📄 ‘ওয়াজদ’ এর ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
গ্রন্থকার বলেন, এ সব লোক গানের আবেশে উদ্বেলিত হয়ে নাচানাচি করতে থাকে। এটাকে 'ওয়াজদ' অর্থাৎ আবেগ, উত্তেজনা, উন্মত্ততা বলা হতো। এই ছেমা বা সংগীত ও ওয়াজদ অর্থাৎ গানের আবেশে তন্ময় হয়ে নাচানাচি বা উন্মত্ততা ৫ম হিজরি শতাব্দী থেকে সুফি সাধকদের কর্মকাণ্ডের অন্যতম অংশ হয়ে যায়। সামা ব্যতিরেকে কোনো সুফি খানকা বা সুফি দরবার কল্পনা করা যেত না।
এদিকে যখন সামা সংগীতের ব্যাপক প্রচলন হয়ে গেল নেককার মানুষদের মাঝে তখন জালিয়াতগণ তাদের মেধা খরচের একটি বড় ক্ষেত্র পেয়ে গেল। তারা সামা, ওয়াজদ প্রভৃতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন হাদিস বানিয়ে প্রচার করে। গানের মজলিসে আবেগে উদ্বেলিত হয়ে অচেতন হওয়া বা নাচানাচি করাকে ইশকের বড় নিদর্শন বলে গণ্য করা হতো। জালিয়াতরা এ বিষয়ে কিছু হাদিস বানিয়ে নিয়েছিল। অথচ এটা ছিল ইবলিসের মস্ত বড় প্ররোচনা। এই দলটি প্রমাণ হিসেবে ওই হাদিসটি উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে যা আমি আবু নাসার আবদুল্লাহ ইবনে আলী সিরাজ তুসি থেকে পেয়েছি। তিনি বলেন, তারা বলে থাকে—যখ وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمَوْعِدُهُمْ أَجْمَعِينَ অর্থাৎ 'এ সকল কাফেরদের জন্য জাহান্নাম প্রতিশ্রুত”-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়, তখন হজরত সালমান ফারেসী রা. উচ্চশব্দে তালি বাজালেন। এতে তাঁর মাথার চুল পড়ে গেল। পরে তিনি তিনদিন গোপন থাকেন।
অনুরূপভাবে সুফিরা আরেকটি কথাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে যা আবু ওয়ায়েল থেকে আমি জানতে পারি। তিনি বলেন, আমরা আবদুল্লাহর সাথে কোথাও যাচ্ছিলাম। আমার সাথে রবী' ইবনে হাইসামও ছিলেন। আমরা এক কামারের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। আবদুল্লাহ দাঁড়িয়ে ওই লোহাটি দেখছিলেন, যা আগুনের মধ্যে ছিল। রবী'ও লোহা দেখছেন এবং কাঁপতে কাঁপতে তিনি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। পরে সম্মুখে গিয়ে ফোরাত নদীর তীরে এক কামারের দোকানে গেলে অগ্নির বিচ্ছুরণ দেখতে পেয়ে এই আয়াত পড়েন,
إِذَا رَ أَنَّهُمْ مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُظاً وَزَفِيراً
"দূর হতে আগুন যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা তার ক্রুদ্ধ গর্জন ও প্রচণ্ড চিৎকার শুনতে পাবে।” এ আয়াত পড়ে তিনি মূর্ছা যান। আবদুল্লাহও তার পাশে অবস্থান করেন। এভাবে যোহর নামায আদায় করেন। তখনও তার সংজ্ঞা ফেরেনি। এমনকি আসরের সময়ও তার হুঁশ ফেরেনি। মাগরিবের সময় হলে আবদুল্লাহ ঘরে ফিরে আসেন।
সুফিরা বলেন, এমন অনেক ঘটনা আছে যে, কোনো কোনো আল্লাহর বান্দা কুরআন শরিফ শুনে মৃত্যুবরণ করেন। কেউ-বা মূর্ছা যান। আবার কেউ চিৎকার করে ওঠেন। এমন ঘটনা যুহুদ তথা কৃষ্ণব্রতের কিতাবসমূহে বিস্তর রয়েছে।
উত্তর : হজরত সালমান রা. সম্পর্কে যে আলোচনা করা হয়েছে তা ভুল ও নিছক বিভ্রান্তি। এছাড়া ওই হাদিসের কোনো ভিত্তি নেই। উক্ত আয়াত মক্কায় অবতীর্ণ হয়, অথচ হজরত সালমান ফারেসী রা. মদিনায় ইসলাম গ্রহণ করেন। কোনো সাহাবি এমন ঘটনা কখনো বলেননি। বাকি রইল রবী' ইবনে হাইসামের ঘটনা। তো, এর রাবি ঈসা ইবনে সালীম 'দুর্বল' রাবি হিসেবে সাব্যস্ত। সুফিয়ান সাওরি বলেন, রবী' ইবনে হাইসামের পক্ষ থেকে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু সাহাবা বা তাবেয়িদের কারও কাছ থেকে এমন ঘটনার কথা কোথাও নেই।
গ্রন্থকার বলেন, আল্লাহ যদি তাওফিক দেন তবে জেনে নিন যে, সাহাবাদের অন্তর ছিল খুবই পরিষ্কার। তারা আবেগের আধিক্যে প্রচুর কান্নাকাটি করতেন। কোনো বিষয়ের আবেশে তন্ময় হয়ে নাচানাচি বা উন্মত্ততা কখনোই করেননি। সাবেত আমাকে হজরত আনাসের হাদিস শুনিয়েছেন: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'এরা কে যে আমাদের দীনকে তাদের সাথে গুলিয়ে ফেলে? যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে তাহলে সে নিজেকে যেন প্রকাশ করে। আর সে যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করবেন।"
হজরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা দেখেছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদেরকে ওয়াজ করেছেন। এতে ওয়াজের প্রভাবে লোকজনের কান্নার শব্দ শুনেছি। কিন্তু কাউকে পড়ে যেতে দেখিনি।'
হজরত হোসাইন ইবনে আবদুর রহমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আসমা বিনতে আবু বকর রা. এর কাছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবাদের কুরআন পড়াকালীন অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের অবস্থা তেমনই হতো যেমন আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেছেন। অথবা এমন বলেছেন, যেভাবে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে গুণান্বিত করেছেন। অর্থাৎ চোখ ভেজা ভেজা থাকত। তাঁদের শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যেত। আমি বললাম, আমাদের এখানে এমন অনেক লোক আছে, যাদের সামনে কুরআন পড়া হলে তারা বেহুঁশ হয়ে পড়েন। হজরত আসমা রা. শুনে বললেন, أعوذ بالله من الشيطان الرجيم 'আমরা আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে পানাহ চাই।'
হাসান বসরি রহ. হতে বর্ণিত। তিনি একদিন ওয়াজ করছিলেন। এক ব্যক্তি সেই ওয়াজে দীর্ঘশ্বাস ফেললে হাসান বসরি রহ. বললেন, এই দীর্ঘশ্বাস যদি আল্লাহর জন্য হয়, তবে তুমি নিজেকে প্রসিদ্ধ করলে। আর যদি গাইরুল্লাহর জন্য করে থাকো তাহলে তুমি নিজেকে ধ্বংস করে দিলে।
ফযাইল ইবনে আয়ায রহ. তাঁর পুত্রকে বলেন, যে এমন অবস্থায় কেঁপে কেঁপে পড়ে যেতেন, যদি তুমি সত্যবাদী হও তাহলে তুমি নিজেকে হাসির পাত্র বানালে। আর যদি মিথ্যাবাদী হও তাহলে তুমি নিজেকে ধ্বংস করে দিলে। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি ছেলেকে বলেছেন, হে বৎস! যদি তুমি সত্যবাদী হও তাহলে তোমার ভেতরে যা ছিল তা প্রকাশ করে দিলে। আর যদি মিথ্যাবাদী হও তাহলে আল্লাহর সাথে শরিক করলে।
টিকাঃ
১. সুরা হুজর: আয়াত ৪৩
২. সুরা ফুরকান: আয়াত ১২
৩. ইমাম যাহাবী রহ. তার 'মীযানুল ই'তিদাল' গ্রন্থে এটাকে বাতিল বলেছেন।
৪. হাদিসটির সনদ 'যঈফ'। এখানে রূহ ইবনে আতা আছেন, তিনি যঈফ রাবী।
📄 ‘ওয়াজদ’ এর ক্ষেত্রে সুফিদের মতবাদ
লেখক রহ. বলেন, যদি কেউ বলে যে, কথা তো সত্যবাদীদের ব্যাপারে চলতে পারে; রিয়াকারদের ব্যাপারে নয়। ওই ব্যক্তির ব্যাপারে কী বলা হবে, যার ওপর অনিচ্ছাকৃতভাবে 'ওয়াজদ' তথা আবেগ, উত্তেজনা, উন্মত্ততার সৃষ্টি হয়? যে তা নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য রাখে না? এর উত্তরে বলা হবে—'ওয়াজদ' আরম্ভ হওয়ার প্রাক্ককালে অভ্যন্তরীণ একধরনের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। তখন মানুষ যদি তার নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট হয় যে, কেউ যেন এই অবস্থা অবলোকন করতে না পারে। তখন শয়তান তার থেকে নিরাশ হয়ে দূরে সরে যেতে বাধ্য।
আইয়ুব সাখতিয়ানির ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে, তিনি যখন হাদিস বর্ণনা করতেন এবং তার অন্তর খুবই কোমল হয়ে যেত এবং তিনি বেশ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন। তখন তিনি নাক মুছতেন এবং বলতেন আবহাওয়া বেশ শীতল অনুভূত হচ্ছে। বোঝা গেল, মানুষ যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণহীন করে রাখে তাহলে শয়তান তার ভেতর কুমন্ত্রণার বীজ বপন করার সাহস ও সুযোগ পায়। তার ফুৎকারে মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়ে।
হজরত যায়নাব রা. এর ভাতিজা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হজরত আবদুল্লাহর স্ত্রী যায়নাব বলেন, একদিন আবদুল্লাহ বাইরে থেকে এলে। আমার পাশে একজন বুড়ি বসা ছিলেন, যিনি আমাকে জ্বরের শুশ্রূষা করছিলেন। আমি তাকে চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখলাম। আবদুল্লাহ এসে আমার পাশে বসে আমার গলায় একটি তাবিজ ঝোলানো দেখতে পান। জিজ্ঞেস করলেন, এই তাবিজ কিসের? আমি বললাম, আমার জন্য পড়ে ফুঁক দেয়া হয়েছে। আবদুল্লাহ তাবিজটি নিয়ে ভেঙ্গে ফেললেন এবং বললেন, আবদুল্লাহর পরিবার শিরক থেকে মুক্ত। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে শুনেছি, তিনি বলতেন, কষ্ঠিপাথর, তাবিজ ও এ-জাতীয় দানা শিরক। যায়নাব রা. বলেন, তুমি এটা কেন বলছ? অথচ একবার আমার চোখে ব্যথা অনুভূত হলে আমি অমুক ইহুদির কাছে গিয়ে ঝেড়ে আসি। এরপর এই ব্যথা উপশম হয়ে যায়। আব্দুল্লাহ বললেন, এটা শুধু শয়তানের কারবার। সে তার হাত দিয়ে চোখে ঠোকর মারে। যখন ইহুদি ঝেড়ে দেয় তখন ভালো হয় বলে মনে হয়। তোমাদের জন্য উচিত ছিল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমতাবস্থায় যে আমল করতেন, তা করা। তিনি এই দুআ করতেন :
اللَّهُمَّ أَذْهِبْ البَأْسَ رَبِّ النَّاسِ ، وَاشْفِ فَأَنْتَ الشَّانِي ، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءٌ لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
'হে আল্লাহ মানুষের প্রতিপালক। দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিন। শিফা দান করুন। আপনি সুস্থতা দানকারী। আপনার শিফা ব্যতীত কারও শিফা নেই। এমন শিফা দান করুন যাতে কোনো কষ্ট অবশিষ্ট না থাকে।”
📄 ‘ওয়াজদ’-এর নিয়ন্ত্রণ
যদি বলা হয়, আমরা ওই ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে চাই, যারা 'ওয়াজদ' তথা আবেগ, উত্তেজনা, উন্মত্ততা নিয়ন্ত্রণের বহু চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তাহলে এখানে শয়তান আসবে কোথা থেকে?
এর জবাবে বলা হবে, আমরা এ কথা অস্বীকার করছি না যে, কেউ কেউ অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। কিন্তু সত্যবাদীর পরিচয় হচ্ছে, তারা জানে না কী ঘটে যাচ্ছে। অতএব তারা ওই দলের—যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, فَخَرَّ مُوسَى صَعِقًا 'এবং মুসা বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেল।'
আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাবের সামনে কেয়ামতের ভয়াবহতার কথা আলোচনা করা হলে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন এবং কোনো কথা বলতে পারেননি। এভাবে কয়েকদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন।
গ্রন্থকার বলেন, আমি বলছি, অনেক মানুষ ওয়াজ শুনে মারা গেছেন এবং বেহুঁশ হয়ে গেছেন। আমি 'ওয়াজদ' বলতে তাদের বোঝাতে চাচ্ছি, যারা শয়তানের ফাঁদে পড়ে বিভিন্ন উন্মত্ততা ও অস্বাভাবিক আচরণ করে থাকে, উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার দিতে থাকে। বাহ্যত তাদেরকে কৃত্রিমতার আশ্রয় নিতে দেখা যায়, যা শয়তানের ফাঁদে পড়েই এমন করে বেড়ায়।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, যদি বলা হয়, ইখলাসওয়ালাদের অবস্থা কি এমন অবস্থার চেয়ে কম হবে? উত্তরে বলা হবে, হ্যাঁ। দু'টি কারণে। ১. যদি তার ইলম শক্তিশালী হয় তাহলে সে তা আয়ত্ত করতে পারবে। ২. সাহাবি ও তাবেয়িদের বিপরীত কর্মকাণ্ড সাধনের কারণে সে বহু পেছনে পড়ে থাকবে।
সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা থেকে আমার কাছে হাদিস পৌঁছেছে। তিনি বলেন, আমি খালাফ ইবনে হাওশাব থেকে শুনেছি যে, খাওয়াত রহ. ওয়াজের সময় কাঁপতেন। তা দেখে ইবরাহিম নাখয়ী বলেছেন যে, তুমি যদি এই অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পার, তবে আমি তোমাকে হীন ভাবতে অসুবিধার কিছু দেখি না। পক্ষান্তরে যদি নিয়ন্ত্রণ করতে না পার, তবে মনে রেখো, তুমি পূর্ববর্তী মনীষীদের বিপরীত কর্ম সাধন করছ।
গ্রন্থকার বলেন, ইবরাহিম নাখয়ী এমন একজন ফকিহ ছিলেন, যিনি সুন্নাতের খুবই পাবন্দি করতেন এবং মনীষীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতেন। আর খাওয়াত রহ. ভালো লোক ছিলেন এবং কৃত্রিমতার আশ্রয় নিতেন না। তার ক্ষেত্রেও ওয়াজদ এর ব্যাপারে ইবরাহিম নাখয়ী কী পরিমাণ কঠোর ছিলেন, তা সহজেই অনুমেয়।
টিকাঃ
১. সহিহুল জামে': হাদিস নং ১৬৩২
২. সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৩
📄 গান শুনে পরিতৃপ্ত হয়ে তালি দেয়া ও নাচা
তাসাওউফওয়ালারা কাউয়ালি গান শুনে পরিতৃপ্ত হয়ে হাতে তালি বাজাতে থাকে। তারা বলে, হজরত ইবনে বুনান 'ওয়াজদ' করতেন এবং হজরত আবু সাঈদ খায্যায তালি বাজাতেন।
গ্রন্থকার বলেন, তালি বাজানো মন্দ ও ঘৃণিত স্বভাব। এটা উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ। বুদ্ধিমান লোক এমন কাণ্ড থেকে বিরত থাকেন। কারণ এটা পৌত্তলিকদের নিয়ম। তারা বায়তুল্লাহ শরিফের সন্নিকটে আসার প্রাক্ককালে হাত তালি বাজাত। যার নিন্দা জানিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا كَانَ صَلَاتُهُمْ عِنْدَ الْبَيْتِ إِلَّا مُكَاءً وَتَصْدِيَةً فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ
'আর কাবার নিকট তাদের নামায শিস ও হাত-তালি ছাড়া কিছু ছিল না। সুতরাং তোমরা আস্বাদন করো আযাব। কারণ তোমরা কুফরী করতে।'
লেখক বলেন, এতে মহিলাদের সাথেও সাযুজ্য দেখতে পাওয়া যায়। বুদ্ধিমানেরা এমনটি করতে পারেন না। তারা ব্যক্তিত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে মুশরিক ও নারীদের সাযুজ্য গ্রহণ করতে পারেন না। এর পর তারা পরিতৃপ্ত হয়ে নাচতে থাকে। প্রমাণ হিসেবে তারা আল্লাহ তায়ালার বাণী أركض برجلك অর্থাৎ 'হে আইয়ুব! স্বীয় পা মাটিতে মারো।'-এটা দ্বারা প্রমাণ সাব্যস্ত করার চেষ্টা চালায়। গ্রন্থকার বলেন, আমার মতে এ আয়াত দ্বারা প্রমাণ নেয়া চরম ধৃষ্টতা। কেননা জমিনে পা মারার নির্দেশ তো আনন্দ প্রকাশের জন্য দেয়া হয়নি; বরং চাহিদামতো পানি প্রাপ্তির নিমিত্তে এমন নির্দেশ এসেছে।
ইবনে আকিল রহ. বলেন, একজন অসুস্থ ব্যক্তির ঘটনা, যার বিপদমুক্তির সময় এমন পা নাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং তাতে পানি প্রবহমান হওয়ার নবীর মুজেযার অন্তর্ভুক্ত-এ দ্বারা নাচের বিধান নির্ণয় করা আহমকি। ইবনে আকিল আরও বলেন, কুরআনে কড়া ভাষায় সুফি- দরবেশদের এমন পা মারা ও নাচার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি এসেছে-
لَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَهًا 'জমিনে দর্পভরে চলো না।'
আল্লাহ তায়ালা অহংকার ও দর্প সহকারে চলাফেরা করার প্রতি নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।
তালি বাজানো ও নাচানাচি করা খুশির আতিশয্যে হয়ে থাকে। এতে পূর্ণমাত্রা অহংকার ও দর্প পরিদৃষ্ট হয়ে থাকে। গানের মজলিসে আবেগে উদ্বেলিত হয়ে অচেতন হওয়া বা নাচানাচি করাকে ইশকের বড় নিদর্শন বলে গণ্য করা হতো। জালিয়াতরা এ বিষয়ে কিছু হাদিস বানিয়েছে।
এদের নাচ-গানের মজলিসে চরম পুলকিত হয়ে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে থাকে। এমনকি পাশের বসা লোককে ধরে দাঁড় করিয়ে যুগলভাবে নাচানাচি করতে থাকে। এমতাবস্থায় পাশের বসা লোকটি যদি তৎক্ষণাৎ না দাঁড়ায়, তবে এটাকে ধৃষ্টতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অতঃপর একজনের দেখাদেখি সকলেই সমস্বরে চিৎকার করে দাঁড়াতে শুরু করে এবং লাফালাফি করতে থাকে। এবার কেউ তার মস্তিষ্কাবরণ খুলে ফেললে সকলে তার অনুসরণ করে নিজ নিজ মাথার কাপড় খুলে ছুড়ে ফেলে দেয়। অথচ বুদ্ধিমানমাত্রই এ কথা স্বীকার করে থাকবেন যে, মাথার কাপড় খুলে ফেলা নিন্দনীয় বিষয়। এটা শিষ্টাচারপরিপন্থী। কেবল হজের সময় আল্লাহ তায়ালার সামনে দাসত্বের নিদর্শনস্বরূপ মাথা খোলা রাখা হয়।
টিকাঃ
১. সুরা আনফাল: আয়াত ৩৫
২. সুরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ৩৭
৩. সুরা লোকমান: আয়াত ১৮