📄 আত্মশুদ্ধি
সুফিদের মধ্যে অনেকে এমন আছেন, যাদের সাধনা নির্দিষ্ট একটি সময়ব্যাপী দৃঢ় ছিল, পরে তা দুর্বল হয়ে যেতে থাকে। তাদের প্রবৃত্তি অন্যায়ের অভিলাষী হয়ে পড়লে তারা বালকদের সাথে মেলামেশা ছেড়ে দেয়। আবু হামযা সুফি বলেন, আমি মুহাম্মাদ বিন আলা দামেস্কীকে জিজ্ঞেস করলাম, যিনি সুফিদের দলপতি ছিলেন, নির্দিষ্ট এককাল ধরে তার সাথে একজন সুদর্শন বালক দেখতে পেতাম। পরে তিনি তার থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিলেন। আমি বললাম আপনি ওই বালককে কেন ছেড়ে দিলেন? যাকে সর্বদা আপনার সাথে দেখতে পেতাম। আপনি তার সাথে খুব মেলামেশা করতেন। তার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। এ কথা শুনে উত্তরে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তাকে কোনো প্রকার শত্রুতা বা বিদ্বেষের কারণে ছাড়িনি। আমি বললাম, তো শেষে কেন ছেড়ে দিলেন? বললেন, আমি যখন তার সাথে একাকী থাকতাম আর সে আমার পাশে বসত, তখন আমি দিলের দিকে মনোযোগী হয়ে দেখতাম, সে এমন কাজের প্রতি আমাকে উৎসাহিত করছে যদি তাতে লিপ্ত হয়ে পড়ি, তাহলে আল্লাহর দৃষ্টি থেকে আমি ছিটকে পড়ব। তাই আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। যাতে আল্লাহর শাস্তির মুখোমুখি হতে না হয় এবং আমার নফস ফিতনার মোকাবেলায় নিরাপদে থাকে।
📄 তাওয়াক্কাহ ও দীর্ঘ ক্রন্দন
অধিকাংশ সুফিদের মাঝে এমন লোকও আছেন, যারা অনুশোচনাকারী এবং দৃষ্টি মেলে তাকানোর কারণে দীর্ঘ সময় নিয়ে কান্নাকাটি করেন। উবায়দুল্লাহ আমাকে বলেছেন, আমি আমার ভাই আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ থেকে শুনে বলছি, তাকে খায়র নাসাজ বলেছেন, আমি উমাইয়া ইবনে সামেত সুফির সফরসঙ্গী ছিলাম, হঠাৎ তার দৃষ্টি একজন বালকের দিকে পড়লে তিনি এ আয়াত পড়েন:
وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
'তোমরা যেখানেই থাকো, আল্লাহ তোমাদের সাথে রয়েছেন। আর যা কিছু তোমরা করে থাকো, তিনি সবকিছু দেখেন।' পরে বললেন, আল্লাহর জেলখানা থেকে কে পালাতে পারে? অথচ তিনি তাঁর জেলখানাকে শক্তিশালী ও কঠোর ফেরেশতা দ্বারা সুরক্ষিত রেখেছেন। আল্লাহু আকবার! এই ছেলের প্রতি দৃষ্টিপাত করা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার জন্য কত বড় পরীক্ষা! তার প্রতি দৃষ্টিপাতের উদাহরণ হচ্ছে, যেমন কোথাও দমকা হাওয়া বইছে, আর ওদিকে জঙ্গলে আগুন লেগেছে। এমতাবস্থায় আগুন সম্মুখপানে যা পাবে তা-ই ভস্মীভূত করে ছাড়বে। পরে তিনি বললেন, আমার চোখ আমার অন্তরে যে সকল মন্দ প্রভাব দ্বারা আকর্ষিত করতে চাচ্ছে, তা থেকে আমি আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। আমি এ ব্যাপারে ভয় করছি যে, আমি এ কাজের শাস্তিতে পাকড়াও হব কি না! কেয়ামতের দিবসে সত্তরজন সিদ্দীকের পুণ্য নিয়ে উপস্থিত হলেও এ পাপের ক্ষতিপূরণ হবে কি? অথচ অচিরেই মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। আমি শুনিছে, গুনগুনিয়ে তিনি নিম্নের কবিতা আবৃত্তি করে চলেছেন, 'হে চোখ আমি তোমাকে এই আপৎসঙ্কুল দৃষ্টি থেকে হটিয়ে কান্নাকাটির জন্য নিয়োজিত করলাম।'
টিকাঃ
১. সুরা হাদীদ: আয়াত ৪
📄 অধিক মহব্বতের ব্যাধি
অধিকাংশ সুফি এমন আছেন, যারা অতিরিক্ত মহব্বতের কারণে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। আবু হামযা সুফি বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবনে মুসা সুফিদের সরদার ও মুরুব্বি ছিলেন। তিনি কোনো এক হাটে একজন সুন্দর বালকের দিকে দৃষ্টি দিয়েছিলেন। এতে তিনি তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে, সত্বর তিনি বুদ্ধি বিপর্যয়ে আক্রান্ত হওয়ার উপক্রম হয়ে গেলেন। প্রতিদিন এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যেতেন। ছেলেটি যখন আসা-যাওয়া করত, তাকে দেখতে থাকতেন। এভাবে তার প্রেম-প্রীতি বেড়েই চলল। তার চিন্তায় তিনি অতি দুর্বল হয়ে পড়লে আর চলাফেরা করতে পারলেন না। একদিন আমি তার সাক্ষাতে গেলে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবু মুহাম্মাদ! তোমার কী অবস্থা? এ বিপদ কী করে এলো যা আমি তোমার ওপর পতিত হতে দেখছি? জবাবে তিনি বললেন, এটা ওই কর্মফল যার ওপর আল্লাহ আমাকে পরীক্ষা নিয়েছেন। আমি সেই মসিবতে ধৈর্য ধরিনি, তা সহ্য করার ক্ষমতাও আমার ছিল না। মানুষ অধিকাংশ সময় এমন পাপকে খাটো করে দেখে, অথচ তা আল্লাহর কাছে কবিরা গুনাহের চেয়ে মারাত্মক। যে ব্যক্তি হারাম বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করবে, সে নির্ঘাত লম্বা সময়ের জন্য এমন রোগে আক্রান্ত হবে। এটা বলে সে কান্নাকাটি করতে থাকল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কাঁদছ কেন? সে বলল, আমি ভাবছি এই দুর্ভাগা দীর্ঘ সময় জাহান্নামে পড়ে থাকবে কি না? বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আমি তার নিকট থেকে ফিরে এলে তার জন্য আমার খুবই করুণা হতে থাকল।
আবু হামযা বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আশআস দামেস্কী আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা ছিলেন। তিনি একজন সুদর্শন বালককে দেখে বেহুঁশ হয়ে পড়লে লোকেরা তাকে ঘরে নিয়ে গেল। পরে তিনি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি তিনি চলাফেরা করতে অপারগ হয়ে পড়েছিলেন। দীর্ঘকাল এভাবে অতিক্রম হচ্ছিল। আমরা তাকে দেখতে যেতাম এবং তার অবস্থা জানতে চাইতাম। তিনি সরাসরি আমাদেরকে তার প্রকৃত অবস্থা জানাতেন না। সে ঘটনাও বলতেন না। অসুস্থ হওয়ার কারণও বলতেন না। কিন্তু অন্যান্য লোকজন সেই সুদর্শন বালকের প্রতি তাকানোর কারণে এই অবস্থায় পতিত হওয়ার ঘটনা বলত। এ কথা এক সময় বালকের কানে যায়। সে তাঁকে দেখতে আসে। বালককে দেখে সুফি খুশি হয়ে গেলেন এবং স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে আরম্ভ করলেন। তার চেহারা দেখে হাসতেন। বালকও সর্বদা তাকে দেখতে আসত। এভাবে একসময় সুফি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসেন। একদিন বালক তার ঘরে সুফিকে দাওয়াত দেয়। কিন্তু তিনি যেতে অস্বীকার করেন। আমি জানতে চাইলাম, শেষ পর্যন্ত ছেলেটির উসিলায় আপনি সুস্থ হলেন, আর এখন তার বাড়িতে যেতে কেন আপনার অস্বীকৃতি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, আমি আপদ থেকে মুক্ত নই এবং ফিতনা থেকে নিরাপদ নই। আমি ভয় করি, কখন শয়তান আমাকে তার ওপর মহব্বত ও কামনা উদ্রেক করে কোনো পাপাচারে আক্রান্ত করে। তখন তো আমি ধ্বংসপ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব!
📄 ব্যভিচারের উসকুলে হাল আহবান
কিছু সুফি এমন আছেন, যাদেরকে তাদের নফস কোনো মন্দ কাজে আহ্বান করার কারণে তারা নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেন। আবু আবদুল্লাহ হোসাইন ইবনে মুহাম্মাদ দামগানী বর্ণনা করেন, পারস্য শহরে একজন নামকরা সুফি ছিলেন। হঠাৎ একবার তিনি এক সুদর্শন বালকের ইশকে লিপ্ত হয়ে পড়েন। পরে তিনি আর নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। এমনকি অযাচারের মন্দ কামনা মনে ঠাঁই নিল। পরে তিনি মোরাকাবায় বসলেন এবং নিজের ইচ্ছার ওপর লাঞ্ছিত হলেন। তাঁর ঘর ছিল একটি উঁচু পাহাড়ের ওপর। তার নিচে প্রবাহিত ছিল একটি নদী। অনুশোচনার আধিক্যে তিনি ঘরের ছাদ থেকে নদীতে ঝাঁপ দেন এবং এ আয়াত পড়েন:
فَتُوبُوا إِلَى بَارِئِكُمْ فَاقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ
'হে বনি ইসরাইল, আল্লাহর দরবারে তাওবা করো এবং নিজেদেরকে ধ্বংস করে দাও।” পরে তিনি পানিতে ডুবে মারা গেলেন।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ইবলিসকে দেখুন। প্রথমত বেচারাকে এটা শেখাল যে, বালকের প্রতি দৃষ্টিপাত করো। পরে এখান থেকে হটিয়ে তার দিকে সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকতে উদ্দীপনা জাগাতে থাকল। এভাবে তার অন্তরে বালকের প্রতি অগাধ ভালোবাসা সৃষ্টি হলো। পরে ইবলিস যখন দেখল, সে এ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করছে, তখন অজ্ঞতা দ্বারা তাকে আত্মহত্যার দিকে প্ররোচনা দিতে থাকল। বাহ্যত এমন মনে হয় যে, এ লোক কুমন্ত্রণা কেবল অন্তরেই পোষণ করত, নিশ্চিত কামেচ্ছা চরিতার্থের ফন্দি আঁকত না। শরিয়তে নিয়তের ক্ষেত্রে পাপ হলে ক্ষমার অবকাশ আছে। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
عفي لأمتي عما حدثت به نفوسها
"আমার উম্মতের ওই সকল পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, যার ইচ্ছা সে কেবল মনে মনে পোষণ করে।” পরে লোকটি তার এমন ইচ্ছার ওপর অনুশোচনাও করেছে। এটাকেই তো তাওবা বলে। কিন্তু শয়তান তাকে এভাবে ধোঁকা দিয়েছে যে, নিজেকে ধ্বংস তথা আত্মহত্যা হচ্ছে তাওবার সর্বোচ্চ স্তর, যা বনি ইসরাইলের আমল ছিল। অথচ তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত হয়েছিল। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
فَتُوبُوا إِلَى بَارِئِكُمْ فَاقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ
'হে বনি ইসরাইল, আল্লাহর দরবারে তাওবা করো এবং নিজেদেরকে ধ্বংস করে দাও।" আর আমাদেরকে তথা উম্মতে মুহাম্মদিকে এমন কাজ করতে বারণ করা হয়েছে:
لَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُم
'তোমরা নিজেদের ধ্বংস কোরো না।” মোট কথা উক্ত সুফি মস্ত বড় পাপে লিপ্ত হলো। সহিহাইনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত:
وَمَنْ تَرَدَّى مِنْ جَبَلٍ فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَهُوَ يَتَرَدَّى فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا
'যে ব্যক্তি পাহাড়ের চূড়া থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেকে ধ্বংস করে, সে যেন জাহান্নামের অগ্নিতে ঝাঁপ দিল। সে সর্বদা সেখানেই অবস্থান করবে।”
***
বহু সুফি এমন আছেন, যাদেরকে তাদের প্রিয়তমের থেকে পৃথক করে দেয়া হলে তিনি সেই প্রিয়তমকে মেরে ফেলেন। এমন একজন সুফির ঘটনা শুনেছি, তিনি বাগদাদে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করতেন। যে ঘরে তিনি থাকতেন সেখানে তার সঙ্গে একজন সুদর্শন বালকও থাকত। মানুষজন তাকে অপবাদ দিচ্ছিল এবং উভয়কে পৃথক করে দিল। উক্ত সুফি একটি ছুরি নিয়ে বালকের কাছে গিয়ে তাকে খুন করে ফেললেন এবং তার কাছে বসে কাঁদতে থাকলেন। মহল্লাবাসী এসে এমন অবস্থা দেখে ঘটনার কথা জিজ্ঞেস করলে সুফি বালককে খুন করার কথা স্বীকার করেন। লোকেরা তাকে আদালতে নিয়ে গেলে সেখানেও সে খুনের কথা অকপটে স্বীকার করে। সেখানে সে বালকের পিতাকে দেখতে পেয়ে বলে, তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, তুমি আমার থেকে তোমার ছেলে হত্যার বদলা নাও। সে বলল, এখন আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। সুফি সেখান থেকে ওঠে বালকের কবরের কাছে এসে তার জন্য ক্রন্দন করতে থাকল। অবশেষে আজীবন ছেলেটির জন্য প্রতি বছর হজ করতেন এবং তার জন্য ইসালে সাওয়াব করতেন।
টিকাঃ
১. সুরা বাকারা: আয়াত ৫৪
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২৫২৮, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১২৭
৩. সুরা বাকারা: আয়াত ৫৪
৪. সুরা নিসা: আয়াত ২৯
৫. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫৭৭৮, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১০৯