📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পানাহারের ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 পানাহারের ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


গ্রন্থকার বলেন, প্রথম যুগের সুফিদেরকে শয়তান এমন চক্রান্তের জালে আটকিয়েছে যে, তাদেরকে শুকনা ও মোটা খাবার খেতে বাধ্য করেছে। তারা ঠান্ডা পানি পান করত না। তবে পরবর্তী সুফিদের ক্ষেত্রে শয়তান তার কৌশল পরিবর্তন করেছে। এতে করে সুফিরা কষ্ট-মুজাহাদা থেকে বিতৃষ্ণ হয় এবং অধিক আহার ও বিলাসী জীবনযাপনে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে。

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পানাহারের ব্যাপারে প্রথম যুগের সুফিদের কিছু কর্মকাণ্ড ও তার জবাব

📄 পানাহারের ব্যাপারে প্রথম যুগের সুফিদের কিছু কর্মকাণ্ড ও তার জবাব


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, অনেক সুফি কয়েক দিন ধরে না খেয়ে থাকত। আবার কেউ কেউ প্রতিদিন অল্প অল্প করে কিছু খেত, যাতে জীবন টিকে থাকে। সাহাল ইবনে আবদুল্লাহ শুরুর দিকে এক দিরহাম মূল্যের খেজুরের রস, এক দিরহাম মূল্যের ঘি ও এক দিরহাম মূলার আটা এক সাথে মিশিয়ে তিনশ ঘাট ভাগ করে রেখে দিতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক এক ভাগ দ্বারা ইফতার করতেন। আবু হামেদ তুসি বর্ণনা করেন, সাহল ইবনে আবদুল্লাহ দীঘদিন শুধু গাছের পাতা খেয়ে দিনাতিপাত করতেন। এরপর শুধু ভুসি খেয়ে দিন কাটাতেন। গোটা বছর তিনি মাত্র তিন দিরহাম মূল্যের খাদ্য গ্রহণ করেছেন।

আবু জাফর হাদ্দাদ বলেন, একবার আমি এক পানির হাউজের তীরে উপবিষ্ট ছিলাম। এমতাবস্থায় আমার কাছে আবু তুরাব এসে উপস্থিত। আমি খোলদিন যাবৎ কিছুই খাইনি। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার কী অবস্থা? তুমি এখানে বসে আছ কেন? উত্তরে আমি বললাম, ইলম ও ইয়াকিনের শ্রেষ্ঠত্বের পরীক্ষা চালাচ্ছি। দেখব কোন্‌টি জয়ী হয়। যে জয়ী হবে, আমি তারই অনুসরণ করব। আবু তুরাব বললেন, অচিরেই তুমি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হতে পারবে।

ইবরাহিম ইবনে বাল্লা বাগদাদি বলেন, আমি একবার আহওয়াইয়াম থেকে ইস্কান্দারিয়া পর্যন্ত জুনুন মিসরির সাথে ছিলাম। পথিমধ্যে ইফতারের সময় হলে আমি রুটির টুকরো ও লবণ বের করে তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, আসুন, ইফতার করুন। তিনি বললেন, তোমার লবণ কি পিষা ও চূর্ণিত? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তুমি সফল হতে পারবে না। অতঃপর আমি তার খাদ্য-স্থলে সন্ধান করে দেখি, সামান্য কিছু যবের ছাতু আছে। তিনি ওই ছাতুটুকু খেয়ে নিলেন।

সাহল ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, আমি মানুষের জন্য আল্লাহর حجت বা প্রমাণ। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো কীভাবে? তিনি বললেন, আমি হালাল খাদ্য গ্রহণ করি। এসো আমরা সবাই মিলে হালাল খাবার চিনে নিই। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কি হালাল খাবার চিনে নিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করা হলো কীভাবে চিনতে পারলেন? তিনি বললেন, আমি আপন জ্ঞান, মারেফত ও শক্তিকে সাত ভাগ করি এবং এভাবে রেখে দিই। যখন কেবল একটি অবশিষ্ট থাকে, আর ছয়টি বিলীন হয়ে যায়, তখন একটিও বিলীন হয়ে যাবে এবং মৃত্যু এসে যাবে—এ আশঙ্কায় তাকে বেঁচে রাখা পরিমাণ খাবার দিই, যাতে ওই ছয়টিও ফিরে আসে।

আবু আবদুল্লাহ ইবনে মুফলিহ তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, আমাকে আবু আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ বলেছেন, আমি আজ চল্লিশ বছর যাবৎ এমন অবস্থায় উপনীত হওয়ার আগে খাদ্য গ্রহণ করি না, যে অবস্থায় উপনীত হলে শরিয়ত মৃত প্রাণী খাওয়ার অনুমতি দেয়।

ঈসা ইবনে আদম বলেন, জনৈক ব্যক্তি সুফি আবু ইয়াযিদের কাছে এসে বলল, জনাব! আমি আপনার এ স্থানে বসতে চাই। মেহেরবানি করে একটু অনুমতি দিন। আবু ইয়াযিদ বলল, তুমি এ স্থানের যোগ্য নও। সে আবারও অনুরোধ জানালে আবু ইয়াযিদ তাকে অনুমতি দেন। একদিন অনাহারে থাকার পর দ্বিতীয় দিন বলল, জনাব! আমার খাদ্যের প্রয়োজন। আবু ইয়াযিদ বলল, বৎস! আমাদের এখানে খাদ্য হলো আল্লাহর যিকির। সে বলল, তাহলে আমাকে এমন জিনিস দান করুন, যা দ্বারা আমার দেহ টিকে থাকে এবং সর্বদা আল্লাহর ইবাদত করতে পারি। আবু ইয়াযিদ বলল, বৎস! দেহ আল্লাহর যিকির দ্বারাই টিকে থাকবে।

ইবরাহিম খাওয়াস বলেন, আবু তুরাবের সাহচর্য লাভ করেছে—এমন এক ব্যক্তি আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, একদিন আবু তুরাব জনৈক সুফিকে তরমুজের খোসার দিকে হাত বাড়াতে দেখে বলল, তুমি তাসাওউফের যোগ্য নও, এখনই তোমার বাজারে চলে যাওয়া উচিত।

আবুল কাসেম কিরওয়ানী বলেন, আমার এক সাথিকে বলতে শুনেছি, আবুল হাসান নাসিবী হারাম শরিফে কিছু সাথি নিয়ে অবস্থান করেন। তাঁরা সাতদিন অনাহারে থাকার পর এক সাথি পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্যে বের হয়ে সামনে এক তরমুজের খোসা দেখতে পেয়ে সেটি উঠিয়ে ভক্ষণ করলে এক লোক তা দেখে ফেলে। তখন লোকটি আরও কিছু তরমুজের খোসা তার সামনে হাজির করলে সে তা নিয়ে সাথিদের সামনে বিনয়ের সাথে পেশ করে। খোসা দেখে শায়খ আবুল হাসান নাসিবী বললেন, তোমাদের কে এই অপরাধ করেছে? সে তখন বলল, আমি। আবুল হাসান বললেন, যাও, তুমি তোমার অপরাধসহ থেকে যাও এবং এ খাবার সামলিয়ে রাখো। শায়খ আবুল হাসান নাসিবী তার সাথিদের নিয়ে হারাম শরিফ থেকে বের হলে সে লোকটিও তাদের অনুসরণ করে। তখন শায়খ নাসিবী বলেন, আমি কি তোমাকে তোমার অপরাধের সাথেই থাকতে বলিনি? লোকটি বলল, আমার অপরাধ থেকে আমি আল্লাহর কাছে তাওবাহ করেছি। পরে শায়খ বললেন, তাওবাহ করলে আমাদের সাথে থাকতে পার।

বুনান ইবনে মুহাম্মাদ বলেন, আমি মক্কায় হারাম শরিফে অবস্থান করছিলাম। সেখানেই ইবরাহিম খাওয়াসের সাথে সাক্ষাৎ হয়। লাগাতার কয়েকদিন আমি অনাহারে ছিলাম। মক্কায় মুযাইন নামক এক ক্ষৌরিক ছিল। সে ফকিরদেরকে অত্যন্ত ভালোবাসত। যে কোনো ফকির তার কাছে শিঙ্গা লাগাতে গেলে তাকে সে গোশত ও রুটি খাইয়ে দিত। আমিও শিঙ্গা লাগানোর জন্য তার কাছে গেলাম। সে গোশত কিনে রুটি তৈরি করার নির্দেশ দিয়ে আমার শিঙ্গা লাগানোর কাজ শুরু করল। তখন আমার নফস আমাকে বলতে লাগল, রুটি গোশত রান্না হচ্ছে। শিঙ্গা লাগানোর কাজ থেকে অবসর হলেই মজা করে রুটি-গোশত খেতে পারবে। তৎক্ষণাৎ আমার চৈতন্য ফিরে আসে। আমি মনে মনে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করে ফেললাম যে, ক্ষৌরিকের খাবার হতে বিন্দুমাত্রও আমি খাব না। কাজ সমাপ্ত হলে আমি ওঠে চলে আসতে লাগলাম। ক্ষৌরিক বলল, এ কী করছেন? আমার রীতি সম্পর্কে আপনি জানেন না? আমি বললাম, আমি কিছুই খাব না-এ ব্যাপারে আল্লাহর সাথে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ। এর পর আমি হেরেম শরিফে চলে এলাম। ওই দিন খাওয়ার কিছুই মেলেনি। পরের দিনও আসর পর্যন্ত কিছু না খেয়ে কেটে গেল। আসরের নামাযের জন্য বের হলে হঠাৎ বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে যাই। মানুষে এসে আমার কাছে ভিড় করল। ইবরাহিম খাওয়াসও এলেন। তিনি আমার কাছে বসে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কিছু খাবে কি? আমি বললাম, এখন তো রাত ঘনিয়ে এসেছে। ইবরাহিম বলল, হ্যাঁ। শাবাশ, এ অবস্থার ওপরই অটল থাকো, তাহলে নাজাত পাবে। অতঃপর ইবরাহিম খাওয়াস ওঠে চলে গেলেন।

এশার নামাযের পর তিনি আমার জন্য দু'টি রুটি ও এক পেয়ালা মসুরের ডাল হাতে করে নিয়ে এলেন। আমি সেগুলো খেলাম। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আরও ক্ষুধা আছে কি? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি আরও এক পেয়ালা ডাল ও দু'টি রুটি নিয়ে এলেন। আমি সেগুলো খেয়ে বললাম, এবার পেট ভরে গেছে। খানা খাওয়ার পর ঘুমিয়ে গেলাম। ভোর পর্যন্ত ঘুমালাম। ওই রাতে কোনো নামাযও পড়িনি, তাওয়াফও করিনি।

মানসূর ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, আমি আবু আলী রুযবারীকে বলতে শুনেছি, কোনো সুফি যদি পাঁচদিন উপবাসের পর বলে যে, আমি ক্ষুধার্ত, তাহলে তাকে জোরপূর্বক বাজারে পাঠিয়ে রুজি উপার্জনের নির্দেশ দাও।

ইবনে বাকুইয়া বলেন, আমি আবু আহমদ সগীরকে বলতে শুনেছি, আবু আবদুল্লাহ খাফিফ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তাকে ইফতার করার জন্য প্রতিরাতে তার সামনে দশটি কিশমিশ উপস্থিত করি। আমি অনুগ্রহ করে এক রাতে তার জন্য পনেরটি কিসমিস পেশ করলে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাকে এ নির্দেশ কে দিয়েছে? তিনি তা হতে কিশমিশের দশটি দানা খেয়ে অবশিষ্টগুলো রেখে দেন।

আবদুল্লাহ ইবনে খাফিফ বলেন, আমি যখন মুবতাদী তথা তাসাওউফের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলাম, তখন চল্লিশ মাস এভাবে কেটেছে যে, রাতে শুধু এক মুষ্টি ছাতু দ্বারা ইফতার করতাম। একদিন আমি শিঙ্গা লাগালাম। শরীর থেকে কেবল কিছু পানি বের হলো। ক্ষৌরিক বলল, এমন রক্তশূন্য শরীর আর কখনো দেখিনি।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পানি পান ও গোশত ভক্ষণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা

📄 পানি পান ও গোশত ভক্ষণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা


গ্রন্থকার বলেন, সুফিদের এক সম্প্রদায় গোশত খায় না। তারা বলে, এক টুকরো গোশত খেলে চল্লিশ দিন পর্যন্ত অন্তর কঠিন হয়ে থাকে। অনেকে আবার উন্নতমানের খাবার থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখত। প্রমাণ হিসেবে তারা পেশ করে : হজরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
أحرموا أنفسكم طيب الطعام فانما قوي الشيطان أن يجري في العروق بها
'তোমরা উন্নতমানের খাদ্য থেকে নিজেদেরকে বিরত রেখো। কেননা এ ধরনের খাদ্যগ্রহণের কারণে শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় বিচরণের শক্তি পায়।"

তাদের অনেকে আবার ঠাণ্ডা পানি পান করেন না। তারা এক কলস পানি ভরে মাটির নীচে রেখে দেয়। পরে সেই পানি গরম হলে তা পান করে। আবার কেউ কেউ স্বচ্ছ পানি পান করত না। কেউ আবার দীর্ঘ সময় পানি পান হতে বিরত থেকে নিজেকে কষ্টের মাঝে পতিত করত।

ঈসা ইবনে মুসা বোস্তামি তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করে বলেন, আমি আমার চাচা আবু ইয়াযিদের খাদেমকে বলতে শুনেছি, মানুষ সাধারণত যা খায়, আমি চল্লিশ বছর যাবৎ তা ভক্ষণ করিনি। আমি একবার আমার নফসকে আমার জন্য কল্যাণকর বিষয় পালনের আহ্বান জানালে নফস তা প্রত্যাখ্যান করে। তাই আমি এক বছর যাবৎ পানি পান না করার প্রতিজ্ঞা করে এক বছর ধরে পানি পান থেকে বিরত থাকি।

আবু হামেদ গাযালি বলেন, আমি আবু ইয়াযিদকে বলতে শুনেছি, আমি আমার নফসকে আল্লাহর নির্দেশ পালনের আহ্বান জানালে নফস তা প্রত্যাখ্যান করে। তাই আমি নফসের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে এক বছর পানি পান না করার ও এক বছর বিশ্রাম না করার প্রতিজ্ঞা করলে আমার প্রতিজ্ঞা পূরণ করা সম্ভব হয়।
***
গ্রন্থকার বলেন, আবু তালেব মক্কি সুফিদের জন্য খাবারের নিয়ম বাতলিয়ে বলেন, শিষ্য ও মুরিদানদের জন্য মুস্তাহাব হলো—রাত-দিন দু'টি রুটির বেশি না খাওয়া। অনেক সুফি মেপে মেপে আহার গ্রহণ করেন এবং প্রতিদিন খাবারের পরিমাণ অল্প অল্প করে কমাতে থাকেন। এদিকে আবার অনেকে শুরুতে দিনে একবার খাদ্য গ্রহণ করেন, পরে কিছুদিন অতিবাহিত হলে দু'দিন পর একবার খাবার খেয়ে থাকেন—এভাবে ধীরে ধীরে তাদের খাবারের তালিকা হ্রাস পেতে থাকে। তাঁদের বক্তব্য হলো, ক্ষুধা অন্তরের রক্ত হ্রাস করে মনকে সাদা করে। আর মন সাদা হলে তাতে নূর বিরাজ করে। এছাড়াও ক্ষুধা মনের চর্বি গলায়। এতে মন নরম হয়। আর মন নরম হলে আল্লাহর মারেফতের পথ খুলে যায়।

গ্রন্থকার বলেন, সুফিদের জন্য আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আলী তিরমিযি রিয়াযাতুন্নুফুস নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এতে তিনি লেখেন—তাসাওউফের নবীন শিক্ষানবীশদের উচিত হলো, আল্লাহর কাছে তাওবাহস্বরূপ একাধারে দুই মাস রোযা রাখা। অতঃপর রোযা পরিহার করে প্রতিদিন অল্প পরিমাণে আহার করা। আরও উচিত—তারা তরকারি, ফলমূল, সুস্বাদু খাবার, সাথিদের সাথে উঠাবসা ও কিতাব অধ্যয়ন পরিহার করবে। কেননা এতে নফস প্রভাবিত হয়ে গাফেল হয়ে পড়ে।

টিকাঃ
১. [মাউযূ'] আলবানি রহ. প্রণীত 'আসিলসিলাতুস যঈফাহ': ১৮৭৯

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 উল্লেখিত কর্মকাণ্ডের অসারতা বিষয়ক প্রমাণপঞ্জি

📄 উল্লেখিত কর্মকাণ্ডের অসারতা বিষয়ক প্রমাণপঞ্জি


গ্রন্থকার বলেন, সাহাল ইবনে আবদুল্লাহর যে রীতি উপরে বর্ণনা করা হয়েছে, তা শরিয়াসমর্থিত নয়। কেননা সে তার ধারণক্ষমতার বাইরের বস্তুকে নিজের জন্য জরুরি মনে করে নিয়েছে। এছাড়া আল্লাহ তায়ালা রিযিকস্বরূপ মানুষকে গম দ্বারা সম্মানিত করেছেন। এর খড়কুটো চতুষ্পদ জন্তুর জন্য নির্ধারণ করেছেন। অতএব মানুষের জন্য খড়কুটো ভক্ষণ করে জীব-জন্তুর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বেমানান। আবু হামেদ গাযালি রহ. সাহাল ইবনে আবদুল্লাহ থেকে তার মতামত তুলে ধরে বলেন, ক্ষুধার তীব্রতায় যে ব্যক্তি দুর্বল হয়েছে তার বসে নামায পড়া ওই ব্যক্তির দাঁড়িয়ে নামায থেকে উত্তম, যে খাদ্য গ্রহণের কারণে দাঁড়াতে পেরেছে।

গ্রন্থকার বলেন, উপরোক্ত মন্তব্য সম্পূর্ণ ভুল। আহার করে যদি দাঁড়ানো সম্ভব হয়, তাহলে তার আহার করাও ইবাদত হিসেবে গণ্য। কেননা আহার করলে মানুষ ইবাদত করতে সক্ষম হয়। কেউ যদি খাদ্য গ্রহণে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও আহার করা থেকে বিরত থাকার দরুন ক্ষুধার যন্ত্রণায় বসে নামায পড়ে, তাহলে তার পানাহার থেকে বিরত থাকা ফরয ছেড়ে দেয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই খাদ্য গ্রহণে সক্ষম থাকলে, তা পরিহার করা শরিয়তে নিষেধ। ক্ষুধার তীব্রতায় মানুষের জন্য মৃত প্রাণী ভক্ষণ ত্যাগ করাও জায়েয নয়। সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে হালাল খাবার ত্যাগ করা তার জন্য কী করে বৈধ হতে পারে?

জাফর হাদ্দাদ বলেছে—'ইলম ও ইয়াকিনের শ্রেষ্ঠত্বের পরীক্ষা চালাচ্ছি। দেখব কোন্টি জয়ী হয়। যে জয়ী হবে, আমি তারই অনুসরণ করব'—এটা মারাত্মক মূর্খতাজনিত কথা। কেননা ইলম ও ইয়াকিনের মাঝে কোনো ব্যবধান নেই। ইলমের সর্বোচ্চ স্তরের নামই 'ইয়াকিন'। আর ক্ষুধার্ত হলে খাবার-দাবার বর্জনের কথা ইলম বা ইয়াকিনের কোথাও নেই। এরা এমন দল—যারা নিজেদের আবিষ্কৃত বিষয়ে কঠিনকে বেছে নিয়েছে। এদের কঠোরতা কুরাইশদের মতো। এই কঠোরতার কারণেই কুরাইশদেরকে ‘হুমস’ বলা হয়। তারা মৌলিক বিষয়কে অস্বীকার করে শাখাগত বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করেছে। যুন্নুন মিসরির কথা—'তোমার লবণ কি পেষা ও চূর্ণিত? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তুমি সফল হতে পারবে না'—এটা নিতান্তই অমূলক মন্তব্য। কেননা শরিয়তে যা বৈধ, তাকে কীভাবে নিন্দার চোখে দেখা যায়? এছাড়া যবের ছাতু খেয়ে যে দিনাতিপাত করে, সেটা তো মানুষের শরীরে কুলানজা রোগ সৃষ্টির কারণ। যে ব্যক্তি বলে, মধু দ্বারা মাখন খাওয়া অপচয়—তার এ কথাকে শরিয়ত সমর্থন করে না। কেননা এ বিষয়ে শরিয়তে অনুমতি রয়েছে। সহিহ সনদে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত আছে:
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَانَ يَأْكُلُ الْقِنَّاءَ بِالرُّطَبِ তিনি খেজুর দ্বারা শশা খেতেন।”
كَانَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم يُحِبُّ الحَلْوَاءَ وَالعَسَلَ 'মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য ও মধু খেতে ভালোবাসতেন।"

সাহাল ইবনে আবদুল্লাহর কথা—'আমি আপন জ্ঞান, মারেফত ও শক্তিকে সাত ভাগ করি'—তার এ কাজ নিন্দনীয়। কেননা তা শরীয়তসমর্থিত নয়; বরং তা হারামের কাছাকাছি। কেননা এটা নিজের প্রতি জুলুমের নামান্তর, এতে দেহের হক আদায় হয় না। আবু আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ বলেছেন, 'আমি আজ চল্লিশ বছর যাবৎ এমন অবস্থায় উপনীত হওয়ার আগে খাদ্য গ্রহণ করি না, যে অবস্থায় উপনীত হলে শরিয়ত মৃত প্রাণী খাওয়ার অনুমতি দেয়'-ইসলাম এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে না। অদ্ভুত ও বিকৃত চিন্তার কারণে সে এমনটি করা দুঃসাহস পেয়েছে। বৈধ খাবার উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তা ত্যাগ করা জুলুমের নামান্তর। আবু ইয়াযিদ বলেছেন, 'যিকিরই আমাদের খাদ্য'—এটি তার বানোয়াট মতবাদ। কেননা খাবারের মুখাপেক্ষী করেই আল্লাহ তায়ালা দেহকে সৃষ্টি করেছেন। এমনকি দোযখবাসী দোযখের ভেতরে খাবারের মুখাপেক্ষী হবে এবং খাদ্যের সন্ধান করবে। ওপরের ঘটনায় দীর্ঘদিন ক্ষুধার্ত থাকার পর তরমুজের খোসা খাওয়ার ওপর আবুল হাসান নাসিবী নিন্দা ও হঠকারী সিদ্ধান্ত শরিয়ত সমর্থন করে না। যে ব্যক্তি সাতদিন খাবার-দাবার থেকে দূরে থেকেছেন-ইসলাম সেটাকেও সমর্থন করে না। তদ্রূপ শিঙ্গা লাগানোর সময় যে ব্যক্তি অঙ্গীকার করেছে যে, আমি খাব না, ফলে সে দুর্বল হয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়েছে-তার এহেন কর্মকাণ্ডকেও শরিয়ত নিন্দা জানায়। অনুরূপভাবে যে তাকে বলেছে, 'শাবাশ, এ অবস্থার ওপরই অটল থাকো, তাহলে নাজাত পাবে।' তার এ কথা মারাত্মক ভ্রষ্টতা। কেননা এমন পরিস্থিতিতে তার উচিত ছিল, তাকে আহার করানো, যদিও তা রমযান মাস হোক। কেননা শরিয়তের বিধানমতে, যে ব্যক্তি কয়েকদিন রোযা রাখার ফলে দুর্বল হয়েছে এবং শিঙ্গা লাগানোর পর চৈতন্যশক্তি লোপ পেয়েছে, তার জন্য রোযা রাখা বৈধ নয়। হাদিসে আছে: হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'যে ব্যক্তি রমযানে ভীষণ ক্লান্ত হবে, সে যদি রোযা না ভাঙ্গে এবং সে কারণে তার মৃত্যু ঘটে, তাহলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'

গ্রন্থকার বলেন, আরেকটি বিশুদ্ধ সনদেও আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'যে ব্যক্তি রমযানে ভীষণ ক্লান্ত হবে, সে যদি রোযা না ভাঙ্গে এবং সে কারণে তার মৃত্যু ঘটে, তাহলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'

গ্রন্থকার বলেন, ইবনে খাফিফের অল্প আহারের ঘটনা শরিয়তের দৃষ্টিতে খুবই নিন্দনীয় কাজ। শরিয়তের বিষয়ে অজ্ঞ ব্যক্তিরা এমন অমূলক মন্তব্য করতে পারে। গোশত ভক্ষণ থেকে বিরত থাকা হিন্দু ও বৌদ্ধদের কাজ—যারা প্রাণী হত্যা অবৈধ মনে করে। অথচ কোন খাবার মানুষের জন্য কল্যাণকর, সে বিষয়ে আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। তাই মানুষের শরীরকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি গোশত ভক্ষণ হালাল করেছেন। হাদিসে আছে: 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোশত খেতেন এবং ছাগলের রান পছন্দ করতেন।"
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আয়েশা রা. এর ঘরে প্রবেশ করলে তাঁর সামনে ঘরের স্বাভাবিক খাবার পেশ করা হলে তিনি বললেন, আমি তো ঘরের পাতিল থেকে গোশতের ঘ্রাণ পাচ্ছি।'

হযরত হাসান বসরি রহ. প্রতিদিন গোশত কিনতেন। আমাদের পূর্বসূরি মনীষীগণ এমনই ছিলেন। তবে যাঁরা তাঁদের মাঝে দরিদ্র ছিলেন এবং অভাবের কারণে গোশত খেতে পারতেন না—তাঁদের কথা ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে উষ্ণতা, শীতলতা, শুষ্কতা ও আর্দ্রতার মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। রক্ত, কফ, হলুদপিত্ত ও কালোপিত্তের ভারসাম্যের ওপর তার সুস্থতা নির্ভরশীল করেছেন। তাই শরীরের কোনো দেহরস বৃদ্ধি পেলে শরীর এমন খাদ্যের মুখাপেক্ষী হবে, যা বেড়ে যাওয়া দেহরসকে নিয়ন্ত্রণে আনবে। সুতরাং শরীর কোনো খাদ্যের প্রয়োজন অনুভব করলে তা তাকে না দেয়া শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করার শামিল। আল্লাহর সৃষ্টি-প্রকৃতি এটা কামনা করে না। এটা শরিয়ত ও বিবেকবর্জিত কাজ।
***

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫৪৪০, ৫৪৪৭, ৫৪৪৯, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২০৪৩
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫৪৩১, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৪৭৪
২. হাদিসটির সনদ দুর্বল। তারিখে বাগদাদ: ১০/২৭০।
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৩৩৪০
৪. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫০৯৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00