📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 ‘ওয়াজদ’-এর নিয়ন্ত্রণ

📄 ‘ওয়াজদ’-এর নিয়ন্ত্রণ


যদি বলা হয়, আমরা ওই ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে চাই, যারা 'ওয়াজদ' তথা আবেগ, উত্তেজনা, উন্মত্ততা নিয়ন্ত্রণের বহু চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তাহলে এখানে শয়তান আসবে কোথা থেকে?

এর জবাবে বলা হবে, আমরা এ কথা অস্বীকার করছি না যে, কেউ কেউ অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। কিন্তু সত্যবাদীর পরিচয় হচ্ছে, তারা জানে না কী ঘটে যাচ্ছে। অতএব তারা ওই দলের—যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, فَخَرَّ مُوسَى صَعِقًا 'এবং মুসা বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেল।'

আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাবের সামনে কেয়ামতের ভয়াবহতার কথা আলোচনা করা হলে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন এবং কোনো কথা বলতে পারেননি। এভাবে কয়েকদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন।

গ্রন্থকার বলেন, আমি বলছি, অনেক মানুষ ওয়াজ শুনে মারা গেছেন এবং বেহুঁশ হয়ে গেছেন। আমি 'ওয়াজদ' বলতে তাদের বোঝাতে চাচ্ছি, যারা শয়তানের ফাঁদে পড়ে বিভিন্ন উন্মত্ততা ও অস্বাভাবিক আচরণ করে থাকে, উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার দিতে থাকে। বাহ্যত তাদেরকে কৃত্রিমতার আশ্রয় নিতে দেখা যায়, যা শয়তানের ফাঁদে পড়েই এমন করে বেড়ায়।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, যদি বলা হয়, ইখলাসওয়ালাদের অবস্থা কি এমন অবস্থার চেয়ে কম হবে? উত্তরে বলা হবে, হ্যাঁ। দু'টি কারণে। ১. যদি তার ইলম শক্তিশালী হয় তাহলে সে তা আয়ত্ত করতে পারবে। ২. সাহাবি ও তাবেয়িদের বিপরীত কর্মকাণ্ড সাধনের কারণে সে বহু পেছনে পড়ে থাকবে।

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা থেকে আমার কাছে হাদিস পৌঁছেছে। তিনি বলেন, আমি খালাফ ইবনে হাওশাব থেকে শুনেছি যে, খাওয়াত রহ. ওয়াজের সময় কাঁপতেন। তা দেখে ইবরাহিম নাখয়ী বলেছেন যে, তুমি যদি এই অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পার, তবে আমি তোমাকে হীন ভাবতে অসুবিধার কিছু দেখি না। পক্ষান্তরে যদি নিয়ন্ত্রণ করতে না পার, তবে মনে রেখো, তুমি পূর্ববর্তী মনীষীদের বিপরীত কর্ম সাধন করছ।

গ্রন্থকার বলেন, ইবরাহিম নাখয়ী এমন একজন ফকিহ ছিলেন, যিনি সুন্নাতের খুবই পাবন্দি করতেন এবং মনীষীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতেন। আর খাওয়াত রহ. ভালো লোক ছিলেন এবং কৃত্রিমতার আশ্রয় নিতেন না। তার ক্ষেত্রেও ওয়াজদ এর ব্যাপারে ইবরাহিম নাখয়ী কী পরিমাণ কঠোর ছিলেন, তা সহজেই অনুমেয়।

টিকাঃ
১. সহিহুল জামে': হাদিস নং ১৬৩২
২. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৩

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 গান শুনে পরিতৃপ্ত হয়ে তালি দেয়া ও নাচা

📄 গান শুনে পরিতৃপ্ত হয়ে তালি দেয়া ও নাচা


তাসাওউফওয়ালারা কাউয়ালি গান শুনে পরিতৃপ্ত হয়ে হাতে তালি বাজাতে থাকে। তারা বলে, হজরত ইবনে বুনান 'ওয়াজদ' করতেন এবং হজরত আবু সাঈদ খায্যায তালি বাজাতেন।

গ্রন্থকার বলেন, তালি বাজানো মন্দ ও ঘৃণিত স্বভাব। এটা উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ। বুদ্ধিমান লোক এমন কাণ্ড থেকে বিরত থাকেন। কারণ এটা পৌত্তলিকদের নিয়ম। তারা বায়তুল্লাহ শরিফের সন্নিকটে আসার প্রাক্ককালে হাত তালি বাজাত। যার নিন্দা জানিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا كَانَ صَلَاتُهُمْ عِنْدَ الْبَيْتِ إِلَّا مُكَاءً وَتَصْدِيَةً فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ
'আর কাবার নিকট তাদের নামায শিস ও হাত-তালি ছাড়া কিছু ছিল না। সুতরাং তোমরা আস্বাদন করো আযাব। কারণ তোমরা কুফরী করতে।'

লেখক বলেন, এতে মহিলাদের সাথেও সাযুজ্য দেখতে পাওয়া যায়। বুদ্ধিমানেরা এমনটি করতে পারেন না। তারা ব্যক্তিত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে মুশরিক ও নারীদের সাযুজ্য গ্রহণ করতে পারেন না। এর পর তারা পরিতৃপ্ত হয়ে নাচতে থাকে। প্রমাণ হিসেবে তারা আল্লাহ তায়ালার বাণী أركض برجلك অর্থাৎ 'হে আইয়ুব! স্বীয় পা মাটিতে মারো।'-এটা দ্বারা প্রমাণ সাব্যস্ত করার চেষ্টা চালায়। গ্রন্থকার বলেন, আমার মতে এ আয়াত দ্বারা প্রমাণ নেয়া চরম ধৃষ্টতা। কেননা জমিনে পা মারার নির্দেশ তো আনন্দ প্রকাশের জন্য দেয়া হয়নি; বরং চাহিদামতো পানি প্রাপ্তির নিমিত্তে এমন নির্দেশ এসেছে।

ইবনে আকিল রহ. বলেন, একজন অসুস্থ ব্যক্তির ঘটনা, যার বিপদমুক্তির সময় এমন পা নাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং তাতে পানি প্রবহমান হওয়ার নবীর মুজেযার অন্তর্ভুক্ত-এ দ্বারা নাচের বিধান নির্ণয় করা আহমকি। ইবনে আকিল আরও বলেন, কুরআনে কড়া ভাষায় সুফি- দরবেশদের এমন পা মারা ও নাচার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি এসেছে-
لَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَهًا 'জমিনে দর্পভরে চলো না।'

আল্লাহ তায়ালা অহংকার ও দর্প সহকারে চলাফেরা করার প্রতি নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।

তালি বাজানো ও নাচানাচি করা খুশির আতিশয্যে হয়ে থাকে। এতে পূর্ণমাত্রা অহংকার ও দর্প পরিদৃষ্ট হয়ে থাকে। গানের মজলিসে আবেগে উদ্বেলিত হয়ে অচেতন হওয়া বা নাচানাচি করাকে ইশকের বড় নিদর্শন বলে গণ্য করা হতো। জালিয়াতরা এ বিষয়ে কিছু হাদিস বানিয়েছে।

এদের নাচ-গানের মজলিসে চরম পুলকিত হয়ে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে থাকে। এমনকি পাশের বসা লোককে ধরে দাঁড় করিয়ে যুগলভাবে নাচানাচি করতে থাকে। এমতাবস্থায় পাশের বসা লোকটি যদি তৎক্ষণাৎ না দাঁড়ায়, তবে এটাকে ধৃষ্টতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অতঃপর একজনের দেখাদেখি সকলেই সমস্বরে চিৎকার করে দাঁড়াতে শুরু করে এবং লাফালাফি করতে থাকে। এবার কেউ তার মস্তিষ্কাবরণ খুলে ফেললে সকলে তার অনুসরণ করে নিজ নিজ মাথার কাপড় খুলে ছুড়ে ফেলে দেয়। অথচ বুদ্ধিমানমাত্রই এ কথা স্বীকার করে থাকবেন যে, মাথার কাপড় খুলে ফেলা নিন্দনীয় বিষয়। এটা শিষ্টাচারপরিপন্থী। কেবল হজের সময় আল্লাহ তায়ালার সামনে দাসত্বের নিদর্শনস্বরূপ মাথা খোলা রাখা হয়।

টিকাঃ
১. সুরা আনফাল: আয়াত ৩৫
২. সুরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ৩৭
৩. সুরা লোকমান: আয়াত ১৮

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 আনন্দের আতিশয্যে পোশাক নিক্ষেপ করা ও ছিঁড়ে ফেলা

📄 আনন্দের আতিশয্যে পোশাক নিক্ষেপ করা ও ছিঁড়ে ফেলা


আধ্যাত্মিক দাবিদার সুফিরা ছেমা ও কাউয়ালিজাতীয় গান-বাদ্য শুনে খুশির আতিশয্যে স্বীয় পোশাক খুলে ছুড়ে ফেলে দেয়। কেউ কেউ তার সঙ্গী-সাথির দিকে নিক্ষেপ করে। আবার কেউ কেউ তা ছিঁড়ে ফেলে দেয়। তাদের এহেন কাণ্ড দেখে অনেক অজ্ঞলোক বলে থাকে, সে তার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। সুতরাং তাকে অভিযুক্ত করা যাবে না। ইবনে আকিলের কাছে এমন কাপড় ছিঁড়ে ফেলা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এটাকে গর্হিত ও হারাম কাজ বলে সাব্যস্ত করেন।
وَنَهَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ إِضَاعَةِ المَالِ وَعَنْ شَقَّ الْحِيُوْبِ
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাল ধ্বংস করা এবং কাপড় ছিঁড়তে নিষেধ করেছেন।”

জিজ্ঞাসু লোকেরা ইবনে আকিলের কাছে আরও জানতে চেয়েছেন যে, এ সব লোক তো কী করছে তা তারা জানে না। তদুত্তরে তিনি বলেছেন, যেখানে অবস্থান করলে তার মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে এবং হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়, এমন বৈঠকে উপস্থিত হওয়া গুনাহের কাজ।

ইবনে তাহের এই সুফি মতাবলম্বীদের এহেন কর্মকাণ্ডের বৈধতা দিতে গিয়ে হজরত আয়েশা রা. হাদিসের উদ্ধৃতি পেশ করেছেন। হজরত আয়েশা রা. বলেন: 'আমি একটি পর্দা টাঙিয়েছিলাম, যাতে নকশা ও প্রাণীর ছবি অঙ্কিত ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখে ছিঁড়ে ফেললেন।'

লেখক বলেন, এই বেচারা দীনহীন লোকের অজ্ঞতার ওপর করুণা হয়। কোন বিষয়কে কী কাজের সাথে সে তুলনা করছে! এটা যদি মেনেও নেয়া হয় যে, তিনি পর্দাটি ছিঁড়ে ফেলেছেন, তবে সাবধান করার জন্য এটা বৈধ। যেমন তিনি মদের ব্যাপারে মদের পাত্র ভেঙে ফেলার নির্দেশ নিয়েছিলেন।' কিন্তু কাপড় ছিঁড়ে ফেলার ব্যাপারে এখানে কী যুক্তি থাকতে পারে? এ সব লোককে শয়তান দারুণভাবেই প্ররোচিত করে রেখেছে।

আবু ইমরান আলজুনী বলেন, একবার মুসা ইবনে ইমরান আলাইহিস সালাম ওয়াজ করছিলেন। এতে আবেগের আতিশয্যে শ্রোতাদের মধ্যে একজন নিজের পোশাক ছিঁড়ে ফেললে হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এর কাছে অহী আসে যে, যে লোকটি কাপড় ছিঁড়েছে, তাকে বলুন সে যেন কাপড় না ছিঁড়ে; বরং আমার জন্য অন্তরটা স্বচ্ছ রাখে।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১২৯৪, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৮৫
২. এ অর্থের হাদিস সহিহ বুখারিতে এসেছে। হাদিস নং ৫৯৫৪

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 অধিকাংশ সুফির ওপর বালকদের ব্যাপারে শয়তানের চক্রান্ত

📄 অধিকাংশ সুফির ওপর বালকদের ব্যাপারে শয়তানের চক্রান্ত


জেনে রাখা দরকার, অধিকাংশ সুফি নিজেদের ওপর যুবতী নারীদের দর্শনের দ্বার বন্ধ করে দিয়েছেন। তাই তারা নারী সংশ্রব থেকে দূরে থাকেন এবং তাদের সাথে মেলামেশا করেন না। বিবাহ-শাদি ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করেন। সৎ উদ্দেশ্যে তাদের কাছে তালীম ও দীক্ষা নিতে আসে কিশোর ও বালকেরা। ইবলিস তখন এদের প্রতি সুফিকে আগ্রহী করে তুলে।

জেনে রাখা চাই, কিশোর-যুবকদের সোহবত বা সংশ্রবের ব্যাপারে সুফিরা সাত (৭) ভাগে বিভক্ত।

১. সবচেয়ে নিকৃষ্ট খবিস। এরা সুফিদের বেশভূষা ধারণ করে এবং ‘হুলুল’ এর মতাদর্শ লালন করে। আবু নাসার আবদুল্লাহ ইবনে সিরাজ বলেন, আমার কাছে বার্তা এসেছে যে, ‘হুললিয়া’ গোত্রের মধ্যে একটি দলের ধারণা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা বহু শরীরকে স্বীয় হুলুলের জন্য অবলম্বন করেছেন। আর এটা হচ্ছে ‘রুবুবিয়‍্যাত’ এর অর্থ। কারও কারও ভাষ্যমতে, আল্লাহ সুন্দর বস্তুতে হুলুল করে থাকেন। আবু আবদুল্লাহ ইবনে হামেদ বলেন, সুফিদের একটি জামাতের মতাদর্শ হচ্ছে, তারা আল্লাহকে পৃথিবীতে দেখে থাকেন। তারা আল্লাহকে মানুষের আকৃতি ধারণ করা সম্ভব বলে মনে করেন। সুন্দর অবস্থার তার ভেতর হুলুল করেন। বহু সময় তারা হাবশী ছেলেকে দেখে তার ভেতর আল্লাহকে দেখার চেষ্টা করেন।

২. দ্বিতীয়ত ওই সকল লোক, যারা সুফিদের সাথে পোশাকের সাদৃশ্য রাখে।

৩. তৃতীয়ত ওই সকল লোক, যারা ভালো বস্তুকে দেখা বৈধ মনে করে থাকেন। আবু আবদুর রহমান সালামী ‘সুনানুস সূফিয়াহ' নামক একটি গ্রন্থ লিখেছেন। গ্রন্থটির শেষ পর্যায়ে তিনি একটি অধ্যায়ে লিখেছেন, ‘ঐ সকল বিষয়ের বর্ণনা, যে বিষয়ে সুফিদের জন্য ছাড় আছে।’ অধ্যায়টিতে গান, বাদ্য ও সুন্দর চেহারা দেখার বিষয় উল্লেখ করে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, যেখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা ভালো বস্তু সুন্দর আকৃতির মাঝে সন্ধান করো।”

এছাড়াও আছে, “তিনটি বস্তু দেখা চোখের জন্য উপকারী। যথা-১. সবুজ, ২. পানি ও ৩. সুন্দর চেহারা।”

গ্রন্থকার বলেন, উপরোক্ত দু'টি হাদিস রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। প্রথম হাদিসের সনদ নিম্নরূপ: ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أَطْلُبُوا الْخَيْرَ عِنْدَ حَسَّانِ الْوُجُوهِ 'তোমরা ভালো বস্তু সুন্দর আকৃতির মাঝে সন্ধান করো।”

ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন বলেন, হাদিসটির বর্ণনাকারীদের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান কেউই নন। লেখক বলেন, হাদিসটি কয়েক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ওকাইলী বলেন, এ ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কোনো কিছু বর্ণিত বলে প্রমাণিত হয়নি। বাকি থাকল দ্বিতীয় হাদিস। এর সনদ হচ্ছে,

"আমাকে আবু মানসুর বিন খাইরুন বলেছেন, তাকে ইবনে উবাইদ রায়হানি বলেছেন, আমি আবুল বুখতারি ওয়াহাব ইবনে ওয়াহাব থেকে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমি বাদশা হারুনুর রশিদের কাছে যাওয়া-আসা করতাম। তার সামনে তার ছেলে কাসেম থাকত। আমি তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতাম। হারুনুর রশিদ বলতেন, আমি দেখছি তুমি কাসেমের দিকেই নিষ্পলক তাকিয়ে আছ! তোমার কি ইচ্ছে হয় যে, সে তোমারই হয়ে থাকবে? আমি বললাম, আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহর পানাহ! আমাকে এমন দুঃসাহস দেখাতে বলবেন না, যা আমার অন্তরে নেই। আমি কাসেমের দিকে তাকিয়ে আছি, তার কারণ হচ্ছে আমাকে ইমাম জাফর সাদিক বর্ণনা করেছেন, তাঁর পিতা তাঁর দাদা আলী ইবনে হোসাইন থেকে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর পিতা তাঁর দাদা হজরত আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তিনটি বস্তু দেখা চোখের জন্য উপকারী। যথা-১. সবুজ, ২. পানি ও ৩. সুন্দর চেহারা।'

গ্রন্থকার বলেছেন, আমি বলছি হাদিসটি 'মাওযূ'। আবুল বুখতারির সম্পর্কে আলেমদের মাঝে কোনো মতানৈক্য নেই যে, সে মিথ্যা এবং বানোয়াট হাদিস বানায়। এছাড়া আবু আবদুর রহমান সালামীর উচিত ছিল, যেহেতু তিনি সুন্দর চেহারার দিকে তাকানোর কথা বলেছেন, তাই তিনি তার স্ত্রী বা দাসীদের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ অনৈতিক উদ্দেশ্যে এমনটি করেছেন।

আমাদের শায়খ মুহাম্মাদ বিন নাসির আলহাফিজ বলেছেন, ইবনে তাহের মুকাদ্দাসী একটি গ্রন্থ লিখেছেন। যাতে তরুণ বালকদের দিকে তাকানোকে বৈধ বলা হয়েছে। লেখক বলেন, তরুণ বালকদের দিকে তাকালে যে ব্যক্তির কামনা ও প্রবৃত্তি জাগ্রত হয়, তার জন্য দেখা হারাম। মানুষ যখন এই দাবি করবে যে, সুন্দর বালকদের দিকে তাকালে তার কামনা জাগে না, তবে তার এ দাবি মিথ্যা। সাধারণত এ জন্য এটাকে 'মুবাহ' বা বৈধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। কেননা শিশু-কিশোরদের সাথে মেলা-মেশা অধিক পরিমাণে হয়ে থাকে। নিষিদ্ধ হলে এতে মানুষের দুঃখ-দুর্দশার অন্ত থাকবে না। কিন্তু দেখার মাত্রা যদি অতিরিক্ত হয়, তাহলে তা প্রবৃত্তি বা কামনা জাগরণের প্রমাণ। সাঈদ ইবনে মুসায়্যিব বলেন,
إذا رأيتم الرجل يلح النظر الى غلام أمرد فاتهموه "কাউকে যখন দেখবে, সে সুদর্শন বালকের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে, তখন তাকে অভিযুক্ত করতে পার।"

৪. চতুর্থ হচ্ছে সেই দল-যারা বলে, আমরা কামনার দৃষ্টিতে দেখি না; বরং অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা গ্রহণের নিমিত্তে দেখি। তাদের প্রতি তাকানোতে আমাদের কোনো ক্ষতি হয় না। অথচ তাদের এ সকল কথা ভুল। কেননা সকলের অভ্যাস সমান সমান। তারপরও যে এই দাবি করবে যে, সে অভ্যাসের ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে ভিন্ন, তাহলে সে একটি অগ্রহণযোগ্য বিষয়ের দাবি করল। এ বিষয়ে আমরা শুরুতে 'ছেমা'র বর্ণনায় বিস্তারিত আলোকপাত করেছি।

আবু হামযা সুফি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর বলেছেন, আমি আবু নাসার গানাভীর কাছে বসা ছিলাম। তিনি একজন অতুলনীয় আবেদ ছিলেন। এক সুদর্শন বালককে দেখে গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এমনকি তার কাছাকাছি গিয়ে তাকে বললেন, তুমি সর্বশ্রোতা, মহা প্রজ্ঞাবান, ইজ্জতে রফী' মহান সৃষ্টিকর্তার উসিলায় আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি মন ভরে তোমাকে দেখে নিই। ছেলেটি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে যেতে চাইলে সুফি বললেন, তুমি হাকিক, মাজিদ, কারিম, মুবদী ও মুয়ীদ আল্লাহ তায়ালার উসিলায় একটু দাঁড়াও। ছেলেটি ফিরে আবার এসে দাঁড়ালো। সুফি ছেলেটির মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখতে থাকল। অতঃপর সে যেতে চাইলে সুফি বললেন, তুমি ওয়াহেদ, আহাদ, সামী', বাসীর, বেমেছাল খোদা ও নাযীরের উসিলায় সামান্য দাঁড়াও। ছেলেটি দাঁড়ালো। সুফি আগের মতোই তাকে দেখে যাচ্ছে। অতঃপর তার মাথা মাটিতে ঠেকালেন। আর ছেলেটি চলে গেল। দীর্ঘক্ষণ পর জমিন থেকে মাথা তুলে সুফি কাঁদছেন আর বলছেন, ছেলেটির চেহারা দেখার কারণে আমার ভেতর সেই সত্তার কথা স্মরণ এসেছে, যিনি তুলনা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে, উপমা থেকে চির পবিত্র এবং চির অসীম। আল্লাহর কসম! আমি তাঁর সন্তুষ্টির জন্য স্বীয় প্রাণ তাঁর শত্রুদের সাথে জিহাদ করে কষ্ট-ক্লেশে নিপতিত করব এবং তাঁর বন্ধুদের সাথে ভালোবাসা রাখব, যাতে আমার উদ্দেশ্য সাধিত হয়। অর্থাৎ তাঁর উৎসৃষ্ট চেহারা ও পূতপবিত্র উচ্চতা দেখতে পাব। আমি আশা করি, তিনি আমাকে তাঁর দর্শনে কৃতজ্ঞ করবেন। তার বিনিময়ে তিনি আমাকে আকাশ-মাটির এই পৃথিবীতে আগুনে নিক্ষেপ করুন, এতে আমার আক্ষেপ নেই। এটা বলেই তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন।

আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, কিছু আলেম আমাকে বলেছেন, একজন বালক আমাকে বলেছে, অমুক সুফি যে আমাকে ভালোবাসে, তিনি বলেছেন, বৎস! তোমার ওপর আল্লাহ তায়ালা বিশেষ অনুগ্রহ এবং দৃষ্টি রয়েছে। আমাকে তিনি তোমার মুখোপেক্ষী বানিয়ে দিয়েছেন। বর্ণিত আছে, সুফিদের একটি জামাত আহমাদ গাযালির নিকট গেলে তাঁর কাছে একজন বালক দেখতে পান। তারা একসাথে বসে আছে। উভয়ের মাঝখানে একটি গোলাপ ফুল রয়েছে। আহমাদ কখনো দৃষ্টি দেন গোলাপের দিকে, কখনো বালকের দিকে চোখা ফেরান। সুফিরা এসে বসলে তাদের মধ্য হতে একজন বললেন, সম্ভবত আমরা এসে আপনাকে বিরক্ত করলাম। প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, অবশ্যই, আল্লাহর কসম! পরে সকলে সমস্বরে ওজদেহালের নিয়মে স্লোগান দিলেন।

আবুল হাসান ইবনে ইউসুফ আমাকে বলেন, তিনি আহমাদ গাযালিকে এক চিরকুটে লিখেছেন, 'তুমি তোমার তুর্কি গোলামের দিকে তাকাও।' তিনি চিরকুট পড়ে গোলামকে ডেকে সঙ্গে নিয়ে মিম্বরে আরোহণ করলেন এবং তার উভয় চোখে চুমু খেয়ে বললেন, এটাই চিরকুটের জবাব। লেখক বলেন, ওই ব্যক্তির (আহমাদ গাযালি) এহেন কার্যকলাপে তার চেহারায় লজ্জা-শরমের পর্দা পড়ে যাওয়া কোনো আশ্চর্যের কথা নয়। আশ্চর্য লাগে ওই গাধাদের ওপর, যারা ওখানে উপস্থিত ছিল। তারা কেন কোনো অভিযোগ করল না? এ থেকে বিরত রাখল না? বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মানুষের অন্তরে শরিয়তের তাপ ঠান্ডা হয়ে গেছে।

আবু তৈয়ব তাবারি আমাকে বলেছেন, যে সব গোষ্ঠী রাগশাস্ত্র চর্চা করেন, শুনেছি তারা ছেমার সাথে সাথে সুদর্শন বালকদের দিকে তাকানোকেও আবশ্যক মনে করেন। অনেক সময় বালকদেরকে অলংকার ও রঙিন কাপড় এবং জরিদার পোশাকে সাজিয়ে থাকে। তারা মনে করে, এমন কর্মকাণ্ড মূল ঈমান এবং বালকের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার ফলে তাদের অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। তারা 'সৃষ্টিবস্তু দ্বারা সৃষ্টিকর্তার স্মরণ হয়' বলে প্রমাণ দিতে চায়। অথচ তাদের এ সব কথা একান্তই তামাশা ও প্রবৃত্তির অনুগামী। বিবেক-বুদ্ধিকে ধোঁকা দেয়া এবং জ্ঞানের বিপরীত কাজই এর ফলাফল। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ
"আল্লাহ তায়ালার নিদর্শন তোমাদের অস্তিত্বেই বিদ্যমান, তোমরা কি তা দেখো না?” তিনি আরও বলেন,
أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ
“তারা কি উটের দিকে দৃষ্টি দেয় না! কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে!” আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
أَوَلَمْ يَنْظُرُوا فِي مَلَكُوتِ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ
“তারা কি আকাশমণ্ডলী ও জমিনের দিকে তাকায় না!”

যে সব বস্তুর মাধ্যমে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা ছেড়ে এরা এমন বিষয়ে পড়ে আছে, যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। এই গোষ্ঠীটি কেবল রুচিশীল ও সুস্বাদু খাবার খেয়ে উপর্যুক্ত কর্মকাণ্ড করে থাকে। এসব মজাদার খাদ্য খেয়ে তাদের মন ভরে গেলে তারা নাচ, গান-বাদ্য ও সুদর্শন বালকদের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং এ-জাতীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে থাকে। যদি কখনো খাবার-দাবার কম গ্রহণ করে, তখন ছেমা ও নজরের কাছে কম ঘেঁষে থাকে। আবু তৈয়ব বলেন, রাগসংগীত শ্রোতাদের অবস্থা এবং কিছু ছেমার সময় তাদের ওপর কী ধরনের অবস্থা অতিবাহিত হয়, কয়েক পঙ্ক্তি কবিতায় তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে-
أتذكر وقتنا وقد اجتمعنا * على طيب السماع الى الصباح ودارت بيننا كأس الأغاني * فأسكرت النفوس بغير راح
فلم نر فيهم إلا نشاوى " سرورا والسرور هناك صاحي إذا لبي أخو اللذات فيه " منادى اللهو حي على الفلاح ولم نملك سوى المهجات شيئا * أرقناها لا لحاظ ملاح
'যে অবস্থায় আমরা সকাল থেকে মনোমুগ্ধকর রাগ-সংগীত শুনতে সমবেত হয়েছি, তুমি কি এখনও সে সময়কার কথা স্মরণ করতে চাও? আমাদের মাঝে রাগ-সংগীতের পেয়ালা ঘুরছে। যা পান করে আমাদের মনপ্রাণ শরাবের নেশা ছাড়াই নেশাগ্রস্ত হয়ে গেছে। জলসায় যারা আছে, সবাই প্রশান্তিতে তৃপ্ত। এখানে কেবল শান্তিই হুঁশিয়ার। এই জলসায় যখন খেল-তামাশার আহ্বানকারী ডাকে যে, লবণাক্ত প্রিয়তমা তোমায় আহ্বান করছে, চলো। তখন মজা ও তৃপ্তি গ্রহণকারী ব্যক্তি বলে, উপস্থিত! আমাদের কাছে মনোলোভা বস্তু ব্যতিরেকে আর কিছু নেই। যার খুশি চোখ দিয়ে ভাসিয়ে দাও।'

আবু তৈয়ব বলেন, মনে ছেমার প্রভাব এভাবে পড়ে যেভাবে কবি আবৃত্তির সুরে উল্লেখ করেছেন। তাহলে ছেমা-কী করে উপকার পৌঁছায়? ইবনে আকিল বলেন, যারা বলে, সুদর্শন বস্তু দেখার বিষয়ে আমার কোনো ভয় নেই। অথচ তার এ কথা অসার ও অযৌক্তিক। কেননা শরিয়তের খেতাব তথা উদ্দিষ্ট সবার জন্য সমান। কেউ এর ব্যতিক্রম হতে পারে না। কোরআনের আয়াত তাদের দাবিকে আরও অসার ও অকৃতকার্য করে তোলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ 'হে রাসুল! আপনি বিশ্বাসীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে।"

অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন,
أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ “তারা কি উটের দিকে দৃষ্টি দেয় না! কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে!” সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ওই সকল বস্তুর প্রতি দৃষ্টি দেয়া বৈধ যার প্রতি তাকালে কামনার উদ্রেক হয় না, মনের লালসা জাগে না। এটা এমন শিক্ষা, যেখানে বিন্দু পরিমাণ কামনা-বাসনার অবকাশ নেই। অন্যদিকে কামনা উদ্রেককারী বিষয়গুলোর ব্যাখ্যায় বলা যায়, এতে প্রবৃত্তির দাসত্বস্বরূপ কামনার অভিজ্ঞতা নেয়া যায়। প্রত্যেকটি চেহারাই পাপের উৎস। এর প্রতি দৃষ্টি দেয়া উচিত নয়। কেননা এর মাধ্যমে অধিকাংশ ফিতনার উৎপত্তি। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা কোনো নারীকে নবী হিসেবে পাঠাননি। না কোনো নারীকে কাজী, ইমাম বা মুয়াজ্জিন বানিয়েছেন। এসবের হেতু হচ্ছে নারীরা আপদ ও কামনার উৎস। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর দিকে তাকালে শরিয়তের উদ্দেশ্য রহিত হয়ে যায়। এখন যে ব্যক্তি বলে, আমি সুন্দর দর্শন করে ইবরত নিই। তাকে আমরা মিথ্যুক বলব। আর যারা নিজের স্বভাবকে অন্যদের চেয়ে উন্নত মনে করে, তাদের দাবি অমূলক। এব কথা কেবলই শয়তানের ধোঁকা ও প্রতারণা।

৫. পঞ্চম, ওই সকল সুফি-যারা বালকদের সাথে মেলামেশা করে এবং নিজেকে অনাচার অযাচার থেকে দূরে রাখে। এটাকে মুজাহাদা এবং আত্মশুদ্ধি মনে করে। তারা এটা জানে না যে, সুদর্শন বালকদের সাথে মেলামেশা করা এবং তাদের দিকে কামনার দৃষ্টিতে তাকানোও পাপ। এগুলো সুফিদের অভ্যাস। তাদের উত্তরসূরিরাও এমন মতবাদ লালন করত। আহমদ ইবনে সাবিত আমাকে বলেছেন, আবু আলী রোযবারী নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতেন-
أنزه في روض المحاسن مقلتي * وأمنع نفسي أن تنال محرما وأحمل من ثقل الهوى مالو أنه " على الجبل الصلد الأصم تهدما
"আমি স্বীয় নয়নযুগল সুন্দর ও সৌন্দর্যের বাগিচায় অবগাহন করাই এবং নিজের নফসকে হারামে পতিত হওয়া থেকে বিরত রাখি। আমি প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার এতো ভারী বোঝা বহন করি, তা যদি কোনো দৃঢ় পাহাড় বহন করে তবে তা ভেঙ্গে পড়বে।"

আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, অচিরেই ইউসুফ ইবনুল হোসাইনের ঘটনা এবং তার অভিমত বিবৃত হবে, যাতে তিনি বলেছেন, আমি আল্লাহর কাছে একশতবার অঙ্গীকার করেছি যে, কোনো সুদর্শন বালকের কাছে বসব না। তথাপি নাজুক দেহাবয়ব ও কামনাময় চোখ দেখে সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে ফেলি।

আবুল মুখতার আয্যবী বলেন, আমি আবুল কুমাইন আন্দুলুসি—যিনি খুবই কুৎসিত কৃষ্ণ বর্ণের ছিলেন—তাকে বললাম, সুফিদের অত্যাশ্চর্য কোনো ঘটনা বলুন। তিনি বললেন, সুফিদের মধ্যে একজনের সাথে আমার মেলামেশার সুযোগ হয়েছে, যার নাম মেহেরজান। তিনি শুরুতে অগ্নিপূজক ছিলেন। পরে মুসলমান হয়ে সুফি হয়ে গিয়েছিলেন। আমি তার সাথে একজন সুদর্শন বালক দেখতে পেতাম, যাকে তিনি কখনো পৃথক করতেন না। রাত হলে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। পরে তার দিকে ফিরে শুয়ে যেতেন। অতঃপর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে দাঁড়াতেন এবং যতটুকু সম্ভব নামায পড়তেন। আবার বালকের দিকে ফিরে শুয়ে যেতেন। এমন কর্মকাণ্ড রাতে কয়েকবার করতেন। অবশেষে ভোর আলোকময় হলে কিংবা ভোরের কাছাকাছি সময়ে বিতর নামায আদায় করতেন। অতঃপর আকাশের দিকে উভয় হাত তুলে বলতেন, হে আল্লাহ! তুমি ভালো করেই জানো, আজ রাত আমার নিরাপদে কেটেছে। এ রাতে অন্যায়মূলক কোনো কাজ আমি করিনি। মন্দ কামনার কাছে যাইনি। কিরামান কাতিবীন আমার আমলনামায় কোনো গোনাহ লেখেনি। অথচ এই বালকের ভালোবাসা আমার অন্তরে এতটাই গোপনে গেঁথে রেখেছি, তা যদি কোনো পাহাড় বহন করে, তবে নির্ঘাত সে হেলে পড়বে এবং খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাবে। যদি তা জমিন বহন করে তবে, তা ফেটে যাবে। পরে তিনি বলতেন, হে রাত! আমার পক্ষ থেকে যা কিছু তোমার মাঝে অতিবাহিত হয়েছে, তুমি তার সাক্ষী থেকো। আল্লাহর ভয় আমাকে হারামের খায়েশ এবং পাপাচারে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রেখেছে। পরে বলতেন, হে আল্লাহ! হে আমার মালিক! তুমি আমাকে পরহেযগারীর ওপর অটল রেখো। যেদিন সব প্রিয়তমা একে অন্যের কাছ থেকে দূরে থাকবে সেদিনও আমাদেরকে পৃথক কোরো না।

বর্ণনাকারী বলেন, আমি ওই সুফির কাছে দীর্ঘদিন ছিলাম। প্রত্যেক রাতে এটা তার রুটিন ছিল। আমি তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসতে চাইলে, তাকে বললাম, এটা কেমন কথা যে, রাত অতিবাহিতকালে আপনাকে এমন কথা বলতে শুনি। তিনি বললেন, তুমি কি তা শোনো? আমি বললাম, হ্যাঁ। উত্তরে বললেন, হে ভাই, আল্লাহর কসম! আমার অন্তরে বালকটির এতই ভালোবাসা, তা যদি কোনো রাজা-বাদশার তার প্রজাদের প্রতি থাকত, তাহলে আল্লাহর পক্ষ হতে সে মাগফিরাতের হকদার হয়ে যেত। আমি বললাম, তাহলে এটা বলুন, যে মানুষের পক্ষ থেকে আপনার ওপর পাপ বা অন্যায়ে পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তার সাথে মেলামেশারই-বা দরকার কী?

আবু মুহাম্মাদ জাফর ইবনে আবদুল্লাহ সুফি বলেন, আবু হামযা সুফি বর্ণনা করেছেন, আমি বায়তুল মুকাদ্দাসে একজন যুবক সুফি দেখেছি, যে দীর্ঘদিন ধরে একজন বালকের সাথে মেলামেশা করত। পরে সেই সুফি মারা গেল। তার মৃত্যুতে বালক খুব মর্মাহত হলো। এমনকি দুশ্চিন্তা আর পেরেশানির কারণে সে দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। তার শরীরে কেবল চামড়া আর হাড্ডিই পরিদৃষ্ট হতো। একদিন আমি তাকে বললাম, তুমি তোমার দোস্তের জন্য খুব শোকাহত। আমি তো দেখছি তুমি স্থির থাকতে পারছ না। উত্তরে বলল, এমন ভালো ব্যক্তি গত হলে কেউ কি স্থির থাকতে পারে? যার জন্য আল্লাহ নির্ধারিত করে দিয়েছেন। তিনি এক মুহূর্তের জন্যও আমার থেকে পৃথক হননি। এত লম্বা সময়ের রাত-দিন মেলামেশা ও উঠা-বসা সত্ত্বেও আমার সাথে কোনো পাপ বা অন্যায় আচরণ করেননি।

গ্রন্থকার বলেন, এই গোষ্ঠীকে শয়তান যখন দেখল যে, তারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করছে না, তখন তাদের দৃষ্টিতে বেহায়াপনাকে বৈধ হিসেবে দেখাতে শুরু করল। সুতরাং তারা দেখা, মেলামেশা করা এবং পরস্পর কথা বলার মাধ্যমে পরিতৃপ্ত হতে শুরু করে এবং এভাবে মন্দ কাজ থেকে বাঁচার জন্য নফসের বিরোধিতা করার অঙ্গীকার করে। এখন যদি সে সত্যবাদী হয়, তাহলে তার উচিত—যে দিলে আল্লাহকে স্থান দেয়ার কথা সেখানে গাইরুল্লাহকে কেন স্থান দেয়া হচ্ছে? আর যে সময়টুকু এমন জোরপূর্বক আত্মশুদ্ধি, সাধনা এবং মুজাহাদার পেছনে ব্যয় করা হয়, মনকে তা থেকে ফিরিয়ে আখিরাতে উপকারী বিষয়ে অধিক মনোযোগী হওয়া অধিক জরুরি। শুধু যিনা-ব্যভিচার থেকে বিরত থাকার এই সংযমে সময় ক্ষয় করা অজ্ঞতা এবং শরয়ি শিষ্টাচারবিরোধী। কেননা আল্লাহ তায়ালা চক্ষুদ্বয় অবনত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমেই কোনো শঙ্কা ও সংশয় ব্যতিরেকে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়া যায়। ওই সকল লোকদের উদাহরণ হচ্ছে ওই ব্যক্তির মতো যে কোনো অলস ও অমনোযোগী হিংস্র প্রাণীর কাছ দিয়ে কোথাও যাচ্ছে, হিংস্র প্রাণী তাকে দেখতে পায়নি। এহেন অবস্থায় সে হিংস্র প্রাণীকে উত্তেজিত করতে লাগল এবং তার মোকাবেলা করার চেষ্টা করল। এমতাবস্থায় ওই ব্যক্তি যদি মারা না-ও যায়, কিন্তু সে কি কখনো আঘাত থেকে রক্ষা পাবে?

টিকাঃ
১. [মাউযূ] আলবানি সংকলিত যঈফুল জামে: ৯০৩
২. [যঈফ] আলবানি সংকলিত যঈফুল জামে: ২৫৬৭
১. সুরা যারিয়াত: আয়াত ২১
২. সুরা গাশিয়াহ: আয়াত ১৭
৩. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৮৫
৪. সুরা নূর: আয়াত ৩০
৫. সুরা গাশিয়াহ: আয়াত ১৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00