📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 গান-বাজনা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে প্রমাণাদি

📄 গান-বাজনা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে প্রমাণাদি


কুরআন: আসলে নাচ-গানের ক্ষতি এত বেশি যে তা নাজায়েয হওয়ার জন্য আলাদা কোনো প্রমাণের দরকার পড়ে না। তদুপরি মহান আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু ভাষ্য থেকে তা হারাম হওয়া প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهُوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ
'আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ওইগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব।"

বেশির ভাগ তাফসিরকারক 'লাহওয়াল হাদিস' বলতে গানকে বুঝিয়েছেন।' হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, তা গান। ইমাম হাসান বসরি রহ. বলেন, তা গান ও বাদ্য সম্পর্কে নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সুরা নজমে আরও বলেন,
أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ * وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ * وَأَنتُمْ سَامِدُونَ
'তোমরা কি এ কথায় বিস্ময়বোধ করছ? আর হাসছ এবং কাঁদছ না? আর তোমরা তো গাফিল।”

যেমন ইবনে জারির আততাবারি ইকরামা হতে এবং তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, এখানে আয়াতে সামেদুন অর্থ গান-বাজনা। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারীমে ইবলিসকে সম্বোধন করে বলেন, 'তোমার কণ্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পার প্ররোচিত করো, তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ো তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে।

এখানে ইবলিসের আওয়াজ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, গান। এতেও প্রমাণিত হয়, গান হারাম। মুজাহিদ বলেন, ইবলিসের আওয়াজ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো 'গান-বাজনা।' কুরআন মাজিদের অন্য আয়াতে আছে, ইবলিস-শয়তান আদম সন্তানকে ধোঁকা দেওয়ার আরজি পেশ করলে আল্লাহ তায়ালা ইবলিসকে বললেন,
وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتِكَ
'তোমার কণ্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পার প্ররোচিত করো।"

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে সকল বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তা-ই ইবলিসের আওয়াজ। বিখ্যাত তাবেয়ি মুজাহিদ রহ. বলেন, ইবলিসের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে।

বস্তুত গান-বাজনার ক্ষতিকর প্রভাব এত বেশি যে, তা নাজায়েয হওয়ার জন্য আলাদা কোনো দলীল খোঁজার প্রয়োজন পড়ে না। এতৎসত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বহু হাদিসের মাধ্যমে তা প্রমাণিত।

সুন্নাহ : বিখ্যাত তাবেয়ি হজরত নাফে' রহ. থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার চলার পথে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বাঁশির আওয়াজ শুনলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দুই কানে আঙ্গুল দিলেন। কিছুদূর গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে নাফে'! এখনো কি আওয়াজ শুনছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। অতঃপর আমি যখন বললাম, এখন আর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না তখন তিনি কান থেকে আঙ্গুল সরালেন এবং বললেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলার পথে বাঁশির আওয়াজ শুনে এমনই করেছিলেন।

বাজনাদার নুপুর ও ঘুঙুরের আওয়াজও সাহাবায়ে কেরাম বরদাশত করতেন না। তাহলে গান ও বাদ্যযন্ত্রের প্রশ্ন কি অবান্তর নয়? নাসাঈ ও সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত আছে, একদিন হজরত আয়েশা রা.-এর নিকট বাজনাদার নুপুর পরে কোনো বালিকা আসলে আয়েশা রা. বললেন, খবরদার! তা কেটে না ফেলা পর্যন্ত আমার ঘরে প্রবেশ করবে না। অতঃপর তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ঘরে ঘণ্টি থাকে সেই ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।' মৃদু আওয়াজের ঘণ্টি-ঘুঙুরের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আধুনিক সুরেলা বাদ্যযন্ত্রের বিধান কী হবে তা খুব সহজেই বোঝা যায়। গান-গায়িকা এবং এর ব্যবসা ও চর্চাকে হারাম আখ্যায়িত করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
لاَ تَبيعُوا الْقَيْنَاتِ وَلاَ تَشْتَرُوهُنَّ وَلاَ تُعَلِّمُوهُنَّ وَلاَ خَيْرَ فِي تِجَارَةٍ فِيهِنَّ وَشَمْنَهُنَ حَرَام
'তোমরা গায়িকা (দাসী) ক্রয়-বিক্রয় কোরো না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। আর এসবের ব্যবসায় কোনো কল্যাণ নেই। জেনে রেখো, এর প্রাপ্ত মূল্য হারাম।'

لَيَشْرَبَنَ أُنَاسٌ مِنْ أُمَّتِى الْخَمْرَ يُسَمُّونَهَا بِغَيْرِ اسْمِهَا وَتُضْرَبُ عَلَى رُءُوسِهِمُ الْمَعَازِفُ يَخْسِفُ اللهُ بِهِمُ الْأَرْضَ وَيَجْعَلُ مِنْهُمْ قِرَدَةً وَخَنَازِيرَ.
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমণীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে জমিনে ধসিয়ে দেবেন।'

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, الْغِنَاءُ يُنْبِتُ النِّفَاقَ فِي الْقَلْبِ كَمَا يُنْبِتُ الْمَاءُ الزِّرْعَ
পানি যেমন (ভূমিতে) তৃণলতা উৎপন্ন করে তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।

উপরোক্ত বাণীর সত্যতা এখন দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার। গান-বাজনার ব্যাপক বিস্তারের ফলে মানুষের অন্তরে এই পরিমাণ নিফাক সৃষ্টি হয়েছে যে, সাহাবিদের ইসলামকে এ যুগে অচল মনে করা হচ্ছে এবং গান-বাদ্য, নারী-পুরুষের মেলামেশা ইত্যাদিকে হালাল মনে করা হচ্ছে।

টিকাঃ
১. সুরা লোকমান: আয়াত ৬
২. আল্লাহ তাআলা মক্কাতেই অর্থাৎ ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় গান-বাদ্যকে হারাম ঘোষণা করেন। এতেই অনুমেয় যে গান একজন মুসলমানের জন্য কতবড় ক্ষতিকর এবং বান্দার ওপর তার প্রভাব যে কত মারাত্মক। আল্লাহ তাআলা সুরা নজমে ও সুরা লোকমানে গান হারাম হওয়ার বিষয়ে ঘোষণা দেন। আর সুরাদ্বয় অবশ্যই মক্কি সুরা।
৩. সুরা নজম: আয়াত ৫৯-৬১
৪. সুরা ইসরা: আয়াত ৬৪
৫. সুরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ৬৪
৬. মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৪৫৩৫; সুনানে আবু দাউদ হাদিস: ৪৯২৪। বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ. থেকেও এমন একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে।-ইবনে মাজাহ হাদিস: ১৯০১
৭. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪২৩১; সুনানে নাসাঈ, হাদিস: ৫২৩৭ সহিহ মুসলিমে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ঘণ্টি, বাজা, ঘুঙুর হলো শয়তানের বাদ্যযন্ত্র। -সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১১४
১. জামে তিরমিযি: হাদিস নং ১২৮২; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ২১৬৮
২. সুনানে ইবনে মাজাহ হাদিস: ৪০২০; সহিহ ইবনে হিব্বান হাদিস: ৬৭৫৮
৩. তাফসীরে কুরতুবী ১৪/৫২

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 গানের ব্যাপারে চার ইমামের অভিমত

📄 গানের ব্যাপারে চার ইমামের অভিমত


গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. অভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। সকলেই গান-বাদ্যকে হারাম বলে আখ্যায়িত করেছেন। আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, তার পিতা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলতেন, গান অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে। ইসমাঈল ইবনে ইসহাক সাকাফী রহ. বলেন, জনৈক ব্যক্তি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের কাছে কাসিদা শুনতে চাইলে তিনি বলেন, এটাকে আমি মাকরুহ মনে করি।

ইমাম মালেক রহ.-কে গান-বাদ্যের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কেবল ফাসিকরাই তা করতে পারে। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেছেন, গান-বাদ্যে লিপ্ত ব্যক্তি হলো আহমক। তিনি আরও বলেন, সর্বপ্রকার বীণা, তন্ত্রী, ঢাকঢোল, তবলা, সারেঙ্গী সবই হারাম এবং এর শ্রোতা ফাসেক। তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না।

হাম্বলী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকিহ আল্লামা আলী মারদভী লেখেন, বাদ্য ছাড়া গান মাকরুহে তাহরীমী। আর যদি বাদ্য থাকে তবে তা হারাম। ইমাম শাফেয়ি রহ. শর্তসাপেক্ষে শুধু ওলিমা অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশ আছে বলে মত দিয়েছেন। কেননা বিয়ের ঘোষণার উদ্দেশ্যে ওলিমার অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশের বর্ণনা হাদিসে রয়েছে। মনে রাখতে হবে, এখানে দফ বাজানোর উদ্দেশ্য হলো বিবাহের ঘোষণা, অন্য কিছু নয়।

টিকাঃ
৪. কুরতুবী ১৪/৫৫
৫. প্রাগুক্ত
৬. জামে তিরমিযি হাদিস : ১০৮৯; সহিহ বুখারি হাদিস : ৫১৪৭, ৫১৬২

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 গান-বাজনা ও ছেমার ব্যাপারে সুফিদের মতবাদ

📄 গান-বাজনা ও ছেমার ব্যাপারে সুফিদের মতবাদ


গ্রন্থকার বলেন, পূর্ববর্তী সুফিদের একটি জামাত তাসাওউফে নবাগতদেরকে 'ছেমা' থেকে দূরে থাকতে বলতেন। তাদের জানা ছিল—নবাগতরা এতে उत्तेजित হয়ে পড়বে। আবদুল্লাহ ইবনে সালেহ বলেন, আমাকে জুনাইদ বলেছেন, যখন তুমি মুরিদদের ছেমা শুনতে দেখো, তখন জেনে নেবে এখনো তার মধ্যে খেল-তামাশার আগ্রহ বিদ্যমান রয়েছে। মুরতায়াশ বলেন, আমি আবুল হাসান সাওরি থেকে শুনেছি, তিনি তার এক সহপাঠীকে বলেছেন, যখন তুমি মুরিদদেরকে কাসিদা, কবিতা ও গান ইত্যাদি শুনতে দেখবে এবং তাতে জোশ, উত্তেজনা ও প্রশান্তির তৃপ্তি পাবে, তখন তার কাছ থেকে কোনো ভালো বিষয়ের আশা রেখো না।

গ্রন্থকার বলেন, সুফিদের গুরুদের কথা ছিল এমনই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা খেল-তামাশার প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়ার কারণে এর বৈধতা দিতে থাকে। ফলে এর দ্বারা দু'টি মন্দ ধারার সৃষ্টি হয়। প্রথমত সাধারণ মানুষ পূর্ববর্তী সুফিদের সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে। কেননা তারা মনে করে, তারা সবাই এমনই ছিলেন। দ্বিতীয়ত সাধারণ মানুষ এ দ্বারা খেল-তামাশায় মত্ত হওয়ার প্ররোচনা পাচ্ছে। এটাকে তারা প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস পাচ্ছে। তাই তারা বলে, উনি এমন করেছেন, ইনি এমন করছেন ইত্যাদি।

গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, অধিকাংশ সুফির অন্তরে ছেমার প্রতি গভীর অনুরাগ দেখা যায়। এমনকি তারা কুরআন ছেড়ে এই ছেমাকেই প্রাধান্য দিতে থাকে। এ সব এজন্যই হয়েছে যে, প্রবৃত্তির তাড়না এবং মনের খায়েশের কাছে তারা পরাজিত হয়ে গেছে। আবু হাতেম সাজিস্তানী বলেন, আমি আবু নাসার সিরাজকে বলতে শুনেছি, আমাকে আমার এক বন্ধু বলেছেন, আবুল হোসাইন দরাজ বলতেন, আমি বাগদাদে ইউসুফ ইবনে হোসাইন রাযীর সাক্ষাতে গিয়ে তার ঘর সম্পর্কে জানতে চাইলাম। যার কাছেই তার সম্পর্কে জানতে চাই, সে-ই উত্তরে বলে, এই ধর্মদ্রোহী সম্পর্কে কিছু জানতে চেয়ো না। এতে আমি ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়লাম। ফলে আমি ফিরে আসার ইচ্ছা করলাম। সে রাতে একটি মসজিদে থাকার সুযোগ হলো। সেখানে মনে মনে চিন্তা করলাম, আমি এতদূর এলাম, তার সাথে দেখা না করে কী করে ফিরে যাই! এই ভাবনায় আবার তার ঠিকানার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি। এমন করে সেই আগের মসজিদে গিয়ে দেখতে পাই, এক লোক মেহরাবের কাছে রেহাল হাতে কুরআন তেলাওয়াত করছে। আমি তাকে গিয়ে সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিয়ে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি বললাম, আমি বাগদাদ থেকে আপনার সাক্ষাতে এসেছি। তিনি বললেন, তুমি কি সুললিত কণ্ঠে কিছু পড়তে পার? আমি নিম্নোক্ত কবিতাটি পড়লাম-
رأيتك تبني دائما في قطيعتي * ولو كنت ذا حزم لهدمت ما تبني
'হে প্রিয়! আমি দেখছি, তুমি আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাচ্ছ, যদি তুমি দূরে অবস্থান করো তাহলে এর ভিত্তি মূলোৎপাটন সম্ভব।'

এই কবিতা শুনে তিনি কুরআন শরিফ বন্ধ করে দিলেন এবং এমনভাবে ক্রন্দন করতে থাকলেন যে, তার দাড়ি ও কাপড়-চোপড় ভিজে যাচ্ছিল। পরে তিনি আমাকে বললেন, এখানকার অধিবাসী আমাকে ধর্মদ্রোহী বলে অপবাদ দিচ্ছে। নামাযের সময় পর্যন্ত আমি এই স্থানে বসে কুরআন পড়তে থাকি, কিন্তু কখনো আমার চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু প্রবাহিত হয় না। কিন্তু তোমার এই কবিতাটি শুনে তো আমার ওপর কিয়ামত পতিত হচ্ছে।

আবু আবদুর রহমান সালামী বলেন, আমি ওস্তাদ আবু সাহাল সালুকির জীবদ্দশায় মরুভূমিতে চলে গিয়েছিলাম। আমি ওখানে চলে যাওয়ার আগে ওস্তাদ এখানে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। প্রত্যহ তিনি জনসমাবেশে কুরআন ও খতমের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি চলে যাওয়ার পর এই সমাগম বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে লোকজন ইবনে ফারগানীর নামে কাউয়ালি এবং রাগ সংগীতের মজলিস কায়েম করে। একদিন ওস্তাদ জিজ্ঞেস করলেন, লোকজন পরস্পর কিসের যেন আলোচনা করছে। আমি বললাম, কুরআনের মজলিস উঠিয়ে সেখানে সংগীতের ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। তিনি শুনে বললেন, যে ব্যক্তি তার ওস্তাদকে এমন বলবে যে, এটা কেন হলো? সে কখনো সফল হবে না।

গ্রন্থকার বলেন, এটা সুফিদের অভ্যাস যে, তারা বলে থাকে, নিজেকে সম্পূর্ণরূপে পীরের হাওয়ালা করে দিতে হবে। অথচ এমন কেউ নেই যারা সম্পূর্ণরূপে নিজেকে সোপর্দ করে দিতে পারে। কেননা মানুষ শরীয়ত ও জ্ঞান-বুদ্ধির সাহায্যে নিজের সমুদয় সমস্যা সমাধান করে থাকে। অন্যদিকে চতুষ্পদ জন্তু তার চিৎকারের সাহায্যে নিজের সমস্যার সমাধান করে বেড়ায়।

টিকাঃ
৭. 'ছেমা' বা 'সামা' (সেমা) অর্থ 'শ্রবণ'। সাহাবি-তাবেয়িগণের যুগে সামা বলতে কুরআন শ্রবণ ও রাসুলে আকরামের জীবনী, কর্ম ও বাণী শ্রবণকেই বোঝানো হতো। এগুলোই তাঁদের মনে আল্লাহ-প্রেমের ও নবী-প্রেমের জোয়ার সৃষ্টি করত। কোনো মুসলিম কখনোই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য বা হৃদয়ে আল্লাহর প্রেম সৃষ্টি করার জন্য গান শুনতেন না। সমাজের বিলাসী ও ধার্মিক মানুষের মাঝে বিনোদন হিসেবে গান-বাজনার সীমিত প্রচলন ছিল, কিন্তু আলেমগণ তা হারাম জানতেন। ২/১ জন বিনোদন হিসেবে একে জায়েয বলার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কখনোই এ সকল কর্ম আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম বলে গণ্য হয়নি।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সুফিদের গান-বাজনার বিধান

📄 সুফিদের গান-বাজনার বিধান


গানের যে সকল ব্যাপারে আমরা আলোকপাত করেছি যে, কিছু আলেমের মতে তা হারাম, কারও মতে মাকরুহ। সুফিদের একটি গ্রুপ মনে করে তাদের জন্য গান মুস্তাহাব। আবু আলী দাক্কাক বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য ছেমা হারাম, কেননা তাদের নফস জীবিত। যাহেদদের জন্য ছেমা মুবাহ বা বৈধ, কেননা তারা আত্যশুদ্ধির ব্যাপারে সজাগ থাকে। পক্ষান্তরে আমাদের সুফিদের জন্য ছেমা মুস্তাহাব, কেননা তাদের অন্তর জীবিত।

গ্রন্থকার বলেন, এ কথাটি পাঁচটি কারণে ভুল। যথা-
১. আবু হামেদ গাযালির সূত্রে আমরা বর্ণনা করেছি যে, ছেমা সবার জন্য বৈধ। এদিকে আবু আলী থেকে গাযালি অনেক বেশি মারেফতবিজ্ঞ।
২. নফস প্রাকৃতিক অভ্যাসের অনুসারী হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতানৈক্য নেই। মুজাহাদা দ্বারা কেবল এটুকু লাভ পাওয়া যায় যে, অভ্যাসগত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখে। যে ব্যক্তি অভ্যাস পরিবর্তন হওয়ার দাবি করে, সে একটি অসম্ভব বিষয়ের দাবিদার। কেননা এক্ষেত্রে বাধাদানকারী বিষয়টির অবর্তমানে অভ্যাস পূর্বের স্থানে ফিরে যেতে বাধ্য।
৩. ছেমা'র বৈধ-অবৈধ হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতানৈক্য আছে। কোনো আলেম শ্রোতার অভ্যাসের দিকে দৃষ্টিপাত করার অবকাশ পাননি। কেননা তারা মনে করেন, সবার অভ্যাস সমান। এখন যদি কেউ এমন দাবি করে যে, তার অভ্যাস সচরাচর মানুষের অভ্যাসের বিপরীত, তাহলে সে নিশ্চয় অসম্ভবের দাবিদার বলে সাব্যস্ত হবেন।
৪. এ ব্যাপারে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে যে, ছেমা বৈধ। কিন্তু এটাকে মুস্তাহাব বলে অভিহিত করা ইজমার বিপরীত।
৫. যার অভ্যাসে রূপান্তর ঘটেছে তার জন্য ছেমা শোনা মুবাহ বা মুস্তাহাব হওয়া আবশ্যক হয়ে যায়। এতে তার চরিত্রে বিবর্তন ঘটে এবং তাকে প্রবৃত্তির তাড়না নিবারণ করতে উৎসাহিত করে। এই আশঙ্কা না থাকলে মুবাহ বা বৈধ হওয়া যুক্তিযুক্ত। অথচ এ ব্যাপারে আমরা পূর্বে আলোচনা করে এসেছি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00