে সহবাসকারী, সন্তানদের খোরপোশের ব্যবাস্থাকারী, যে ব্যক্তির সন্তান মারা যায় অথবা যে সন্তান রেখে মারা যায়, এ সবকিছুর বিনিময়ে সে সাওয়াবপ্রাপ্ত হয়। অতএব যে ব্যক্তি সন্তানের আকাঙ্খা থেকে বিমুখ হয়ে থাকে সে সুন্নত ও উত্তম বিষয়ের বিরোধী এবং সুখপূজারি বলে সাব্যস্ত হবে।
জুনাইদ বলতেন, সন্তান হচ্ছে বৈধ সহবাসের শাস্তিস্বরূপ। তাহলে অবৈধ সহবাসের ফল কী হতে পারে? চিন্তা করে দেখো! লেখক আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, কথাটি ভুল। কেননা 'মুবাহ' ও বৈধ বস্তুকে কখনো শান্তি বলে আখ্যায়িত করা যায় না। এটি খুবই মন্দ কাজ। কেননা যে কাজ মুবাহ, তার ফলাফল শাস্তি কী করে হয়? শরিয়ত যে কাজের দিকে আহ্বান করেছে, তা অর্জন করা সাওয়াব বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।
টিকাঃ
১. সুরা নূর: আয়াত ৩২
২. [যঈফ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ২৪৮৪