📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 অল্প বয়স্ক যুবকদের থেকে দূরে থাকা

📄 অল্প বয়স্ক যুবকদের থেকে দূরে থাকা


পূর্বেকার লোকেরা বালকদের থেকে দূরে থাকার জন্য জোর দিতেন। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, “রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্দর চেহারার বালককে পিঠের পেছনে বসিয়েছেন।” সুফিয়ান সাওরি রহ. কোনো সুন্দর চেহারার বালককে তাঁর কাছে বসতে দিতেন না। ইবরাহিম ইবনে হানী হতে বর্ণিত আছে, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন বলেছেন, এমন কখনো হয়নি যে, একই রাস্তায় আমার সাথে কোনো বালক চলার আশা করবে, আর ওদিকে আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.ও থাকবেন। আবু আইয়ুব বলেন, আমি আবু নসর ইবনে হারেসের সাথে ছিলাম। তার সাথে এক অত্যধিক সুন্দরী কন্যা, যার মতো সুন্দর বালিকা আমি আর কখনো দেখিনি, সে এসে বলল, হে জনাব, বাবে হারাব কোথায় অবস্থিত? তিনি উত্তর দিলেন, এই যে সামনে ফটক আছে, এটাকেই বাবে হারব বলে।

এরপর একজন অত্যধিক সুন্দর বালক, যার মতো সুন্দর বালক আগে আমি আর কখনো দেখিনি, সে এসে বলল, হে জনাব, বাবে হারব কোথায়? আবু নসর মাথা নিচু করে ফেললেন এবং নিজের চোখ বন্ধ করে দিলেন। আমি ছেলেটিকে বললাম, এদিকে এস। কী জিজ্ঞেস করছ? সে বলল, বাবে হারাব কোথায়? আমি বললাম, তোমার সামনে। বালক চলে গেলে আমি শায়খকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবু নসর! আপনার সামনে মেয়ে এলো, আপনি তার কথার উত্তর দিলেন। আর যখন বালক এলো, তখন তার সাথে কথা বললেন না। কেন? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ, সুফিয়ান সাওরি হতে বর্ণিত আছে, মেয়েদের সাথে একজন শয়তান থাকে, আর সুন্দর চেহারার বালকদের সাথে দু'জন শয়তান থাকে। আমি নিজের ব্যাপারে সেই দুই শয়তানের কথা ভেবে ভীত হয়ে পড়েছিলাম। অন্য এক বর্ণনামতে, সুন্দর চেহারার বালকদের সাথে দশজন পর্যন্ত শয়তান থাকে।

আবুল কাসেম আমাকে বলেছেন, মুহাম্মাদ ইবনে হোসাইন—যিনি ইয়াহইয়া ইবনে মাঈনের সাথি ছিলেন, তার কাছে গেলেন। বলা হয়ে থাকে, তিনি চল্লিশ বছর পর্যন্ত আকাশের দিকে মাথা তুলে তাকাননি।

আমরা যখন তার কাছে গেলাম, তখন আমাদের সাথে সুন্দর চেহারার একজন বালকও তার মজলিসে উপস্থিত ছিল। তাকে তিনি বললেন, আমার সম্মুখ থেকে চলে যাও এবং আমারে পেছনে বসো। আবু উসামা বলেন, আমি একজন শায়খের কাছে থাকতাম, যিনি হাদিস বর্ণনা করতেন। তার কাছে হাদিস শোনাতে এক বালক এলো। আমি সেখান থেকে উঠতে চাইলে, তিনি আমার বাহু ধরে বললেন, দাঁড়াও। একটু অপেক্ষা করো। বালকের শোনানো শেষ হলে তখন যেও। আমি একাকী এই বালকের সাথে থাকা খুব অপছন্দ করি।

আবু আলী রোযবারী আমাকে বলেছেন, আমাকে আবুল আব্বাস আহমদ আলমুয়াদ্দিব জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু আলী! আমাদের কালে সুফিরা সুন্দর চেহারার বালকদেরকে কাছে রাখার নিয়ম কোথায় পেল? উত্তরে আমি বললাম, হে জনাব! আপনি তো তাদেরকে খুব ভালো করেই চেনেন। অধিকাংশ সময় বালকেরা তাদের কাছে নিরাপদেই থাকে। তিনি বললেন, হায়! হায়! আমি তাদের চেয়ে আরও উত্তম বুযুর্গদের দেখেছি, যাদের ঈমান আরও দৃঢ় ছিল—তারা যখন সুন্দর চেহারার কোনো বালককে দেখত, এমনভাবে পালাত—যেভাবে মানুষ জঙ্গলের হিংস্র জন্তু থেকে পলায়ন করে। এসব কথা কেবল ওই সময়ের উপযোগী, যখন অধিকাংশ মানুষের ওপর অবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয়। যখন অভ্যাস স্বাভাবিক থাকে, তখন এমন আশঙ্কার ধারণা একেবারেই অমূলক।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সুন্দর বালকদের সাথে মেলামেশা

📄 সুন্দর বালকদের সাথে মেলামেশা


সুন্দর চেহারার বালকদের সাথে উঠা-বসা ও মেলামেশা করা ইবলিসের একটি অন্যতম ফাঁদ। যা দিয়ে সে সুফিদের শিকার করে বেড়ায়। আবু আবদুর রহমান সালামী আমাকে বলেন, আমি আবু বকর রাযী'র কাছে শুনেছি, ইউসুফ ইবনে হোসাইন বলেছেন, আমি সৃষ্টির বিপৎসমূহের ওপর গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলাম তার উৎপত্তি কোথায়। সুফিদের বিপদাপদ আমি সুন্দর চেহারার বালকদের সোহবত, মূর্খদের মেলামেশা এবং নারীদের সংশ্রবে পেয়েছি। সুফি ইবনে ফারাজ রুস্তমি বলেন, আমি শয়তানকে স্বপ্নে দেখেছি। তাকে বললাম, তুমি আমাদেরকে কেমন পেলে? আমরা তো দুনিয়া ও তার সমুদয় আরাম-আয়েশের সামগ্রী এবং ধন-দৌলত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। এখন তুমি তো আর আমাদেরকে কাবু করতে পারছ না। শয়তান বলল, তোমাদের কি খবর আছে? তোমাদের মন গান শ্রবণ ও সুন্দর চেহারার বালকদের সাথে মেলামেশার প্রতি কী পরিমাণ উদগ্রীব? আবু সাঈদ বলেন, এই ফিতনা থেকে খুব কম সুফি-দরবেশই মুক্তি পেতে পারেন。

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সুন্দর বালকদের প্রতি দৃষ্টিপাতের শাস্তি

📄 সুন্দর বালকদের প্রতি দৃষ্টিপাতের শাস্তি


আবু আবদুল্লাহ ইবনুল জালাল বলেন, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একজন খ্রিষ্টান সুদর্শন বালককে দেখছিলাম। ইত্যবসরে আবু আবদুল্লাহ বলখি আমার সম্মুখে এসে জিজ্ঞেস করলেন, কেন দাঁড়িয়ে আছেন? আমি বললাম, চাচাজান! এই সুন্দর চেহারার দিকে লক্ষ করেছেন, কীভাবে তাকে জাহান্নামে শাস্তি দেয়া হবে! তিনি তাঁর উভয় হাত দ্বারা আমার সিনায় ধাক্কা দিয়ে বললেন, তার পরিণতি তোমাকেও ভুগতে হবে, যদিও এটা কিছুটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমি চল্লিশ বছর পর এর প্রমাণ পেলাম। আমি কুরআন শরিফ ভুলে গিয়েছিলাম।

আবুল আদইয়ান বলেন, আমি আমার ওস্তাদ আবু বকর দাক্কাক-এর সাথে ছিলাম। এক অল্পবয়সী যুবক সামনে এলে তাকে আমি দেখছিলাম। তার প্রতি তাকিয়ে আছি দেখে ওস্তাদ আমাকে বললেন, বৎস! কিছুদিন পর তুমি টের পাবে এর অশুভ পরিণতি। আমি বিশ বছর ধরে অপেক্ষায় রইলাম। কিন্তু সেই অশুভ পরিণতি দেখলাম না। এই ভাবনায় একবার শুয়ে পড়লাম। ভোরে ওঠে দেখলাম পুরো কুরআন শরিফ আমার আর স্মরণ নেই।

আবু বকর কাত্তানী আমাকে বলেছেন, আমি আমার এক বন্ধুকে স্বপ্নে দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ তোমার সাথে কীরূপ ব্যবহার করেছেন? উত্তরে তিনি জানালেন, আমার সামনে আমার কৃত সমুদয় পাপ উপস্থাপন করে আমাকে বলা হলো, তুমি এমন এমন করেছ। তারপর বলা হলো, তুমি এমন এমনও করেছ, এটা স্বীকার করতে আমার খুব লজ্জাবোধ হলো। আমি বললাম, এর স্বীকারোক্তিতে আমার ভীষণ লজ্জা হচ্ছে। আমাকে বলা হলো, তোমার স্বীকারকৃত পাপ যখন আমি ক্ষমা করে দিয়েছি, তো লজ্জায় স্বীকার করতে ইতস্ততবোধ করছ—এমন পাপসমূহও ক্ষমা করে দিলাম। আমি বললাম, সেই লজ্জাজনক পাপটি কী? সে বলল, একজন সুদর্শন বালকের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছি, যে আমার সামনে দিয়ে কোথাও যাচ্ছিল। এক বর্ণনায় আছে, আমি লজ্জিত হয়ে প্রচণ্ড ঘেমে যাচ্ছিলাম; এমনকি আমার মুখের মাংস পড়ে যাচ্ছিল।

আবু ইয়াকুব তাবারি হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমার কাছে একজন সুদর্শন বালক থাকত। সে আমার সেবা-যত্ন করত। একবার বাগদাদ থেকে এলো একজন সুফি। সে অধিকাংশ বালকের প্রতি তাকিয়ে থাকত। আমি তাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করতাম। একরাতে আমি ঘুমের মধ্যে মহান আল্লাহকে স্বপ্নে দেখলাম। আমাকে তিনি বলছেন, তুমি কেন বাগদাদিকে বালকদের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার ব্যাপারে বারণ করছ না? আমার মর্যাদার কসম! তাকেই আমি বালকদের প্রতি আগ্রহী করে তুলি, যাকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখতে চাই। আবু ইয়াকুব বলেন, এ কথা শুনে আমি খুব বিচলিত হয়ে পড়লাম। বাগদাদিকে স্বপ্নে কথা বললে সে জোরে এক চিৎকার মেরে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়ল। তাকে গোসল ও দাফন করলাম। কিন্তু আমার মনপ্রাণজুড়ে তার চিন্তা। অবশেষে তাকে স্বপ্নে দেখলাম একমাস পর। জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ তায়ালা তোমার সাথে কীরূপ আচরণ করেছেন? তিনি বললেন, আমাকে খুব ধমক দেয়া হয়েছে। এমনকি আমি মুক্তির ব্যাপারে হয়ে পড়লাম আশঙ্কাগ্রস্ত। পরে আমাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। আমি বলছি, এ ব্যাপারে আমি দীর্ঘ আলোচনা করে আসছি। কেননা অধিকাংশ সাধারণ মানুষ এ পাপে লিপ্ত। এ ব্যাপারে আরও বিশদভাবে জানতে চাইলে 'যাম্মুল হাওয়া' নামীয় গ্রন্থে চোখ রাখতে পারেন। তাতে এ সকল বিষয়ে বিশদ বিশ্লেষণ বিদ্যমান。

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 তাওয়াক্কালের দাবি করা ও ধন-সম্পদের ব্যাপারে সুফিদের ওপর

📄 তাওয়াক্কালের দাবি করা ও ধন-সম্পদের ব্যাপারে সুফিদের ওপর


আহমদ ইবনে আবুল হাওয়ারি বলেন, আমি আবু সুলাইমান দারানিকে বলতে শুনেছি, আমরা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল ও পূর্ণ ভরসা করলে চোরের ভয়ে দেয়াল দিতাম না এবং দরজায় তালা দিতাম না।

যুন্নুন মিসরির সূত্রে বর্ণিত আছে, আমি কয়েক বছর ভ্রমণ করেছি, কিন্তু এর ভেতর একবার ব্যতীত আল্লাহর ওপর আমার ভরসা বিশুদ্ধ হয়নি। আমি একদিন সমুদ্র ভ্রমণে ছিলাম। প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাসে আমাদের জাহাজ টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তখন আমি জাহাজের একটি কাঠের খণ্ডের সাথে ভাসতে থাকি। একসময় মন আমাকে বলল, আল্লাহ তায়ালা যদি তোমার মৃত্যু পানিতে লিখে রাখেন, তাহলে এই কাঠ তোমাকে কী উপকার করবে? তখন আমি কাঠটি ছেড়ে পানিতে ভাসতে থাকি এবং পানির ঢেউ একসময় আমাকে তীরে নিক্ষেপ করে।

হাফেজ আবু নুয়াইম বলেন, জাফর খুলদি তার গ্রন্থে লেখেন, আমি জুনাইদ বাগদাদিকে বলতে শুনেছি, একবার আমরা দলবদ্ধ হয়ে আবু ইয়াকুব যাইয়্যাতের বাড়িতে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লে তিনি বললেন, আল্লাহর ইবাদতে তোমাদের এমন কী ব্যস্ততা নেই, যা তোমাদেরকে আমার কাছে আসতে বাধা দেয়? আমি বললাম, আপনার কাছে আসাও ইবাদতের অংশ। তখন আমরা তাঁর কাছে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে জানতে চাইলাম। প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, আমার কাছে ধন-সম্পদ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় তোমাকে তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা দিতে আমি লজ্জাবোধ করছি।

আবু নাসার সিরাজ স্বীয় কিতাবুল্ লামা গ্রন্থে লেখেন, এক লোক আবদুল্লাহ ইবনে জালার কাছে এসে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো প্রকার উত্তর না দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে একটি থলে নিয়ে আসেন, যাতে কিছু মুদ্রা ছিল। তিনি মুদ্রাগুলো উপস্থিত লোকদেরকে দিয়ে বললেন, তোমরা এগুলো দিয়ে কিছু কিনে আনো। পরে তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা দিলে তাঁকে বলা হলো, আপনি এমন করলেন কেন? জবাবে তিনি বললেন, উক্ত মুদ্রাগুলো থাকা অবস্থায় আমি তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা পেশ করতে লজ্জাবোধ করছি।

গ্রন্থকার বলেন, শরিয়ত সম্পর্কে অজ্ঞতা তাদের এই অসার চিন্তাচেতনা সরবরাহ করেছে। তাওয়াক্কুলের হাকিকত ও বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত থাকলে তারা জানতে পারত যে, আসবাব-উপকরণ তাওয়াক্কুল পরিপন্থী নয়। কেননা আল্লাহর প্রতি মনের অবস্থাকেই তাওয়াক্কুল বলে। এটা শরীরের মাধ্যমে উপকরণ সংগ্রহ ও ধন-সম্পদ সঞ্চয় ও সংরক্ষণের বিপরীত কিছু নয়। ধন-সম্পদের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলা হয়েছে- وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا
'আর তোমরা নির্বোধদের হাতে তোমাদের ধন-সম্পদ দিও না, যাকে আল্লাহ তোমাদের জন্য করেছেন জীবিকার মাধ্যম।"

হাদিসে আছে, হজরত আমর ইবনুল আস রা. বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোক মারফত আমাকে ডেকে বললেন, তুমি বর্ম ও অস্ত্র ধারণ করে আমার কাছে এসো। আমি তখন তা পরিধান করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বললেন, আমি তোমাকে এক সেনাদলের উদ্দেশে পাঠাতে চাই। তুমি সেখানে পৌঁছলে আল্লাহ তায়ালা তোমাকে বিজয়ী করবেন এবং গনীমত দান করবেন। আর ভালো উদ্দেশ্যে আমি তোমার জন্য ধন-সম্পদ কামনা করি। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি তো ধন-সম্পদ লাভের আশায় ইসলাম গ্রহণ করিনি। আল্লাহর আনুগত্য করার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছি। জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আমর! ভালো মানুষের জন্য হালাল ধন-সম্পদ কতই-না উত্তম!'

وَقَالَ «صلى الله عليه وسلم» إِنَّكَ تَدَعُ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَدَعَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ
'তুমি তোমার ওয়ারিশদেরকে সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়া তাদেরকে দরিদ্রাবস্থায় রেখে যাওয়া থেকে উত্তম, যেন মানুষের কাছে তাদের হাত পাততে না হয়।'

ভালো করে জেনে রাখা দরকার যে, আল্লাহ তায়ালা তাওয়াক্কুলের নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি সতর্কতা অবলম্বনের আদেশ দিয়ে বলেছেন,
خُذُوا حِذْرَكُمْ
'তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো।'

অন্য আয়াত আল্লাহ তায়ালা শত্রুর মোকাবিলার নির্দেশ দিতে গিয়ে বলেন,
وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ
'তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী তাদের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো।'

অন্য আয়াতে হজরত মুসা আলাইহিস সালাম-কে শত্রু বাহিনী থেকে আত্মরক্ষার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي لَيْلًا
'আমার বান্দাদের নিয়ে রাতে ভ্রমণ করুন।

স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্ত্রের আঘাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য একসঙ্গে দু'টি লোহার বর্ম পরিধান করেছেন। রোগের বিষয়ে দু'জন চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করেছেন। শত্রুর ভয়ে পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করেছেন। রাতে পাহারার জন্য লোক নিয়োগ দিয়েছেন এবং ঘুমের পূর্বে দরজা বন্ধ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।

হজরত জাবের রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَغْلِقُ بَابَكَ
'তুমি তোমার দরজা বন্ধ করো।'

তিনি তাঁদেরকে এটাও বলেছেন যে, এমন সতর্কতা অবলম্বন করা তাওয়াক্কুলের বিপরীত কোনো বিষয় নয়।

হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. হতে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি তার উট মসজিদের সামনে ছেড়ে দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে উপস্থিত হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তার উট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি বলল, আমি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে তা মসজিদের সামনে ছেড়ে রেখেছি। এটা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, আগে উট বেঁধে আসো, তারপর তাওয়াক্কুল করো।'

ইবনে আকিল বলেন, মানুষ মনে করে, সতর্কতা ও সংরক্ষণ তাওয়াক্কুল-পরিপন্থী বিষয়। তাই কোনো ব্যক্তি আল্লাহর ওপর আস্থাশীল তখনই হতে পারবে যখন সে কর্মপরিণতির চিন্তা পরিত্যাগ করবে এবং ধন-সম্পদ সংরক্ষণে উদাসীন থাকবে। অথচ এটাকে বিদগ্ধ ওলামায়ে কেরাম অক্ষমতা ও অবজ্ঞা বলে আখ্যা দেন। মানুষ এটাকে বিবেকবর্জিত কাজ হিসেবে ধরে নেয়। আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে সতর্কতা অবলম্বন ও সংরক্ষণের ব্যাপারে সাধ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের পর তাওয়াক্কুলের নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্বোধন করে আল্লাহ বলেন,
وَشَاوِرُهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ
'আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে।'

অতএব সতর্কতা অবলম্বন তাওয়াক্কুল-পরিপন্থী হলে আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে তাঁর নবীকে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিতেন না। কেননা পরামর্শের উদ্দেশ্যই হলো, শত্রু থেকে সতর্কতা অবলম্বনের সর্বোত্তম পন্থা সাথিদের থেকে গ্রহণ করা। এছাড়া আল্লাহ তায়ালা সতর্কতা অবলম্বনের ক্ষেত্রে সাথিদের মতামত গ্রহণের নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং নামাযের মতো সর্বোত্তম ইবাদতের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনকে কার্যকরীভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
وَاِذَا كُنْتَ فِيْهِمْ فَاَقَمْتَ لَهُمُ الصَّلٰوةَ فَلْتَقُمْ طَّائِفَةٌ مِّنْهُمْ مَّعَكَ وَلْيَأْخُذُوْا اَسْلِحَتَهُمْ
'আর যখন তুমি তাদের মধ্যে থাকবে। অতঃপর তাদের জন্য নামায কায়েম করবে, তখন যেন তাদের মধ্য থেকে একদল তোমার সাথে দাঁড়ায় এবং তারা তাদের অস্ত্র ধারণ করে।" অতঃপর সতর্কতা অবলম্বনের কারণ বর্ণনা করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন :
وَدَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَوْ تَغْفُلُوْنَ عَنْ اَسْلِحَتِكُمْ وَاَمْتِعَتِكُمْ فَيَمِيْلُوْنَ عَلَيْكُمْ مَّيْلَةً وَّاحِدَةً
'কাফিররা কামনা করে যদি তোমরা তোমাদের অস্ত্র-শস্ত্র ও আসবাব-পত্র সম্বন্ধে অসতর্ক হও তাহলে তারা তোমাদের ওপর একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়বে।” অতএব যে ব্যক্তি জানবে যে, সতর্কতা অবলম্বন তাওয়াক্কুলেরই অংশ, সে কিছুতেই এ কথা বলতে পারবে না যে, সতর্কতা অবলম্বন পরিত্যাগ করলে আল্লাহর প্রতি বান্দার তাওয়াক্কুল বিশুদ্ধ হবে। তাওয়াক্কুল হলো, যা বাস্তবায়নের ক্ষমতা বান্দার নেই, সে বিষয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
'আগে উট বাঁধো, তারপর তাওয়াক্কুল করো।' যদি সতর্কতা অবলম্বন ছেড়ে দেয়ার নাম তাওয়াক্কুল হতো, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নামাযের মধ্যে সতর্কতা অবলম্বন না করার নির্দেশ দিতেন। কিন্তু প্রজ্ঞাবান আল্লাহ তায়ালা তা করেননি, নামাযের মধ্যে সশস্ত্র থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এ কারণেই ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, যদি হামলার আশঙ্কা থাকে, তাহলে নামাযের মধ্যেও সশস্ত্র থাকা ওয়াজিব। অতএব প্রতীয়মান হলো, সতর্কতা অবলম্বন তাওয়াক্কুলের বিপরীত কোনো বিষয় নয়। কেননা মুসা আলাইহিস সালামকে যখন বলা হয়,
يَا مُوْسٰٓى اِنَّ الْمَلَاَ يَأْتَمِرُوْنَ بِكَ لِيَقْتُلُوْكَ فَاخْرُجْ اِنِّيْ لَكَ مِنَ النَّاصِحِيْنَ
'হে মুসা, নিশ্চয় পারিষদবর্গ তোমাকে হত্যার পরামর্শ করছে, তাই তুমি বেরিয়ে যাও, নিশ্চয় আমি তোমার জন্য কল্যাণকামীদের একজন।” তিনি তখন শহর ছেড়ে মাদায়েন চলে যান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ষড়যন্ত্রকারীদের থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে মক্কা ছেড়ে মদিনা হিজরত করেন এবং গুহার বিষধর প্রাণীর দংশন থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রক্ষার উদ্দেশ্যে হজরত আবু বকর রা. গুহার ছিদ্রপথ কাপড় দ্বারা বন্ধ করে দেন। এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম সতর্কতা অবলম্বনের পর আল্লাহ তায়ালার ওপর তাওয়াক্কুল করে এই উম্মতকে তাওয়াক্কুল শিক্ষা দিয়েছেন। কুরআন মাজীদে এর অনেক নজির বিদ্যমান। হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এর উক্তি উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَى إِخْوَتِكَ
'তুমি তোমার ভাইদের নিকট তোমার স্বপ্নের বর্ণনা দিও না।' অন্য আয়াতে হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এর উক্তি উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابِ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ
'তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ কোরো না; বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করো।" অনেকে প্রশ্ন করতে পারে, আমরা কীভাবে সতর্কতা অবলম্বন করব? অথচ সৃষ্টির বহু পূর্বেই মানুষের ভাগ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে। এর জবাবে বলা হবে—আপনি কেন সতর্কতা অবলম্বন করবেন না? অথচ ভাগ্য নির্ধারণকারীই সতর্কতা অবলম্বনের আদেশ করেছেন। কেননা তিনিই তো বলেছেন,
خُذُوا حِذْرَكُمْ
'তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো।'

আবু উসমান বলেন, একদিন ঈসা আলাইহিস সাল্লাম পাহাড়ের চূড়ায় নামায পড়ছিলেন। তখন শয়তান তার কাছে এসে বলল, আপনি তো বলে থাকেন, সবকিছু আল্লাহর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়। তিনি উত্তরে বলেছিলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই আমি তা দাবি করি। শয়তান বলল, তাহলে আপনি পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে মনকে বলুন, আল্লাহ আমার জন্য এটাই সিদ্ধান্ত রেখেছেন। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন, হে অভিশপ্ত শয়তান! পরীক্ষা আল্লাহই করবেন বান্দাকে। বান্দা কী করে আল্লাহকে পরীক্ষা করার স্পর্ধা দেখাবে?
***
আমরা সুফিদের যে সকল অবান্তর ও অনর্থক কর্মকাণ্ডের ঘটনাবলি উল্লেখ করেছি—এর সবই ছিল শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা।

আবদুর রহমান সালামি বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ রাযির কাছ থেকে শুনেছি, জনৈক ব্যক্তি আবু আবদুল্লাহ ইবনে সালেমকে জিজ্ঞেস করেন, আমরা কি উপার্জনের ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদত করব নাকি তাওয়াক্কুলের ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদত করব? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, তাওয়াক্কুল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থা, আর উপার্জন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নত। তিনি আরও বলেন, যার বিশ্বাস দৃঢ় নয়, তার জন্য উপার্জন করা সুন্নত। তবে আল্লাহর ওপর যার দৃঢ় বিশ্বাস আছে, তার জন্য উপার্জন করা বৈধ নয়। আবুল কাসেম রাজী বলেন, আমি ইউসুফ ইবনে হোসাইনকে বলতে শুনেছি, কোনো শিষ্য জাগতিক উপার্জনে ব্যস্ত হলে তার থেকে কল্যাণ পাওয়া যাবে না।

গ্রন্থকার বলেন, যারা তাওয়াক্কুলের মর্মার্থ বুঝতে অপারগ, তারাই এমন কথা বলার স্পর্ধা দেখাতে পারেন। ইতোপূর্বে আমরা উল্লেখ করে এসেছি, তাওয়াক্কুল অন্তরঘটিত ব্যাপার। তাই রিযিক অন্বেষণে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার তাওয়াক্কুল-পরিপন্থী হতে পারে না। রিযিক অন্বেষণকারী তাওয়াক্কুলকারী না হলে তো বলতে হবে, কোনো নবী তাওয়াক্কুলকারী ছিলেন না! কেননা হজরত আদম আলাইহিস সালাম চাষী ছিলেন, হজরত নুহ ও যাকারিয়া আলাইহিস সালাম কাঠমিস্ত্রি ছিলেন, হজরত ইদরীস আলাইহিস সালাম দর্জি ছিলেন, হজরত ইবরাহিম ও লূত আলাইহিস সালাম কৃষক ছিলেন, হজরত সালেহ আলাইহিস সালাম ব্যবসায়ী ছিলেন, হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম বর্ম বানাতেন এবং তা বিক্রি করে সংসার চালাতেন, হজরত মুসা আলাইহিস সালাম, শুয়াইব আলাইহিস সালাম ও হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাখাল ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: وَأَنَا كُنْتُ أَرْعَاهَا لِأَهْلِ مَكَّةَ بِالْقَرَارِيطِ
'আমি অর্থের বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চড়াতাম।'

আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য গনিমতের অংশ নির্ধারণ করলে তাঁকে আর উপার্জনের পেছনে পড়তে হয়নি। হজরত আবু বকর, ওসমান, আবদুর রহমান ইবনে আউফ ও তালহা রা. কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন। তেমনিভাবে মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন ও মায়মুন ইবনে মেহরান রহ.ও কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন। হজরত যুবাইর ইবনুল আউয়াম, আমর ইবনুল আস, আমের ইবনে কুরাইজ রা. রেশম ব্যবসায়ী ছিলেন। তেমনিভাবে ইমাম আবু হানিফা রহ.ও রেশম ব্যবসায়ী ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম রা. ও তাবেয়িনরা নিজে উপার্জন করতেন এবং অন্যকেও এ ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন।

আতা ইবনে সায়েব রা. বলেন, খিলাফতের গুরুদায়িত্ব হজরত আবু বকর রা. এর কাঁধে পড়লে তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে মাথায় কাপড় নিয়ে বাজারে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে হজরত ওমর ও আবু উবায়দা রা. এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তাঁরা বলেন, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন, আমি বাজারে যাচ্ছি। তাঁরা বললেন, আপনি বাজারে গিয়ে ব্যবসা করলে মুসলমানদের দায়িত্ব পালন করবে কে? সিদ্দীকে আকবর রা. বললেন, আমি যদি ব্যবসা না করি, আমার পরিবারের ভরণ-পোষণ কীভাবে হবে?

আমর ইবনে মাইমূন রা. বলেন, আবু বকর রা. এর ওপর খিলাফতের দায়িত্ব পড়লে, তাঁর জন্য দুই হাজার দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করা হয়। তিনি বললেন, আমাকে আরও কিছু বাড়িয়ে দাও, কেননা আমার পরিবার আছে। আর তোমরাও আমাকে ব্যবসা থেকে বিরত রাখছ। তখন আরও পাঁচশত দিরহাম ভাতা বাড়ানো হয়।

গ্রন্থকার বলেন, কেউ যদি সুফিদেরকে বলে, আমি আমার পরিবারকে কীভাবে খাওয়াব? এ কথা শুনে সুফি বলবে, তুমি শিরক করে ফেলেছ। কাউকে তারা ব্যবসা করতে দেখলে তারা তাকে বলবে, তুমি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলকারী নও, তোমার ইয়াকীন বিশুদ্ধ হয়নি। অথচ এই বেচারা সুফি তাওয়াক্কুল ও ইয়াকীনের সঠিক মর্ম অনুধাবন করতে না পেরে এমন মন্তব্য করেছে। অনেক সুফি তাই আয়-উপার্জন বাদ দিয়ে সারাক্ষণ খানকায় পড়ে থাকে। এখানে লোকজন দান-দক্ষিণা করে থাকে। এই দান-অনুদানই হয় তাদের তাওয়াক্কুলের কেন্দ্রবিন্দু। এক্ষেত্রে দোকান আর খানকার মাঝে তেমন বিস্তর তফাৎ নেই।

ইবরাহিম ইবনে আদহাম বলেন, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলতেন, যে ব্যক্তি উপার্জন বাদ দিয়ে সারাক্ষণ মসজিদে পড়ে থাকে এবং মানুষের দান-অনুদান গ্রহণ করে সে যেন ভিক্ষার জন্য হাত পাতল।

ইসমাঈল ইবনে নাজদি বলেন, আবু তুরাব তাঁর সঙ্গীদেরকে বলতেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তালিযুক্ত কাপড় পরবে, সে যেন ভিক্ষার ভান করল। আর যে ব্যক্তি উপার্জন ছাড়া খানকা বা মসজিদে পড়ে থাকবে, সেও ভিক্ষার ভান করল।

গ্রন্থকার বলেন, পূর্বেকার মহান বুযুর্গরা এমন ভান-বাহানা অবলম্বন করতে নিষেধ করতেন এবং জীবিকার সন্ধানে বের হবার তাগাদা দিতেন। হজরত উমর রা. বলেন, হে দরিদ্র জাতি, তোমরা মাথা উঁচু করো। নিশ্চয় হক-বাতিলের পথ স্পষ্ট হয়েছে। সুতরাং কল্যাণের দিকে এসো এবং মুসলমানদের ওপর নির্ভরশীল হয়ো না।

মুহাম্মাদ ইবনে আসেম বলেন, আমার কাছে এ বার্তা এসেছে যে, কোনো বালককে দেখে হজরত উমর রা. খুশি হলে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে বলতেন, তার কি কোনো পেশা আছে? না-সূচক উত্তর দেয়া হলে তিনি বলতেন, সে আমার দৃষ্টি হতে দূরে সরে পড়ল।

সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবারা সিরিয়ায় ব্যবসা করতেন। তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ ও সাঈদ ইবনে যায়েদ রা. সেই ব্যবসায়ীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

আবুল কাসেম খুত্তালি বলেন, আমি আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে জিজ্ঞেস করলাম, এমন ব্যক্তিকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখেন, যে সারাক্ষণ ঘরে বা মসজিদে অবস্থান করে বলে, আমি ততক্ষণ কোনো কাজ করব না, যতক্ষণ আমার রিযিক আমার কাছে না আসে। তখন আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বললেন, সে তো শরিয়ত সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ব্যক্তি। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
جَعَلَ اللَّهُ رِزْقِي تَحْتَ ظِلَّ رُمْحِي
'আল্লাহ তায়ালা আমার তরবারির ছায়ার নীচে আমার রিযিক নির্ধারণ করেছেন।'

অন্য হাদিসে এসেছে, পাখিরা ভোরবেলা খালি পেট নিয়ে রিযিকের সন্ধানে বের হয়。

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, وَآخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الْأَرْضِ يَبْتَغُونَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ 'আর কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে পৃথিবীতে ভ্রমণ করবে।"

অন্য আয়াতে এসেছে- لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَبْتَغُوا فَضْلًا مِنْ رَبِّكُمْ 'আল্লাহর রিযিক সন্ধান করাতে তোমাদের কোনো পাপ নেই।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবায়ে কেরামগণ জলে-স্থলে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন এবং নিজেদের খেজুর বাগানে কাজ করতেন। এঁরাই তো আমাদের আদর্শ।

আবু বকর মারুযি বলেন, আমি আবু আবদুল্লাহকে বললাম, তাওয়াক্কুলের দাবিদার এ সব লোকেরা বলে, আমরা রিযিকের সন্ধান করব না। কেননা আল্লাহর জিম্মাতেই আমাদের রিযিক। আবু আবদুল্লাহ উত্তরে বললেন, এটা একটা অবান্তর মন্তব্য। অজ্ঞরাই এমন বলতে পারে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ 'জুমার দিন নামাযের আযান দিলে ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ করে নামাযের দিকে ধাবিত হও।"

আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ বলেন, আমি আমার পিতাকে এমন জাতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, যারা বলে, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করব, উপার্জনের পেছনে পড়ব না। তিনি তখন বললেন, এটা একমাত্র বেকুবরাই বলতে পারে। প্রত্যেক মানুষের উচিত—আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে রিযিকের সন্ধানে সাধ্যমতো চেষ্টা-তদবির করা। ফযল ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে যিয়াদ বলেন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. মানুষকে বাজারে গিয়ে ব্যবসা করার নির্দেশ দিয়ে বলতেন, বাজারে গিয়ে ব্যবসা করলে মানুষের মুখাপেক্ষী থাকতে হয় না।

গ্রন্থকার বলেন, ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. ফসল কাটতেন, সালমান খাওয়াস রহ. টোকাই ছিলেন এবং হোযাইফা মারয়াসী গোয়াল ছিলেন। ইবনে আকিল বলেন, উপকরণ গ্রহণ করা তাওয়াক্কুল-পরিপন্থী নয়, পাথেয় ও উপকরণ গ্রহণকারীকে নিন্দা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। ভালো করে জেনে রাখা দরকার-নবীদের অনন্য গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত হয়ে আরও উঁচু বৈশিষ্ট্যের অনুশীলন একদিকে যেমন শরিয়তে নিষিদ্ধ, অন্যদিকে তা দীনের জন্য বহু ক্ষতি ডেকে আনে।

টিকাঃ
১. সুরা নিসা: আয়াত ৫
২. মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৯৭, [আলবানি রহ. হাদিসটি সহিহ বলেছেন]
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১২৯৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৬২৮
২. সুরা নিসা: আয়াত ৭১
৩. সুরা আনফাল: আয়াত ৬০
৪. সুরা দুখান: আয়াত ২৩
৫. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৯০৫, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২১৪৬
৬. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩২৮০, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২০১২
৭. [হাসান] সহিহুল জামে': হাদিস নং ১০৬৮
৮. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৫৯
১. সুরা নিসা: আয়াত ১০২
২. সুরা নিসা: আয়াত ১০২
৩. সুরা কাসাস: আয়াত ২০
৪. সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫
৫. সুরা ইউসুফ: আয়াত ৬৭
৬. সুরা নিসা: আয়াত ৭১
১. [সহিহ] মুসনাদে আহমাদ: ২/৫০
২. [সহিহ] সহিহুল জামে': হাদিস নং ৫২৫৪
৩. সুরা মুয্যাম্মিল: আয়াত নং ২০
৪. সুরা বাকারা: আয়াত নং ১৯৮
৫. সুরা জুমা: আয়াত ৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00