📄 গান-বাজনা ও ছেমার ব্যাপারে সুফিদের মতবাদ
গ্রন্থকার বলেন, পূর্ববর্তী সুফিদের একটি জামাত তাসাওউফে নবাগতদেরকে 'ছেমা' থেকে দূরে থাকতে বলতেন। তাদের জানা ছিল—নবাগতরা এতে उत्तेजित হয়ে পড়বে। আবদুল্লাহ ইবনে সালেহ বলেন, আমাকে জুনাইদ বলেছেন, যখন তুমি মুরিদদের ছেমা শুনতে দেখো, তখন জেনে নেবে এখনো তার মধ্যে খেল-তামাশার আগ্রহ বিদ্যমান রয়েছে। মুরতায়াশ বলেন, আমি আবুল হাসান সাওরি থেকে শুনেছি, তিনি তার এক সহপাঠীকে বলেছেন, যখন তুমি মুরিদদেরকে কাসিদা, কবিতা ও গান ইত্যাদি শুনতে দেখবে এবং তাতে জোশ, উত্তেজনা ও প্রশান্তির তৃপ্তি পাবে, তখন তার কাছ থেকে কোনো ভালো বিষয়ের আশা রেখো না।
গ্রন্থকার বলেন, সুফিদের গুরুদের কথা ছিল এমনই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা খেল-তামাশার প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়ার কারণে এর বৈধতা দিতে থাকে। ফলে এর দ্বারা দু'টি মন্দ ধারার সৃষ্টি হয়। প্রথমত সাধারণ মানুষ পূর্ববর্তী সুফিদের সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে। কেননা তারা মনে করে, তারা সবাই এমনই ছিলেন। দ্বিতীয়ত সাধারণ মানুষ এ দ্বারা খেল-তামাশায় মত্ত হওয়ার প্ররোচনা পাচ্ছে। এটাকে তারা প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস পাচ্ছে। তাই তারা বলে, উনি এমন করেছেন, ইনি এমন করছেন ইত্যাদি।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, অধিকাংশ সুফির অন্তরে ছেমার প্রতি গভীর অনুরাগ দেখা যায়। এমনকি তারা কুরআন ছেড়ে এই ছেমাকেই প্রাধান্য দিতে থাকে। এ সব এজন্যই হয়েছে যে, প্রবৃত্তির তাড়না এবং মনের খায়েশের কাছে তারা পরাজিত হয়ে গেছে। আবু হাতেম সাজিস্তানী বলেন, আমি আবু নাসার সিরাজকে বলতে শুনেছি, আমাকে আমার এক বন্ধু বলেছেন, আবুল হোসাইন দরাজ বলতেন, আমি বাগদাদে ইউসুফ ইবনে হোসাইন রাযীর সাক্ষাতে গিয়ে তার ঘর সম্পর্কে জানতে চাইলাম। যার কাছেই তার সম্পর্কে জানতে চাই, সে-ই উত্তরে বলে, এই ধর্মদ্রোহী সম্পর্কে কিছু জানতে চেয়ো না। এতে আমি ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়লাম। ফলে আমি ফিরে আসার ইচ্ছা করলাম। সে রাতে একটি মসজিদে থাকার সুযোগ হলো। সেখানে মনে মনে চিন্তা করলাম, আমি এতদূর এলাম, তার সাথে দেখা না করে কী করে ফিরে যাই! এই ভাবনায় আবার তার ঠিকানার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি। এমন করে সেই আগের মসজিদে গিয়ে দেখতে পাই, এক লোক মেহরাবের কাছে রেহাল হাতে কুরআন তেলাওয়াত করছে। আমি তাকে গিয়ে সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিয়ে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি বললাম, আমি বাগদাদ থেকে আপনার সাক্ষাতে এসেছি। তিনি বললেন, তুমি কি সুললিত কণ্ঠে কিছু পড়তে পার? আমি নিম্নোক্ত কবিতাটি পড়লাম-
رأيتك تبني دائما في قطيعتي * ولو كنت ذا حزم لهدمت ما تبني
'হে প্রিয়! আমি দেখছি, তুমি আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাচ্ছ, যদি তুমি দূরে অবস্থান করো তাহলে এর ভিত্তি মূলোৎপাটন সম্ভব।'
এই কবিতা শুনে তিনি কুরআন শরিফ বন্ধ করে দিলেন এবং এমনভাবে ক্রন্দন করতে থাকলেন যে, তার দাড়ি ও কাপড়-চোপড় ভিজে যাচ্ছিল। পরে তিনি আমাকে বললেন, এখানকার অধিবাসী আমাকে ধর্মদ্রোহী বলে অপবাদ দিচ্ছে। নামাযের সময় পর্যন্ত আমি এই স্থানে বসে কুরআন পড়তে থাকি, কিন্তু কখনো আমার চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু প্রবাহিত হয় না। কিন্তু তোমার এই কবিতাটি শুনে তো আমার ওপর কিয়ামত পতিত হচ্ছে।
আবু আবদুর রহমান সালামী বলেন, আমি ওস্তাদ আবু সাহাল সালুকির জীবদ্দশায় মরুভূমিতে চলে গিয়েছিলাম। আমি ওখানে চলে যাওয়ার আগে ওস্তাদ এখানে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। প্রত্যহ তিনি জনসমাবেশে কুরআন ও খতমের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি চলে যাওয়ার পর এই সমাগম বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে লোকজন ইবনে ফারগানীর নামে কাউয়ালি এবং রাগ সংগীতের মজলিস কায়েম করে। একদিন ওস্তাদ জিজ্ঞেস করলেন, লোকজন পরস্পর কিসের যেন আলোচনা করছে। আমি বললাম, কুরআনের মজলিস উঠিয়ে সেখানে সংগীতের ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। তিনি শুনে বললেন, যে ব্যক্তি তার ওস্তাদকে এমন বলবে যে, এটা কেন হলো? সে কখনো সফল হবে না।
গ্রন্থকার বলেন, এটা সুফিদের অভ্যাস যে, তারা বলে থাকে, নিজেকে সম্পূর্ণরূপে পীরের হাওয়ালা করে দিতে হবে। অথচ এমন কেউ নেই যারা সম্পূর্ণরূপে নিজেকে সোপর্দ করে দিতে পারে। কেননা মানুষ শরীয়ত ও জ্ঞান-বুদ্ধির সাহায্যে নিজের সমুদয় সমস্যা সমাধান করে থাকে। অন্যদিকে চতুষ্পদ জন্তু তার চিৎকারের সাহায্যে নিজের সমস্যার সমাধান করে বেড়ায়।
টিকাঃ
৭. 'ছেমা' বা 'সামা' (সেমা) অর্থ 'শ্রবণ'। সাহাবি-তাবেয়িগণের যুগে সামা বলতে কুরআন শ্রবণ ও রাসুলে আকরামের জীবনী, কর্ম ও বাণী শ্রবণকেই বোঝানো হতো। এগুলোই তাঁদের মনে আল্লাহ-প্রেমের ও নবী-প্রেমের জোয়ার সৃষ্টি করত। কোনো মুসলিম কখনোই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য বা হৃদয়ে আল্লাহর প্রেম সৃষ্টি করার জন্য গান শুনতেন না। সমাজের বিলাসী ও ধার্মিক মানুষের মাঝে বিনোদন হিসেবে গান-বাজনার সীমিত প্রচলন ছিল, কিন্তু আলেমগণ তা হারাম জানতেন। ২/১ জন বিনোদন হিসেবে একে জায়েয বলার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কখনোই এ সকল কর্ম আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম বলে গণ্য হয়নি।
📄 সুফিদের গান-বাজনার বিধান
গানের যে সকল ব্যাপারে আমরা আলোকপাত করেছি যে, কিছু আলেমের মতে তা হারাম, কারও মতে মাকরুহ। সুফিদের একটি গ্রুপ মনে করে তাদের জন্য গান মুস্তাহাব। আবু আলী দাক্কাক বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য ছেমা হারাম, কেননা তাদের নফস জীবিত। যাহেদদের জন্য ছেমা মুবাহ বা বৈধ, কেননা তারা আত্যশুদ্ধির ব্যাপারে সজাগ থাকে। পক্ষান্তরে আমাদের সুফিদের জন্য ছেমা মুস্তাহাব, কেননা তাদের অন্তর জীবিত।
গ্রন্থকার বলেন, এ কথাটি পাঁচটি কারণে ভুল। যথা-
১. আবু হামেদ গাযালির সূত্রে আমরা বর্ণনা করেছি যে, ছেমা সবার জন্য বৈধ। এদিকে আবু আলী থেকে গাযালি অনেক বেশি মারেফতবিজ্ঞ।
২. নফস প্রাকৃতিক অভ্যাসের অনুসারী হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতানৈক্য নেই। মুজাহাদা দ্বারা কেবল এটুকু লাভ পাওয়া যায় যে, অভ্যাসগত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখে। যে ব্যক্তি অভ্যাস পরিবর্তন হওয়ার দাবি করে, সে একটি অসম্ভব বিষয়ের দাবিদার। কেননা এক্ষেত্রে বাধাদানকারী বিষয়টির অবর্তমানে অভ্যাস পূর্বের স্থানে ফিরে যেতে বাধ্য।
৩. ছেমা'র বৈধ-অবৈধ হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতানৈক্য আছে। কোনো আলেম শ্রোতার অভ্যাসের দিকে দৃষ্টিপাত করার অবকাশ পাননি। কেননা তারা মনে করেন, সবার অভ্যাস সমান। এখন যদি কেউ এমন দাবি করে যে, তার অভ্যাস সচরাচর মানুষের অভ্যাসের বিপরীত, তাহলে সে নিশ্চয় অসম্ভবের দাবিদার বলে সাব্যস্ত হবেন।
৪. এ ব্যাপারে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে যে, ছেমা বৈধ। কিন্তু এটাকে মুস্তাহাব বলে অভিহিত করা ইজমার বিপরীত।
৫. যার অভ্যাসে রূপান্তর ঘটেছে তার জন্য ছেমা শোনা মুবাহ বা মুস্তাহাব হওয়া আবশ্যক হয়ে যায়। এতে তার চরিত্রে বিবর্তন ঘটে এবং তাকে প্রবৃত্তির তাড়না নিবারণ করতে উৎসাহিত করে। এই আশঙ্কা না থাকলে মুবাহ বা বৈধ হওয়া যুক্তিযুক্ত। অথচ এ ব্যাপারে আমরা পূর্বে আলোচনা করে এসেছি।
📄 ছেমা ও গানের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যলাভের দাবির অসারতা
গ্রন্থকার বলেন, তাদের একটি গোষ্ঠীর ধারণা-ছেমার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়। আবু তালেব মক্কি বলেন, আমাদের কিছু মুরুব্বি বলেছেন যে, জুনাইদ রহ. বলতেন, সুফিদের মজলিসে তিনবার রহমত অবতীর্ণ হয়।
১. পানাহারের সময়। কেননা সুফিরা ক্ষুধা না লাগলে আহার করেন না।
২. যখন আমরা পরস্পর জিকির করি, কেননা সে সময় তারা সিদ্দিকীনদের মর্যাদা ও নবীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণের অবকাশ পান।
৩. ছেমার সময়। কেননা তারা 'ওজদ' এর সাথে তা শ্রবণ করে এবং তারা সত্যের সাক্ষী দিয়ে থাকে।
গ্রন্থকার বলেন, আমার মতে—এ কথা যদি জুনাইদ থেকে সহিহ সূত্রে পাপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে এটা যাহেদানা কাসীদার ছেমার ওপর নির্ভর। কেননা এটা নম্রতার উপকরণ। অন্যথায় সাওদা ও লায়লার প্রশংসার সময় যদি রহমত অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়, তাহলে এটা খুবই গর্হিত আকিদা বলে বিবেচিত হবে। জুনাইদের আমলে আজকালের মতো কবিতা-গান গাওয়া হতো না। বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তাই তুলনাও অসার। লেখক বলেন, এমন বিশ্বাস লালন করা মানুষকে কুফরীর কাছাকাছি নিয়ে যায়। কেননা সে হারাম ও মাকরুহ বিষয়কে আল্লাহর নৈকট্যের উপকরণ বলে মনে করেছে।
📄 ‘ওয়াজদ’ এর ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
গ্রন্থকার বলেন, এ সব লোক গানের আবেশে উদ্বেলিত হয়ে নাচানাচি করতে থাকে। এটাকে 'ওয়াজদ' অর্থাৎ আবেগ, উত্তেজনা, উন্মত্ততা বলা হতো। এই ছেমা বা সংগীত ও ওয়াজদ অর্থাৎ গানের আবেশে তন্ময় হয়ে নাচানাচি বা উন্মত্ততা ৫ম হিজরি শতাব্দী থেকে সুফি সাধকদের কর্মকাণ্ডের অন্যতম অংশ হয়ে যায়। সামা ব্যতিরেকে কোনো সুফি খানকা বা সুফি দরবার কল্পনা করা যেত না।
এদিকে যখন সামা সংগীতের ব্যাপক প্রচলন হয়ে গেল নেককার মানুষদের মাঝে তখন জালিয়াতগণ তাদের মেধা খরচের একটি বড় ক্ষেত্র পেয়ে গেল। তারা সামা, ওয়াজদ প্রভৃতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন হাদিস বানিয়ে প্রচার করে। গানের মজলিসে আবেগে উদ্বেলিত হয়ে অচেতন হওয়া বা নাচানাচি করাকে ইশকের বড় নিদর্শন বলে গণ্য করা হতো। জালিয়াতরা এ বিষয়ে কিছু হাদিস বানিয়ে নিয়েছিল। অথচ এটা ছিল ইবলিসের মস্ত বড় প্ররোচনা। এই দলটি প্রমাণ হিসেবে ওই হাদিসটি উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে যা আমি আবু নাসার আবদুল্লাহ ইবনে আলী সিরাজ তুসি থেকে পেয়েছি। তিনি বলেন, তারা বলে থাকে—যখ وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمَوْعِدُهُمْ أَجْمَعِينَ অর্থাৎ 'এ সকল কাফেরদের জন্য জাহান্নাম প্রতিশ্রুত”-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়, তখন হজরত সালমান ফারেসী রা. উচ্চশব্দে তালি বাজালেন। এতে তাঁর মাথার চুল পড়ে গেল। পরে তিনি তিনদিন গোপন থাকেন।
অনুরূপভাবে সুফিরা আরেকটি কথাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে যা আবু ওয়ায়েল থেকে আমি জানতে পারি। তিনি বলেন, আমরা আবদুল্লাহর সাথে কোথাও যাচ্ছিলাম। আমার সাথে রবী' ইবনে হাইসামও ছিলেন। আমরা এক কামারের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। আবদুল্লাহ দাঁড়িয়ে ওই লোহাটি দেখছিলেন, যা আগুনের মধ্যে ছিল। রবী'ও লোহা দেখছেন এবং কাঁপতে কাঁপতে তিনি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। পরে সম্মুখে গিয়ে ফোরাত নদীর তীরে এক কামারের দোকানে গেলে অগ্নির বিচ্ছুরণ দেখতে পেয়ে এই আয়াত পড়েন,
إِذَا رَ أَنَّهُمْ مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُظاً وَزَفِيراً
"দূর হতে আগুন যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা তার ক্রুদ্ধ গর্জন ও প্রচণ্ড চিৎকার শুনতে পাবে।” এ আয়াত পড়ে তিনি মূর্ছা যান। আবদুল্লাহও তার পাশে অবস্থান করেন। এভাবে যোহর নামায আদায় করেন। তখনও তার সংজ্ঞা ফেরেনি। এমনকি আসরের সময়ও তার হুঁশ ফেরেনি। মাগরিবের সময় হলে আবদুল্লাহ ঘরে ফিরে আসেন।
সুফিরা বলেন, এমন অনেক ঘটনা আছে যে, কোনো কোনো আল্লাহর বান্দা কুরআন শরিফ শুনে মৃত্যুবরণ করেন। কেউ-বা মূর্ছা যান। আবার কেউ চিৎকার করে ওঠেন। এমন ঘটনা যুহুদ তথা কৃষ্ণব্রতের কিতাবসমূহে বিস্তর রয়েছে।
উত্তর : হজরত সালমান রা. সম্পর্কে যে আলোচনা করা হয়েছে তা ভুল ও নিছক বিভ্রান্তি। এছাড়া ওই হাদিসের কোনো ভিত্তি নেই। উক্ত আয়াত মক্কায় অবতীর্ণ হয়, অথচ হজরত সালমান ফারেসী রা. মদিনায় ইসলাম গ্রহণ করেন। কোনো সাহাবি এমন ঘটনা কখনো বলেননি। বাকি রইল রবী' ইবনে হাইসামের ঘটনা। তো, এর রাবি ঈসা ইবনে সালীম 'দুর্বল' রাবি হিসেবে সাব্যস্ত। সুফিয়ান সাওরি বলেন, রবী' ইবনে হাইসামের পক্ষ থেকে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু সাহাবা বা তাবেয়িদের কারও কাছ থেকে এমন ঘটনার কথা কোথাও নেই।
গ্রন্থকার বলেন, আল্লাহ যদি তাওফিক দেন তবে জেনে নিন যে, সাহাবাদের অন্তর ছিল খুবই পরিষ্কার। তারা আবেগের আধিক্যে প্রচুর কান্নাকাটি করতেন। কোনো বিষয়ের আবেশে তন্ময় হয়ে নাচানাচি বা উন্মত্ততা কখনোই করেননি। সাবেত আমাকে হজরত আনাসের হাদিস শুনিয়েছেন: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'এরা কে যে আমাদের দীনকে তাদের সাথে গুলিয়ে ফেলে? যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে তাহলে সে নিজেকে যেন প্রকাশ করে। আর সে যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করবেন।"
হজরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা দেখেছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদেরকে ওয়াজ করেছেন। এতে ওয়াজের প্রভাবে লোকজনের কান্নার শব্দ শুনেছি। কিন্তু কাউকে পড়ে যেতে দেখিনি।'
হজরত হোসাইন ইবনে আবদুর রহমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আসমা বিনতে আবু বকর রা. এর কাছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবাদের কুরআন পড়াকালীন অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের অবস্থা তেমনই হতো যেমন আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেছেন। অথবা এমন বলেছেন, যেভাবে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে গুণান্বিত করেছেন। অর্থাৎ চোখ ভেজা ভেজা থাকত। তাঁদের শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যেত। আমি বললাম, আমাদের এখানে এমন অনেক লোক আছে, যাদের সামনে কুরআন পড়া হলে তারা বেহুঁশ হয়ে পড়েন। হজরত আসমা রা. শুনে বললেন, أعوذ بالله من الشيطان الرجيم 'আমরা আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে পানাহ চাই।'
হাসান বসরি রহ. হতে বর্ণিত। তিনি একদিন ওয়াজ করছিলেন। এক ব্যক্তি সেই ওয়াজে দীর্ঘশ্বাস ফেললে হাসান বসরি রহ. বললেন, এই দীর্ঘশ্বাস যদি আল্লাহর জন্য হয়, তবে তুমি নিজেকে প্রসিদ্ধ করলে। আর যদি গাইরুল্লাহর জন্য করে থাকো তাহলে তুমি নিজেকে ধ্বংস করে দিলে।
ফযাইল ইবনে আয়ায রহ. তাঁর পুত্রকে বলেন, যে এমন অবস্থায় কেঁপে কেঁপে পড়ে যেতেন, যদি তুমি সত্যবাদী হও তাহলে তুমি নিজেকে হাসির পাত্র বানালে। আর যদি মিথ্যাবাদী হও তাহলে তুমি নিজেকে ধ্বংস করে দিলে। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি ছেলেকে বলেছেন, হে বৎস! যদি তুমি সত্যবাদী হও তাহলে তোমার ভেতরে যা ছিল তা প্রকাশ করে দিলে। আর যদি মিথ্যাবাদী হও তাহলে আল্লাহর সাথে শরিক করলে।
টিকাঃ
১. সুরা হুজর: আয়াত ৪৩
২. সুরা ফুরকান: আয়াত ১২
৩. ইমাম যাহাবী রহ. তার 'মীযানুল ই'তিদাল' গ্রন্থে এটাকে বাতিল বলেছেন।
৪. হাদিসটির সনদ 'যঈফ'। এখানে রূহ ইবনে আতা আছেন, তিনি যঈফ রাবী।