📄 গানের ব্যাপারে চার ইমামের অভিমত
গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. অভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। সকলেই গান-বাদ্যকে হারাম বলে আখ্যায়িত করেছেন। আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, তার পিতা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলতেন, গান অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে। ইসমাঈল ইবনে ইসহাক সাকাফী রহ. বলেন, জনৈক ব্যক্তি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের কাছে কাসিদা শুনতে চাইলে তিনি বলেন, এটাকে আমি মাকরুহ মনে করি।
ইমাম মালেক রহ.-কে গান-বাদ্যের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কেবল ফাসিকরাই তা করতে পারে। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেছেন, গান-বাদ্যে লিপ্ত ব্যক্তি হলো আহমক। তিনি আরও বলেন, সর্বপ্রকার বীণা, তন্ত্রী, ঢাকঢোল, তবলা, সারেঙ্গী সবই হারাম এবং এর শ্রোতা ফাসেক। তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না।
হাম্বলী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকিহ আল্লামা আলী মারদভী লেখেন, বাদ্য ছাড়া গান মাকরুহে তাহরীমী। আর যদি বাদ্য থাকে তবে তা হারাম। ইমাম শাফেয়ি রহ. শর্তসাপেক্ষে শুধু ওলিমা অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশ আছে বলে মত দিয়েছেন। কেননা বিয়ের ঘোষণার উদ্দেশ্যে ওলিমার অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশের বর্ণনা হাদিসে রয়েছে। মনে রাখতে হবে, এখানে দফ বাজানোর উদ্দেশ্য হলো বিবাহের ঘোষণা, অন্য কিছু নয়।
টিকাঃ
৪. কুরতুবী ১৪/৫৫
৫. প্রাগুক্ত
৬. জামে তিরমিযি হাদিস : ১০৮৯; সহিহ বুখারি হাদিস : ৫১৪৭, ৫১৬২
📄 গান-বাজনা ও ছেমার ব্যাপারে সুফিদের মতবাদ
গ্রন্থকার বলেন, পূর্ববর্তী সুফিদের একটি জামাত তাসাওউফে নবাগতদেরকে 'ছেমা' থেকে দূরে থাকতে বলতেন। তাদের জানা ছিল—নবাগতরা এতে उत्तेजित হয়ে পড়বে। আবদুল্লাহ ইবনে সালেহ বলেন, আমাকে জুনাইদ বলেছেন, যখন তুমি মুরিদদের ছেমা শুনতে দেখো, তখন জেনে নেবে এখনো তার মধ্যে খেল-তামাশার আগ্রহ বিদ্যমান রয়েছে। মুরতায়াশ বলেন, আমি আবুল হাসান সাওরি থেকে শুনেছি, তিনি তার এক সহপাঠীকে বলেছেন, যখন তুমি মুরিদদেরকে কাসিদা, কবিতা ও গান ইত্যাদি শুনতে দেখবে এবং তাতে জোশ, উত্তেজনা ও প্রশান্তির তৃপ্তি পাবে, তখন তার কাছ থেকে কোনো ভালো বিষয়ের আশা রেখো না।
গ্রন্থকার বলেন, সুফিদের গুরুদের কথা ছিল এমনই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা খেল-তামাশার প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়ার কারণে এর বৈধতা দিতে থাকে। ফলে এর দ্বারা দু'টি মন্দ ধারার সৃষ্টি হয়। প্রথমত সাধারণ মানুষ পূর্ববর্তী সুফিদের সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে। কেননা তারা মনে করে, তারা সবাই এমনই ছিলেন। দ্বিতীয়ত সাধারণ মানুষ এ দ্বারা খেল-তামাশায় মত্ত হওয়ার প্ররোচনা পাচ্ছে। এটাকে তারা প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস পাচ্ছে। তাই তারা বলে, উনি এমন করেছেন, ইনি এমন করছেন ইত্যাদি।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, অধিকাংশ সুফির অন্তরে ছেমার প্রতি গভীর অনুরাগ দেখা যায়। এমনকি তারা কুরআন ছেড়ে এই ছেমাকেই প্রাধান্য দিতে থাকে। এ সব এজন্যই হয়েছে যে, প্রবৃত্তির তাড়না এবং মনের খায়েশের কাছে তারা পরাজিত হয়ে গেছে। আবু হাতেম সাজিস্তানী বলেন, আমি আবু নাসার সিরাজকে বলতে শুনেছি, আমাকে আমার এক বন্ধু বলেছেন, আবুল হোসাইন দরাজ বলতেন, আমি বাগদাদে ইউসুফ ইবনে হোসাইন রাযীর সাক্ষাতে গিয়ে তার ঘর সম্পর্কে জানতে চাইলাম। যার কাছেই তার সম্পর্কে জানতে চাই, সে-ই উত্তরে বলে, এই ধর্মদ্রোহী সম্পর্কে কিছু জানতে চেয়ো না। এতে আমি ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়লাম। ফলে আমি ফিরে আসার ইচ্ছা করলাম। সে রাতে একটি মসজিদে থাকার সুযোগ হলো। সেখানে মনে মনে চিন্তা করলাম, আমি এতদূর এলাম, তার সাথে দেখা না করে কী করে ফিরে যাই! এই ভাবনায় আবার তার ঠিকানার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি। এমন করে সেই আগের মসজিদে গিয়ে দেখতে পাই, এক লোক মেহরাবের কাছে রেহাল হাতে কুরআন তেলাওয়াত করছে। আমি তাকে গিয়ে সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিয়ে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি বললাম, আমি বাগদাদ থেকে আপনার সাক্ষাতে এসেছি। তিনি বললেন, তুমি কি সুললিত কণ্ঠে কিছু পড়তে পার? আমি নিম্নোক্ত কবিতাটি পড়লাম-
رأيتك تبني دائما في قطيعتي * ولو كنت ذا حزم لهدمت ما تبني
'হে প্রিয়! আমি দেখছি, তুমি আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাচ্ছ, যদি তুমি দূরে অবস্থান করো তাহলে এর ভিত্তি মূলোৎপাটন সম্ভব।'
এই কবিতা শুনে তিনি কুরআন শরিফ বন্ধ করে দিলেন এবং এমনভাবে ক্রন্দন করতে থাকলেন যে, তার দাড়ি ও কাপড়-চোপড় ভিজে যাচ্ছিল। পরে তিনি আমাকে বললেন, এখানকার অধিবাসী আমাকে ধর্মদ্রোহী বলে অপবাদ দিচ্ছে। নামাযের সময় পর্যন্ত আমি এই স্থানে বসে কুরআন পড়তে থাকি, কিন্তু কখনো আমার চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু প্রবাহিত হয় না। কিন্তু তোমার এই কবিতাটি শুনে তো আমার ওপর কিয়ামত পতিত হচ্ছে।
আবু আবদুর রহমান সালামী বলেন, আমি ওস্তাদ আবু সাহাল সালুকির জীবদ্দশায় মরুভূমিতে চলে গিয়েছিলাম। আমি ওখানে চলে যাওয়ার আগে ওস্তাদ এখানে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। প্রত্যহ তিনি জনসমাবেশে কুরআন ও খতমের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি চলে যাওয়ার পর এই সমাগম বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে লোকজন ইবনে ফারগানীর নামে কাউয়ালি এবং রাগ সংগীতের মজলিস কায়েম করে। একদিন ওস্তাদ জিজ্ঞেস করলেন, লোকজন পরস্পর কিসের যেন আলোচনা করছে। আমি বললাম, কুরআনের মজলিস উঠিয়ে সেখানে সংগীতের ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। তিনি শুনে বললেন, যে ব্যক্তি তার ওস্তাদকে এমন বলবে যে, এটা কেন হলো? সে কখনো সফল হবে না।
গ্রন্থকার বলেন, এটা সুফিদের অভ্যাস যে, তারা বলে থাকে, নিজেকে সম্পূর্ণরূপে পীরের হাওয়ালা করে দিতে হবে। অথচ এমন কেউ নেই যারা সম্পূর্ণরূপে নিজেকে সোপর্দ করে দিতে পারে। কেননা মানুষ শরীয়ত ও জ্ঞান-বুদ্ধির সাহায্যে নিজের সমুদয় সমস্যা সমাধান করে থাকে। অন্যদিকে চতুষ্পদ জন্তু তার চিৎকারের সাহায্যে নিজের সমস্যার সমাধান করে বেড়ায়।
টিকাঃ
৭. 'ছেমা' বা 'সামা' (সেমা) অর্থ 'শ্রবণ'। সাহাবি-তাবেয়িগণের যুগে সামা বলতে কুরআন শ্রবণ ও রাসুলে আকরামের জীবনী, কর্ম ও বাণী শ্রবণকেই বোঝানো হতো। এগুলোই তাঁদের মনে আল্লাহ-প্রেমের ও নবী-প্রেমের জোয়ার সৃষ্টি করত। কোনো মুসলিম কখনোই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য বা হৃদয়ে আল্লাহর প্রেম সৃষ্টি করার জন্য গান শুনতেন না। সমাজের বিলাসী ও ধার্মিক মানুষের মাঝে বিনোদন হিসেবে গান-বাজনার সীমিত প্রচলন ছিল, কিন্তু আলেমগণ তা হারাম জানতেন। ২/১ জন বিনোদন হিসেবে একে জায়েয বলার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কখনোই এ সকল কর্ম আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম বলে গণ্য হয়নি।
📄 সুফিদের গান-বাজনার বিধান
গানের যে সকল ব্যাপারে আমরা আলোকপাত করেছি যে, কিছু আলেমের মতে তা হারাম, কারও মতে মাকরুহ। সুফিদের একটি গ্রুপ মনে করে তাদের জন্য গান মুস্তাহাব। আবু আলী দাক্কাক বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য ছেমা হারাম, কেননা তাদের নফস জীবিত। যাহেদদের জন্য ছেমা মুবাহ বা বৈধ, কেননা তারা আত্যশুদ্ধির ব্যাপারে সজাগ থাকে। পক্ষান্তরে আমাদের সুফিদের জন্য ছেমা মুস্তাহাব, কেননা তাদের অন্তর জীবিত।
গ্রন্থকার বলেন, এ কথাটি পাঁচটি কারণে ভুল। যথা-
১. আবু হামেদ গাযালির সূত্রে আমরা বর্ণনা করেছি যে, ছেমা সবার জন্য বৈধ। এদিকে আবু আলী থেকে গাযালি অনেক বেশি মারেফতবিজ্ঞ।
২. নফস প্রাকৃতিক অভ্যাসের অনুসারী হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতানৈক্য নেই। মুজাহাদা দ্বারা কেবল এটুকু লাভ পাওয়া যায় যে, অভ্যাসগত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখে। যে ব্যক্তি অভ্যাস পরিবর্তন হওয়ার দাবি করে, সে একটি অসম্ভব বিষয়ের দাবিদার। কেননা এক্ষেত্রে বাধাদানকারী বিষয়টির অবর্তমানে অভ্যাস পূর্বের স্থানে ফিরে যেতে বাধ্য।
৩. ছেমা'র বৈধ-অবৈধ হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতানৈক্য আছে। কোনো আলেম শ্রোতার অভ্যাসের দিকে দৃষ্টিপাত করার অবকাশ পাননি। কেননা তারা মনে করেন, সবার অভ্যাস সমান। এখন যদি কেউ এমন দাবি করে যে, তার অভ্যাস সচরাচর মানুষের অভ্যাসের বিপরীত, তাহলে সে নিশ্চয় অসম্ভবের দাবিদার বলে সাব্যস্ত হবেন।
৪. এ ব্যাপারে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে যে, ছেমা বৈধ। কিন্তু এটাকে মুস্তাহাব বলে অভিহিত করা ইজমার বিপরীত।
৫. যার অভ্যাসে রূপান্তর ঘটেছে তার জন্য ছেমা শোনা মুবাহ বা মুস্তাহাব হওয়া আবশ্যক হয়ে যায়। এতে তার চরিত্রে বিবর্তন ঘটে এবং তাকে প্রবৃত্তির তাড়না নিবারণ করতে উৎসাহিত করে। এই আশঙ্কা না থাকলে মুবাহ বা বৈধ হওয়া যুক্তিযুক্ত। অথচ এ ব্যাপারে আমরা পূর্বে আলোচনা করে এসেছি।
📄 ছেমা ও গানের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যলাভের দাবির অসারতা
গ্রন্থকার বলেন, তাদের একটি গোষ্ঠীর ধারণা-ছেমার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়। আবু তালেব মক্কি বলেন, আমাদের কিছু মুরুব্বি বলেছেন যে, জুনাইদ রহ. বলতেন, সুফিদের মজলিসে তিনবার রহমত অবতীর্ণ হয়।
১. পানাহারের সময়। কেননা সুফিরা ক্ষুধা না লাগলে আহার করেন না।
২. যখন আমরা পরস্পর জিকির করি, কেননা সে সময় তারা সিদ্দিকীনদের মর্যাদা ও নবীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণের অবকাশ পান।
৩. ছেমার সময়। কেননা তারা 'ওজদ' এর সাথে তা শ্রবণ করে এবং তারা সত্যের সাক্ষী দিয়ে থাকে।
গ্রন্থকার বলেন, আমার মতে—এ কথা যদি জুনাইদ থেকে সহিহ সূত্রে পাপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে এটা যাহেদানা কাসীদার ছেমার ওপর নির্ভর। কেননা এটা নম্রতার উপকরণ। অন্যথায় সাওদা ও লায়লার প্রশংসার সময় যদি রহমত অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়, তাহলে এটা খুবই গর্হিত আকিদা বলে বিবেচিত হবে। জুনাইদের আমলে আজকালের মতো কবিতা-গান গাওয়া হতো না। বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তাই তুলনাও অসার। লেখক বলেন, এমন বিশ্বাস লালন করা মানুষকে কুফরীর কাছাকাছি নিয়ে যায়। কেননা সে হারাম ও মাকরুহ বিষয়কে আল্লাহর নৈকট্যের উপকরণ বলে মনে করেছে।