📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পোশাকের ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 পোশাকের ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, সুফিরা যখন শুনতে পেল,
كَانَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَرْقَعُ ثَوْبَه 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তালিযুক্ত কাপড় পরিধান করেছেন!' এবং হজরত আয়েশা রা.-কে বলেছেন,
لَا تَخْلِعِي ثَوْبًا حَتَّى تَرْقِعِيهِ 'কাপড়ে তালিযুক্ত করার পূর্বে তা পরিধান থেকে বিরত হয়ো না।"

তারা আরও শুনল যে, হজরত উমর রা. এর কাপড় তালিযুক্ত ছিল। অনুরূপভাবে ওয়াইস কারনী স্বীয় পোশাকে তালি লাগিয়েছেন। তখন সুফিরাও নিজ পোশাকে তালি লাগাতে শুরু করে, যদিও তা নতুন কাপড় হোক না কেন। নতুন কাপড় ছিঁড়ে সেলাই করে নেয়। এটাকে তারা সুন্নত মনে করে। অথচ যাঁদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁরা অভাবের কারণেই তালি লাগিয়েছিলেন; নতুন কাপড় ছিঁড়ে তালি লাগাননি। মাসলামা ইবনে আবদুল মালেক বলেন, আমি একদিন হজরত ওমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. এর ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে ময়লা কাপড় পরিহিত অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাঁর স্ত্রী ফাতেমাকে বললাম, আমিরুল মুমিনিনের জামাটি ধুয়ে দাও। তখন ফাতেমা বলল, আল্লাহর কসম! এ জামা ছাড়া তাঁর অন্য কোনো জামা নেই। সুতরাং জরাজীর্ণ অবস্থা যার পছন্দ নয় এবং যে আর্থিকভাবেও অসচ্ছল নয়, তার জন্য তালিযুক্ত কাপড় পরার কোনো সার্থকতা থাকতে পারে না।

পোশাকের ক্ষেত্রে যুহদ

গ্রন্থকার বলেন, বর্তমান যুগের সুফিদের অবস্থা হচ্ছে, তারা বিভিন্ন রঙের দু'তিনটি কাপড় কিনে সেগুলোর বিভিন্ন স্থানে ফুটো করে তাতে তালি দেয়। সুফিদের এরূপ কাপড় পরিধান করার দু'টি সার্থকতা রয়েছে। ১. মনের খাহেশ পূরণ করা, ২. খ্যাতি অর্জন করা। কারণ এ ধরনের কাপড় পরিধান করলে যাহেদ ও সুফি হিসেবে পরিচিত হওয়া যাবে এবং প্রসিদ্ধি লাভ করা যাবে।

হজরত উমর রা. সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস গমন করলে সেখানকার খ্রিস্টান পুরোহিতরা জিজ্ঞেস করল, তোমাদের আমির কে? তখন সাহাবায়ে কেরাম সেনাদলের আমির আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ রা., খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা. ও অন্যান্যদেরকে তাদের সামনে পেশ করলে তারা বলল, আমাদের নিকট আমিরের যে বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে, এরা তো সেই ব্যক্তি নয়। তারা বলল, তোমাদের কি আমির আছেন, নাকি নেই? সাহাবারা বললেন, এরা ছাড়াও আমাদের একজন আমির আছেন। তারা বলল, তিনি কি এসব আমিরদেরও আমির? সাহাবারা বললেন, হ্যাঁ, উনি হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। তারা বলল, তোমরা তাঁকে আসতে বলো, আমরা তাঁকে দেখব। যদি তিনি আমাদের নিকট বর্ণিত গুণের অধিকারী ব্যক্তি হন, তাহলে বিনা যুদ্ধে আমরা বায়তুল মুকাদ্দাস তোমাদের নিকট হস্তান্তর করব। আর যদি তিনি উক্ত গুণের অধিকারী না হন, তাহলে আমরা তোমাদের নিকট তা হস্তান্তর করব না। আর তোমরা যদি আমাদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখো, তাহলে কিছুতেই আমাদের সাথে পারবে না। তখন মুসলমানরা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর নিকট লোক পাঠিয়ে তাঁকে বিষয়টি জানালে তিনি তাদের সামনে উপস্থিত হন। তখন যে কাপড়টি তাঁর পরনে ছিল, তাতে ছিল সতেরটি তালি-যার একটি ছিল চামড়ার। খ্রিস্টান পুরোহিতরা তাদের কাছে বর্ণিত গুণাবলি হজরত উমর রা.-এর মাঝে দেখতে পেয়ে বিনা যুদ্ধে বায়তুল মুকাদ্দাস তাঁর কাছে হস্তান্তর করল। কোথায় তিনি আর কোথায় এ যুগের মূর্খ সুফিরা!
***
গ্রন্থকার বলেন, পূর্বেকার মহান মনীষী ও আকাবিররা সাধারণত মধ্যম পর্যায়ের পোশাক পরতেন। তবে ঈদ, জুমা এবং মানুষের সাথে সাক্ষাৎকালে উত্তম পোশাক পরতেন। উত্তম পোশাক পরিধান করা তাঁদের কাছে কোনো নিন্দনীয় বিষয় ছিল না। মুসলিম শরিফের হাদিসে আছে, হজরত উমর রা. একবার মসজিদের কাছে রেখাবিশিষ্ট উত্তম জোড়া (লুঙ্গি-চাদর) বিক্রি হতে দেখে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি যদি জুমার দিন এবং বহিরাগত প্রতিনিধিদলের সামনে পরিধান করার জন্য এ জোড়াটি খরিদ করে নিতেন, তবে খুবই ভালো হতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ পোশাক তারাই পরে, যাদের পরকালে কোনো হিস্যা নেই।'

উক্ত হাদিসে রেশমি পোশাক হওয়ার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অস্বীকৃতি ছিল। নচেৎ হজরত উমর রা. এর কথা দ্বারা উত্তম পোশাক পরিধান করার বৈধতাই নয়; বরং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তার শ্রেষ্ঠত্বও প্রমাণিত হয়।

মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রহ. বলেন, তামিম দারি রা. এক হাজার দিরহাম দিয়ে একটি জোড়া (চাদর-লুঙ্গি) ক্রয় করেছিলেন। তিনি তা পরে তাহাজ্জুদ পড়তেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. প্রায় এক দিনার মূল্যমানের একটি কাপড় কিনতেন। এমনইভাবে পূর্বেকার বহু মনীষীর সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তাঁরা সাধারণত মধ্যম পর্যায়ের পোশাক পরিধান করতেন আর বাইরে বের হলে উত্তম পোশাক পরতেন।

আহওয়াস বর্ণনা করেন, আমার পিতা বলেছেন, আমি একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে হাজির হলাম। আমার জীর্ণশীর্ণ অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে সম্পদ আছে কি? আমি বললাম, জি হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করলেন, কী ধরনের সম্পদ আছে? আমি বললাম, সব ধরনের সম্পদই আছে। আল্লাহ তায়ালা আমাকে উট, ঘোড়া, ছাগল, গোলাম—সকল ধরনের সম্পদই দান করেছেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তায়ালা যেহেতু তোমাকে সম্পদ দান করেছেন, তাই তোমাকে সম্পদশালী হিসেবে প্রকাশ করা উচিত।

একবার হজরত আলী রা. রবী' ইবনে যিয়াদের অসুস্থতার সংবাদ শুনে তাকে দেখতে গেলেন। রবী' বললেন, আমিরুল মুমিনীন! আমি আপনার কাছে আমার ভাই আসেমের ব্যাপারে একটি অভিযোগ করছি। হজরত আলী রা. জিজ্ঞেস করলেন, কিসের অভিযোগ? রবী' বললেন, আসেম উত্তম পোশাক পরিত্যাগ করে জীর্ণশীর্ণ পোশাক পরছে। ফলে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছে। হজরত আলী রা. আসেমকে ডেকে তার প্রতি লক্ষ্য করে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন, তুমি জানো না যে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য দুনিয়াকে হালাল করে দিয়েছেন। তিনি তোমার থেকে দুনিয়া ছিনিয়ে নিতে চান না। আল্লাহর কসম! আল্লাহর নেয়ামত কথায় প্রকাশ করার চেয়ে আমার কাছে কাজে প্রকাশ করা অধিক পছন্দনীয়। তখন আসেম বললেন, আমিরুল মুমিনীন! আপনাকে দেখছি, আপনি মোটা কাপড় পরছেন এবং মোটা খাবার খাচ্ছেন। হজরত আলী রা. দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আসেম! আল্লাহ তায়ালা ন্যায়পরায়ণ ইমামদের ওপর জনসাধারণের অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলা আবশ্যক করে দিয়েছেন, যাতে দারিদ্র্য বেড়ে না যায়।

যদি কেউ মনে করে যে, উত্তম পোশাক পরাতে নফসানি খাহেশ পূরণ করা হয় অথচ নফস দমন করার চেষ্টা করা জরুরি। অনুরূপভাবে উত্তম পোশাক পরে সাজসজ্জা করা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। আর রিয়া বা লৌকিকতা চরম গর্হিত কাজ। এর জবাবে বলা যাবে-নফসের যে কোনো খাহেশ পূরণ করা নিন্দনীয় নয়। নিন্দনীয় তো সেটি, যা শরিয়তে নিষিদ্ধ এবং দীনের জন্য ক্ষতিকর। অনুরূপভাবে যে কোনো সাজসজ্জা নিন্দনীয় নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়না দ্বারা মুখ দেখেছেন এবং মাথার চুলে সিঁথি কেটেছেন। দাড়ি আঁচড়িয়েছেন।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ : " كَانَ نَفَرُ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْتَظِرُونَهُ عَلَى الْبَابِ فَخَرَجَ يُرِيدُهُمْ، وَفِي الدَّارِ رَكْوَةٌ فِيهَا مَاءً، فَجَعَلَ يَنْظُرُ فِي الْمَاءِ وَيُسَرِّى شَعْرَهُ وَلِحْيَتَهُ ، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَأَنْتَ تَفْعَلُ هَذَا؟ قَالَ: «نَعَمْ، إِذَا خَرَجَ الرَّجُلُ إِلَى إِخْوَانِهِ فَلْيُهَيِّئْ مِنْ نَفْسِهِ، فَإِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ
হজরত আয়েশা রা. বলেন, কিছু লোক ঘরের বাইরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য অপেক্ষা করছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ওই পাত্রে চেহারা দেখে মাথার চুল ও দাড়ি মোবারক বিন্যস্ত করেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনিও এমন করেন। উত্তরে বললেন, নিজ ভাইদের কাছে গেলে সেজেগুজে যাওয়া উচিত। কেননা আল্লাহ তায়ালা সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।”

মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি ইয়ামেনী চাদর ও একটি ওমানী লুঙ্গি ছিল। এ দু'টি কাপড় তিনি জুমা ও ঈদের দিন পরিধান করতেন। পরে ভাঁজ করে রেখে দিতেন।

টিকাঃ
২. মুসনাদে আহমাদ: ৬/১৬৭
৩. জামে' তিরমিযি: হাদিস নং ১৭৮০ [আলবানি রহ. হাদিসটিকে যঈফ বলেছেন]
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৮৮৬, ৩০৫৪, ৫৮৪১, ৫৯৮১, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২০৬৮
১. [মুনকার) হাদিসটির শেষাংশ সহিহ মুসলিমের হাদীসে দ্বারা প্রমাণিত

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পোশাকের ক্ষেত্রে যুহদ

📄 পোশাকের ক্ষেত্রে যুহদ


গ্রন্থকার বলেন, বর্তমান যুগের সুফিদের অবস্থা হচ্ছে, তারা বিভিন্ন রঙের দু'তিনটি কাপড় কিনে সেগুলোর বিভিন্ন স্থানে ফুটো করে তাতে তালি দেয়। সুফিদের এরূপ কাপড় পরিধান করার দু'টি সার্থকতা রয়েছে। ১. মনের খাহেশ পূরণ করা, ২. খ্যাতি অর্জন করা। কারণ এ ধরনের কাপড় পরিধান করলে যাহেদ ও সুফি হিসেবে পরিচিত হওয়া যাবে এবং প্রসিদ্ধি লাভ করা যাবে।

হজরত উমর রা. সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস গমন করলে সেখানকার খ্রিস্টান পুরোহিতরা জিজ্ঞেস করল, তোমাদের আমির কে? তখন সাহাবায়ে কেরাম সেনাদলের আমির আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ রা., খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা. ও অন্যান্যদেরকে তাদের সামনে পেশ করলে তারা বলল, আমাদের নিকট আমিরের যে বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে, এরা তো সেই ব্যক্তি নয়। তারা বলল, তোমাদের কি আমির আছেন, নাকি নেই? সাহাবারা বললেন, এরা ছাড়াও আমাদের একজন আমির আছেন। তারা বলল, তিনি কি এসব আমিরদেরও আমির? সাহাবারা বললেন, হ্যাঁ, উনি হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। তারা বলল, তোমরা তাঁকে আসতে বলো, আমরা তাঁকে দেখব। যদি তিনি আমাদের নিকট বর্ণিত গুণের অধিকারী ব্যক্তি হন, তাহলে বিনা যুদ্ধে আমরা বায়তুল মুকাদ্দাস তোমাদের নিকট হস্তান্তর করব। আর যদি তিনি উক্ত গুণের অধিকারী না হন, তাহলে আমরা তোমাদের নিকট তা হস্তান্তর করব না। আর তোমরা যদি আমাদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখো, তাহলে কিছুতেই আমাদের সাথে পারবে না। তখন মুসলমানরা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর নিকট লোক পাঠিয়ে তাঁকে বিষয়টি জানালে তিনি তাদের সামনে উপস্থিত হন। তখন যে কাপড়টি তাঁর পরনে ছিল, তাতে ছিল সতেরটি তালি-যার একটি ছিল চামড়ার। খ্রিস্টান পুরোহিতরা তাদের কাছে বর্ণিত গুণাবলি হজরত উমর রা.-এর মাঝে দেখতে পেয়ে বিনা যুদ্ধে বায়তুল মুকাদ্দাস তাঁর কাছে হস্তান্তর করল। কোথায় তিনি আর কোথায় এ যুগের মূর্খ সুফিরা!
***
গ্রন্থকার বলেন, পূর্বেকার মহান মনীষী ও আকাবিররা সাধারণত মধ্যম পর্যায়ের পোশাক পরতেন। তবে ঈদ, জুমা এবং মানুষের সাথে সাক্ষাৎকালে উত্তম পোশাক পরতেন। উত্তম পোশাক পরিধান করা তাঁদের কাছে কোনো নিন্দনীয় বিষয় ছিল না। মুসলিম শরিফের হাদিসে আছে, হজরত উমর রা. একবার মসজিদের কাছে রেখাবিশিষ্ট উত্তম জোড়া (লুঙ্গি-চাদর) বিক্রি হতে দেখে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি যদি জুমার দিন এবং বহিরাগত প্রতিনিধিদলের সামনে পরিধান করার জন্য এ জোড়াটি খরিদ করে নিতেন, তবে খুবই ভালো হতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ পোশাক তারাই পরে, যাদের পরকালে কোনো হিস্যা নেই।'

উক্ত হাদিসে রেশমি পোশাক হওয়ার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অস্বীকৃতি ছিল। নচেৎ হজরত উমর রা. এর কথা দ্বারা উত্তম পোশাক পরিধান করার বৈধতাই নয়; বরং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তার শ্রেষ্ঠত্বও প্রমাণিত হয়।

মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রহ. বলেন, তামিম দারি রা. এক হাজার দিরহাম দিয়ে একটি জোড়া (চাদর-লুঙ্গি) ক্রয় করেছিলেন। তিনি তা পরে তাহাজ্জুদ পড়তেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. প্রায় এক দিনার মূল্যমানের একটি কাপড় কিনতেন। এমনইভাবে পূর্বেকার বহু মনীষীর সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তাঁরা সাধারণত মধ্যম পর্যায়ের পোশাক পরিধান করতেন আর বাইরে বের হলে উত্তম পোশাক পরতেন।

আহওয়াস বর্ণনা করেন, আমার পিতা বলেছেন, আমি একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে হাজির হলাম। আমার জীর্ণশীর্ণ অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে সম্পদ আছে কি? আমি বললাম, জি হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করলেন, কী ধরনের সম্পদ আছে? আমি বললাম, সব ধরনের সম্পদই আছে। আল্লাহ তায়ালা আমাকে উট, ঘোড়া, ছাগল, গোলাম—সকল ধরনের সম্পদই দান করেছেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তায়ালা যেহেতু তোমাকে সম্পদ দান করেছেন, তাই তোমাকে সম্পদশালী হিসেবে প্রকাশ করা উচিত।

একবার হজরত আলী রা. রবী' ইবনে যিয়াদের অসুস্থতার সংবাদ শুনে তাকে দেখতে গেলেন। রবী' বললেন, আমিরুল মুমিনীন! আমি আপনার কাছে আমার ভাই আসেমের ব্যাপারে একটি অভিযোগ করছি। হজরত আলী রা. জিজ্ঞেস করলেন, কিসের অভিযোগ? রবী' বললেন, আসেম উত্তম পোশাক পরিত্যাগ করে জীর্ণশীর্ণ পোশাক পরছে। ফলে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছে। হজরত আলী রা. আসেমকে ডেকে তার প্রতি লক্ষ্য করে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন, তুমি জানো না যে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য দুনিয়াকে হালাল করে দিয়েছেন। তিনি তোমার থেকে দুনিয়া ছিনিয়ে নিতে চান না। আল্লাহর কসম! আল্লাহর নেয়ামত কথায় প্রকাশ করার চেয়ে আমার কাছে কাজে প্রকাশ করা অধিক পছন্দনীয়। তখন আসেম বললেন, আমিরুল মুমিনীন! আপনাকে দেখছি, আপনি মোটা কাপড় পরছেন এবং মোটা খাবার খাচ্ছেন। হজরত আলী রা. দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আসেম! আল্লাহ তায়ালা ন্যায়পরায়ণ ইমামদের ওপর জনসাধারণের অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলা আবশ্যক করে দিয়েছেন, যাতে দারিদ্র্য বেড়ে না যায়।

যদি কেউ মনে করে যে, উত্তম পোশাক পরাতে নফসানি খাহেশ পূরণ করা হয় অথচ নফস দমন করার চেষ্টা করা জরুরি। অনুরূপভাবে উত্তম পোশাক পরে সাজসজ্জা করা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। আর রিয়া বা লৌকিকতা চরম গর্হিত কাজ। এর জবাবে বলা যাবে-নফসের যে কোনো খাহেশ পূরণ করা নিন্দনীয় নয়। নিন্দনীয় তো সেটি, যা শরিয়তে নিষিদ্ধ এবং দীনের জন্য ক্ষতিকর। অনুরূপভাবে যে কোনো সাজসজ্জা নিন্দনীয় নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়না দ্বারা মুখ দেখেছেন এবং মাথার চুলে সিঁথি কেটেছেন। দাড়ি আঁচড়িয়েছেন।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ : " كَانَ نَفَرُ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْتَظِرُونَهُ عَلَى الْبَابِ فَخَرَجَ يُرِيدُهُمْ، وَفِي الدَّارِ رَكْوَةٌ فِيهَا مَاءً، فَجَعَلَ يَنْظُرُ فِي الْمَاءِ وَيُسَرِّى شَعْرَهُ وَلِحْيَتَهُ ، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَأَنْتَ تَفْعَلُ هَذَا؟ قَالَ: «نَعَمْ، إِذَا خَرَجَ الرَّجُلُ إِلَى إِخْوَانِهِ فَلْيُهَيِّئْ مِنْ نَفْسِهِ، فَإِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ
হজরত আয়েশা রা. বলেন, কিছু লোক ঘরের বাইরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য অপেক্ষা করছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ওই পাত্রে চেহারা দেখে মাথার চুল ও দাড়ি মোবারক বিন্যস্ত করেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনিও এমন করেন। উত্তরে বললেন, নিজ ভাইদের কাছে গেলে সেজেগুজে যাওয়া উচিত। কেননা আল্লাহ তায়ালা সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।”

মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি ইয়ামেনী চাদর ও একটি ওমানী লুঙ্গি ছিল। এ দু'টি কাপড় তিনি জুমা ও ঈদের দিন পরিধান করতেন। পরে ভাঁজ করে রেখে দিতেন।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৮৮৬, ৩০৫৪, ৫৮৪১, ৫৯৮১, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২০৬৮
১. [মুনকার) হাদিসটির শেষাংশ সহিহ মুসলিমের হাদীসে দ্বারা প্রমাণিত

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পানাহারের ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 পানাহারের ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


গ্রন্থকার বলেন, প্রথম যুগের সুফিদেরকে শয়তান এমন চক্রান্তের জালে আটকিয়েছে যে, তাদেরকে শুকনা ও মোটা খাবার খেতে বাধ্য করেছে। তারা ঠান্ডা পানি পান করত না। তবে পরবর্তী সুফিদের ক্ষেত্রে শয়তান তার কৌশল পরিবর্তন করেছে। এতে করে সুফিরা কষ্ট-মুজাহাদা থেকে বিতৃষ্ণ হয় এবং অধিক আহার ও বিলাসী জীবনযাপনে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে。

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পানাহারের ব্যাপারে প্রথম যুগের সুফিদের কিছু কর্মকাণ্ড ও তার জবাব

📄 পানাহারের ব্যাপারে প্রথম যুগের সুফিদের কিছু কর্মকাণ্ড ও তার জবাব


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, অনেক সুফি কয়েক দিন ধরে না খেয়ে থাকত। আবার কেউ কেউ প্রতিদিন অল্প অল্প করে কিছু খেত, যাতে জীবন টিকে থাকে। সাহাল ইবনে আবদুল্লাহ শুরুর দিকে এক দিরহাম মূল্যের খেজুরের রস, এক দিরহাম মূল্যের ঘি ও এক দিরহাম মূলার আটা এক সাথে মিশিয়ে তিনশ ঘাট ভাগ করে রেখে দিতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক এক ভাগ দ্বারা ইফতার করতেন। আবু হামেদ তুসি বর্ণনা করেন, সাহল ইবনে আবদুল্লাহ দীঘদিন শুধু গাছের পাতা খেয়ে দিনাতিপাত করতেন। এরপর শুধু ভুসি খেয়ে দিন কাটাতেন। গোটা বছর তিনি মাত্র তিন দিরহাম মূল্যের খাদ্য গ্রহণ করেছেন।

আবু জাফর হাদ্দাদ বলেন, একবার আমি এক পানির হাউজের তীরে উপবিষ্ট ছিলাম। এমতাবস্থায় আমার কাছে আবু তুরাব এসে উপস্থিত। আমি খোলদিন যাবৎ কিছুই খাইনি। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার কী অবস্থা? তুমি এখানে বসে আছ কেন? উত্তরে আমি বললাম, ইলম ও ইয়াকিনের শ্রেষ্ঠত্বের পরীক্ষা চালাচ্ছি। দেখব কোন্‌টি জয়ী হয়। যে জয়ী হবে, আমি তারই অনুসরণ করব। আবু তুরাব বললেন, অচিরেই তুমি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হতে পারবে।

ইবরাহিম ইবনে বাল্লা বাগদাদি বলেন, আমি একবার আহওয়াইয়াম থেকে ইস্কান্দারিয়া পর্যন্ত জুনুন মিসরির সাথে ছিলাম। পথিমধ্যে ইফতারের সময় হলে আমি রুটির টুকরো ও লবণ বের করে তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, আসুন, ইফতার করুন। তিনি বললেন, তোমার লবণ কি পিষা ও চূর্ণিত? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তুমি সফল হতে পারবে না। অতঃপর আমি তার খাদ্য-স্থলে সন্ধান করে দেখি, সামান্য কিছু যবের ছাতু আছে। তিনি ওই ছাতুটুকু খেয়ে নিলেন।

সাহল ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, আমি মানুষের জন্য আল্লাহর حجت বা প্রমাণ। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো কীভাবে? তিনি বললেন, আমি হালাল খাদ্য গ্রহণ করি। এসো আমরা সবাই মিলে হালাল খাবার চিনে নিই। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কি হালাল খাবার চিনে নিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করা হলো কীভাবে চিনতে পারলেন? তিনি বললেন, আমি আপন জ্ঞান, মারেফত ও শক্তিকে সাত ভাগ করি এবং এভাবে রেখে দিই। যখন কেবল একটি অবশিষ্ট থাকে, আর ছয়টি বিলীন হয়ে যায়, তখন একটিও বিলীন হয়ে যাবে এবং মৃত্যু এসে যাবে—এ আশঙ্কায় তাকে বেঁচে রাখা পরিমাণ খাবার দিই, যাতে ওই ছয়টিও ফিরে আসে।

আবু আবদুল্লাহ ইবনে মুফলিহ তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, আমাকে আবু আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ বলেছেন, আমি আজ চল্লিশ বছর যাবৎ এমন অবস্থায় উপনীত হওয়ার আগে খাদ্য গ্রহণ করি না, যে অবস্থায় উপনীত হলে শরিয়ত মৃত প্রাণী খাওয়ার অনুমতি দেয়।

ঈসা ইবনে আদম বলেন, জনৈক ব্যক্তি সুফি আবু ইয়াযিদের কাছে এসে বলল, জনাব! আমি আপনার এ স্থানে বসতে চাই। মেহেরবানি করে একটু অনুমতি দিন। আবু ইয়াযিদ বলল, তুমি এ স্থানের যোগ্য নও। সে আবারও অনুরোধ জানালে আবু ইয়াযিদ তাকে অনুমতি দেন। একদিন অনাহারে থাকার পর দ্বিতীয় দিন বলল, জনাব! আমার খাদ্যের প্রয়োজন। আবু ইয়াযিদ বলল, বৎস! আমাদের এখানে খাদ্য হলো আল্লাহর যিকির। সে বলল, তাহলে আমাকে এমন জিনিস দান করুন, যা দ্বারা আমার দেহ টিকে থাকে এবং সর্বদা আল্লাহর ইবাদত করতে পারি। আবু ইয়াযিদ বলল, বৎস! দেহ আল্লাহর যিকির দ্বারাই টিকে থাকবে।

ইবরাহিম খাওয়াস বলেন, আবু তুরাবের সাহচর্য লাভ করেছে—এমন এক ব্যক্তি আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, একদিন আবু তুরাব জনৈক সুফিকে তরমুজের খোসার দিকে হাত বাড়াতে দেখে বলল, তুমি তাসাওউফের যোগ্য নও, এখনই তোমার বাজারে চলে যাওয়া উচিত।

আবুল কাসেম কিরওয়ানী বলেন, আমার এক সাথিকে বলতে শুনেছি, আবুল হাসান নাসিবী হারাম শরিফে কিছু সাথি নিয়ে অবস্থান করেন। তাঁরা সাতদিন অনাহারে থাকার পর এক সাথি পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্যে বের হয়ে সামনে এক তরমুজের খোসা দেখতে পেয়ে সেটি উঠিয়ে ভক্ষণ করলে এক লোক তা দেখে ফেলে। তখন লোকটি আরও কিছু তরমুজের খোসা তার সামনে হাজির করলে সে তা নিয়ে সাথিদের সামনে বিনয়ের সাথে পেশ করে। খোসা দেখে শায়খ আবুল হাসান নাসিবী বললেন, তোমাদের কে এই অপরাধ করেছে? সে তখন বলল, আমি। আবুল হাসান বললেন, যাও, তুমি তোমার অপরাধসহ থেকে যাও এবং এ খাবার সামলিয়ে রাখো। শায়খ আবুল হাসান নাসিবী তার সাথিদের নিয়ে হারাম শরিফ থেকে বের হলে সে লোকটিও তাদের অনুসরণ করে। তখন শায়খ নাসিবী বলেন, আমি কি তোমাকে তোমার অপরাধের সাথেই থাকতে বলিনি? লোকটি বলল, আমার অপরাধ থেকে আমি আল্লাহর কাছে তাওবাহ করেছি। পরে শায়খ বললেন, তাওবাহ করলে আমাদের সাথে থাকতে পার।

বুনান ইবনে মুহাম্মাদ বলেন, আমি মক্কায় হারাম শরিফে অবস্থান করছিলাম। সেখানেই ইবরাহিম খাওয়াসের সাথে সাক্ষাৎ হয়। লাগাতার কয়েকদিন আমি অনাহারে ছিলাম। মক্কায় মুযাইন নামক এক ক্ষৌরিক ছিল। সে ফকিরদেরকে অত্যন্ত ভালোবাসত। যে কোনো ফকির তার কাছে শিঙ্গা লাগাতে গেলে তাকে সে গোশত ও রুটি খাইয়ে দিত। আমিও শিঙ্গা লাগানোর জন্য তার কাছে গেলাম। সে গোশত কিনে রুটি তৈরি করার নির্দেশ দিয়ে আমার শিঙ্গা লাগানোর কাজ শুরু করল। তখন আমার নফস আমাকে বলতে লাগল, রুটি গোশত রান্না হচ্ছে। শিঙ্গা লাগানোর কাজ থেকে অবসর হলেই মজা করে রুটি-গোশত খেতে পারবে। তৎক্ষণাৎ আমার চৈতন্য ফিরে আসে। আমি মনে মনে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করে ফেললাম যে, ক্ষৌরিকের খাবার হতে বিন্দুমাত্রও আমি খাব না। কাজ সমাপ্ত হলে আমি ওঠে চলে আসতে লাগলাম। ক্ষৌরিক বলল, এ কী করছেন? আমার রীতি সম্পর্কে আপনি জানেন না? আমি বললাম, আমি কিছুই খাব না-এ ব্যাপারে আল্লাহর সাথে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ। এর পর আমি হেরেম শরিফে চলে এলাম। ওই দিন খাওয়ার কিছুই মেলেনি। পরের দিনও আসর পর্যন্ত কিছু না খেয়ে কেটে গেল। আসরের নামাযের জন্য বের হলে হঠাৎ বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে যাই। মানুষে এসে আমার কাছে ভিড় করল। ইবরাহিম খাওয়াসও এলেন। তিনি আমার কাছে বসে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কিছু খাবে কি? আমি বললাম, এখন তো রাত ঘনিয়ে এসেছে। ইবরাহিম বলল, হ্যাঁ। শাবাশ, এ অবস্থার ওপরই অটল থাকো, তাহলে নাজাত পাবে। অতঃপর ইবরাহিম খাওয়াস ওঠে চলে গেলেন।

এশার নামাযের পর তিনি আমার জন্য দু'টি রুটি ও এক পেয়ালা মসুরের ডাল হাতে করে নিয়ে এলেন। আমি সেগুলো খেলাম। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আরও ক্ষুধা আছে কি? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি আরও এক পেয়ালা ডাল ও দু'টি রুটি নিয়ে এলেন। আমি সেগুলো খেয়ে বললাম, এবার পেট ভরে গেছে। খানা খাওয়ার পর ঘুমিয়ে গেলাম। ভোর পর্যন্ত ঘুমালাম। ওই রাতে কোনো নামাযও পড়িনি, তাওয়াফও করিনি।

মানসূর ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, আমি আবু আলী রুযবারীকে বলতে শুনেছি, কোনো সুফি যদি পাঁচদিন উপবাসের পর বলে যে, আমি ক্ষুধার্ত, তাহলে তাকে জোরপূর্বক বাজারে পাঠিয়ে রুজি উপার্জনের নির্দেশ দাও।

ইবনে বাকুইয়া বলেন, আমি আবু আহমদ সগীরকে বলতে শুনেছি, আবু আবদুল্লাহ খাফিফ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তাকে ইফতার করার জন্য প্রতিরাতে তার সামনে দশটি কিশমিশ উপস্থিত করি। আমি অনুগ্রহ করে এক রাতে তার জন্য পনেরটি কিসমিস পেশ করলে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাকে এ নির্দেশ কে দিয়েছে? তিনি তা হতে কিশমিশের দশটি দানা খেয়ে অবশিষ্টগুলো রেখে দেন।

আবদুল্লাহ ইবনে খাফিফ বলেন, আমি যখন মুবতাদী তথা তাসাওউফের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলাম, তখন চল্লিশ মাস এভাবে কেটেছে যে, রাতে শুধু এক মুষ্টি ছাতু দ্বারা ইফতার করতাম। একদিন আমি শিঙ্গা লাগালাম। শরীর থেকে কেবল কিছু পানি বের হলো। ক্ষৌরিক বলল, এমন রক্তশূন্য শরীর আর কখনো দেখিনি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00