📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 দারিদ্রতা ও অনুন্নততার বৈধবিধান

📄 দারিদ্রতা ও অনুন্নততার বৈধবিধান


জেনে রাখা উচিত— দরিদ্রতা একটি রোগ। সুতরাং যে তাতে আক্রান্ত হবে এবং তার ওপর ধৈর্যধারণ করবে, সে অবশ্যই সবরের সাওয়াব পাবে। এ কারণে দরিদ্ররা ধনীদের পাঁচশত বছর পূর্বে জান্নাতে যাবে। সম্পদ যেহেতু নেয়ামত, তাই সম্পদশালীর জন্য শোকর আদায় করা কর্তব্য। তার দায়িত্ব হচ্ছে, আল্লাহর নির্দেশিত পথে তা ব্যয় করা। এ কারণে সম্পদের হিসাব দিতে গিয়ে ধনীরা বিলম্বে জান্নাতে যাবে। আবু আবদুর রহমান সালামী তাঁর প্রণীত 'সুনানুস্ সূফিয়্যাহ' গ্রন্থে দরিদ্র ব্যক্তি মৃত্যুর সময় কোনো সম্পদ রেখে যাওয়া মাকরুহ সংক্রান্ত একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, যেখানে উল্লেখ আছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আহলে সুফফার জনৈক ব্যক্তির ইন্তেকাল হলে তার জুব্বার মাঝে দু'টি দিনার পাওয়া যায়। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করা হলে তিনি বললেন, 'এ-তো জাহান্নামের দু'টি দাগ।'

গ্রন্থকার বলেন, উপরোক্ত হাদিস দ্বারা মৃত্যুর সময় ধন-সম্পদ রেখে যাওয়া মাকরুহ হওয়াকে বোঝায় না। এর পটভূমি ভিন্ন। কেননা আহলে সুফ্ফার এ দরিদ্র লোক সদকা গ্রহণ ও সম্পদ সঞ্চয়ের ব্যাপারে দরিদ্রদের সাথে বাদানুবাদ করতেন। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জমাকৃত সম্পদের বিষয়ে বলেছেন, 'এ-তো জাহান্নামের দু'টি দাগ।' ধন-সম্পদ রেখে যাওয়া মাকরুহ হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-কে সম্পদ রেখে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন না। হজরত সাআদ রা.-কে উদ্দেশ্য করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِنَّكَ أَنْ تَتْرُكَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَتْرُكَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ
'তুমি তোমার ওয়ারিসদেরকে সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়া তাদেরকে দরিদ্রাবস্থায় রেখে যাওয়া থেকে উত্তম। যাতে তারা মানুষের দ্বারস্থ হতে না হয়।'

হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সদকার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করলে আমি আমার অর্ধেক সম্পদ নিয়ে আসি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ? আমি বললাম, অনুরূপ সম্পদ রেখে এসেছি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে আমার নিন্দা করেননি।'

ইবনে জারির তাবারি বলেন, এ হাদিসটি জাহেল সুফিদের বক্তব্যের বিরুদ্ধে যথার্থ। কেননা তারা মনে করে, আগামী দিনের জন্য কোনো কিছু অবশিষ্ট রাখা বৈধ নয়। এমন করা আল্লাহ তায়ালার রিযিকের জিম্মাদারির ব্যাপারে অনাস্থা প্রকাশ করার নামান্তর। এটাকে তারা তাওয়াক্কুলপরিপন্থী হিসেবেও বিবেচনা করে। ইবনে জারির বলেন, অনুরূপভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
اتَّخِذُوا الْغَنَمَ فَإِنَّ فِيهَا بَرَكَةً
'তোমরা ছাগল প্রতিপালন করো। কেননা এটা বরকতময় প্রাণী।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বাণী এ সকল সুফিদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে, যারা বলে, আল্লাহর ওপর বান্দার তাওয়াক্কুল তখনই বিশুদ্ধ হবে, যখন সকালবেলা তার কাছে সম্পদ বা খাবার কিছু থাকবে না, অনুরূপভাবে বিকালও এভাবে কাটাবে। অথচ হাদিসে আছে,
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় স্ত্রীদের জন্য এক বছরের খাবার মজুদ রেখেছেন。
***
কোনো কোনো সুফি এমনও আছেন, যারা তার মালিকানাধীন সকল প্রকার ধন-সম্পদ সদকা করে মানুষের কাছে হাত পাতে। এর কারণ হচ্ছে, মানুষের চাহিদা অপরিসীম। এ জন্য বুদ্ধিমানরা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে। হাদিসে আছে, আবু হোসাইন তাদের খনি থেকে এক টুকরো স্বর্ণ নিয়ে আসেন। অতঃপর তা দ্বারা ঋণ পরিশোধের পর কবুতরের ডিম পরিমাণ কিছু স্বর্ণ থেকে গেলে তিনি তা নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি যা ভালো মনে করেন, তদনুযায়ী তা ব্যয় করুন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ডান পাশে এলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নেন। অতঃপর সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাম পাশে এলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নেন। অতঃপর সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাথা মোবারক নিচু করে রাখেন। স্বর্ণ গ্রহণের ব্যাপারে তার পীড়াপীড়ির মাত্রা বেড়ে গেলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত থেকে নিয়ে টুকরোটি এমনভাবে নিক্ষেপ করেন, যদি তার গায়ে আঘাত লাগত, সে নির্ঘাত মৃত্যুবরণ করত। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের কারও অবস্থা তো এমন যে, তার সম্পদের পুরো অংশ সদকা করার পর নিঃস্ব হয়ে মানুষের কাছে হাত পাতে। হে বেকুব! সদকা তো সচ্ছলতার সাথে করতে হয়, আর সদকার সর্বাধিক হকদার হচ্ছে তোমার পরিবার। সুতরাং তাদেরকে দিয়ে শুরু করো।”

أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ، يَقُولُ: " دَخَلَ رَجُلُ الْمَسْجِدَ، فَأَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَطْرَحُوا ثِيَابًا فَطَرَحُوا، فَأَمَرَ لَهُ بِثَوْبَيْنِ ، ثُمَّ حَتَّ عَلَى الصَّدَقَةِ، فَجَاءَ، فَطَرَحَ أَحَدَ التَّوْبَيْنِ، فَصَاحَ بِهِ، وَقَالَ: «خُذْ ثَوْبَكَ
'হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, একবার জনৈক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে কাপড় সদকা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন। তারা বেশ কিছু কাপড় সদকা করল। এসব কাপড় থেকে দু'টি কাপড় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই ব্যক্তিকে দান করলেন। কিছুক্ষণ পর আবার সদকার জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন। তখন ওই ব্যক্তিও কাপড় দু'টি সদকা করে দিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কাপড় নিয়ে নাও।'
***
অনেক সুফি এমন আছেন—যাদের হাতে কোনো মাল থাকলে তারা তা খরচ করে বলেন, আমি আল্লাহ ছাড়া কারও ওপর নির্ভর করতে চাই না। অথচ শরিয়ত সম্পর্কে স্বল্প জ্ঞানের কারণেই তারা এমনটি বলে থাকেন। কেননা তারা মনে করে, তাওয়াক্কুলের অর্থই হচ্ছে আসবাবমুক্ত হওয়া এবং ধন-সম্পদ থেকে দূরে থাকা।

হাফেজ আবু নুয়াইম বলেন, জাফর খুলদি তার কিতাবে লেখেন, আমি জুনাইদ বাগদাদিকে বলতে শুনেছি, আমরা একবার দলবদ্ধ হয়ে আবু ইয়াকুব যাইয়্যাতের বাড়িতে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লে তিনি বললেন, আল্লাহর ইবাদতে কি এমন ব্যস্ততা নেই, যা তোমাদেরকে আমার নিকট আসতে বাধা দেয়? তখন আমি বললাম, আপনার নিকট আমাদের আগমন তো আল্লাহর ইবাদতে ব্যস্ততারই অংশবিশেষ। তখন আমরা তাকে তাওয়াক্কুল বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি সাথে থাকা একটি দিরহাম দান করে আমাদেরকে তাওয়াক্কুলের সঠিক বর্ণনা দিয়ে বললেন, আমার কাছে সম্পদ বিদ্যমান থাকাবস্থায় তোমাকে তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা দিতে আমি লজ্জাবোধ করছি।

গ্রন্থকার বলেন, সুফিরা তাওয়াক্কুলের অর্থই বোঝে না। তাই তারা মাল থেকে পৃথক হয়ে যায়। সাহাবায়ে কেরাম রা. সম্পদ অর্জন করেছেন। এ কথা কি বলা যাবে যে, তাদের তাওয়াক্কুল কম ছিল? তাদের যদি তাওয়াক্কুল না থাকে, তবে আর কার তাওয়াক্কুল থাকবে? হজরত আবু বকর রা. যখন খলিফা নিযুক্ত হন এবং খিলাফতের দায়িত্ব পালনের দরুন ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়, তখন বলেছিলেন, যদি আমার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়, তবে আমার পরিবারের ভরণ-পোষণ চলবে কীভাবে? হজরত আবু বকর রা. এক্ষেত্রে মালের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। তাহলে সুফিদের মতে আবু বকর রা. এর কথা (নাউযুবিল্লাহ) তাওয়াক্কুলপরিপন্থী হয়েছে? এটা কখনো হতে পারে না। মাল হলো আসবাব ও উপকরণ। উপকরণ অবলম্বন করার পরও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে হবে। আর উপকরণ অবলম্বন তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। অনেক সুফি বলেন, অমুক জিনিস ক্ষতি করেছে—এ কথা বলা ঠিক নয়। কেননা ক্ষতি ও উপকারের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর তারা এ ব্যাপারে একটি ঘটনাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে।

আবু তালেব রাযি. বলেন, আমি আমার সঙ্গীদের সাথে কোনো এক স্থানে অবস্থান করছিলাম। সেখানকার লোকেরা কিছু দুধ নিয়ে এল এবং আমাকে দুধ পান করতে বলল। আমি বললাম, আমি দুধ পান করব না। কেননা দুধ আমার জন্য ক্ষতিকর। এ ঘটনার চল্লিশ বছর পর আমি একবার মাকামে ইবরাহীমিতে নামায আদায় করে আল্লাহর কাছে দোয়া করে বললাম, হে আল্লাহ! আপনি জানেন, আমি এক মুহূর্তের জন্যও কখনো আপনার সাথে কাউকে শরিক করিনি। তৎক্ষণাৎ এক আওয়াজ এল, দুধের দিন কি শরিক করোনি?

গ্রন্থকার বলেন, এ ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে প্রশ্ন রয়েছে। 'অমুক জিনিস ক্ষতিকর'-এর অর্থ হচ্ছে, এটা ক্ষতির কারণ। এর অর্থ এই নয় যে, এটা আল্লাহর হুকুম না হলেও ক্ষতি করতে পারবে। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলেছিলেন-
رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيراً مِنَ النَّاسِ
'মূর্তিরা বহু লোককে পথভ্রষ্ট করে ফেলেছে।” হাদিসে আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: مَا نَفَعَنِي مَالَ كَمَالِ أَبِي بَكْرٍ
'আবু বকরের ধন-সম্পদ আমাকে যতটুকু উপকৃত করেছে, অন্য কারও ধন-সম্পদে আমি সেই পরিমাণ উপকৃত হইনি।' বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে খাইবারে জনৈকা ইহুদি মহিলা বিষমিশ্রিত গোশত খাইয়েছিল এবং তার প্রতিক্রিয়া পরেও বাকি ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, 'বিষমিশ্রিত লোকমার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পাচ্ছে। এমনকি তা আমার দিলের রগগুলোও কেটে ফেলেছে।”

এটা সর্বজনবিদিত বিষয় যে, নবুয়তের স্তর সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্তর। সকল নবীদের সর্দার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপকারকে মালের দিকে আর ক্ষতিকে খাবারের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। সুতরাং তাঁর স্বভাব-চরিত্র ও আচার-ব্যবহারকে ডিঙিয়ে শরিয়তবিরোধী অসার মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড সাধনকারীদের ব্যাপারে কোনো তোয়াক্কা করা যাবে না।

টিকাঃ
১. এ-সংক্রান্ত হাদিস ইমাম আহমদ রহ. তাঁর 'মুসনাদ' এ সংকলন করেছেন।
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১২৯৫, ২৭৪২, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৬২৮
৩. [হাসান] সুনানে আবি দাউদ: হাদিস নং ১৬৭৮
৪৮. সহিহুল জামে': হাদিস নং ৮২
৪৯. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৪০৩৩, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৭৫৭
১. [আলবানির মতে হাদিসটি যঈফ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ৬৪০৮
২. সুনানে আবি দাউদ: হাদিস নং ১৬৭৫
১. সুরা ইবরাহীম: আয়াত ৩৬
২. জামে' তিরমিযি: হাদিস নং ৩৬৬২, সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ৯৪, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৩৮২
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৪৪২৮

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সম্পদ ত্যাগের ব্যাপারে সুফিদের মতবাদ

📄 সম্পদ ত্যাগের ব্যাপারে সুফিদের মতবাদ


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ইতোপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, প্রথম যুগের সুফিরা দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তির কারণেই ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা জমা করা থেকে বিরত থেকেছেন। এক্ষেত্রে তাদের নিয়ত তথা উদ্দেশ্য ভালো ছিল। তবে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তাদের বিচ্যুতি ঘটেছে। পূর্বের বর্ণনাগুলোতে তাদের বিবেকবর্জিত কর্মকাণ্ড থেকে আমরা তা আঁচ করতে পেরেছি। অন্যদিকে পরবর্তী যুগের সুফিদের অবস্থা সম্পূর্ণ বিরপীত ছিল। তারা দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। বৈধ-অবৈধের বাছ-বিচার ব্যতিরেকে ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা সঞ্চয় ও সংরক্ষণে মনোনিবেশ করেছে। যাতে করে দুনিয়াতে বিলাসী জীবনযাপন ও ভালো করে প্রবৃত্তির অনুসরণ করা যায়। তাদের কারও অবস্থা হচ্ছে এমন—এরা উপার্জনে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও কাজ করে না। তারা মসজিদে অথবা উপাসনালয়ে বসে মানুষের সদকার ওপর নির্ভর করে। দরজার কড়া নাড়ার দিকে তাদের মন পড়ে থাকে। অথচ এটা জানা কথা—ধনী ও উপার্জনে সক্ষম ব্যক্তির জন্য সদকা জায়েয নয়। কার কাছ থেকে এই ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা আসছে—এ ব্যাপারে তারা পরোয়া করে না। অত্যাচারী বা ট্যাক্স আদায়কারী তাদের নিকট কিছু পাঠালে তারা তা ফিরিয়ে দেন না। আরও ব্যাখ্যাস্বরূপ বলেন, আমাদের রিযিক তো আমাদের কাছে পৌঁছবেই। অথবা বলে, এ মাল তো আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে। সুতরাং তা ফিরিয়ে দেয়া উচিত নয়। অথচ তারা যা করছে, এর সবগুলোই শরিয়তবিরোধী এবং পূর্ববর্তী আকাবিরদের জীবনাচারের বিপরীত। কেননা হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, الْحَلَالَ بَيِّنُ، وَالْحَرَامَ بَيِّنٌ، وَإِنَّ بَيْنَ الْحَلَالِ وَالْحَرَامِ مُشَبَّهَاتٍ، لَا يَدْرِي كَثِيرُ مِنَ النَّاسِ أَمِنَ الْحَلَالِ هِيَ، أَمْ مِنَ الْحَرَامِ، فَمَنْ تَرَكَهَا، اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ
'হালাল ও হারামের বিষয় সুস্পষ্ট। আর এ উভয়ের মাঝে বহু সন্দেহযুক্ত বিষয় বিদ্যমান, অধিকাংশ মানুষ সে বিষয়ে অনবগত। সুতরাং আল্লাহর ভয়ে, এ সব সন্দেহযুক্ত বিষয় যে পরিহার করবে সে তার দীন ও সম্মান রক্ষায় চেষ্টা করল।'

হজরত আবু বকর রা. সন্দেহযুক্ত খাবার পেটে গেলে বমি করে তা বের করে আনেন। পূর্বেকার মহান মনীষীরা কোনো অত্যাচারীর দান গ্রহণ করতেন না এবং যার ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা সন্দেহযুক্ত—তার দান-অনুদান ও অনুকম্পাও গ্রহণ করতেন না। আবু বকর মারুযী বলেন, আমি আবু আবদুল্লাহর নিকট এক মুহাদ্দিসের আলোচনা তুললে তিনি বললেন, আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন—যদি তার মাঝে একটি স্বভাব না থাকত, তাহলে যোগ্যতা ও গুণাবলিতে তিনি থাকতেন অতুলনীয়। অতঃপর কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আমি তাকে বললাম, তিনি কি সুন্নাতের অনুসারী ছিলেন না? তিনি বললেন, আল্লাহ কসম! আমি তাঁর থেকেও হাদিস লিখেছি, কিন্তু তাঁর একটি বদস্বভাব হলো, তিনি কার কার কাছ থেকে ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা গ্রহণ করছেন—এ বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ করতেন না।

গ্রন্থকার বলেন, আমরা এ বার্তা পেয়েছি যে, জনৈক সুফি কোনো এক আমিরের দরবারে প্রবেশ করে আমিরকে ওয়াজ শোনালে আমির তাকে দানস্বরূপ কিছু সম্পদ বের করে এবং সে তা আগ্রহ-সহকারে গ্রহণ করে। তখন আমির বললেন, আমরা সবাই শিকারি, তবে শিকারের ফাঁদ বিভিন্ন রকম।
***
গ্রন্থকার বলেন, পূর্বেকার যুগের সুফিরা ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা অর্জনের বিষয়ে চিন্তা করতেন এবং তাদের খাবারের বিষয়ে খোঁজ নিতেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে বিখ্যাত সুফি সাররি সাকতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তিনি হালাল খাদ্য গ্রহণের বিষয়ে একজন প্রসিদ্ধ বুযুর্গ। সাররি সাকতি বলেন, জিহাদের উদ্দেশ্যে আমি এক দলের সাথে শরিক হলাম। তখন আমরা একটি ঘর ভাড়া নিয়ে তাতে আমি একটি চুলা তৈরি করলে আমার সাথিরা সেই চুলার রুটি খেতে ইতস্ততবোধ করে।

গ্রন্থকার বলেন, আমি এক সুফির নিকট তার শায়খের সন্ধান চাইলে সে আমাকে বলল, শায়খ তো অমুক আমিরের দরবারে গিয়েছেন। আমির আজ শায়খকে এক সম্মানসূচক পোশাক দ্বারা অভিবাদন জানাবেন, অবশ্য আমিও আমীরের কাছ থেকে এরূপ পোশাক পেয়েছি। অথচ সেই আমির জালেম হিসেবে বেশ প্রসিদ্ধ। তখন আমি বললাম, তোমাদের জন্য আফসোস হয়। তোমরা কেন ব্যবসার উদ্দেশ্যে দোকান খুলছ না? মাথায় পণ্য বহন করে ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা উপার্জন করছ না? উপার্জনে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও কেন তা থেকে বিরত থেকে মানুষের সদকা ও উপঢৌকনের ওপর নির্ভর করছ? কোথা হতে এই ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা আসছে, কে পাঠাচ্ছে-এ ব্যাপারে কিছুরই পরোয়া করছ না? তোমরা দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে রাজা-বাদশা ও ক্ষমতাসীনদের দুয়ারে ঘুরছ এবং তাদের অনুদান লাভের আশায় তাদের কাছে যাচ্ছ? আল্লাহর শপথ! তোমরা ইসলামের গায়ে বিরাট কলঙ্ক লেপন করছ।
***
গ্রন্থকার বলেন, অনেক সুফি শায়খ আছেন-যারা ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সার আধিক্য থাকা এবং তা সঞ্চয় ও সংরক্ষণের লোভ অন্তরে থাকা সত্ত্বেও সে দুনিয়াবিমুখিতার দাবি করে। কেউ কেউ আছেন-ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা অঢেল থাকা সত্ত্বেও অভাব প্রকাশ করেন। তারা যাকাত গ্রহণের ব্যাপারে দুঃস্থ-গরিবদেরকে বাধা দেয় এবং তাদের সাথে ঝগড়া- বিবাদ করে, কিন্তু নিজে তা ভালো করেই জমা করে। আবুল হাসান বুসতামী নামক এক সুফি শীত-গ্রীষ্ম উভয়কালে পশমি পোশাক পরতেন। তার উদ্দেশ্য ছিল, মানুষ যেন তার জুব্বা দ্বারা বরকত পেতে পারে। অথচ এই সুফি মৃত্যুর সময় চার হাজার দিনার রেখে যান।

গ্রন্থকার বলেন, এটা চরম গর্হিত কাজ। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আহলে সুফফার জনৈক ব্যক্তির ইন্তেকাল হলে তার জুব্বার মাঝে দু'টি দিনার পাওয়া যায়। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করা হলে তিনি বললেন, 'এ তো জাহান্নামের দু'টি দাগ।"

টিকাঃ
৪. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫২, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৫৯৯
১. এ সংক্রান্ত হাদিস ইমাম আহমদ রহ. তাঁর 'মুসনাদ' এ সংকলন করেছেন।

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পোশাকের ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 পোশাকের ব্যাপারে সুফিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, সুফিরা যখন শুনতে পেল,
كَانَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَرْقَعُ ثَوْبَه 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তালিযুক্ত কাপড় পরিধান করেছেন!' এবং হজরত আয়েশা রা.-কে বলেছেন,
لَا تَخْلِعِي ثَوْبًا حَتَّى تَرْقِعِيهِ 'কাপড়ে তালিযুক্ত করার পূর্বে তা পরিধান থেকে বিরত হয়ো না।"

তারা আরও শুনল যে, হজরত উমর রা. এর কাপড় তালিযুক্ত ছিল। অনুরূপভাবে ওয়াইস কারনী স্বীয় পোশাকে তালি লাগিয়েছেন। তখন সুফিরাও নিজ পোশাকে তালি লাগাতে শুরু করে, যদিও তা নতুন কাপড় হোক না কেন। নতুন কাপড় ছিঁড়ে সেলাই করে নেয়। এটাকে তারা সুন্নত মনে করে। অথচ যাঁদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁরা অভাবের কারণেই তালি লাগিয়েছিলেন; নতুন কাপড় ছিঁড়ে তালি লাগাননি। মাসলামা ইবনে আবদুল মালেক বলেন, আমি একদিন হজরত ওমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. এর ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে ময়লা কাপড় পরিহিত অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাঁর স্ত্রী ফাতেমাকে বললাম, আমিরুল মুমিনিনের জামাটি ধুয়ে দাও। তখন ফাতেমা বলল, আল্লাহর কসম! এ জামা ছাড়া তাঁর অন্য কোনো জামা নেই। সুতরাং জরাজীর্ণ অবস্থা যার পছন্দ নয় এবং যে আর্থিকভাবেও অসচ্ছল নয়, তার জন্য তালিযুক্ত কাপড় পরার কোনো সার্থকতা থাকতে পারে না।

পোশাকের ক্ষেত্রে যুহদ

গ্রন্থকার বলেন, বর্তমান যুগের সুফিদের অবস্থা হচ্ছে, তারা বিভিন্ন রঙের দু'তিনটি কাপড় কিনে সেগুলোর বিভিন্ন স্থানে ফুটো করে তাতে তালি দেয়। সুফিদের এরূপ কাপড় পরিধান করার দু'টি সার্থকতা রয়েছে। ১. মনের খাহেশ পূরণ করা, ২. খ্যাতি অর্জন করা। কারণ এ ধরনের কাপড় পরিধান করলে যাহেদ ও সুফি হিসেবে পরিচিত হওয়া যাবে এবং প্রসিদ্ধি লাভ করা যাবে।

হজরত উমর রা. সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস গমন করলে সেখানকার খ্রিস্টান পুরোহিতরা জিজ্ঞেস করল, তোমাদের আমির কে? তখন সাহাবায়ে কেরাম সেনাদলের আমির আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ রা., খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা. ও অন্যান্যদেরকে তাদের সামনে পেশ করলে তারা বলল, আমাদের নিকট আমিরের যে বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে, এরা তো সেই ব্যক্তি নয়। তারা বলল, তোমাদের কি আমির আছেন, নাকি নেই? সাহাবারা বললেন, এরা ছাড়াও আমাদের একজন আমির আছেন। তারা বলল, তিনি কি এসব আমিরদেরও আমির? সাহাবারা বললেন, হ্যাঁ, উনি হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। তারা বলল, তোমরা তাঁকে আসতে বলো, আমরা তাঁকে দেখব। যদি তিনি আমাদের নিকট বর্ণিত গুণের অধিকারী ব্যক্তি হন, তাহলে বিনা যুদ্ধে আমরা বায়তুল মুকাদ্দাস তোমাদের নিকট হস্তান্তর করব। আর যদি তিনি উক্ত গুণের অধিকারী না হন, তাহলে আমরা তোমাদের নিকট তা হস্তান্তর করব না। আর তোমরা যদি আমাদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখো, তাহলে কিছুতেই আমাদের সাথে পারবে না। তখন মুসলমানরা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর নিকট লোক পাঠিয়ে তাঁকে বিষয়টি জানালে তিনি তাদের সামনে উপস্থিত হন। তখন যে কাপড়টি তাঁর পরনে ছিল, তাতে ছিল সতেরটি তালি-যার একটি ছিল চামড়ার। খ্রিস্টান পুরোহিতরা তাদের কাছে বর্ণিত গুণাবলি হজরত উমর রা.-এর মাঝে দেখতে পেয়ে বিনা যুদ্ধে বায়তুল মুকাদ্দাস তাঁর কাছে হস্তান্তর করল। কোথায় তিনি আর কোথায় এ যুগের মূর্খ সুফিরা!
***
গ্রন্থকার বলেন, পূর্বেকার মহান মনীষী ও আকাবিররা সাধারণত মধ্যম পর্যায়ের পোশাক পরতেন। তবে ঈদ, জুমা এবং মানুষের সাথে সাক্ষাৎকালে উত্তম পোশাক পরতেন। উত্তম পোশাক পরিধান করা তাঁদের কাছে কোনো নিন্দনীয় বিষয় ছিল না। মুসলিম শরিফের হাদিসে আছে, হজরত উমর রা. একবার মসজিদের কাছে রেখাবিশিষ্ট উত্তম জোড়া (লুঙ্গি-চাদর) বিক্রি হতে দেখে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি যদি জুমার দিন এবং বহিরাগত প্রতিনিধিদলের সামনে পরিধান করার জন্য এ জোড়াটি খরিদ করে নিতেন, তবে খুবই ভালো হতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ পোশাক তারাই পরে, যাদের পরকালে কোনো হিস্যা নেই।'

উক্ত হাদিসে রেশমি পোশাক হওয়ার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অস্বীকৃতি ছিল। নচেৎ হজরত উমর রা. এর কথা দ্বারা উত্তম পোশাক পরিধান করার বৈধতাই নয়; বরং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তার শ্রেষ্ঠত্বও প্রমাণিত হয়।

মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রহ. বলেন, তামিম দারি রা. এক হাজার দিরহাম দিয়ে একটি জোড়া (চাদর-লুঙ্গি) ক্রয় করেছিলেন। তিনি তা পরে তাহাজ্জুদ পড়তেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. প্রায় এক দিনার মূল্যমানের একটি কাপড় কিনতেন। এমনইভাবে পূর্বেকার বহু মনীষীর সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তাঁরা সাধারণত মধ্যম পর্যায়ের পোশাক পরিধান করতেন আর বাইরে বের হলে উত্তম পোশাক পরতেন।

আহওয়াস বর্ণনা করেন, আমার পিতা বলেছেন, আমি একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে হাজির হলাম। আমার জীর্ণশীর্ণ অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে সম্পদ আছে কি? আমি বললাম, জি হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করলেন, কী ধরনের সম্পদ আছে? আমি বললাম, সব ধরনের সম্পদই আছে। আল্লাহ তায়ালা আমাকে উট, ঘোড়া, ছাগল, গোলাম—সকল ধরনের সম্পদই দান করেছেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তায়ালা যেহেতু তোমাকে সম্পদ দান করেছেন, তাই তোমাকে সম্পদশালী হিসেবে প্রকাশ করা উচিত।

একবার হজরত আলী রা. রবী' ইবনে যিয়াদের অসুস্থতার সংবাদ শুনে তাকে দেখতে গেলেন। রবী' বললেন, আমিরুল মুমিনীন! আমি আপনার কাছে আমার ভাই আসেমের ব্যাপারে একটি অভিযোগ করছি। হজরত আলী রা. জিজ্ঞেস করলেন, কিসের অভিযোগ? রবী' বললেন, আসেম উত্তম পোশাক পরিত্যাগ করে জীর্ণশীর্ণ পোশাক পরছে। ফলে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছে। হজরত আলী রা. আসেমকে ডেকে তার প্রতি লক্ষ্য করে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন, তুমি জানো না যে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য দুনিয়াকে হালাল করে দিয়েছেন। তিনি তোমার থেকে দুনিয়া ছিনিয়ে নিতে চান না। আল্লাহর কসম! আল্লাহর নেয়ামত কথায় প্রকাশ করার চেয়ে আমার কাছে কাজে প্রকাশ করা অধিক পছন্দনীয়। তখন আসেম বললেন, আমিরুল মুমিনীন! আপনাকে দেখছি, আপনি মোটা কাপড় পরছেন এবং মোটা খাবার খাচ্ছেন। হজরত আলী রা. দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আসেম! আল্লাহ তায়ালা ন্যায়পরায়ণ ইমামদের ওপর জনসাধারণের অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলা আবশ্যক করে দিয়েছেন, যাতে দারিদ্র্য বেড়ে না যায়।

যদি কেউ মনে করে যে, উত্তম পোশাক পরাতে নফসানি খাহেশ পূরণ করা হয় অথচ নফস দমন করার চেষ্টা করা জরুরি। অনুরূপভাবে উত্তম পোশাক পরে সাজসজ্জা করা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। আর রিয়া বা লৌকিকতা চরম গর্হিত কাজ। এর জবাবে বলা যাবে-নফসের যে কোনো খাহেশ পূরণ করা নিন্দনীয় নয়। নিন্দনীয় তো সেটি, যা শরিয়তে নিষিদ্ধ এবং দীনের জন্য ক্ষতিকর। অনুরূপভাবে যে কোনো সাজসজ্জা নিন্দনীয় নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়না দ্বারা মুখ দেখেছেন এবং মাথার চুলে সিঁথি কেটেছেন। দাড়ি আঁচড়িয়েছেন।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ : " كَانَ نَفَرُ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْتَظِرُونَهُ عَلَى الْبَابِ فَخَرَجَ يُرِيدُهُمْ، وَفِي الدَّارِ رَكْوَةٌ فِيهَا مَاءً، فَجَعَلَ يَنْظُرُ فِي الْمَاءِ وَيُسَرِّى شَعْرَهُ وَلِحْيَتَهُ ، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَأَنْتَ تَفْعَلُ هَذَا؟ قَالَ: «نَعَمْ، إِذَا خَرَجَ الرَّجُلُ إِلَى إِخْوَانِهِ فَلْيُهَيِّئْ مِنْ نَفْسِهِ، فَإِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ
হজরত আয়েশা রা. বলেন, কিছু লোক ঘরের বাইরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য অপেক্ষা করছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ওই পাত্রে চেহারা দেখে মাথার চুল ও দাড়ি মোবারক বিন্যস্ত করেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনিও এমন করেন। উত্তরে বললেন, নিজ ভাইদের কাছে গেলে সেজেগুজে যাওয়া উচিত। কেননা আল্লাহ তায়ালা সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।”

মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি ইয়ামেনী চাদর ও একটি ওমানী লুঙ্গি ছিল। এ দু'টি কাপড় তিনি জুমা ও ঈদের দিন পরিধান করতেন। পরে ভাঁজ করে রেখে দিতেন।

টিকাঃ
২. মুসনাদে আহমাদ: ৬/১৬৭
৩. জামে' তিরমিযি: হাদিস নং ১৭৮০ [আলবানি রহ. হাদিসটিকে যঈফ বলেছেন]
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৮৮৬, ৩০৫৪, ৫৮৪১, ৫৯৮১, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২০৬৮
১. [মুনকার) হাদিসটির শেষাংশ সহিহ মুসলিমের হাদীসে দ্বারা প্রমাণিত

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 পোশাকের ক্ষেত্রে যুহদ

📄 পোশাকের ক্ষেত্রে যুহদ


গ্রন্থকার বলেন, বর্তমান যুগের সুফিদের অবস্থা হচ্ছে, তারা বিভিন্ন রঙের দু'তিনটি কাপড় কিনে সেগুলোর বিভিন্ন স্থানে ফুটো করে তাতে তালি দেয়। সুফিদের এরূপ কাপড় পরিধান করার দু'টি সার্থকতা রয়েছে। ১. মনের খাহেশ পূরণ করা, ২. খ্যাতি অর্জন করা। কারণ এ ধরনের কাপড় পরিধান করলে যাহেদ ও সুফি হিসেবে পরিচিত হওয়া যাবে এবং প্রসিদ্ধি লাভ করা যাবে।

হজরত উমর রা. সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস গমন করলে সেখানকার খ্রিস্টান পুরোহিতরা জিজ্ঞেস করল, তোমাদের আমির কে? তখন সাহাবায়ে কেরাম সেনাদলের আমির আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ রা., খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা. ও অন্যান্যদেরকে তাদের সামনে পেশ করলে তারা বলল, আমাদের নিকট আমিরের যে বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে, এরা তো সেই ব্যক্তি নয়। তারা বলল, তোমাদের কি আমির আছেন, নাকি নেই? সাহাবারা বললেন, এরা ছাড়াও আমাদের একজন আমির আছেন। তারা বলল, তিনি কি এসব আমিরদেরও আমির? সাহাবারা বললেন, হ্যাঁ, উনি হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। তারা বলল, তোমরা তাঁকে আসতে বলো, আমরা তাঁকে দেখব। যদি তিনি আমাদের নিকট বর্ণিত গুণের অধিকারী ব্যক্তি হন, তাহলে বিনা যুদ্ধে আমরা বায়তুল মুকাদ্দাস তোমাদের নিকট হস্তান্তর করব। আর যদি তিনি উক্ত গুণের অধিকারী না হন, তাহলে আমরা তোমাদের নিকট তা হস্তান্তর করব না। আর তোমরা যদি আমাদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখো, তাহলে কিছুতেই আমাদের সাথে পারবে না। তখন মুসলমানরা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর নিকট লোক পাঠিয়ে তাঁকে বিষয়টি জানালে তিনি তাদের সামনে উপস্থিত হন। তখন যে কাপড়টি তাঁর পরনে ছিল, তাতে ছিল সতেরটি তালি-যার একটি ছিল চামড়ার। খ্রিস্টান পুরোহিতরা তাদের কাছে বর্ণিত গুণাবলি হজরত উমর রা.-এর মাঝে দেখতে পেয়ে বিনা যুদ্ধে বায়তুল মুকাদ্দাস তাঁর কাছে হস্তান্তর করল। কোথায় তিনি আর কোথায় এ যুগের মূর্খ সুফিরা!
***
গ্রন্থকার বলেন, পূর্বেকার মহান মনীষী ও আকাবিররা সাধারণত মধ্যম পর্যায়ের পোশাক পরতেন। তবে ঈদ, জুমা এবং মানুষের সাথে সাক্ষাৎকালে উত্তম পোশাক পরতেন। উত্তম পোশাক পরিধান করা তাঁদের কাছে কোনো নিন্দনীয় বিষয় ছিল না। মুসলিম শরিফের হাদিসে আছে, হজরত উমর রা. একবার মসজিদের কাছে রেখাবিশিষ্ট উত্তম জোড়া (লুঙ্গি-চাদর) বিক্রি হতে দেখে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি যদি জুমার দিন এবং বহিরাগত প্রতিনিধিদলের সামনে পরিধান করার জন্য এ জোড়াটি খরিদ করে নিতেন, তবে খুবই ভালো হতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ পোশাক তারাই পরে, যাদের পরকালে কোনো হিস্যা নেই।'

উক্ত হাদিসে রেশমি পোশাক হওয়ার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অস্বীকৃতি ছিল। নচেৎ হজরত উমর রা. এর কথা দ্বারা উত্তম পোশাক পরিধান করার বৈধতাই নয়; বরং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তার শ্রেষ্ঠত্বও প্রমাণিত হয়।

মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রহ. বলেন, তামিম দারি রা. এক হাজার দিরহাম দিয়ে একটি জোড়া (চাদর-লুঙ্গি) ক্রয় করেছিলেন। তিনি তা পরে তাহাজ্জুদ পড়তেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. প্রায় এক দিনার মূল্যমানের একটি কাপড় কিনতেন। এমনইভাবে পূর্বেকার বহু মনীষীর সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তাঁরা সাধারণত মধ্যম পর্যায়ের পোশাক পরিধান করতেন আর বাইরে বের হলে উত্তম পোশাক পরতেন।

আহওয়াস বর্ণনা করেন, আমার পিতা বলেছেন, আমি একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে হাজির হলাম। আমার জীর্ণশীর্ণ অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে সম্পদ আছে কি? আমি বললাম, জি হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করলেন, কী ধরনের সম্পদ আছে? আমি বললাম, সব ধরনের সম্পদই আছে। আল্লাহ তায়ালা আমাকে উট, ঘোড়া, ছাগল, গোলাম—সকল ধরনের সম্পদই দান করেছেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তায়ালা যেহেতু তোমাকে সম্পদ দান করেছেন, তাই তোমাকে সম্পদশালী হিসেবে প্রকাশ করা উচিত।

একবার হজরত আলী রা. রবী' ইবনে যিয়াদের অসুস্থতার সংবাদ শুনে তাকে দেখতে গেলেন। রবী' বললেন, আমিরুল মুমিনীন! আমি আপনার কাছে আমার ভাই আসেমের ব্যাপারে একটি অভিযোগ করছি। হজরত আলী রা. জিজ্ঞেস করলেন, কিসের অভিযোগ? রবী' বললেন, আসেম উত্তম পোশাক পরিত্যাগ করে জীর্ণশীর্ণ পোশাক পরছে। ফলে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছে। হজরত আলী রা. আসেমকে ডেকে তার প্রতি লক্ষ্য করে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন, তুমি জানো না যে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য দুনিয়াকে হালাল করে দিয়েছেন। তিনি তোমার থেকে দুনিয়া ছিনিয়ে নিতে চান না। আল্লাহর কসম! আল্লাহর নেয়ামত কথায় প্রকাশ করার চেয়ে আমার কাছে কাজে প্রকাশ করা অধিক পছন্দনীয়। তখন আসেম বললেন, আমিরুল মুমিনীন! আপনাকে দেখছি, আপনি মোটা কাপড় পরছেন এবং মোটা খাবার খাচ্ছেন। হজরত আলী রা. দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আসেম! আল্লাহ তায়ালা ন্যায়পরায়ণ ইমামদের ওপর জনসাধারণের অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলা আবশ্যক করে দিয়েছেন, যাতে দারিদ্র্য বেড়ে না যায়।

যদি কেউ মনে করে যে, উত্তম পোশাক পরাতে নফসানি খাহেশ পূরণ করা হয় অথচ নফস দমন করার চেষ্টা করা জরুরি। অনুরূপভাবে উত্তম পোশাক পরে সাজসজ্জা করা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। আর রিয়া বা লৌকিকতা চরম গর্হিত কাজ। এর জবাবে বলা যাবে-নফসের যে কোনো খাহেশ পূরণ করা নিন্দনীয় নয়। নিন্দনীয় তো সেটি, যা শরিয়তে নিষিদ্ধ এবং দীনের জন্য ক্ষতিকর। অনুরূপভাবে যে কোনো সাজসজ্জা নিন্দনীয় নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়না দ্বারা মুখ দেখেছেন এবং মাথার চুলে সিঁথি কেটেছেন। দাড়ি আঁচড়িয়েছেন।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ : " كَانَ نَفَرُ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْتَظِرُونَهُ عَلَى الْبَابِ فَخَرَجَ يُرِيدُهُمْ، وَفِي الدَّارِ رَكْوَةٌ فِيهَا مَاءً، فَجَعَلَ يَنْظُرُ فِي الْمَاءِ وَيُسَرِّى شَعْرَهُ وَلِحْيَتَهُ ، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَأَنْتَ تَفْعَلُ هَذَا؟ قَالَ: «نَعَمْ، إِذَا خَرَجَ الرَّجُلُ إِلَى إِخْوَانِهِ فَلْيُهَيِّئْ مِنْ نَفْسِهِ، فَإِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ
হজরত আয়েশা রা. বলেন, কিছু লোক ঘরের বাইরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য অপেক্ষা করছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ওই পাত্রে চেহারা দেখে মাথার চুল ও দাড়ি মোবারক বিন্যস্ত করেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনিও এমন করেন। উত্তরে বললেন, নিজ ভাইদের কাছে গেলে সেজেগুজে যাওয়া উচিত। কেননা আল্লাহ তায়ালা সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।”

মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি ইয়ামেনী চাদর ও একটি ওমানী লুঙ্গি ছিল। এ দু'টি কাপড় তিনি জুমা ও ঈদের দিন পরিধান করতেন। পরে ভাঁজ করে রেখে দিতেন।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৮৮৬, ৩০৫৪, ৫৮৪১, ৫৯৮১, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২০৬৮
১. [মুনকার) হাদিসটির শেষাংশ সহিহ মুসলিমের হাদীসে দ্বারা প্রমাণিত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00