📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 অধিকাংশ সুফির ওপর বালকদের ব্যাপারে শয়তানের চক্রান্ত

📄 অধিকাংশ সুফির ওপর বালকদের ব্যাপারে শয়তানের চক্রান্ত


জেনে রাখা দরকার, অধিকাংশ সুফি নিজেদের ওপর যুবতী নারীদের দর্শনের দ্বার বন্ধ করে দিয়েছেন। তাই তারা নারী সংশ্রব থেকে দূরে থাকেন এবং তাদের সাথে মেলামেশا করেন না। বিবাহ-শাদি ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করেন। সৎ উদ্দেশ্যে তাদের কাছে তালীম ও দীক্ষা নিতে আসে কিশোর ও বালকেরা। ইবলিস তখন এদের প্রতি সুফিকে আগ্রহী করে তুলে।

জেনে রাখা চাই, কিশোর-যুবকদের সোহবত বা সংশ্রবের ব্যাপারে সুফিরা সাত (৭) ভাগে বিভক্ত।

১. সবচেয়ে নিকৃষ্ট খবিস। এরা সুফিদের বেশভূষা ধারণ করে এবং ‘হুলুল’ এর মতাদর্শ লালন করে। আবু নাসার আবদুল্লাহ ইবনে সিরাজ বলেন, আমার কাছে বার্তা এসেছে যে, ‘হুললিয়া’ গোত্রের মধ্যে একটি দলের ধারণা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা বহু শরীরকে স্বীয় হুলুলের জন্য অবলম্বন করেছেন। আর এটা হচ্ছে ‘রুবুবিয়‍্যাত’ এর অর্থ। কারও কারও ভাষ্যমতে, আল্লাহ সুন্দর বস্তুতে হুলুল করে থাকেন। আবু আবদুল্লাহ ইবনে হামেদ বলেন, সুফিদের একটি জামাতের মতাদর্শ হচ্ছে, তারা আল্লাহকে পৃথিবীতে দেখে থাকেন। তারা আল্লাহকে মানুষের আকৃতি ধারণ করা সম্ভব বলে মনে করেন। সুন্দর অবস্থার তার ভেতর হুলুল করেন। বহু সময় তারা হাবশী ছেলেকে দেখে তার ভেতর আল্লাহকে দেখার চেষ্টা করেন।

২. দ্বিতীয়ত ওই সকল লোক, যারা সুফিদের সাথে পোশাকের সাদৃশ্য রাখে।

৩. তৃতীয়ত ওই সকল লোক, যারা ভালো বস্তুকে দেখা বৈধ মনে করে থাকেন। আবু আবদুর রহমান সালামী ‘সুনানুস সূফিয়াহ' নামক একটি গ্রন্থ লিখেছেন। গ্রন্থটির শেষ পর্যায়ে তিনি একটি অধ্যায়ে লিখেছেন, ‘ঐ সকল বিষয়ের বর্ণনা, যে বিষয়ে সুফিদের জন্য ছাড় আছে।’ অধ্যায়টিতে গান, বাদ্য ও সুন্দর চেহারা দেখার বিষয় উল্লেখ করে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, যেখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা ভালো বস্তু সুন্দর আকৃতির মাঝে সন্ধান করো।”

এছাড়াও আছে, “তিনটি বস্তু দেখা চোখের জন্য উপকারী। যথা-১. সবুজ, ২. পানি ও ৩. সুন্দর চেহারা।”

গ্রন্থকার বলেন, উপরোক্ত দু'টি হাদিস রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। প্রথম হাদিসের সনদ নিম্নরূপ: ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أَطْلُبُوا الْخَيْرَ عِنْدَ حَسَّانِ الْوُجُوهِ 'তোমরা ভালো বস্তু সুন্দর আকৃতির মাঝে সন্ধান করো।”

ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন বলেন, হাদিসটির বর্ণনাকারীদের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান কেউই নন। লেখক বলেন, হাদিসটি কয়েক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ওকাইলী বলেন, এ ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কোনো কিছু বর্ণিত বলে প্রমাণিত হয়নি। বাকি থাকল দ্বিতীয় হাদিস। এর সনদ হচ্ছে,

"আমাকে আবু মানসুর বিন খাইরুন বলেছেন, তাকে ইবনে উবাইদ রায়হানি বলেছেন, আমি আবুল বুখতারি ওয়াহাব ইবনে ওয়াহাব থেকে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমি বাদশা হারুনুর রশিদের কাছে যাওয়া-আসা করতাম। তার সামনে তার ছেলে কাসেম থাকত। আমি তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতাম। হারুনুর রশিদ বলতেন, আমি দেখছি তুমি কাসেমের দিকেই নিষ্পলক তাকিয়ে আছ! তোমার কি ইচ্ছে হয় যে, সে তোমারই হয়ে থাকবে? আমি বললাম, আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহর পানাহ! আমাকে এমন দুঃসাহস দেখাতে বলবেন না, যা আমার অন্তরে নেই। আমি কাসেমের দিকে তাকিয়ে আছি, তার কারণ হচ্ছে আমাকে ইমাম জাফর সাদিক বর্ণনা করেছেন, তাঁর পিতা তাঁর দাদা আলী ইবনে হোসাইন থেকে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর পিতা তাঁর দাদা হজরত আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তিনটি বস্তু দেখা চোখের জন্য উপকারী। যথা-১. সবুজ, ২. পানি ও ৩. সুন্দর চেহারা।'

গ্রন্থকার বলেছেন, আমি বলছি হাদিসটি 'মাওযূ'। আবুল বুখতারির সম্পর্কে আলেমদের মাঝে কোনো মতানৈক্য নেই যে, সে মিথ্যা এবং বানোয়াট হাদিস বানায়। এছাড়া আবু আবদুর রহমান সালামীর উচিত ছিল, যেহেতু তিনি সুন্দর চেহারার দিকে তাকানোর কথা বলেছেন, তাই তিনি তার স্ত্রী বা দাসীদের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ অনৈতিক উদ্দেশ্যে এমনটি করেছেন।

আমাদের শায়খ মুহাম্মাদ বিন নাসির আলহাফিজ বলেছেন, ইবনে তাহের মুকাদ্দাসী একটি গ্রন্থ লিখেছেন। যাতে তরুণ বালকদের দিকে তাকানোকে বৈধ বলা হয়েছে। লেখক বলেন, তরুণ বালকদের দিকে তাকালে যে ব্যক্তির কামনা ও প্রবৃত্তি জাগ্রত হয়, তার জন্য দেখা হারাম। মানুষ যখন এই দাবি করবে যে, সুন্দর বালকদের দিকে তাকালে তার কামনা জাগে না, তবে তার এ দাবি মিথ্যা। সাধারণত এ জন্য এটাকে 'মুবাহ' বা বৈধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। কেননা শিশু-কিশোরদের সাথে মেলা-মেশা অধিক পরিমাণে হয়ে থাকে। নিষিদ্ধ হলে এতে মানুষের দুঃখ-দুর্দশার অন্ত থাকবে না। কিন্তু দেখার মাত্রা যদি অতিরিক্ত হয়, তাহলে তা প্রবৃত্তি বা কামনা জাগরণের প্রমাণ। সাঈদ ইবনে মুসায়্যিব বলেন,
إذا رأيتم الرجل يلح النظر الى غلام أمرد فاتهموه "কাউকে যখন দেখবে, সে সুদর্শন বালকের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে, তখন তাকে অভিযুক্ত করতে পার।"

৪. চতুর্থ হচ্ছে সেই দল-যারা বলে, আমরা কামনার দৃষ্টিতে দেখি না; বরং অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা গ্রহণের নিমিত্তে দেখি। তাদের প্রতি তাকানোতে আমাদের কোনো ক্ষতি হয় না। অথচ তাদের এ সকল কথা ভুল। কেননা সকলের অভ্যাস সমান সমান। তারপরও যে এই দাবি করবে যে, সে অভ্যাসের ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে ভিন্ন, তাহলে সে একটি অগ্রহণযোগ্য বিষয়ের দাবি করল। এ বিষয়ে আমরা শুরুতে 'ছেমা'র বর্ণনায় বিস্তারিত আলোকপাত করেছি।

আবু হামযা সুফি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর বলেছেন, আমি আবু নাসার গানাভীর কাছে বসা ছিলাম। তিনি একজন অতুলনীয় আবেদ ছিলেন। এক সুদর্শন বালককে দেখে গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এমনকি তার কাছাকাছি গিয়ে তাকে বললেন, তুমি সর্বশ্রোতা, মহা প্রজ্ঞাবান, ইজ্জতে রফী' মহান সৃষ্টিকর্তার উসিলায় আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি মন ভরে তোমাকে দেখে নিই। ছেলেটি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে যেতে চাইলে সুফি বললেন, তুমি হাকিক, মাজিদ, কারিম, মুবদী ও মুয়ীদ আল্লাহ তায়ালার উসিলায় একটু দাঁড়াও। ছেলেটি ফিরে আবার এসে দাঁড়ালো। সুফি ছেলেটির মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখতে থাকল। অতঃপর সে যেতে চাইলে সুফি বললেন, তুমি ওয়াহেদ, আহাদ, সামী', বাসীর, বেমেছাল খোদা ও নাযীরের উসিলায় সামান্য দাঁড়াও। ছেলেটি দাঁড়ালো। সুফি আগের মতোই তাকে দেখে যাচ্ছে। অতঃপর তার মাথা মাটিতে ঠেকালেন। আর ছেলেটি চলে গেল। দীর্ঘক্ষণ পর জমিন থেকে মাথা তুলে সুফি কাঁদছেন আর বলছেন, ছেলেটির চেহারা দেখার কারণে আমার ভেতর সেই সত্তার কথা স্মরণ এসেছে, যিনি তুলনা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে, উপমা থেকে চির পবিত্র এবং চির অসীম। আল্লাহর কসম! আমি তাঁর সন্তুষ্টির জন্য স্বীয় প্রাণ তাঁর শত্রুদের সাথে জিহাদ করে কষ্ট-ক্লেশে নিপতিত করব এবং তাঁর বন্ধুদের সাথে ভালোবাসা রাখব, যাতে আমার উদ্দেশ্য সাধিত হয়। অর্থাৎ তাঁর উৎসৃষ্ট চেহারা ও পূতপবিত্র উচ্চতা দেখতে পাব। আমি আশা করি, তিনি আমাকে তাঁর দর্শনে কৃতজ্ঞ করবেন। তার বিনিময়ে তিনি আমাকে আকাশ-মাটির এই পৃথিবীতে আগুনে নিক্ষেপ করুন, এতে আমার আক্ষেপ নেই। এটা বলেই তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন।

আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, কিছু আলেম আমাকে বলেছেন, একজন বালক আমাকে বলেছে, অমুক সুফি যে আমাকে ভালোবাসে, তিনি বলেছেন, বৎস! তোমার ওপর আল্লাহ তায়ালা বিশেষ অনুগ্রহ এবং দৃষ্টি রয়েছে। আমাকে তিনি তোমার মুখোপেক্ষী বানিয়ে দিয়েছেন। বর্ণিত আছে, সুফিদের একটি জামাত আহমাদ গাযালির নিকট গেলে তাঁর কাছে একজন বালক দেখতে পান। তারা একসাথে বসে আছে। উভয়ের মাঝখানে একটি গোলাপ ফুল রয়েছে। আহমাদ কখনো দৃষ্টি দেন গোলাপের দিকে, কখনো বালকের দিকে চোখা ফেরান। সুফিরা এসে বসলে তাদের মধ্য হতে একজন বললেন, সম্ভবত আমরা এসে আপনাকে বিরক্ত করলাম। প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, অবশ্যই, আল্লাহর কসম! পরে সকলে সমস্বরে ওজদেহালের নিয়মে স্লোগান দিলেন।

আবুল হাসান ইবনে ইউসুফ আমাকে বলেন, তিনি আহমাদ গাযালিকে এক চিরকুটে লিখেছেন, 'তুমি তোমার তুর্কি গোলামের দিকে তাকাও।' তিনি চিরকুট পড়ে গোলামকে ডেকে সঙ্গে নিয়ে মিম্বরে আরোহণ করলেন এবং তার উভয় চোখে চুমু খেয়ে বললেন, এটাই চিরকুটের জবাব। লেখক বলেন, ওই ব্যক্তির (আহমাদ গাযালি) এহেন কার্যকলাপে তার চেহারায় লজ্জা-শরমের পর্দা পড়ে যাওয়া কোনো আশ্চর্যের কথা নয়। আশ্চর্য লাগে ওই গাধাদের ওপর, যারা ওখানে উপস্থিত ছিল। তারা কেন কোনো অভিযোগ করল না? এ থেকে বিরত রাখল না? বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মানুষের অন্তরে শরিয়তের তাপ ঠান্ডা হয়ে গেছে।

আবু তৈয়ব তাবারি আমাকে বলেছেন, যে সব গোষ্ঠী রাগশাস্ত্র চর্চা করেন, শুনেছি তারা ছেমার সাথে সাথে সুদর্শন বালকদের দিকে তাকানোকেও আবশ্যক মনে করেন। অনেক সময় বালকদেরকে অলংকার ও রঙিন কাপড় এবং জরিদার পোশাকে সাজিয়ে থাকে। তারা মনে করে, এমন কর্মকাণ্ড মূল ঈমান এবং বালকের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার ফলে তাদের অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। তারা 'সৃষ্টিবস্তু দ্বারা সৃষ্টিকর্তার স্মরণ হয়' বলে প্রমাণ দিতে চায়। অথচ তাদের এ সব কথা একান্তই তামাশা ও প্রবৃত্তির অনুগামী। বিবেক-বুদ্ধিকে ধোঁকা দেয়া এবং জ্ঞানের বিপরীত কাজই এর ফলাফল। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ
"আল্লাহ তায়ালার নিদর্শন তোমাদের অস্তিত্বেই বিদ্যমান, তোমরা কি তা দেখো না?” তিনি আরও বলেন,
أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ
“তারা কি উটের দিকে দৃষ্টি দেয় না! কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে!” আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
أَوَلَمْ يَنْظُرُوا فِي مَلَكُوتِ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ
“তারা কি আকাশমণ্ডলী ও জমিনের দিকে তাকায় না!”

যে সব বস্তুর মাধ্যমে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা ছেড়ে এরা এমন বিষয়ে পড়ে আছে, যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। এই গোষ্ঠীটি কেবল রুচিশীল ও সুস্বাদু খাবার খেয়ে উপর্যুক্ত কর্মকাণ্ড করে থাকে। এসব মজাদার খাদ্য খেয়ে তাদের মন ভরে গেলে তারা নাচ, গান-বাদ্য ও সুদর্শন বালকদের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং এ-জাতীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে থাকে। যদি কখনো খাবার-দাবার কম গ্রহণ করে, তখন ছেমা ও নজরের কাছে কম ঘেঁষে থাকে। আবু তৈয়ব বলেন, রাগসংগীত শ্রোতাদের অবস্থা এবং কিছু ছেমার সময় তাদের ওপর কী ধরনের অবস্থা অতিবাহিত হয়, কয়েক পঙ্ক্তি কবিতায় তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে-
أتذكر وقتنا وقد اجتمعنا * على طيب السماع الى الصباح ودارت بيننا كأس الأغاني * فأسكرت النفوس بغير راح
فلم نر فيهم إلا نشاوى " سرورا والسرور هناك صاحي إذا لبي أخو اللذات فيه " منادى اللهو حي على الفلاح ولم نملك سوى المهجات شيئا * أرقناها لا لحاظ ملاح
'যে অবস্থায় আমরা সকাল থেকে মনোমুগ্ধকর রাগ-সংগীত শুনতে সমবেত হয়েছি, তুমি কি এখনও সে সময়কার কথা স্মরণ করতে চাও? আমাদের মাঝে রাগ-সংগীতের পেয়ালা ঘুরছে। যা পান করে আমাদের মনপ্রাণ শরাবের নেশা ছাড়াই নেশাগ্রস্ত হয়ে গেছে। জলসায় যারা আছে, সবাই প্রশান্তিতে তৃপ্ত। এখানে কেবল শান্তিই হুঁশিয়ার। এই জলসায় যখন খেল-তামাশার আহ্বানকারী ডাকে যে, লবণাক্ত প্রিয়তমা তোমায় আহ্বান করছে, চলো। তখন মজা ও তৃপ্তি গ্রহণকারী ব্যক্তি বলে, উপস্থিত! আমাদের কাছে মনোলোভা বস্তু ব্যতিরেকে আর কিছু নেই। যার খুশি চোখ দিয়ে ভাসিয়ে দাও।'

আবু তৈয়ব বলেন, মনে ছেমার প্রভাব এভাবে পড়ে যেভাবে কবি আবৃত্তির সুরে উল্লেখ করেছেন। তাহলে ছেমা-কী করে উপকার পৌঁছায়? ইবনে আকিল বলেন, যারা বলে, সুদর্শন বস্তু দেখার বিষয়ে আমার কোনো ভয় নেই। অথচ তার এ কথা অসার ও অযৌক্তিক। কেননা শরিয়তের খেতাব তথা উদ্দিষ্ট সবার জন্য সমান। কেউ এর ব্যতিক্রম হতে পারে না। কোরআনের আয়াত তাদের দাবিকে আরও অসার ও অকৃতকার্য করে তোলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ 'হে রাসুল! আপনি বিশ্বাসীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে।"

অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন,
أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ “তারা কি উটের দিকে দৃষ্টি দেয় না! কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে!” সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ওই সকল বস্তুর প্রতি দৃষ্টি দেয়া বৈধ যার প্রতি তাকালে কামনার উদ্রেক হয় না, মনের লালসা জাগে না। এটা এমন শিক্ষা, যেখানে বিন্দু পরিমাণ কামনা-বাসনার অবকাশ নেই। অন্যদিকে কামনা উদ্রেককারী বিষয়গুলোর ব্যাখ্যায় বলা যায়, এতে প্রবৃত্তির দাসত্বস্বরূপ কামনার অভিজ্ঞতা নেয়া যায়। প্রত্যেকটি চেহারাই পাপের উৎস। এর প্রতি দৃষ্টি দেয়া উচিত নয়। কেননা এর মাধ্যমে অধিকাংশ ফিতনার উৎপত্তি। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা কোনো নারীকে নবী হিসেবে পাঠাননি। না কোনো নারীকে কাজী, ইমাম বা মুয়াজ্জিন বানিয়েছেন। এসবের হেতু হচ্ছে নারীরা আপদ ও কামনার উৎস। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর দিকে তাকালে শরিয়তের উদ্দেশ্য রহিত হয়ে যায়। এখন যে ব্যক্তি বলে, আমি সুন্দর দর্শন করে ইবরত নিই। তাকে আমরা মিথ্যুক বলব। আর যারা নিজের স্বভাবকে অন্যদের চেয়ে উন্নত মনে করে, তাদের দাবি অমূলক। এব কথা কেবলই শয়তানের ধোঁকা ও প্রতারণা।

৫. পঞ্চম, ওই সকল সুফি-যারা বালকদের সাথে মেলামেশা করে এবং নিজেকে অনাচার অযাচার থেকে দূরে রাখে। এটাকে মুজাহাদা এবং আত্মশুদ্ধি মনে করে। তারা এটা জানে না যে, সুদর্শন বালকদের সাথে মেলামেশা করা এবং তাদের দিকে কামনার দৃষ্টিতে তাকানোও পাপ। এগুলো সুফিদের অভ্যাস। তাদের উত্তরসূরিরাও এমন মতবাদ লালন করত। আহমদ ইবনে সাবিত আমাকে বলেছেন, আবু আলী রোযবারী নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতেন-
أنزه في روض المحاسن مقلتي * وأمنع نفسي أن تنال محرما وأحمل من ثقل الهوى مالو أنه " على الجبل الصلد الأصم تهدما
"আমি স্বীয় নয়নযুগল সুন্দর ও সৌন্দর্যের বাগিচায় অবগাহন করাই এবং নিজের নফসকে হারামে পতিত হওয়া থেকে বিরত রাখি। আমি প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার এতো ভারী বোঝা বহন করি, তা যদি কোনো দৃঢ় পাহাড় বহন করে তবে তা ভেঙ্গে পড়বে।"

আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, অচিরেই ইউসুফ ইবনুল হোসাইনের ঘটনা এবং তার অভিমত বিবৃত হবে, যাতে তিনি বলেছেন, আমি আল্লাহর কাছে একশতবার অঙ্গীকার করেছি যে, কোনো সুদর্শন বালকের কাছে বসব না। তথাপি নাজুক দেহাবয়ব ও কামনাময় চোখ দেখে সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে ফেলি।

আবুল মুখতার আয্যবী বলেন, আমি আবুল কুমাইন আন্দুলুসি—যিনি খুবই কুৎসিত কৃষ্ণ বর্ণের ছিলেন—তাকে বললাম, সুফিদের অত্যাশ্চর্য কোনো ঘটনা বলুন। তিনি বললেন, সুফিদের মধ্যে একজনের সাথে আমার মেলামেশার সুযোগ হয়েছে, যার নাম মেহেরজান। তিনি শুরুতে অগ্নিপূজক ছিলেন। পরে মুসলমান হয়ে সুফি হয়ে গিয়েছিলেন। আমি তার সাথে একজন সুদর্শন বালক দেখতে পেতাম, যাকে তিনি কখনো পৃথক করতেন না। রাত হলে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। পরে তার দিকে ফিরে শুয়ে যেতেন। অতঃপর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে দাঁড়াতেন এবং যতটুকু সম্ভব নামায পড়তেন। আবার বালকের দিকে ফিরে শুয়ে যেতেন। এমন কর্মকাণ্ড রাতে কয়েকবার করতেন। অবশেষে ভোর আলোকময় হলে কিংবা ভোরের কাছাকাছি সময়ে বিতর নামায আদায় করতেন। অতঃপর আকাশের দিকে উভয় হাত তুলে বলতেন, হে আল্লাহ! তুমি ভালো করেই জানো, আজ রাত আমার নিরাপদে কেটেছে। এ রাতে অন্যায়মূলক কোনো কাজ আমি করিনি। মন্দ কামনার কাছে যাইনি। কিরামান কাতিবীন আমার আমলনামায় কোনো গোনাহ লেখেনি। অথচ এই বালকের ভালোবাসা আমার অন্তরে এতটাই গোপনে গেঁথে রেখেছি, তা যদি কোনো পাহাড় বহন করে, তবে নির্ঘাত সে হেলে পড়বে এবং খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাবে। যদি তা জমিন বহন করে তবে, তা ফেটে যাবে। পরে তিনি বলতেন, হে রাত! আমার পক্ষ থেকে যা কিছু তোমার মাঝে অতিবাহিত হয়েছে, তুমি তার সাক্ষী থেকো। আল্লাহর ভয় আমাকে হারামের খায়েশ এবং পাপাচারে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রেখেছে। পরে বলতেন, হে আল্লাহ! হে আমার মালিক! তুমি আমাকে পরহেযগারীর ওপর অটল রেখো। যেদিন সব প্রিয়তমা একে অন্যের কাছ থেকে দূরে থাকবে সেদিনও আমাদেরকে পৃথক কোরো না।

বর্ণনাকারী বলেন, আমি ওই সুফির কাছে দীর্ঘদিন ছিলাম। প্রত্যেক রাতে এটা তার রুটিন ছিল। আমি তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসতে চাইলে, তাকে বললাম, এটা কেমন কথা যে, রাত অতিবাহিতকালে আপনাকে এমন কথা বলতে শুনি। তিনি বললেন, তুমি কি তা শোনো? আমি বললাম, হ্যাঁ। উত্তরে বললেন, হে ভাই, আল্লাহর কসম! আমার অন্তরে বালকটির এতই ভালোবাসা, তা যদি কোনো রাজা-বাদশার তার প্রজাদের প্রতি থাকত, তাহলে আল্লাহর পক্ষ হতে সে মাগফিরাতের হকদার হয়ে যেত। আমি বললাম, তাহলে এটা বলুন, যে মানুষের পক্ষ থেকে আপনার ওপর পাপ বা অন্যায়ে পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তার সাথে মেলামেশারই-বা দরকার কী?

আবু মুহাম্মাদ জাফর ইবনে আবদুল্লাহ সুফি বলেন, আবু হামযা সুফি বর্ণনা করেছেন, আমি বায়তুল মুকাদ্দাসে একজন যুবক সুফি দেখেছি, যে দীর্ঘদিন ধরে একজন বালকের সাথে মেলামেশা করত। পরে সেই সুফি মারা গেল। তার মৃত্যুতে বালক খুব মর্মাহত হলো। এমনকি দুশ্চিন্তা আর পেরেশানির কারণে সে দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। তার শরীরে কেবল চামড়া আর হাড্ডিই পরিদৃষ্ট হতো। একদিন আমি তাকে বললাম, তুমি তোমার দোস্তের জন্য খুব শোকাহত। আমি তো দেখছি তুমি স্থির থাকতে পারছ না। উত্তরে বলল, এমন ভালো ব্যক্তি গত হলে কেউ কি স্থির থাকতে পারে? যার জন্য আল্লাহ নির্ধারিত করে দিয়েছেন। তিনি এক মুহূর্তের জন্যও আমার থেকে পৃথক হননি। এত লম্বা সময়ের রাত-দিন মেলামেশা ও উঠা-বসা সত্ত্বেও আমার সাথে কোনো পাপ বা অন্যায় আচরণ করেননি।

গ্রন্থকার বলেন, এই গোষ্ঠীকে শয়তান যখন দেখল যে, তারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করছে না, তখন তাদের দৃষ্টিতে বেহায়াপনাকে বৈধ হিসেবে দেখাতে শুরু করল। সুতরাং তারা দেখা, মেলামেশা করা এবং পরস্পর কথা বলার মাধ্যমে পরিতৃপ্ত হতে শুরু করে এবং এভাবে মন্দ কাজ থেকে বাঁচার জন্য নফসের বিরোধিতা করার অঙ্গীকার করে। এখন যদি সে সত্যবাদী হয়, তাহলে তার উচিত—যে দিলে আল্লাহকে স্থান দেয়ার কথা সেখানে গাইরুল্লাহকে কেন স্থান দেয়া হচ্ছে? আর যে সময়টুকু এমন জোরপূর্বক আত্মশুদ্ধি, সাধনা এবং মুজাহাদার পেছনে ব্যয় করা হয়, মনকে তা থেকে ফিরিয়ে আখিরাতে উপকারী বিষয়ে অধিক মনোযোগী হওয়া অধিক জরুরি। শুধু যিনা-ব্যভিচার থেকে বিরত থাকার এই সংযমে সময় ক্ষয় করা অজ্ঞতা এবং শরয়ি শিষ্টাচারবিরোধী। কেননা আল্লাহ তায়ালা চক্ষুদ্বয় অবনত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমেই কোনো শঙ্কা ও সংশয় ব্যতিরেকে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়া যায়। ওই সকল লোকদের উদাহরণ হচ্ছে ওই ব্যক্তির মতো যে কোনো অলস ও অমনোযোগী হিংস্র প্রাণীর কাছ দিয়ে কোথাও যাচ্ছে, হিংস্র প্রাণী তাকে দেখতে পায়নি। এহেন অবস্থায় সে হিংস্র প্রাণীকে উত্তেজিত করতে লাগল এবং তার মোকাবেলা করার চেষ্টা করল। এমতাবস্থায় ওই ব্যক্তি যদি মারা না-ও যায়, কিন্তু সে কি কখনো আঘাত থেকে রক্ষা পাবে?

টিকাঃ
১. [মাউযূ] আলবানি সংকলিত যঈফুল জামে: ৯০৩
২. [যঈফ] আলবানি সংকলিত যঈফুল জামে: ২৫৬৭
১. সুরা যারিয়াত: আয়াত ২১
২. সুরা গাশিয়াহ: আয়াত ১৭
৩. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৮৫
৪. সুরা নূর: আয়াত ৩০
৫. সুরা গাশিয়াহ: আয়াত ১৭

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 আত্মশুদ্ধি

📄 আত্মশুদ্ধি


সুফিদের মধ্যে অনেকে এমন আছেন, যাদের সাধনা নির্দিষ্ট একটি সময়ব্যাপী দৃঢ় ছিল, পরে তা দুর্বল হয়ে যেতে থাকে। তাদের প্রবৃত্তি অন্যায়ের অভিলাষী হয়ে পড়লে তারা বালকদের সাথে মেলামেশা ছেড়ে দেয়। আবু হামযা সুফি বলেন, আমি মুহাম্মাদ বিন আলা দামেস্কীকে জিজ্ঞেস করলাম, যিনি সুফিদের দলপতি ছিলেন, নির্দিষ্ট এককাল ধরে তার সাথে একজন সুদর্শন বালক দেখতে পেতাম। পরে তিনি তার থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিলেন। আমি বললাম আপনি ওই বালককে কেন ছেড়ে দিলেন? যাকে সর্বদা আপনার সাথে দেখতে পেতাম। আপনি তার সাথে খুব মেলামেশা করতেন। তার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। এ কথা শুনে উত্তরে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তাকে কোনো প্রকার শত্রুতা বা বিদ্বেষের কারণে ছাড়িনি। আমি বললাম, তো শেষে কেন ছেড়ে দিলেন? বললেন, আমি যখন তার সাথে একাকী থাকতাম আর সে আমার পাশে বসত, তখন আমি দিলের দিকে মনোযোগী হয়ে দেখতাম, সে এমন কাজের প্রতি আমাকে উৎসাহিত করছে যদি তাতে লিপ্ত হয়ে পড়ি, তাহলে আল্লাহর দৃষ্টি থেকে আমি ছিটকে পড়ব। তাই আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। যাতে আল্লাহর শাস্তির মুখোমুখি হতে না হয় এবং আমার নফস ফিতনার মোকাবেলায় নিরাপদে থাকে।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 তাওয়াক্কাহ ও দীর্ঘ ক্রন্দন

📄 তাওয়াক্কাহ ও দীর্ঘ ক্রন্দন


অধিকাংশ সুফিদের মাঝে এমন লোকও আছেন, যারা অনুশোচনাকারী এবং দৃষ্টি মেলে তাকানোর কারণে দীর্ঘ সময় নিয়ে কান্নাকাটি করেন। উবায়দুল্লাহ আমাকে বলেছেন, আমি আমার ভাই আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ থেকে শুনে বলছি, তাকে খায়র নাসাজ বলেছেন, আমি উমাইয়া ইবনে সামেত সুফির সফরসঙ্গী ছিলাম, হঠাৎ তার দৃষ্টি একজন বালকের দিকে পড়লে তিনি এ আয়াত পড়েন:
وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
'তোমরা যেখানেই থাকো, আল্লাহ তোমাদের সাথে রয়েছেন। আর যা কিছু তোমরা করে থাকো, তিনি সবকিছু দেখেন।' পরে বললেন, আল্লাহর জেলখানা থেকে কে পালাতে পারে? অথচ তিনি তাঁর জেলখানাকে শক্তিশালী ও কঠোর ফেরেশতা দ্বারা সুরক্ষিত রেখেছেন। আল্লাহু আকবার! এই ছেলের প্রতি দৃষ্টিপাত করা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার জন্য কত বড় পরীক্ষা! তার প্রতি দৃষ্টিপাতের উদাহরণ হচ্ছে, যেমন কোথাও দমকা হাওয়া বইছে, আর ওদিকে জঙ্গলে আগুন লেগেছে। এমতাবস্থায় আগুন সম্মুখপানে যা পাবে তা-ই ভস্মীভূত করে ছাড়বে। পরে তিনি বললেন, আমার চোখ আমার অন্তরে যে সকল মন্দ প্রভাব দ্বারা আকর্ষিত করতে চাচ্ছে, তা থেকে আমি আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। আমি এ ব্যাপারে ভয় করছি যে, আমি এ কাজের শাস্তিতে পাকড়াও হব কি না! কেয়ামতের দিবসে সত্তরজন সিদ্দীকের পুণ্য নিয়ে উপস্থিত হলেও এ পাপের ক্ষতিপূরণ হবে কি? অথচ অচিরেই মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। আমি শুনিছে, গুনগুনিয়ে তিনি নিম্নের কবিতা আবৃত্তি করে চলেছেন, 'হে চোখ আমি তোমাকে এই আপৎসঙ্কুল দৃষ্টি থেকে হটিয়ে কান্নাকাটির জন্য নিয়োজিত করলাম।'

টিকাঃ
১. সুরা হাদীদ: আয়াত ৪

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 অধিক মহব্বতের ব্যাধি

📄 অধিক মহব্বতের ব্যাধি


অধিকাংশ সুফি এমন আছেন, যারা অতিরিক্ত মহব্বতের কারণে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। আবু হামযা সুফি বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবনে মুসা সুফিদের সরদার ও মুরুব্বি ছিলেন। তিনি কোনো এক হাটে একজন সুন্দর বালকের দিকে দৃষ্টি দিয়েছিলেন। এতে তিনি তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে, সত্বর তিনি বুদ্ধি বিপর্যয়ে আক্রান্ত হওয়ার উপক্রম হয়ে গেলেন। প্রতিদিন এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যেতেন। ছেলেটি যখন আসা-যাওয়া করত, তাকে দেখতে থাকতেন। এভাবে তার প্রেম-প্রীতি বেড়েই চলল। তার চিন্তায় তিনি অতি দুর্বল হয়ে পড়লে আর চলাফেরা করতে পারলেন না। একদিন আমি তার সাক্ষাতে গেলে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবু মুহাম্মাদ! তোমার কী অবস্থা? এ বিপদ কী করে এলো যা আমি তোমার ওপর পতিত হতে দেখছি? জবাবে তিনি বললেন, এটা ওই কর্মফল যার ওপর আল্লাহ আমাকে পরীক্ষা নিয়েছেন। আমি সেই মসিবতে ধৈর্য ধরিনি, তা সহ্য করার ক্ষমতাও আমার ছিল না। মানুষ অধিকাংশ সময় এমন পাপকে খাটো করে দেখে, অথচ তা আল্লাহর কাছে কবিরা গুনাহের চেয়ে মারাত্মক। যে ব্যক্তি হারাম বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করবে, সে নির্ঘাত লম্বা সময়ের জন্য এমন রোগে আক্রান্ত হবে। এটা বলে সে কান্নাকাটি করতে থাকল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কাঁদছ কেন? সে বলল, আমি ভাবছি এই দুর্ভাগা দীর্ঘ সময় জাহান্নামে পড়ে থাকবে কি না? বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আমি তার নিকট থেকে ফিরে এলে তার জন্য আমার খুবই করুণা হতে থাকল।

আবু হামযা বলেন, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আশআস দামেস্কী আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা ছিলেন। তিনি একজন সুদর্শন বালককে দেখে বেহুঁশ হয়ে পড়লে লোকেরা তাকে ঘরে নিয়ে গেল। পরে তিনি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি তিনি চলাফেরা করতে অপারগ হয়ে পড়েছিলেন। দীর্ঘকাল এভাবে অতিক্রম হচ্ছিল। আমরা তাকে দেখতে যেতাম এবং তার অবস্থা জানতে চাইতাম। তিনি সরাসরি আমাদেরকে তার প্রকৃত অবস্থা জানাতেন না। সে ঘটনাও বলতেন না। অসুস্থ হওয়ার কারণও বলতেন না। কিন্তু অন্যান্য লোকজন সেই সুদর্শন বালকের প্রতি তাকানোর কারণে এই অবস্থায় পতিত হওয়ার ঘটনা বলত। এ কথা এক সময় বালকের কানে যায়। সে তাঁকে দেখতে আসে। বালককে দেখে সুফি খুশি হয়ে গেলেন এবং স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে আরম্ভ করলেন। তার চেহারা দেখে হাসতেন। বালকও সর্বদা তাকে দেখতে আসত। এভাবে একসময় সুফি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসেন। একদিন বালক তার ঘরে সুফিকে দাওয়াত দেয়। কিন্তু তিনি যেতে অস্বীকার করেন। আমি জানতে চাইলাম, শেষ পর্যন্ত ছেলেটির উসিলায় আপনি সুস্থ হলেন, আর এখন তার বাড়িতে যেতে কেন আপনার অস্বীকৃতি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, আমি আপদ থেকে মুক্ত নই এবং ফিতনা থেকে নিরাপদ নই। আমি ভয় করি, কখন শয়তান আমাকে তার ওপর মহব্বত ও কামনা উদ্রেক করে কোনো পাপাচারে আক্রান্ত করে। তখন তো আমি ধ্বংসপ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00