📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 ধন-সম্পদ বর্জনের ক্ষেত্রে সুফিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত

📄 ধন-সম্পদ বর্জনের ক্ষেত্রে সুফিদের ওপর শয়তানের চক্রান্ত


প্রথম যুগের সুফিদের দুনিয়া ত্যাগের বিষয়ে নিয়ত সৎ থাকায় শয়তান তাদের সামনে ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সার দোষ তুলে ধরার চেষ্টা চালায়। ফলে তারা ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা বর্জন করে দরিদ্র জীবন অবলম্বন করতে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য সৎ থাকলেও কম জ্ঞানের কারণে তাদের মাঝে বিচ্যুতি ঘটে। এটা ছিল প্রথম যুগের সুফিদের ওপর শয়তানের চক্রান্তের নমুনা। অপর দিকে বর্তমান কালের সুফিদের ওপর শয়তান ধোঁকার পট পরিবর্তন করে নিয়েছে। কেননা পূর্বেকার যুগের সুফিদের অনুসরণ করতে গিয়ে তারা পরিবার-পরিজন ও নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করে তার মালিকানাধীন সকল ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা সদকা করে দেয়।

আবু নাসর তুসি বলেন, আমি রায় নগরীর কয়েকজন বুযুর্গকে বলতে শুনেছি, আবু আবদুল্লাহ মাকরি ওয়ারিসসূত্রে তার পিতা থেকে স্থাবর সম্পত্তি ছাড়াও পঞ্চাশ হাজার দিনার লাভ করেন। এরপর যাবতীয় সম্পদ গরিবদের মাঝে খরচ করে তিনি একদম শূন্য হয়ে যান।

এ ধরনের আরও বহু ঘটনা কিতাবের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। যারা এমনটি করে থাকেন আমরা গড়পড়তা তাদের সমালোচনা করব না। যদি তারা পরিবার-পরিজন ও নিজের খরচ বাবদ প্রয়োজনমতো ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা রেখে অতিরিক্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে দেন, অথবা তার যদি এমন পেশা থাকে, যা দ্বারা তার মানুষের দ্বারস্থ হতে হয় না, অথবা তার ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা যদি সন্দেহযুক্ত হয় এবং সে তা গরিব-দুঃস্থদের মাঝে সদকা করে দেয়, তাহলে সে শরিয়তের আলোকে ভালো ও প্রশংসিত কাজ করেছে বলেই বিবেচিত হবে। কিন্তু সে যদি তার সন্দেহমুক্ত ও সম্পূর্ণ হালাল সব ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা দান করে পরিবারকে অভাবের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজেও মানুষের দ্বারস্থ হয়, তাহলে আমরা তার এ কাজের নিন্দা জানাতে বাধ্য হব। কেননা এর দ্বারা সে আত্মীয়-স্বজনদের অনুগ্রহ, তাদের দান-সদকার মাল ভক্ষণ অথবা দুষ্কৃতকারীদের সন্দেহযুক্ত ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সার মুখাপেক্ষী হবে— শরিয়তে এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অবশ্য যে সব সুফি জ্ঞানস্বল্পতার দরুন এমনটি করেন, তাদের বিষয় আশ্চর্যের কিছু নয়; বরং আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই সকল সুফিদের বিষয়—যারা বুদ্ধিমান, বিবেকবান ও শরয়ি বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া সত্ত্বেও মানুষকে এ বিষয়ে উৎসাহ দেন এবং তাদেরকে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।

হারেস মুহাসেবি এ ব্যাপারে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করেছেন। আবু হামেদ গাযালি রহ. এর মতো বিখ্যাত আলেম তার সমর্থন দিয়ে ব্যাপারটিকে আরও জোরালো করেছেন। অবশ্য আমার মতে হারেস মুহাসেবির তুলনায় আবু হামেদ গাযালি ছিলেন অধিক প্রাজ্ঞ। কেননা গাযালি শরয়ি বিধি-বিধান সম্পর্কে হারেস মুহাসেবি থেকে অনেক এগিয়ে। তবে গাযালি রহ. তাসাওউফশাস্ত্রে অনুপ্রবেশের কারণে হারেস মুহাসেবিকে সমর্থন দিয়েছেন বলে অনুমিত হচ্ছে।

ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সার বিষয়ে হারেস মুহাসেবি মুফতী সাহেবানদের উদ্দেশ্য করে বলেন, হে মুফতী সম্প্রদায়! আপনারা যে ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সার বিষয়ে বলেন, হালাল মাল জমা করা তা বর্জন করা থেকে ভালো—এ কথার দ্বারা তো আপনারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্যান্য নবী-রাসুলদের অবজ্ঞা করছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উম্মতের কল্যাণকামী মনে করছেন না। কেননা ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা জমা করা তাদের জন্য উত্তম হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাদেরকে তা জমা করতে বারণ করেছেন। এছাড়া আপনারা এ দাবিও করছেন যে, স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও তার বান্দার কল্যাণ চান না, যেহেতু তিনিও ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা জমা করতে বান্দাকে নিষেধ করেছেন। অথচ এগুলো বান্দার জন্য উপকারী ছিল।

হারেস মুহাসেবি আরও বলেন, সাহাবাদের সম্পদ দ্বারা প্রমাণ পেশ করা আপনাদের জন্য শোভা পায় না। কেননা সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. অঢেল সম্পদের মালিক ছিলেন। তার ইন্তেকালের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কয়েকজন সাহাবি বললেন, আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এর রেখে যাওয়া সম্পদের কারণে তার ব্যাপারে আমাদের আশঙ্কা হয়। তখন কা'আব রা. বললেন, সুবহানাল্লাহ! তোমরা আবদুর রহমান ইবনে আউফের ব্যাপারে কিসের আশঙ্কা করছ? তিনি তো বৈধ পথে ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা উপার্জন করেছেন এবং আল্লাহর পথে খরচ করেছেন। হজরত কা'আব রা. এর এ কথা সাহাবি হজরত আবু যর গিফারি রা. এর কানে পৌঁছলে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে কা'আব রা. এর সন্ধানে বের হন। চলার পথে উটের চোয়ালের হাড় পেয়ে তিনি তা নিয়েই কা'আব রা. এর সন্ধানে হাঁটতে থাকেন। তখন হজরত কা'আব রা.-কে বলা হলো, আবু যর রা. আপনাকে খুঁজছেন। এ কথা শুনে কা'আব রা. দ্রুত পালিয়ে হজরত ওসমান রা. এর ঘরে উপস্থিত হয়ে তার কাছে সাহায্য চান এবং পুরো ঘটনা বিস্তারিত খুলে বলেন। এদিকে আবু যর রা.ও কা'আব রা. এর অনুসরণ করতে করতে সোজা চলে যান হজরত ওসমান রা. এর ঘরে। আবু যর ঘরে প্রবেশ করলে কা'আব রা. তাঁর ভয়ে ওসমান রা. এর পেছনে অবস্থান নেন। তখন আবু যর তাঁকে বললেন, হে ইহুদির বাচ্চা, তুমি নাকি আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এর রেখে যাওয়া সম্পদে কোনো সমস্যা নেই বলে দাবি করেছ? ভালো করে শুনে রাখো:
خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَوْمًا فَقَالَ الْأَكْثَرُونَ هُمُ الْأَقَلُّونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ قَالَ ذَلِكَ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ إِلَّا مَنْ قَالَ هَكَذَا وَهَكَذَا ثُمَّ قَالَ يَا أَبَا ذَرٍّ وَأَنْتَ تُرِيدُ الْأَكْثَرَ وَأَنَا أُرِيدُ الْأَقَلَّ
'একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বের হয়ে বললেন, দুনিয়াতে যার সম্পদ বেশি আখিরাতে সে নিঃস্ব হবে, তবে যে গরিব ও দুঃস্থদের মাঝে সম্পদ খরচের নির্দেশ দেবে তার বিষয়টি আলাদা। তারপর বললেন, হে আবু যর! তুমি অধিক সম্পদের আশা করো, আর আমি স্বল্প সম্পদের আশা করি।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সার ব্যাপারে এ কথা বলেছেন, আর হে ইহুদির বাচ্চা! তুমি আবদুর রহমান ইবনে আউফ যা রেখে গেছেন তাতে কোনো সমস্যা নেই বলে দাবি করছ। তুমি মিথ্যাবাদী, আর যারা তোমার মতো মন্তব্য করে তারাও মিথ্যাবাদী। পরে আবু যর রা. সেখান থেকে চলে আসেন, কিন্তু হজরত কা'আব রা. এ সব কথার কোনো উত্তর না দিয়ে চুপিসারে বসে থাকেন।

হারেস মুহাসেবি বলেন, আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এত বড় মহান সাহাবি হওয়া সত্ত্বেও কেয়ামতের ময়দানে তাঁকে দাঁড় করিয়ে রাখা হবে এবং মুহাজির গরিব সাহাবিদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করা থেকে বাধা প্রদান করা হবে, তিনি তাঁদের পেছনে হামাগুড়ি দিয়ে চলবেন। এর একমাত্র কারণ, তিনি নিজেকে মানুষের মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন এবং মঙ্গলজনক খাতে ব্যয় করার জন্য ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা উপার্জন করেছেন। অন্যান্য সাহাবাদের অবস্থা ছিল অন্য রকম। তারা আহারের জন্য কোনো কিছু না পেলে খুশি হতেন। আর তুমি দরিদ্রতার ভয়ে ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা সঞ্চয় করছ। আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা ও রিযিকের ব্যাপারে আল্লাহর জিম্মাদারির প্রতি আস্থা না থাকার কারণে তুমি শয়তানের এ ফাঁদে আটকা পড়েছ। ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা জমা করার আরেকটি ক্ষতিকর দিক হচ্ছে, তুমি দুনিয়ার ভোগ-বিলাস, আমোদ-প্রমোদের উদ্দেশ্যে সম্পদ জমা করলে, পরে দেখা গেল যে কোনো কারণে তা তোমার হাতছাড়া হলে তোমার আক্ষেপ আর আফসোসের শেষ থাকে না। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি দুনিয়ার সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার পর তার ওপর আফসোস করবে, সে এক বছরের রাস্তা পরিমাণ জাহান্নামের নিকটবর্তী হয়ে যাবে।”

অথচ তোমরা সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার পর তার ওপর আফসোস করে আল্লাহর শাস্তির প্রতি উদাসীনতা দেখাচ্ছ। তোমরা কি সাহাবায়ে কেরামের যুগের মতো হালাল সম্পদ পাবে? সুতরাং হালাল সম্পদই যখন দুষ্প্রাপ্য, তখন তুমি তা কী করে জমা করবে? মনোযোগ দিয়ে শোনো, আমি তোমাদেরকে ভালো উপদেশ দিচ্ছি। তুমি প্রয়োজনমাফিক সম্পদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে। মঙ্গলজনক খাতে ব্যয় করার উদ্দেশ্যেও ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা জমা করবে না। কেননা জনৈক প্রখ্যাত আলেমের কাছে সৎকাজে ব্যয় করার উদ্দেশ্যে ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা জমা করার কথা বলা হলে তিনি বলেন, মাল বর্জন করা জমা করা থেকে উত্তম।

হারেস মুহাসেবি বলেন, একদল বৈধ ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা সঞ্চয় করার পর আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে মৃত্যুবরণ করেছে, পক্ষান্তরে আরেক দল ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা অন্বেষণ করেনি এবং আল্লাহর রাস্তায় খরচও করেনি—এমন দু'টি দল সম্পর্কে তৎকালীন বিখ্যাত তাবেয়িদের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা বললেন, আল্লাহর শপথ! যে ব্যক্তি ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা উপার্জন থেকে বিরত রয়েছে, সে-ই শ্রেষ্ঠ। আর শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে উভয়ের মাঝে পূর্ব ও পশ্চিম মেরু বরাবর ব্যবধান রয়েছে।

গ্রন্থকার বলেন, এতক্ষণ যা আলোচিত হলো, তা হারেস মুহাবেসির বক্তব্য। তার এ বক্তব্য আবু হামেদ গাযালি রহ. উল্লেখ করেছেন এবং তার সমর্থন করেছেন। হজরত সা'লাবা রা. এর হাদিস দ্বারা তার মন্তব্যকে আরও পোক্ত করেছেন। কেননা সা'লাবা রা. অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও সম্পদের যাকাত দেননি। অথচ তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সাহাবি ছিলেন।

আবু হামেদ গাযালি রহ. বলেন, যে ব্যক্তি আম্বিয়ায়ে কেরাম ও পূর্ববর্তী মনীষীদের অবস্থার দিকে চিন্তা-ভাবনা করবে, সে নির্দ্বিধায় এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা সঞ্চয় করার চেয়ে তা হাতছাড়া করা উত্তম, তা যদিও মঙ্গলজনক খাতে ব্যয় হোক না কেন। কেননা ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সার ব্যস্ততা মানুষকে আল্লাহ হতে গাফেল করে দেয়। তাই ভক্ত-মুরিদানদের উচিত—প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হওয়া। কেননা তার নিকট যদি একটি টাকাও অবশিষ্ট থাকে, যার দিকে মন আকৃষ্ট হয়, তাহলে সে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যাবে।

গ্রন্থকার বলেন, আবু হামেদ গাযালির এ বক্তব্য শরিয়তবিরোধী ও বিবেকবর্জিত। এ ছাড়া তিনি ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সার মন্দ উপলব্ধির শিকার হয়েছেন।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২৩৮৮
১. [যঈফ] আলবানি সংকলিত 'যঈফুল জামে': হাদিস নং ৫৪১৩

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 ধন-সম্পদবিরোধী এ মতবাদের প্রমাণভিত্তিক অসারতা

📄 ধন-সম্পদবিরোধী এ মতবাদের প্রমাণভিত্তিক অসারতা


উপরোল্লিখিত বক্তব্যের খণ্ডনে আমাদের মনে রাখতে হবে আল্লাহ তায়ালা ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সার মর্যাদা বর্ণনা করেছেন এবং তা সংরক্ষণের আদেশ দিয়েছেন। যেহেতু মানুষের উপজীব্য হিসেবে আল্লাহ তায়ালা ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সাকে নির্ধারণ করেছেন, বিহিত কারণে এর মর্যাদা থাকা বাঞ্ছনীয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا 'আর তোমরা নির্বোধদের হাতে তোমাদের ধন-সম্পদ দিও না, যাকে আল্লাহ তোমাদের জন্য করেছেন জীবিকার মাধ্যম।' অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নির্বোধদের হাতে ধন-সম্পদ অর্পণের ব্যাপারে নিষেধ করতে গিয়ে বলেন,
فَإِنْ أَنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ 'যদি তাদের মাঝে ভালো-মন্দ বিচার করতে পারার জ্ঞান দেখতে পাও, তাহলে তাদের সম্পদ তাদেরকে ফিরিয়ে দাও।'

হাদিসে আছে,
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ إِضَاعَةِ المَالِ 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধন-সম্পদ নষ্ট করতে নিষেধ করেছেন।'

হজরত সা'আদ রা.-কে উদ্দেশ্য করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِنَّكَ أَنْ تَذَرَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ، خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ 'তুমি তোমার ওয়ারিসদেরকে সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়া তাদেরকে দরিদ্রাবস্থায় রেখে যাওয়া থেকে উত্তম। যাতে তাদের মানুষের দ্বারস্থ হতে না হয়।'

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, مَا نَفَعَنِي مَالٌ قَدْ مَا نَفَعَنِي مَالُ أَبِي بَكْرٍ 'আবু বকরের ধন-সম্পদ আমাকে যতটুকু উপকৃত করেছে, অন্য কারও ধন-সম্পদে আমি সেই পরিমাণ উপকৃত হইনি।'

অন্য হাদিসে আছে, হজরত Amr ইবনুল আস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোক মারফরত আমাকে ডেকে বললেন,
أخُذَ عَلَيَّ ثِيَابِي وَسِلَاحِي، ثُمَّ آتِيَهُ قَالَ: فَفَعَلْتُ، ثُمَّ أَتَيْتُهُ وَهُوَ يَتَوَضَّأُ فَصَعَّدَ فِي النَّظَرَ، ثُمَّ طَأْطَةً، ثُمَّ قَالَ : " يَا عَمْرُو إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أَبْعَثَكَ عَلَى جَيْشِ فَيُغْنِمُكَ اللَّهُ وَيُسْلِمُكَ، وَأَرْغَبُ لَكَ رَغْبَةً صَالِحَةٌ مِنَ الْمَالِ ، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي لَمْ أَسْلِمْ رَغْبَةً فِي الْمَالِ، وَلَكِنْ أَسْلَمْتُ رَغْبَةً فِي الْإِسْلَامِ وَأَنْ أَكُونَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ لِي: " يَا عَمْرُو نِعْمَ الْمَالُ الصَّالِحُ لِلرَّجُلِ الصَّالِحِ
'তুমি বর্ম ও অস্ত্র ধারণ করে আমার কাছে এসো। আমি তখন তা পরিধান করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বললেন, আমি তোমাকে এক সেনাদলের উদ্দেশে পাঠাতে চাই। তুমি সেখানে পৌঁছলে আল্লাহ তায়ালা তোমাকে বিজয়ী করবেন এবং গনীমত দান করবেন। আর ভালো উদ্দেশ্যে আমি তোমার জন্য ধন-সম্পদ কামনা করি। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি তো ধন-সম্পদ লাভের আশায় ইসলাম গ্রহণ করিনি। আল্লাহর আনুগত্য করার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছি। জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আমর! ভালো মানুষের জন্য হালাল ধন-সম্পদ কতই-না উত্তম!'

হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন,
ادْعُ اللَّهَ لَهُ، قَالَ: «اللَّهُمَّ أَكْثِرْ مَالَهُ، وَوَلَدَهُ، وَبَارِكْ لَهُ فِيمَا أَعْطَيْتَهُ
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জন্য সকল প্রকার দোয়া করেছেন। আর দোয়ার শেষভাগে ছিল, হে আল্লাহ! তার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিন এবং তাকে বরকত দান করুন।'

উবাইদুল্লাহ ইবনে কা'আব বলেন, আমি কা'আব বিন মালেক রা.-কে তাঁর তাওবাহ'র হাদিস বর্ণনা করতে শুনেছি। হাদিসের একাংশে তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার কৃত অপরাধের তাওবাহস্বরূপ আমার সমস্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় সদকা করব। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, أَمْسِكْ عَلَيْكَ بَعْضَ مَالِكَ، فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ
'তুমি কিছু সম্পদ রেখে দাও, কেননা এগুলো তোমার জন্য মঙ্গলজনক।"

গ্রন্থকার বলেন, উপরোল্লিখিত হাদিসগুলো হাদিসের বিশুদ্ধ গ্রন্থ থেকে চয়ন করা হয়েছে। এগুলো সুফিদের আকিদার বিপরীত প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। তাদের দৃষ্টিতে ধন-সম্পদের আধিক্য আল্লাহর রহমতের পথে বাধা সৃষ্টি করে। সুফিরা ধন-সম্পদ সংরক্ষণ ও সঞ্চয়কে তাওয়াক্কুল পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।

এতে অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই যে, ধন-সম্পদের আধিক্যের কারণে ফিতনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে পূর্ববর্তী বহু মনীষী ধন-সম্পদকে এড়িয়ে চলতেন। একদিকে যেমন ধন-সম্পদ জমা করা উত্তম, অন্যদিকে ধন-সম্পদের আধিক্যের কারণে ফিতনায় পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সার আধিক্যের কারণে পরকালের চিন্তা-ফিকিরও মনে লালন করা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্য এর ফিতনাকে ভয় করা হয়ে থাকে।

দেহ সবল রাখা পরিমাণ বৈধ ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা উপার্জন একটি আবশ্যিক বিষয়। অন্যদিকে কেউ যদি বৈধ ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা জমা করা এবং তা বৃদ্ধি করার ইচ্ছা করে, তখন তার উদ্দেশ্য যাচাই করতে হবে। যদি তার উদ্দেশ্য হয় গর্ব, অহংকার ও প্রতিযোগিতা, তাহলে ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা জমা করা নিকৃষ্ট বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যদি অন্যের মুখাপেক্ষী হতে পরিবার-পরিজন ও নিজেকে পবিত্র রাখা, তাদের বিপদ-আপদে খরচ করা, আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতা করা এবং জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তার নিয়ত অনুযায়ী সে সাওয়াব পাবে। এ উদ্দেশ্যে ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা সঞ্চয় ও সংরক্ষণ করা বহু নফল ইবাদত অপেক্ষা উত্তম বলে বিবেচিত হবে। ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে এক জামাত সাহাবায়ে কেরামের নিয়ত নিষ্কলুষ ছিল। ভালো নিয়তে তারা ধন-সম্পদ ও টাকা-পয়সা বৃদ্ধির প্রার্থনা করেছেন।

عَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَقْطَعَ الزُّبَيْرَ حُضْرَ فَرَسِهِ، بِأَرْضِ يُقَالُ لَهَا: تُرَبِّرُ، فَأَجْرَى الْفَرَسَ حَتَّى قَامَ، ثُمَّ رَمَى بِسَوْطِهِ، فَقَالَ: «أَعْطُوهُ حَيْثُ بَلَغَ السَّوْطُ
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত যুবাইর রা. এর সারসার নামীয় একখণ্ড জমি দান করেন। তিনি তাঁকে বললেন, তোমার ঘোড়া দৌড়াও। যেখানে গিয়ে ঘোড়া থামবে, তুমি সে পর্যন্ত জমির মালিক হবে। তিনি ঘোড়া দৌড়ানো শুরু করলে একপর্যায়ে ঘোড়া থেমে যায়। এরপর তিনি চাবুক নিক্ষেপ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার চাবুক যেখানে গিয়ে পড়েছে, সে পর্যন্ত জমিও তাকে দিয়ে দাও।

হজরত সাআদ ইবনে উবাদাহ রা. তাঁর দোয়ায় বলতেন اللَّهُمَّ وَسِعْ عَلَىّ 'হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সচ্ছলতা দান করুন।'

গ্রন্থকার বলেন, এর চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-কে তাঁর সন্তানেরা যখন বলল, "وَنَزْدَادُ كَيْلَ بَعِيرٍ" বিনইয়ামীনকে আমাদের সাথে পাঠালে আমরা এক উট রসদ বেশি লাভ করতে পারব। তখন তিনি রসদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পুত্র বানইয়ামীনকে তাদের সাথে পাঠাতে অনুমতি দেন। আইয়ুব আলাইহিস সালাম সুস্থতা লাভ করলে তাঁর দিকে স্বর্ণের ফড়িং নিক্ষেপ করা হলে তিনি বেশি পাওয়ার আশায় সেগুলো কাপড়ে জড়াতে থাকেন। তখন তাকে বলা হলো, তুমি কি তৃপ্ত হওনি? তিনি বললেন, কে এমন আছে, যে আপনার অনুগ্রহে তৃপ্ত হয়?

ধন-সম্পদের প্রতি স্বভাবতই মানুষ আকৃষ্ট হয়ে থাকে। এর সঞ্চয় ও সংরক্ষণ যদি ভালো উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তা কল্যাণকর ও মঙ্গলজনক হিসেবেই বিবেচিত হবে।

থেকে গেল হারেস মুহাসেবির বক্তব্যের অসারতা। তিনি অজ্ঞতা ও কম জ্ঞানের দরুন ভুলে পতিত হয়েছেন। তার বক্তব্যমতে আল্লাহ তায়ালা ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধন-সম্পদ জমা করতে নিষেধ করছেন—এটা একটা অসম্ভব বিষয়। কেননা ধন-সম্পদ জমা করা ওই সময় নিষেধ, যখন উদ্দেশ্য হয় মন্দ কিংবা অবৈধ পন্থায় তা সঞ্চয় ও সংরক্ষণ করা হয়। অন্যদিকে ধন-সম্পদ বৈধ হলে এবং ভালো নিয়তে তা জমা করা হলে, শরিয়ত এ ব্যাপারে অনুমতি দেয়। সুতরাং শরিয়ত অনুমোদিত বিষয়ের নিন্দা করা অনুচিত। হজরত কা'আব ও আবু যর রা. এর ঘটনা হারেস মুহাসেবি উল্লেখ করেছেন, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট—যার কোনো ভিত্তি নেই। অবশ্য এ ঘটনাটি সূত্র ছাড়া অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে :

মালেক বিন আবদুল্লাহ যিয়াদি বলেন, হজরত আবু যর রা. উসমান রা. এর বাড়িতে এসে প্রবেশের অনুমতি চান। অনুমতি পেয়ে হাতে একটি লাঠি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন। তখন হজরত কা'আব রা.-কে সম্ভোধন করে উসমান রা. বললেন, হে কা'আব! আবদুর রহমান তো ইন্তেকাল করেছেন এবং মৃত্যুকালে অনেক সম্পদ রেখে গেছেন। এ বিষয়ে তোমার অভিমত কী? হজরত কা'আব রা. বললেন, তিনি যদি ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে আল্লাহর হক আদায় করে থাকেন, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। এ কথা শুনে হজরত আবু যর রা. লাঠি দ্বারা কা'আব রা.-কে প্রহার করেন এবং বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যদি আমার জন্য এ পাহাড়কে স্বর্ণে রূপান্তর করা হয় এবং তা থেকে আমি আল্লাহর পথে খরচ করি এবং আমার দান কবুল করা হয়, তবুও আমি তা পছন্দ করব না যে, মৃত্যুর সময় ছয় আউকিয়া (বাহাত্তর দিরহাম) রেখে যাব। অতঃপর হজরত আবু যর রা. বললেন, হে উসমান! আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনি কি এ হাদিস শুনেছেন? তিনি এভাবে তিনবার জিজ্ঞেস করলে হজরত ওসমান রা. বললেন, হ্যাঁ, শুনেছি।'

গ্রন্থকার বলেন, উপরোক্ত হাদিসটি ভিত্তিহীন। এর রাবি ইবনে লাহিয়াহ 'মাতউন' তথা অভিযুক্ত। ইয়াহইয়া বলেন, তার হাদিস প্রমাণ হিসেবে পেশ করার যোগ্য নয়। ইতিহাসের বিশুদ্ধ বর্ণনানুসারে হজরত আবু যর রা. পঁচিশ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন, অন্যদিকে আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. ইন্তেকাল করেন বত্রিশ হিজরিতে। সে মতে আবু যর রা. এর পরেও আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. সাত বছর জীবিত ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। সুতরাং আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এর মৃত্যুর ব্যাপারে আবু যর রা. এর জিজ্ঞাসা-সংক্রান্ত হাদিসটি বানোয়াট বলে প্রমাণিত হয়। সাহাবায়ে কেরাম রা. হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এর ব্যাপারে কীভাবে আশঙ্কা করতে পারেন! অথচ হালাল ধন-সম্পদ জমা করা সর্বসম্মতভাবে বৈধ। শরিয়া কর্তৃক প্রমাণিত বিষয়ের ওপর তাঁরা কিসের আশঙ্কা করবেন? এছাড়া সাহাবাদের নিন্দার বিষয়টি আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এর সাথে সীমাবদ্ধ করে রাখার অর্থ হচ্ছে, তিনি সাহাবাদের আদর্শ অনুসরণ করেননি। অথচ বিখ্যাত সাহাবি হজরত তালহা রা. মৃত্যুর সময় তিনশত বোঝা ধন-সম্পদ রেখে যান। প্রতি বোঝায় সম্পদের পরিমাণ ছিল তিন কিনতার, আর প্রতি কিনতার সম্পদের পরিমাণ প্রায় এককোটি দিনার। আরেক বিখ্যাত সাহাবি হজরত যুবাইর রা. এর ধন-সম্পদের পরিমাণ ছিল পঞ্চাশ কোটি দুই লক্ষ দিরহাম। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. মৃত্যুর সময় নব্বই হাজার দিরহাম রেখে যান। এভাবে অধিকাংশ সাহাবি সম্পদ উপার্জন করেছেন এবং মৃত্যুর সময় তা ওয়ারিসদের জন্য রেখে গেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তাদের কাউকে অন্যের নিন্দা করতে দেখা যায়নি।

হারেস মুহাসেবির কথা—'আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এতবড় মহান সাহাবি হওয়া সত্ত্বেও কেয়ামতের ময়দানে তাঁকে দাঁড় করিয়ে রাখা হবে এবং মুহাজির গরিব সাহাবিদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করা থেকে বাধা প্রদান করা হবে, তিনি তাঁদের পেছনে হামাগুড়ি দিয়ে চলবেন'- তার এ কথাই প্রমাণ করে যে, তিনি হাদিস সম্পর্কে যথেষ্ট অজ্ঞ। হতে পারে এ ধরনের হাদিস তিনি স্বপ্নে প্রাপ্ত হয়েছেন, বাস্তবে নয়। হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এর মতো সাহাবি কেয়ামতের দিন হামাগুড়ি দিয়ে চলবেন! কতবড় স্পর্ধার কথা! আমরা এমন কথা থেকে আল্লাহ কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তাঁর মতো সাহাবি যদি হামাগুড়ি দিতে হায়, তাহলে জান্নাতে প্রবেশের অগ্রগামী আর কে হতে পারেন? অথচ তিনি ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবির অন্যতম। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, যাঁদের ব্যাপারে ক্ষমার ঘোষণা এসেছে। এছাড়াও আহলে শুরার অন্যতম সাহাবি ছিলেন হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.।

অভিযুক্ত হাদিসটির রাবি আম্মারাহ সম্পর্কে ইমাম বুখারি রহ. বলেছেন, তার অধিকাংশ হাদিস মুযতারিব। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, সে হজরত আনাস রা. থেকে বহু মুনকার হাদিস বর্ণনা করেছে। আবু হাতেম রাযি বলেন, তার হাদিস দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। দারাকুতনী রহ. বলেন, সে একজন দুর্বল রাবী।

হারেস মুহাসেবি আরও বলেছেন, 'বৈধ ধন-সম্পদ বর্জন করা তা সঞ্চয় ও সংরক্ষণ করা অপেক্ষা উত্তম।' ব্যাপারটি আসলে এমন নয়। নিয়ত ভালো থাকলে আলেমদের সর্বসম্মত ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা সঞ্চয় ও সংরক্ষণ করা উত্তম বলে বিবেচিত হবে। অনুরূপভাবে হারেস মুহাসেবি ধন-সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার পর আক্ষেপ করলে এক বছরের রাস্তা পরিমাণ জাহান্নামের নিকটবর্তী হওয়ার ব্যাপারে যে কথাটি উল্লেখ করেছেন, তা হাদিস নয়। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কথা কখনো বলেননি। হারেস মুহাসেবি সাহাবায়ে কেরামের যুগের মতো হালাল ধন-সম্পদ পাওয়া যাবে না বলে যে মন্তব্য করেছে-তাও অর্থহীন। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
الحَلالُ بَيِّنُ، وَالحَرَامُ بَيِّنُ
'হালালও স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট।” আপনার কি মনে হয় হালাল দ্বারা স্বর্ণ যে অবস্থায় বের হয়েছে সে অবস্থায় বহাল থাকাকে বোঝানো হয়েছে? এটা দ্বারা অবৈধ বেচাকেনা হলে তার বৈধতার গুণ কমে যাবে? এটা কখনো সম্ভব নয়। শরিয়তের কথা হচ্ছে, কোনো মুসলমান ইহুদির নিকট কোনো পণ্য বিক্রয় করলে ফকিহদের মতানুসারে বিক্রিত মূল্য মুসলমানের জন্য বৈধ বলে বিবেচিত হবে। হারেস মুহাসেবির এমন জঘন্য কথা শুনে আবু হামেদ গাযালি কী করে নীরবতা পালন করলেন-এটা ভাবতেই আমি আশ্চর্য হই। উল্টো তিনি হারেসের সমর্থন করে গেলেন। আর তিনি কীভাবে বললেন যে, মঙ্গলজনক খাতে ব্যয় করা সত্ত্বেও ধন-সম্পদ হাতছাড়া হওয়া তা লাভ করা অপেক্ষা উত্তম! তিনি এর বিপরীত ইজমা দাবি করলে তা বিশুদ্ধ বলে সাব্যস্ত হতো। তাসাওউফকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তিনি ফতোয়া পাল্টাতে বাধ্য হয়েছেন। মারুযির বর্ণনামতে, আমি এক ব্যক্তিকে আবু উবাইদুল্লাহর এর নিকট হতে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমার ব্যক্তিগত খরচ চালানোর সামর্থ্য আছে। তিনি বললেন, বাজারে গিয়ে ব্যবসা করো এবং উপার্জিত অর্থ দ্বারা আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতা করো। অসুস্থ ব্যক্তিদের সেবা-যত্নে মনোযোগী হও।

টিকাঃ
১. সুরা নিসা: আয়াত ৫
২. সুরা নিসা: আয়াত ৬
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ২৪০৮, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৫৯৩
৪. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১২৯৫, ২৭৪২, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৬২৮
৫. জামে' তিরমিযি: হাদিস নং ৩৬৬২, সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ৯৪, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৩৮২
৬. মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৯৭, [আলবানি রহ. হাদিসটি সহিহ বলেছেন]
৭. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১৯৮২, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৪৮১
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৪৪১৮, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৭৬৯
২. সুনানে আবি দাউদ: হাদিস নং ৩০৭২
৩. সুরা ইউসুফ: আয়াত ৬৫
৪. এমন হাদিস-বুখারিতেও রয়েছে: হাদিস নং ২৭৯
১. মুসনাদে আহমাদ: ১/৬৩
১. সহিহ বুখারি : হাদিস নং ৫২, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৫৯৯

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 দারিদ্রতা ও অনুন্নততার বৈধবিধান

📄 দারিদ্রতা ও অনুন্নততার বৈধবিধান


জেনে রাখা উচিত— দরিদ্রতা একটি রোগ। সুতরাং যে তাতে আক্রান্ত হবে এবং তার ওপর ধৈর্যধারণ করবে, সে অবশ্যই সবরের সাওয়াব পাবে। এ কারণে দরিদ্ররা ধনীদের পাঁচশত বছর পূর্বে জান্নাতে যাবে। সম্পদ যেহেতু নেয়ামত, তাই সম্পদশালীর জন্য শোকর আদায় করা কর্তব্য। তার দায়িত্ব হচ্ছে, আল্লাহর নির্দেশিত পথে তা ব্যয় করা। এ কারণে সম্পদের হিসাব দিতে গিয়ে ধনীরা বিলম্বে জান্নাতে যাবে। আবু আবদুর রহমান সালামী তাঁর প্রণীত 'সুনানুস্ সূফিয়্যাহ' গ্রন্থে দরিদ্র ব্যক্তি মৃত্যুর সময় কোনো সম্পদ রেখে যাওয়া মাকরুহ সংক্রান্ত একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, যেখানে উল্লেখ আছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আহলে সুফফার জনৈক ব্যক্তির ইন্তেকাল হলে তার জুব্বার মাঝে দু'টি দিনার পাওয়া যায়। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করা হলে তিনি বললেন, 'এ-তো জাহান্নামের দু'টি দাগ।'

গ্রন্থকার বলেন, উপরোক্ত হাদিস দ্বারা মৃত্যুর সময় ধন-সম্পদ রেখে যাওয়া মাকরুহ হওয়াকে বোঝায় না। এর পটভূমি ভিন্ন। কেননা আহলে সুফ্ফার এ দরিদ্র লোক সদকা গ্রহণ ও সম্পদ সঞ্চয়ের ব্যাপারে দরিদ্রদের সাথে বাদানুবাদ করতেন। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জমাকৃত সম্পদের বিষয়ে বলেছেন, 'এ-তো জাহান্নামের দু'টি দাগ।' ধন-সম্পদ রেখে যাওয়া মাকরুহ হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-কে সম্পদ রেখে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন না। হজরত সাআদ রা.-কে উদ্দেশ্য করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِنَّكَ أَنْ تَتْرُكَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَتْرُكَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ
'তুমি তোমার ওয়ারিসদেরকে সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়া তাদেরকে দরিদ্রাবস্থায় রেখে যাওয়া থেকে উত্তম। যাতে তারা মানুষের দ্বারস্থ হতে না হয়।'

হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সদকার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করলে আমি আমার অর্ধেক সম্পদ নিয়ে আসি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ? আমি বললাম, অনুরূপ সম্পদ রেখে এসেছি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে আমার নিন্দা করেননি।'

ইবনে জারির তাবারি বলেন, এ হাদিসটি জাহেল সুফিদের বক্তব্যের বিরুদ্ধে যথার্থ। কেননা তারা মনে করে, আগামী দিনের জন্য কোনো কিছু অবশিষ্ট রাখা বৈধ নয়। এমন করা আল্লাহ তায়ালার রিযিকের জিম্মাদারির ব্যাপারে অনাস্থা প্রকাশ করার নামান্তর। এটাকে তারা তাওয়াক্কুলপরিপন্থী হিসেবেও বিবেচনা করে। ইবনে জারির বলেন, অনুরূপভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
اتَّخِذُوا الْغَنَمَ فَإِنَّ فِيهَا بَرَكَةً
'তোমরা ছাগল প্রতিপালন করো। কেননা এটা বরকতময় প্রাণী।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বাণী এ সকল সুফিদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে, যারা বলে, আল্লাহর ওপর বান্দার তাওয়াক্কুল তখনই বিশুদ্ধ হবে, যখন সকালবেলা তার কাছে সম্পদ বা খাবার কিছু থাকবে না, অনুরূপভাবে বিকালও এভাবে কাটাবে। অথচ হাদিসে আছে,
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় স্ত্রীদের জন্য এক বছরের খাবার মজুদ রেখেছেন。
***
কোনো কোনো সুফি এমনও আছেন, যারা তার মালিকানাধীন সকল প্রকার ধন-সম্পদ সদকা করে মানুষের কাছে হাত পাতে। এর কারণ হচ্ছে, মানুষের চাহিদা অপরিসীম। এ জন্য বুদ্ধিমানরা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে। হাদিসে আছে, আবু হোসাইন তাদের খনি থেকে এক টুকরো স্বর্ণ নিয়ে আসেন। অতঃপর তা দ্বারা ঋণ পরিশোধের পর কবুতরের ডিম পরিমাণ কিছু স্বর্ণ থেকে গেলে তিনি তা নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি যা ভালো মনে করেন, তদনুযায়ী তা ব্যয় করুন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ডান পাশে এলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নেন। অতঃপর সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাম পাশে এলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নেন। অতঃপর সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাথা মোবারক নিচু করে রাখেন। স্বর্ণ গ্রহণের ব্যাপারে তার পীড়াপীড়ির মাত্রা বেড়ে গেলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত থেকে নিয়ে টুকরোটি এমনভাবে নিক্ষেপ করেন, যদি তার গায়ে আঘাত লাগত, সে নির্ঘাত মৃত্যুবরণ করত। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের কারও অবস্থা তো এমন যে, তার সম্পদের পুরো অংশ সদকা করার পর নিঃস্ব হয়ে মানুষের কাছে হাত পাতে। হে বেকুব! সদকা তো সচ্ছলতার সাথে করতে হয়, আর সদকার সর্বাধিক হকদার হচ্ছে তোমার পরিবার। সুতরাং তাদেরকে দিয়ে শুরু করো।”

أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ، يَقُولُ: " دَخَلَ رَجُلُ الْمَسْجِدَ، فَأَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَطْرَحُوا ثِيَابًا فَطَرَحُوا، فَأَمَرَ لَهُ بِثَوْبَيْنِ ، ثُمَّ حَتَّ عَلَى الصَّدَقَةِ، فَجَاءَ، فَطَرَحَ أَحَدَ التَّوْبَيْنِ، فَصَاحَ بِهِ، وَقَالَ: «خُذْ ثَوْبَكَ
'হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, একবার জনৈক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে কাপড় সদকা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন। তারা বেশ কিছু কাপড় সদকা করল। এসব কাপড় থেকে দু'টি কাপড় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই ব্যক্তিকে দান করলেন। কিছুক্ষণ পর আবার সদকার জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন। তখন ওই ব্যক্তিও কাপড় দু'টি সদকা করে দিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কাপড় নিয়ে নাও।'
***
অনেক সুফি এমন আছেন—যাদের হাতে কোনো মাল থাকলে তারা তা খরচ করে বলেন, আমি আল্লাহ ছাড়া কারও ওপর নির্ভর করতে চাই না। অথচ শরিয়ত সম্পর্কে স্বল্প জ্ঞানের কারণেই তারা এমনটি বলে থাকেন। কেননা তারা মনে করে, তাওয়াক্কুলের অর্থই হচ্ছে আসবাবমুক্ত হওয়া এবং ধন-সম্পদ থেকে দূরে থাকা।

হাফেজ আবু নুয়াইম বলেন, জাফর খুলদি তার কিতাবে লেখেন, আমি জুনাইদ বাগদাদিকে বলতে শুনেছি, আমরা একবার দলবদ্ধ হয়ে আবু ইয়াকুব যাইয়্যাতের বাড়িতে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লে তিনি বললেন, আল্লাহর ইবাদতে কি এমন ব্যস্ততা নেই, যা তোমাদেরকে আমার নিকট আসতে বাধা দেয়? তখন আমি বললাম, আপনার নিকট আমাদের আগমন তো আল্লাহর ইবাদতে ব্যস্ততারই অংশবিশেষ। তখন আমরা তাকে তাওয়াক্কুল বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি সাথে থাকা একটি দিরহাম দান করে আমাদেরকে তাওয়াক্কুলের সঠিক বর্ণনা দিয়ে বললেন, আমার কাছে সম্পদ বিদ্যমান থাকাবস্থায় তোমাকে তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা দিতে আমি লজ্জাবোধ করছি।

গ্রন্থকার বলেন, সুফিরা তাওয়াক্কুলের অর্থই বোঝে না। তাই তারা মাল থেকে পৃথক হয়ে যায়। সাহাবায়ে কেরাম রা. সম্পদ অর্জন করেছেন। এ কথা কি বলা যাবে যে, তাদের তাওয়াক্কুল কম ছিল? তাদের যদি তাওয়াক্কুল না থাকে, তবে আর কার তাওয়াক্কুল থাকবে? হজরত আবু বকর রা. যখন খলিফা নিযুক্ত হন এবং খিলাফতের দায়িত্ব পালনের দরুন ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়, তখন বলেছিলেন, যদি আমার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়, তবে আমার পরিবারের ভরণ-পোষণ চলবে কীভাবে? হজরত আবু বকর রা. এক্ষেত্রে মালের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। তাহলে সুফিদের মতে আবু বকর রা. এর কথা (নাউযুবিল্লাহ) তাওয়াক্কুলপরিপন্থী হয়েছে? এটা কখনো হতে পারে না। মাল হলো আসবাব ও উপকরণ। উপকরণ অবলম্বন করার পরও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে হবে। আর উপকরণ অবলম্বন তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। অনেক সুফি বলেন, অমুক জিনিস ক্ষতি করেছে—এ কথা বলা ঠিক নয়। কেননা ক্ষতি ও উপকারের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর তারা এ ব্যাপারে একটি ঘটনাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে।

আবু তালেব রাযি. বলেন, আমি আমার সঙ্গীদের সাথে কোনো এক স্থানে অবস্থান করছিলাম। সেখানকার লোকেরা কিছু দুধ নিয়ে এল এবং আমাকে দুধ পান করতে বলল। আমি বললাম, আমি দুধ পান করব না। কেননা দুধ আমার জন্য ক্ষতিকর। এ ঘটনার চল্লিশ বছর পর আমি একবার মাকামে ইবরাহীমিতে নামায আদায় করে আল্লাহর কাছে দোয়া করে বললাম, হে আল্লাহ! আপনি জানেন, আমি এক মুহূর্তের জন্যও কখনো আপনার সাথে কাউকে শরিক করিনি। তৎক্ষণাৎ এক আওয়াজ এল, দুধের দিন কি শরিক করোনি?

গ্রন্থকার বলেন, এ ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে প্রশ্ন রয়েছে। 'অমুক জিনিস ক্ষতিকর'-এর অর্থ হচ্ছে, এটা ক্ষতির কারণ। এর অর্থ এই নয় যে, এটা আল্লাহর হুকুম না হলেও ক্ষতি করতে পারবে। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলেছিলেন-
رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيراً مِنَ النَّاسِ
'মূর্তিরা বহু লোককে পথভ্রষ্ট করে ফেলেছে।” হাদিসে আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: مَا نَفَعَنِي مَالَ كَمَالِ أَبِي بَكْرٍ
'আবু বকরের ধন-সম্পদ আমাকে যতটুকু উপকৃত করেছে, অন্য কারও ধন-সম্পদে আমি সেই পরিমাণ উপকৃত হইনি।' বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে খাইবারে জনৈকা ইহুদি মহিলা বিষমিশ্রিত গোশত খাইয়েছিল এবং তার প্রতিক্রিয়া পরেও বাকি ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, 'বিষমিশ্রিত লোকমার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পাচ্ছে। এমনকি তা আমার দিলের রগগুলোও কেটে ফেলেছে।”

এটা সর্বজনবিদিত বিষয় যে, নবুয়তের স্তর সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্তর। সকল নবীদের সর্দার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপকারকে মালের দিকে আর ক্ষতিকে খাবারের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। সুতরাং তাঁর স্বভাব-চরিত্র ও আচার-ব্যবহারকে ডিঙিয়ে শরিয়তবিরোধী অসার মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড সাধনকারীদের ব্যাপারে কোনো তোয়াক্কা করা যাবে না।

টিকাঃ
১. এ-সংক্রান্ত হাদিস ইমাম আহমদ রহ. তাঁর 'মুসনাদ' এ সংকলন করেছেন।
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১২৯৫, ২৭৪২, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৬২৮
৩. [হাসান] সুনানে আবি দাউদ: হাদিস নং ১৬৭৮
৪৮. সহিহুল জামে': হাদিস নং ৮২
৪৯. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৪০৩৩, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৭৫৭
১. [আলবানির মতে হাদিসটি যঈফ] যঈফুল জামে': হাদিস নং ৬৪০৮
২. সুনানে আবি দাউদ: হাদিস নং ১৬৭৫
১. সুরা ইবরাহীম: আয়াত ৩৬
২. জামে' তিরমিযি: হাদিস নং ৩৬৬২, সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ৯৪, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৩৮২
৩. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৪৪২৮

📘 শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় তালবিসে ইবলিস > 📄 সম্পদ ত্যাগের ব্যাপারে সুফিদের মতবাদ

📄 সম্পদ ত্যাগের ব্যাপারে সুফিদের মতবাদ


গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ইতোপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, প্রথম যুগের সুফিরা দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তির কারণেই ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা জমা করা থেকে বিরত থেকেছেন। এক্ষেত্রে তাদের নিয়ত তথা উদ্দেশ্য ভালো ছিল। তবে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তাদের বিচ্যুতি ঘটেছে। পূর্বের বর্ণনাগুলোতে তাদের বিবেকবর্জিত কর্মকাণ্ড থেকে আমরা তা আঁচ করতে পেরেছি। অন্যদিকে পরবর্তী যুগের সুফিদের অবস্থা সম্পূর্ণ বিরপীত ছিল। তারা দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। বৈধ-অবৈধের বাছ-বিচার ব্যতিরেকে ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা সঞ্চয় ও সংরক্ষণে মনোনিবেশ করেছে। যাতে করে দুনিয়াতে বিলাসী জীবনযাপন ও ভালো করে প্রবৃত্তির অনুসরণ করা যায়। তাদের কারও অবস্থা হচ্ছে এমন—এরা উপার্জনে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও কাজ করে না। তারা মসজিদে অথবা উপাসনালয়ে বসে মানুষের সদকার ওপর নির্ভর করে। দরজার কড়া নাড়ার দিকে তাদের মন পড়ে থাকে। অথচ এটা জানা কথা—ধনী ও উপার্জনে সক্ষম ব্যক্তির জন্য সদকা জায়েয নয়। কার কাছ থেকে এই ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা আসছে—এ ব্যাপারে তারা পরোয়া করে না। অত্যাচারী বা ট্যাক্স আদায়কারী তাদের নিকট কিছু পাঠালে তারা তা ফিরিয়ে দেন না। আরও ব্যাখ্যাস্বরূপ বলেন, আমাদের রিযিক তো আমাদের কাছে পৌঁছবেই। অথবা বলে, এ মাল তো আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে। সুতরাং তা ফিরিয়ে দেয়া উচিত নয়। অথচ তারা যা করছে, এর সবগুলোই শরিয়তবিরোধী এবং পূর্ববর্তী আকাবিরদের জীবনাচারের বিপরীত। কেননা হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, الْحَلَالَ بَيِّنُ، وَالْحَرَامَ بَيِّنٌ، وَإِنَّ بَيْنَ الْحَلَالِ وَالْحَرَامِ مُشَبَّهَاتٍ، لَا يَدْرِي كَثِيرُ مِنَ النَّاسِ أَمِنَ الْحَلَالِ هِيَ، أَمْ مِنَ الْحَرَامِ، فَمَنْ تَرَكَهَا، اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ
'হালাল ও হারামের বিষয় সুস্পষ্ট। আর এ উভয়ের মাঝে বহু সন্দেহযুক্ত বিষয় বিদ্যমান, অধিকাংশ মানুষ সে বিষয়ে অনবগত। সুতরাং আল্লাহর ভয়ে, এ সব সন্দেহযুক্ত বিষয় যে পরিহার করবে সে তার দীন ও সম্মান রক্ষায় চেষ্টা করল।'

হজরত আবু বকর রা. সন্দেহযুক্ত খাবার পেটে গেলে বমি করে তা বের করে আনেন। পূর্বেকার মহান মনীষীরা কোনো অত্যাচারীর দান গ্রহণ করতেন না এবং যার ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা সন্দেহযুক্ত—তার দান-অনুদান ও অনুকম্পাও গ্রহণ করতেন না। আবু বকর মারুযী বলেন, আমি আবু আবদুল্লাহর নিকট এক মুহাদ্দিসের আলোচনা তুললে তিনি বললেন, আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন—যদি তার মাঝে একটি স্বভাব না থাকত, তাহলে যোগ্যতা ও গুণাবলিতে তিনি থাকতেন অতুলনীয়। অতঃপর কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আমি তাকে বললাম, তিনি কি সুন্নাতের অনুসারী ছিলেন না? তিনি বললেন, আল্লাহ কসম! আমি তাঁর থেকেও হাদিস লিখেছি, কিন্তু তাঁর একটি বদস্বভাব হলো, তিনি কার কার কাছ থেকে ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা গ্রহণ করছেন—এ বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ করতেন না।

গ্রন্থকার বলেন, আমরা এ বার্তা পেয়েছি যে, জনৈক সুফি কোনো এক আমিরের দরবারে প্রবেশ করে আমিরকে ওয়াজ শোনালে আমির তাকে দানস্বরূপ কিছু সম্পদ বের করে এবং সে তা আগ্রহ-সহকারে গ্রহণ করে। তখন আমির বললেন, আমরা সবাই শিকারি, তবে শিকারের ফাঁদ বিভিন্ন রকম।
***
গ্রন্থকার বলেন, পূর্বেকার যুগের সুফিরা ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা অর্জনের বিষয়ে চিন্তা করতেন এবং তাদের খাবারের বিষয়ে খোঁজ নিতেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে বিখ্যাত সুফি সাররি সাকতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তিনি হালাল খাদ্য গ্রহণের বিষয়ে একজন প্রসিদ্ধ বুযুর্গ। সাররি সাকতি বলেন, জিহাদের উদ্দেশ্যে আমি এক দলের সাথে শরিক হলাম। তখন আমরা একটি ঘর ভাড়া নিয়ে তাতে আমি একটি চুলা তৈরি করলে আমার সাথিরা সেই চুলার রুটি খেতে ইতস্ততবোধ করে।

গ্রন্থকার বলেন, আমি এক সুফির নিকট তার শায়খের সন্ধান চাইলে সে আমাকে বলল, শায়খ তো অমুক আমিরের দরবারে গিয়েছেন। আমির আজ শায়খকে এক সম্মানসূচক পোশাক দ্বারা অভিবাদন জানাবেন, অবশ্য আমিও আমীরের কাছ থেকে এরূপ পোশাক পেয়েছি। অথচ সেই আমির জালেম হিসেবে বেশ প্রসিদ্ধ। তখন আমি বললাম, তোমাদের জন্য আফসোস হয়। তোমরা কেন ব্যবসার উদ্দেশ্যে দোকান খুলছ না? মাথায় পণ্য বহন করে ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা উপার্জন করছ না? উপার্জনে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও কেন তা থেকে বিরত থেকে মানুষের সদকা ও উপঢৌকনের ওপর নির্ভর করছ? কোথা হতে এই ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা আসছে, কে পাঠাচ্ছে-এ ব্যাপারে কিছুরই পরোয়া করছ না? তোমরা দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে রাজা-বাদশা ও ক্ষমতাসীনদের দুয়ারে ঘুরছ এবং তাদের অনুদান লাভের আশায় তাদের কাছে যাচ্ছ? আল্লাহর শপথ! তোমরা ইসলামের গায়ে বিরাট কলঙ্ক লেপন করছ।
***
গ্রন্থকার বলেন, অনেক সুফি শায়খ আছেন-যারা ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সার আধিক্য থাকা এবং তা সঞ্চয় ও সংরক্ষণের লোভ অন্তরে থাকা সত্ত্বেও সে দুনিয়াবিমুখিতার দাবি করে। কেউ কেউ আছেন-ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা অঢেল থাকা সত্ত্বেও অভাব প্রকাশ করেন। তারা যাকাত গ্রহণের ব্যাপারে দুঃস্থ-গরিবদেরকে বাধা দেয় এবং তাদের সাথে ঝগড়া- বিবাদ করে, কিন্তু নিজে তা ভালো করেই জমা করে। আবুল হাসান বুসতামী নামক এক সুফি শীত-গ্রীষ্ম উভয়কালে পশমি পোশাক পরতেন। তার উদ্দেশ্য ছিল, মানুষ যেন তার জুব্বা দ্বারা বরকত পেতে পারে। অথচ এই সুফি মৃত্যুর সময় চার হাজার দিনার রেখে যান।

গ্রন্থকার বলেন, এটা চরম গর্হিত কাজ। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আহলে সুফফার জনৈক ব্যক্তির ইন্তেকাল হলে তার জুব্বার মাঝে দু'টি দিনার পাওয়া যায়। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করা হলে তিনি বললেন, 'এ তো জাহান্নামের দু'টি দাগ।"

টিকাঃ
৪. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫২, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৫৯৯
১. এ সংক্রান্ত হাদিস ইমাম আহমদ রহ. তাঁর 'মুসনাদ' এ সংকলন করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00