📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 উল্লেখিত কর্মকাণ্ডের অসারতা বিষয়ক প্রমাণপঞ্জি

📄 উল্লেখিত কর্মকাণ্ডের অসারতা বিষয়ক প্রমাণপঞ্জি


গ্রন্থকার বলেন, সাহাল ইবনে আবদুল্লাহর যে রীতি উপরে বর্ণনা করা হয়েছে, তা শরিয়াসমর্থিত নয়। কেননা সে তার ধারণক্ষমতার বাইরের বস্তুকে নিজের জন্য জরুরি মনে করে নিয়েছে। এছাড়া আল্লাহ তায়ালা রিযিকস্বরূপ মানুষকে গম দ্বারা সম্মানিত করেছেন। এর খড়কুটো চতুষ্পদ জন্তুর জন্য নির্ধারণ করেছেন। অতএব মানুষের জন্য খড়কুটো ভক্ষণ করে জীব-জন্তুর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বেমানান। আবু হামেদ গাযালি রহ. সাহাল ইবনে আবদুল্লাহ থেকে তার মতামত তুলে ধরে বলেন, ক্ষুধার তীব্রতায় যে ব্যক্তি দুর্বল হয়েছে তার বসে নামায পড়া ওই ব্যক্তির দাঁড়িয়ে নামায থেকে উত্তম, যে খাদ্য গ্রহণের কারণে দাঁড়াতে পেরেছে।

গ্রন্থকার বলেন, উপরোক্ত মন্তব্য সম্পূর্ণ ভুল। আহার করে যদি দাঁড়ানো সম্ভব হয়, তাহলে তার আহার করাও ইবাদত হিসেবে গণ্য। কেননা আহার করলে মানুষ ইবাদত করতে সক্ষম হয়। কেউ যদি খাদ্য গ্রহণে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও আহার করা থেকে বিরত থাকার দরুন ক্ষুধার যন্ত্রণায় বসে নামায পড়ে, তাহলে তার পানাহার থেকে বিরত থাকা ফরয ছেড়ে দেয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই খাদ্য গ্রহণে সক্ষম থাকলে, তা পরিহার করা শরিয়তে নিষেধ। ক্ষুধার তীব্রতায় মানুষের জন্য মৃত প্রাণী ভক্ষণ ত্যাগ করাও জায়েয নয়। সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে হালাল খাবার ত্যাগ করা তার জন্য কী করে বৈধ হতে পারে?

জাফর হাদ্দাদ বলেছে—'ইলম ও ইয়াকিনের শ্রেষ্ঠত্বের পরীক্ষা চালাচ্ছি। দেখব কোন্টি জয়ী হয়। যে জয়ী হবে, আমি তারই অনুসরণ করব'—এটা মারাত্মক মূর্খতাজনিত কথা। কেননা ইলম ও ইয়াকিনের মাঝে কোনো ব্যবধান নেই। ইলমের সর্বোচ্চ স্তরের নামই 'ইয়াকিন'। আর ক্ষুধার্ত হলে খাবার-দাবার বর্জনের কথা ইলম বা ইয়াকিনের কোথাও নেই। এরা এমন দল—যারা নিজেদের আবিষ্কৃত বিষয়ে কঠিনকে বেছে নিয়েছে। এদের কঠোরতা কুরাইশদের মতো। এই কঠোরতার কারণেই কুরাইশদেরকে ‘হুমস’ বলা হয়। তারা মৌলিক বিষয়কে অস্বীকার করে শাখাগত বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করেছে। যুন্নুন মিসরির কথা—'তোমার লবণ কি পেষা ও চূর্ণিত? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তুমি সফল হতে পারবে না'—এটা নিতান্তই অমূলক মন্তব্য। কেননা শরিয়তে যা বৈধ, তাকে কীভাবে নিন্দার চোখে দেখা যায়? এছাড়া যবের ছাতু খেয়ে যে দিনাতিপাত করে, সেটা তো মানুষের শরীরে কুলানজা রোগ সৃষ্টির কারণ। যে ব্যক্তি বলে, মধু দ্বারা মাখন খাওয়া অপচয়—তার এ কথাকে শরিয়ত সমর্থন করে না। কেননা এ বিষয়ে শরিয়তে অনুমতি রয়েছে। সহিহ সনদে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত আছে:
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَانَ يَأْكُلُ الْقِنَّاءَ بِالرُّطَبِ তিনি খেজুর দ্বারা শশা খেতেন।”
كَانَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم يُحِبُّ الحَلْوَاءَ وَالعَسَلَ 'মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য ও মধু খেতে ভালোবাসতেন।"

সাহাল ইবনে আবদুল্লাহর কথা—'আমি আপন জ্ঞান, মারেফত ও শক্তিকে সাত ভাগ করি'—তার এ কাজ নিন্দনীয়। কেননা তা শরীয়তসমর্থিত নয়; বরং তা হারামের কাছাকাছি। কেননা এটা নিজের প্রতি জুলুমের নামান্তর, এতে দেহের হক আদায় হয় না। আবু আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ বলেছেন, 'আমি আজ চল্লিশ বছর যাবৎ এমন অবস্থায় উপনীত হওয়ার আগে খাদ্য গ্রহণ করি না, যে অবস্থায় উপনীত হলে শরিয়ত মৃত প্রাণী খাওয়ার অনুমতি দেয়'-ইসলাম এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে না। অদ্ভুত ও বিকৃত চিন্তার কারণে সে এমনটি করা দুঃসাহস পেয়েছে। বৈধ খাবার উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তা ত্যাগ করা জুলুমের নামান্তর। আবু ইয়াযিদ বলেছেন, 'যিকিরই আমাদের খাদ্য'—এটি তার বানোয়াট মতবাদ। কেননা খাবারের মুখাপেক্ষী করেই আল্লাহ তায়ালা দেহকে সৃষ্টি করেছেন। এমনকি দোযখবাসী দোযখের ভেতরে খাবারের মুখাপেক্ষী হবে এবং খাদ্যের সন্ধান করবে। ওপরের ঘটনায় দীর্ঘদিন ক্ষুধার্ত থাকার পর তরমুজের খোসা খাওয়ার ওপর আবুল হাসান নাসিবী নিন্দা ও হঠকারী সিদ্ধান্ত শরিয়ত সমর্থন করে না। যে ব্যক্তি সাতদিন খাবার-দাবার থেকে দূরে থেকেছেন-ইসলাম সেটাকেও সমর্থন করে না। তদ্রূপ শিঙ্গা লাগানোর সময় যে ব্যক্তি অঙ্গীকার করেছে যে, আমি খাব না, ফলে সে দুর্বল হয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়েছে-তার এহেন কর্মকাণ্ডকেও শরিয়ত নিন্দা জানায়। অনুরূপভাবে যে তাকে বলেছে, 'শাবাশ, এ অবস্থার ওপরই অটল থাকো, তাহলে নাজাত পাবে।' তার এ কথা মারাত্মক ভ্রষ্টতা। কেননা এমন পরিস্থিতিতে তার উচিত ছিল, তাকে আহার করানো, যদিও তা রমযান মাস হোক। কেননা শরিয়তের বিধানমতে, যে ব্যক্তি কয়েকদিন রোযা রাখার ফলে দুর্বল হয়েছে এবং শিঙ্গা লাগানোর পর চৈতন্যশক্তি লোপ পেয়েছে, তার জন্য রোযা রাখা বৈধ নয়। হাদিসে আছে: হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'যে ব্যক্তি রমযানে ভীষণ ক্লান্ত হবে, সে যদি রোযা না ভাঙ্গে এবং সে কারণে তার মৃত্যু ঘটে, তাহলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'

গ্রন্থকার বলেন, আরেকটি বিশুদ্ধ সনদেও আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'যে ব্যক্তি রমযানে ভীষণ ক্লান্ত হবে, সে যদি রোযা না ভাঙ্গে এবং সে কারণে তার মৃত্যু ঘটে, তাহলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'

গ্রন্থকার বলেন, ইবনে খাফিফের অল্প আহারের ঘটনা শরিয়তের দৃষ্টিতে খুবই নিন্দনীয় কাজ। শরিয়তের বিষয়ে অজ্ঞ ব্যক্তিরা এমন অমূলক মন্তব্য করতে পারে। গোশত ভক্ষণ থেকে বিরত থাকা হিন্দু ও বৌদ্ধদের কাজ—যারা প্রাণী হত্যা অবৈধ মনে করে। অথচ কোন খাবার মানুষের জন্য কল্যাণকর, সে বিষয়ে আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। তাই মানুষের শরীরকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি গোশত ভক্ষণ হালাল করেছেন। হাদিসে আছে: 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোশত খেতেন এবং ছাগলের রান পছন্দ করতেন।"
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আয়েশা রা. এর ঘরে প্রবেশ করলে তাঁর সামনে ঘরের স্বাভাবিক খাবার পেশ করা হলে তিনি বললেন, আমি তো ঘরের পাতিল থেকে গোশতের ঘ্রাণ পাচ্ছি।'

হযরত হাসান বসরি রহ. প্রতিদিন গোশত কিনতেন। আমাদের পূর্বসূরি মনীষীগণ এমনই ছিলেন। তবে যাঁরা তাঁদের মাঝে দরিদ্র ছিলেন এবং অভাবের কারণে গোশত খেতে পারতেন না—তাঁদের কথা ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে উষ্ণতা, শীতলতা, শুষ্কতা ও আর্দ্রতার মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। রক্ত, কফ, হলুদপিত্ত ও কালোপিত্তের ভারসাম্যের ওপর তার সুস্থতা নির্ভরশীল করেছেন। তাই শরীরের কোনো দেহরস বৃদ্ধি পেলে শরীর এমন খাদ্যের মুখাপেক্ষী হবে, যা বেড়ে যাওয়া দেহরসকে নিয়ন্ত্রণে আনবে। সুতরাং শরীর কোনো খাদ্যের প্রয়োজন অনুভব করলে তা তাকে না দেয়া শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করার শামিল। আল্লাহর সৃষ্টি-প্রকৃতি এটা কামনা করে না। এটা শরিয়ত ও বিবেকবর্জিত কাজ।
***

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫৪৪০, ৫৪৪৭, ৫৪৪৯, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২০৪৩
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫৪৩১, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৪৭৪
২. হাদিসটির সনদ দুর্বল। তারিখে বাগদাদ: ১০/২৭০।
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৩৪০
৪. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫০৯৭

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সুফিবাদ ও ক্ষুধা

📄 সুফিবাদ ও ক্ষুধা


গ্রন্থকার বলেন, সুফিরা শুধু অল্পবয়স্ক ও তাসাওউফে নবীন শিক্ষানবীশদেরকে কম খাওয়ার নির্দেশ প্রদান করে বেড়ায়। অথচ যুবকদের জন্য ক্ষুধা যথেষ্ট ক্ষতিকর। কেননা বৃদ্ধ ও পরিণত বয়সের লোকেরা ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে পারে। এর কারণ হলো, যৌবনের তেজ খুব তীব্র। তাই যুবকদের হজমশক্তি ভালো হওয়ার কারণে পেট দ্রুত খালি হয়ে যায়। নতুন বাতি যেমন অধিক তেলের মুখাপেক্ষী, তদ্রূপ তারা বেশি খেতে চায়।

গ্রন্থকার বলেন, খুব কম খাবার গ্রহণের কারণে শরীর দুর্বল হয়ে যায় বলে আলেমগণ অভিমত দিয়েছেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে উকবা বিন মুকাররম জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা খুব কম আহার করে এবং অন্নসংস্থানে উদাসীন থাকে, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী? জবাবে তিনি বলেন, তাদের এ বিষয়টি আমার ভালো লাগে না। তিনি আরও বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনে মাহদিকে বলতে শুনেছি, সুফিরা এমন কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক ফরয ছেড়ে দেয়। ইসহাক ইবনে দাউদ বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনে মাহদিকে বললাম, হে আবু সাঈদ! আমাদের এলাকায় সুফি সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটেছে। তিনি আমাকে বললেন, তুমি এদের কাছে যেয়ো না। কেননা এদের একটি দলকে আমি দেখেছি, যাদেরকে তাদের কর্মকাণ্ড বেপরোয়া করে ফেলে। অনেকে মুলহিদ ও নাস্তিক হয়ে যায়। অপঃপর তিনি বললেন, একবার সুফইয়ান সাওরি রহ. সফরে বের হলে আমিও তাঁর অনুসরণ করি। আমি দেখলাম তাঁর সফরে আনা খাদ্যের মাঝে ফালুদাও ছিল।

আবু আবদুল্লাহ আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে জনৈক ব্যক্তি বলল, আজ পনেরো বছর যাবত শয়তান আমাকে প্রলোভন দিয়ে রেখেছে। অধিকাংশ সময় দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে আমি আল্লাহর বিষয়ে চিন্তা করতে থাকি। এ কথা শুনে ইবনে হাম্বল বললেন, সম্ভবত তুমি নিয়মিত সিয়ামব্রত পালন করতে। তুমি রোযা রাখা বন্ধ করে চর্বিযুক্ত খাবার খাও এবং গল্পকারদের সাথে উঠা-বসা করতে থাকো।

গ্রন্থকার বলেন, কিছু কিছু সুফি নিকৃষ্টমানের খাদ্য গ্রহণ করে। তারা চর্বিযুক্ত খাবার খায় না। এতে করে তার পাকস্থলিতে নিকৃষ্ট খাবার একত্র হলে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত পাকস্থলি তা থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। কেননা পাকস্থলি সব সময় এমন কিছু খাবার চায়, যা সে সহজে হজম করতে পারে। সুতরাং পাকস্থলিতে নিকৃষ্ট খাবার একত্র হলে এবং পাকস্থলি তা হজম করে শরীরে খাবার সরবরাহ করলে সেই নিকৃষ্ট খাবার তার মাঝে দ্বিধা, সংশয় ও বেপরোয়া স্বভাবের জন্ম দেয়। খুব অল্প আহারকারীদের পাকস্থলি ক্রমান্বয়ে সরু ও সঙ্কুচিত হয়। একপর্যায়ে একবার আহার করে তারা দীর্ঘদিন অনাহারে কাটাতে পারে। এ ক্ষেত্রে যৌবনের শক্তি তাদেরকে সহযোগিতা করে। বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে তারা দীর্ঘদিন অনাহারে থাকতে পারাকে কারামত বলে মনে করতে থাকে।

আবদুল মুনইম বিন আবদুল করিম তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, এক মহিলা বৃদ্ধ হওয়ার পর তাকে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমি যৌবনকালে কম খাদ্য গ্রহণ করা সত্ত্বেও কয়েকদিন না খেয়ে থাকতে পারতাম। এটাকে আমি কারামত ও বুযুর্গি মনে করতাম। কিন্তু বয়স বাড়তে থাকলে আমার দেহশক্তি কমতে থাকে। তখন আমি বুঝতে পারলাম, এটা তো কারামত নয়; বরং এটা আমার যৌবনশক্তি ছিল।

গ্রন্থকার বলেন, কেউ এ প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে যে, আপনারা কোন্ যুক্তিতে কম খাবার গ্রহণ করতে নিষেধ করছেন? আপনারাই তো বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ওমর রা. দিনে মাত্র এগারো লোকমা খাবার খেতেন। ইবরাহিম তামিমী ইবনে যুবাইর এক সপ্তাহ ধরে না খেয়ে থাকতেন। এর জবাবে আমরা বলব, ইচ্ছে না করলেও অনবরত দুই মাস না খেয়ে থাকতে হত। তবে তারা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় আল্লাহর বা না খেয়ে থাকতে অভ্যস্ত হতেন। এমনকি এটাকে অভ্যাস হিসেবেও গ্রহণ করতেন না। আমাদের পূর্ববর্তী মনীষীরা অস্বচ্ছলতা ও দারিদ্র‍্যতাজনিত হেতুতে না খেয়ে থাকতেন। আবার অনাহারে থাকা তাদের কারও অভ্যাসে পরিণত হলে তাতে তাদের দেহ দুর্বল হত না। এতে করে ইবাদত-বন্দেগিতে কোনো প্রকার বিঘ্ন ঘটত না। এখনও আরবের অনেক লোক আছেন, যারা শুধু দুধ পান করে দীর্ঘদিন অনায়াসে কাটাতে পারেন। বিষয়টি ভালো করে বুঝে নেয়া জরুরি যে, আমরা অধিক ভোজনের নির্দেশ দিচ্ছি না; বরং এমন ক্ষুধা থেকে বিরত থাকতে বলছি, যার কারণে শক্তি হ্রাস পায় এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। কেননা এক্ষেত্রে শরিয়তের বিধি-বিধান পালন করা কষ্টকর হয়ে পড়ে।

হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত ওমর রা. এর সামনে এক সা’ পরিমাণ খেজুর রাখা হত, তিনি খেতে খেতে সব শেষ করে ফেলতেন।

ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহ. একবার মাখন, মধু ও রুটি কিনলে তাকে বলা হল, আপনি কি সবগুলো খেয়ে ফেলবেন? তিনি বললেন, আমরা যখন পাই তখন বীরপুরুষের মতো খাই, আর যখন না পাই তখন মহাপুরুষের মতো সবর করি।

টিকাঃ
১. আলবানি প্রণীত 'আলজামে' হাদিস নং ৫৬৭৪

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পানি পানের ব্যাপারে প্রমাণপঞ্জি

📄 পানি পানের ব্যাপারে প্রমাণপঞ্জি


গ্রন্থকার বলেন, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বচ্ছ ও শীতল পানি ভালোবাসতেন। হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আনসারদের এক অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে এসে পানি চাইলেন। ওই আনসারির বাড়ির পাশেই একটি ঝরনা ছিল। তিনি বললেন,
عِنْدَكَ مَاءٌ بَاتَ اللَّيْلَةَ فِي شَنِّ ؟ وَإِلَّا كَرَعْنَا
'তোমাদের কাছে কলসে রাখা রাতের পানি থাকলে তা নিয়ে আসো। অন্যথায় আমরা ঝরনা হতেই চুমুক দিয়ে পানি পান করব।"

অন্য হাদিসে আছে, হজরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُسْتَقَى لَهُ الْمَاءُ الْعَذِّبُ مِنْ بِثْرِ السُّقْيَا রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সুকইয়া কূপ হতে মিষ্টপানি সংগ্রহ করা হতো।'

গ্রন্থকার বলেন, অনেক সুফি বলে থাকে, মানুষ উত্তম খাবার খেলে এবং শীতল পানি পান করলে মৃত্যুর ভালোবাসা কখন সৃষ্টি হবে? আবু হামেদ গাযালি রহ.ও বলেন, মানুষ সুস্বাদু খাদ্য গ্রহণ করলে তার মন কঠিন হয়ে যায় এবং মৃত্যুকে সে ভালোবাসে না।

গ্রন্থকার বলেন, একজন অভিজ্ঞ ফকিহের মুখ থেকে এমন কথা বের হচ্ছে দেখে আমি আশ্চর্যবোধ করছি। আচ্ছা, বলুন তো, কেউ যদি চতুর্দিক থেকে বহুমুখী শাস্তি ও অত্যাচারের সম্মুখীন হয়, তারপরও কি কেউ মৃত্যু কামনা করতে ভালোবাসবে? এছাড়া মানুষের জন্য নিজেকে শাস্তি দেয়া কি কখনো বৈধ হতে পারে?
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ 'তোমরা নিজেকে হত্যা কোরো না।"

সফরকালীন আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ করে রোযা ভাঙ্গার সুযোগ দিয়ে বলেছেন, يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ 'আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ব্যাপারে সহজ বিধান চান, কঠিন বিধান চান না।' শরীর ছাড়া কি আমরা জান্নাতে যেতে পারব? সুতরাং এর প্রতি অবহেলা প্রদর্শন একপ্রকার ধৃষ্টতা।

ওপরের ঘটনায় আবু ইয়াযিদ এক বছর ধরে পানি পান থেকে বিরত থেকে নিজেকে কষ্ট দেয়ার উত্তরে বলা যায়, এরা শরিয়তের দৃষ্টিতে নিন্দিত ও পরিত্যাজ্য। কারণ মানুষের ওপর তার দেহের হক রয়েছে। হকদারকে হক না দেয়া জুলুমের নামান্তর। তাই গ্রীষ্মকালে দীর্ঘ সময় রোদে পড়ে থাকা আর শীতকালে দীর্ঘ সময় বরফে বসে থাকা দেহের জন্য কষ্টকর বিধায় তাও পরিত্যাজ্য। পানি দেহের আর্দ্র উপাদানগুলো সুস্থ সবল রাখে এবং শরীরে শক্তি জোগায়। এছাড়া এটা জানা কথা যে, খাবারের মাধ্যমেই দেহ সুস্থসবল থাকে। অতএব কেউ শরীরকে খাবার-দাবার থেকে বিরত রাখলে কিংবা পর্যাপ্ত খাবার-দাবার না দিলে সে দেহের ক্ষতি করেছে হিসেবে বিবেচিত হবে। যে যা উত্তম মনে করে করেছে, তা তার ভুল ছিল। তেমনিভাবে শরীরকে নিদ্রা থেকে বিরত রাখাও জুলুম।

ইবনে আকিল বলেন, মানুষের জন্য তার নিজের ওপর শাস্তি দেয়া জায়েয নয়।' অনুরূপভাবে প্রতিশোধ গ্রহণ করাও বৈধ নয়। কেউ এমন করে থাকলে ইমাম তাকে শাস্তি দেবেন। শরীর ও জীবন আল্লাহ তায়ালা মানুষকে আমানতস্বরূপ দান করেছেন। মানুষকে তার নিজ মালিকানাধীন বস্তু ব্যবহারের পূর্ণ স্বাধীনতা আল্লাহ তায়ালা দেননি। ধন-সম্পদ ব্যয়ের পন্থাও আল্লাহ তায়ালা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।

গ্রন্থকার বলেন, হিজরতের হাদিসে আমরা উল্লেখ করে এসেছি- 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা সফরের জন্য পাথেয় হিসেবে খাদ্য ও পানীয় সঙ্গে নিয়েছেন।'

হজরত আবু বকর রা. পাথরের ছায়ায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য বিছানা বিছিয়েছেন এবং পাত্রে দুধ দোহনের পর তার ওপর পানি ঢেলেছেন, যেন পেটের নিম্নভাগ শীতল হয়। এ সব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল শরীরের সাথে উত্তম ব্যবহার করা। আবু তালেব মক্কি অল্প খাবার গ্রহণের ব্যাপারে যা বলেছেন, তা শরীরের ওপর এমন অত্যাচার, যাতে শরীর খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশ্য ক্ষুধা পরিমিত হলে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখতে পারে। মুহাম্মাদ বিন আলী তিরমিযি যা লিখেছেন তা এক নষ্ট চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। হয়তো তিনি নতুন শরিয়ত আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন। তাওবাহর সময় অনবরত দুই মাস রোযা রাখার ব্যাপারে শরিয়তের কোনো দিকনির্দেশনা আছে কি? অনুরূপভাবে ফলমূল ও হালাল খাদ্য পরিহারের মাঝেও কোনো উপকারিতা নেই।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫৬১৩
২. সহিহুল জামে': হাদিস নং ৪৯৫১
৩. সুরা নিসা: আয়াত ২৯
৪. সুরা বাকারা: আয়াত ১৮৫
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৯০৫
২. ইনি হাকীম তিরমিযি; সুনান সংকলক আবু ঈসা তিরমিযি নন।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সুফিদের কর্মকাণ্ডের অসারতা প্রমাণে হাদিসসমূহ

📄 সুফিদের কর্মকাণ্ডের অসারতা প্রমাণে হাদিসসমূহ


সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব বলেন, হজরত উসমান ইবনে মাযউন রা. একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার মনে কিছু বিষয়ের উদ্ভব হয়েছে। আপনাকে জিজ্ঞেস না করে সেগুলোর কোনোটি করতে চাই না।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার মনে কিসের উদ্ভব হয়েছে? তিনি বললেন, আমার ইচ্ছে হয় নপুংসক (পুরুষত্বহীন) হয়ে যেতে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার উম্মতের নপুংসক হওয়া হলো রোযা। উসমান ইবনে মাযউন রা. বললেন, আমার মন চায় পাহাড়ের নির্জন স্থানে গিয়ে বসে থাকতে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার উম্মতের বৈরাগ্য হলো মসজিদে বসে এক নামাযের পর আরেক নামাযের জন্য অপেক্ষা করা। উসমান রা. বললেন, আমার মন চায়, বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করতে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার উম্মতের ভ্রমণ হলো, জিহাদ ও হজ-ওমরা। উসমান রা. বললেন, আমার মন চায় স্ত্রী-সন্তান থেকে পৃথক হয়ে যেতে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, প্রতিদিন সদকা করা, নিজের এবং বাচ্চাদের ভরণ-পোষণ এবং এতিম-মিসকিনদের ওপর দয়া-দাক্ষিণ্য করা এর চেয়ে উত্তম। উসমান রা. বললেন, আমার মন চায়, স্ত্রী-সহবাস বর্জন করতে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোনো মুসলমান যখন আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করে আর এর ফলে কোনো সন্তান জন্মলাভ না করে, তবে তার জন্য জান্নাতে একটি বাঁদি লাভ হবে। আর যদি সন্তান জন্মলাভ করে, আর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করে, তবে সে সন্তান তার জন্য কেয়ামতের দিন সুপারিশকারী হবে। আর যদি তার পরেও জীবিত থাকে, তবে তার জন্য কেয়ামতের দিন নূর হবে। উসমান রা. বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার মন চায় গোশত খাওয়া বর্জন করতে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, গোশত প্রিয় বস্তু। আমি যখন গোশত জোটে তখন খাই। আমি যদি আল্লাহর কাছে প্রতিদিন আমাকে গোশত খাওয়ানোর দরখাস্ত করি, তবে অবশ্যই তিনি তা আমাকে খাওয়াবেন। উসমান রা. বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার মন চায়, সুগন্ধজাতীয় দ্রব্য বর্জন করতে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আমাকে সুগন্ধজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করতে আদেশ করেছেন। আর জুমার দিন আমি কখনে সুগন্ধজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার বর্জন করি না। হে উসমান! আমার রাস্তা থেকে বিমুখ হয়ো না। যে ব্যক্তি আমার রাস্তা থেকে বিমুখ হয়ে তাওবাহ ছাড়া মৃত্যুবরণ করে ফেরেশতারা আমার হাউজে কাউসার থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে দেবে।'

গ্রন্থকার বলেন, এটি ওমায়ের ইবনে মারদাসের হাদিস।

হজরত আবু বুরদাহ রা. হতে বর্ণিত, উসমান ইবনে মাযউন রা. এর স্ত্রী একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের কাছে এলেন। তাঁরা তাঁকে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, তোমার এ অবস্থা কেন? তোমার স্বামী কি বিত্তশালী নয়? মাযঊন-পত্নী বললেন, তার দ্বারা আমার কোনো উপকার লাভ হয় না। সে সারারাত নামায পড়ে, সারাদিন রোযা রাখে। নবীপত্নীগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ঘটনাটি জানালেন। তিনি উসমান রা.-কে পেয়ে বললেন, হে উসমান! তুমি কি আমার অনুসরণ করো না? উসমান রা. বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কী ব্যাপার? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি সারারাত নামায পড়ো, আর সারাদিন রোযা রাখো? উসমান রা. বললেন, জি হ্যাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা করবে না। কেননা তোমার ওপর তোমার চোখের হক আছে। তোমার ওপর আপন শরীরের হক আছে। তোমার ওপর আপন স্ত্রীর হক আছে। অতএব তুমি নামাযও পড়ো, নিদ্রাও যাও। রোযাও রাখো, ইফতারও করো।'

হজরত আবু কিলাবাহ রা. বলেন, উসমান ইবনে মাযঊন রা. একটি ঘর নির্মাণ করে তাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে ইবাদত করতে শুরু করেন। বিষয়টি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পেরে তার নিকট গমন করে তার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন,
يا عثمان إن الله عز وجل لم يبعثني بالرهبانية مرتين أو ثلاثا
'হে উসমান! আমাকে তো আল্লাহ তায়ালা সন্ন্যাসব্রত দিয়ে পাঠাননি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা দুইবার তিনবার বলেছেন।'

কাহমাস হেলালি রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণের কথা জানালাম। অতঃপর এক বছর যাবৎ অনুপস্থিত রইলাম। এরপর আবার খেদমতে হাজির হলাম। তখন আমি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার আপাদমস্তক দেখলেন। আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না? তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? আমি বললাম, আমি কাহমাস হেলালী। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার এ অবস্থা কেন? আমি বললাম, আপনার কাছ থেকে যাওয়ার পর এক রাতও ঘুমাইনি এবং একদিনও রোযাবিহীন থাকিনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিজেকে শাস্তির মুখোমুখি করার নির্দেশ তোমাকে কে দিয়েছে? পূর্ণ রমযান এবং প্রতিমাসে একটি রোযা রাখো। আমি বললাম, আরও বৃদ্ধি করুন। বললেন, পূর্ণ রমযান এবং প্রতি মাসে দু'টি রোযা রাখো। আমি আরয করলাম আরও বৃদ্ধি করুন। বললেন, পূর্ণ রমযান এবং প্রতি মাসে তিনদিন রোযা রাখো।

হজরত আবু কিলাবা রা. বলেন, আমার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এ সংবাদ পৌছল যে, একদল সাহাবি স্ত্রীদের নিকটবর্তী হওয়া ও গোশত খাওয়া পরিত্যাগ করে একস্থানে সমবেত হয়েছেন। তখন আমরাও স্ত্রীদের নিকটবর্তী না হওয়া এবং গোশত না খাওয়ার বিষয়টি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উল্লেখ করলে তিনি এ বিষয়ে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে বললেন,
لو كنت تقدمت فيه لفعلت ثم قال إني لم أرسل بالرهبانية إن خير الدين الحنيفية السمحة
'এর দ্বারা যদি পরকালে মঙ্গলজনক পরিণতি পাওয়া যেত, তাহলে সর্বপ্রথম আমি তা করতাম। অতঃপর তিনি বললেন, আমি সন্ন্যাস-ধর্ম নিয়ে প্রেরিত হইনি। আমি মধ্যপন্থী ধর্ম নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।”

গ্রন্থকার বলেন, এক হাদিসে এসেছে- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُحِبُّ أَنْ يرى آثَارَ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ فَيْ مَأْكِلِهِ وَمَشْرَبِهِ
'আল্লাহ তায়ালা বান্দার খাবার-দাবার ও বেশভূষায় তাঁর অনুগ্রহের নিদর্শন দেখতে ভালোবাসেন।'

বকর ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, আল্লাহ তায়ালা যাকে নেয়ামত দান করেছেন এবং তার খাবার-দাবার ও বেশভূষায় নেয়ামতের নিদর্শন দেখা না যায় তাকে 'বাগিযুল্লাহ' বা আল্লাহর অপছন্দনীয় উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
***
গ্রন্থকার বলেন, এ সব হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, সুফিরা যে পন্থা অবলম্বন করেছে, তা সঠিক নয়। পানাহার বর্জনের এ রীতি আগেকার যুগের সুফিদের ছিল। কিন্তু পরবর্তী সুফিরা এ ব্যাপারে অন্যদেরকে ডিঙিয়ে গেছে।

মুহাম্মাদ ইবনে আবদুস সিরাজ বাগদাদি বলেন, আবু মরহুম একবার বসরায় ওয়াজ করতে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও মর্মস্পশী ওয়াজ করলেন-এতে মানুষ অঝোরে কাঁদতে থাকল। ওয়াজ শেষে বললেন, আমাদেরকে আল্লাহর ওয়াস্তে কে ভাত খাওয়াবে? এক যুবক দাঁড়িয়ে বলল, আমি এ সেবার জন্য প্রস্তুত আছি। আবু মরহুম বললেন, তুমি বসো। তোমার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। আমি তোমার মর্যাদা উপলব্ধি করতে পেরেছি। ওই যুবক এভাবে তিনবার ওঠে বলল। তৃতীয়বার আবু মরহুম সঙ্গীদেরকে বললেন, চলো, এ ব্যক্তির বাড়িতে যাই। সবাই ওই যুবকের বাড়িতে গেলেন। যুবক বলল, আমি তাদের সামনে এক পাতিল শাক রান্না করে এনেছিলাম। তাঁরা লবণ ছাড়াই সেগুলো খেয়ে নিলেন।

এরপর আবু মরহুম বললেন, আমার কাছে একটি লম্বা চওড়া দস্তরখান, পাঁচ টুকরি ভাত, পাঁচ সের ঘি, দশ সের চিনি, পাঁচ সের বাদাম এবং পাঁচ সের পেস্তা নিয়ে আসো। এ সবকিছু উপস্থিত করা হলো। আবু মরহুম সঙ্গীদেকে লক্ষ্য করে বললেন, এখন দুনিয়া কেমন দেখাচ্ছে? তারা বলল, তার রং চমকাচ্ছে এবং সূর্য উজ্জ্বল। আবু মরহুম বললেন, এখন দুনিয়াতে নহরও প্রবাহিত করে দাও। এ বলে ঘিগুলো ভাতে ঢেলে দেয়া হলো। আবার আবু মরহুম জিজ্ঞেস করলেন, এবার দুনিয়া কেমন দেখাচ্ছে? তারা বলল, তার রং চমকাচ্ছে, সূর্য উজ্জ্বল এবং নহরও প্রবাহমান। অতঃপর পেস্তা বাদাম আনা হলো এবং ভাতে ঢালা হলো। এরপর আবু মরহুম সঙ্গীদেরকে বলল, এখন দুনিয়া কেমন দেখাচ্ছে? তারা বলল, তার রং চমকাচ্ছে, সূর্য উজ্জ্বল, নহরও প্রবহমান এবং গাছও জন্মেছে। আবু মরহুম বললেন, এবার পাথরও ঢেলে দাও। এ বলে চিনিগুলোও ঢেলে দেয়া হলো। এরপর আবু মরহুম সঙ্গীদেরকে বলল, এখন দুনিয়া কেমন দেখাচ্ছে? তারা বলল, তার রং চমকাচ্ছে, সূর্য উজ্জ্বল, নহরও প্রবহমান, গাছ জন্মেছে, ফল ধরেছে এবং পাথরও ঢালা হয়েছে। আবু মরহুম বললেন, ভাইয়েরা! দুনিয়ার সাথে আমাদের কী সম্পর্ক? আমরা দুনিয়া দিয়ে কী করব? এ বলে সবাই হাত বাড়াল এবং পাঁচ আঙ্গুল দিয়ে খেতে শুরু করল। আবু ফযল আহমদ ইবনে সালামাহ বলেন, আমি এ ঘটনা আবু হাতেম রাযীর কাছে বর্ণনা করলে তিনি বললেন, ঘটনাটি আমাকে লিখে দাও। অতঃপর তিনি বললেন, বর্তমান সুফিদের অবস্থা এটাই।

টিকাঃ
১. [যঈফুন জিদ্দান] এর সনদে আলী ইবনে যায়েদ ইবনে জুদয়ান রয়েছেন- যিনি 'যঈফ'। অবশ্য অনুরূপ অর্থবোধক হাদিস সহিহ বুখারিতে রয়েছে: হাদিস নং ৫০৭৩
২. হাদিসটি তাবাকাতে ইবনে সা'আদে উপরোক্ত সনদে এসেছে। সনদটি 'মুরসালান সহিহ'।
৩. হাদিসটি তাবাকাতে ইবনে সা'আদে বর্ণিত হয়েছে। আলবানি রহ. এটাকে সহিহ বলেছেন।
৪. [যঈফ] মুসনাদে আহমাদ: ৫/২৮, সুনানে আবি দাউদ: হাদিস নং ২৪২৮
১. 'ইরসাল' এর কারণে হাদিসটির সনদ দুর্বল। এছাড়া অনুরূপ অর্থবোধক হাদিস পূর্বেও উল্লেখিত আছে।
২. [যঈফ] আলবানি প্রণীত 'যঈফুল জামে' : হাদিস নং ১৭১৫, অন্য একটি বর্ণনামতে হাদিসটি 'সহিহ লিগাইরিহী' এর পর্যায়ে পড়ে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00