📄 চিকিৎসা গ্রহণের ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের কুমন্ত্রণা
গ্রন্থকার বলেন, রোগ-বালাই হলে তার জন্য চিকিৎসা গ্রহণের ব্যাপারে আলেমদের মাঝে কোনো মতবিরোধ নেই। শুধু মুষ্টিমেয় কিছু লোকের মতামত হচ্ছে, চিকিৎসা না নেয়া উত্তম। এ ব্যাপারে মনীষীদের অভিমত এবং আরও বিস্তারিত তত্ত্ব ও তথ্য আমি চিকিৎসাবিষয়ক 'লাকতুল মানাফী' গ্রন্থে বিবৃত করেছি। এখানে আমি শুধু এটুকুই আলোকপাত করব, যেহেতু চিকিৎসা গ্রহণ সর্বসম্মতিক্রমে বৈধ এবং কোনো কোনো আলেমের মতে উত্তম হিসেবে বিবেচিত। সুতরাং আমরা তাদের কথার প্রতি কর্ণপাত করব না যারা বলে, চিকিৎসা গ্রহণ করা 'তাওয়াক্কুল' এর বিপরীত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত আছে,
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন এবং চিকিৎসা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।”
তাবারি বলেন, বিভিন্ন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসা না নিয়ে বসে থাকা তাওয়াক্কুলের পরিচায়ক নয়। এটা উচিতও নয়। কেননা আল্লাহ তায়ালা মৃত্যু ব্যতীত যত রোগ-ব্যাধি আছে তার চিকিৎসারও ব্যবস্থা করেছেন। রোগ সারানোর উপকরণও সৃষ্টি করেছেন, যেভাবে পানাহারকে ক্ষুদা নিবারণের উপকরণ বানিয়েছেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা তার মাখলুককে ক্ষুধা ও রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখার ক্ষমতা রাখেন। সুতরাং ক্ষুধার যন্ত্রণা যেভাবে পানাহার দিয়ে দূরীভূত হয়, তদ্রূপ ঔষধ খাওয়ার মাধ্যমে তিনি রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থা রেখেছেন।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫৬৭৮, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৫৭৪১
২. মুসতাদরাকে হাকিম: ৪/৪৪৫
📄 নির্জনতা ও জুমা ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে সুফিদের ওপর
আগেকার যুগে যারা একাকিত্ব এবং মানুষের কাছ থেকে পৃথক থাকার অভ্যাস অবলম্বন করতেন, তাদের মূল লক্ষ্য থাকত যেন জ্ঞান অর্জন ও আল্লাহর ইবাদতে ভালো করে মনোনিবেশ করা যায়। কিন্তু তারা এই নির্জনতা অবলম্বন করতে গিয়ে কখনো জুমা ও জামাত ছাড়তেন না। অসুস্থের খবরাখবর নিতেন, জানাযার নামাযে উপস্থিত হতেন। একাকিত্ব অবলম্বনের কারণ ছিল কেবলই মন্দ কাজ হতে বিরত থাকা, ঝগড়া-বিবাদ থেকে নিরাপদ থাকা এবং অসৎ সংশ্রব থেকে দূরে থাকা। সুফিদের এক গোষ্ঠীর অন্তরে প্ররোচনা জাগাতে থাকল শয়তান। এতে কতেক সুফি পাহাড়ের চূড়ায় সন্ন্যাসীদের মতো আসন গাড়তে আরম্ভ করল। জুমা এবং জামাতের সাথে নামায আদায়ের তোয়াক্কা করল না। ছেড়ে দিল আলেম ও জ্ঞানীদের সংশ্রব। সাধারণত সুফিরা তাদের খানকায় অবস্থান করে। মসজিদে নামায পড়তে খুব কমই আসে। প্রশান্তিদায়ক বিছানায় পড়ে থাকে। জীবিকার চিন্তা ছেড়ে দেয়।
আবু হামেদ গাযালি রহ. এহইয়াউল উলুম গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রেয়াযত বা সাধনার লক্ষ্য হচ্ছে মনের একাগ্রতা জাগ্রত হওয়া। এ লক্ষ্য তখনই সাধিত হবে যখন সে একটি অন্ধকার ঘরে কিংবা যদি অন্ধকার ঘর পাওয়া না যায়, তাহলে চক্ষু বন্ধ করে চাদর ইত্যাদির নিচে একাকী অবস্থান করবে। এমতাবস্থায় সে হক শব্দ শুনতে পাবে এবং পরম প্রতিপালকের জালাল ও ঔজ্জ্বল্য প্রত্যক্ষ করতে পারবে।
গ্রন্থকার বলেন, এই প্রশিক্ষণের দিকে গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, একজন ফকিহ ব্যক্তির পক্ষ থেকে কী করে এমন কথা বেরোতে পারে? আর তিনি কী করে বুঝলেন যে, সে যা শুনবে তা আল্লাহ তায়ালার আওয়াজ! আর সে যা দেখতে পাবে তা পরম প্রতিপালকের জালাল বা ঔজ্জ্বল্য! অথচ যে ব্যক্তি প্রয়োজনের তুলনায় কম আহার করবে, তার ব্যাপারে এমন আশঙ্কা আছে যে, হয়তো সংজ্ঞা হারাবে। কোনো কোনো সময় মানুষ বিভিন্ন প্ররোচনা ও সন্দেহ থেকে দূরে থাকে। কিন্তু যখন সে চোখ বন্ধ করে তার মনে বিভিন্ন ধরনের সন্দেহের উদ্রেক হয়ে থাকে। কেননা মানব মস্তিষ্কে তিনটি শক্তি বিদ্যমান। এক. ইচ্ছাশক্তি, দুই. চিন্তাশক্তি ও তিন. স্মরণশক্তি। মস্তিষ্কে ইচ্ছার স্থানের আগে আরও দু'টি পর্দা আছে, চিন্তার স্থান মাঝামাঝি আর ধী বা স্মরণশক্তি আরও পেছনে অবস্থান করে। মানুষ যখন তার মাথা ঝুঁকিয়ে রাখে এবং চক্ষু বন্ধ করে নেয় তখন চিন্তা ও ইচ্ছাশক্তি প্রভাবিত হতে থাকে।
আবু উসমান ইবনুল আদমি বলেন, আবু উবাইদ বসরির নিয়ম ছিল, রমযানের প্রথম তারিখে ঘরে গিয়ে স্ত্রীকে বলতেন, আমার ঘরের দরজা মাটি দ্বারা ভরাট করে দেবে এবং ছিদ্র দিয়ে প্রতিদিন একটি করে রুটি দেবে। ঈদের দিন এলে স্ত্রী তার ঘরে গিয়ে ত্রিশটি রুটি দেখতে পেত। সে কিছু খেত না, পানও করত না এবং মাসের শেষ দিন পর্যন্ত এক অযুতে থাকত।
গ্রন্থকার বলেন, এই ঘটনা দু'টি কারণে আমার মতে বিশ্বাসযোগ্য নয়। প্রথমত এক মাস ধরে মানুষ কীভাবে পানাহার, অযু ও পায়খানা-পেশাব ছাড়া চলতে পারে? দ্বিতীয়ত মুসলমান হয়ে জুমা ও জামাতে নামায আদায় হতে বিরত থাকা কি উচিত? অথচ এটা ওয়াজিব, ছেড়ে দেয়া নাজায়েয। তথাপি ঘটনা যদি বাস্তবে ঘটেও থাকে, তাহলে বলতে হবে এই লোকের সাথে শয়তান ধোঁকা দিতে অনেক চেষ্টা-তদবির চালিয়ে সফল হয়েছে।
আবু আবদুল্লাহ নিশাপুরী বলেন, আমি অনেকবার আবুল হাসান সুফিকে বলতে শুনেছি, তাঁকে জুমা ও জামাত তরক করার কারণে বহু অপদস্থ হতে হয়েছে। তিনি বলতেন, ফজিলত যদিও জামাতের মধ্যে, কিন্তু নিরাপত্তা একাকিত্বে নিহিত।
📄 নির্জনতার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা
যে নির্জনতা ও একাকী অবস্থানের ফলে ইলম অর্জন এবং কাফিরদের সাথে জিহাদ হতে বঞ্চিত থাকতে হয়, এমন নির্জনতা ও একাকী অবস্থানের ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে।
হজরত আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে একটি বাহিনীর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমাদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি পাহাড় দিয়ে অতিক্রমকালে সেখানে সামান্য পানি দেখতে পেল। সে মনে মনে ভাবল, এই পাহাড়ে আমি ঘর নির্মাণ করব এবং এখানে যে সবুজ প্রকৃতি আছে, তা হতে জীবিকা নির্বাহ করে জীবন কাটিয়ে দেব। দুনিয়াদারি থেকে একেবারে পৃথক হয়ে যাব। পরে সে ভাবল, ব্যাপারটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উপস্থাপন করে দেখি। তিনি অনুমতি দিলেই আমি এমন করব, নচেৎ নয়। সে এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বিস্তারিত মনোবাসনার কথা পেশ করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি ইহুদিবাদ ও খ্রিষ্টবাদ নিয়ে অবতীর্ণ হইনি; বরং প্রকৃত শরিয়ত ও সহজ দীন নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছি। ওই সত্তার কসম, যার কুদরতি হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! আল্লাহর রাস্তায় সকাল-সন্ধ্যা একবার কদম উঠানো দুনিয়া এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু রয়েছে তদাপেক্ষা উত্তম। আর তোমাদের জন্য জামাতের কাতারে দাঁড়ানো একাকী ষাট বছর নামায অপেক্ষা উত্তম।'
টিকাঃ
১. [যঈফ] মুসনাদে আহমাদ: ৫/২৬৬
📄 সুফিদের ওপর অতি নম্রতা ও মাথা অবনত রাখার ব্যাপারে
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, আল্লাহর ভয় যখন মানুষের মনে বদ্ধমূলভাবে গেঁথে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবে নম্রতা ও দুর্বলতা প্রদর্শনের অভ্যাস গড়ে ওঠে। এটাকে মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সুতরাং সে অবনত মস্তিষ্কে সারাক্ষণ নিজেকে দুর্বল ও ছোট ভাবতে থাকে। সালফে সালেহীনগণ এ অবস্থা লুকাতে চেষ্টা করতেন। মুহাম্মাদ বিন সিরিন দিনের বেলা হাসতেন আর রাত্রিবেলা কাঁদতেন। আমি এটা বলতে চাচ্ছি না যে, আলেমগণ সাধারণ মানুষের কাছে বসে অস্বাভাবিক আচরণ করবেন; বরং এতে তো তাদের কষ্ট আরও বৃদ্ধি পাবে।
হজরত আলী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'যখন তোমরা ইলমের আলোচনা করবে, তখন স্বীয় মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব বজায় রাখবে। হাসি-কৌতুকের সাথে ইলমকে গুলিয়ে ফেলো না। যাতে মানুষ মন থেকে সে কথা ছুড়ে ফেলে। এমন অবস্থাকে 'রিয়া' বলে না।'
সুতরাং আলেমদের উচিত, সাধারণ মানুষের সামনে নীরবতা ও আদবের সাথে উপস্থিত হওয়া। অন্যদিকে তাদের সামনে কৃত্রিম দুর্বলতা ও নম্রতা প্রদর্শন, মাথা নিচু রাখা নিন্দনীয় বিষয়। এতে মানুষ তাকে বড় পীর, অলি বুঝবে এবং মুসাফা করে হাতে চুমু দেয়ার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ আসবে। অনেক সময় কেউ যদি বলে, হুজুর আমার জন্য একটু দোয়া করবেন, তৎক্ষণাৎ তিনি হাত তুলে দোয়া আরম্ভ করেন, যেন তিনি তার জন্য এখনই মঙ্গল বয়ে আনবেন। এ সব খুবই নিন্দনীয় ও পরিত্যাজ্য। ইবরাহীম নাখয়ি রহ. হতে বর্ণিত আছে, তাঁকে বলা হয়েছিল, আমাদের জন্য দোয়া করুন, তার কাছে বিষয়টি খুব খারাপ লাগে এবং এতে তিনি মারাত্মক অসন্তুষ্ট হন।
এমন বহু ভীরু রয়েছেন—যারা ভয়ের আধিক্যের দরুন নিজেকে খুবই হেয় ও অথর্ব ভেবে থাকেন। লজ্জা-সংকোচের তীব্রতায় আকাশের দিকে তাকান না মাথা তুলে। অথচ এটা কোনো ফজিলতের বিষয় নয়। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নম্রতা ও খুশুর চেয়ে অধিক খুশু আর নম্রতা কারও হতে পারে না। সহিহ মুসলিমে আছে, হজরত আবু মুসা আশয়ারী রা. হতে বর্ণিত,
وَكَانَ كَثِيرًا مَا يَرْفَعُ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময় আকাশের দিকে মাথা তুলে থাকতেন।'
এ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, আকাশের নিদর্শনাবলি থেকে শিক্ষা নেয়ার উদ্দেশ্যে আকাশপানে তাকানো মুস্তাহাব। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
أَوَلَمْ يَنْظُرُوا إِلَى السَّمَاءِ فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَاهَا
"তারা কি উপরের আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে না, আমি কীভাবে তা সৃষ্টি করেছি!” অন্যত্র বলেন,
قُلِ انْظُرُوا مَاذَا فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ
"ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডল তথা জমিন ও আকাশের দিকে দেখো এতে কত নিদর্শন বিদ্যমান।"
এসব আয়াত সুফিদের এমন কর্মকাণ্ডের ঘোরতর বিরোধী, যেখানে তারা বলে যে, অমুক সুফি এত বছর যাবৎ আকাশের দিকে তাকায়নি।
এসব শ্রেণি নিজেদের আবিষ্কৃত বিদয়াতের সাথে বিভিন্ন উপমাও নির্ধারণ করে রেখেছে। তাদের যদি এ বিষয়ে জানা থাকত যে, আল্লাহর ভয় ও লজ্জায় তাদের মাথা অবনত করা ঊর্ধ্বমুখী রাখার মতোই, তাহলে তারা এমন করত না। কিন্তু ইবলিসের কারবার হচ্ছে অজ্ঞদের সাথে খেল-তামাশায় মত্ত থাকা।
বাকি রইল আলেমগণ। তাদের থেকে ইবলিস বহু দূরে অবস্থান করে। ভীষণ ভয় পায় তাদের। কেননা আলেমগণ ইবলিসের সমুদয় হাল-অবস্থা ও স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত। তাঁরা তার সকল ফাঁদ, ধোঁকা ও চক্রান্ত থেকে দূরে থাকেন। আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবাগণ কোণঠাসা ও লাজুক প্রকৃতির ছিলেন না। তাঁরা তাদের মজলিসে শে'র-কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং নিজেদের জাহেলি যুগের কথা অকপটে বর্ণনা করতেন। পরে যখন তাদের সম্মুখে দীনের কোনো বিষয় আসতো তাদের নয়নযুগল এমনভাবে ঘষতেন ও ঘোরাতেন যেন তিনি পাগল হয়ে গেছেন।
বর্ণিত আছে, হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এক ব্যক্তিকে দেখলেন যিনি মাথা নিচু করে আছেন। উমর রা. বললেন, হে অমুক! মাথা উঠাও। কেননা যে পরিমাণ খুশু বা আল্লাহর ভয় তোমার অন্তরে আছে, তার বেশি প্রকাশ হয় না। আর যে ব্যক্তি নিজের অন্তরের আল্লাহর ভয়ের চেয়ে মানুষকে দেখানোর জন্য তাদের সামনে খুশু ও নম্রতা প্রদর্শন করে, সে তো মুনাফেকী প্রকাশ করল। বলা হয়, হজরত উমর রা. এর সামনে কোনো এক ব্যক্তি চিন্তা বা পেরেশানীর কারণে ভারী শ্বাস ফেললে তিনি তাকে ঘুষি মারেন অথবা লাথি মারেন।
ইবনে আবি খাইসামা তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, শিফা বিনতে আবদুল্লাহ কিছু লোককে দেখেন, যারা ধীরে ধীরে হাঁটছে এবং নম্রসুরে কথা বলছে। জিজ্ঞেস করা হলো, তারা এমন করছে কেন? উপস্থিত লোকেরা বলল, এরা আবেদ। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! হজরত উমর রা. যখন কথা বলতেন উচ্চৈঃস্বরে বলতেন যেন সকলে শুনতে পায়। আর যখন হাঁটতেন তীব্র বেগে হাঁটতেন। আর কাউকে প্রহারের জন্য উদ্যত হলে তার মন কোমল হয়ে যেত। অথচ তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে আবেদ।
গ্রন্থকার বলেন, মনীষীরা নিজেদের অবস্থা লুকাতেন। আইয়ুব সাখতিয়ানি রহ. এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি স্বাভাবিকের চেয়ে একটু লম্বা জামা পরতেন। যাতে তার প্রকৃত অবস্থা গোপন থাকে। সুফিয়ান সাওরি রহ. বলতেন, আমার যে সব আমল প্রকাশ হয়ে গেছে আমি তা গণনায় ধরি না।
তিনি কাউকে নামায পড়তে দেখে বলেছিলেন, এই নামায দ্বারা তুমি কী পাবে, যা মানুষজন দেখছে? আবু উমামা জনৈক ব্যক্তিকে সিজদা অবস্থায় দেখে বললেন, কত ভালো হতো, যদি এই সিজদাটি ঘরে গিয়ে দিতে! হোসাইন ইবনে আম্মারার মজলিসে জনৈক ব্যক্তি আহ্ করে উঠল। লোকজন বলছে, হোসাইন ওই লোককে দেখে জানতে চাইলেন সে কে? তার ইচ্ছে ছিল পরিচয় নিয়ে তাকে একাকী গিয়ে এ ব্যাপারে কিছু কথা বলবেন। হারমালা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইমাম শাফেয়ি রহ.কে নিম্নের কবিতা আবৃত্তি করতে শুনেছি-
ودع الذين اذا أتوك تنسكوا * واذا خلوا فهم ذئاب خفاف
"এমন লোকদের থেকে দূরে থাকো, যারা তোমার সম্মুখে এলে তীব্র নম্রতায় মাথা নিচু করে রাখে, আর তোমার অগোচরে সে হিংস্র বাঘ হয়ে যায়।"
ইবরাহিম ইবনে সাঈদ রহ. বলেন, আমি খলিফা মামুনুর রশীদের খেদমতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমাকে আওয়াজ দিয়ে তিনি বললেন, হে ইবরাহিম! আমি উত্তর দিলাম, জি হুজুর! তিনি বললেন, দশটি নেক আমল এমন আছে, যা আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। তার কিছুই আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয় না। আমি জানতে চেয়ে বললাম, আমিরুল মুমিনীন! সেগুলো কী কী? উত্তরে তিনি বললেন, ইবরাহিম ইবনে বুরাইহার মিম্বরে দাঁড়িয়ে কান্না করা, আবদুর রহমান ইবনে ইসহাকের খুশু', দরবেশীর কারণে ইবনে সুমা'আর চেহারা বিবর্ণ হওয়া, ইবনে খিউইয়ার রাত্রিবেলা নামায পড়া, আইয়্যাশের চাশতের নামায পড়া, ইবনে সিন্দীর সোম ও বৃহস্পতিবারে রোযা রাখা, আবু রাজা'র হাদিস বর্ণনা করা, হাজেবীর গল্প বলা, হাফসুইয়ার সদকা করা এবং ইয়া'লা ইবনে কুরাইশের কিতাব 'আশ্শামী'।
টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৫৩১
২. সুরা ক্বাফ: আয়াত ৬
৩. সুরা ইউনুস: আয়াত ১০১