📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 তাওয়াক্কালের দাবি করা ও ধন-সম্পদের ব্যাপারে সুফিদের ওপর

📄 তাওয়াক্কালের দাবি করা ও ধন-সম্পদের ব্যাপারে সুফিদের ওপর


আহমদ ইবনে আবুল হাওয়ারি বলেন, আমি আবু সুলাইমান দারানিকে বলতে শুনেছি, আমরা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল ও পূর্ণ ভরসা করলে চোরের ভয়ে দেয়াল দিতাম না এবং দরজায় তালা দিতাম না।

যুন্নুন মিসরির সূত্রে বর্ণিত আছে, আমি কয়েক বছর ভ্রমণ করেছি, কিন্তু এর ভেতর একবার ব্যতীত আল্লাহর ওপর আমার ভরসা বিশুদ্ধ হয়নি। আমি একদিন সমুদ্র ভ্রমণে ছিলাম। প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাসে আমাদের জাহাজ টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তখন আমি জাহাজের একটি কাঠের খণ্ডের সাথে ভাসতে থাকি। একসময় মন আমাকে বলল, আল্লাহ তায়ালা যদি তোমার মৃত্যু পানিতে লিখে রাখেন, তাহলে এই কাঠ তোমাকে কী উপকার করবে? তখন আমি কাঠটি ছেড়ে পানিতে ভাসতে থাকি এবং পানির ঢেউ একসময় আমাকে তীরে নিক্ষেপ করে।

হাফেজ আবু নুয়াইম বলেন, জাফর খুলদি তার গ্রন্থে লেখেন, আমি জুনাইদ বাগদাদিকে বলতে শুনেছি, একবার আমরা দলবদ্ধ হয়ে আবু ইয়াকুব যাইয়্যাতের বাড়িতে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লে তিনি বললেন, আল্লাহর ইবাদতে তোমাদের এমন কী ব্যস্ততা নেই, যা তোমাদেরকে আমার কাছে আসতে বাধা দেয়? আমি বললাম, আপনার কাছে আসাও ইবাদতের অংশ। তখন আমরা তাঁর কাছে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে জানতে চাইলাম। প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, আমার কাছে ধন-সম্পদ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় তোমাকে তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা দিতে আমি লজ্জাবোধ করছি।

আবু নাসার সিরাজ স্বীয় কিতাবুল্ লামা গ্রন্থে লেখেন, এক লোক আবদুল্লাহ ইবনে জালার কাছে এসে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো প্রকার উত্তর না দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে একটি থলে নিয়ে আসেন, যাতে কিছু মুদ্রা ছিল। তিনি মুদ্রাগুলো উপস্থিত লোকদেরকে দিয়ে বললেন, তোমরা এগুলো দিয়ে কিছু কিনে আনো। পরে তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা দিলে তাঁকে বলা হলো, আপনি এমন করলেন কেন? জবাবে তিনি বললেন, উক্ত মুদ্রাগুলো থাকা অবস্থায় আমি তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা পেশ করতে লজ্জাবোধ করছি।

গ্রন্থকার বলেন, শরিয়ত সম্পর্কে অজ্ঞতা তাদের এই অসার চিন্তাচেতনা সরবরাহ করেছে। তাওয়াক্কুলের হাকিকত ও বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত থাকলে তারা জানতে পারত যে, আসবাব-উপকরণ তাওয়াক্কুল পরিপন্থী নয়। কেননা আল্লাহর প্রতি মনের অবস্থাকেই তাওয়াক্কুল বলে। এটা শরীরের মাধ্যমে উপকরণ সংগ্রহ ও ধন-সম্পদ সঞ্চয় ও সংরক্ষণের বিপরীত কিছু নয়। ধন-সম্পদের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলা হয়েছে- وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا
'আর তোমরা নির্বোধদের হাতে তোমাদের ধন-সম্পদ দিও না, যাকে আল্লাহ তোমাদের জন্য করেছেন জীবিকার মাধ্যম।"

হাদিসে আছে, হজরত আমর ইবনুল আস রা. বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোক মারফত আমাকে ডেকে বললেন, তুমি বর্ম ও অস্ত্র ধারণ করে আমার কাছে এসো। আমি তখন তা পরিধান করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বললেন, আমি তোমাকে এক সেনাদলের উদ্দেশে পাঠাতে চাই। তুমি সেখানে পৌঁছলে আল্লাহ তায়ালা তোমাকে বিজয়ী করবেন এবং গনীমত দান করবেন। আর ভালো উদ্দেশ্যে আমি তোমার জন্য ধন-সম্পদ কামনা করি। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি তো ধন-সম্পদ লাভের আশায় ইসলাম গ্রহণ করিনি। আল্লাহর আনুগত্য করার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছি। জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আমর! ভালো মানুষের জন্য হালাল ধন-সম্পদ কতই-না উত্তম!'

وَقَالَ «صلى الله عليه وسلم» إِنَّكَ تَدَعُ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَدَعَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ
'তুমি তোমার ওয়ারিশদেরকে সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়া তাদেরকে দরিদ্রাবস্থায় রেখে যাওয়া থেকে উত্তম, যেন মানুষের কাছে তাদের হাত পাততে না হয়।'

ভালো করে জেনে রাখা দরকার যে, আল্লাহ তায়ালা তাওয়াক্কুলের নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি সতর্কতা অবলম্বনের আদেশ দিয়ে বলেছেন,
خُذُوا حِذْرَكُمْ
'তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো।'

অন্য আয়াত আল্লাহ তায়ালা শত্রুর মোকাবিলার নির্দেশ দিতে গিয়ে বলেন,
وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ
'তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী তাদের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো।'

অন্য আয়াতে হজরত মুসা আলাইহিস সালাম-কে শত্রু বাহিনী থেকে আত্মরক্ষার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي لَيْلًا
'আমার বান্দাদের নিয়ে রাতে ভ্রমণ করুন।

স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্ত্রের আঘাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য একসঙ্গে দু'টি লোহার বর্ম পরিধান করেছেন। রোগের বিষয়ে দু'জন চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করেছেন। শত্রুর ভয়ে পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করেছেন। রাতে পাহারার জন্য লোক নিয়োগ দিয়েছেন এবং ঘুমের পূর্বে দরজা বন্ধ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।

হজরত জাবের রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَغْلِقُ بَابَكَ
'তুমি তোমার দরজা বন্ধ করো।'

তিনি তাঁদেরকে এটাও বলেছেন যে, এমন সতর্কতা অবলম্বন করা তাওয়াক্কুলের বিপরীত কোনো বিষয় নয়।

হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. হতে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি তার উট মসজিদের সামনে ছেড়ে দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে উপস্থিত হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তার উট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি বলল, আমি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে তা মসজিদের সামনে ছেড়ে রেখেছি। এটা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, আগে উট বেঁধে আসো, তারপর তাওয়াক্কুল করো।'

ইবনে আকিল বলেন, মানুষ মনে করে, সতর্কতা ও সংরক্ষণ তাওয়াক্কুল-পরিপন্থী বিষয়। তাই কোনো ব্যক্তি আল্লাহর ওপর আস্থাশীল তখনই হতে পারবে যখন সে কর্মপরিণতির চিন্তা পরিত্যাগ করবে এবং ধন-সম্পদ সংরক্ষণে উদাসীন থাকবে। অথচ এটাকে বিদগ্ধ ওলামায়ে কেরাম অক্ষমতা ও অবজ্ঞা বলে আখ্যা দেন। মানুষ এটাকে বিবেকবর্জিত কাজ হিসেবে ধরে নেয়। আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে সতর্কতা অবলম্বন ও সংরক্ষণের ব্যাপারে সাধ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের পর তাওয়াক্কুলের নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্বোধন করে আল্লাহ বলেন,
وَشَاوِرُهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ
'আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে।'

অতএব সতর্কতা অবলম্বন তাওয়াক্কুল-পরিপন্থী হলে আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে তাঁর নবীকে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিতেন না। কেননা পরামর্শের উদ্দেশ্যই হলো, শত্রু থেকে সতর্কতা অবলম্বনের সর্বোত্তম পন্থা সাথিদের থেকে গ্রহণ করা। এছাড়া আল্লাহ তায়ালা সতর্কতা অবলম্বনের ক্ষেত্রে সাথিদের মতামত গ্রহণের নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং নামাযের মতো সর্বোত্তম ইবাদতের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনকে কার্যকরীভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
وَاِذَا كُنْتَ فِيْهِمْ فَاَقَمْتَ لَهُمُ الصَّلٰوةَ فَلْتَقُمْ طَّائِفَةٌ مِّنْهُمْ مَّعَكَ وَلْيَأْخُذُوْا اَسْلِحَتَهُمْ
'আর যখন তুমি তাদের মধ্যে থাকবে। অতঃপর তাদের জন্য নামায কায়েম করবে, তখন যেন তাদের মধ্য থেকে একদল তোমার সাথে দাঁড়ায় এবং তারা তাদের অস্ত্র ধারণ করে।" অতঃপর সতর্কতা অবলম্বনের কারণ বর্ণনা করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন :
وَدَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَوْ تَغْفُلُوْنَ عَنْ اَسْلِحَتِكُمْ وَاَمْتِعَتِكُمْ فَيَمِيْلُوْنَ عَلَيْكُمْ مَّيْلَةً وَّاحِدَةً
'কাফিররা কামনা করে যদি তোমরা তোমাদের অস্ত্র-শস্ত্র ও আসবাব-পত্র সম্বন্ধে অসতর্ক হও তাহলে তারা তোমাদের ওপর একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়বে।” অতএব যে ব্যক্তি জানবে যে, সতর্কতা অবলম্বন তাওয়াক্কুলেরই অংশ, সে কিছুতেই এ কথা বলতে পারবে না যে, সতর্কতা অবলম্বন পরিত্যাগ করলে আল্লাহর প্রতি বান্দার তাওয়াক্কুল বিশুদ্ধ হবে। তাওয়াক্কুল হলো, যা বাস্তবায়নের ক্ষমতা বান্দার নেই, সে বিষয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
'আগে উট বাঁধো, তারপর তাওয়াক্কুল করো।' যদি সতর্কতা অবলম্বন ছেড়ে দেয়ার নাম তাওয়াক্কুল হতো, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নামাযের মধ্যে সতর্কতা অবলম্বন না করার নির্দেশ দিতেন। কিন্তু প্রজ্ঞাবান আল্লাহ তায়ালা তা করেননি, নামাযের মধ্যে সশস্ত্র থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এ কারণেই ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, যদি হামলার আশঙ্কা থাকে, তাহলে নামাযের মধ্যেও সশস্ত্র থাকা ওয়াজিব। অতএব প্রতীয়মান হলো, সতর্কতা অবলম্বন তাওয়াক্কুলের বিপরীত কোনো বিষয় নয়। কেননা মুসা আলাইহিস সালামকে যখন বলা হয়,
يَا مُوْسٰٓى اِنَّ الْمَلَاَ يَأْتَمِرُوْنَ بِكَ لِيَقْتُلُوْكَ فَاخْرُجْ اِنِّيْ لَكَ مِنَ النَّاصِحِيْنَ
'হে মুসা, নিশ্চয় পারিষদবর্গ তোমাকে হত্যার পরামর্শ করছে, তাই তুমি বেরিয়ে যাও, নিশ্চয় আমি তোমার জন্য কল্যাণকামীদের একজন।” তিনি তখন শহর ছেড়ে মাদায়েন চলে যান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ষড়যন্ত্রকারীদের থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে মক্কা ছেড়ে মদিনা হিজরত করেন এবং গুহার বিষধর প্রাণীর দংশন থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রক্ষার উদ্দেশ্যে হজরত আবু বকর রা. গুহার ছিদ্রপথ কাপড় দ্বারা বন্ধ করে দেন। এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম সতর্কতা অবলম্বনের পর আল্লাহ তায়ালার ওপর তাওয়াক্কুল করে এই উম্মতকে তাওয়াক্কুল শিক্ষা দিয়েছেন। কুরআন মাজীদে এর অনেক নজির বিদ্যমান। হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এর উক্তি উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَى إِخْوَتِكَ
'তুমি তোমার ভাইদের নিকট তোমার স্বপ্নের বর্ণনা দিও না।' অন্য আয়াতে হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এর উক্তি উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابِ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ
'তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ কোরো না; বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করো।" অনেকে প্রশ্ন করতে পারে, আমরা কীভাবে সতর্কতা অবলম্বন করব? অথচ সৃষ্টির বহু পূর্বেই মানুষের ভাগ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে। এর জবাবে বলা হবে—আপনি কেন সতর্কতা অবলম্বন করবেন না? অথচ ভাগ্য নির্ধারণকারীই সতর্কতা অবলম্বনের আদেশ করেছেন। কেননা তিনিই তো বলেছেন,
خُذُوا حِذْرَكُمْ
'তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো।'

আবু উসমান বলেন, একদিন ঈসা আলাইহিস সাল্লাম পাহাড়ের চূড়ায় নামায পড়ছিলেন। তখন শয়তান তার কাছে এসে বলল, আপনি তো বলে থাকেন, সবকিছু আল্লাহর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়। তিনি উত্তরে বলেছিলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই আমি তা দাবি করি। শয়তান বলল, তাহলে আপনি পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে মনকে বলুন, আল্লাহ আমার জন্য এটাই সিদ্ধান্ত রেখেছেন। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন, হে অভিশপ্ত শয়তান! পরীক্ষা আল্লাহই করবেন বান্দাকে। বান্দা কী করে আল্লাহকে পরীক্ষা করার স্পর্ধা দেখাবে?
***
আমরা সুফিদের যে সকল অবান্তর ও অনর্থক কর্মকাণ্ডের ঘটনাবলি উল্লেখ করেছি—এর সবই ছিল শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা।

আবদুর রহমান সালামি বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ রাযির কাছ থেকে শুনেছি, জনৈক ব্যক্তি আবু আবদুল্লাহ ইবনে সালেমকে জিজ্ঞেস করেন, আমরা কি উপার্জনের ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদত করব নাকি তাওয়াক্কুলের ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদত করব? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, তাওয়াক্কুল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থা, আর উপার্জন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নত। তিনি আরও বলেন, যার বিশ্বাস দৃঢ় নয়, তার জন্য উপার্জন করা সুন্নত। তবে আল্লাহর ওপর যার দৃঢ় বিশ্বাস আছে, তার জন্য উপার্জন করা বৈধ নয়। আবুল কাসেম রাজী বলেন, আমি ইউসুফ ইবনে হোসাইনকে বলতে শুনেছি, কোনো শিষ্য জাগতিক উপার্জনে ব্যস্ত হলে তার থেকে কল্যাণ পাওয়া যাবে না।

গ্রন্থকার বলেন, যারা তাওয়াক্কুলের মর্মার্থ বুঝতে অপারগ, তারাই এমন কথা বলার স্পর্ধা দেখাতে পারেন। ইতোপূর্বে আমরা উল্লেখ করে এসেছি, তাওয়াক্কুল অন্তরঘটিত ব্যাপার। তাই রিযিক অন্বেষণে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার তাওয়াক্কুল-পরিপন্থী হতে পারে না। রিযিক অন্বেষণকারী তাওয়াক্কুলকারী না হলে তো বলতে হবে, কোনো নবী তাওয়াক্কুলকারী ছিলেন না! কেননা হজরত আদম আলাইহিস সালাম চাষী ছিলেন, হজরত নুহ ও যাকারিয়া আলাইহিস সালাম কাঠমিস্ত্রি ছিলেন, হজরত ইদরীস আলাইহিস সালাম দর্জি ছিলেন, হজরত ইবরাহিম ও লূত আলাইহিস সালাম কৃষক ছিলেন, হজরত সালেহ আলাইহিস সালাম ব্যবসায়ী ছিলেন, হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম বর্ম বানাতেন এবং তা বিক্রি করে সংসার চালাতেন, হজরত মুসা আলাইহিস সালাম, শুয়াইব আলাইহিস সালাম ও হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাখাল ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: وَأَنَا كُنْتُ أَرْعَاهَا لِأَهْلِ مَكَّةَ بِالْقَرَارِيطِ
'আমি অর্থের বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চড়াতাম।'

আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য গনিমতের অংশ নির্ধারণ করলে তাঁকে আর উপার্জনের পেছনে পড়তে হয়নি। হজরত আবু বকর, ওসমান, আবদুর রহমান ইবনে আউফ ও তালহা রা. কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন। তেমনিভাবে মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন ও মায়মুন ইবনে মেহরান রহ.ও কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন। হজরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম, আমর ইবনুল আস, আমের ইবনে কুরাইজ রা. রেশম ব্যবসায়ী ছিলেন। তেমনিভাবে ইমাম আবু হানিফা রহ.ও রেশম ব্যবসায়ী ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম রা. ও তাবেয়িনরা নিজে উপার্জন করতেন এবং অন্যকেও এ ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন।

আতা ইবনে সায়েব রা. বলেন, খিলাফতের গুরুদায়িত্ব হজরত আবু বকর রা. এর কাঁধে পড়লে তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে মাথায় কাপড় নিয়ে বাজারে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে হজরত ওমর ও আবু উবায়দা রা. এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তাঁরা বলেন, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন, আমি বাজারে যাচ্ছি। তাঁরা বললেন, আপনি বাজারে গিয়ে ব্যবসা করলে মুসলমানদের দায়িত্ব পালন করবে কে? সিদ্দীকে আকবর রা. বললেন, আমি যদি ব্যবসা না করি, আমার পরিবারের ভরণ-পোষণ কীভাবে হবে?

আমর ইবনে মাইমূন রা. বলেন, আবু বকর রা. এর ওপর খিলাফতের দায়িত্ব পড়লে, তাঁর জন্য দুই হাজার দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করা হয়। তিনি বললেন, আমাকে আরও কিছু বাড়িয়ে দাও, কেননা আমার পরিবার আছে। আর তোমরাও আমাকে ব্যবসা থেকে বিরত রাখছ। তখন আরও পাঁচশত দিরহাম ভাতা বাড়ানো হয়।

গ্রন্থকার বলেন, কেউ যদি সুফিদেরকে বলে, আমি আমার পরিবারকে কীভাবে খাওয়াব? এ কথা শুনে সুফি বলবে, তুমি শিরক করে ফেলেছ। কাউকে তারা ব্যবসা করতে দেখলে তারা তাকে বলবে, তুমি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলকারী নও, তোমার ইয়াকীন বিশুদ্ধ হয়নি। অথচ এই বেচারা সুফি তাওয়াক্কুল ও ইয়াকীনের সঠিক মর্ম অনুধাবন করতে না পেরে এমন মন্তব্য করেছে। অনেক সুফি তাই আয়-উপার্জন বাদ দিয়ে সারাক্ষণ খানকায় পড়ে থাকে। এখানে লোকজন দান-দক্ষিণা করে থাকে। এই দান-অনুদানই হয় তাদের তাওয়াক্কুলের কেন্দ্রবিন্দু। এক্ষেত্রে দোকান আর খানকার মাঝে তেমন বিস্তর তফাৎ নেই।

ইবরাহিম ইবনে আদহাম বলেন, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলতেন, যে ব্যক্তি উপার্জন বাদ দিয়ে সারাক্ষণ মসজিদে পড়ে থাকে এবং মানুষের দান-অনুদান গ্রহণ করে সে যেন ভিক্ষার জন্য হাত পাতল।

ইসমাঈল ইবনে নাজদি বলেন, আবু তুরাব তাঁর সঙ্গীদেরকে বলতেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তালিযুক্ত কাপড় পরবে, সে যেন ভিক্ষার ভান করল। আর যে ব্যক্তি উপার্জন ছাড়া খানকা বা মসজিদে পড়ে থাকবে, সেও ভিক্ষার ভান করল।

গ্রন্থকার বলেন, পূর্বেকার মহান বুযুর্গরা এমন ভান-বাহানা অবলম্বন করতে নিষেধ করতেন এবং জীবিকার সন্ধানে বের হবার তাগাদা দিতেন। হজরত উমর রা. বলেন, হে দরিদ্র জাতি, তোমরা মাথা উঁচু করো। নিশ্চয় হক-বাতিলের পথ স্পষ্ট হয়েছে। সুতরাং কল্যাণের দিকে এসো এবং মুসলমানদের ওপর নির্ভরশীল হয়ো না।

মুহাম্মাদ ইবনে আসেম বলেন, আমার কাছে এ বার্তা এসেছে যে, কোনো বালককে দেখে হজরত উমর রা. খুশি হলে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে বলতেন, তার কি কোনো পেশা আছে? না-সূচক উত্তর দেয়া হলে তিনি বলতেন, সে আমার দৃষ্টি হতে দূরে সরে পড়ল।

সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবারা সিরিয়ায় ব্যবসা করতেন। তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ ও সাঈদ ইবনে যায়েদ রা. সেই ব্যবসায়ীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

আবুল কাসেম খুত্তালি বলেন, আমি আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে জিজ্ঞেস করলাম, এমন ব্যক্তিকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখেন, যে সারাক্ষণ ঘরে বা মসজিদে অবস্থান করে বলে, আমি ততক্ষণ কোনো কাজ করব না, যতক্ষণ আমার রিযিক আমার কাছে না আসে। তখন আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বললেন, সে তো শরিয়ত সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ব্যক্তি। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
جَعَلَ اللَّهُ رِزْقِي تَحْتَ ظِلَّ رُمْحِي
'আল্লাহ তায়ালা আমার তরবারির ছায়ার নীচে আমার রিযিক নির্ধারণ করেছেন।'

অন্য হাদিসে এসেছে, পাখিরা ভোরবেলা খালি পেট নিয়ে রিযিকের সন্ধানে বের হয়。

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, وَآخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الْأَرْضِ يَبْتَغُونَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ 'আর কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে পৃথিবীতে ভ্রমণ করবে।"

অন্য আয়াতে এসেছে- لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَبْتَغُوا فَضْلًا مِنْ رَبِّكُمْ 'আল্লাহর রিযিক সন্ধান করাতে তোমাদের কোনো পাপ নেই।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবায়ে কেরামগণ জলে-স্থলে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন এবং নিজেদের খেজুর বাগানে কাজ করতেন। এঁরাই তো আমাদের আদর্শ।

আবু বকর মারুযি বলেন, আমি আবু আবদুল্লাহকে বললাম, তাওয়াক্কুলের দাবিদার এ সব লোকেরা বলে, আমরা রিযিকের সন্ধান করব না। কেননা আল্লাহর জিম্মাতেই আমাদের রিযিক। আবু আবদুল্লাহ উত্তরে বললেন, এটা একটা অবান্তর মন্তব্য। অজ্ঞরাই এমন বলতে পারে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ 'জুমার দিন নামাযের আযান দিলে ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ করে নামাযের দিকে ধাবিত হও।"

আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ বলেন, আমি আমার পিতাকে এমন জাতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, যারা বলে, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করব, উপার্জনের পেছনে পড়ব না। তিনি তখন বললেন, এটা একমাত্র বেকুবরাই বলতে পারে। প্রত্যেক মানুষের উচিত—আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে রিযিকের সন্ধানে সাধ্যমতো চেষ্টা-তদবির করা। ফযল ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে যিয়াদ বলেন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. মানুষকে বাজারে গিয়ে ব্যবসা করার নির্দেশ দিয়ে বলতেন, বাজারে গিয়ে ব্যবসা করলে মানুষের মুখাপেক্ষী থাকতে হয় না।

গ্রন্থকার বলেন, ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. ফসল কাটতেন, সালমান খাওয়াস রহ. টোকাই ছিলেন এবং হোযাইফা মারয়াসী গোয়াল ছিলেন। ইবনে আকিল বলেন, উপকরণ গ্রহণ করা তাওয়াক্কুল-পরিপন্থী নয়, পাথেয় ও উপকরণ গ্রহণকারীকে নিন্দা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। ভালো করে জেনে রাখা দরকার-নবীদের অনন্য গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত হয়ে আরও উঁচু বৈশিষ্ট্যের অনুশীলন একদিকে যেমন শরিয়তে নিষিদ্ধ, অন্যদিকে তা দীনের জন্য বহু ক্ষতি ডেকে আনে।

টিকাঃ
১. সুরা নিসা: আয়াত ৫
২. মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৯৭, [আলবানি রহ. হাদিসটি সহিহ বলেছেন]
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১২৯৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৬২৮
২. সুরা নিসা: আয়াত ৭১
৩. সুরা আনফাল: আয়াত ৬০
৪. সুরা দুখান: আয়াত ২৩
৫. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৯০৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২১৪৬
৬. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩২৮০, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২০১২
৭. [হাসান] সহিহুল জামে': হাদিস নং ১০৬৮
৮. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৫৯
১. সুরা নিসা: আয়াত ১০২
২. সুরা নিসা: আয়াত ১০২
৩. সুরা কাসাস: আয়াত ২০
৪. সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫
৫. সুরা ইউসুফ: আয়াত ৬৭
৬. সুরা নিসা: আয়াত ৭১
১. [সহিহ] মুসনাদে আহমাদ: ২/৫০
২. [সহিহ] সহিহুল জামে': হাদিস নং ৫২৫৪
৩. সুরা মুয্যাম্মিল: আয়াত নং ২০
৪. সুরা বাকারা: আয়াত নং ১৯৮
৫. সুরা জুমা: আয়াত ৯

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 চিকিৎসা গ্রহণের ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের কুমন্ত্রণা

📄 চিকিৎসা গ্রহণের ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের কুমন্ত্রণা


গ্রন্থকার বলেন, রোগ-বালাই হলে তার জন্য চিকিৎসা গ্রহণের ব্যাপারে আলেমদের মাঝে কোনো মতবিরোধ নেই। শুধু মুষ্টিমেয় কিছু লোকের মতামত হচ্ছে, চিকিৎসা না নেয়া উত্তম। এ ব্যাপারে মনীষীদের অভিমত এবং আরও বিস্তারিত তত্ত্ব ও তথ্য আমি চিকিৎসাবিষয়ক 'লাকতুল মানাফী' গ্রন্থে বিবৃত করেছি। এখানে আমি শুধু এটুকুই আলোকপাত করব, যেহেতু চিকিৎসা গ্রহণ সর্বসম্মতিক্রমে বৈধ এবং কোনো কোনো আলেমের মতে উত্তম হিসেবে বিবেচিত। সুতরাং আমরা তাদের কথার প্রতি কর্ণপাত করব না যারা বলে, চিকিৎসা গ্রহণ করা 'তাওয়াক্কুল' এর বিপরীত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত আছে,
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন এবং চিকিৎসা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।”

তাবারি বলেন, বিভিন্ন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসা না নিয়ে বসে থাকা তাওয়াক্কুলের পরিচায়ক নয়। এটা উচিতও নয়। কেননা আল্লাহ তায়ালা মৃত্যু ব্যতীত যত রোগ-ব্যাধি আছে তার চিকিৎসারও ব্যবস্থা করেছেন। রোগ সারানোর উপকরণও সৃষ্টি করেছেন, যেভাবে পানাহারকে ক্ষুদা নিবারণের উপকরণ বানিয়েছেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা তার মাখলুককে ক্ষুধা ও রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখার ক্ষমতা রাখেন। সুতরাং ক্ষুধার যন্ত্রণা যেভাবে পানাহার দিয়ে দূরীভূত হয়, তদ্রূপ ঔষধ খাওয়ার মাধ্যমে তিনি রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থা রেখেছেন।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫৬৭৮, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৫৭৪১
২. মুসতাদরাকে হাকিম: ৪/৪৪৫

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 নির্জনতা ও জুমা ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে সুফিদের ওপর

📄 নির্জনতা ও জুমা ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে সুফিদের ওপর


আগেকার যুগে যারা একাকিত্ব এবং মানুষের কাছ থেকে পৃথক থাকার অভ্যাস অবলম্বন করতেন, তাদের মূল লক্ষ্য থাকত যেন জ্ঞান অর্জন ও আল্লাহর ইবাদতে ভালো করে মনোনিবেশ করা যায়। কিন্তু তারা এই নির্জনতা অবলম্বন করতে গিয়ে কখনো জুমা ও জামাত ছাড়তেন না। অসুস্থের খবরাখবর নিতেন, জানাযার নামাযে উপস্থিত হতেন। একাকিত্ব অবলম্বনের কারণ ছিল কেবলই মন্দ কাজ হতে বিরত থাকা, ঝগড়া-বিবাদ থেকে নিরাপদ থাকা এবং অসৎ সংশ্রব থেকে দূরে থাকা। সুফিদের এক গোষ্ঠীর অন্তরে প্ররোচনা জাগাতে থাকল শয়তান। এতে কতেক সুফি পাহাড়ের চূড়ায় সন্ন্যাসীদের মতো আসন গাড়তে আরম্ভ করল। জুমা এবং জামাতের সাথে নামায আদায়ের তোয়াক্কা করল না। ছেড়ে দিল আলেম ও জ্ঞানীদের সংশ্রব। সাধারণত সুফিরা তাদের খানকায় অবস্থান করে। মসজিদে নামায পড়তে খুব কমই আসে। প্রশান্তিদায়ক বিছানায় পড়ে থাকে। জীবিকার চিন্তা ছেড়ে দেয়।

আবু হামেদ গাযালি রহ. এহইয়াউল উলুম গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রেয়াযত বা সাধনার লক্ষ্য হচ্ছে মনের একাগ্রতা জাগ্রত হওয়া। এ লক্ষ্য তখনই সাধিত হবে যখন সে একটি অন্ধকার ঘরে কিংবা যদি অন্ধকার ঘর পাওয়া না যায়, তাহলে চক্ষু বন্ধ করে চাদর ইত্যাদির নিচে একাকী অবস্থান করবে। এমতাবস্থায় সে হক শব্দ শুনতে পাবে এবং পরম প্রতিপালকের জালাল ও ঔজ্জ্বল্য প্রত্যক্ষ করতে পারবে।

গ্রন্থকার বলেন, এই প্রশিক্ষণের দিকে গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, একজন ফকিহ ব্যক্তির পক্ষ থেকে কী করে এমন কথা বেরোতে পারে? আর তিনি কী করে বুঝলেন যে, সে যা শুনবে তা আল্লাহ তায়ালার আওয়াজ! আর সে যা দেখতে পাবে তা পরম প্রতিপালকের জালাল বা ঔজ্জ্বল্য! অথচ যে ব্যক্তি প্রয়োজনের তুলনায় কম আহার করবে, তার ব্যাপারে এমন আশঙ্কা আছে যে, হয়তো সংজ্ঞা হারাবে। কোনো কোনো সময় মানুষ বিভিন্ন প্ররোচনা ও সন্দেহ থেকে দূরে থাকে। কিন্তু যখন সে চোখ বন্ধ করে তার মনে বিভিন্ন ধরনের সন্দেহের উদ্রেক হয়ে থাকে। কেননা মানব মস্তিষ্কে তিনটি শক্তি বিদ্যমান। এক. ইচ্ছাশক্তি, দুই. চিন্তাশক্তি ও তিন. স্মরণশক্তি। মস্তিষ্কে ইচ্ছার স্থানের আগে আরও দু'টি পর্দা আছে, চিন্তার স্থান মাঝামাঝি আর ধী বা স্মরণশক্তি আরও পেছনে অবস্থান করে। মানুষ যখন তার মাথা ঝুঁকিয়ে রাখে এবং চক্ষু বন্ধ করে নেয় তখন চিন্তা ও ইচ্ছাশক্তি প্রভাবিত হতে থাকে।

আবু উসমান ইবনুল আদমি বলেন, আবু উবাইদ বসরির নিয়ম ছিল, রমযানের প্রথম তারিখে ঘরে গিয়ে স্ত্রীকে বলতেন, আমার ঘরের দরজা মাটি দ্বারা ভরাট করে দেবে এবং ছিদ্র দিয়ে প্রতিদিন একটি করে রুটি দেবে। ঈদের দিন এলে স্ত্রী তার ঘরে গিয়ে ত্রিশটি রুটি দেখতে পেত। সে কিছু খেত না, পানও করত না এবং মাসের শেষ দিন পর্যন্ত এক অযুতে থাকত।

গ্রন্থকার বলেন, এই ঘটনা দু'টি কারণে আমার মতে বিশ্বাসযোগ্য নয়। প্রথমত এক মাস ধরে মানুষ কীভাবে পানাহার, অযু ও পায়খানা-পেশাব ছাড়া চলতে পারে? দ্বিতীয়ত মুসলমান হয়ে জুমা ও জামাতে নামায আদায় হতে বিরত থাকা কি উচিত? অথচ এটা ওয়াজিব, ছেড়ে দেয়া নাজায়েয। তথাপি ঘটনা যদি বাস্তবে ঘটেও থাকে, তাহলে বলতে হবে এই লোকের সাথে শয়তান ধোঁকা দিতে অনেক চেষ্টা-তদবির চালিয়ে সফল হয়েছে।

আবু আবদুল্লাহ নিশাপুরী বলেন, আমি অনেকবার আবুল হাসান সুফিকে বলতে শুনেছি, তাঁকে জুমা ও জামাত তরক করার কারণে বহু অপদস্থ হতে হয়েছে। তিনি বলতেন, ফজিলত যদিও জামাতের মধ্যে, কিন্তু নিরাপত্তা একাকিত্বে নিহিত।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 নির্জনতার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা

📄 নির্জনতার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা


যে নির্জনতা ও একাকী অবস্থানের ফলে ইলম অর্জন এবং কাফিরদের সাথে জিহাদ হতে বঞ্চিত থাকতে হয়, এমন নির্জনতা ও একাকী অবস্থানের ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে।

হজরত আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে একটি বাহিনীর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমাদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি পাহাড় দিয়ে অতিক্রমকালে সেখানে সামান্য পানি দেখতে পেল। সে মনে মনে ভাবল, এই পাহাড়ে আমি ঘর নির্মাণ করব এবং এখানে যে সবুজ প্রকৃতি আছে, তা হতে জীবিকা নির্বাহ করে জীবন কাটিয়ে দেব। দুনিয়াদারি থেকে একেবারে পৃথক হয়ে যাব। পরে সে ভাবল, ব্যাপারটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উপস্থাপন করে দেখি। তিনি অনুমতি দিলেই আমি এমন করব, নচেৎ নয়। সে এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বিস্তারিত মনোবাসনার কথা পেশ করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি ইহুদিবাদ ও খ্রিষ্টবাদ নিয়ে অবতীর্ণ হইনি; বরং প্রকৃত শরিয়ত ও সহজ দীন নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছি। ওই সত্তার কসম, যার কুদরতি হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! আল্লাহর রাস্তায় সকাল-সন্ধ্যা একবার কদম উঠানো দুনিয়া এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু রয়েছে তদাপেক্ষা উত্তম। আর তোমাদের জন্য জামাতের কাতারে দাঁড়ানো একাকী ষাট বছর নামায অপেক্ষা উত্তম।'

টিকাঃ
১. [যঈফ] মুসনাদে আহমাদ: ৫/২৬৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00